আজকে বেশ বড় একটা বাওয়াল হবে।টি আর মানে তপনবাবু আসছে চব্বিশ পরগণা জেলা কমিটির তরফ থেকে,বহ্নির সাথে তার গন্ডগোল সুবিদিত।তারা নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করতেও পারে,নাও করতে পারে।আজ হাফিজদার উপস্হিতিতে সংযত থাকার সম্ভাবনাই বেশী।কারণ হাফিজদা থাকলে ঝামেলাটা সাধারণত উনিই তৈরী করেন,অন্য কাউকে বড় একটা সুযোগ দেন না।
একটা সিগারেট ধরিয়ে একটা বস্তার উপর বসেছিল রক্তিম।কাল উত্তরবঙ্গের নেতা পার্থ সরকার এসেছে,চন্দ্রিলদা এই মিটিং এও আসতে পারলেন না।শ্বাসকষ্টের সমস্যাটা আবার বেড়েছে।পার্থই আজ তাঁকে রিপ্রেজেন্ট করবে।অবশ্য সেন্ট্রাল কমিটির সব সদস্যই যে উপস্হিত তা নয়। চব্বিশ পরগণা আর কলকাতার জেলা কমিটির সদস্যদের সাথে সি এম আর হাফিজ ইসলামের আলোচনায় বসার কথা ছিল।জয়ন্ত মিশ্র আসবেন,তাঁর সাথেই হিসাব মত হাফিজদার ঝামেলা লাগা উচিত।দেখা যাক কি হয়!
পার্থ রক্তিমের সাথে বেশ কিছুক্ষণ ধরে গল্প করার চেষ্টা করছিল।রক্তিমের ওর সাথে কথা বলতে খুব একটা ভাল লাগছিল না।যদিও আপাত দৃষ্টিতে দেখলে ওকে খারাপ লাগার কোনো কারণ নেই।নাম ধরে ডাকার ব্যাপারটা ছাড়া।পার্থ রক্তিমের থেকে অন্তত বছর তিনেকের ছোট হবেই।ও শিলিগুড়ি মেডিকেল কলেজে হাউজস্টাফশিপ করছে,সৌরভদের থেকে দুবছরের জুনিয়র।সৌরভ রক্তিমের এক বছর পরে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে।পার্থর সাথে আগে থেকে সঙ্গত কারণেই রক্তিমের পরিচয় ছিল না।প্রথম আলাপ পার্টি করতে এসেই,প্রথম থেকেই নাম ধরে ডাকে, ‘তুমি’ বলে।রক্তিমের সমস্যা হচ্ছে সে হুট করে কাউকে কড়া কথা বলতে পারে না।বেশ প্রস্তুতি নিতে হয়।আজকে অনেকক্ষণ ধরেই সে ভাবছে পার্থকে সে দাদা ডাকতে বলবে।বেশ কড়া ও ঠান্ডা স্বরে।

-”এই গলিটা দিয়ে আসুন।”বলে শানু ভট্টাচার্য একটা জঘন্য নোংরা এঁদো গলির মধ্যে হাওয়া হয়ে গেল।দু পাশে নর্দমা,প্রস্রাবের ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে।বহ্নি কোনওমতে ওকে অনুসরণ করার চেষ্টা করল।
একটু বাদে তাকে দেখা গেল।
-”এটা কোথায় নিয়ে এলেন?কি গন্ধ।”বহ্নি নাকে কাপড় চাপা দিল।
-”আর কোনো রাস্তা ছিল না।পুরো এরিয়া পুলিশ ঘিরে ফেলেছে।এখানে নেহাত মেথররা গু জমা করে বলে…”
-”বাহ চমৎকার!”
বহ্নির জুতোটা একটা বিশ্রী হলুদ জমাট থকথকে জিনিসে আটকে গেল।বহ্নি ওটা তোলার জন্য নীচু হতেই শানু বলল,”দাঁড়ান।”বলে জুতোটা হাতে তুলে নিয়ে পাতা দিয়ে পরিষ্কার করে দিল।কোনোমতে গলি থেকে বেরিয়ে একটা মাঠের পাশের টিউবওয়েল থেকে হাত পা ধুয়ে নেওয়া গেল।
শানু বলল,”মাঠটা ধরে সোজা চলে যান।পুলিশ ঐ গলিটা দিয়ে এদিকে আসতে পারবে না।সোজা গিয়ে একটা রাস্তা পাবেন,পুকুরটা বাঁ হাতে রেখে হেঁটে গেলেই মেন রোড।ওখানে বাস পেয়ে যাবেন।আমি গিয়ে বাবলুদের আটকাচ্ছি।যান।”
-”থ্যাঙ্ক ইউ।”বহ্নি বলল,”তবে আমাকে বাঁচিয়ে রেখে বোধ হয় ঠিক করলেন না।আমি তো আমার পথেই চলব।”
-”শানু গুন্ডা হতে পারে তবে নিমকহারাম নয়।জান বাঁচানেয়ালাকে যে মরতে পাঠায় সে একটা কুত্তারও অধম।আর তাছাড়া আমি মা বোনদের সনমান দিতে জানি।আসুন।”
কথা শেষ করে শানু আর দাঁড়াল না।বহ্নি এক সেকেন্ড ওর গলির মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকা চেহারাটা দেখল,তারপর মাঠের পথ ধরল।শানু বেইমানিটাও ইমানদারির সাথে করে-এটা ওর শত্রুরাও অস্বীকার করবে না।
এই শানু বহ্নিদের পার্টির অন্তত গোটা দশেক ছেলেকে খুন করেছে।একদিন মারোয়ারী বাগানে খেতে যাওয়ার সময় আচমকা তাকে অসীমদের দলটা ঘিরে ফেলেছিল।সেদিন সে নিরস্ত্র ছিল।ফায়ার আর্মস কোনদিনই শানু ক্যারি করে না।কিন্তু যতক্ষণ ওর হাতে রামপুরী থাকে,বন্দুকও দাঁড়াতে পারে না।ডিপিআই এর এই একটা লোককে বহ্নি দেখেছে একেবারে নির্ভীক।
লাইটপোস্টে বেঁধে একপ্রস্হ মারধোরের পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বহ্নির সামনে।মৃত্যু নিশ্চিত জেনে সে হাসিমুখে বলছিল, “দাঁড়া মারবি তো?তার আগে একটু শিঙারা খাওয়াবি না?আর একটা ফাইভ ফিফটি ফাইভ?মারার আগে শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে হয়।”
-”শালার সখ দেখুন,মামাবাড়িতে এসেছে যেন।”বলেছিল অসীম।
বেশ পুরু আলেকজান্ডার মার্কা ব্যাপার না?
আসলে একেবারেই না।একটা লোক স্ট্রীট ফাইটে মারা পড়ল,সেটা এমন কিছু বড় ডিল নয়।কিন্তু একদম জ্যান্ত একটা মানুষকে ধরে চোখের সামনে মেরে ফেলা?একটা মানুষকে তৈরী করার কাজটা নয় মাসের মত সময়সাপেক্ষ, আর তাছাড়া একজন মহিলার যথেষ্ট ফিজিকাল লেবারেরও প্রয়োজন হয়।মেরে ফেলতে ঠিক এক সেকেন্ড লাগে।একটা বুলেট,কি গলার নলিতে আলতো করে চাকু বুলিয়ে দেওয়া।
আবার ছেড়ে দেওয়া মানেও শহীদদের প্রতি অবিচার করা সন্দেহ নেই।কিন্তু মারা আর ছাড়ার মাঝামাঝি কোন পথ খোলা নেই কারণ বহ্নিদের হাতে তো আর কোনো জেলখানা নেই।
-”ফাইভ ফিফটি ফাইভ কেনার পয়সা থাকলে আমরা বিড়ি খেতাম না।এক পয়সার অওকাত নেই,যত সব নবাবি হুহ্।”শঙ্কর রাগত গলায় বলল।
কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে বসে রইল বহ্নি,তারপর বলল,”আমরা শ্রেণিশত্রুদের জামাই আদর করি না।ফাইভ ফিফটি ফাইভ হবে না,যান ফুটুন।”
-”মানে?”শানু একটু অবাক হল।
-”বাড়ী চলে যান,ছেড়ে দিচ্ছি আপনাকে।”
কয়েক সেকেন্ড কারো মুখে কোনো কথা নেই।অসীমরা বোধহয় ভাবছে ই এস জি একে নিধন করার কোনো চৈনিক কায়দা ভাবছে কিনা।শানু নিজেও কথাটা বিশ্বাস করেনি।
বহ্নি বলল,”আমার সাথের এই ছেলেগুলো এরকম সিদ্ধান্তের জন্য বিদ্রোহ করতে পারে,সেন্ট্রাল কমিটির কাছে আমাকে শাস্তি পেতে হতে পারে।এতগুলো রিস্ক নিয়েও আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি।এরপর আমার দলের কোনো ছেলের গলায় ছুরি বসানোর আগে আজকের দিনটার কথা ভাববেন।মরতে বসার ঠিক আগে কেমন লাগে,আর হাতে পেয়েও আপনাকে আমরা ছেড়ে দিচ্ছি।এই দুটো কথা।”
-”কেন ছেড়ে দিচ্ছেন?”শানু ঘাবড়ানো মুখে বলল।
-”একটা মেসেজ দিতে চাই।আমরা খুনী বা সন্ত্রাসবাদী নই।আমরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পেটে লাথি মারতে এসেছি।সেটা গান্ধীবাদি প্রসেসে সম্ভব নয়।কিন্তু ভায়োলেন্স যতক্ষণ না অপরিহার্য হচ্ছে আমরা তা ব্যবহার করব না।মানুষের জীবন আমাদের কাছে মূল্যবান।মতাদর্শ যাপনে তৈরী হয়।আশা করছি এরপর আমাদের বা যে কোনো বিরোধীকে মারার আগে এটা মাথায় থাকবে।”

শানু যে সত্যিই সত্যিই কথাটা আপ্তবাক্যের মত মাথায় নিয়ে নেবে ভাবা যায়নি।ভালই হয়েছে। ওকে টুক করে আরেকবার তুলতে হবে,বাগবাজার থেকে(বরানগর ছেড়ে চলে যাবার পর থেকে ও বাগবাজারেই থাকে)।দলে টানার পক্ষে আদর্শ পরিবেশ।এই জাতীয় এলিমেন্টদের পার্টিতে খুব কদর।তবে এই প্রবণতাটা ভাল নয়।পার্টিতে প্রচুর বেনোজল ঢুকছে,হাফিজ ইসলামকে জানিয়েও লাভ হয়নি।পার্টিতে এদের নেওয়া খোদ জি এসের সিদ্ধান্ত।আর হাফিজ ইসলাম তাঁকে অন্ধভাবে মান্য করেন।
হাফিজ ইসলাম বিদ্বান মানুষ,তাত্ত্বিক নেতা,কবি,বুদ্ধিজীবি,সাংবাদিক।ছাত্রযুবদের হিরো।ব্রিটিশ আমলে ইংরাজীতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন এম এ পরীক্ষায়।কিন্তু বহ্নির লোকটাকে ঠিক আপ টু দ্য মার্ক মনে হয় না।কেমন একটা ডগমাটিজম আছে।যেমন বছর তিনেক আগে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিকে চীনের ভারতীয় শাখা হিসাবে ধরে নেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে তাঁকে একান্তে প্রশ্ন করায় যত্ন করে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিলেন,আবার এই মানুষটাই মিটিং এ সবাইকে দাবড়ে দিয়ে বললেন,পার্টির নির্দেশ-তাই বিনা প্রশ্নে মানতে হবে।তবে এস আই শ্যামল ভৌমিকের ঘটনাটায় বহ্নিকে খুব সাপোর্ট করেছিলেন,সমীরণ বাবুর সাথে প্রায় ঝগড়া লেগে গেছিল।আজকে দেখা যাক মিটিং এ কি বলেন।

-”চন্দ্রিলদা এবারও আসতে পারলেন না।হাঁপানির টানটা খুব বেড়েছে।”
-”হুম।”অন্যমনস্ক ভাবে রক্তিম বলল।ছেলেটার ধৈর্য আছে বটে।গত চারটে প্রশ্নের এরকম ডেজাল্টারি উত্তরের পরও হাল ছাড়ছে না।চন্দ্রিলদা ওর প্রতি বেশ ইমপ্রেসড বোধ হয় এই কারণেই।প্রথমবার গ্রামে প্রচার করতে গিয়ে এক বুড়ি চোর সন্দেহে বঁটি হাতে ওকে তাড়া করেছিল।তাও দু বছর ধরে হাল না ছেড়ে মাটি কামড়ে পড়ে আছে গ্রামে।
-”তা ই এস জির খবর কি?”কথাটা বলেই রক্তিমের চোখের দিকে তাকিয়ে পার্থর মুখটা একটু টসকাল,রক্তিম বেশ হিংস্র দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।তবে ছেলেটা স্মার্ট আছে,সামলে নিয়ে বলল,”চন্দ্রিলদা ওর সাথে দেখা করতে চান।সেভাবে তো ওর সাথে আলাপ হয়নি।”
রক্তিমের গা জ্বলে গেল।এই ছেলেটার নিশ্চিত গন্ডগোল আছে।যখনই মিটিং এর জন্য কলকাতা আসে,বহ্নিকে কিছুতেই ছাড়তে চায় না।মিটিং এর আগে বা পরে একবার ধরবেই এবং বকবক করে মাথা খারাপ করে দেবে।বহ্নি সবার সাথে ভদ্র ব্যবহার করে,এই ব্যাপারটার ভালো মত সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা।
-”আচ্ছা রক্তিম, কলেজ স্ট্রীটে কোন দোকানে ওপার বাংলার বই পাব বলতে পার?”
-”পার্থ” বরফশীতল গলায় রক্তিম বলল,”তুমি আমাকে এবার থেকে রক্তিমদা বলে ডাকবে।”
-”যাচ্চলে,কেন?”
-”এতে কেনর কিছু নেই।তুমি আমার জুনিয়র,আর আমার নাম ধরে ডাকা পছন্দ নয়।”
পার্থ উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিল,হঠাৎ সামনের দিকে চোখ পড়ল।
-”আরে ঐ তো বহ্নি এসে গেছে।”বলে ঠিক ব্যাঙের মত একটা লাফ দিয়ে উঠে গেল পার্থ।রক্তিম লক্ষ করেছে বহ্নিকে দেখলেই ও এই লাফটা দেয়।অথচ ও যে খুব ছ্যাবলা ধরনের ছেলে তা কিন্তু নয়।

একটুকরো লাল কাপড়ে মোড়া সূর্যকে রক্তিম দূর থেকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে দেখছিল।বহ্নির শ্বেতপাথরের মত ত্বকের উপর লাল শাড়ির মধ্যে দিয়ে রোদ পড়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর রক্তিমাভা ফুটে উঠেছে।ওকে দেখলে দুপুর বারোটার সূর্য ছাড়া আর কিছুর কথা মনে আসে না রক্তিমের।মধ্যাহ্ন সূর্যের কয়েকটা বৈশিষ্ট্য আছে।এক,বেশীক্ষণ তার দিকে তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।দুই,চোখ বন্ধ করার পরও অনেকক্ষণ তার রেশ চোখে লেগে থাকে।এত উজ্জ্বল ফর্সা রঙের বাঙালী মেয়ে বড় একটা দেখা যায় না।তাই পার্থর মত মাছিগুলো গিয়ে জোটে।আসলে একটা মানুষের মধ্যে যা যা ভাল জিনিস থাকা দরকার,সেগুলো সবই বহ্নির তিন চার গুণ বেশী রয়েছে।রূপ,প্রতিভা আর আত্মত্যাগ।ঐ অনলশিখার মত রূপ দেখে যে মাছিগুলো ওর চারপাশে ভন ভন করে,তারা কেউ জানে না বহ্নিকে সবচেয়ে বেশী সুন্দর দেখায় মিছিলের দিনগুলো।যে দিন কমরেডদের বাঁচাতে গিয়ে রক্তাক্ত হওয়া বহ্নিকে সুভাষ আর সুবিমলদার মেয়ে চাতালে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিচ্ছিল সেদিন সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী ছিল।
বহ্নি সম্রাজ্ঞীর মত ভঙ্গীতে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে একটা রকের উপর বসল।ঠিক একটা কুত্তার মত পার্থ ওর পিছন পিছন গিয়ে ওর পায়ের কাছে একটা বস্তার উপর বসল।ও বোঝে না যে এরকম বসার ভঙ্গিতে ওকে সীতার পদতলে বসা হনুমান ছাড়া কিছু মনে হয় না।বহ্নি কেন যে এসব উটকো ছেলেগুলো সহ্য করে।পার্থ জানে না এই সহ্য করাটা ততক্ষণই থাকবে যতক্ষণ ও পায়ের নীচে থাকবে।বহ্নি লোকের উপর ছড়ি ঘোরাতে খুবই পছন্দ করে।সেবার গ্রামে গিয়ে,রক্তিম,বহ্নি,নীলাদ্রি, অরিন্দম আর স্বাতী এক চাষীর বাড়ী শেল্টারে।মাত্র মাসখানেক আগে অরিন্দম আর স্বাতী রেডবুক বদলে বিয়ে করেছে।রাতে ওদের অসভ্যতায় অতিষ্ঠ হয়ে দুটো লুঙ্গিকে পর্দা হিসাবে টাঙাতে হয়েছিল।বহ্নি ব্যাপারটা নিয়ে বেশ বিরক্ত ছিল।পার্টির ছেলেমেয়েদের ইদানীং বিয়ে করার প্রবণতা প্রচন্ড বেড়ে গেছে।এটা নিয়ে প্রবীণ নেতারা কেউ কেউ অসন্তুষ্ট।বহ্নি প্রবীণ না হয়েও বেশ বিরক্ত।রক্তিমের মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েটার একরকম মানসিক অসুস্হতা আছে।এই পুরুষ নারীর স্বাভাবিক শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারটা ও একদম সহ্য করতে পারে না।আরেকটা জিনিসের প্রতি বহ্নির চরম বিতৃষ্ণা আছে,সেটা হচ্ছে পৌরুষ।মানে যা কিছু পুরুষালি বহ্নি একদম পছন্দ করে না।সেটা নিয়েই সেদিনের ঘটনাটা।
অরিন্দম স্বাতীকে বলছিল,”আমার পাঞ্জাবিটা একটু কেচে দিবি?কাল বেরোব।”
বহ্নি উপযাজকের মত ওদের মাঝখানে কথা বলেছিল,”নিজের কাজটা একটু নিজে করতে শেখ অরিন্দম।প্রচার, সারাদিনের কাজকর্ম সেরে এসে সবাই ক্লান্ত থাকে।”
অরিন্দম বলতে সাহস পায়নি যে এটা মেয়েদের কাজ,আর স্বাতী আমার বউ।ও বলেছিল,”আচ্ছা আমি তো ওর সাথে কথা বলছি।ও তো আপত্তি করছে না,ব্যাপারটা আমাদের দুজনের মধ্যের।এতে বাইরের কারো না ঢোকাই ভাল।”
-”তোদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই।তবে বিষয়টা আদর্শগত হলে ঢুকতে হবে বৈকি।নেতা হিসাবে আমার কাজ এটা দেখা যাতে কেউ ফ্রি রাইডার না হয়।বাইরে কমিউনিস্ট থাকব আর ঘরে ঢুকেই ফিউডাল লর্ড হয়ে গিয়ে বউয়ের উপর হুকুমবাজি চালাব এটা আমার কাছে চলবে না।জেন্ডার রোলগুলো যাতে ডিজলভড হয় সেটা দেখাও আমার কর্তব্য।”
-”আচ্ছা তুই এখন আমাদের ব্যক্তিগত প্রত্যেকটা ব্যাপারেও নাক গলাবি তাই তো?”
-”মতাদর্শ যাপনে রিপ্রোডিউসড হয় এটা মাথায় রাখিস।বিপ্লবীকে সমস্ত ওল্ড কাস্টমসকেই চ্যালেঞ্জ করতে হয়।নিজের সুবিধার জায়গাটা অক্ষুণ্ণ রেখে বিপ্লবী সাজার চেষ্টা করব,এটা একধরনের দ্বিচারিতা।”
সাধারণত সুন্দরী মেয়েরা পরস্পরের বন্ধু হয় না,কিন্তু খুবই আশ্চর্যজনক ভাবে স্বাতী বহ্নিকে সমর্থন করল।স্বাতী অবশ্য বরাবরই বহ্নির চামচে।বহ্নি কি করে যে এতগুলো মেয়েকে বশ করে রক্তিমের মাথায় আসে না।স্বাভাবিক ভাবে বহ্নির মত অসহনীয় ধরনের সুন্দরী মেয়েদের মেয়েরা পছন্দ করে না,কিন্তু বহ্নি ব্যতিক্রম।
স্বাতী বলল,”বহ্নিদি তো ঠিকই বলছে।আমরা সবাই টায়ার্ড,আমাকে জামা কাচতে হবে কেন?আমি মেয়ে বলে?”
সব জায়গায় এই ফেমিনিস্ট ইস্যু তৈরী করা জিনিসটা রক্তিমের পর্যন্ত খুব বিরক্তিকর লাগে।অরিন্দমেরও লাগবে জানা কথা।ফলে ওদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হল।তার ফলে যেটা ভাল হল তা হচ্ছে লুঙ্গিদুটো টানিয়ে রাখার প্রয়োজন রইল না। রক্তিমের লুঙ্গিগুলো মাটিতে পেতে ঘুমোনো গেল। ওরা কথা বন্ধ করে আলাদা জায়গায় ঘুমোলো।কৃতজ্ঞতাবশত রক্তিম বহ্নিকে তার ব্যাগটা বালিশ হিসাবে ব্যবহার করতে দিয়ে দিল।

-”আপনারা কি আরম্ভ করেছেন?রাজধানী এক্সপ্রেস উল্টে দেওয়া হল কেন?”জয়ন্ত মিশ্র ঢুকেই চেঁচাতে শুরু করলেন।
বহ্নি, পার্থ দুজনেই তাঁর দিকে দেখল।তারপর পার্থ বলল,”কি হয়েছে?”
বহ্নি পার্থর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বলল,”এটা লোকাল কমিটির ডিসিশন,এখানে আমার কিছু করার নেই।তাছাড়া অর্ডারটা বিহারের কমরেডরা ক্যারি আউট করেছেন।”

-”সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হিসাবে আপনিও দায় এড়াতে পারেন না কমরেড ইএসজি।”
-”আপনি শান্ত হয়ে বসুন।হাফিজদা কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছেন।এটা মিটিং এ আলোচনা করা যাবে।”বলল বহ্নি।

হাফিজদা মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঢুকলেন।এবং ঢুকেই বহ্নিকে বললেন,”আপনি আজ রাতের ট্রেনেই নর্থ বেঙ্গল চলে যান।পুলিশ আপনাকে ফলো করছে।এখানে থাকলে দুদিনের মধ্যে অ্যারেস্ট হয়ে যাবেন।”
-”আজকেই?”বহ্নিকে চিন্তিত দেখাল।
-”অাপনি অ্যারেস্ট হলে সিএমের কাছে আমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে।চিন্তার কিছু নেই,এই পার্থর সাথেই বেরিয়ে যেতে পারেন।ও ওখানে আপনার শেল্টারের ব্যবস্হা করে দেবে।তাছাড়া প্রদীপও তো এখন নর্থ বেঙ্গলে কাজ করছে।”
রক্তিমের কথাটা একটুও পছন্দ হল না।হাফিজদা সব জেনেও সব সময় এতটা ইনসেন্সিটিভ ভাবে কেন কথা বলেন?তিন মাস আগের একটা ঘটনা মনে পড়ল রক্তিমের।ঐ সময় বহ্নি আর রক্তিম বিহারের সীমান্তবর্তী এলাকার গ্রামগুলো পরিদর্শন করছিল।সেরকম একটা দিনে আসানসোলে সেন্ট্রাল কমিটির একটা মিটিং এর পর সমীরণদা বলছিলেন,”আচ্ছা রক্তিম তোমাকে যদি বহরমপুরে একটা জায়গায় পাঠানো হয় আপত্তি আছে?মানে একা আর কি।বহ্নিকে ঐ সময় নদীয়ায় একটা কাজে পাঠাব ভাবছি।”
হাফিজদা বহ্নি বা রক্তিমকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলে উঠেছিলেন,”আমরা যেখানে পাঠাব ওরা যাবে।ওতে অত জিজ্ঞেস করার কি আছে!”
সমীরণবাবু একটু বিস্মিত গলায় বলেছিলেন,”না আসলে ওরা বোধহয়..”
-”ওরা কিছুই না। ওরা পার্টিজ্যান,এটাই ওদের বা আমাদের সবার একমাত্র পরিচয়।যেটা আপনি ভাবছেন সেটাও নয়।ওদের মধ্যে আপনি যেরকম ভাবছেন সেরকম কোনো সম্পর্ক নেই।অবশ্য যদি থাকতও তাতেও পার্টির নির্দেশ ওরা মানতে বাধ্য থাকত।”
সব কথাই সত্যি এবং রক্তিমের জানা,কিন্তু কিছু কিছু সত্যি আরেকবার করে শুনতে খুব হৃদয়বিদারক লাগে।
এক দুর্বল মুহূর্তে হাফিজদার সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করে ফেলেছিল রক্তিম।আর সেটাই ভুল হয়েছে।হাফিজ ইসলাম চন্দ্রিলদা নন।চন্দ্রিলদা ছাড়া এঁরা প্রত্যেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগের পিউরিটানিজমের শিকার।
হাফিজদা শান্তভাবে রক্তিমের সব কথা শুনে বলেছিলেন,”আচ্ছা বহ্নি কি বলছে?”
-”বহ্নি রাজী নয়।ও বলছে এই বিক্ষুব্ধ সময়ে এসব চিন্তাও নাকি মধ্যবিত্ত বিলাসিতা।”
-”সেভাবে দেখতে গেলে কিন্তু খুব একটা ভুল বলেনি।যাক গে ও যখন পছন্দ করছে না আর এটা নিয়ে কথা বাড়িও না।”
কত সহজে সব মিটিয়ে দিলেন ভদ্রলোক।তারপর থেকেই ওঁর সম্ভবত একটা ধারণা তৈরী হয়েছে যে রক্তিম বহ্নিকে জ্বালাতন করে।এঁদের পক্ষে প্রেমিককে সেক্সুয়াল প্রিডেটর বানিয়ে দেওয়া খুব সহজ।আর বহ্নিও তো কখনও হাফিজদার এই অসংবেদনশীল কথাগুলোর প্রতিবাদ করে না।
মিটিং এ তেমন কোনো ঝামেলা হল না।ঝামেলা হল মিটিং এর পরে।ইদানীং শেল্টারে পার্টি সমর্থকদের হাতে মহিলা কমরেডদের কারো কারো শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটছে।বহ্নি কিছুদিন ধরে এটা নিয়ে চিন্তিত।একটা মেয়ে তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে।মৌখিকভাবে রক্তিমের কাছেও কয়েকটা মেয়ে কমপ্লেন করেছিল।বহ্নি আর রক্তিম সেটা নিয়ে হাফিজ ইসলামের সাথে কথা বলছিল।তখনই জয়ন্ত মিশ্র এসে ঢুকলেন।
-”কমরেড এইচ আই,আপনার সাথে কথা ছিল।”
হাফিজ তাঁর দিকে মৃদু নড করে আবার আলোচনায় ফিরে এলেন।রক্তিমদের সাথে তখনও কথা শেষ হয়নি।বহ্নিকে আজই বেরিয়ে যেতে হবে নইলে এ ব্যাপারে তাকে কিছু দায়িত্ব দেওয়া যেত।
একটু বাদে কথা শেষ হলে জয়ন্তকে ডাকলেন হাফিজ।
-”রাজধানী এক্সপ্রেস উলটে দেওয়া ঠিক হয়নি।ওতে গরীবরাও থাকে,তাছাড়া রাজধানী এক্সপ্রেসে যাতায়াত করা মানেই কেউ শোষকে পরিণত হয় না।আমি এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আপনার ছেলেরা আমাকে প্রতিবিপ্লবী বলছে।প্রচুর অ্যান্টিসোশাল এলিমেন্টস আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারে চলে আসছে।গোপনীয়তা বলে কিছুই থাকছে না।সেন্ট্রালিজম রক্ষা করাটা আপনাদের দায়িত্ব ছিল।”

হাফিজ ইসলাম শান্তভাবে তাঁর সব অভিযোগ শুনলেন।তাঁর পাশ থেকে একটা ছেলে বলে উঠল,”গদ্দারকে বাঁচিয়ে রাখা মানে বিপ্লবের ক্ষতি করা।”

হাফিজ চুপ করে রইলেন।একসময় শুধু জিজ্ঞেস করলেন,”আপনি কি লিখিত ভাবে কিছু দিয়েছেন?”
জয়ন্ত বললেন,”হ্যাঁ।”
হাফিজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,”আপনার কাছে চন্দ্রিলবাবুর যে সাক্ষাৎকারের টেপ আছে সেটা দিন।”

হঠাৎ বহ্নির দিকে ফিরলেন,”আপনি এখনও দাঁড়িয়ে?”
বহ্নি বলল,”হ্যাঁ আসলে আমার জয়ন্তদার সাথে সমীরণ স্যরের বাড়ী যাবার কথা ছিল।”
-”আপনাকে একটু আটকাব।আমাদের কালকের বাংলা দৈনিকে আমার দুটো প্রতিবেদন বেরোবে।মানে কয়েকটা টেকনিকাল বিষয় আছে,আপনাদের মেকানিকস সংক্রান্ত। একটু লেখাগুলো দেখে দেবেন?”
-”আমি আপনার লেখা কারেকশন করব?”বহ্নি খুবই অবাক হল।
-”কেন নয়?”খুবই বিনীত গলায় হাফিজ বললেন,তারপর বললেন,”রক্তিম তুমিও দাঁড়িয়ে যাও।বহ্নির লেখাটা দেখা হয়ে গেলে তুমি ওটা নিয়ে রেখ,বিকেলে আমায় দিয়ে দেবে।”
তারপর জয়ন্তর হাত থেকে ক্যাসেটটা নিয়ে বললেন,”আপনাকে এক্সপেল করলাম।”

বলে বেরিয়ে গেলেন।
বহ্নি লেখায় পরিবর্তন করার মত কিছুই পেল না।একটু বাদে হাফিজকেও অরিন্দমের সাথে ফিরে আসতে হল চিন্তিত মুখে।বললেন,”পুলিশ পুরো এরিয়া ঘিরে ফেলেছে।”
বহ্নি বেরিয়ে চারপাশ দেখল তারপর বলল,”সবাই আমার সাথে আসুন।”
বাকিরা আগেই বেরিয়ে গেছে।সবাই বলতে রক্তিম,হাফিজ,অরিন্দম আর বহ্নি।
তারপর একটা ম্যানহোলের ঢাকনা সরিয়ে তার মধ্যে ঢুকে গেল বহ্নি।বাকিদেরও ইশারা করল চলে আসতে।রক্তিম একটু ইতস্তত করল,তারপর যখন দেখল হাফিজদা সাদা ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবি পরে ম্যানহোলে নেমে যাচ্ছেন তখন অরিন্দমের হাত ধরে ওঁদের অনুসরণ করল।

সন্ধ্যে ছ’টার আগে বেরোনো গেল না।মাঝখানে বহ্নি একবার সর্দারি করে অরিন্দমকে নিয়ে বেরোবার চেষ্টা করেছিল।মানে রক্তিম যাতে হাফিজ ইসলামকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে,ততক্ষণ বহ্নি পুলিশকে ডিসট্র্যাক্ট করবে।হাফিজদা কিছুতেই বেরোতে দেননি।বলেছেন,”এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে নাকি?একজন মহিলা কমরেডের ঘাড়ে বন্দুক রেখে পালাতে পারব না।”
এরপর ঐ জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন নিয়ে বহ্নির সাথে কিছুক্ষণ তাঁর তাত্ত্বিক তর্ক হয়েছে।শেষ পর্যন্ত একটা ব্যাপারে বহ্নি এবং হাফিজদা দুজনেই একমত হল যে পুরীষ বা দুর্গন্ধযুক্ত পাঁকের মধ্যে পুলিশ আসতে পছন্দ করে না তাই এ জায়গাটা নিরাপদ।
বেরোনোর পর একটা টিউবওয়েলে হাত মুখ ধুয়ে নিতে হল।জামাকাপড় এবং চেহারার খুবই শোচনীয় অবস্হা।হাফিজদা অরিন্দমকে নিয়ে চলে গেলেন।রক্তিম আর বহ্নি পাশাপাশি হাঁটছিল।আজ পুলিশের গোলমালে পার্থ সরকারের বহ্নিকে নিয়ে যাওয়া হয়নি।আগেই কেটে পড়তে বাধ্য হয়েছে।ভালই হয়েছে,ভাবছিল রক্তিম।
একসময় বহ্নি বলল,”একটা ভুল হয়ে গেল।হাফিজদাকে টিকিটের কথা বলা হল না।আমার কাছে একদম পয়সা নেই।তোমার কাছে হবে?”
-”টিকিটের মত পয়সা তো নেই রে।দাঁড়া আগে কিছু খাওয়া যাক,তারপর ভেবে দেখি কোথা থেকে জোগাড় হয়।আচ্ছা রাজাবাজারের মুসলিম বস্তিগুলোয় তো তোর ভাল সংগঠন আছে, ওখান থেকে ব্যবস্হা হবে না?”
-”দেখি,কিন্তু আমাদের এভাবে কোনো খাবারের দোকানে ঢুকতে দেবে?জামাকাপড়ের যা অবস্হা!”
-”দেখা যাবে।আমি কিছু না খেলে আর হাঁটতে পারব না।”
রক্তিম একটু এগিয়েই থমকে গেল।একটা আর্মির জিপ সামনে দাঁড়িয়ে।বহ্নির হাতে আলতো চাপ দিয়ে বলল,”কেটে পড়।”
দুজন দুদিকের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।উলটো দিকের ফুটপাথটায় চোখ যেতেই রক্তিমের হাড় হিম হয়ে গেল।একটা ছয় ফুটের উপর লম্বা জলপাই রঙের উর্দি পরা ছেলে,কাঁধে তিনটে স্টার,ঠোঁটের নীচে মোটা পাকানো গোঁফ-বহ্নির পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে।ছেলেটাকে দেখতে অপূর্ব সুন্দর,বিশেষ করে গায়ের রঙ এবং নাকের শেপটা দেখার মত।রাস্তায় অনেকেই ঘুরে দেখছে।উর্দিটা আর্মির ক্যাপ্টেন র‍্যাঙ্কের অফিসারের,কালচে সবুজ উর্দিতে গায়ের উজ্জ্বল ফর্সা রঙ যেন ফেটে পড়ছে।

(ক্রমশ)

দ্রোহকাল ৬
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments