“আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু,পার হয় গাড়ি।
দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি।”

ছোটবেলা বহ্নি একটা ছবি আঁকত।দাদা,আশিস ভাইসা,বড়দা,ছোটদা সবাই আঁকত।মানে বাচ্চারা ছোটবেলায় যে বিশেষ একটা ছবি এঁকে থাকে।একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর,দাওয়া,পিছনে কলাগাছ,পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী।আর দূরে জেগে থাকা পাহাড়।বহ্নির নতুন শেল্টারটা ঠিক সেরকম।একটু অন্ধকার হয়ে গেলেই একটা বন্য নিস্তব্ধতা পুরো গ্রামটাকে ঘিরে ফেলে।বহ্নি একটা সিগারেট হাতে ছোট্ট দাওয়ায় বসে পাহারা দিচ্ছিল।এখানে আসার পর দেড় মাস হয়ে গেল,কোন কাজ নেই।পার্থদার দ্বারস্হ হতে হয়নি,বড়দা মানে প্রদীপ দাশগুপ্তই শেল্টারের ব্যবস্হা করেছে।দারিদ্র্য কি চেহারা নিতে পারে তার ছোট্ট একটু নমুনা।চা শ্রমিক কমরেড দিনেন্দ্র গুরুং এর বাড়ী।দিনে একবার ভাত খাওয়ার ব্যবস্হা।রাতে মুড়ি খাওয়া হয়,কিন্তু কোনো কোনো দিন তাও জোটে না।ঐসব বইয়ের মধ্যে খোরাক খোঁজা টোজা যে আদ্যন্ত আঁতেল বুজরুকি সেটা বহ্নি এখানে এসে বুঝতে পারছে।সুকান্ত ছাড়া সব মিথ্যে।”পুর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি” র থেকে খাঁটি কথা আর কিছুই নেই।সারাক্ষণ খাওয়ার চিন্তা মাথায় ঘোরে।মনে হয় আকাশ খাই, পাতাল খাই।এই বহ্নিই কলকাতায় থাকার সময় ভাত খেতে চাইত না।শুধু খেতে ভাল লাগে না বলে মিল স্কিপ করে কোচের ঝাড় খেত।
আজ বহ্নি ভাত খেয়েছে সকাল এগারোটায়।এখন হাতঘড়িতে রাত বারোটা।তারপর থেকে এক কাপ চা ছাড়া কিচ্ছু পেটে পড়েনি।অবশ্য সিগারেট খেলে খিদে কম হয়।আপাতত খিদের চিন্তাটা মাথা থেকে সরাতে চাইল বহ্নি।এখানে খাওয়ার অভাব থাকলেও জায়গাটা চমৎকার।যেমন ভালো ওয়েদার তেমন সিনারি।একটা ছোট্ট ঝরণা,তার থেকে তৈরী হওয়া নদী,দূরে পাহাড়,চারদিকে জঙ্গল।ঝরণাটার উপর এত সুন্দর করে চাঁদের আলো পড়েছে যে দুধের মত দেখাচ্ছে।দুধের ঝরণা,তার থেকে তৈরী হওয়া দুধের নদী।পার্টির নির্দেশ ছিল সি এমের রচনাবলী,রেডবুক আর পার্টির দৈনিক মুখপত্র ছাড়া কিছু সঙ্গে না রাখার।প্রদীপদার পরামর্শে বহ্নি একটা শীতের জামাও নিয়ে এসেছে।ওটা না আনলে বোকামি হত।রাতে এখানে জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ে।
আশিস ভাইসা তাকে একটা সোয়েটার কিনে দিয়েছিল পাহাড়ে এক্সকারশনের কথা শুনে।

সেদিন আশিস ভাইসা সোডার দোকানের সামনে তার ম্যানহোল শোভিত জামাকাপড় দেখে খুবই আশ্চর্য হয়েছিল।
-”ইয়ে কয়া ভুতনি জেয়সা হাল বনা রাখখা হ্যায়?অওর তু ইয়াহা কর কয়া রহি হ্যায়?”
-”ম্যানহোলে পড়ে গেছিলাম।”বহ্নি কাঁচুমাচু মুখে উত্তর দিয়েছিল।
-”তা তুই এখানে?”
-”তোদের বাড়ী যাব বলেই এসেছিলাম,তা অফিসে এত দেরী হয়ে গেল।আসলে আমার প্রোমোশন হয়েছে,বুয়াসাকে সেই খবরটা দিতেই আসা।এই লাড্ডুর প্যাকেটটা…”
-”দে।”বলে আশিসের হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে বহ্নি খেতে শুরু করেছিল।
-”আরে কি করছিস রাস্তার মধ্যে…”
ভাইসা নিঃসন্দেহে ওর হাবভাব দেখে ঘাবড়ে গেছিল।রক্তিমদা ওপাশের ফুটপাথ থেকে ভয়ে ভয়ে দেখছে।ভাইসা সন্দেহ করলে একটা বিশ্রী কান্ড হবে।বহ্নি ভাইসাকে আড়াল করে ওকে চোখের ইশারা করল যাতে পালিয়ে যায়।ওর জন্য একটু খারাপও লাগছিল।বেচারার অনেকক্ষন ধরে খিদে পেয়েছে।
-”আসলে আমার খুব খিদে পেয়েছে।ম্যানহোলে অনেকক্ষণ আটকে ছিলাম।ঘেবর আনিসনি?”

-”আমি তো দিল্লি থেকে আসছি।বাড়ি থেকে এলে পরের বার এনে দেব।আর তুই এরকম ভাবে বরং খাস না।”হিন্দিতে বলল ভাইসা।

-”কাহা না ভুখ লাগি হ্যায়।”

-”ভুখ তো মুঝে ভি লাগি হ্যায়।চল কোনো ভাল রেস্তোরাঁ দেখে বসা যাক।তার আগে তোর এই হুলিয়াটা চেঞ্জ করা দরকার।এখানে কোথাও জামাকাপড়ের ভালো দোকান আছে?এখানে একটা এসি মার্কেট ছিল না?”
-”উসকি জরুরত নহী হ্যায়।সামনের ঐ কচুরির দোকানটায় চল না।”অসহায় ভাবে বলল বহ্নি।
আশিস ভাইসা কোনো কথা শুনল না।জোর করে নিয়ে গেল।এমনিতেই আর্মির লোকেরা গোঁয়ার হয়,তার উপর “রাণা প্রতাপের বংশধর”(!) হলে তো কথাই নেই।একে তো বোঝানো যাবে না যে বহ্নির পাবলিক প্লেসে বেশী ঘোরাঘুরি করা বারণ।
পোশাক বদলে নেওয়ার পর একটা বেশ দামী ভেজিটেরিয়ান রেস্তোরাঁয় নিয়ে এল ভাইসা।বহ্নির এত আলো আর লোকজনের মধ্যে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল।যদিও আশেপাশে তেমন চেনা মুখ নেই,তাও।
আশিস বেশ আরাম করে বসে খাস্তা কচুরি,পনির প্যাটি,জিলিপি,মিষ্টি লস্যি – অনেক কিছু অর্ডার করল।
-”তোদের বাড়ী যাবার কথা ছিল,কিন্তু এত দেরী হয়ে গেল।কালই আবার জলপাইগুঁড়ি গিয়ে রিপোর্ট করতে হবে।ন’টার সময় ট্রেন।”
আশিস চট করে একবার ঘড়ি দেখে নিল।সাড়ে সাতটা।
-”তুই দার্জিলিং মেল ধরবি?”
বহ্নি আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল।
-”হ্যাঁ কেন?তোকে ড্রপ করে দেব,চিন্তা নেই।”
বহ্নি একটু ভেবে বলল,”আসলে আমাদের কলেজ থেকে এক্সকারশনে নিয়ে যাচ্ছে,আমার দুপুরের ট্রেনটা ধরার কথা ছিল।ম্যানহোলের জন্য মিস করলাম।আমার পার্সটাও… ”
-”কি?ম্যানহোলে থেকে গেছে?”
আশিস জোরে হেসে উঠল।বহ্নি ওর হাতে আলতো করে একটা চড় মেরে বিরক্ত গলায় বলল,”বোকার মত হাসিস না।”
-”তুই এখনও আগের মতই ছাগল থেকে গেছিস।ইঞ্জিনিয়ার হয়েও খুব একটা লাভ হল না।”
বহ্নি কথাটা পাত্তা না দিয়ে বলল,”আমাকে একটা টিকিট কেটে দিবি?একদম পয়সা নেই,তাহলে কাল গিয়ে ওদের ধরতে পারব।”
-”ওকে নো প্রবলেম।তোর সামান কোথায়?”
-”রাজাবাজারে একটা বন্ধুর বাড়ীতে।আসলে সকালে কলেজে গেছিলাম তো।”
-”আচ্ছা জলদি করনা হাঁ?”
রাজাবাজারে বস্তির সামনে এসে ভাইসা একটুও খুশী হল না।বিরক্ত গলায় বলল,”ইয়ে ক্যায়সে ক্যায়সে দোস্ত হ্যায় তেরে!”
-”এক্ষুণি হয়ে যাবে,দাঁড়া।”
আসলামদের বাড়ীর পথের নোংরা গলিটা ধরল বহ্নি।তখনই শুনতে পেল কেউ তাকে ফিস ফিস করে ডাকছে।
-”ই এস জি শুনছেন?”
বহ্নি এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না।তখনই কেউ বেশ ব্যাকুল গলায় ডেকে উঠল,”অ্যাই বহ্নি”
বহ্নি একটা কুঁড়েঘরের মধ্যে থেকে বাড়িয়ে দেওয়া জয়ন্তদার মুন্ডুটা দেখতে পেল।
-”ওহ আপনি!কি ব্যাপার?”
-”খুব ঝামেলায় পড়েছি ভাই।যাই হোক বলছি,তা বাইরে মিলিটারির জিপ মনে হচ্ছে।কি ব্যাপার?”
শঙ্কিত মুখে বললেন জয়ন্ত মিশ্র।
-”সে অনেক ইতিহাস,ছাড়ুন।এখন বেরোবার চেষ্টা করবেন না।আমি গাড়ীটা সরানোর ব্যবস্থা করছি।”
-”বেরোচ্ছি না।আপনার জন্য সকাল থেকে অপেক্ষা করছিলাম।আই ব্যাডলি নিড ইওর হেল্প।”
-”কি হয়েছে?”
-”হাফিজ ইসলাম আমাকে এক্জিকিউট করার নির্দেশ দিয়েছেন।তখন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।আপনাদের গ্রুপের কয়েকটা ছেলে আমাকে খুঁজছে।”
-”মানে?”বহ্নি অবাক হয়ে বলল,”উনি তো আপনাকে এক্সপেল করার কথা বললেন।”
-”ওটাই ওদের কাছে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ ছিল।”একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জয়ন্ত।
-”আমাকে তো আজকেই কলকাতা ছাড়তে বলা হয়েছে।”
-”প্লিজ কিছু তো একটা করুন।”
-”আপনি পেয়ারাবাগানের কাছে মধুসূদন বাবুর বাড়ী চলে যান।আমি একটা নোট লিখে দিচ্ছি।”
-”অনেক ধন্যবাদ।”
আসলামের বাড়ী থেকে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বহ্নি ফিরে এসেছিল গাড়ীতে।
আজ দার্জিলিং মেল দুঘন্টা লেট আছে।ন’টা নাগাদ গাড়ী ঢুকল।আশিস বহ্নির টিকিট কাটল।তারপর ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টে উঠল।দুজনের ক্যুপ।বহ্নি একটু ভয়ে ভয়ে ছিল যদি আর্মির কামরায় যেতে হয়।আশিস ভাইসাকে বিশ্বাস নেই।যাই হোক,সেরকম কিছু হয়নি,ভাইসা একাই যাচ্ছিল।
আশিস টয়লেটে গিয়ে চেঞ্জ করে ফিরে এল।বিদেশী ব্র্যান্ডের মাসল টি শার্ট,সোয়েটপ্যান্টস।কোমরে একটা বেল্টে আটকানো সার্ভিস রিভলভার,হাতে রোলেক্স।হলিউডের নায়কদের মত সুন্দর দেখাচ্ছে।
আশিস যত্ন করে কম্বলের উপর চাদর বিছিয়ে নীচের বার্থে বহ্নির জন্য বিছানা করে দিল।তারপর দোতলায় নিজের বিছানা গোছাচ্ছে,এমন সময় কারা যেন দরজা নক করল।
পুলিশ।
-”আমাদের কাছে খবর আছে এই ট্রেনে একজন উগ্রপন্হী…একি এঁর কাছে তো ফায়ার আর্মস রয়েছে।”
আশিস কোনো কথা না বলে নিজের আইকার্ড দেখাল।মিলিটারি দেখলে পুলিশ কথা বাড়ায় না।তাও অফিসার একবার বলার চেষ্টা করলেন,”স্যর আসলে একজন খুব ভয়ঙ্কর উগ্রপন্হীর নর্থ বেঙ্গলের কোনো একটা ট্রেনে থাকার কথা।তাই আমরা দুপুর থেকেই সব ট্রেনগুলোর উপর নজর…”
-”এখানে নজর রাখার কোনো দরকার নেই।আমি আর আমার কাজিন আছি।” আশিস লোকটাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল।এবং দরজা থেকে সরার কোনো লক্ষণ দেখাল না।
অফিসার অসন্তুষ্ট মুখে “ওকে স্যর” বলে চলে গেলেন।
-”এই ভুঁড়িওয়ালা পুলিশ ধরবে জঙ্গি!হুহ্!”খুব তাচ্ছিল্যপূর্ণ মুখে আশিস এসে বহ্নির পাশে বসল,”শোন এদের ইনফর্মেশনের উপর আমার একটুও আস্হা নেই।তাও রিস্ক নেওয়া ঠিক না।তুই টয়লেট গেলে এখনই ঘুরে আয়।রাতে একা একা না যাওয়াই ভাল।”
-”কিছু হবে না।”বহ্নি স্মিতমুখে বলল।
-”বো লড়কা কন থা?”
-”কোন ছেলে?”
-”যাকে ঐ সোডার দোকানের সামনে চলে যেতে ইশারা করলি।”
-”ওহ ও আমার সিনিয়র।আমাদের ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট ডক করছে।”
-”তোর বয়ফ্রেন্ড?”
-”না রে বাবা।কি বাজে বকছিস?”
-”তাহলে আমায় দেখে পালাল কেন?”
-”জানি না।তুই মিলিটারি ইউনিফর্ম পরে আছিস দেখে ভয় পেয়ে গেছে মনে হয়।”
-”মিলিটারিকে সিভিলিয়নদের ভয় পাওয়ার কথা নয়।দু ধরনের লোক ভয় পেতে পারে।এক চোর উচাক্কা,আরেক উগ্রপন্হী।”
-”আচ্ছা তুই একটা ছেলের সাথে আমায় দেখে এত জেরা করছিস।তোকে গার্লফ্রেন্ড শুদ্ধু রেডহ্যান্ডেড ধরে কেউ এত জেরা করলে ভাল লাগত?”
-”আমার কোন গার্লফ্রেন্ড নেই।”
-”সেকি তোকে এত সুন্দর দেখতে আর গার্লফ্রেন্ড নেই?কথাটা বিশ্বাসযোগ্য?”
-”সুন্দর দেখতে হলেই প্রেম করতে হবে এটা কোথাও লেখা আছে?”
-”তাই তো দেখা যায়।আচ্ছা বল্লরী দিদি তোর গার্লফ্রেন্ড?”

আশিসের ফর্সা মুখ সামান্য লাল হল,তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে বলল,”জানি না।তুই পড়াশোনা না করে এইসব করে বেড়াচ্ছিস?”

-”কি করে বেড়াচ্ছি?দুটো ছেলেমেয়ে একসাথে রাস্তায় হাঁটছে মানেই তারা প্রেম করছে?”
-”ঘি আগুন একসাথে রাখাটা আনসেফ।”
ছেলেটা অত্যধিক পেকেছে তো!মজা দেখাতে হবে।বিরক্ত হয়ে ভাবল বহ্নি।
-”আচ্ছা তাহলে তো আমাদের দুজনের একসাথে যাওয়াটাও আনসেফ।”
-”কয়া বকওয়াস কর রাহি হ্যায়?”খুব বিরক্ত হল আশিস,”আমি তোর দাদা হই।”
-”তাতে কি হয়েছে?অপোজিট জেন্ডার,তার উপর এজ গ্যাপ এত কম মানে তোর ভাষায় আগুন আর ঘি।”
-”এবার কিন্তু একটা থাপ্পড় খাবি,অনেকক্ষণ ধরে বাজে কথা বলছিস।”আশিস প্রায় চেঁচিয়ে ফেলল।
-”আর তুই যে ঐ দাদাটাকে নিয়ে বাজে কথা বললি এতক্ষণ?আমাদের মাথাতেই ফিজিকাল ইন্টিমেসির কথা আসবে না,এলেও ইনসেস্ট একটা ঘৃণ্য বিষয় ভেবে আমরা ঐ চিন্তাটাকে ডিসমিস করব।একই কথা অনাত্মীয় ছেলে মেয়েদেরও ক্ষেত্রেও ঠিক।সভ্য মানুষ যাকে তাকে নিয়ে ঐ জাতীয় চিন্তা করবে না।এবার থেকে তোর ঐ বকওয়াস তুলনাগুলো টানার আগে এই কথাগুলো মাথায় রাখিস।”শান্তভাবে বলল বহ্নি।
-”তোর হাবভাব আমার সুবিধার লাগছে না।যাক গে অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়।”
আশিস বাঙ্কে উঠে লাইট নিভিয়ে দিয়েছিল।ভাগ্য ভাল বহ্নি বল্লরীর ব্যাপারটা নিয়ে পড়েনি।ওর মত অত্যুৎসাহী পাগলীর এত তাড়াতাড়ি এসব না জানাই ডিজায়ারেবল।কিন্তু বাড়ির লোকদের মধ্যে আশিস বললেই বা কাকে বলবে?ও ছাড়া?বাড়িতে তো বল্লরীর মত চেন স্মোকার এয়ার হোস্টেসকে কোনমতেই মেনে নেবে না।আর এই পাগলীটাই বা ব্যাগে লাইটার নিয়ে ঘোরে কেন?কোনো ছেলের লাইটার?নাকি ও ও বল্লরীর মত ধোঁয়া টোয়া…..

একটু পরে বহ্নি অনুভব করেছিল ও কিছু একটা খাচ্ছে, মানে পান করছে।

-”এই কি খাচ্ছিস একা একা?দে। “বলে বহ্নি ওর হাত থেকে বোতলটা ছিনিয়ে নিয়েছিল।
-”খা নহী রহা হু,পি রহা হু।আরে কি করছিস?থাম।”
বহ্নি ততক্ষণে এক ঢোক মুখে ঢেলে দিয়েছে।
-”এটা কি?টেস্টটা কিরকম যেন…তু শরাব পি রহা থা?”
আশিস খুব অস্বস্তিতে পড়ল,”ঐ একটুখানি আর কি!বুয়াসাকে প্লিজ বলিস না।বাড়ীতে জানে না।”
-”নাক টিপলে দুধ বেরোয় আর মদ ধরে ফেললি?”
আশিস এবার রেগে গেল,”শোন একটু আগে তোর ব্যাগে লাইটার দেখেছি।চুপ করে আছি মানে ভাবিস না কিছু জানি না।তুই একটা মেয়ে হয়ে সিগারেট খাস। লজ্জা করে না?”
-”তুই মদ খাস,আর আমার ধারণা প্রেমও করিস।এখন সেটা চাপা দিতে উলটো পালটা বলছিস।”
-”আচ্ছা বোতলটা দে।কাল সকালে কথা হবে।আর আমি প্রেম করি না, সত্যিই করি না।বিশ্বাস কর।”
-”বোতল এখন পাবি না।”বহ্নি আরেক ঢোক মুখে ঢালল,”বেশ ভাল খেতে,কি ব্র্যান্ড?আমি আগে একবার ব্রান্ডি ট্রাই করেছি,ভাল লাগেনি।”
-”তুমি বেশ ভালোই ডুবে ডুবে জল খাও।”বহ্নিকে আবার খেতে দেখে, “ওরে আর খাস না,ওটা আমার সারা রাস্তার স্টক।”আশিস আর্তনাদ করে উঠল।
-”আমি মদ খাই না তোর মত।ওটা একবার বড়পিসোর বাড়ীতে আমি,দাদা আর বড়দা টেস্ট করেছিলাম লুকিয়ে।আর তুই ট্রেনে করে ছি ছি।”
-”কে ধরবে আমাকে?ওসব রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস তোদের মত সিভিলিয়ানদের জন্য।আমাদের জন্য নয়,বুঝেছিস?”
বহ্নির হঠাৎ খুব ঘেন্না করল।আশিস ঠিক একটা স্টেট অ্যাপারেটাসের সুরে কথা বলছে।কোনো কথা না বলে বোতলটা আশিসের বালিশের পাশে রেখে দিল বহ্নি।
-”বনি!”আশিস খুব চিনিমাখা গলায় ডাকল।
-”মন্নে থারে সে বাত নহী করনি।সো জা।”বহ্নি বলল।
-”শোন না, এই চকলেট বারটা কে নেবে?”
-”আমার কিছু লাগবে না।এটা বাড়ীতে কিছু না জানানোর ঘুষ তো?”
-”না রে সত্যি চকলেটটা তোর জন্যই এনেছিলাম।আসলে রাস্তায় এত পাগলামি করিস,মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গেছিল।সুইস চকলেট দেখ।”
বহ্নির মনটা একটু হলেও আর্দ্র হচ্ছিল।বড়দা আর আশিস ভাইসা-দুজনেই খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে।বহ্নি দুদিকেই একমাত্র বোন,তাই বহ্নিকে সব দাদারাই কিছু না কিছু উপহার দেয়।কিন্তু প্রদীপদার দেওয়ার মধ্যে একটা আত্মরতির অহংকার থাকে,মুখে প্রকাশ না করলেও।এখন অবশ্য পরিস্হিতি আলাদা।কিন্তু আশিস ভাইসার মধ্যে আন্তরিকতা ছাড়া কোনদিন কিছু দেখেনি বহ্নি।এমনকি চাকরি পাওয়ার পর পরই এসে বলেছিল, “দেখ অনলটা তো অপদার্থ,বুয়াসা আচারের টাকায় আর কতটুকু চালাবে?ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিস,খরচা আছে তো?কোন বই টই বা বা কোর্স ফির জন্য দরকার হলে আমাকে বলবি।তোর ভাইসা এখন চাকরি করে।”
হ্যাঁ আশিসের হাতে এখন প্রচুর টাকা।ওকে বাড়ীতে এক পয়সাও দিতে হয় না।বহ্নির জন্য ও খরচ করতেই পারে।কিন্তু বহ্নি কেন ওকে করতে দেবে!কেন বহ্নির জন্য ও এখনও এত চিন্তা করছে?একটুও ভাল লাগছে না ব্যাপারটা।ভয়টা প্রতিক্রিয়াশীলদের নয়,ভয়টা নিজেকে।ভয়টা পাঁকের মত আষ্টেপৃষ্টে আটকে ধরা আত্মীয়তা বা হৃদয়বৃত্তিকে।বহ্নির বাড়ীর প্রত্যেকটা লোক প্রতিক্রিয়াশীল,অথচ তারা বহ্নিকে ভালবাসে।সেদিন বাড়িতে ঐ মিথ্যাচারটা করে বেরিয়ে আসতে ভাল লাগেনি।আজ ভাইসাকে ঠকাতেও খুব কষ্ট হচ্ছে।আজ পুলিশকে দরজা থেকে বিদায় করে দিল।যদি বহ্নির সাথে ওর আসার ব্যাপারটা জানাজানি হয় ওর চাকরি যেতে পারে।আরও খারাপ কোন শাস্তি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
আশিস ভাইসা পরদিন সকালে বহ্নিকে শিলিগুড়ি ড্রপ করে দিয়েছিল।হয়ত ব্যারাকে যাওয়ার পর তাকে দেখে সুবেদার জাতীয় কেউ স্যালুট করবে,তারপর বলবে,”স্যর আপনি দার্জিলিং মেলে এসেছেন?কাল দার্জিলিং মেল লেট করেছিল।আমাদের কাছে খবর আছে ভয়ানক জঙ্গী এক্সপ্লোসিভ সেনগুপ্ত এই ট্রেনে উত্তরবঙ্গ এসেছে।”
আশিস তখনও ওর বোনের প্রতারণাটা বুঝতে পারবে না।আজ উত্তরবঙ্গের এই প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও একবার ভাইসার মুখটা মনে পড়ল বহ্নির। তার সাথে দাদা আর মায়ের কথাও।এদের কারো সঙ্গেই হয়ত আর দেখা হবে না।
এখানে আসার পর পরই বড়দা ডেকে পাঠিয়েছিল।বড়পিসো মানে বড়দার বাবাও ইঞ্জিনিয়ার।একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কর্পোরেট পদে কাজ করেন।বড়দা যাদবপুর থেকে মেকানিকাল নিয়ে এম টেক শেষ করে ফ্লুইড ডায়নামিক্স নিয়ে পিএইচডি করতে শুরু করেছিল।তারপর সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে গত দুবছর ধরে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলোয় কাজ করছে।জি এসের ডান হাত বলা যায়।
একটা পোড়ো বাড়ীর শেল্টারে হ্যারিকেন জ্বেলে বসে “হাউ টু বি আ গুড কমিউনিস্ট ” পড়ছিল বড়দা।
-”আয় বোস,শেল্টারে অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
দু চারটে কুশল প্রশ্নের পর বিনা ভণিতায় জিজ্ঞেস করেছিল,”তুই সমীরণ রায়ের সাথে দেখা করেছিলি?”
-”হ্যাঁ অসুস্হ ছিলেন,তাই দেখতে গেছিলাম।”
-”বাহ কি কথা হল?”
বহ্নি প্রশ্নটায় বিরক্তি বোধ করছিল মনে মনে।কিন্তু নেতার সামনে সেটা প্রকাশ করা বাঞ্ছনীয় নয়।স্বাভাবিক গলায় বলল,”উল্লেখযোগ্য কিছু না।কেন?”
-”আমরা খবর পেয়েছি সে কমরেড সি এমের নামে টানা বিষোদগার করে যাচ্ছে।কলকাতার কমরেডদের কাছে যাতা কুৎসা ছড়াচ্ছে।তোদেরও তাই বলেছে নিশ্চয়ই।কিন্তু আমার খুব আনক্যানি লাগছে যে তুই ওকে এসব বলতে অ্যালাউ করলি।”
সমীরণ স্যরের কথাগুলো সব কিন্তু অযৌক্তিক ছিল না।ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি,সমাজবিরোধীদের দলে অন্তর্ভুক্তি,মূর্তি ভাঙা বা ইনসারেকশন নিয়ে তাড়াহুড়ো করার যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।এখন মনে হচ্ছে হাফিজ ইসলামের ব্যাপারে জয়ন্তদার অভিযোগ সত্যি হলে সমীরণবাবুর বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক।
শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন এই বিষয়গুলোই আলোচনা হয়।তাঁর অসুস্হতার কথা শুনে দেখতে গিয়েছিল বহ্নি।পার্টি ইদানীং তাঁকে ভাল চোখে দেখছে না জেনেও।
বহ্নি সেদিনও জয়ন্তদাকে নিয়ে গেছিল।সমীরণ রায় বিষয়গুলো নিয়ে ডিবেটের প্রস্তাব রেখেছিলেন পলিটব্যুরোতে।সমীরণ রায়ের মতে সি এম একযোগে তা খারিজ করে দেন।এবং এই একটা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে চরম তিক্ত স্তরে নিয়ে গেছেন ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও।খুবই খারাপ আচরণ করে গেছেন ঐদিনের পর থেকে।
কিন্তু বহ্নি যতদূর শুনেছে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়।সিএম ওঁকে বিতর্কের,এমনকি নিজের বিরুদ্ধে সমালোচনারও স্পেস দিতে রাজী ছিলেন।সমস্যা হচ্ছে কিছু লোক মাঝখানে ঢুকে পড়ছে।ইমতিয়াজ আলি এবং অর্ক ব্যানার্জী নামে দুটি ছেলে সিএমকে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে।কিছুদিন আগে দুটি ছেলে সিএমের লাইনের বিরোধিতা করায় ওরা তাদের মেরে দেয়।এতে সিএম অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।কিন্তু এখন তিনিও সমীরণ বাবুর সাথে একরকম অলিখিত দেওয়াল রেখে চলছেন।
-”খারাপ আচরণ?”জয়ন্তদা অবাক হয়ে বলেছিলেন।
-”ঝগড়া করার লোক চন্দ্রিলবাবু নন।আমাকে এডিটোরিয়াল বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।আমাকে সামনে দেখলে সম্পূ্র্ণ উপেক্ষা করেছেন,কখনও আমি ফোন করলে কথা বলতে অস্বীকার করেছেন আর চিঠির উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।খুব মার্জিত ভাবে কি করে মিসবিহেভ করতে হয় এটা চন্দ্রিলবাবুর থেকে শেখা উচিত।আর ইদানীং তো পার্টির কিছু ছেলে খুনের হুমকিও দিচ্ছে।”
-”প্রশ্ন করলে এঁরাও তো পুরনো পার্টির নেতাদের মত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন।কিছুদিন আগে চব্বিশ পরগণার জেলা সম্পাদক আর বি একটা সার্কুলার বের করলেন,যে ২০০০ টাকার বেশী রোজগার করে সেই শ্রেণীশত্রু।”বললেন জয়ন্ত মিশ্র।
-”বক্তব্যটা একটু একতরফা হয়ে গেল না?জয়ন্তদা আপনি যেটা বলছেন ওটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।আমি এটা নিয়ে জি এসকে লিখেছিলাম।উনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে সার্কুলারটা আটকেছেন।আর স্যর আপনি অনেক বড়,আপনাকে কিছু বলতে যাওয়া ধৃষ্টতা হবে।কিন্তু আপনি জানেন কিনা জানি না একটা বিশেষ গ্রুপ আপনাকে পলিটব্যুরো থেকে সরানোর চেষ্টা করছিল।জি এস স্বয়ং ইন্টারভেন করে ওদের থামিয়েছেন।”
-”একটা কথার পরিষ্কার উত্তর দেবে বহ্নি?”সমীরণ বাবু সোজা তাকিয়েছিলেন বহ্নির চোখের দিকে,”তুমি কি আমায় সংশোধনপন্হী বলে মনে কর?তুমিও কি ভাবছ আমি পার্টিকে ছুরি মারার চেষ্টা করছি?”
-”একদমই না।কিন্তু আমার মনে হয় ইগোর উপর পার্টিকে স্হান দেওয়া উচিত।”
-”ইগো?মানে পার্টি যা করছে সব ঠিক আছে তাই তো?”
-”প্রথম পর্যায়ে কিছু বিচ্যুতি,কিছু অ্যানার্কি থাকা স্বাভাবিক।সেটাকেই বড় করে দেখিয়ে পার্টির প্রত্যেক কাজের বিরোধিতা করাটা আমাদের মুভমেন্টের পক্ষে ভাল হচ্ছে বলে আমি মনে করি না।”
-”মানে আমি এখন তোমার শত্রু তাই তো?”
-”সেটা আপনি ঠিক করবেন।তবে পার্টির বিরুদ্ধে আমি যেতে পারব না।আরও স্পষ্ট ভাষায় বললে চন্দ্রিল মজুমদারের বিরোধিতা আমি করব না।আপনারা হয়ত একে পার্সোনালিটি কাল্ট বলবেন….আমি অত থিওরি বুঝি না।যেটা জানি তা হচ্ছে ঐ লোকটার কথায় প্রাণ দিতে পারি।ওঁর আত্মত্যাগকে আদর্শ করে পড়াশোনা ছেড়ে চলে এসেছি।আপনাকে শুধু একটাই অনুরোধ করব আন্দোলনের শুরুতেই এভাবে দূরে সরে যাবেন না।আপনাকে আমাদের প্রয়োজন আছে।”
-”এই কথাগুলো হাফিজ ইসলাম শিখিয়ে দিয়েছেন?”
-”উনি কিছুই শেখাননি।ওঁর সাথে আমার আলোচনা হয়েছে এটা ঠিক।আমিই বলেছিলাম আপনাকে ফেরাবার চেষ্টা করব।উনি বারণ করেননি।তবে বলেছিলেন কোনো লাভ নেই।এবার আপনি কাকে মিথ্যে প্রমাণ করবেন এটা আপনার ব্যাপার।”
-”কমিউনিজমের নামে সমাজবিরোধিতা আর লেফট অ্যাডভেঞ্চারিজমকে সমর্থন করা সম্ভব নয়।”
-”ঠিক আছে ভাল থাকবেন।উঠি।”
-”বহ্নি আমার একটা কথা শুনবে?”নরম গলায় বলেছিলেন সমীরণ রায়,”তুমি প্রাপ্তবয়স্ক,যা ভাল বোঝ করবে।আমি যেচে কোন উপদেশ দিতে যাব না।তবে তোমাকে চিনি বলে তোমার মাস্টারমশাই হিসাবে একটা কথা বলতে চাই।তুমি বিজ্ঞানমনস্ক,প্রশ্ন ছাড়া কোনকিছুই মেনে নিতে পার না।তাই বলছি,মতানৈক্য হলে চন্দ্রিলবাবু কতটা রুথলেস হতে পারেন তোমার ধারণা নেই।সামনাসামনি যদি কাজ করতে হয়,হবেই এবং সংঘাত বাধে তাহলে বুঝবে।এবং আমার ধারণা সে সংঘাত অনিবার্য।কারণ কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে ওঁর সাথে কাজ করা সম্ভব নয়।”

-”শাস্তি পেলে লোকে নানারকম কুৎসা রটাতে থাকে।এটা আত্মত্যাগের পথ,এখানে তো আর পার্লামেন্টের মধু নেই।”বলেছিল প্রদীপদা,”পার্টিকে পিছন থেকে ছুরি মারার চেষ্টা করছে বলেই পার্টি ওকে এক্সপেল করার কথা ভাবছে।এরা মিষ্টভাষী তাই রিঅ্যাকশনারীদের চেয়েও বিপজ্জনক।এদের সাথে টার্মস না রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।বুঝতে পারছিস নিশ্চয়ই।”

নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল বহ্নি। রাত একটা।চন্ডী আর দেবাঞ্জনাও পাহারায় ছিল,একটু দূরে বসে নিঃসারে ঘুমোচ্ছে।
হঠাৎ একটা বিপদের গন্ধ পেয়ে সচেতন হয়ে উঠল বহ্নি।চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা অ্যাম্বুলেন্স।অদ্ভুতভাবে আদ্যোপ্রান্ত কালো তিরপলে ঘেরা।ওটা কাছেই এসে থামল।তার থেকে প্রথমে দুটো,পরে তিনটে ছায়ামূর্তি নামল।বহ্নিদের ঘরটার দিকেই আসছে।
পুলিশের খোঁচড়!কারণ এই সময়ে কোনো কমরেডের আসার কথা নয়।গাড়ীতে তো নয়ই।বহ্নি চন্ডী আর দেবাঞ্জনাকে জাগিয়ে পজিশন নিয়ে তৈরী থাকতে বলে কোল্টটা হাতে খুলে নিয়ে চটি খুলে নিঃশব্দে এগোল বহ্নি।সবাইকে জাগানোর সময় নেই,আঘাত হানতে হবে অজান্তে,আগন্তুকরা সচেতন হবার আগে।
ঐ তিনজনের থেকে একজন সামান্য পিছিয়ে পড়েছে,লোকটার মাঝারি হাইট,রোগা পাতলা চেহারা।বহ্নির কাছে তার নিজের হাইটটা সব সময়েই একটা অ্যাডভান্টেজ।সে খুব সহজেই এগিয়ে গিয়ে লোকটার মুখ চেপে ধরল পিছন থেকে,তারপর সজোরে রিভলভারের বাঁট দিয়ে মাথায় মারল।
মাথা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল লোকটা।সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে মুখে একটাও যন্ত্রণার শব্দ করল না।
হঠাৎ দুটো তিন ব্যাটারীর টর্চ জ্বলে উঠল।আহতকে হোস্টেজ ধরা অবস্হাতেই বহ্নি দেখল তার চার সঙ্গীর আগ্নেয়াস্ত্র বহ্নির দিকে উদ্যত।এর মধ্যে দেবাঞ্জনা আর চন্ডী অর্ক আর গৌতমকে ডেকে এনেছে।চারজনের হাতেই লোডেড পাইপ।বহ্নি অবাক হয়ে দেখল আহতের সঙ্গীদের মধ্যে একটা বন্দুক ধরা হাতের মালিক বড়দা।সেও বিস্মিত গোল গোল চোখে বহ্নির দিকে তাকিয়ে আছে।
বহ্নি নার্ভাস হয়ে নীচে বসে পড়া মানুষটার দিকে দেখল।একটা ঢিলে হাওয়াই শার্ট,পুরোনো রঙচটা ট্রাউজার,চোখে ভারী চশমা,খাড়া নাক এবং দীর্ঘদিন তেল না পড়া কোঁকড়া,ফোলা উস্কোখুস্কো চুল কপালে ছড়ানো।
-”হে ধরণী দ্বিধা হও” ভাবতে ভাবতে বহ্নি দেখতে পেল তার হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা চন্দ্রিল মজুমদারের মাথা ফেটে কানের পাশ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে।

(ক্রমশ)

দ্রোহকাল ৭
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments