[এই বারোয়ারী গল্পটি লিখছেন লেখকদল "কতিপয় কচি ভূত"। এই লেখকদলের লেখকেরা আগের বারোয়ারী গল্পের তুলনায় নিয়মগুলি কিছুটা নিজেদের মত করে পালটে নিয়েছেন, নিজেদের মধ্যে আলোচনার পরিসর আগের চেয়ে বেশি রাখা হয়েছে। এই বড়গল্প/উপন্যাসটির প্রতিটি পর্ব প্রকাশিত হবে ১৫দিন অন্তর।]

 

রাত প্রায় বারোটা। আধ ঘণ্টার মধ্যেই গাড়ি চলে আসার কথা। এমনিতেই মিতাহারী, আর অনুষ্ঠান থাকলে তো কথাই নেই, সর্বক্ষণের পরিচারকটি দিন কয়েকের জন্যে ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে, অতএব গলাটা ভিজিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অর্পণ নিজেই মাইক্রোওয়েভে এক কাপ চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নিল। আরেকটু দেরি করে বের হলেও চলত, ষ্টেজে উঠতে উঠতে প্রায় সোয়া তিনটে, রাস্তাঘাট ফাঁকা বলে খুব বেশি হলে আধ ঘণ্টার বেশি লাগার কথা নয়, কিন্তু নালন্দাকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবটা সে নিজেই দিয়েছিল।

সিডি প্লেয়ারে বাজতে থাকা নিজেরই কনসার্টের আওয়াজটা সামান্য একটু কমিয়ে দিয়ে হাতে কফির কাপ নিয়ে অর্পণ বসার ঘরে সেন্টার টেবিলে এসে বসল। যে কোনও অনুষ্ঠানের আগে তৈরি হওয়ার শেষ মুহূর্তে নিজের সঙ্গীত শোনা, বহুদিনের অভ্যেস। এই বসার ঘরটা রাস্তা থেকে একটু দূরে হলেও বাইরের শব্দ কানে আসে।

ঠিক এখন যেমন আসছে। জেগে থাকলে এই আওয়াজটাকে বেশ উপভোগ করে অর্পণ। কেউ খুব জোরে কথা বলছে না, কিন্তু সবার আস্তে আস্তে কথাবার্তা মিলেমিশে একটা অদ্ভুত শব্দ সৃষ্টি হয়, একেই বোধহয় কোলাহল বলে। উল্টোদিকের যে ফুটপাথ জুড়ে এখন হালে গজিয়ে ওঠা মাল্টিপ্লেক্সের লেট নাইট শো ফেরত দর্শকদের আলাপ আলোচনা ভেসে বেড়াচ্ছে,  বছর দশ-বারো আগেও বেশ কয়েকটা পরিবার সেখানে গরমে খোলা আকাশের তলায় আর শীত-বর্ষায় একটা প্লাস্টিকের ত্রিপল দিয়ে তাঁবু খাটিয়ে থাকত। বছর বছর মা ষষ্ঠীর কৃপায় আড়ে বহরে সংসার বাড়িয়ে তোলা ছাড়া অন্য কি কাজ তারা করত সে বিষয়টা অজানা থাকলেও মাঝে মাঝে মাঝরাতে তীব্র ঝগড়ায় তার ঘুম ভেঙে যাওয়া ঠেকাতে অনেক ছোটবেলাতেই যে শোওয়ার ঘরটি বদলে ফেলেছিল সে কথা বিলক্ষণ মনে আছে। যদিও বাড়ির মূল গেট থেকে সদর দরজার মাঝে প্রায় ফুট দশেক দূরে, তবু অর্পণ এই সমস্যায় ভুগত। এখনকার আওয়াজে তীব্রতা তুলনায় কম হলেও অর্পণ আর ফিরে আসেনি।

কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রাখতেই কলিং বেল বেজে উঠল। অর্পণ বুঝতে পারল গাড়ি এসে গেছে। তবু একবার জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল একটা সাদা জাইলো উঁকি মারছে। আরও একবার কলিং বেল বেজে উঠতেই দরজা খুলল। বাঁশির ব্যাগ বসার ঘরে এনেই রাখা ছিল। অর্পণের নির্দেশে ড্রাইভার ব্যাগটি নিয়ে জানতে চাইল ডিকিতে রাখলে অসুবিধে আছে কিনা। সম্মতি পেতেই সে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। অর্পণ বাড়ির সবক’টা দরজা ঠিকঠাক বন্ধ আছে কিনা দেখে সদর দরজায় তালা মেরে গেটের কাছে এগিয়ে গিয়ে মোবাইলের এসএমএস-এর সাথে গাড়ির নাম্বারটা মিলিয়ে নিয়ে পেছনের সিটে বসল। খুব বেশি সময় লাগল না, মিনিট দশেকের মধ্যেই ভিআইপি রোডের ওপর রঘুনাথপুরে অতিথি গেস্ট হাউস, কলকাতায় এলে নালন্দার সাময়িক ঠিকানা।

নালন্দার রেডি হয়েই থাকার কথা ছিল, তাও অর্পণ ফোন করার পরে প্রায় পনের মিনিট কেটে যাওয়ার পরেও সে আসছে না দেখে আবার ফোন করতে গিয়ে দেখল ফোন ব্যস্ত। বাধ্য হয়েই অর্পণ নেমে রিসেপশনে যেতেই চোখে পড়ল নালন্দা নামছে। তাকে দেখে হেসে বলল – "কি হল? ভাবছিলে অন্য কারও সাথে কেটে পড়লাম কিনা?" অর্পণ কথাটার জবাব না দিয়ে বলল – "তাড়াতাড়ি চল, কখন থেকে ওয়েট করছি।"

- "তোমার এই ঘণ্টা দুয়েক আগে থেকে অডিটোরিয়ামে গিয়ে কি লাভ হয় তা তুমিই জান, আমরাও তো পারফর্ম করি, কে যায় তোমার মত?"
- "কে কি করে আমার অজানা, তবে আমি করি।"

গাড়ির কাছে যাওয়ার আগেই ড্রাইভার এগিয়ে যে খবর দিল তার জন্যে কেউই প্রস্তুত ছিল না। গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। কাউকে যদি একটু ঠেলার জন্যে পাওয়া যেত। নালন্দা কিছু একটা বলতে যেতেই অর্পণ তাকে থামিয়ে দিল, মৃদু স্বরে জানিয়ে দিল এত রাতে মাথা গরম করে লাভ নেই। বরং সময় নষ্ট না করে অন্য কিছু ব্যবস্থা করা দরকার।

- "স্যর, এজেন্সিকে ফোন করলে ওরা আরেকটা গাড়ি পাঠিয়ে দেবে।"
- "কিন্তু আসতে তো সময় লাগবে।"
- "হ্যাঁ স্যর তা লাগবে।"
- "কতক্ষণ?"

ড্রাইভার ফোনে কথা বলে অর্পণকে জানালো প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে কারণ গাড়ি এই মুহূর্তে আছে গড়িয়ায়। চল তাহলে ভেতরে গিয়ে বসি – নালন্দার কথায় অর্পণ কান না দিয়ে একটু এগিয়ে গেল। তারপরেই ড্রাইভারকে ডেকে একটু দূরে একটা ট্যাক্সি দেখিয়ে বলল ডেকে আনতে। ত্রিশ টাকা বেশি দিতে হবে, এই শর্তে অর্পণ রাজি হয়ে যেতেই ড্রাইভার দুজনের ব্যাগ ট্যাক্সির ডিকিতে তুলে দিল।

——————————

একদিন দিনের প্রথম প্রহরের প্রথম ঘণ্টায় শুরু হয়ে দ্বিতীয় দিন একই সময়ে শেষ হতে চলা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কন্ঠসঙ্গীত এবং যন্ত্রানুষঙ্গের মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া মোট আটটি কনসার্টের ‘দ্য কমন ওয়ান’ সারা বিশ্ব জুড়েই অত্যন্ত সমাদৃত। গত কুড়ি বছর ধরে একটানা চলে আসা এই কনসার্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জুড়ে হলেও ভারতে এই প্রথম। অত্যন্ত নামীদামী শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানে অংশ না নিলেও এই কনসার্টে বাজিয়ে পরে নাম করেছেন এইরকম শিল্পীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। নালন্দার এটাই প্রথম অ্যাপিয়ারেন্স হলেও অর্পণের এই নিয়ে তৃতীয়বার। মস্কো এবং অন্টারিওর পর নিজের শহর কলকাতা।

নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামের ভিআইপি গ্রিনরুমে নালন্দার একটু জড়সড় ভাব দেখে অর্পণ মুখ খুলল – "কি ব্যাপার নন্দা? টেনশন হচ্ছে?"

- "সে তো একটু হচ্ছেই।"
- "তুমি তোমার নিজের মত বাজাবে, লাস্ট রিহার্সালে বেশ ভালই বাজিয়েছ।"
- "কিন্তু আর কেউ তো এখনও এল না, একটা বেজে গেছে।"

নালন্দার কথা শেষ না হতে হতেই হইহই করে ঢুকল হৃতিক রাজ আনন্দ, ইরফান আকমল, রনি ফার্নান্ডেজ এবং অবিনাশ সইকিয়া। ঢুকতে ঢুকতেই ফুট কাটল একজন – নন্দা, তোমায় করব রানী অপুতলে। অর্পণ কথাটায় পাত্তা না দিয়ে বলল  

- "কি ব্যাপার? তোদের মুম্বাই অভিযান বেশ সাক্সেসফুল মনে হচ্ছে?"
- "সে আর বলতে। তবে আমার কি মনে হচ্ছে জান অপুদা, অর্পণ চক্রবর্তীর বাঁশি, হৃতিক রাজ আনন্দের সন্তুর, নালন্দা দেশমুখের স্যাক্সোফোন, ইরফান আকমলের অর্গ্যান সঙ্গে তবলায় রনি ফার্নান্ডেজ আর ড্রামে অবিনাশ সইকিয়া একটা ফাটাফাটি ব্যাপার হতে চলেছে আজকে ইন্ডিয়াতে!"

রনির রসিকতায় সবাই হেসে উঠতেই নালন্দা বলে উঠল – "সে সবই তো বুঝলাম, আর যে বেচারারা ভোকাল দেবে, তাদের কথা বললে না তো?"

- "আরে ওরা তো আছেই, তবে দর্শক তো সাড়ে তিনটে থেকে ভোর হওয়া পর্যন্ত এই ছ’টা লোকের জন্যেই জেগে থাকবে, নয় কি?"
- "ফ্র্যাঙ্ক সিমন্সের বোসানোভার পরে আমাদের ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিকাল কলকাতা খাবে তো?"
- "আরে ইয়ার, দিজ শো ইজ রানিং সাক্সেসফুলি অ্যাক্রস দ্য গ্লোব সিন্স লাস্ট টোয়েন্টি ইয়ার্স, ক্যান ইউ শো অর হ্যাভ ইউ হার্ড ওয়ান, অনলি ওয়ান ইন্সট্যান্স অফ সাচ ফেইলইওর?"
- "ইউ আর রাইট, বাট ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট ইট’স ইন্ডিয়া, অ্যাবভ অল কলকাতা, দ্য মোস্ট কনজার্ভেটিভ ওয়ান…"
- "হোয়াটএভার মে বি, আই স্ট্রংলি বিলিভ, দ্য কনসার্ট উইল বি হাইলি অ্যাপ্রিসিয়েটেড হিয়ার অলসো!"

এই রকমই টুকরো টাকরা কথা গড়াতে গড়াতে ঘড়ির কাঁটা সোয়া দুটো ছুঁতেই গ্রিনরুমের আবহাওয়া বদলে গেল। যে যার নিজের বাজনা শেষবারের মত চেক করে নিল। পৌনে তিনটের সময় সপ্তম কনসার্ট শেষ হওয়ার আগেই গ্রিনরুম থেকে যাবতীয় ইন্সট্রুমেন্টসহ ব্যাকষ্টেজে পৌঁছে গেল সবাই।

কাঁটায় কাঁটায় সোয়া তিনটেয় সাউন্ড চেকিং শেষ হয়ে সাড়ে তিনটের সময় সামনের পর্দা সরে যেতেই পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ডে ফুটে উঠল শেষ হয়ে আসা রাতের আকাশ। ঘোষণা শেষ হতেই পশ্চিমদিকে ঢলে পড়া তারার দলের সামনে ললিত রাগে শুরু হল সমবেত কন্ঠে তরানা। একদম ক্ষীণ আওয়াজ বাড়তে বাড়তে প্রেক্ষাগৃহে ছড়িয়ে পড়ে ভোরের আহ্বান জানিয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে মিশে গেল মুক্তছন্দে সমবেত কন্ঠের রবীন্দ্রসঙ্গীত – ডুবি অমৃতপাথারে। কণ্ঠসঙ্গীতের শেষে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা, যেন ধ্যানে বসার প্রস্তুতি। সন্তুরে শুরু হল আলাপ। এরপরে বাকি যা পড়ে থাকে তা যেন সমুদ্রের হৃদয় থেকে সূর্যের জেগে ওঠার এক ছবি। একের পর এক ঢেউ ওঠা, আছড়ে পড়া, ভোরের আকাশের রঙের সাথে সাথে বদলাতে থাকা এক উত্তাল সাগর ধরতে চাওয়া এই কনসার্টের একদম শেষ পর্বে যেখানে বিভাস ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে ফুটে ওঠে বিলাসখানি টোড়ি, সেখানেই বোঝা যায় অর্পণ চক্রবর্তীর মুন্সিয়ানা। শুধুমাত্র বাঁশি দিয়ে এইরকম একটা পরিবর্তন ধরা, এইটুকু শুনতেই হয়ত কোটি কোটি মাইল হেঁটে যাওয়া যায় বলেই সঙ্গীত রসিকদের ধারণা।

কিন্তু আজ কি সে জায়গাতেই এসে ছন্দপতন ঘটল! বিলাসখানি টোড়ি-তে প্রবেশ করে বাঁশি যেন ঠিক সুরে লাগছে না মনে হচ্ছে! দর্শকাসনে ওঠা গুঞ্জন কি কানে পৌঁছল অর্পণের!!

- "তরুদা, তরুদা, হোয়াটস হ্যাপেন? এনিথিং রং?"

হৃতিক রাজ আনন্দের কথার জবাব দিতে চেয়েও পারল না অর্পণ। একটা আকস্মিক হতভম্ব অবস্থা, বাঁ দিকে সাজিয়ে রাখা সারিবদ্ধ তবলাগুলি এদিক ওদিক অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে দিয়ে অর্পণ নুইয়ে পড়ল।

——————————

 

শেষ ডিসেম্বরের বৃষ্টি-ভেজা ঠাণ্ডা রাত, শহরের রাস্তা শুনশান। মাঝে মধ্যে দু-একটা ট্যাক্সি হুউশ করে রাস্তার পাশে জমা কালো জল ছিটিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। সোডিয়াম ভেপারের ঘোলাটে আলোয় ঘুমন্ত সাপের মত শুয়ে আছে ভেজা রবীন্দ্র সরণি। চওড়া রাস্তার দু’ধারের বৃদ্ধ বাড়িগুলো শীতের চোটে একে অপরের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ভূতের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। এরকমই একটা বাড়ির তিনতলার ছোট ঘরের খোলা জানলা দিয়ে ষাট ওয়াটের বাল্বের মিয়ানো আলোর সঙ্গে মৃদু ফিসফিসানির মত ভেসে আসছে এক কমনীয় পুরুষ কণ্ঠস্বর “…জানি, আমার এসব কথা লোকে শুনলে খারাপ ভাববে… কিন্তু আমার যে কিছু করার নেই, তুমি তো বোঝো সবই… তোমার শরীরের প্রতিটা রোমকূপে আমার নিষ্পাপ ঠোঁটের দাগ তার সাক্ষী, বৃষ্টির মত… তোমার জন্য আমি এই পচে যাওয়া নোংরা সমাজটা কে অস্বীকার করতে প্রস্তুত, প্রস্তুত আমি তোমার জন্য রাধা হতে…” ১০৩.৪ এফ.এম. তিলোত্তমায় আর.জে. অনিরুদ্ধ একজন ব্যর্থ প্রেমিকের চিঠি পাঠ করছিল। পাঠের মধ্যেই একটা গান ফেড ইন করে ঢুকে পড়ল, আকাশনীল সেনের গলায় অখিলবন্ধুর গানের রিমেক, “কেন তুমি বদলে গেছ, বলোনা, আগেকার সহজ হাসি, যখন তখন হাসো না…”

টিএনটি রেডিওটা বন্ধ করে দিয়ে অ্যাশট্রের ওপর থেকে নিভে যাওয়া জয়েন্টটা ধরিয়ে নিয়ে জানলার কাছে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে, কিন্তু উত্তরে হাওয়ারা বুলেটের মত খোলা জানলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে এখনও। নীল আলোর ঝলকানি আর সাইরেনের তীব্র ওঁয়াও ওঁয়াও শব্দ তুলে একটা অ্যাম্বুলেন্স ছুটে গেল আর.জি. করের দিকে। বৈঠকখানা ঘরের গ্রান্ডফাদার্স ক্লকে রাত এগারোটা বাজলো। টিএনটি হাতের শেষ হয়ে আসা জয়েন্টে একটা লম্বা টান মেরে উদাস চোখে দূরের আলোকোদ্ভাসিত অন্ধকার আকাশটার দিকে তাকিয়ে ছিল। উৎকৃষ্ট মনিপুরী গঞ্জিকার উগ্র গন্ধটা পাক খেতে খেতে জানলা দিয়ে বেরিয়ে রাতের খয়েরীতে মিশে যাচ্ছে নিঃশব্দে। নেতাজী ইন্ডোরের ঘটনাটা এখনও তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘটনাটা এতই আকস্মিক ও মর্মান্তিক যে তার প্রভাবটা চট করে কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। একটা যেন ঘোর লেগে রয়েছে এখনও। সেই সন্ধ্যের সাত সুরের সহস্র আলোকমালিকার জৌলুসের শেষ লগ্নে অর্পণ চক্রবর্তীর বাঁশির সুরে যখন নতুন সকালের আগমনী ঘোষিত হচ্ছে, শিল্পী তাঁর অভ্রান্ত শৈল্পিক মুন্সিয়ানায় যখন কোমল ধৈবত থেকে কোমল নিষাদ ছুঁয়ে লম্বা মীড় নিয়ে শুদ্ধ মধ্যমে পৌঁছে বিলাসখানির টোড়ির ধ্যানস্থ রূপের প্রকাশে হৃদয়ের অভ্যন্তরে ফুটিয়ে তুলছেন এক অপার্থিব আলোর রেখা, তখন কি তিনি আদৌ জানতেন যে আধ ঘন্টা পরেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে লাশকাটা ঘরের শীতল শাদা অন্ধকার! আমির খান সাহেবের মৃত্যুর দিনটার কথা মনে পড়ছিল টিএনটির। সেদিন একটা ঘরোয়া জলসা থেকে বাড়ি ফেরবার পথে সন্ধ্যেতে গাওয়া বসন্ত বাহারের বন্দিশটাই গুনগুণ করে ভাঁজছিলেন তিনি, সাদার্ন অ্যাভিনিউ এর চাপ চাপ কুয়াশার ভেতর দিয়ে পঙ্খীরাজের মত উড়ে চলছিল তাঁর গাড়ি… তারপরেই… 

দরজায় মৃদু ধাক্কার শব্দে টিএনটির ভাবনার জ্বাল ছিঁড়ে যায়। বন্ধ দরজার ওদিকে থেকে বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে

- “তিলু, খেয়ে নে, খাবার ঢাকা আছে রান্নাঘরে!” 

- “আমি খাবো পরে, দেরী আছে মা, তুমি খেয়ে নাও।”

- “আমি তো সেই সোন্দেবেলাতেই দুদ-খই খেয়ে নিইচি। আজ তো একাদোশী…”

- “ও আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে… তুমি শুয়ে পড়ো।”
- “খেয়ে নিয়ে মাছের কাঁটা গুলো সব বাইরে ফেলে দিও, ছুঁচো ইঁদুরের যা উৎপাত… থালা থেকে টেনে টেনে নিয়ে গিয়ে সব ওই কত্তা মশাইয়ের ঘরের আলমারির তলায় জড়ো করবে…”

- “আচ্ছা, ঠিক আছে ঠিক আছে, তুমি শুয়ে পড়ো তো…”

- “হ্যাঁ, করতে তো হয়না কাউকে, আমারই হয়চে যতো জ্বালা…”

বন্ধ দরজার পেছন থেকে বৃদ্ধা মায়ের গজগজ চলতে থাকে, কিন্তু টিএনটি আর কথা বাড়ায় না। জানলাটা ভেজিয়ে দিয়ে সে তার ঘরের বড় কাঠের আলমারিটা খোলে। থাক থাক করে অজস্র কাগজের খাপে মোড়া পুরনো আমলের রেকর্ড সাজানো। তার মধ্যে থেকে বেছে বেছে সে একটা ৭৮ আর.পি.এম রেকর্ড বের করে আনে ও তার ঘরের গ্রামাফোন রেকর্ড যন্ত্রে বসিয়ে সুইচ অন করে। একটা ঘষঘষ শব্দের সঙ্গে একটা প্রাচীন নারী কণ্ঠে গান শুরু হয়। টিএনটি রেকর্ডের কভারটা পড়ে দেখে, জোহরাবাঈ আগ্রেওয়ালি, রাগ কেদারা। বিচিত্র তানের মার প্যাঁচের মাধ্যমে গায়িকা বার বার “চতুর সুঘর বালমা” এই অন্তরায় ফিরে ফিরে আসছেন, টিএনটি শোনে। তার বাবার খুব সখ ছিল গান বাজনার, বিশেষত কালোয়াতী, টপ্পা, ভজন, ঠুমরী এইসব। এই গানের প্রেমে বা প্রেমের গানে তিনি এমনই মজেছিলেন যে গরানহাটার নামকরা বাইজীদের বাড়িতেই তাঁর যৌবন প্রৌঢ়ত্বের অনেকটা সময় কেটে যায়। শোনা যায় সোনাগাছি লেনের বেশ কয়েকটা বাড়ির খাজনা তাঁর তহবিল থেকেই যেত। শেষ বয়সে পক্ষাঘাতে কাবু হয়ে বাড়িতে বন্দী হয়েও তাঁর গানের নেশা কমল না। তখন শুরু হল গ্রামাফোন আর রেকর্ড কেনার ব্যারাম। নিজে তো বেড়তে পারতেন না, হাতিবাগানের পুরনো রেকর্ডের দোকানের নিশিকান্ত বাবু বাড়ি এসে প্রায় দুগুণ তিনগুণ দামে রেকর্ড দিয়ে যেতেন। শেষের দিকে তো রেকর্ড কোম্পানির অবাঙালী বাবুদেরও যাওয়া আসা ছিল, এসব টিএনটি ছোটবেলায় নিজের চোখে দেখেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি টাকা-পয়সা সবই প্রায় চলে যায়, পাঁচ ভুতে লুটে পুটে নেয় যে যেরকম পারে। কেবল এই ভাঙাচোরা ভুতুড়ে বাড়িটা রয়ে যায়। আর বাবার পুরনো কয়েকজন সুদের খাতকের যৎসামান্য টাকার অংশ। আর এর সঙ্গে রয়ে যায় তিন চার আলমারি ভর্তি ঐ সমস্ত রেকর্ডগুলো। টিএনটি একমাত্র ছেলে হিসাবে উত্তরাধিকার সূত্রে এইসব দুষ্প্রাপ্য খাজানার মালিকানা পায়, কারণ ওগুলোর দিকে কারুরই বিশেষ নজর ছিলোনা।

ছোটবেলা থেকে রাত দিন কানের সামনে এইসব রেকর্ডগুলো বাজবার ফলে সে, টিএনটি, না চাইতেই অনেক কিছু শিখে ফেলেছিল। যদিও ঐ শোনা টুকু ছাড়া আর বেশী কিছু হয়ে ওঠেনি। প্রফেশনাল গোয়েন্দাগিরির রহস্যময় পাড়ায় ভ্রমণ করতেই সে ভালোবাসে, সদ্য চল্লিশে পা দেওয়া টিএনটির মাথার চুলে কিছু কিছু পাক ধরলেও তার মগজটা এখনও বেশ ভালোই প্রখর ও সচল। তাই প্রথাগত চাকরী বাকরির সন্ধান না করে বিভিন্ন বই, পুরনো ম্যাগাজিন, কেস স্টাডি ইত্যাদির স্তুপের মধ্যে সে এই তিন তলার ঘুপচি ঘরেতেই তার নিজস্ব পৃথিবী রচনা করেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথম দিকে রুটি রুজির তাগিদে কিছুটা দিশেহারা অবস্থায় পড়লেও এইসব দুষ্প্রাপ্য রেকর্ড যে অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয় সেটা যেদিন থেকে সে জানতে পারে সেদিন থেকে আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মা-ছেলের এই ক্ষুদ্র ও জৌলুশহীন সংসার চালানোর জন্য যেটুকু যা প্রয়োজন তা ওইক’টা সুদের টাকা আর রেকর্ড বিক্রি করেই ম্যানেজ করে আসছে এযাবৎ। কদ্দিন চলবে তা অবিশ্যি বলা মুশকিল, কিন্তু এখনও চলছে এবং আগামী আরও বেশ কিছুদিন চলে যাবার মত রসদ আছে। টিএনটি গান শুনতে শুনতে কিছু একটা চিন্তা করে নেয়। গানটা শেষ হলে সে রেকর্ডটাকে মুছে আবার খাপে ঢুকিয়ে তার ঝোলা ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। কাল একবার আমহার্স্ট স্ট্রীটের দোকানটায় যেতে হবে।

——————————

 

আজ অনিরুদ্ধর মন মেজাজ ভাল নেই। তার অফিসের নানাজনের ছ্যাঁচড়ামো, নোংরা পলিটিক্স অনেকদিন ধরেই চলছে, আজ দেবলীনাও এরকম করবে সে ভাবেনি। রাত্রে বাড়ি ফিরে ইস্তক মনটা তেতো হয়ে আছে। আসলে যতই শক্ত মনের হোক সে, কাছের মানুষরা দুর্ব্যবহার করলে একটা আঘাত লাগেই।

অনিরুদ্ধ ছোটো থেকেই ডাকাবুকো। অনেকে বলে সে নাকি ভীষণ ঠোঁটকাটাও। কেউ কিছু ভুল করছে মনে হলে মুখের ওপর যাচ্ছেতাই ভাবে বলে দেয়। এমন কি তার এমপ্লয়ার সুভাষবাবুকেও রেয়াত করে না। এ জন্য অনেকে তাকে যেমন ভালবাসে, তেমনি অনেক শত্রুও তৈরি করেছে এই ক’বছরের পেশাদার জীবনে। বছর সাতেক আগে মিউজিকে এম.এ করে যখন চাকরির সন্ধান করছে, তখনই ওর এক বন্ধুর কথায় উৎসাহিত হয়ে গানবাজনার লাইনে কেরিয়ার তৈরি করার কথা ভাবে। সেই বন্ধু নিজে গানবাজনার লাইনের না হলেও গানের কদর বোঝে, নানারকম গান সম্পর্কে ধারণাও রয়েছে। অনিরুদ্ধর সঙ্গীতপ্রেমের কথা জেনে সে-ই ওকে বলেছিল “কি ম্যাড়ম্যাড়ে সরকারী চাকরি করবি? তার চেয়ে তোর যেটা ভাল লাগে সেটাই কর না!” তা অনিরুদ্ধ প্রোফেশনাল লাইনে বছর কয়েক সঙ্গীতসাধনার চেষ্টা করে যেটা বুঝতে পারে তা হল টালিগঞ্জের ইন্ডাস্ট্রিতে ধরে ঢুকিয়ে দেওয়ার “দাদা” বা “কাকা” না থাকলে হালে পানি পাওয়া সম্ভব না। হয়তো সম্ভব হত যদি তার ভয়ঙ্কর রকমের প্রতিভা থাকত। সেই এলেমও নেই, পয়সা খাওয়ানোর মত সঙ্গতিও নেই, নেহাতই মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে সে। বছর দুয়েক চেষ্টা করে এই করাপশনে তিতিবিরক্ত হয়ে যখন ছেড়েছুড়ে আবার চাকরির পরীক্ষায় বসবে ভাবছে তখনই তার আলাপ হয় দেবলীনার সঙ্গে!

দেবলীনার সঙ্গে প্রেম করতে শুরু করার পর ওর মেসো সুভাষ দত্তর এই ১০৩.৪ এফ.এম তিলোত্তমায় জয়েন করার সুযোগ চলে আসে হঠাৎই। পুরোনো গানকে আধুনিক উপায়ে রিমেক বানানোর কাজ করছেন যেসব শিল্পী, তাঁদের গান নিয়ে সুভাষবাবুর পরিকল্পিত একটি অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে তিনি খোঁজ করছিলেন এমন একজন আর.জে-র যার পুরোনো গান সম্পর্কে ভাল জ্ঞান আছে, অথচ আধুনিক অ্যারেঞ্জমেন্টের সঙ্গে পরিচিত এবং এবং একই সঙ্গে আধুনিক দর্শকদের মন বুঝতে সক্ষম। দেবলীনাই রেকমেন্ড করেছিল অনিরুদ্ধকে। রিস্ক নিয়ে অনিরুদ্ধকে নিয়োগ করলেও সুভাষবাবুর গ্যাম্বলটা খেটে গেছে বলতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী এফ এম গুলোর রিমেকের অনুষ্ঠান কেউ শোনে না, প্রাইম টাইমে অনিরুদ্ধর “নতুন করে পাবো বলে” এখন সুপার ডুপার হিট।

কিন্তু বাইরে থেকে দেখে একজন সফল মানুষকে যতটা সুখী মনে হয়, আসলে বোধহয় ততটা কখনোই হয়না। ওই সাফল্যের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকে হাজারো তিক্ততা। আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে কালসাপ, কে যে কখন পিছন থেকে ছোবল মারবে, বলা মুস্কিল। তবু অনিরুদ্ধর ভরসা ছিল আর যে যাই করুক, অন্তত দেবলীনা তার পাশে দাঁড়াবে। নাহ, কাউকেই বুঝি ভরসা করতে নেই…

আর ভাবতে ভাল লাগছে না। শরীরটা গরম হয়ে উঠেছে। শীতের রাতেই তার চারতলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল অনিরুদ্ধ। ই এম বাইপাসের লম্বা লম্বা ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় ভর করে কুয়াশার পরীরা নেমে আসছে একে একে। একটু আগেই ওর টেবল ক্লকটা টিক টক আওয়াজ করে জানিয়ে দিয়েছে আরো একটা তারিখ পালটে গেল। অনিরুদ্ধর বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কষ্ট হতে থাকে। এই আলো-আঁধারির জীবন আর কতকাল বয়ে বেড়াতে হবে? কিন্তু সত্যির সামনে দাঁড়াবার মত সাহস তার নেই। অস্তিত্বের এই তীব্র দ্বিমুখী সংকটে সে প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে। অথচ দেবলীনার প্রতি এই দু বছরে তার একটা মায়া জন্মে গেছে। এই মায়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় তার জানা নেই। রাতবাতির আলো শুষে নেওয়া উজ্জ্বল অন্ধকারে দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে। আজকের ঘটনার পর দেবলীনারও কি মন খারাপ? নিশ্চয়ই না। তবু এমনটা ভাবতে ভাল লাগে।

এই ভাবনা থেকেই মনে হল একবার ফোন করে দেবলীনাকে। করবে কি করবে না কয়েকবার ভেবে শেষপর্যন্ত তিক্ততা হার মানল ইচ্ছেটার কাছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে ফোন নম্বরটা ডায়াল করল অনিরুদ্ধ…

 

——————————

 

সকাল বেলা “সুপ্রভাত” লেখা এসএমএস-টা যখন এসেছিল তখন কি ভেবেছিল দিনটা এরকম বাজে যাবে? দেবলীনার সকাল মানে অবশ্য বেলা ১১টা। রাত করে ঘুমোনো অভ্যেস। অফিসের শিফট শুরু হয় দুপুর থেকে। সেই এক্কেবারে রাত দশটায় ছুটি। অফিসে গিয়ে অবধি শুধু ঝামেলা আর ঝামেলা। অমলিনদের লবি বহুদিন থেকেই ওদের পিছনে লেগেছে। ওদের হিন্দি পপের অনুষ্ঠানটা যেনতেনপ্রকারেণ শিফট করে প্রাইম টাইমে নিয়ে আসার চেষ্টা করে চলেছে। সোজা উপায়ে তো করতে পারবে না, তার জন্য দেবলীনা আর অনিরুদ্ধর প্রোগ্রাম দুটোকে যতরকম ভাবে পারে বাঁশ দেবার চেষ্টা।

প্রথম প্রথম এই চাপা রেষারেষি ভালই লাগত দেবলীনার। রোজকার একঘেয়ে কাজের মধ্যে একটু উত্তেজনার খোরাক। সেই সঙ্গে ওর কাজে কেউ জেলাস, এটা ভাবতেও ভালই লাগে। কিন্তু সুস্থ প্রতিযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেলে ব্যাপারটা তিক্ততায় পর্যবসিত হয়। শুরুতে ছুটকো ছ্যাঁচড়ামো করত, তারপর যখন ওর নামে সুভাষ মেসোর কাছে লাগানো শুরু করল, সেটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল।

এইসবের মধ্যে দীপার ফোন। দুপুর বেলা বেরোতে যাবে, ঠিক সেই সময়ে। বহুদিন যোগযোগ রাখেনি দীপা নিজেই, এদ্দিন বাদে ফোন করেছে মানে বুঝতে হবে কিছু ধান্দা আছে। ফোন ধরা মাত্র ইনিয়ে বিনিয়ে নানারকম কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করা দেখেই বুঝল অনুমান মিথ্যা নয়। কি আর করবে, কোনো রকমে শুনে চলল দীপার ন্যাকামো…

- "কতদিন পর তোর সঙ্গে কথা হচ্ছে! ভাবতেই পারছিনা!"

- "হ্যাঁ। কি খবর তোর? কাজ কেমন চলছে?"

- "কাজ ছেড়ে ফিরে এসেছি ভাই, বড্ড হোমসিক লাগছিল, কলকাতাকে মিস করছিলাম খুব।"

- "সে কি? তোর এই প্রোফেশনাল মিউজিকের অ্যাম্বিশনের জন্য এত চাপ নিয়ে বোম্বে গেলি, আর… যাই হোক, কবে ফিরলি?"

- "এই তো, দু সপ্তাহ হল। অনিরুদ্ধর সাথে দেখা হয়েছিল তো পরশু, বলে নি?"

- "না, ভুলে গেছে হয়তো…"

- "আর বলিস না, সেদিন এক্সাইডের ওখানে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল! আমায় দেখে তো প্রায় ভূত দেখার মত চমকে উঠল! তারপর হলদিরামে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম… তোর কথা জিজ্ঞেস করতে বলল তুই নাকি আজকাল দারুণ বিজি…"

- "ধুস, বিজি ফিজি কিছু না, যেমন হয় আর কি, অফিসের চাপ…"

- "তা বললে হবে না ভাই, তুই এখন ফেমাস, বাংলা এফ এমের কুইন বলে কথা! অ্যাই শোন, এফ এম বলতে মনে পড়ল, একটা হেল্প করতে পারবি?…"  

পথে এসো বাছা, মনে মনে বলল দেবলীনা, আসল ধান্দার কথা বল এবার! মোদ্দা কথা হল বোম্বে গিয়ে গায়িকা-নায়িকা হবার শখ হয়েছিল মহারানীর! সুবিধে করতে না পেরে এখন কলকাতায় ফিরেছে। তার গানের প্রচার করে দিতে হবে। নানারকম ইনিয়ে বিনিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর! কাজের সময় এসব করলে কারই বা ভাল লাগে। যতই ফোন রাখতে চায় দেবলীনা, সে নাছোড়বান্দা!

অফিস পৌঁছতে দেরিই হয়ে গেছিল আজ দেবলীনার। গিয়ে দেখল অনি কে আগেরদিন যে ডিভিডিটা এনে ওর ড্রয়ারে রেখে দিতে বলেছিল সেটা সে রাখেনি। ইন ফ্যাক্ট সে নিজেই এখনও অনুপস্থিত! রাত অবধি বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করবে, তারপর কাজের বেলায় এরকম কেয়ারলেস। ইন ফ্যাক্ট এই বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করার ব্যাপারটাই অপছন্দ দেবলীনার। কানাঘুষোয় সে শুনছে অনির নাকি ওর পুরুষবন্ধুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আচরণ করার অভ্যেস আছে। ওর এক পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের মত কিছু একটা ভাসা ভাসা ব্যাপার শুনে ফেলেছিল সে একবার অফিসে। ক্যান্টিনে বসে প্রোডাকশানের সুজয়, তথাগতরা এই নিয়ে অশ্লীল হাসি ঠাট্টা করছিলো, দেবলীনা ঢোকা মাত্র আলোচনাটা ধামাচাপা পড়ে যায়! সেই বন্ধু নাকি আবার কোন এক ডিটেকটিভ! এইসব ক্রিপি ব্যাপার স্যাপার ভাবলেই গা-টা গুলিয়ে ওঠে দেবলীনার। অনি-কে সরাসরি কনফ্রন্ট করলে সে অবভিয়াসলি অস্বীকার করেছে। কিন্তু এ সব ব্যাপার একবার মনে ঢুকলে চট করে বেরোবার নয়।

বেশ কিছুদিন হল দেবলীনার মনে হচ্ছে এই সম্পর্ক আর টিকবে না। শুধু প্লেটোনিক প্রেম এভাবে কদ্দিনই বা টেকে? রিসেন্টলি যতবার সে অ্যাপ্রোচ করেছে, অনি কোনো না কোনো ভাবে এড়িয়ে গেছে। এসব থেকে আরোই সন্দেহ বাড়ে। অথচ অনি-কে এই নিয়ে বেশি কিছু বলাও যাবে না। এখন দেবলীনার মনে হয় সে এই জাল থেকে বেরোতে পারলে বাঁচে। তার বয়স কম, নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগের অভাব নেই। আর আজকের ঘটনার পর তো… না থাক… এসব সে আর ভাববে না।    

পাশের ঘরে বাবা মা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘড়ির দিকে তালিয়ে দেখল রাত বারোটা পনেরো। ওর ঘুমোতে এখনো অনেক দেরি। গল্পের বইটা নিয়ে বসল দেবলীনা। হার্মান গুয়েন্থারের “দ্য সেভেন্থ উওম্যান”। ইরোটিক থ্রিলার। যেটুকু পড়েছে, বেশ লাগছে। এতরকম ভাবে যে বিষপ্রয়োগ করা যায়, তা তার ধারণার বাইরে ছিল।

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠে চমকে দিল ওকে! মোবাইল স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখল – অনি! বুকের মধ্যের দুরুদুরুটা সামলে নিয়ে মনটাকে যতটা সম্ভব শক্ত করে দেবলীনা ফোনটা তুলল। কিন্তু অনিরুদ্ধর গলা তো শোনা যাচ্ছেনা। বেশ কয়েকবার হ্যালো বলেও সাড়া পাওয়া গেল না ওদিক থেকে। কানেকশনের সমস্যা হয়তো। কেটে দিয়ে কল ব্যাক করতে রিং টোন শোনা গেল। কিন্তু ফোন ধরল না অনিরুদ্ধ। বেজেই গেল… বেজেই গেল ফোন…

 

ওদিকে পাটুলির ১৩/৮ ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে তখন অনিরুদ্ধর অবশ হয়ে আসা হাতের মুঠোয় ধরা যন্ত্রটায় বেজে চলেছে “ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কি সংগীত ভেসে আসে…”

——————————

 

ট্রামলাইন পেরিয়ে টিএনটি কে আসতে দেখে আমহার্স্ট ষ্ট্রীটের রেকর্ডের দোকানের হালদার বাবু উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। এমনিতে মাছি তাড়ানো ছাড়া সারাদিনে আর বিশেষ কাজকর্ম নেই। খদ্দের তো হয়না, ওই মাঝে সাঝে দু-একজন উৎসাহী বা অকর্মণ্য লোক যেতে যেতে থমকে যায়, উল্টে পাল্টে দু একটা রেকর্ডের কভারের ছবি দেখে নিয়ে আবার হাঁটা লাগায়। ক্যাসেটের প্রাদুর্ভাব হবার পর থেকেই গ্রামাফোনের বাজার লাটে উঠেছে, আর এখন এই সিডি ডিভিডি হওয়াতে তো আরোই পোয়া বারো। তবু দোকানটা বেঁচে আছে কেবল কিছু পাগলাটে রেকর্ড কালেক্টরের জন্যেই। আর কিছু রেকর্ড কোম্পানির লোকজন আলে কালে আসে, বিশেষত পুজোর সিজনে নতুন সিডি ডিভিডির কালেকশান বের করার জন্য রেয়ার গানের বা কালেক্টরের বাড়ির ঠিকানার খোঁজে। ফুটপাতের পাশে ছোট্ট গুমটি দোকান, ভেতরে বসার জায়গা টায়গা নেই, বাইরে থেকেই যা কিছু করতে শুনতে হয়। দোকানের মধ্যে তাকের ওপর থরে থরে সাজানো কাগজের খাপে মোড়া রেকর্ড, বেশীর ভাগ পপুলার আশা কিশোর হেমন্ত রফির হিন্দি বাংলা, কিছু নিখিল ব্যানার্জি, বিলায়েত, আলি আকবর, ভিমসেন, আমীর খাঁ, চৌরাশিয়া, শিবকুমার শর্মা ইত্যাদি ক্লাসিক্যাল খেয়াল ইন্ট্রুমেন্টাল এইসব। কয়েকটা কানা কেষ্ট ও ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কীর্তনের, শম্ভু মিত্রর আবৃত্তির, আর বাকি সব বিটলস, পিঙ্ক ফ্লয়েড, জিম রিভস, রোলিং স্টোনস ও আরও অজস্র অচেনা আজানা সব বিলিতি গানের রেকর্ড। টিএনটি রাস্তা পেরিয়ে দোকানের সামনে এসে পৌঁছয়।      

- “নমস্কার ঠাকুর মশাই, এতো কাল পরে পায়ের ধুলো পড়লো তাহলে?”

- “হ্যাঁ ওই আরকি, এদিকে তেমন আর আসা হয়না তো। আপনার খবর ভালো তো?”

-“আমার আর খবর! বাজারের যা অবস্থা তাতে দু মুঠো খেয়ে পরে বাঁচবার আর উপায় রাখলেন না কত্তা…”

টিএনটি প্রমাদ গনে। প্রত্যেকবার দোকানে এলেই এই একঘেঁয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে শুনতে কান পচে গেছে তার! এদিকে বুড়ো মানুষকে মুখের ওপর কিছু বলাও যায় না। হুঁ হাঁ করে যেতে হয়। বুড়োর সংসারের হাজার একটা দুঃখের ফাটা রেকর্ড বাজতে থাকে…

-“ছোট মেয়েটার একটা কন্যাশ্রী জোটানোর জন্য, বুইলেন কিনা, কাউন্সেলরের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হয়ে গেলাম। আর বলেন কেন মশাই, গেলেই কেবল অন্য কথা বলে। বাপ পিতেমোর করে যাওয়া ওই টুকুনি একখানা বাড়ি, সেটাও নাকি ভেঙে দিয়ে আপদরা ফ্ল্যাট না কি করবে, সেই নিয়ে পড়েছে… তা ইয়ে একটু চা খাবেন তো নাকি?”

টিএনটি একটা সুযোগ পায়। “না দাদা, আজ খুব তাড়া, একবার পোস্টাপিসে যেতে হবে… ও ভালো কথা, একটা পিস ছিল, দেখবেন নাকি?”

হালদার কিছুটা উদাসীন ভাবে বলে “আছে? দেখান দেখি?”

টিএনটিও যেন কিছুটা গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে “দেখি আবার এনেচি কিনা। ব্যাগেই তো ছিল মনে হয়,” বলে তার ঝোলা ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ হাঁতড়ে জোহরাবাই এর রেকর্ডটা বের করে এনে হালদারের হাতে দেয়। হালদার মুখটা কুঁচকে অনেকটা অনিচ্ছা নিয়ে লেবেলটা পড়ে অস্ফুটে মন্তব্য করে “ও বাবা কালোয়াতি, এসব নেবার আর লোক কই!” টিএনটি ঘড়ি দেখে রাস্তার ওপারে তাকিয়ে একটা বিড়ি ধরায়।

দু তরফের এই উদাসীনতার খেলাটা বেশ মজার। ভাবখানা এমন যেন ব্যাপারটায় কারুরই বিশেষ আগ্রহ নেই। এদিকে দুজনেরই মন ছোঁকছোঁক করছে, অথচ সেটা প্রকাশ করা যাবে না। করলেই লস! যে যত উদাস ভাবে দরাদরিটা করতে পারবে তারই জিত!

এইসময় টিএনটির মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। রঞ্জন, তার স্যাঙাৎ কাম একমাত্র বন্ধু। ওরই মত বাউন্ডুলে, ফ্রীল্যান্স ফোটোগ্রাফি করে গ্রাসাচ্ছাদন করে।

টিএনটি ফোনটা ধরে, “বলো হে”। ওদিক থেকে রঞ্জনের থমথমে গলা ভেসে আসে “কোথায়?”

- “এইত্তো একটু বেরিয়েছি”

- “দেখা করতে হবে, আর্জেন্ট!”

- “অ, তা তুমি কোথায়?”

- “তোমার বাড়ির নীচে।”

- “আরে সেকি! তাহলে বাড়িতে বোসো, আমি আধ ঘন্টার মধ্যে ঢুকছি।”

- “না না বাড়িতে ঢুকবো না, একটা জায়গায় যেতে হবে, তুমি কোথায় আছো বলো, আমি আসছি।”

- “কি ব্যাপার কি? খারাপ কিছু?”

- “হুম, গিয়ে বলছি। লোকেশানটা বলো…”

টিএনটি রঞ্জনকে নিজের লোকেশান জানায় এবং মিনিট পনেরোর মধ্যে রাস্তার ওপারে রঞ্জন এসে হাজির হয়। টিএনটি হাত নেড়ে তাকে দাঁড়াতে ইশারা করে। হালদারের হাত থেকে পাঁচশ টাকার নোট দুটো নিয়ে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে হালদার কে বলে “পরের মাসে আসবো, একটা ভালো বাংলা আছে, আর্টিস্টের নাম শুনলে ভিরমি খেয়ে যাবেন। তবে সে মাল এত জলের দরে হবেনা আগেই বলে দিলাম।”

হালদার উদাস মুখে বলে “আসবেন”।

একটা ট্যাক্সি ক্যাঁচ করে ব্রেক কষে থামে দোকানের সামনে। পিছন ঘুরে টিএনটি দেখে একজন সৌম্যকান্তি ভদ্রলোক ট্যাক্সি থেকে নেমে হালদারের দোকানের দিকে এগিয়ে আসছেন। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, পরনে ধুতি পাঞ্জাবী, সোনার চেন, হাতে পালিশ করা ছড়ি, আইভরি!

- “মালদার ব্যক্তিটি কে?” – নিচু গলায় হালদারকে জিজ্ঞেস করে টিএনটি।

- “উনি বিশ্বজিত বাবু, মাঝেসাঝে আসেন এখানে। গানবাজনার বড় সমঝদার!”

বলতে বলতে ভদ্রলোক এসে দাঁড়ান কাউন্টারে। একটা অদ্ভুত মিষ্টি ঝাঁঝালো আতরের গন্ধ টিএনটির নাকে এসে লাগে। হালদারের হাবভাব দেখে মনে হয় টিএনটি এবার বিদেয় হলেই সে খুশি হয়। “আসি আজ”, বলে টিএনটি ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নেমে পড়ে। সম্ভবত কোনও বড় সড় রেকর্ড কালেক্টর, টিএনটি ভাবে। চাল চলনে বেশ একটা জমিদারী হাবভাব রয়েছে, এরকম ধরণের বিত্তশালী প্রাচীন মানুষদের মধ্যেই এখনও গ্রামাফোনের কদরটা রয়ে গেছে। এরকম ধরণের লোকই তো টিএনটি খুঁজছে, তার এইসব দুর্মূল্য রত্নের প্রকৃত মূল্য দিতে এইসব লোকই পারে, এই হালদারের সঙ্গে দু পাঁচশ টাকার জন্য দরাদরি করা কি আর তাকে মানায়! হাতে সময় থাকলে এঁর সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করা যেত, কিন্তু তা আর এখন হবার না। টিএনটি লোকটিকে একবার মেপে নিয়ে রঞ্জনের দিকে এগিয়ে যায়। 

——————————

 

টিএনটি আর রঞ্জন যখন অনিরুদ্ধর পাটুলির ফ্ল্যাটে পৌঁছল ততক্ষণে ডেডবডি পুলিশ ভ্যানে ওঠানো হয়ে গেছে। গড়িয়া থানার মেজবাবু প্রবীর জোয়ারদারের সঙ্গে টিএনটির আগেই আলাপ ছিল। তিনি নিজে এসে পরিবারের লোকজনকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। আরও দুজন সাদা পোশাকের পুলিশ ঘরের এদিক ওদিক পরীক্ষা করে দেখছে। একজন ফটোগ্রাফার বিভিন্ন জিনিসের ছবি তুলছে। টিএনটি কে দেখে জোয়ারদার একটা হাসি দিয়ে উঠে এলেন।

- “আপনি এখানে?”

- “হ্যাঁ আমার পরিচিত”, টিএনটি সংক্ষেপে জানায়, “কিছু পাওয়া গেছে?”

- “নাহ, তবে সুইসাইড বলেই মনে হচ্ছে। ডিপ্রেসানের কেস…”

- “কিভাবে?”

- “সেটা পাওয়া যায়নি। ফরেনসিকে না গেলে বোঝা যাবেনা। বডিতে কোনও মার্ক নেই…”

- “ফ্যামিলির লোকজন…?”

- “কেউই সেরম কিছু বলতে পারছেনা। কোনও মোটিভ নেই… ওই যে গার্লফ্রেন্ড…” জোয়ারদার দেবলীনার দিকে দেখায়। টিএনটি দেখে ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে একটি সুন্দরী মেয়ে ডাইনিং এর সোফায় বসে রয়েছে। কান্নাকাটির চিহ্ন নেই মুখে, শক্‌ড! টিএনটি ঘরের চারিদিকটা একবার নজর করে নিয়ে বলে “লোকেশানটা?”

- “ব্যালকনি, আসুন”, বলে জোয়ারদার ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যায়। টিএনটি ফলো করে। সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট, কোথাও কোনদিকে দুর্ঘটনার কোনও চিহ্ন নেই। ব্যালকনিতে একটা ইজি চেয়ার ও পাশে একটা ছোট টেবিলে মদের বোতল ও আধ খাওয়া গ্লাস, অ্যাস্ট্রে, সিগারেটের প্যাকেট।

মেঝের কোণে পড়ে আছে একটা সিগারেটের শেষাংশ আর একটা লাইটার। জোয়ারদার বলে, “এখানেই পড়ে ছিল বডি, হাতের কাছেই মোবাইলটা ছিল, লাস্ট ডায়ালড নাম্বার ওই, ইয়ে…” জোয়ারদার চোখের ইশারা করে। টিএনটি বলে, “জানা গেল কখন?”

-“সকালে কাজের লোক এসে দরজা ধাক্কা ধাক্কি করে না পেয়ে গেটকিপারকে জানায়। তার আগে ময়লা নিতে আসার লোকও গেটকিপারকে বলেছিল বেল বেজে গেছে, কেউ খোলেনি। গেটকিপারের সন্দেহ হওয়াতে সোসাইটির সেক্রেটারিকে ফোন করে। তারপর…” জোয়ারদার একটা সিগারেট ধরায়, টিএনটিকেও অফার করে। টিএনটি সিগারেট ধরিয়ে ইজিচেয়ার আর টেবিলটাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলে,

-“হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। আজকাল এসব তো হচ্ছে খুব…”

-“হ্যাঁ! তা আর বলতে। মাসে তিন চারটে কেস আসছে বিলো ফর্টি হার্ট অ্যাটাকের। পুলিশের আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, তাই নিয়ে দৌড়ও… তবে এ কেসটা একটু ধোঁয়াশা লাগছে… রেডিওতে কাজ করতো, সারাদিন বকবক করে না? সেই। তাতে আর স্ট্রেস কি আছে? তার ওপর মেয়েটা এখনও মুখ খোলেনি সেভাবে। রেপুটেড ফ্যামিলি, চোটপাট তো করা যায় না দুম করে। না হলে এতক্ষণে…”

টিএনটি মদের গ্লাসটা টাচ না করে শুঁকে দেখে, দামি হুইস্কি। কিং সাইজ সিগারেটের প্যাকেট, সদ্য সিল খোলা হয়েছে। অ্যাস্ট্রে ফাঁকা।

জোয়ারদার একটু গলা খাঁকরি দিয়ে বলে, “তা আপনার সঙ্গে কিভাবে…”

টিএনটি নির্লিপ্ত মুখে ডাহা মিথ্যে বলে দেয়, “এক কমন ফ্রেন্ডের বিয়েতে আলাপ হয়েছিলো, তারপর দু একবার এখানে সেখানে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। ওনার রেডিওর প্রোগ্রামটার নিয়মিত শ্রোতা আমি। তাই খবরটা পেয়েই…”

জোয়ারদার মৃদু হেসে বলে “আপনার আবার ফ্রেন্ড ট্রেন্ডও রয়েছে আর আপনি তাদের বিয়েতেও জান! বাব্বা জানা ছিলোনা তো…”

টিএনটিও মুখে একটা কাষ্ঠ হাসি এনে বলে, “নেহাতই বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে কয়েকবার। বোঝেনই তো…”

জোয়ারদারের মোবাইলটা বেজে ওঠে।

টিএনটি বলে “আমরা উঠি তাহলে আজ।” সে আর রঞ্জন বেরিয়ে পড়ে। যাবার আগে সকলের অলক্ষ্যে সে টুক করে একটা জিনিস পকেটে পুরে নেয়। 

——————————

 

বিকেল হতে না হতেই মেঘ জমতে শুরু করেছিল সারাদিন ধরে তেতে থাকা আকাশটার ঈশান কোণে। দীপা ব্যালকনিতে বসে দ্রুতগতিতে প্রকৃতির বদলে যাওয়ার দিকে লক্ষ্য রাখছিল। আসলে গ্রাম্য পরিবেশে এই দৃশ্য অনেকবার উপভোগ করলেও কলকাতা শহরের স্কাইলাইন ফুঁড়ে ওঠা লম্বা লম্বা টাওয়ারগুলোর ফাঁক দিয়ে ব্যাপারটা কেমন লাগে সেটা জানার জন্যে সে অনেকদিন ধরেই উৎসুক ছিল। এমন নয় যে কলকাতায় আসার পরে এই জিনিসটা এই প্রথম হচ্ছে, কিন্তু নানা ব্যস্ততায় আর দেখা হয়ে ওঠেনি। সেদিন খানিকটা আকস্মিক ভাবেই সুযোগ এসে যেতে হাতছাড়া করতে নিতান্তই অনিচ্ছুক ছিল। কালবৈশাখীর ঝড় থেমে যাওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল তুমুল বৃষ্টি।

প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে তৈরি হওয়া নতুন শপিং মলে কেনাকাটা করতে আসা বা অন্য কোনও কারণে ঘুরতে আসা মানুষজনের ধারণার বাইরে ছিল যে এই রকম বৃষ্টি হঠাৎ নামতে পারে। প্রচন্ড হাওয়ার সাথে তোড়ে নেমে আসা জলের ধারা, বেশ মায়াময়ী লাগছিল শহরটাকে। ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে দীপা খানিকটা অন্যমনস্ক ভাবেই তাকিয়েছিল যেই যুগলের দিকে যারা বৃষ্টির তোয়াক্কা না করেই উল্টোদিকের ফুটপাথ বরাবর হাঁটতে শুরু করল। সেই তাকিয়ে থাকাটাকে আড়াল করেই একটা সাদা রংয়ের টয়োটা ইনোভা এসে থামতেই খেয়াল করল গাড়ি থেকে নেমে আসা যাত্রীটিকে। চিনে নিতে বিন্দুমাত্র সময় লাগেনি তার। আগে হলে হয়ত সে দরজা খুলেই অপেক্ষা করত, কিন্তু সেদিন কলিং বেল বেজে ওঠার আগে পর্যন্ত সে দরজা খোলাটা নেহাতই অপ্রয়োজনীয় মনে করেছিল।

- “তুমি এখন এই বৃষ্টির মধ্যে?”

- “হ্যাঁ, আসলে কথাটা তো আমি ফোনেই বলতে পারতাম, তবে সেটা একটু অসুবিধের ছিল…”

- “তা, কি এমন সে অজানা জরুরি কথা যেটা বলতে এই অবস্থায় এতটা পথ উজিয়ে আসতে হল?”

দীপার গলায় তাচ্ছিল্যের সুরকে একেবারেই আমল না দিয়ে আগন্তুক জানতে চাইল – “তাহলে তুমি মুম্বইতেই পাকাপাকি ভাবে থেকে যেতে চাইছ?”

– “ইজ দেয়ার এনি কনফিউশন?” একটু শ্রাগ করে সিগারেটের ধোঁয়াটা ইচ্ছে করেই অতিথির মুখের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে প্রশ্ন করল সে।

- “ভাল করে ভেবে দেখ আরেকবার।”

- “তোমাকে তো আমি আগেই বলেছি যে আমি ভেবেই কাজ করি, এছাড়া বিনীত যথেষ্ট হেল্পফুল ছেলে। এর মধ্যেই বেশ কিছু কন্ট্যাক্টস আমার জন্যে এস্টাব্লিশ করে ফেলেছে।”

- “আর আমি যেখানে যেখানে তোমায় রেকমেন্ড করেছিলাম?”

- “হোয়াই? হু টোল্ড ইউ টু ডু সো? ওয়ান্না হ্যাভ আ ড্রিঙ্ক? উই মে সেলিব্রেট ইওর আনকলড অ্যাটেনশন!”

- “নো। থ্যাঙ্কস। কথাটা মনে থাকবে আমার!"

- “হাও লং? আর মনে রেখেই বা করবে কি? কি ছিঁড়ে নেবে আমার? মুম্বইতে কে চেনে তোমায়? করো তো টাউটারি!”

- “টাউটারি… আগন্তুকের আহত গলার স্বর খাদে নেমে আসে।”

- “বেশ, দেখা যাক… চলি… উইশ ইউ অল দ্য বেস্ট!”

যে রকম ভাবে এসেছিল, সেভাবেই ভেজা রাস্তা দিয়েই মিলিয়ে যায় সাদা রংয়ের ইনোভা।

——————————

 

এই সমস্ত অতীত যত ভুলে থাকা যায় ততই ভাল। কিন্তু এই শীতের সন্ধ্যেবেলা ক্রিস্টমাস উপলক্ষে সেজে ওঠা মায়াবী শপিং মল আবার সেসব মনে করিয়ে দিল। ভুলে থাকার উদ্দেশ্য নিয়েই ঘরে ঢুকে টিভিটা অন করে দীপা।

আওয়ার নেক্সট কন্টেস্টেন্ট নীতা… নীতা বনসল ফ্রম ডেলহি!

বেরিয়ে গিয়েও দর্শকদের ভোটে ফিরে আসা নীতা। মেয়েটা গাইছে ভালই। অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। টিভি-র দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড়িয়ে ওঠে দীপা – “কিন্তু ক’দিন আয়ু, এইরকম একটা দিন তো দীপারও ছিল। ঠিক এরই মত অডিয়েন্স পোলে ফেরত আসা, কিন্তু তারপর…?” নেহাত দীপার পিতৃদেব টের পেয়েছিলেন যে মুম্বইতে একমাত্র মেয়ের কেরিয়ার কোন খাতে বয়ে চলেছে এবং বোনের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে পুত্রের বিবাহ পরবর্তী সময়ে আন্তরিক অনীহা! মূলত দূরদৃষ্টির ওপর ভর করেই মারা যাওয়ার আগে কলকাতা শহরে তার জন্যে একটি ওয়ান বিএইচকে ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন ভদ্রলোক যাতে অন্তত খাওয়াদাওয়ার সংস্থান করার সাথে সাথে মাথা গোঁজার একটা ছাদের সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে তার একমাত্র কন্যাটি বাঁচতে পারে।

এক, দুই, তিনের মধ্যে আসতে না পারলেও পঞ্চম স্থান, এটাই বা পারে ক’জন? দীপা পেরেছিল একটি সর্বভারতীয় চ্যানেলের নামী রিয়েলিটি শো-তে। প্রতিযোগিতার প্রথমদিকে দীপার কন্ঠে ‘বড়া নটখট হ্যায় নন্দলালা’ শুনে স্বয়ং আশা ভোঁসলে একদিন বিচারকের আসন থেকে উঠে এসে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ব্যাকস্টেজে ফিরে গিয়ে হাতটা মুঠো করে ছুঁড়ে দিয়েছিল সে – ইয়েস, আই মেড ইট। আশেপাশে দুয়েকজন যারা সেই দৃশ্য দেখেছিল তারা যে খুব ভালভাবে ব্যাপারটা নিয়েছিল এমন নয়। বিশেষ করে গ্র্যান্ড ফিনালে যেদিন ফস্কে গেল সেদিন তো কয়েকজনের চোখেমুখে খুশির ঝিলিকও চোখে পড়েছিল। আজও একটা আফসোস রয়ে গেছে দীপার মনে। ইশ সেদিন যদি প্রথমে চয়েস করা গানটাই গাইত, তাহলে হয়তো… ‘দিলবর দিল সে প্যারে’ ফুটিয়ে তোলার মত যথেষ্ট দক্ষতা যে সেইসময় তার ছিল না, সেটা অনেকবারই পরে মনে হয়েছে। তবু খবরের কাগজের তৃতীয় পাতায় বড় করে ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছিল। এইরকম একটা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় পঞ্চম স্থান অধিকার করাও যে একটা অ্যাচিভমেন্ট সেটা প্রায় পাখিপড়ার মত করে শিখিয়ে দিয়েছিল সবাই মিলে। আরও ছিল বিনীত গোস্বামী। ওই রিয়েলিটি শোয়ের পারকাশনিস্ট। “দীপা, ওই যে গানটা গেয়ে তুই বাদ পড়লি সেটাই তো গাইতে হবে, আর এইসব রিয়েলিটি শো-ফো কিছু না, মুম্বইতে থাক, কামড়ে পড়ে থাকতে পারলে প্রচুর চান্স” – রোখ চাপিয়ে দিয়েছিল এই কথা। অতএব কেরিয়ার হিসেবে এটাই চাই। অলকা ইয়াগ্নিক, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি তো আর রিয়েলিটি শোতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আজকে এই জায়গায় পৌঁছয়নি।

গান ব্যাপারটা জন্মসূত্রেই পেয়েছিল দীপা। মা ছিলেন রেডিও শিল্পী, অসময়ে জীবনাবসান না হলে হয়ত বি-হাই-টাও করে নিতে পারতেন। বাবা নিজে গান না গাইলেও সঙ্গীতপ্রেমী। অতএব তার মতো আর পাঁচজন মেয়ে যখন ক্লাস নাইনে ওঠার পর থেকেই ভাবতে শুরু করেছিল এরপর কি, দীপা তখন সেসব ভাবেনি। আইএসসি পাস করেই সোজা চলে গিয়েছিল শান্তিনিকেতনে সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা করতে। সফল হয়েছিল সে যাত্রা। আর প্রথম প্রথম লঘু সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ একটা আকর্ষণ বোধ না করলেও পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরে পরেই যোগ দিতে শুরু করল একের পর এক রিয়েলেটি শো-এর অডিশনে।

বেশ কিছু রিয়েলেটির অডিশন থেকেই ছিটকে যাওয়ার পরে দীপা বুঝতে পেরেছিল যে শুধুমাত্র ভারতীয় ধ্রুপদীসঙ্গীতে দক্ষতা নিয়ে খেলা করার জায়গা এটা নয়। তার সাথে অন্য ধারার গানেও সমান দক্ষতা থাকা জরুরি এবং সেটা অর্জন করতে হয়। সেই লক্ষ্যে ছুটতে গিয়ে তাকে যথেষ্ট আত্মত্যাগ করতে হয়েছিল। এমনকি ছেড়ে দিতে হয়েছিল বেশ কিছু ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর।

আরবসাগরের জল যে বেশ লোনা সেটা টের পেতে দীপার খুব বেশি সময় লাগেনি। যে বিনীত গোস্বামীর কথায় নেচে সে মুম্বই পাড়ি দিয়েছিল সে যে আদতে একটা মুখোশআঁটা ধান্দাবাজ দালাল, এটা আগে বুঝতে পারলে হয়ত দীপার সঙ্গীত কেরিয়ার অন্যখাতেও বইতে পারত। অথচ শুধু অর্পণ নয়, আরও বেশ কিছু শুভানুধ্যায়ীর কথা সে অগ্রাহ্য করেছিল। সেদিন দীপা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনি, পিওর ক্ল্যাসিক্যাল গায়করা কি লাইট গায় না? সে কি প্রথম নাকি যে এই পথে পা বাড়াচ্ছে! তাহলে তো বলতে হবে তার সাহস আছে! আজ অবশ্য মনে হয়, তখন পূর্বাশ্রমের সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ত্যাগ করে যাওয়াটা বোধহয় ভুলই হয়েছিল।

সেদিন তো অনেকেই বাধা দিয়েছিল। যে কোনও একজনের কথাও যদি শুনত !! আফসোসটা রয়েই গেছে। শুধু কলকাতা কেন, অর্পণ তো এমনকি মুম্বইতেও ধাওয়া করেছিল।

- “দ্যাখ, দীপা, তুই যে এই হাজার হাজার ওয়াটের আলোর ফোকাসে দাঁড়িয়ে আছিস, আসলে তোর চোখ ধাঁধিয়ে গেছে, বাইরের অন্ধকারটা দেখতে পাচ্ছিস না, যেদিন এই লাইট ফেইড হয়ে যাবে, সেদিন বুঝবি। তার চেয়ে তোর ট্যালেন্ট আছে, নিজের জায়গায় চলে আয়। হ্যাঁ, প্রচুর নাম, তুই যেটা ভাবছিস রাতারাতি হবে, সেটা সময় নেবে, কিন্তু স্যাটিসফেকশন আছে। আচ্ছা বল তো, ক’জন, ক’জন এই রিয়েলিটি থেকে উঠে এসে দাঁড়িয়েছে?”

- “বড্ড অবান্তর বকছিস তুই!”

- “অবান্তর! এই স্টেজের বাইরে কিন্তু জাজেস প্যানেল পাঁচজনের নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের, সেখানে অডিয়েন্স পোল নেই, দুটোই কথা হয় বেঁচে থাকো নয় মরে যাও, খুঁটে খাওয়ার দরকার নেই, একটার পরে দুটো গানে মার্কেট পাবি না, জাস্ট ফুটে যাও। আর এমন তো নয় যে তুই একেবারে স্টেজ পাচ্ছিস না, মাসে একটা-দুটো তো হয়েই যাচ্ছিল, এখনও টাইম আছে…”

একসময়কার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে কার্যত বিতাড়িত হয়ে অর্পণও আসেনি আর কোনওদিন বোঝাতে। তবু কলকাতায় ফেরার মাসখানেক আগে অর্পণকে ফোন করেছিল। ভেবেছিল, অতীতে যাই ঘটে থাকুক, একসময়ের বান্ধবীকে সে ফেরাতে পারবে না, কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু কথা বলেই বুঝতে পারল অর্পণ সেদিনের অপমান ভোলেনি, সরাসরি না বললেও ঘুরিয়ে বলে দিয়েছিল তার পক্ষে এখন কিছুই করা সম্ভব নয়, তবে দীপা যেন যোগাযোগ রেখে চলে, সুযোগ পেলে সে নিশ্চয় কিছু একটা করবে, আর এর মধ্যে যদি কিছু সুযোগ এসে যায়, সে নিজেই ফোন করে নেবে। মুম্বইয়ের জীবনযাত্রায় দিন কাটিয়ে এইসব টিপিক্যাল কথাবার্তার অন্তর্নিহিত অর্থ কি হতে পারে সেটা দীপার খুব ভাল করেই জানা থাকলেও এইসব কথা অর্পণ কবে রপ্ত করেছে তা ভেবেই দীপা বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল। “দীপান্বিতা মজুমদারকে অত আন্ডারএস্টিমেট করিস না অর্পণ, সে কি করতে পারে আর কি না পারে সেই নিয়ে তোদের আইডিয়া নেই,  ফর ইওর ইনফো আমি কিন্তু একেবারে শূন্য হাতে ফিরছি না” – হিসহিসিয়ে শেষ কথাটা বলেই লাইনটা কেটে দিয়েছিল দীপা। নাঃ অর্পণের ফোন আর আসেনি। খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় দুয়েকবার যোগাযোগ করতে গেলেও অর্পণ ফোন তুলে কথা বলার সৌজন্যটুকুও দেখায়নি।

——————————

 

গোটাকয়েক বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক, একটা মডার্ন মিউজিক শেখানোর স্কুলে ক্লাসপ্রতি চুক্তি, আর পুজো আচ্চার সিজনে গ্রাম গঞ্জের দিকে কয়েকটা মাচা-জলসা, এই সম্বল করেই দীপার কলকাতায় ফেরত আসা। আড়ালে অনেকেই ‘মুম্বই-ফেরত’ বলে টিপ্পনি কাটলেও দীপা কিছু বলত না। কাল অনিরুদ্ধর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবার পর কথা বলে প্রথমে মনে হয়েছিল সে হয়তো হেল্প করবে। “ওসব কথায় কান দিস না” – দীপা মেনে নিয়েছিল অনির কথা। সেই অনিই কি অদ্ভুতভাবে তাকে ব্যঙ্গ করল এফ.এম-এ কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা তুলতেই। অথচ সেদিন দীপা নয়, অনিরুদ্ধই তাকে ডেকেছিল –

- “আরে দীপা না!”

- “আরে তুই!”

- “এই একটু শিশির মঞ্চে একটা কাজ ছিল। তুই ফিরলি কবে? চল না কোনো একটা কফিশপে গিয়ে বসি!”

পাশের একটা কফিশপে বসে অনিই অর্ডার দিয়েছিল কফির। দীপা পেমেন্ট করতে চাইলেও সে রাজি হয়নি।

- “তারপর বল ফিরে এলি কেন?” 

- “সেরকম কিছু না, ওখানে আর পোষাচ্ছিল না, এখন যা সব চলছে, এইগুলো গান! ওর চেয়ে এখানে ভাল অফারও আছে, গেয়ে সুখ আছে, পয়সা হয়ত একটু কম, কিন্তু মানসিক স্বস্তিটাও তো ইম্পর্ট্যান্ট।”

নানান কথার ফাঁকে দীপা কায়দা করে বলেছিল – “তুই তো এখন উড়ছিস। ফাটফাটি ব্যাপার তোর এখন, দেখিস না যদি কিছু হয়, মানে এই নয় যে তোদেরটাতেই, অন্য কোথায়ও যদি ওপেনিং থাকে।”

মুহূর্তে অনির মুখের চেহারা পাল্টে গিয়েছিল – “আসলে ওটা তো দেবলীনার মেসোর প্রজেক্ট, ওর সাথেই কথা বলে নিস, নাম্বার আছে তো?”

- “তা আছে, তবে তুই যদি একবার…”

- “ঠিক আছে, দেখব। বাই দ্য ওয়ে একবার যাত্রার লাইনটা ট্রাই করতে পারতিস তো…”

কথাটা দীপার মোটেই ভাল লাগেনি শুনতে। তবু মুখে কিছু না বলেনি সে।  ততক্ষণে কফিও শেষ হয়ে গেছে। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে অনিরুদ্ধর উঠে পড়ার জন্যে উসখুসানি দেখে “তাহলে আজ ওঠা যাক” বলে দুজনেই বাইরে বেরিয়ে দীপা সিগারেটের প্যাকেট বের করে – তুই কফি খাওয়ালি, তোকে অন্তত একটা সিগারেট খাওয়ানো তো আমার ডিউটির মধ্যেই পড়ে, এই নে…

- “হুঁ, বেন্সন অ্যান্ড হেজেস!”

- “ইউ মে কিপ দ্য প্যাকেট অলসো”

- “ওয়াও, থ্যাঙ্কস। বাই দা ওয়ে, এটা আবার দেবলীনা কে বলিস না যেন…”

- “ও হাহা, তাহলে তো বলে দেবোই, বৌকে লুকিয়ে পরনারীর কাছ থেকে সিগারেট খাওয়া!”

- “এই খবদ্দার, সংসারে আর আগুণ লাগাস না প্লিজ, এমনিতেই যথেষ্ট জ্বলছি…”

হঠাতই দীপার মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়, একটা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে সে বলে, “জ্বলছি…” একটু থেমে, “কে নয়?… তবে এই জ্বলুনি আর বেশীদিন থাকবে না, দেখে নিস…”

দীপার এই সাডেন মুড সুইং টা অনির পরিচিত, তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ে।

- “শোন এবার আমাকে উঠতেই হবে, রেকর্ডিং এর সময় হয়ে এলো, এখন আবার সেই অফিস টাইমের জ্যাম ঠেলে যেতে হবে এতোটা…”

দীপা উত্তর দেয়না, একদৃষ্টে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। অনির্বাণ অপ্রস্তুত হয়ে উঠে চলে আসে।

 

শেষমেশ টিভি থেকে ভেসে আসা কান্নার শব্দে দীপার সম্বিৎ ফিরল। কাউকে না কাউকে তো বাদ যেতেই হয়, ঠিক যেরকম দীপাও ভেঙে পড়েছিল কান্নায়। জীবনটাও তো আসলে এরকমই রিয়েলিটি শো, দীপা ভাবে, কে কখন বাদ পড়ে যাবে কেউ জানেনা। অনেক কষ্ট পেয়ে এসব ব্যাপারে সে কেমন নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। মৃত্যুর খবর তাকে আর দুঃখ দেয়না তাই ইদানিং, অন্য কনটেস্ট্যান্ট বাদ গেলে কি আর কেউ কষ্ট পায়? ভাবতে ভাবতে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে দীপার মুখে…

——————————

 

রোববারের সকাল। কুয়াশার ঝাপসা চাদর সরে গিয়ে ঝলমলে রোদ উঠেছে আজ। ট্রামের টং টং মিষ্টি ঘন্টিতে ঘুম ভেঙে আড়মোড়া ভাঙছে শীতের রবীন্দ্র সরণী। ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড়ের চা আর উড়িয়া দোকানের সদ্য ভাজা গরম কচুরির গন্ধ রাস্তা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে সাবেকী বাড়িগুলোর অন্দর মহলে। রঞ্জনও সেই গন্ধ অনুসরণ করে এসে উপস্থিত হয় পাথুরিয়া ঘাটা ষ্ট্রীটের ৩৭৭ নম্বর বাড়িটার সামনে। হাতে তার খয়েরী কাগজের ঠোঙাভর্তি কচুরি আর জিলিপি।       

৩৭৭ নম্বর বাড়িটা বাইরে থেকে দেখলেই তার প্রাচীনত্ব টের পেটে অসুবিধা হয়না। এই বাড়ির ইতিহাস বলতে গেলে আলাদা একটা উপন্যাস লিখতে হয়। দরজা ঠেলে ঢুকে শূন্য ভাঙাচোরা ঠাকুর দালানের সামনেটায় এসে রঞ্জন একবার থামে, চারিদিকটা দেখে নিয়ে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকার ভুতুড়ে সিঁড়িটার দিকে এগিয়ে যায় সে। এই অন্ধকারের ওপরে রয়েছে আরও গভীর এক অন্ধকারের রাজ্য, টিএনটির বৈঠকখানা! অসম্ভব অগোছালো বললেও কম বলা হয়। টিএনটি বাদে কারো ক্ষমতা নেই সে ঘর থেকে কোনো জিনিস খুঁজে বার করে! অথচ সেই ছেঁড়াখোঁড়া বই-খাতাপত্র, পুরোনো ফেলতে না পারা জিনিস আর তাকভর্তি রেকর্ডের ভিড়ের মধ্যে কোন খাঁজে কোন জিনিসটা আছে, সব টিএনটির মগজস্থ। বরং বৃদ্ধা মা মাঝেসাঝে ঘর গোছাতে এসে তার সব “গুছিয়ে রাখা” জিনিস ঘেঁটে দিয়ে ধমক খেয়েছেন! আজকাল আর তিনি ছেলের ঘর নিয়ে কিছু বলতে আসেননা তাই। সেই জিনিসপত্রের স্তূপের মধ্যে বসে হাতের জিলিপির অন্তিম টুকরোটা মুখে চালান করে দিয়ে রঞ্জন বলে

- “পুলিশ তো বলছে হার্ট অ্যাটাক, তোমার কি মনে হচ্ছে?”

- “হুঁ, কি বলছ?” টিএনটি একটু অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দিল, “স্বাভাবিক হার্ট অ্যাটাক? অনিকে আমি চিনতাম, বেশ সুস্থ সবল শরীর ছিল… না হে না, ব্যাপারটা অত সহজ না, আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা এল কিনা খোঁজ লাগাতে হবে।”

- “তোমায় দেখেই জোয়ারদারের মুখটা যেমন বাঙলার পাঁচের মত হয়ে গেল, এই নিয়ে বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে সুবিধে হবে বলে তো মনে হয়না।”

- “সেটা ঠিকই বলেছ। কিন্তু এর শেষ না দেখে আমি ছাড়বনা”, টিএনটির চোয়ালটা অকারণেই কেমন শক্ত হয়ে উঠল। একটা হেল্প করতে পারবে রঞ্জন?”

- “পারব। মনোজদার থ্রু দিয়ে কি করে মুভ করা যায় দেখব। এটাই বলতে চাইছ তো?”

- “এক্স্যাক্টলি!”

ওর মনের কথাটা রঞ্জন বুঝে ফেলেছে দেখে অবাক হলনা টিএনটি। চৌখশ ছেলে সে, নেহাত সাধারণ চাকরি বাকরিতে অরুচি, নইলে অনেক কিছুই করতে পারত জীবনে। তার বদলে পড়ে আছে এই ফ্রি ল্যান্স ফোটোগ্রাফি নিয়ে। টিএনটি ওকে মাঝে মাঝেই ঠাট্টা করে – “কি হে? এই সিল্পো করে আর কদ্দিন? যেভাবে রাস্তায় ঘাটে লোকজনের ছবি তুলে বেড়াচ্ছ, কেউ কোনদিন ক্যালানি না দিয়ে দেয় ধরে!” রঞ্জন এসব গায়ে মাখেনা, মৃদু হাসে। সে জানে টিএনটি যতই হ্যাটা দিক, আসলে তার ছবি তোলার বেশ ভক্ত। “সিল্পোকাকু” বলে লেগ পুলিং করলেও আসলে সে চাকরিবাকরি করলেই বরং টিএনটি দুঃখ পাবে, এ তার ভালই জানা আছে। এককালে ফোটোজার্নালিজম করার সুবাদে নানা মহলে রঞ্জনের যোগাযোগ আছে। যাদবপুরের এমএলএ মনোজ সেন তার প্রায় দাদাস্থানীয়। পুলিশের কাছ থেকে তথ্য বার করার ব্যাপারে টিএনটি ঝামেলায় পড়লে এই মনোজদার প্রভাব খাটিয়ে প্রায়ই কাজ হাসিল করে রঞ্জন।

টিএনটির সঙ্গে রঞ্জনের চিন্তাভাবনার ফ্রিকুয়েন্সিটা মেলে বেশ। সেই কলেজ জীবন থেকে ওরা বন্ধু। টিএনটি ছিল এক ব্যাচ সিনিয়র, কিন্তু থার্ড ইয়ারে পড়তে টাইফয়েড হয়ে এক বছর পরীক্ষা দিতে পারেনি সে। সেই ফাইনাল ইয়ার থেকেই রঞ্জনের সঙ্গে দহরম মহরম। গল্পের গোয়েন্দারা শুধু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর বুদ্ধির জোরে সবকিছু সমাধান করে ফেলে বটে, কিন্তু টিএনটি জানে ঠিকঠাক তথ্য সংগ্রহ করতে পারার গুরুত্ব কত। আর সেই কাজে রঞ্জনকে না পেলে তার চলেনা।

- “বুঝলে ঘোষ”, টিএনটি হাতের তালু থেকে সাবুর দানার মত কালো কালো বীজ গুলো বেছে বেছে অ্যাস্ট্রের মধ্যে ফেলতে ফেলতে বলল, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস এটা খুন, আর যে খুন করেছে সে অত্যন্ত সাবধানী, আর বুদ্ধিমান। এমনভাবে খুনটা সাজিয়েছে, যাতে খুন বলেই সন্দেহ না হয়!”

- “হুম! কিন্তু কাল অনির সিগারেটের বাক্সখানা টুক করে পকেটে পুরলে যে? জোয়ারদার দেখতে পেলে না? হুঁ হুঁ…” মিচকে হেসে হাতের বিশেষ ইশারা করে জোয়ারদারের কাছে টিএনটির সম্ভাব্য ইজ্জতহানির কথা বুঝিয়ে দিল রঞ্জন।

- “হাতসাফাইটা ছোটোবেলার অভ্যেস ভাই। সেই ছোটোবেলা থেকে বাপের সিগারেট ঝেড়ে হাত পাকিয়েছি!” হেসে বলল টিএনটি।

- “তা বলে মৃতদেহের থেকেও সিগারেট ঝাড়বে? এত অধঃপতন তোমার?”

- “আমার ধারণা… ওই সিগারেটের বাক্সের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মৃত্যুরহস্যের চাবিকাঠি। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, খুনী এল কিভাবে, আর খুন করে পালালোই বা কিভাবে? তার চেয়ে ধর যদি সিগারেটের মধ্যে বিষাক্ত কিছু মিশিয়ে দেওয়া যায়… মেঝেতে একটা আধখাওয়া সিগারেট পড়েছিল, খেয়াল করেছ নিশ্চয়ই…”

চকচকে টাকটা একটু চুলকে নিয়ে রঞ্জন বলল – “বটে? খুনীর অ্যালিবাইও থাকল আবার ইদিকে কাজও হাসিল হল! কিন্তু সিগারেটের প্যাকেটে বিষ ঢেলে দেওয়া কি অতই সোজা নাকি?”

- “ধরো কেউ যদি প্যাকেটটাই পাল্টে দিয়ে থাকে? অনির কোলিগদের সঙ্গে কথা না বললে বোঝা যাচ্ছেনা কে এরকম করে থাকতে পারে। চল দেখি, একটু ঘুরে আসি তিলোত্তমার অফিস থেকে।”

চৌকি থেকে উঠে জিন্সের জ্যাকেটটা গলাতে গলাতে টিএনটি বলল “এই সিগারেটের প্যাকেটটার কেমিক্যাল অ্যানালিসিসও করা জরুরি। পুলিশকে এড়িয়ে সেটা কিভাবে করা যায় ভাবছি। তোমার চেনাজানা কেউ আছে নাকি?”

- “দেখছি। আমার এক বন্ধুর বৌ কেমিস্ট, ওকে যদি ধরা যায়।”

টিএনটির মা বোধহয় পুজোর ঘরে ছিলেন। বৃদ্ধার উদ্দেশ্যে “মা আমরা একটু বেরোলাম!” ছুঁড়ে দিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল টিএনটি।

ক্যামেরার ব্যাগ খানা কাঁধে গলিয়ে রঞ্জন ওর পিছু নিল।

——————————

 

ক্যামাক স্ট্রিটের তিলোত্তমার অফিসে ওরা যখন পৌঁছল বারোটা বেজে গেছে। রোববার হলে কি হবে, রেডিও কোম্পানির অফিসের ছুটি নেই। রিসেপশনে বসে থাকা সুসজ্জিতা, কিন্তু ক্যাবলা গোছের ভদ্রমহিলাকে শুরুতেই নিজের প্রাইভেট ডিটেকটিভ লেখা কার্ড দেখিয়ে চমকে দেবার কাজটা সেরে ফেলল টিএনটি। গতকাল পুলিশ এসে জেরা করে গেছে নাম কা ওয়াস্তে, আজ আবার ডিটেকটিভ! দেখে একটু ঘাবড়ে গেছেন বলে মনে হল।

দেবলীনার সঙ্গেই কথা বলার সুযোগ পাওয়া গেল সবার আগে। চেহারা দেখে প্রচণ্ড বিধ্বস্ত, এমন মনে হচ্ছেনা। বেশ নর্ম্যাল সাজগোজ করেই এসেছে সে। হাল্কা সবুজ টি-শার্ট আর জিন্স। পুলিশের পর আবার ডিটেকটিভ কেন সে প্রশ্ন তুললনা সে। হয়তো আগেরদিন জোয়ারদারের সঙ্গে টিএনটিকে দেখে ভেবেছে সেও পুলিশের দলেরই লোক।

- “আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি মিস ব্যানার্জি, কয়েকটা প্রশ্ন করে জ্বালাবো আপনাকে।” টিএনটি বলল।

- “নো প্রবলেম। প্লিজ গো অ্যাহেড”, দেবলীনার গলায় পশ্চিমী ফর্ম্যালিটি।

- “অনি আমারও বন্ধু ছিল। হয়তো ওর কাছে কখনো আমার নাম শুনে থাকতে পারেন…” দেবলীনাকে বিশেষ কিছু বলতে না দেখে টিএনটি বলে চলে – “ওর মৃত্যু সম্পর্কে আপনার কি ধারণা? সিম্পল হার্ট অ্যাটাক?”

- “আমার বিশ্বাস হয়না। কিন্তু… কি জানি…” কিছু বলতে গিয়েও যেন বললনা সে।

টিএনটি জানে ধীরে ধীরে এগোতে হবে, শুরুতেই চাপ দিলে বিশেষ কিছু বার করা যাবেনা। গলাটা একটু খাঁকরে নিয়ে সে বলল

- “যদি অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা ভাবি তাহলে স্বভাবতই খুনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না। আপনাদের রিলেশন তো বেশ কয়েক বছরের বোধহয়। কারোর সঙ্গে অনির খারাপ সম্পর্ক ছিল, এরকম কিছু জানা আছে?”

- “নাহ, সেরকম কিছু জানা নেই। তবে অনেক দিনের সম্পর্ক হলেও ওর জীবনের সমস্ত খুঁটিনাটি ও আমায় জানাতনা। অনেক কিছুই প্রাইভেট রাখতে পছন্দ করত। সো, আই অ্যাম নট শিওর…”

- “অফিসের সবার সঙ্গে সম্পর্ক ভাল ছিল, তাই তো?”

- “ওই কোলিগদের মধ্যে নর্ম্যাল ঈর্ষা জনিত কারণে রেষারেষি ছিল কিছুটা। এখানে নানারকম লবিবাজি হয়…”

- “স্পেসিফিকালি কারুর নাম বলতে পারেন? আপনার বলা কথা গোপন থাকবে, কথা দিতে পারি।”

একটু ইতস্তত করে দেবলীনা বলল – “আমাদের আরেকজন পপুলার আরজে অমলিন বিশ্বাস, ও রিসেন্টলি অনি আর আমার পিছনে লেগেছিল। ঝুটঝামেলা চলছিল কয়েকদিন ধরে।”

- “ওনার সঙ্গে একটু কথা বলা যায়?”

- “শিওর। আমি ডেকে দিচ্ছি। আমায় আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?”

- “এখন আর না। আপনাকে বেশি জ্বালাবনা এখন। কিন্তু পরে যদি কখনো কিছু জানার থাকে…”

- “যে কোনো সময় চলে আসতে পারেন। কোনো সমস্যা হলে আমার নাম করবেন। আমার মেসো তিলোত্তমার মালিক, আমার কথা বললে যে কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারবেন আশা করি।”

- “ওহ তাই? তাঁর সঙ্গেও কি কথা বলা যায়?”

- “উনি তো আজ নেই এখানে। তবে ওনার ফোন নাম্বারটা দিতে পারি, আপনি সরাসরি যোগাযোগ করে নিতে পারেন।”

- “মেনি থ্যাঙ্কস!” ফোন নম্বর নিয়ে বাইরের লবিতে এসে বসল ওরা। রঞ্জনের মনটা অনেকক্ষণ থেকেই কফি কফি করছিল। লবির পাশের কফি মেশিনটা দেখে তার মুখে হাসি ফুটল। দুজনের জন্য এক কাপ করে নিয়ে এসে দেখে টিএনটি উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করছে একজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোকের সঙ্গে।

অমলিন বিশ্বাসের চেহারাটা বেশ ব্যক্তিত্বপূর্ণ। গম্ভীর গলা আর সঙ্গে ফর্ম্যাল জামা প্যান্ট, এক নজরে দেখে আরজে নয়, বরং বিজনেসম্যান মনে হতে পারে। টিএনটি আলাপ করিয়ে দেয় রঞ্জনের সঙ্গে “রঞ্জন ঘোষ, আমার বন্ধু এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট।”

- “আসুন আমরা ওই ঘরে গিয়ে বসি” অমলিন ডেকে নিয়ে গিয়ে ওদের বসাল অফিসের পূর্বদিকের একটা ঘরে, “বলুন, হাও ক্যান আই হেল্প ইউ?”

- “আমরা অনির্বাণ মল্লিকের মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর করতে এসেছি, মিস ব্যানার্জি হয়তো আপনাকে…”

- “হ্যাঁ বলেছে। ভেরি আনফরচুনেট। কিন্তু শুনলাম তো হার্ট অ্যাটাক। নাকি অন্যরকম হাইপোথিসিস শোনা যাচ্ছে?”

- “এখনো কিছু নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছেনা। তবে অপঘাত মৃত্যুও হতে পারে। যদি কিছু মনে না করেন, আপনাদের অফিস সম্পর্কে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব।”

- “করুন?”

- “মোট কতজন রেডিও জকি আছেন আপনাদের এখানে? আর অন্যান্য কর্মচারীই বা কতজন?”

- “এখানে আরজে বলতে আট জন। কিন্তু তাছাড়াও আরও অনেকে চাকরি করেন। আসলে আপনারা শুধু আরজে-দেরই দেখতে পান। এছাড়াও কিন্তু আরো হাজারো রকমের লোক লাগে একটা রেডিও স্টেশন চালাতে গেলে। বেশিরভাগই টেকনিশিয়ান, এছাড়াও ক্লার্ক, জার্নালিস্ট, প্রোডিউসার সবরকমই আছে। সব মিলে এই অফিসে জনা পঞ্চাশ হবে হয়তো। এছাড়া আমাদের এন্টালিতে একটা অফিস আছে। কিন্তু এখানেই বেশিরভাগ কাজ হয়।”

- “আই সী… তো অফিসে সবার সঙ্গে অনির্বাণ বাবুর সদ্ভাব ছিল?”

- “অ্যাজ ফার অ্যাজ আই নো, ইয়েস… তবে…” কিছু একটা ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করে যেন অমলিন।

- “তবে?”   

- “দেবলীনার সঙ্গে ওর সম্প্রতি একটু ঝামেলা চলছিল। মাঝেমাঝেই ঝগড়া শোনা যেত। দ্য ডে হি ডায়েড, সেদিনও ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল, সবার সামনেই।”

- “কি নিয়ে?”

- “সেটা বোধহয় আমার বলাটা অশোভন হবে। আপনি দেবলীনাকেই সরাসরি জিজ্ঞেস করুন।”

- “ঠিকই বলেছেন। এনিওয়ে, অনেক ধন্যবাদ। পরে দরকার হলে আবার আসব। এখন উঠি।”

- “ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম!”

 

লবির দিকে এগোতেই টিএনটির চোখে পড়ে একজন বিশালবপু ভদ্রলোকের সঙ্গে হেঁটে সেদিকেই আসছে দেবলীনা। ভদ্রলোকের গায়ে চেক কাটা শার্ট, ভুঁড়ির কাছের একটা বোতাম অনুপস্থিত। ওদের সঙ্গে দেবলীনার চোখাচোখি হয়ে যেতে সে এগিয়ে এসে বলল – “আপনারা কি চললেন? কথা হয়েছে সবার সঙ্গে?”

- “হ্যাঁ, আজকের মত যতটা হবার হয়েছে। সুভাষবাবুর সঙ্গে আমি ফোনে যোগাযোগ করে নেব পরে।”

- “বাই দ্য ওয়ে, ইনি হলেন ডক্টর মৈনাক ভট্টাচার্য, আমাদের কমন ফ্রেন্ড। অনি বেশিরভাগ সময় ওনার কাছেই যেত চিকিৎসার জন্য। আমরা ওই হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাটা নিয়ে কথা বলছিলাম…” দেবলীনা বলে।

- “কল মি রিঙ্গো!” করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন ডাক্তারবাবু।

টিএনটি আর রঞ্জন নিজেদের পরিচয় দিল। দেবলীনা ওদের কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেল, কি একটা জরুরি কাজে যেতে হবে তাকে।

- “আপনাকে আগে কোথাও দেখেছি? হ্যাভ উই মেট?” রঞ্জনের উদ্দেশ্যে বললেন ‘রিঙ্গো’।

- “আজ্ঞে তা তো ঠিক জানিনা, আমার তো খেয়াল হচ্ছেনা সেরকম কিছু।” মনে মনে রঞ্জন বললে “তোমার মত চীজকে দেখলে ভুলতাম না বস!”

- “এনিওয়ে, অনির মৃত্যু নিয়ে আপনারা তদন্ত করছেন, খুব ভাল কথা। আমি হয়তো আপনাদের কিছু তথ্য দিতে পারি। কিন্তু এখন আমায় কাটতে হবে। আমার কার্ডটা রাখুন, জাস্ট একটা ফোন করে নেবেন। আজ সন্ধ্যায় কি করছেন? কোথাও বসা যেতে পারে…”

- “কোনও কফি শপ টপ…”

- “উম, ইয়ে, আমি আবার… বুঝলেন কিনা… একটু মায়ের ভক্ত… সন্ধ্যের দিকে একটু কারণ বারি ছাড়া হেঁ হেঁ হেঁ”

- “ওহ! হেঁ হেঁ তা আমিও মশাই ভক্ত মানুষ, তবে কিনা মায়ের নয়, বাবার…” টিএনটি চোখ টিপে মৃদু হাসে।

- “হা হা কেয়া বাত কেয়া বাত! তাহলে তো এমন একটা জায়গায় বসতে হয় যেখানে নির্বিঘ্নে মা বাবা সকলেরই সেবা করা যায়, নাকি?”

- “হ্যাঁ তা বটে… তা সেরকম জায়গা…”

- “আছে। আমি নিয়ে যাবো, সন্ধ্যে সাতটার পর একটা ফোন করুন আমায়। নম্বরটা ওই কার্ডেই…”

- “আচ্ছা, থ্যাঙ্ক ইউ। সাউন্ডস গুড!” টিএনটি জবাব দেয়।

- “বেশ। কথা হচ্ছে তবে। আপাতত এটুকু বলতে পারি, অনিই বোধহয় প্রথম নয়…” নীচু গলায় বললেন স্থূলকায় ভদ্রলোক।

- “ইউ মীন…”

- “এখানে নয়, সেসব কথা পরেই হবে… এখন চলি…” টিএনটির কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ওদের ফেলে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলেন ডক্টর ভট্টাচার্য।   

 

(ক্রমশ)

 

ধূসর মেঘের মলহার অথবা একটি হত্যার স্বরলিপি (ষষ্ঠ পর্ব অবধি)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments