প্যাঁচের শিরোনাম! দেখেই "বড্ড বোরিং ব্যাপার" বলে কাটিয়ে দিয়ে যদি না থাকেন, তবে চুপিচুপি বলি, আসলে আমিও এই প্যাঁচালো ব্যাপার নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছি। সেই চিন্তার জট খুলতেই আপনাদের সাথে জটটা ভাগ করে নিতে আগ্রহী হলাম। এসবের কি আর কিছু অ্যাবসলোউট রায় দেওয়া যায়? হাজার ধর্মের হাজার মত, আবার নীতিবোধও স্থান কাল পাত্র অনুযায়ী পালটে পালটে যায়। এই দেখুননা, নীতিবোধের উপরের খোলস, যাকে আমরা বলি "ভদ্রতা", সেটারই কেমন হরেক জায়গায় হরেক রূপ। কোনো দেশে পাবলিক প্লেসে হাঁচি পেলেও হাঁচতে হয় "হ্যাঁচ্চোক্সকিউজ মি!" বলে, আবার কোনো দেশে পাবলিক প্লেসে অন্যকে কনুই মারাটাই নর্ম, না মারতে পারলে বরং আপনার চাপ আছে!
 

 

নীতিবোধ, বা মোর‍্যালিটি… ব্যাপারটা নিয়ে আমরা অনেকেই সচেতন, আবার অনেকে এসবের তোয়াক্কাও করেননা, নিজের ভালটাই ভাবেন কেবল। তাঁদের আমরা বলি স্বার্থপর। ওদিকে ডারউইন সাহেব যে বলেছেন আমরা সবাই স্বার্থপর, তার কি হবে? অথবা রিচার্ড ডকিন্সের সেলফিশ জিনের গল্পটাই বা কি দাঁড়াচ্ছে?

এইখানে এসে নাস্তিক "মানবতাবাদী"দের হোঁচট খেতে হয়। তবে আমরা যে সবাই দিব্যি মিলেমিশে আছি, একে অপরের ভাল চাইছি, অন্যায় কাজ না করারই চেষ্টা করছি পারতপক্ষে, এসব কি তাহলে আরোপিত? এই সুযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েন "ধর্মবাদী"রা। ধর্মের অস্তিত্ব না থাকলে যে সভ্যতা অ্যাস অফ অ্যাস-এ চলে যাবে, সেই তত্ব ঝাড়তে থাকেন। স্বর্গে সুখলাভের ইনসেন্টিভ বা নরকের কড়াইতে ভাজা ভাজা হবার ভয়ই আমার নীতিবোধের উৎস, এই তাঁদের বক্তব্য। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়াচ্ছে?

ধর্মের অস্তিত্ব না থাকলে মানুষ নীতিহীন হয়ে অন্যায় কাজ করতে থাকবে, এই কথা যে সত্যি নয় তা বর্তমান পৃথিবীর নাস্তিক-প্রধান দেশগুলোর উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হয়।  পঞ্চদশ শতক নাগাদ ইউরোপে যখন লোকে বলতে শুরু করল যা করব এ জীবনেই করে যাব, কৃচ্ছ্রসাধন করে পরজন্মে সুখলাভের আশায় নয়, সেটাকে কিন্তু আমরা বিপদসঙ্কেত হিসেবে দেখিনা, নবজাগরণের শুরু বলে থাকি।

তাহলে এই নীতিবোধ বা মোর‍্যালিটি আসলে কি? কিভাবেই বা তার শুরু? আধুনিক যে ধর্মগুলো আমরা দেখি, সেগুলো তো মাত্র কয়েক হাজার বছরের পুরোনো, মানুষ তো পৃথিবীতে এসেছে তার বহু বহু বছর আগে। তখন কি ধর্ম ছিল না? ছিল হয়তো অন্য ফর্মে, কিন্তু সেই ধর্মেরও উদ্ভব হবার আগের সময়, যখন মানুষ গুহাবাসী, তখন কি তাদের কোনো নীতি ফিতি ছিল না? যে যাকে পারত কেলিয়ে দিত? না। তখনো মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ ছিল। তখনো তার সকলে মিলে কাজ করার, একে অপরকে সাহায্য করার টেন্ডেন্সি ছিল। আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে যদি আমরা দেখি অন্য জীবজন্তুদের, তাহলে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হবে। অনেক জীবজন্তুই দল বেঁধে থাকে, নির্দিষ্ট জীবনশৈলী মেনে চলে, একে অপরের ক্ষতি তো না-ই, বরং সাহায্য করে। একে কি মোর‍্যালিটি বলা চলে?

এ নিয়ে বিশদে গবেষণা করেছেন ডাচ বিজ্ঞানী ফ্রানজ ডি ওয়াল। এমপ্যাথির উৎস কি, এবং জীবজন্তুর মধ্যে সেটা কিভাবে দেখা যায়, এ নিয়ে কয়েক দশক কাজ করেছেন তিনি। ফলাফল বেশ মজার। বেশি লিখবনা, তাঁর বিখ্যাত একটি টক এখানে এমবেড করে দিলাম। নিজেরাই শুনে নিন। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি এই টক টার কনক্লুশনের সঙ্গে একমত হোন বা না হোন, দেখে মজা পাবেন এ গ্যারান্টি দিতে পারি। ফ্রানজ ডি ওয়ালের দুর্দান্ত একটি বই "দ্য বোনোবো অ্যান্ড দ্য অ্যাথেইস্ট" পড়ে দেখতে পারেন, অনেক চিন্তার খোরাক আছে ওতে। 


 

মোদ্দা ব্যাপারটা তাহলে এই দাঁড়াচ্ছে যে জীবজন্তুদের মধ্যেও এমপ্যাথি এবং ফেয়ারনেসের ধারণা আছে, যাকে সব মিলে মোর‍্যালিটি বলাই চলে। সুতরাং পরলোকের মোহ ছাড়াও নীতিবোধের অস্তিত্ব এখানেও দেখা যাচ্ছে। এই নীতিবোধ তাহলে ধর্মভীরুতার দ্বারা আরোপিত নয়, এর অস্তিত্ব অনেক গভীরে। আমার মতে এর উৎস দুরকম হতে পারে। প্রথমত, যেকোনো জীব চায় তার জিনকে টিকিয়ে রাখতে। তাই নিজের প্রজাতির অন্য জীবের ক্ষতি সে করতে চাইবেনা স্বভাবতই, যদি না তা তার নিজের টিকে থাকার পক্ষে অসুবিধাজনক হয়। অপরদিকে, নিজের ক্ষতি যতক্ষণ না হচ্ছে, প্রজাতির অন্যের উপকার করা প্রজাতির পক্ষে লাভজনক। এর ফলে আমরা "স্বার্থপর জিন" এর প্রভাব কাটিয়ে "নীতিবাগিশ" হয়ে উঠতে পারি। দ্বিতীয় কারণটা একটু অন্যরকম। গোষ্ঠীবদ্ধ জীব অপরের ওপর নির্ভরশীল। "আমি ওর ভাল করলে ও-ও আমার ভাল করবে" – এই গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি যদি চালু করা যায়, তাহলে একে অপরের উপকার করার এবং ক্ষতিসাধন না করার একটা ইনসেন্টিভ হিসেবে কাজ করবে। এই জায়গা থেকেই আমাদের "ভাল মানুষ" বা ওদের "ভাল শিম্পাঞ্জি" হবার শুরু। ডি ওয়ালের টকে খেয়াল করবেন কিভাবে একটি শিম্পাঞ্জি আরেকটিকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে, কিন্তু ততক্ষণই, যতক্ষণ অন্য শিম্পাঞ্জিটিও তাকে সাহায্য করছে। এই হল নীতির গোড়ার কথা। নেতাজি পর্যন্ত রক্ত দিলে তবেই তার বদলে স্বাধীনতা দেবেন বলেছিলেন, আমরা তো ছোটোখাটো মানুষ!

এবং এখানেই গান্ধীবাদ শান্তির স্ট্র্যাটেজি হিসেবে প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। চড় খেয়ে যদি অন্য গাল বাড়িয়ে দিই, কেউ অন্যায় করলেও তার বিরুদ্ধে যদি কড়া না হই, তবে তো মোর‍্যালিটির বেসিক জায়গাতেই গড়বড় হয়ে যাচ্ছে। যে গিভ অ্যান্ড টেক পলিসির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে আমাদের ন্যায়-অন্যায়ের বোধ, সেটাই তো ধ্বসে যাচ্ছে! কেউ যদি দেখে সে "অন্যায়" করা সত্বেও আপনি তার ক্ষতি করছেন না, তবে তার "অন্যায়" এর ধারণাটাই হয়ে যাবে বায়াসড, ওই "অন্যায়"টাই হয়ে যাবে "ন্যায়", কারণ মোর‍্যালিটির বিবর্তন বলছে "অন্যায়" এর সংজ্ঞা হল "যা করলে আমিও উলটে কেস খাব", সেই ধরণের কাজ। গান্ধী অবশ্য এই উলটে কেস খাওয়ানোর কিছু উপায় রেখেছেন, উদাহরণ – অসহযোগিতা। কিন্তু ওটুকু কেস খাওয়ানো কি যথেষ্ট? নাকি তা শান্তির বদলে আমাদের এনে যেবে ঘেঁটে যাওয়া এক নীতিবোধ? 

** কার্টুনের স্কেচগুলি নেট থেকে সংগৃহীত।

ধর্ম, নীতিবোধ আর গান্ধীবাদ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments