আগের দিন জি এসের সাথে থাকা একমাত্র যে ছেলেটা বহ্নির উপর চেঁচায়নি,মানে ওর সাথে একটা বাক্যব্যয়ও করেনি তাকে বহ্নি ওদের ঘরের দিকে দ্রুত আসতে দেখল।বড়দা বলছিল ওর নাম ইমতিয়াজ আলি।নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনোমিকস নিয়ে এম এ করেছে।কাজকর্ম কিছু করে না,হোল টাইমার।এই ছেলেটা আগের দিন বাইরে দাঁড়িয়ে অর্ক আর জীবনের সাথে সমানে ফিসফিস করে কি সব আলোচনা করছিল।বারদুয়েক খুবই কুটিল এবং অপ্রসন্ন চোখে বহ্নিকে দেখেওছিল।কিন্তু বহ্নির তখন সেদিকে মন ছিল না। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার দিনগুলো থেকে যাঁর লেখা প্রবন্ধ বহ্নি বালিশের নীচে রেখে ঘুমোয়,যাঁর নামে বহ্নিরা বেচুদার ক্যান্টিনে বসে মোমবাতির আগুনে হাত রেখে সর্বস্ব ত্যাগের শপথ নিয়েছে, যাঁর বক্তৃতা দূর থেকে শুনে বহ্নির শিরায় ধমনীতে আগুন ছুটেছে,সেন্ট্রাল কমিটির মিটিং এও যাঁকে দেখে বহ্নির কথা হারিয়ে যেত,সেই মানুষটা আজ বহ্নির কারণে রক্তাক্ত।বহ্নির মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছিল লজ্জায়।জি এস যদি ধরে দুটো থাবড়া লাগাতেন ভাল হত।কিন্তু তিনি তা করলেন না।তিনি এমন আচরণ করলেন যে বহ্নির পাতাল প্রবেশ করে যেতে ইচ্ছা করছিল।এর আগে মিটিং এ, সভায় ওঁর বক্তব্য শুনে মনে হয়েছিল লোকটা আগুন নয়।জাস্ট একটা ভলক্যানো।যা নিজের বুকের আগুনটা শ্রোতাদের শিরায় ধমনীতে ছড়িয়ে দেয়।কি অদ্ভুত চুম্বক রয়েছে মানুষটার গম্ভীর উদাত্ত (এবং কিয়দাংশে রোমাণ্টিক) কণ্ঠস্বরে।কিন্তু সেদিন এক অন্য মানুষকে দেখেছিল বহ্নি।এক আশ্চর্য নম্র ও অমায়িক মানুষকে।যিনি, পার্টির সর্বোচ্চ নেতা হয়েও সবাইকে তাঁর জন্য ব্যস্ত হতে দেখে বিব্রত বোধ করেন।যিনি রক্তাক্ত মাথা হাতে চেপে ধরেও বাকিদের সংযত থাকতে নির্দেশ দেন।বহ্নিকে, সেদিন ওঁর দেহরক্ষীদের কারণে কি পরিস্হিতিতে পড়তে হচ্ছিল সেটা সহজেই অনুমেয়।অথচ উনি সেদিন একটা আঙুলও বহ্নির দিকে উঠতে দেননি।চশমার আড়ালে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল চোখগুলো ওর চোখে রেখে হাসিমুখে বলেছেন,”কমরেড ই এস জি,নাইস টু সি ইউ।আমার নামটা তো জানেনই,আচ্ছা আপনার আসল নামটা কি বলুন তো!”

উনি কি আর ওর নাম জানতেন না!এটা সম্ভবত ওঁর চেলা চামুণ্ডাদের দেখানোর জন্য বলা,মানে এটা বুঝিয়ে দেওয়া যে উনি বহ্নির প্রতি আগের মতই উষ্ণ আছেন।
বহ্নি নাম বলেছে,তারপর নতমুখে বলেছে,”কমরেড আমাকে দয়া করে আপনি করে বলবেন না।”
উনি স্মিতমুখে বলেছেন,”আমি সবাইকে বয়স নির্বিশেষে সম্মানজনক সম্ভাষণ করতেই অভ্যস্ত। ”
-”প্লিজ কমরেড”!
-”আচ্ছা অ্যাজ ইউ উইশ।”বহ্নির মুখের অবস্হা দেখেই বোধহয় ভদ্রলোক হেসে ফেলেছিলেন।
তখন ঐ ছেলেটা ওঁর পাশে অসন্তুষ্ট মুখে দাঁড়িয়েছিল।ছেলেটার মুখটা দেখলে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হয়।ফর্সা রঙ,ঠোঁটের উপর হালকা গোঁফ,আর চোখের দৃষ্টি অস্বস্তিজনক ভাবে শীতল।কেমন একটা খুনি খুনি ভাব।এই ছেলেটা চন্দ্রিল মজুমদারের ডান হাত,এবং ওঁর ব্লু আইড বয়।এত সুন্দর স্বভাবের একটা মানুষের পছন্দ এত বিকট কেন!এই ছেলেটার ব্যাপারে বহ্নি বড়দার কাছে পরে যা শুনল একটুও ভাল লাগল না।ইমতিয়াজ,অর্ক-এই নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টগুলো জি এস কে নিয়ে রীতিমতো পোজেসিভ।কাউকে ওঁর কোর গ্রুপে ঢুকতে দিতে চায় না।হাফিজদা বাদে অন্য পলিটব্যুরো মেম্বারদেরও না।প্রায় একবছর ধরে বড়দার সাথে ওর রীতিমতো ঠাণ্ডা লড়াই চলছে।ওদের গ্রুপের অর্ক,জীবন,প্রভাসদের সাথে কোর গ্রুপে আসা নিয়ে বড়দা তার বাড়ীর লোকদের নিয়ে গুঁতোগুঁতি করছে।মানে ছোটপিসির ছেলে সমরদাকে ইতিমধ্যেই ওঁর পিছনে জুতে দেওয়া,এরপর সম্ভবত বহ্নিকেও।ব্যাপারটা নিয়ে শুধু এরা নয়,হাফিজদা পর্যন্ত বড়দার উপর বেশ বিরক্ত।

ছেলেটার সাথে বহ্নি ঘরের দরজার কাছেই মুখোমুখি হল।বহ্নিকে যান্ত্রিক স্বরে বলল,”চন্দ্রিলদা তোমার সাথে দেখা করতে চান।ঐ দিকে…. ” বলে পাশের বাড়ীর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।আচমকা বুক এবং পেটের মধ্যে ড্রাম পেটার অনুভূতি….এবং সেটা এতটাই তীব্র যে ছেলেটা প্রথম সাক্ষাতেই বহ্নিকে অসভ্যের মত ‘তুমি’ বলল, এতবড় ধৃষ্টতাকেও বহ্নি আমল দিতে পারল না।
এইচ ও ডির মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছোঁড়া,বেশ বড় জমায়েতের সামনে বক্তৃতা দেওয়া,তারপর ঐ থাবড়া সংক্রান্ত কুখ্যাত ঘটনাটা-কোনোটাতেই বহ্নি কিন্তু তেমন নার্ভাস বোধ করেনি।এক শ্যামল ভৌমিকের ঘটনাটা বাদ দিলে।কিন্তু এই ভদ্রলোককে দেখলে কেন যেন একটা নার্ভাসনেস গ্রাস করে।যদিও ভদ্রলোক খুবই অমায়িক ও নম্রভাষী।হয়ত খবরের কাগজ পড়ার কুফল।তাছাড়া কলকাতায় সমীরণ স্যর আর এখানে বড়দা সমানে যা ভয় দেখাচ্ছে ওঁর ব্যাপারে!বড়দা দেখা হলেই একবার করে বলছে, “চন্দ্রিলদার সাথে খুব সাবধানে কথা বলবি।”
জি এস দাওয়ায় একজন চাষীর সাথে গল্প করছিলেন।হাতে জ্বলন্ত বিড়ি।বহ্নিকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন।স্বভাবসিদ্ধ উষ্ণ গলায় বললেন,”কেমন আছেন?আপনারা কেমন কাজ করছেন দেখতে এলাম।তাছাড়া আপনার সাথে তো সেভাবে সেদিন কথাও হল না!”
বহ্নি উত্তরে একটু হাসার চেষ্টা করল।উফ চশমার আড়ালে ঐ এক্স রে চোখ!ভদ্রলোকের চোখগুলো অসম্ভব সুন্দর,কিন্তু টানা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে অস্বস্তি হয়,বড্ড অন্তর্ভেদী দৃষ্টিটা।
-”লোকেশবাবুরা কিছু ঝামেলা করেনি?”
-”নাহ আপনার ঐ গ্যাজেটটা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে বাথরুমের দিকটায় যায়ও নি।যাক গে চলুন আপনার ঘরটা দেখে আসি।”বলে হনহন করে হাঁটা লাগালেন জি এস।বহ্নি তাঁকে অনুসরণ করল।
ঘরে আলো বলে কোনো পদার্থ নেই।বহ্নি ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা মোমবাতিটা বের করে লাইটার দিয়ে জ্বালাল।আরেকটা কিনতে হবে,এটা বেশ ছোট হয়ে গেছে।
“আরে দরকার নেই,এখনও দিব্যি আলো আছে।নিভিয়ে দিতে পারেন মনে করলে।”কথা বলতে বলতে ঘরের একপ্রান্তে থাকা উঁচু ঢিবিটায় চোখ পড়তেই বোধহয় থেমে গেলেন,”এটা কি?”
বহ্নি ঢোক গিলল।বোঝা যাচ্ছে একটা বেশ মারাত্মক রকম অপরাধ হয়েছে।
-”বই।আর জার্নাল।”বলল বহ্নি।
-”আপনি তো পুরো লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেছেন।”বিস্মিত গলায় বললেন জি এস।
বহ্নি নিঃশব্দে একবার ঠোঁট কামড়াল।বইগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করছেন জি এস যার ফল আরো খারাপ।
-”এলিমেন্টস অফ ফিজিক্স,থার্মোডায়ানামিক্স,মেকানিকস, ফ্লুইড ডায়নামিক্স….এসব কি?আপনি পরীক্ষার পড়া তৈরী করছেন?”
-”না কমরেড”, বহ্নি ব্যস্ত হয়ে বলল,”এগুলো আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সের বই নয়।বেশীর ভাগই পোস্ট গ্র্যাজুয়েট লেভেলের।”
-”কিন্তু এগুলো এখানে কি করছে?”
-”আমি অবসর সময়ে পড়ি,তাছাড়া ফায়ার আর্মসের উপর রিসার্চের কাজেও লাগে।”
জি এস,সম্ভবত বহ্নির ব্যাপারে হতাশ হয়েই পাঁচ সেকেণ্ডের জন্য চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,”আপনি যাঁদের বাড়ীতে আছেন,তাঁরা ছোট চাষী।পাশের ঘরে চারজন গাদাগাদি করে শুয়ে আপনাকে এই ঘরটা ছেড়ে দিয়েছেন।এখানে এই মিনি লাইব্রেরি স্হাপন করা যে কতটা দৃষ্টিকটূ বিলাসিতা সেটা…আনবিলিভেবল।আপনার কাছে অন্তত এটা এক্সপেক্ট করিনি।”
-”আমি ওঁদের ইনসিস্ট করেছিলাম,তাও ওঁরা কিছুতেই রাজী হলেন না এখানে থাকতে।”কাতরভাবে বলল বহ্নি।
চন্দ্রিল বললেন,”আপনার যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে এই মুহূর্তে আপনার পজেশনে কি কি আছে একবার দেখতে পারি?এই মিনি লাইব্রেরি ছাড়া?”
বহ্নি তার ব্যাগ খুলে দেখাল,একসেট শাড়ী ব্লাউজ,একসেট শার্ট প্যান্ট,নকল দাড়িগোঁফ,রিভলভার,একটা ডায়েরি আর দুটো কলম।টুথব্রাশ,সাবান এমনকি তেল পর্যন্ত না।
-”স্ট্রেঞ্জ! আপনার কাছে কোনো গরম পোশাক নেই?এখানে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে।”
-”একটা ছিল,এই ভদ্রলোকের মানে নিমাইদার ছোট মেয়েকে দিয়ে দিয়েছি।শীতে কষ্ট পাচ্ছিল।”অপ্রতিভভাবে বলল বহ্নি।
-”আর এগুলোর মধ্যে হোয়াট আর ইউ উইলিং টু গিভ আপ?”
বহ্নি রিভলভার,একটা পেন আর শাড়ী ব্লাউজের সেটটা এগিয়ে দিল।
-”আপনি প্রয়োজনীয় জিনিস না এনে এভাবে….”চন্দ্রিল প্রতিবারই সেন্টেন্স শেষ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন কোনো কারণে।
সম্ভবত বহ্নির ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বল্পতা দেখেই একটু নরম হয়ে বললেন,”জায়গার ব্যাপারটা ছাড়াও,আরেকটা বিষয় থেকে যায়।এই ইন্টেলেকচুয়ালিজম বস্তুটা একজন পার্টি ক্যাডারের পক্ষে খুব হেলদি নয়।এত বই নিয়ে ঘুরলে যারা মুভমেন্টের মূল চালিকা শক্তি তারা ভয়ে ভক্তিতে আমাদের থেকে দূরে সরে যাবে।ডিক্লাসমেন্ট ব্যাপারটা এত সোজা নয়,বুঝি।কিন্তু আপনাকে এভাবে বলতে খারাপই লাগছে…এই পর্যায়ে যে আমাকে এগুলো বলতে হচ্ছে এটা খুবই আনফরচুনেট।”
বহ্নি ব্যথিত মুখে চুপ করে রইল।এটাই তার চরিত্রের একমাত্র দুর্বলতা।মানে চন্দ্রিলের ভাষায় ইন্টেলেকচুয়ালিজম। একটা কথা ভেবেই খারাপ লাগছে যে জি এসের সাথে প্রথম অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎটা এই রকম খারাপ পর্যায়ে চলে গেল।
-”ঠিক আছে,উঠি আজকে।”চন্দ্রিল বেরিয়ে যাচ্ছিলেন,বহ্নি তাঁকে এগিয়ে দিতে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিল,হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন,”এভাবে আপনি বেশীদিন সার্ভাইভ করতে পারবেন না।কিছুদিনের মধ্যেই ঠাণ্ডা পড়বে।আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজনের সাবসিস্টেন্স টুকুও সঙ্গে রাখেননি অথচ…… আপনার যা যা দরকার প্রদীপকে লিখে পাঠিয়ে দেবেন।আর এই লাইব্রেরিটার কিছু ব্যবস্হা করুন।আসছি।লাল সালাম।”

জিএস আজ প্রথম থেকে তাকে ‘আপনি’ বলে গেলেন।এটা কিসের শাস্তি দিচ্ছেন তিনি?একটা মাথা ফাটিয়ে দেওয়া অস্হিরতা বহ্নিকে সারারাতের জন্য গ্রাস করে রাখল।ঐ রাতটা এবং তারপরবর্তী অনেকগুলো রাত সে ঠিক করে সেইভাবে ঘুমোতে পারল না যাতে পরদিন মাথা ধরা বা ঝিম ভাব না থাকে।তখন কি জানা ছিল এই বিনিদ্র রাত্রিগুলো একদিন নিয়মে পরিণত হবে!

(ক্রমশ)

দ্রোহকাল ৯
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments