এক একটা দিন এরকম ধূসর হয়।আজ সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা,ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে।বিছানায় শুয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখছিলেন চন্দ্রিল।এরকমই একটা ধূসর মেঘাচ্ছন্ন দিনে ও চলে গেছিল।সেদিন রাতে বৃষ্টিটা খুব বেড়েছিল।ক্রিমেশনের সময় আগুন জ্বালানোই একটা বিশাল ঝামেলার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পরও যখন আগুনটা জ্বলছিল না তখনও চন্দ্রিলের একটুও বিরক্তি আসছিল না।মহিলাদের শ্মশানযাত্রী হবার কথা না,তা নচ্ছার কমিউনিস্টগুলো কবেই বা নিয়মের ধার ধারে!পাশে দাঁড়ানো গৌরী কিরকম একটা বিস্ময়াহত চোখে তাঁকে দেখছিল।চন্দ্রিল ব্যাপারটা আমল দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।ঐ অন্ধকার, তার মধ্যে মাঝে মাঝে লাইটনিং এর আলো – তার মধ্যেও ওর গায়ের রঙটা এতই ফ্যাকাশে যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।মুগ্ধ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলেন চন্দ্রিল।অন্য কোনো মৃতদেহ নিয়ে আসা শ্মশানযাত্রীদের মধ্যে একজনের মন্তব্যও কানে এল,”ইস এত সুন্দর মেয়েটা!”
চন্দ্রিল লোকটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিলেন।ওর সৌন্দর্যের দশ ভাগও ছেলেটা দেখেনি।এই রুগ্ন শুকনো চেহারা,রক্তশূন্যতা। অসুস্হ হবার আগে ওর গায়ের রঙ ঠিক আপেলের মত ছিল।এত বেশী ফর্সা যে চুলের রঙ কটা।
তাঁর দৃষ্টি বা হাসিতে এমন কিছু ছিল যে ছেলেটা ভয় পেয়ে সরে যায়।পাশ থেকে হরিদা কাঁধে আলতো চাপ দেয়,”ছোটকত্তা,কিচ্ছু হয় নি।আপনি বাইরে চলেন, হয়ে গেলে খপর দেব।এখানে দাঁড়াতে হপে না।”

আজকের দিনটা ওর চলে যাবার দিন।কালকে চন্দ্রিল ঐ মেয়েপুতুলটা কিনে আনার পর তাঁর মনে হচ্ছিল মাসের শুরুতে পয়সা নষ্ট করার জন্য গৌরী তাঁকে বকবে।বকেনি।খুব সহানুভূতির চোখে তাকিয়েছিল।এটা চন্দ্রিলের পছন্দ হয়নি।তিনি চাইছিলেন গৌরী অন্তত একটু অসন্তোষ প্রকাশ করুক।চন্দ্রিল একবার অপরাধী মুখ করে বলেও ছিলেন,”শুধু শুধু এতগুলো টাকা খরচা হয়ে গেল।এটা কেনা ঠিক হয়নি না?”
গৌরী কোন কথা বলেনি।দরদভরা চোখে তাঁর দিকে একইরকম ভাবে তাকিয়ে থেকেছে।তারপর একবার চন্দ্রিলের গায়ে হাত রেখেছে,”শরীর খারাপ লাগছে,চন্দ্রিল?”
চন্দ্রিল মাথা নেড়ে না বলে তাঁর সামনে থেকে সরে গেছেন।
গৌরীকে যে চন্দ্রিল ঘৃণা করেন এটা না বোঝার মত স্হূলবুদ্ধি সে নয়।কিন্তু গতকাল রাতের ঘটনাটা ঠিক হয়নি।মানে এতবছরের অভ্যাস ভাঙাটা।কাল রাতে মদের পরিমাণটা আবার বেশী হয়ে গিয়েছিল।কালকের পুরো ঘটনা স্পষ্ট মনে নেই চন্দ্রিলের, তবে এটা মনে আছে যে তিনি অনেক রাত পর্যন্ত চিৎকার করে গৌরীর সঙ্গে ঝগড়া করেছেন।আজ সকালে উঠে সেটা উপলব্ধি হল,কারণ গলা ভেঙে গেছে।ভালবাসার বিপরীত ঘৃণা নয়।ঘৃণা সহনীয়,অন্তত একটা অনুভূতির আদানপ্রদান আছে।ভালবাসার বিপরীত হল নিষ্পৃহতা,ঐ অস্ত্রেই চন্দ্রিল বিদ্ধ করতে ভালবাসেন গৌরীকে।শীতল ব্যবহারের বদলে কালকের ঐ ঝগড়াটা একদম ঠিক হয়নি।কমপেনসেট করা দরকার।গৌরীকে স্বাভাবিক অবস্হা ফিরিয়ে আনতে দেওয়া যাবে না।উফ মাথাটা প্রচন্ড ধরে আছে।
চন্দ্রিল তাও জোর করে রান্নাঘরে উঠে গেলেন।স্বভাবসিদ্ধ নরম গলায় বললেন,”রাগ করেছ?”
গৌরী দীর্ঘদিন এধরনের সম্ভাষণে অভ্যস্ত নন।সন্দিগ্ধ চোখে একবার ভুরু তুলে দেখলেন চন্দ্রিলকে।
চন্দ্রিল বললেন,”না আসলে কাল তোমায় বলেছি সিক্তার ব্যাপারটার জন্য তুমি দায়ী…”
-”কি চাই?”
-”আয়াম সরি ফর বিইং রুড।আসলে কি জান তো..গৌরী তোমাকে বলছি।”
-”হুঁ।” গৌরী তাঁকে একটুও পাত্তা না দিয়ে একটা গ্লাসে কি যেন নাড়ছে চামচ দিয়ে।
-”আসলে তোমাকে দেখলে এতটা ঘেন্না হয় যে সবসময় নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।প্রেমের বিপরীত অনুভূতি তো নিষ্পৃহতা হওয়া উচিত,কিন্তু এত ঘেন্না,এত বিতৃষ্ণা…. “চুপ করে গেলেন চন্দ্রিল।
গৌরী সম্পূর্ণ নিষ্পৃহ স্বরে বলল,”ঠিক আছে,এখন যাও।কাজের সময় বিরক্ত কোরো না।”
এটাই গৌরীর সমস্যা।চন্দ্রিলকে কখনই সিরিয়াসলি না নেওয়া।
চন্দ্রিল কিছুটা অপ্রস্তুত ভাবে বললেন,”সরি।একটু চা পাওয়া যাবে?আসলে খুব মাথা ধরেছে।”
-”যাবে।তবে এখন না।আগে হ্যাংওভারটা কাটুক।এটা নিয়ে যাও।”বলে হাতে গ্লাসটা দিল।লেবুর সরবত।চন্দ্রিল বাধ্য ছেলের মত সেটা হাতে নিয়ে চলে এলেন।একবার জিজ্ঞেসও করলেন,”আমি একটু বারান্দায় বসব?”
-”না। বৃষ্টির ছাঁট আসছে।মাথার ব্যান্ডেজটা ভিজবে।”
চন্দ্রিল অসন্তুষ্ট মুখে সরে এলেন।তাঁর পছন্দের সব কাজে বাগড়া না দিলে এই মহিলার ভাত হজম হয় না।
চন্দ্রিল আলমারি খুলে পুতুলটা বের করলেন।পুতুলগুলো সবসময়েই মেমসাহেবদের আদলে বানানো হয়।সোনালি চুল,কটা চোখ।এটাকে তুলনায় একটু অন্যরকম দেখতে।চুলের রঙটা লাল,ধূসর চোখ। আজকাল বার্বি বলে একপ্রকার ডল এসেছে বাজারে,একগাদা দাম।বিশ্রী দেখতে,কাঠি কাঠি হাত পা।ওর থেকে এই জাতীয় পুতুলগুলো অনেক বেশী প্রাণবন্ত।এই পুতুলটা আর চারটের মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়ার কারণ আছে।এক হচ্ছে চুল আর চোখের রঙ বাকিগুলোর তুলনায় অন্যরকম,দুই হচ্ছে সাধারণত এই জাতীয় পুতুলগুলো খুকিদের আদলে বানানো হয়।এটা কোন কিশোরীর আদলে বানানো।বেশ কয়েক বছর আগে ঠিক এরকম একটা পুতুল খুব পছন্দ হয়েছিল অভিষিক্তার।কেনা যায়নি,হাতে একদম পয়সা ছিল না।
পুতুলটা একটা প্লাস্টিকের স্বচ্ছ বাক্সে ভরা রয়েছে।চন্দ্রিল গৌরীকে দেখানোর জন্য ইচ্ছা করে এসে বারান্দায় বসলেন।তারপর ওটা সযত্নে বাক্স থেকে বের করলেন।খুবই সুন্দর পুতুল।কিন্তু এরকম নির্বুদ্ধিতার কোনো মানে হয়!এতগুলো টাকা জলে গেল।পরিচিত কোন বাচ্চা নেই।টেঁপিকে দেওয়া যায় অবশ্য।কিন্তু সে ক্লাস টেনে পড়ে,তার কি এটা পছন্দ হবে!না দেওয়াই ভাল। কিরকম যেন মায়া পড়ে গেছে এটার উপর।হাতছাড়া করতে ইচ্ছা করছে না।হঠাৎ পুতুলটার চোখের দিকে তাকিয়ে কমরেড সেনগুপ্তর কথা মনে পড়ল,আরে হ্যাঁ,গতকাল তার আসার কথা ছিল।চন্দ্রিল ডেকে পাঠিয়েছিলেন।শিলিগুড়ির একজন নেতা,অশোকবাবু অভিযোগ জানিয়েছিলেন কমরেড সেনগুপ্ত নাকি তাঁকে ঠেলে গোবরে ফেলে দিয়েছে ইচ্ছাকৃত ভাবে।এতে প্রতিবাদ করায় তাঁর মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে খুলি উড়িয়ে দেবার হুমকি দিয়েছে।
কলকাতার নেতাদের থেকে সেনগুপ্তর ব্যাপারে যে রিপোর্টগুলো পাওয়া গেছে তার প্রত্যেকটার মূলকথা একটাই।খুব ব্রিলিয়ান্ট,অসম্ভব ডেডিকেটেড কিন্তু….এই কিন্তুটার ব্যাখ্যা একেকজন একেকরকম দিয়েছেন।যেমন হাফিজ ইসলাম বলেছিলেন,”ওর প্রবলেম হচ্ছে বড্ড উগ্র নারীবাদী।আর সেই সাথে চরম একরোখা।যা ভাল বুঝবে করবে। মেয়েদের সমস্যা দেখলে আর কোনোদিকে হুঁশ থাকে না।ক্লাস পলিটিকসটা বুঝতে হবে,ওর সবসময় ইকোনোমিক অ্যাসপেক্টের তুলনায় কালচারাল অ্যাসপেক্টের দিকে ঝোঁক,যা দেখবে সব জেন্ডারে রিডিউস করে ফেলার প্রবণতা।এই দিকটা বাদ রাখলে তুলনা হয় না।একদম আগুনে পোড়া ইস্পাত।আমি গ্যারান্টি দিতে পারি টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেও একটা শব্দ উচ্চারণ করবে না।তবে এরকম ছেলে তো আপনি অনেক পাবেন।ওর সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে যোগাযোগ।ওর কলকাতা, দিল্লী এমনকি দক্ষিণ ভারতেও অ্যাকাডেমিয়ার প্রচুর লোকের সাথে পরিচিতি আছে।কয়েকজনকে তো পার্টিতেও এনেছে।তাছাড়া জয়পুরের দলিত আর কলকাতার মুসলিম বস্তিগুলোতেও ভাল কানেকশন।”
হাফিজ ইসলাম বহ্নিকে অপছন্দ করেন এই মিথ্যে কথাটা বহ্নি ছাড়া আর কেউ বলবে না।কারোর মুখের সামনে তার প্রশংসা করা হাফিজের অভ্যাস নেই,বরং তার খারাপ দিকটা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়াই তিনি শ্রেয় মনে করেন।এই বহ্নি কয়েকবার তাঁর মুখে মুখে তর্কও করেছে।অন্য কেউ হলে তিনি এতটা সহ্য করতেন না।অবশ্য সহ্য করার আরও একটা কারণ আছে যেটা সবাই জানে না।তাঁর ছোট ছেলের উচ্চমাধ্যমিক সামনে,বহ্নি তাকে পড়া দেখিয়ে দিত।ফিজিক্স আর অঙ্কটা। প্রাইভেট টিউটর দেওয়ার সামর্থ্য নেই,ক্লাসে আজকাল পড়াশোনার পাট উঠে গেছে।এটা নয় যে পড়া দেখানোর কাজের জন্য হাফিজের বহ্নি ছাড়া চলবে না।আরেকটা ছেলেকে জোগাড় করাই যায়।কিন্তু হুট করে বহ্নির মত ডিপেন্ডেবল কাউকে পাওয়া মুশকিল।স্কুল কলেজে শিক্ষা বয়কটের কথা বলে যে ছাত্ররা সন্ত্রাস চালাচ্ছে তাদের হয়ে হাফিজ স্বয়ং পার্টির মুখপত্রে কলম ধরেছেন।এখন এই ব্যাপারটা জানলে অন্যেরা দ্বিচারিতা ভাববে।আরে বাবা,বাড়ীঘরটাকেও জলে ভাসিয়ে দিতে হবে নাকি!ইংরাজী খবরের কাগজের চিফ এডিটরের অত মোটা মাইনের চাকরিটা ছেড়ে দিলাম,চোর বদমাশের মত লুকিয়ে থাকি,বাড়ী যাই না।খাবার না জুটলে জল খেয়ে পেট ভরিয়েছি-এই আত্মত্যাগগুলো দেখবি না?
কমরেড সেনগুপ্ত এসব দিকে যথেষ্ট লিবারাল।ওরকম জঙ্গী নয়।বা বাইরে গিয়ে নিন্দে করে বেড়াবে না।আর সেফ প্যাসেজ তৈরী করার ক্ষমতাও অসাধারণ।পার্টি থেকে হাফিজের উপর বাড়ী যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে।বাড়ীর উপর পুলিশের খোঁচড়ের দৃষ্টি আছে।এর মধ্যেও বহ্নি অসাধারণ ভাবে মাঝরাতে কয়েকবার লুকিয়ে তাঁকে বাড়ী নিয়ে গেছে।এটা পার্টি প্রোটোকলের বিরুদ্ধে।আরে বাবা বিপ্লবীরা কি মানুষ নয়?বউ ছেলেকে তো তাদেরও দেখতে ইচ্ছা করে।কিন্তু এই ব্যাপারগুলো কমরেড সেনগুপ্তর মত করে কেউ বুঝবে না।সবাই বলবে নিজের ছেলেকে ঠিক লেখাপড়া করাচ্ছে।কিংবা বলবে আমরাও বাড়ী ছেড়ে আছি,আপনি যাবেন কেন!
কমরেড সেনগুপ্তকে হাফিজ একবার বলেওছিলেন,”আপনার বাড়ী যেতে ইচ্ছা করে না?”
সে স্মিত হেসে উত্তর দিয়েছে,”আমার কথা ভেবে বিব্রত হওয়ার দরকার নেই।আই হ্যাভ আ হার্ট অফ আইস।আপনারা যারা এখনও রক্তমাংসের হৃদয়বৃত্তিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁদের এসব দরকার পড়ে।”
হাফিজ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়েছেন।গলায় কোন শ্লেষের চিহ্ন নেই।কারো সামনে মাথা নীচু করতে অভ্যস্ত নন হাফিজ,তাই এই ডেঁপোমি দেখে একটু রাগও হত।কিন্তু বহ্নি তাঁকে কখনও খাটো করতে চায়নি।এটা ক্রমশ একসাথে কাজ করতে গিয়ে বোঝা গেছে।ব্যক্তিগত ভাবে তিনি বহ্নির কাছে কৃতজ্ঞ। ঐ নারীবাদের ব্যাপারটা বাদ দিলে খুবই লক্ষ্মী মেয়ে।অথচ এই মেয়েটাই রেগে গেলে এমন কিছু কথা বলে যে কান থেকে রক্ত বেরোনোর উপক্রম হয়।সেটা হাফিজ বলেছিলেন চন্দ্রিলকে।
এই মারাত্মক খারাপ কথাগুলোর কিছুটা নমুনা চন্দ্রিল সমীরণ বাবুর কাছে শুনেছিলেন।
পুরোনো ছাত্র সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় প্রাক্তন ছাত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন সমীরণ বাবু।
-”এই পথ খুব সহজ নয়।বিশেষ করে মেয়েদের বিপদ কিন্তু আরো বেশী।”
-”কি জাতীয় বিপদ?”বহ্নি নিষ্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
সমীরণ বাবু অস্বস্তিতে পড়েছিলেন।কন্যাসমা ছাত্রীকে এর চেয়ে বিশদে বলা যায় না।বলার চেষ্টা করেছিলেন,”আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারগুলো সবসময় মেয়েদের উপযুক্ত হয় না।আবার শেল্টার নিতে গ্রামেও যেতে হতে পারে।কোথায় থাকতে হল কোনো নিশ্চয়তা নেই।তাছাড়া পুলিশ ধরলে ভয়ংকর টর্চার করবে।মেয়েদের পক্ষে সেটা সহ্য করা… ”
-”মারবে।মারধোর খাওয়ার অভ্যাস মেয়েদের থাকা দরকার।শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তো খেতেই হয়।তাছাড়াও জেন্ডার ভায়োলেন্স জিনিসটা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়।রাস্তায় এরকম ছেলেদের সাথে আমাদের দেখা হয় যারা কোমরে বা শাড়ীর আঁচল লক্ষ করে সিগারেট ছুঁড়ে মারে।হাতকাটা ব্লাউজ পড়লে হাতে ব্লেড চালিয়ে দেওয়াকে সামাজিক কর্তব্য মনে করে।তারপর প্রেমে না বললে অ্যাসিড তো আছেই।”
বহ্নির এই কাটা কাটা ভঙ্গিতে কথা বলার অভ্যাসের সাথে সমীরণ বাবু অপরিচিত নন।তাও খানিকটা নার্ভাস বোধ করলেন।এইটুকু মেয়ের গলায় এরকম কথা বলার সময়ও কি শীতল নিরাসক্তি!
-”আরও বিপদ আছে।মেয়েদের কাছে যা সবচেয়ে দামি..”আর ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।
-”কি? সম্ভ্রম?ওটা আমাদের উরুসন্ধিতে থাকে না।”
রক্তিম মজুমদার একবার ওর ব্যাপারে বলেছিল,সে নাকি মারাত্মক পুরুষবিদ্বেষী।তবে যেহেতু পার্টির অনেকের সাথে ওর ভাল সম্পর্ক, এটা বেশী কেউ বুঝতে পারবে না।তাকে যারা খুব কাছ থেকে চেনে তারা জানে।যদিও এই কথাটার মাথামুন্ডু কিছুই তেমন পরিষ্কার হয়নি।
তাকে সামনে থেকে দেখে অবশ্য অতটা গোলমেলে মনে হয়নি যতটা শোনা গেছে।বেশ স্ট্রেট ফরোয়ার্ড,কোন ন্যাকামি নেই।প্রত্যেকটা কথা বেশ কনফিডেন্স নিয়ে বলে।কিন্তু কয়েকদিন আগে সে একজন নেতাকে পিটিয়েছে।এবং খুলি উড়িয়ে দেবার হুমকি দিয়েছে।

সেদিন ইমতিয়াজ,জীবন,অর্ক প্রত্যেকে বহ্নিকে স্বকীয় পদ্ধতিতে ধিক্কার দিচ্ছিল।মানে জীবন আর অর্ক চ্যাঁচাচ্ছিল,ইমতিয়াজ অনুচ্চ গলায় বহ্নির কিছু একটা ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে থাকার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করছিল।তারপর প্রদীপ মোটা গলা করে সবাইকে থামিয়ে একা সেনগুপ্তকে প্রচন্ড বকাবকি করছিল।
-”একটা কান্ডজ্ঞান নেই,কাকে মারছিস দেখবি না?ওভাবে ধাম করে যার তার মাথায় বাড়ি দিবি?”
সেনগুপ্ত মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল।তার মুখ লাল,সেটা লজ্জায় নয়।তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল তার চুপ করে কারো তিরস্কার শোনার অভ্যাস নেই।
শেষ পর্যন্ত চন্দ্রিল বাধ্য হয়েছিলেন প্রদীপকে থামাতে।খারাপ লাগছিল বিষয়টা।কাজটা সে ইচ্ছা করে করেনি,তাছাড়া সেভাবে দেখতে গেলে তাকে দোষও দেওয়া যায় না।
প্রদীপরা বিদায় হলে সেনগুপ্ত আস্তে আস্তে তাঁর কাছে এসে দুঃখপ্রকাশ করেছিল,”আয়াম এক্সট্রিমলি সরি কমরেড।”
চন্দ্রিল হাসিমুখে বলেছেন,”ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু বি।আমরা যদি খবর না দিয়ে এভাবে চোর ডাকাতের মত ঢোকবার চেষ্টা করি,এরকম প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক।”
সেনগুপ্ত নতমুখে দাঁড়িয়েছিল।ওকে সহজ করতে চন্দ্রিল জিজ্ঞেস করেছিলেন,”আচ্ছা কমরেড ইএসজি আপনার আসল নামটা যেন কি?”
-”বহ্নি সেনগুপ্ত।”এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সে চোখ তুলে তাকিয়েছিল চন্দ্রিলের দিকে,”আমাকে প্লিজ আপনি বলবেন না কমরেড।”
-”ঠিক আছে।”চন্দ্রিল স্মিত হেসে বলেছিলেন।
সেদিন সেনগুপ্তদের ঐ শেল্টারটার পাশ দিয়ে যেতে যেতেই গাড়ীর পেট্রোল শেষ হয়ে গিয়েছিল।বাধ্য হয়ে নামতে হয়েছিল।প্রভাতকে পাঠানো হয়েছিল পেট্রোল পাম্পের খোঁজে।ভোরের আলো ফোটারও আগে চন্দ্রিল বেরিয়ে গিয়েছিলেন প্রদীপদের সাথে।

গৌরী স্কুলের জন্য বেরিয়ে গেছে।না খেয়েই।সেটা চন্দ্রিল রান্নাঘরে এসে বুঝলেন।অর্থাৎ নিষ্পৃহতা দেখালেও আসলে রাগ করেছে।তাকে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছেন জেনে চন্দ্রিলের একটা সেডিস্ট আনন্দ হল।কিন্তু সে না খেয়ে বেরিয়ে গেছে বলে খারাপ লাগছে।চন্দ্রিলের চা’টা ঢাকা দেওয়া আছে।মুড়ির কৌটোটা হাতে নিয়েও রেখে দিলেন চন্দ্রিল।গৌরীটা না খেয়ে চলে গেল।ও বাড়ি না ফিরলে কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।
চা’টা হাতে নিয়ে এসে বারান্দায় নিজের ইজিচেয়ারে বসলেন চন্দ্রিল।পুতুলটা এখনও একটা টুলের উপর রাখা আছে।
হঠাৎ একটা চেনা গলা কানে এল।
-”কমরেড একটু হেল্প করবেন প্লিজ?”
চন্দ্রিল জঙ্গলের দিকটায় তাকিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন।একটা খুব সুন্দর দেখতে ছেলে,প্যান্ট শার্ট পরা – মুখে হালকা দাড়ি,দেওয়ালের উপর দিকটায় ঝুলে আছে।পিঠে একটা ব্যাগ ঝুলছে।পুতুলটা রেখে ওর কাছে উঠে গিয়ে চন্দ্রিল প্রথমটা চিনতে পারেননি।পারলেন ওর চোখের দিকে দেখে।লাইট অ্যান্ড লিকুইড গ্রে আইজ,ওর আইডেন্টিফিকেশন মার্ক।
-”আমাকে চিনতে পারছেন না?আমি বহ্নি।”
-”ও হ্যাঁ,কেমন আছ বহ্নি?”
চন্দ্রিল উদভ্রান্তের মত বললেন।
বহ্নি বলল,”ঝুলে আছি,মানে ইয়ে সরি।ভাল আছি।আমাকে একটু নামতে সাহায্য করবেন?”
বহ্নির “ঝুলে আছি” র মত বিশ্রী রসিকতায় চন্দ্রিল রাগ করলেন না।তিনি খুবই উদ্ভট সময়ে ওকে প্রশ্নটা করেছিলেন।এতে এরকম উত্তর দিলে দোষের কিছু নেই।কিন্তু মাথাটা এখনও ভাল কাজ করছে না।আরও এক গ্লাস লেবুর সরবৎ খেলে ভাল হত বোধহয়।কাল অত মদ খাওয়াও ঠিক হয়নি।
চন্দ্রিল একটু কনফিউজড গলায় বললেন,”ব্যাগটা বরং ফেলে দাও।”
-”ওটাই প্রবলেম।কয়েকটা ব্রিটল জিনিস আছে।নইলে লাফিয়ে নেমে পড়তাম।জিনিসগুলোর জন্যই নামতে ভরসা পাচ্ছি না।”
-”আচ্ছা দাঁড়াও আমি ল্যাডার বা স্টুল কিছু নিয়ে আসছি।”
মইটা জায়গায় পাওয়া গেল না।উঁচু টুলটা চন্দ্রিল নিয়ে এলেন।
বহ্নি নেমে এসে দাড়ি আর পরচুলা আগে টেনে খুলে ফেলল।মানে বেশ কিছুক্ষণ থাকবে।আজকে চন্দ্রিলের একদম ইচ্ছা করছে না ওর সাথে কথা বলতে।
-”তোমার গত কাল আসার কথা ছিল।”
-”হ্যাঁ, আসলে কাল একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম।একটা বদ ঠিকাদার মজুরদের পেমেন্ট না করেই পালাচ্ছিল।ওটাকে আটকাতে গিয়ে একটু হালকা মত ঝামেলা হয়েছে।”
-”গুলি গোলা চলেছে নাকি?”
-”হ্যাঁ।”
-”ওহ আচ্ছা ভেতরে এস।বাড়ী খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় নি তো?”
-”অসুবিধা না,পুলিশের নজর আছে তো!তাই একটু ঘুরপথে আসতে হল।”
-”আমি তো এই জন্যই বাড়িতে আসতে বারণ করেছিলাম।আমিই না হয় তোমাদের ওখানে গিয়ে দেখা করে নিতাম।”
-”না,চিন্তার কিছু নেই।আসলে যে পুলিশটা এই বাড়ীর উপর নজর রাখছে, কাল রাতে ওর মুরগীগুলো খুলিয়ে দেবার ব্যবস্হা করেছিলাম।তাই আজ সকালে ও একটু ব্যস্ত আছে।মেন গেট দিয়েই ঢোকা যেত,কিন্তু একটা ছেলে,আপনার বাড়ীর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল-বারণ করল।”
চন্দ্রিল ওকে ভিতরে এসে চৌকিতে বসতে বললেন।এখন ওকে নিশ্চয়ই কিছু খেতে দিতে হবে।তাছাড়া শেয়ালের বাচ্চা এবং গৌরীর বাচ্চাকেও খাবার দিতে হবে।ছি ছি গৌরীর বাচ্চা আবার কি কথা!বুবুল হ্যাঁ বুবুলকে খেতে দিতে হবে।টেঁপিকেও।
নিশ্চয়ই এখনও ঘুমোচ্ছে।বিশ্রী অভ্যাস।শিক্ষা বয়কটের ব্যাপারে টেঁপির বরাবরই একটু বেশী উৎসাহ,সেটা আর যাই হোক আদর্শগত কারণে নয়।
-”চা খাবে তো?”বহ্নিকে জিজ্ঞেস করলেন চন্দ্রিল।
-”হ্যাঁ।আপনি কি বাড়ীতে একা আছেন?”
-”না।কেন?”
চন্দ্রিল বিস্মিত গলায় বললেন।
-”না চা’টা আপনাকেই করতে হবে কিনা জিজ্ঞেস করছি।”
-”হ্যাঁ,আমি খারাপ চা করি না।”চন্দ্রিল অবাক হয়ে বললেন।
-”নাহ তার জন্য না,আমি করছি।আপনাকে করতে হবে না।”
-”না না বোসো।আমি করব।”
ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চন্দ্রিল ভিতরের ঘরে চলে এলেন।
বুবুল দাঁত মাজছে।টেঁপি দাঁত মাজা শেষ করে গামছায় মুখ মুছছে।চন্দ্রিল কঠিন চোখে একবার ওদের দেখলেন, তারপর বললেন,”এটা ঘুম থেকে ওঠার সময়?”
বুবুল ফ্যানাভর্তি মুখে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল।চন্দ্রিল হালকা ধমকের স্বরে বললেন,”আহ মুখ ধুয়ে এসো।”
টেঁপি বলল,”আচ্ছা পিসো তুমি স্কুল বয়কট করতে বলছ,তাহলে একটু ঘুমোলে এরকম কর কেন?”
-”এডুকেশন সিস্টেম বয়কট করতে বলা হয়েছে,পড়াশোনা ছেড়ে দিতে নয়।দুটোর ফারাক বোঝার মত বয়স তোমাদের হয়েছে।”
-”কোথায় ফারাক?আচ্ছা আমাদের যে হোমওয়ার্ক করতে হয় সেটা কি শিশুশ্রম নয়?”
-”এটা নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব।এখন পড়তে বোসো যাও।”
টেঁপি পড়তে বসল না।চন্দ্রিল চা ছাঁকার সময় তাকে রান্নাঘরে দেখতে পেলেন।
-”ঐ দিদিটা কে গো?কি মারাত্মক সুন্দর!”
-”হ্যাঁ, যাও সুন্দর দিদিকে চা দিয়ে এসো।”
কাপে চা ঢেলে চন্দ্রিল টেঁপিকে দিলেন।
বুবুলকেও তার পিছনে আসতে দেখে তার হাতে মুড়ির বাটি দিয়ে চন্দ্রিল বহ্নিকে দিয়ে আসতে বললেন।
-”ইংরাজীতে কথা বলতে হবে?”
বুবুল বিপন্ন ভাবে বলল।
-”না বাঙালী তো!”
-”বাঙালী?সত্যি?”অবাক হয়ে টেঁপি বলল।
-”যাও না একটু গল্প কর দিদির সাথে।”
চন্দ্রিল একটা বাটিতে মুড়ি তরকারী নিয়ে বাগানে এলেন।শেয়াল বাচ্চাকে খেতে দিতে হবে।
ওদের খেতে দিয়ে খাওয়া শেষ হবার অপেক্ষা করছিলেন চন্দ্রিল।বাটিটা নিতে হবে।কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বিকট শব্দ শোনা গেল।কালীপুজোর রাতে এরকম শব্দ প্রচুর শোনা যায়।বা ক্রিকেটে পাকিস্তান অথবা ডার্বিতে মোহনবাগান হারলে।কিন্তু চন্দ্রিল চিন্তিত হলেন কারণ শব্দটা ছাদ থেকে আসছে।আর এই বারুদ সম্পর্কিত শব্দ খুব একটা ভাল জিনিস নয়।

চন্দ্রিল ঘরে ফিরে এসে দেখলেন বহ্নি,টেঁপি বা বুবুল কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।চায়ের কাপ উল্টে রয়েছে।চা নেই অবশ্য,মুড়ির বাটিটাও ফাঁকা।এবং নিশ্চিত হলেন সেনগুপ্তর ভদ্রতা সভ্যতার বোধ বিশেষ নেই।
ছাদে এসে দেখা গেল ভয়ানক কাণ্ড। একটা বোমারু বিমানের ছোট সংস্করণ উড়ে বেড়াচ্ছে,বহ্নির হাতে রিমোট কন্ট্রোল।মাঝে মধ্যে ওর মধ্যে থেকে বুলেট চার্জ করছে।বুলেটগুলো ক্ষতিকারক নয়,মাটিতে পড়েই গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এখন আর কোনো শব্দ হচ্ছে না।
-”কি করছ তোমরা?” অপ্রসন্ন গলায় বললেন চন্দ্রিল।
-”আপনি শব্দ শুনে এলেন, না?”বহ্নি অপরাধী মুখে বলল,”আয়াম সো সরি,আসলে আমার দোষ নয়।এটায় সাইলেন্সার লাগানো আছে,এই টেঁপির জন্য ওখানে একটু গণ্ডগোল হওয়ায় শব্দ বেরিয়ে গেছিল।আমি আবার ঠিক করে দিয়েছি।”
-”এটা কি?”
-”এটা একটা রিমোট কন্ট্রোল প্লেন,যেটা থেকে বোম ফেলা যায়।”বুবুল উৎসাহিত গলায় বলল।
-”এরকম খেলনা নিয়ে আমাদের বাড়িতে বাচ্চারা কখনও খেলেনি।এটা কি তুমি বানিয়েছ?”বহ্নিকে জিজ্ঞেস করলেন চন্দ্রিল।
-”হ্যাঁ,আমি বানিয়েছি।কারণ আজকাল ভারতবর্ষের বাচ্চারা এইসব খেলনা নিয়েই খেলছে।”বহ্নি বেশ বিজ্ঞের মত বলল।
চন্দ্রিল ওর ইঙ্গিতটাকে পাত্তা না দিয়ে নিরস গলায় বললেন,”এটা এখানে চালাবার আগে একবার জিজ্ঞেস করে নিতে পারতে।বাগানে শেয়ালের বাচ্চা এসেছে,ওদের চোট লাগতে পারত।”
-”না, লাগবে না।বুলেটগুলো মাটির তৈরী, তাছাড়া ছাদের বাইরে পড়বে না,আমি রেঞ্জ ফিক্স করে দিয়েছি।”
-”ঠিক আছে।”বলে বাচ্চাদের দিকে তাকালেন চন্দ্রিল,”এটা খেলার সময় নয়।তাছাড়া এই খেলনাটা তোমাদের আদৌ রাখতে দেওয়া হবে কিনা সেটাও বিতর্কের বিষয়।এখন গিয়ে বাংলা বানান নিয়ে বোসো।আর টেঁপি তুমি অঙ্ক নিয়ে।আমি গিয়ে খাতা দেখব কিন্তু।”
-”আমিও বাংলা বানান নিয়ে বসব?”বহ্নি একটু অবাক হল।কারণ বহ্নি ওদের সাথেই দাঁড়িয়েছিল।আর চন্দ্রিল বুবুলের নাম উল্লেখ করেননি।

-”না,তুমি এখন ওদের কাছে যাবে না।বিশেষ করে টেঁপির কাছে,কারণ ও অঙ্কগুলো তোমাকে দিয়ে সলভ করানোর চেষ্টা করবে।”খুবই গম্ভীর মুখে চন্দ্রিল বললেন।
ভদ্রলোক নীচে নেমে যাচ্ছিলেন,বুবুল আর টেঁপি আগেই নেমে গেছে।বহ্নি তাঁকে অনুসরণ করে নামতে নামতে বলল,”চন্দ্রিলদা আপনি আমার উপর রেগে আছেন?”
-”না তো।কেন?”
-”মানে আগের দিন আমি আপনার মাথায় মেরেছিলাম বলে….তা না হলে আপনি আমার সাথে এরকম ব্যবহার করছেন কেন?”
চন্দ্রিল খুব শান্ত গলায় বললেন,”আসলে আজকের ডেটেই আমার মেয়েটা মারা গেছিল।ঐ জন্য একটু ডিস্টার্বড ছিলাম আর কি।যাক গে,যে গেছে তাকে নিয়ে আর কথা বলে লাভ নেই।একটা অন্য কথা বলছি, ওরকম একটা খেলনা আনার কি দরকার ছিল?খরচা হয়েছে নিশ্চয়ই অনেক।”
-”না,উল্লেখযোগ্য কিছু না।আসলে এটা আনার একটা তাৎপর্য আছে।কম খরচে এর বড় মডেলটা যদি বানানো যায়,তাহলে স্টেট অ্যাপারেটাসের সাথে আমাদের লড়াইটা জমে ক্ষীর হয়ে যাবে।এই ওয়ান শটার ফটার কি দিয়ে কি হয় বলুন?পুলিশের কাছে ওর চেয়ে অনেক ভাল মাল থাকে।”
‘জমে ক্ষীর’ তুলনাটায় চন্দ্রিল মনে মনে বেশ বিরক্ত হলেও মুখের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করলেন না।জিজ্ঞেস করলেন,”এর প্রত্যেকটা পার্টস ভারতে তৈরী?”
-”না।একটা জিনিস জার্মানির আছে।”
চন্দ্রিল দাঁড়িয়ে পড়ে বহ্নির চোখের তাকালেন,”মাতৃভূমিকে মুক্ত করার আমাদের এই লড়াই আমাদের এই মাটিতে দাঁড়িয়ে,এই মাটি আমাদের যা দিতে পারে,তার উপর নির্ভর করেই লড়তে হবে।বিদেশ থেকে অস্ত্র, বা মিলিটারি সাপোর্ট নেওয়ার মানে প্রতিক্রিয়াশীলরা আমাদের যেটা বলে চিহ্নিত করতে চায়,নিজেদের তাই প্রমাণ করা।নিজেদের লড়াই আমরা নিজেরাই লড়ব,তার জন্য সাহেবদের কাছে হাত পাতার প্রয়োজন নেই।”
বহ্নি মুখ ব্যাজার করে রইল।চন্দ্রিল একটু থেমে বললেন,”তাছাড়া,অত্যাধুনিক অস্ত্রের উপর এত নির্ভরতা ভাল না।আমাদের মূল লড়াইটা রাজনীতির,আদর্শের।মিলিটারি এক্সেলেন্স,বা আগ্নেয়াস্ত্র এগুলো গৌণ বিষয়।”
আদর্শ দিয়ে ইন্ডিয়ান আর্মির সাথে কিভাবে লড়ব!মানে ইন্ডিয়ান আর্মি পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী একটা ফোর্স।কিন্তু কথাটা মাথায় এলেও বহ্নি মুখে বলা সঙ্গত বোধ করল না।পুরো পরিস্হিতিটা আগে বুঝে নেওয়া দরকার।এমনিতেও বড়দা তাকে বার বার সাবধান করে দিয়েছে,”চন্দ্রিলদার সামনে খুব মেপে কথা বলবি।”বড়দার আশঙ্কা ভদ্রলোক মনের অবচেতনের দ্বিচারিতা বা সামান্য ভীতি কি স্বার্থপরতা পড়ে ফেলতে পারেন।মানে এমন অনেক কিছুই পড়ে ফেলতে পারেন যার সম্পর্কে একটা মানুষ নিজেই সচেতন নয়।বহ্নির মধ্যে কি গোপনীয় পড়তে পারেন তিনি!বহ্নির লুকোবার আছেটা কি!অবিনাশকাকু সেদিন ঘরে একা পেয়ে যেটা করবার চেষ্টা করেছিল তাতে তো তার কোনো দোষ ছিল না।
বহ্নি বলল,”আপনি এখন কিছু জিজ্ঞেস করতে চান?নইলে আমি বাগানের শেয়ালের বাচ্চাগুলোর সাথে আলাপ করব?”
-”হ্যাঁ যাও।কামড়ায় না যেন।আমি ততক্ষণ তাহলে বুবুলদের কাছে বসছি।”
বহ্নির থেকে কাজের রিপোর্ট নিতেই হত।তাছাড়া অশোকবাবুর ব্যাপারটা নিয়েও কথা বলা দরকার।দ্বিতীয়টা অবশ্য তত জরুরি নয়।আসলে এখন সত্যিই কথা বলতে ভাল লাগছে না।বহ্নি বাড়িতে আসুক এটাও চন্দ্রিল চাননি।দেখা করতে চেয়েছিলেন ঠিকই,কিন্তু বাড়িতে পুলিশের নজর থাকে।চলে এল।অবশ্যই ও রিস্ক মাথায় নিয়ে এসেছে,তাও এই দিনের বেলায়।তাই চন্দ্রিলের ভাল না লাগলেও তাঁকে ওর সাথে কথা বলতে হবে।ভিতরের ঘরে এসে টেঁপিকে পেলেন না।বুবুল জানাল সে সুন্দর দিদির কাছে গেছে।চন্দ্রিল তাকে ধরে আনার বিষয়ে উৎসাহ বোধ করলেন না।মেয়েটার একদম পড়াশোনায় মন নেই।মাথাটাও খুব ভাল নয়।কিছুদিন আগে টিউটর দেওয়া হয়েছে গৌরীর কথায়।একে নিয়ে কি যে করা যায়?পড়াশোনা ছেড়ে দিলে ওর বাবা চন্দ্রিলকে ধরবেন।একে মার্ক্সবাদী আদর্শে দীক্ষিত করার চেষ্টা করে চন্দ্রিল ব্যর্থ হয়েছেন।ওর না বুর্জোয়া শিক্ষায় আগ্রহ আছে না মার্ক্সবাদী শিক্ষায়।ও যখন বিপ্লবী হবে না তখন স্কুল ছাড়ার কোনো মানে হয় না।কিন্তু তাঁর বাড়ির একটা বাচ্চা বুর্জোয়া শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে এটা দেখতেও খুব খারাপ লাগে।
কিছুক্ষণ বাদে টেঁপিকে বই খাতা নিয়ে উঠে আসতে দেখে চন্দ্রিল মধুর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,”দিদিকে দিয়ে সব সামস করিয়ে নিয়েছ?”
টেঁপি মুখ কালো করে বলল,”দিদি শুধু কিভাবে করতে হয় দেখিয়ে দিয়েছে।আমাকেই সলভ করতে হল।”
-”তাও ভাল।”
-”কিচ্ছু ভাল না,পাটিগণিতের নতুন সাতটা টাইপ শিখিয়েছে।আর গোটা তিরিশেক অঙ্ক বানিয়ে করতে দিয়ে দিল।বলেছে খাতা চেক করবে।”
চন্দ্রিল আজ প্রথম বার হাসলেন,”বেশ হয়েছে।যাও সলভ করো গিয়ে।”

বহ্নি কিছুক্ষণ ধরে পুতুলটা নেড়েচেড়ে দেখছিল।কারণ পুতুলটা অনেকটা ওর মত দেখতে।বেশ মজাদার ব্যাপার তো!কিন্তু এটায় কোনো ব্যাটারি নেই।বহ্নির মত দেখতে একটা পুতুল চুপচাপ শুয়ে থাকবে এটা মানা যায় না।কেন যে এই ফালতু পুতুলগুলো বানায়!এর চেয়ে ‘লায়াসেন’ অনেক কাজের ছিল।ওকে দেখতে এদের মত সুন্দর ছিল না,মানে সত্যি বলতে বেশ অস্বস্তিকরই দেখতে ছিল।বহ্নি একটা কম্পিটিশনে পাঠাবে বলে ওকে তৈরী করেছিল।প্রথমে ওর নাম ছিল এফই৪৫৭।মানে ঐ কম্পিটিশনে বহ্নির যেটা রোল নাম্বার ছিল আর কি!ও ঘর ঝাঁট দেওয়া,জল আনা ও ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হিসাবে কাজ করত।ব্যাটারিতে চলত।ওকে একদম সাদামাটা গ্রাফ মানে এক্সেস্কোয়্যার,ই টু দ্য পাওয়ার এক্স,ইত্যাদি একপদী ফাংশন,কিউব অব্দি পাওয়ার পর্যন্ত, এছাড়া আন্ডার গ্র্যাজুয়েট লেভেলের ক্যালকুলাস জাতীয় কিছু সোজা অঙ্ক শেখানো হয়েছিল।ভীন,নিউটন গোছের কিছু ফিজিক্সের অঙ্কও জানত।বহ্নি ওখানে একটা স্কলারশিপ জিতেছিল।কিন্তু আসল কামালটা হয় দুবছর পর।যখন প্রোফেসর লায়াপুনভ ওটাকে আরো উচ্চস্তরের অঙ্কে পারদর্শী করে তোলেন।তখনই ওর নাম দেওয়া হয় লায়াসেন।মানে লায়াপুনভের ‘লায়া’ আর সেনগুপ্তর ‘সেন’।সেবার টোকিওতে গিয়ে লায়াপুনভের সাথে জয়েন্টলি ওর উপর একটা পেপার প্রেজেন্ট করেছিল বহ্নি।প্রোফেসর লাকামাল্লার সাথেও ঐ সেমিনারেই আলাপ হয়েছিল।ভদ্রলোক এখন অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যকমিটির সদস্য।বহ্নিই তাঁকে পার্টিতে নিয়ে আসে।প্রোফেসর লায়াপুনভকে এনেছিল রক্তিমদা।
বহ্নিদের কলেজের সরখেল স্যর লায়াসেনকে অতটা পছন্দ করেননি।বিশেষ করে ওর চেহারাটার জন্য।বহ্নিকে বলেছিলেন যদি চেহারাটার উন্নতির জন্য কিছু করা যায়।প্রোফেসর লায়াপুনভ ঠাট্টা করেছিলেন,”বহ্নি ওসব অপ্রাসঙ্গিক দিকে নজর দেয় না।যেমন রোবোটটার যেহেতু চোখের কোনো ভূমিকা নেই,তাই চোখটাই বানায়নি।”
-”আচ্ছা মানুষের মত একটা অবয়ব দেবার তাহলে কি দরকার ছিল?”সরখেল স্যর বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন,”চোখের কোটরটা বানিয়েছে অথচ চোখ নেই।বীভৎস দেখতে লাগছে।”
বহ্নি তখনই সরখেল স্যরকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে লায়াসেনের চোখের কোটরে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল,কনুই পর্যন্ত।এখান দিয়ে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সংযোগটা ধরা যায়।সরখেল স্যর দৃশ্যের বীভৎসতা সহ্য করতে না পেরে ল্যাব ছেড়ে পালিয়েছিলেন।
-”অশোকবাবুর ব্যাপারটা কি হয়েছে?”একটা যারপরনাই গম্ভীর পুরুষকণ্ঠ শুনে বহ্নি লায়াসেনের চিন্তা ছেড়ে সচেতন হল।
-”উনি যা বলেছেন সেটা সত্যি?একটা তর্কাতর্কির জেরে তুমি ওঁকে কাদায় ফেলে দিয়েছ?”
-”আসলে উনি একটা মেয়েকে কিছু আপত্তিকর কথা বলেছিলেন।”
-”কথাগুলো আপত্তিকর কিনা সেটা বিচারের দায়িত্ব বোধহয় একা একজনের নয়।তাছাড়া আমি ওঁর নামে কখনও কোনো অভিযোগ পাইনি।বরং তোমার নামেই চব্বিশ পরগণার তপেন রায়চৌধুরী অশোকবাবুর মতই একটা অভিযোগ এনেছিলেন।তুমি নাকি ওঁর মুখে রিভলভারের নল ঠেসে ধরেছিলে।”
-”শিলিগুড়ির একটা অবস্হাপন্ন পরিবারের মেয়ে,কলেজে পড়ে কিছুদিন ধরে আমাদের সাথে খেতে জনমজুর খাটছে।সে মেয়েটি প্রথম যখন এসেছিল, তখন অশোকবাবু তাকে বলেছিলেন যে সিল্কের ব্লাউজ পরে নাকি বিপ্লব হয় না।মেয়েটির খারাপ লেগেছিল, কিছু বলেনি।এরপর বেশ কিছুদিন ধরে মেয়েটির ব্লাউজের পিছনে পড়ে ছিলেন।বক্তব্য হচ্ছে গ্রামের আদিবাসী মেয়েরা ব্লাউজ পরে না,তাহলে ডিক্লাসড হতে ওদেরও ব্লাউজ না পরা উচিত।নইলে ওরা সর্বহারা আন্দোলনে থাকার উপযুক্ত নয় বলে উনি ধরে নেবেন।মেয়েটি ওঁর আচরণে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছিল বলে আমার কাছে মৌখিক অভিযোগ জানিয়েছিল।”
-”আর আপনি সাথে সাথে ধর তক্তা মার পেরেক।আচ্ছা এরপর যদি মেয়েটি অভিযোগের ব্যাপারটা অস্বীকার করে তাহলে তো পুরো দায়টা আপনার ঘাড়ে আসবে।লিখিত অভিযোগ ছাড়া আপনি এভাবে পদক্ষেপ নিতে পারেন না।আর এটা কোনো পদক্ষেপও নয়,ধাক্কা দিয়ে কাদায় ফেলে দেওয়া।”
বহ্নি লক্ষ করল ভদ্রলোক আবার আপনিতে সুইচ করে গেছেন।সেটা অবশ্য ইচ্ছাকৃত না ভুলবশত বোঝা গেল না।
-”ব্যাপারটা এরকম ঘটেনি।আমি ওঁকে বিষয়টা নিয়ে চার্জ করায় উনি কলকাতার মেয়েদের চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ শুরু করেন,তখন আমি তাঁকে ফাটা কন্ডোমের প্রোডাক্ট বলতে বাধ্য হই।এরপর উনি কাঁচা গালাগাল শুরু করেন,আশা করেছিলেন যেহেতু আমি মেয়ে ,রুচিগত কারণেই কাদা না ঘেঁটে পালাব।এই কারণে ওঁকে একটু কাদায় ফেলতে হয়েছে।এতে অন্যায়টা কি হয়েছে শুনি?”
-”সেই তো,অন্যায়ের কিই বা আছে?”চন্দ্রিল একটা সিগারেট ধরালেন,তখন ঐ মেয়েপুতুলটা চোখে পড়ল,”আরে এটা এখানে?আমি বারান্দায় খুঁজছিলাম।”
-”বৃষ্টি পড়ছিল বলে আমি ভিতরে এনে রেখেছিলাম।”
-”তোমার পছন্দ হয়েছে এটা?”
বহ্নি বেশ অবাক হল ভদ্রলোককে অত সিরিয়াস একটা বিষয় থেকে প্রসঙ্গান্তরে যেতে দেখে।বলল,”না। আমার এরকম প্যাট্রিয়ার্কি দ্বারা অপ্রেসড মেয়েদের মত কাঠ হয়ে থাকা পুতুলদের ভাল লাগে না।আমি বানালে এটা আরো ভালভাবে বিহেভ করত।”
চন্দ্রিল কি বুঝলেন কে জানে,মুখটা ব্যাজার করে বললেন,”উচ্চারণটা পেট্রিয়াকি হয়।যাক গে ঐ মেয়েটির থেকে লিখিত অভিযোগ নিয়ে রেখো।”
-”ওকে।”
-”তোমার কি লাগবে পুতুলটা?”
-”মানে?”
-”তুমি চাইলে এটা রাখতে পার।এটা নেবার মত এখানে কেউ আর থাকে না।পড়ে পড়ে নষ্ট হবে।”
-”নাহ ধন্যবাদ।আমি আসলে একটু অন্যধরনের জিনিস নিয়ে খেলতে পছন্দ করি।মানে বাড়িতে পুরোনো স্প্রিং,খারাপ হয়ে যাওয়া ঘড়ি, লোহার কিছু বা নতুন ব্যাটারি থাকলে আমাকে উপহার দিতে পারেন।”
চন্দ্রিল কিছুক্ষণ পাজলড মুখে বহ্নির দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর চিন্তিত গলায় বললেন,”ওরকম কিছু তো নেই।আমি তাহলে এটা আলমিরাতে তুলে রাখি?”
-”হ্যাঁ।”
চন্দ্রিল ভিতরের ঘরের দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন,”পাহাড়ে কেমন কাজ হচ্ছে?”
-”আমাদের দুটো সংগঠন হয়েছে মদেশিয়া, লেপচা আর ভুটিয়া শ্রমিকদের নিয়ে।ওঁরাওদের গ্রামে গিয়েও কথাবার্তা চলছে।কিন্তু খুব বাধাহীন ভাবে কাজ এগোচ্ছে না।আমার সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন ওঁরা আলাদা আলাদা রান্না করতে চান।”
-”এই প্রবলেমটা চা বাগানে আমরাও ফেস করেছি।ঠিক হয়ে যাবে।তবে এক দু মাসেই সব হয়ে যাবে,তা নিশ্চয়ই নয়।সময় লাগে।একেকবারের জায়গায় দশবার বলতে হবে।তবে এত কম দিনেও তোমরা যতটুকু করেছ,সেটা প্রোগ্রেস হিসাবে মন্দ নয়….আচ্ছা তুমি পাহাড়ের সাথে সাথে প্লেনের একটা এলাকার দায়িত্ব নিতে পারবে?আদিবাসী নয়,বাঙালী গ্রাম।একজন রাজপুত জোতদার আছে,ভৈঁরো সিংহ নাম।পুরো কাউন্ট ড্রাকুলা।”
-”হ্যাঁ নেব।”
-”একসাথে এতগুলো নিয়ে বদহজম হবে না তো?”
-”আমাকে পাঁচ বছর বয়সে আঁকার ক্লাস, গান, স্কুল আর সাঁতারে একসাথে ভর্তি করে দিয়েছিল।দশ বছর বয়সে বক্সিং। তারপর পনেরো বছর বয়সে এগুলোর সাথে রেসলিং।বদহজম হয়নি।আঁকা আর রেসলিংটা পোষায়নি যখন ছেড়ে দিয়েছি।মানে বক্সিং বাদে আর কোনোটাই সিরিয়াসলি করিনি।”
-”আচ্ছা ঠিক আছে,তুমি তাহলে বরং পাহাড়ের কাজটাই মন দিয়ে কর।”চন্দ্রিল চিন্তিত হয়ে বললেন।
-”বাবা,লোকেশবাবু এদিকে আসছে।”বুবুল দৌড়ে এসে বলল,”সাথে মনে হচ্ছে আরো লোক আছে।”
-”পাজি বদমাশ কোথাকার,এর পরের বার ওর মুরগীগুলো রোস্ট করে ফেলব।”বহ্নি উত্তেজিত হয়ে বলল,”পিছনের কোনো দরজা আছে?”
-”আছে কিন্তু ওদিকে ওদের লোক থাকতে পারে।”চন্দ্রিল চিন্তিত গলায় বললেন।
-”তাহলে?”
-”একটা রাস্তা আছে কিন্তু তুমি কি যেতে পারবে?টয়লেটের জানলা দিয়ে।”
-”দেখি গিয়ে।”
চন্দ্রিল ওকে নিয়ে এলেন,কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না।এখান থেকে নেমেই একটা ডোবা, তাতে সাপখোপ থাকতে পারে।জোঁক তো থাকেই।
বহ্নি সেটা শুনে চুপচাপ জানলার দিকে দেখল।তারপর বলল,”চলে যাব।”
-”কিন্তু তারপর ফিরবে কি করে?তাছাড়া ঐ ডোবাটায় নেমে যাওয়াটাও কিন্তু খুব সোজা নয়।ওখানে বসে থাকাও সেফ নয়।”
-”দেখা যাবে।বুবুল সোনা,আমার ব্যাগটা এনে দেবে?”
-”আমাকে প্রশান্ত বলে ডাকলেই ভাল হয়।”গম্ভীর স্বরে প্রশান্ত কথা বলে চলে গেল।তার এখন আট বছর বয়স,সে পুরুষমানুষ।বাড়ির বাইরের লোকেরা তাকে ডাক নাম ধরে ডাকলে সে বড় একটা খুশি হয় না।
চন্দ্রিল অবশ্য ওকে বকলেনও,”এই এটা কি ধরন কথা বলবার?দিদিকে সরি বলো।”
-”সরি” বলে প্রশান্ত ব্যাগটা বহ্নিকে দিল।বহ্নি ওর মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে ব্যাগটা কোটের মধ্যে ঢুকিয়ে ডোবায় ঝাঁপ দিল।চন্দ্রিল দ্রুত জানলা বন্ধ করে দিয়ে ফিরে এলেন।লোকেশবাবুরা ঢোকার আগে পরিস্হিতিটা স্বাভাবিক দেখানো প্রয়োজন।

লোকেশবাবু মিনিট দুয়েকের মধ্যেই দরজায় বাড়ি দিলেন।চন্দ্রিল বসে পেরি ম্যাসনের একটা বই পড়তে শুরু করেছেন ততক্ষণে।খুব স্বাভাবিক ভাবে,রোজকার মত।লোকেশবাবুর সঙ্গে আরো চারজন ঢুকে এল।
-”কি চন্দ্রিলবাবু,বাড়িতেই বোমটোমের ফ্যাক্টরি খুলে ফেলেছেন নাকি?”
-”আপনি রিটায়ারমেন্টের পর বরং ফিকশন লিখুন।”
তখনই আবার ছাদ থেকে ঐ বিকট শব্দটা এল।
লোকেশবাবু হতচকিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন,”হাবিলদার,ছাদে যাও।”
-”কি চলছে এসব?”ক্রুদ্ধ গলায় বললেন লোকেশবাবু।গলাটা ক্রুদ্ধ হলেও তাতে আতঙ্কের ছাপ চাপা রইল না।
চন্দ্রিল মনে মনে বিরক্ত হলেন।এটা টেঁপির কাজ,ওকে স্বাভাবিক অবস্হা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়ায় আবার ঐ খেলনাটা নিয়ে খেলতে শুরু করেছে।ওটা পুলিশের চোখে পড়া বাঞ্ছনীয় নয়।কবে যে বুদ্ধি হবে!মুখে অবশ্য কোনোরকম আবেগের ছাপ পড়তে দিলেন না।খুব স্বাভাবিক মুখে স্বভাবসিদ্ধ মৃদু গলায় বললেন,”চীনের দালালি।”

(ক্রমশ)

দ্রোহকাল ৮
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments