লোকটাকে প্রথম দেখেছিলাম পঁয়ষট্টিতে, শিলিগুড়ির রেভলিউশনারি মার্ক্সবাদী পার্টির অফিসে। খুব শীর্ণ চেহারা,পুলিশের অত্যাচার শরীরে স্হায়ী ছাপ রেখে গেছে।গায়ের রঙ রোদে জলে কিছুটা চটা হলেও ফর্সা,চেহারায় আভিজাত্যের ভাঙাচোরা ছাপ এখনও লেগে।খুব সাধারণ পরিবারের সন্তান তো সে ছিল না।ধুঁকতে থাকা শরীরেও লোকটার অদ্ভুত প্রাণশক্তি ছিল।দাঁত না থাকায় চেহারা অকালবৃদ্ধের মত,অথচ লোকটা তখনও পঞ্চাশও পেরোয়নি।রুক্ষ,কাটা কাটা,বার্ধক্যের ছাপ পড়া মুখে,মোটা কালো ফ্রেমের চশমার পিছনে চোখগুলো আশ্চর্য রকম উজ্জ্বল ও সুন্দর।আয়ত চোখে সামান্য লালচে ভাব,আর মেয়েদের মত বড় চোখের পাপড়ি।কপালের উপর এসে পড়া ঘন উস্কোখুস্কো কোঁকড়া চুল।পরনে ঢিলে শার্ট পাজামা,কাঁধে কাপড়ের ঝোলা।

সংগঠনের একটা কাজে শিলিগুড়ি যেতে হয়েছিল।সৌরভদা তখন শিলিগুড়ি মেডিকেল স্কুলে ইন্টার্নশিপ করছে।সে’ই ধরে এনেছিল পার্টি অফিসে,”ভাই আজ একজন হেভিওয়েট নেতা থাকবেন,শিলিগুড়ি জেলা কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি। আলাপ করবি?”
লোকটাকে দেখে আমার প্রকৃতপক্ষে আন্ডারওয়েট মনে হয়েছিল।আর এমন কিছু বড় নেতাও নয়।জেলা স্তরের সংগঠক।আসলে সৌরভদার মত স্তরের ছাত্রনেতাদের তো ঐ লেভেলের নেতারা কেউ তেমন পাত্তা দিত না চন্দ্রিলবাবু ছাড়া।
আমার লোকটাকে চাক্ষুস দেখার আগ্রহের কারণ ছিল অন্য।লোকটা একটা দেখার মতই উপকরণ।এর কারণ অলট্রুইজমের নামে ওর বিচিত্র আঁতলামি এবং জঙ্গীপনা।শুধু ওকে দেখার জন্যই অনেকে শিলিগুড়ি যেত।একবার রাজ্য কমিটিতে নেবার চেষ্টা করা হয়েছিল,কিছুতেই যায়নি।”কৃষকদের থেকে দূরে গিয়ে শহরে বসে তাত্ত্বিক আলোচনার আরামকেদারার কৃৃৃষিবিপ্লব আমার কাপ অফ টি নয়।”এটাই বক্তব্য ছিল।ব্রিটিশ আমলে পার্টির নির্দেশ উপেক্ষা করে অগাস্ট আন্দোলনে ঢুকে গ্রেপ্তার হয়েছিল।বাষট্টিতে পুরোনো পার্টিতে থাকাকালীনই পার্টির চেয়ারম্যানের ছবির উপর চড়াও হয়ে কাচের ফ্রেমটা লাথি ঘুঁষি মেরে ভেঙে ফেলেছিল।ওটা নাকি সংশোধনপন্হার উপর প্রতীকি আক্রমণ।বরাবরই সে নাকি একজন ডাউন টু আর্থ ক্যাডার হয়ে থাকতে চেয়েছে,বড় বড় পোর্টফোলিও প্রত্যাখ্যান করে।এমনকি জনগণের সেবাই বিপ্লবীর আত্মশুদ্ধি এবং সেটাকে পয়সার দাঁড়িপাল্লায় তোলা নাকি অশ্লীল তাই পার্টি ওয়েজ পর্যন্ত নিত না।আমাদের পার্টির মধ্যে যে অতিবৈপ্লবিক ফ্যাকশন ছিল, যারা সরাসরি ক্ষমতা দখলের কথা বলত এই লোকটা তাদের নেতা ছিল।যদিও তখন পলিটব্যুরো এদের গ্রুপটাকে মোটেই সিরিয়াসলি নেয়নি।অনেকেই চন্দ্রিল মজুমদারকে পাগল বলত।অ্যাকচুয়ালি চন্দ্রাহত মজুমদার বলত।কেউ ঠাট্টা করত,কেউ ভালবাসত।আমাদের পার্টির সর্বোচ্চ স্তরে নেতাদের একটা অংশ ৬৭ র অভ্যুথ্বানের সময়ও কিন্তু সমানে বলতেন, “চন্দ্রিলবাবুকে নিয়ে ব্যক্তিগত কুৎসা কোরো না।তাঁর আত্মত্যাগ তুলনাহীন।”

উত্তরবাংলায় ভূমিহীন চাষীদের চোখে চন্দ্রিল মজুমদার দেবতা ছিল,অসাধারণ সংগঠক।ঠান্ডা মেজাজ,সবসময় হাসিমুখ,নরম কথাবার্তা,সবস্তরের মানুষের সাথে সহজে মেলামেশা।অথচ এই লোকটাই ব্যক্তিগত জীবনে চরম বোহেমিয়ান।মাঠে ঘাটে মদ কি গাঁজা খেয়ে পড়ে রইল।কোনো চাষী বা রিকশাওয়ালা ঘরে তুলে নিয়ে শুইয়ে দিল বা বাড়ী পৌঁছে দিল।অনেকেই বলে অত্যধিক গাঁজা খাওয়ার ফলেই নাকি ওর চোখ লালচে হয়ে থাকে। মদ খেয়ে রাস্তায় মাতলামি করার জন্য পার্টি থেকে একবার চার্জশীটও ধরানো হয়েছিল।লোকটা চরম একবগ্গা,তারপরও শোধরায়নি।

-”এই চন্দ্রিলবাবুই মদ খেয়ে রিকশা থেকে পড়ে গেছিল না?তারপর ঝামেলা হয়েছিল?”আমি চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
-”এই চুপ কর,সামনে রয়েছেন। শুনতে পাবেন।”
-”কোনজন?”
-”আরে এই মাত্র বসে ছিলেন,”সৌরভদা সামনের দিকে তাকাল,”কোথায় গেলেন কে জানে!”
তখনই সৌরভদার পিঠে আলতো চাপড় পড়েছিল,”আরে সৌরভ যে,কতদিন দেখি না!”
-”উফ চন্দ্রিলদা আপনি পারেনও। আমি দেখতেই পাচ্ছি না আর আপনি…”হাসল সৌরভদা,”এ অনল।অনল সেনগুপ্ত।আমাদের কলকাতার ছাত্রনেতা।আইরিশ চার্চের জি এস।”
চন্দ্রিল মজুমদার ঠোঁটে ভদ্রতাসূচক একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে আমার দিকে তাকিয়ে আলতো মাথা ঝোঁকালেন,তারপর সৌরভদার একটা হাতের তালু নিজের মুঠোয় নিয়ে নিলেন,”এই আজকে একটু তাড়া আছে,একটা গ্রামে ঝামেলা হয়েছে।আমাকে এক্ষুণি বেরিয়ে যেতে হবে।তুমি যদি একঘন্টা আগে আসতে…”
-”ওহ।”
-”নেভার মাইন্ড।তুমি একটু কাল বাড়ীতে এসো না,কাল সারাদিন আমি আছি।ভাল করে কথাই তো হল না।আর গৌরীর সাথেও দেখা হয়ে যাবে।ও কালই তোমার কথা বলছিল।”
-”অনলকে নিয়ে যাই?”
-”হ্যাঁ শিওর।ওকেও নিয়ে এস।আচ্ছা আসি তাহলে?”
চন্দ্রিলবাবু বেরিয়ে গেলে আমি সৌরভদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “গৌরীটা কে?মেয়ে?”
-”শালা সব সময় ছক করার ধান্দা না?”
সৌরভদা কিরকম খচে গেল।
আমি বললাম,”না তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল বলল,তাই আর কি!”
সৌরভদা যে আর জি করের প্রিয়াঙ্কাদির সাথে এনগেজড সেটা অনেকেই জানত।
সৌরভদা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল,”না, গৌরীদি ওঁর ওয়াইফ।মেয়ের ব্যাপারটা নিয়ে চন্দ্রিলদা খুব সেন্সেটিভ।ওঁর বাড়ী গিয়ে এসব উল্টোপাল্টা বলিস না।”
-”কেন সেন্সেটিভ কেন?”
-”ওঁর মেয়ে তিনবছর আগে মারা গেছে।উনি জেলে থাকার সময়।”
আমার শেষ পর্যন্ত অবশ্য যাওয়া হয়নি।সময় পাইনি।

-”স্যার,আমি আইরিশ চার্চে পড়তাম,ম্যাথ অনার্স।”
-”আমি তোমাকে চিনি।বল কি বলবে।”বললেন সমীরণ রায়।
আমি ছাত্রসংসদে পরপর তিনবার জিতেছি।আমাকে চেনা অস্বাভাবিক নয়।তাছাড়া বলরামবাবুর আখড়ায় শ্যামবাজারে আমি কুস্তি করতাম বলে একটা পরিচিতি ছিল।এখন পাড়ার ক্লাবে অনেক ছেলেই আমার কাছে রেসলিং শেখে।
-”তা কি করছ আজকাল?এম এস সি কমপ্লিট?”
-”হ্যাঁ,অনেকদিন।বহ্নিরই তো ফোর্থ ইয়ার চলছিল।এই চাকরি বাকরির চেষ্টা করছি।”
-”ওহ পি এইচ ডি করবে না?”
আমার এম এস সির রেজাল্ট সুবিধার হয়নি।সেটা চেপে গিয়ে বললাম,”মধ্যবিত্তের ছেলের কি আর ওসব বিলাসিতা মানায় স্যার,বোনটাকে এত কষ্টে ইঞ্জিয়ানিয়ারিং পড়ালাম,সে তো…বাড়ীর দায়িত্ব তো আমাকেই নিতে হবে।”
-”আজকের বাজারে আবার চাকরি!হাজার হাজার ছেলে পাশ করছে, আশি ভাগ বেকার হয়ে বসে।যাই হোক কি যেন বলবে বলছিলে।”
আমি ভণিতা না করে বললাম,”আমি বহ্নির খোঁজ করছি।বাড়ী থেকে যাওয়ার পর থেকে দুবার চিঠি দিয়েছে।তাতে “আমি ভাল আছি” ছাড়া কিছু লেখেনি।ও কোথায় আছে আপনি জানেন?কলকাতায় আছে কি?
-”হ্যাঁ আছে তবে বহ্নি এই মুহূর্তে কোন শেল্টারে আছে বলতে পারব না।আসলে ওকে খুব কড়া সিকিওরিটির মধ্যে থাকতে হয় তো।ওর ক্লোজেস্ট অ্যাসোসিয়েটরা পর্যন্ত শেল্টার বদলের সময় আগের দিন রাত অব্দি খবর পায় না।তবে সপ্তাহ দুয়েক আগে আমার কাছে এসেছিল।”
বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,”আর হয়ত আসবে না।তবে আসলে বলব বাড়ীতে যোগাযোগ করতে।”
-”আর আসবে না কেন বলছেন?”
-”এখন তো তার পথ আলাদা।এখন রক্তিম,বহ্নি, সুভাষ,অরিন্দম সবাই হাফিজ ইসলাম আর সি এমের অনুগামী।চন্দ্রিলবাবু এদের যে কি ভয়ঙ্কর পথে নিয়ে যাচ্ছেন।”
চশমা খুলে কাচ মুছলেন সমীরণ রায়,”আর সত্যি কথা বলব,কিছু মনে কোরো না।বহ্নিকে আমি বললেও সে তোমাদের কন্ট্যাক্ট করবে কিনা সন্দেহ।”
-”কেন?”
-”কারণটা একই। তোমার মা বা তুমি অন্য পলিটিক্সের সাথে জড়িত।বহ্নিদের চোখে তোমরা সংশোধনপন্হী।আমিও তাই অবশ্য।”

বেরিয়ে একটা ভ্যাপসা মন খারাপ গ্রাস করল।বহ্নি বাড়ী ফিরবে না?বহ্নি আমাদের ঘেন্না করে?ঐ হাফিজ ইসলাম নামের যশুরে কইটা বললে আমাদের গলায় ছুরি চালাতেও হাত কাঁপবে না?এরকম অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।বাড়ী থেকে একটা কুড়ি বছরের মেয়ে উধাও,যার নাম পুলিশের খাতায় দাগী খুনি হিসাবে উঠে গেছে,পুলিশ খুনের অভিযোগ পর্যন্ত রয়েছে-সে বাড়ী থেকে উধাও।এবং তার বাড়ী ফেরার প্রবল অনীহা।
পাড়ায় ঢোকার মুখে একবার পার্টি অফিসে ঢুঁ মারলাম, যদি শিবদাস থাকে তাহলে ওর সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলে মনটা একটু হালকা হত।
ওকে পেলাম না।বুড়ো সত্যদা বসে আছেন।আমাকে দেখে বললেন,”চা খাবে নাকি হে?”
আমি হতাশ ভাবে পাড়ার দিকে হাঁটা দিলাম।বহ্নি যাওয়ার পর থেকে সব সময় তেতো একটা ডিপ্রেশন আচ্ছন্ন করে রাখে।আমার রোগা বোনটা কোথায় কী ভাবে আছে কে জানে!আমি না তুলে দিলে ঘুম ভাঙত না।সকালের দিকে ক্লাস থাকলে সকাল বেলা খাইয়ে দিতে হত।নিজে তাড়াতাড়ি খেতে পারত না।

-”অনল,এই অনল।”
একটা ফিসফিসে গলা।
-”আমাকে একটু তোর বাড়ীতে থাকতে দিবি?”
পিছনে তাকিয়ে দেখলাম একটা বটগাছের আড়াল থেকে চোর চোর ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসছে সৌরভদা।

(ক্রমশ)

(পরের পর্ব শুক্রবার বা আজ থেকে এক সপ্তাহ পর দেওয়া হবে।)

দ্রোহকাল ৫
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments