আমাদের শিশুকাল ছিল বড়ই মায়াবী, বেজায় স্বপ্নাতুর। ছিল মগজ ফুঁড়ে হৃদয় জুড়ে হরেক রকম কাল্পনিক কাহিনীর আনাগোনা। দেশি বিদেশী রূপকথা থেকে প্রাচীন মহাকাব্য, কমিক্স থেকে কার্টুন স্ট্রিপ – কচি মনকে উস্কে দেওয়ার রসদ কোনোটাতেই কম ছিল না। কোথাও হয়তো আমরা ওই চরিত্রগুলোর সাথে একাত্ম হয়ে পরতাম আবার দুঃখও পেতাম যখন বুঝতাম এরা আসলে কেউ সত্যিকারের নয় , বা সহজ ভাষায় এদের সব্বাই মিথ্যাকারের ! এসপ থেকে জাতক , আরব্য রজনী থেকে পঞ্চতন্ত্র – ওই এক গল্পের থেকে অন্য গল্পে ঢুকে পড়াটা বেশ মজার লাগতো, বার বার পড়তে পড়তে মনে হতো যেন এক থেমে আসা ট্রেন থেকে আরেক চলতি ট্রেনে লাফ মারলাম। আজকের শিশুদের মধ্যে একই উৎসাহ লক্ষ্য করি যখন তারা পিএস২ বা এক্সবক্স হাতে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে। এখন আর কেউ ছোটদের জন্য নতুন করে রূপকথা লেখে না , অবশ্য সেরকম কিছু লিখলে সেটা কজন পড়ার সুযোগ পাবে তাও সঠিক ভাবে কারও জানা নেই। আর সেটা না জানা থাকলে কেউ সেটাকে ছাপবেই বা কেন ? সুতরাং ভাবলাম ফেসবুকে ছাপতে পয়সা লাগে না যখন, তখন বড়দের জন্য একটা ছোট্ট রূপকথা লিখে ফেলি। এই লেখাটিকে একটা আরবান ফেবেলও বলতে পারেন আবার সেরকমটি না চাইলে বলতে পারেন এটা একটা ঐতিহাসিক প্রলাপ।

বেশিদিন আগের কথা নয় , এই পৃথিবীর বুকে নগর সভ্যতা তখন আঁতুরঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। জঙ্গল সাফ করে শহরের বুকজুড়ে তৈরী হচ্ছে বাণিজ্যকেন্দ্র। কৃষিজমি গুলো হটিয়ে দিয়ে বাইরের একপ্রান্ত দখল করছে শিল্প ও অন্য দিকটায় ক্রমশঃ নাগরিক বসতি হিসেবে গড়ে উঠছে আবাসিক অঞ্চল। যা বাকি রইলো তাতে ইস্কুল , হাসপাতাল ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ক্ষমতা ও বিত্তের জোরে কিছু মানুষ তাদের স্বজন আত্মীয়দের নিয়ে বেশ আলো বাতাসওয়ালা প্রাসাদ কিংবা অট্টালিকায় নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছেন। যারা সেটা পারছেন না তারাও নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন তুলনামূলক ভাবে ছোট ও আরো ছোট আস্তানাগুলোয়। আর সেটাও যাদের কপালে জুটছে না তারা একত্রিত ভাবে একটা ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে নিজেদের গুঁজে চলেছেন।
মোটের ওপর সব ঠিক ঠাকই চলছিল – গাড়ি ঘোড়া , কল কারখানা , আপিস কাছারি , থিয়েটার সিনেমা , পার্ক কিংবা নৌকোভ্রমণ – বাঁধ সাধলো মানুষের মাঝে কুকুরের থেকে সংক্রামিত এক মারণব্যাধি লেগে। সে জন্তু, পোষাই হোক বা রাস্তার, তার মাধ্যমে রোগ ছড়াতে লাগলো হু হু করে। মরতে লাগলো একের পর এক মানুষ। সবথেকে সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল এলাকার কুকুরেরা মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা। তারা মনিবের আদর ও চব্য চোষ্য খেয়ে বেশ নধরটি হয়ে উঠেছিল কিন্তু এ হেনো বিপদে এবার তাদের অবস্থা প্রায় দিশেহারা। মধ্যবিত্তদের বাড়িতে পেলে ওঠা কুকুরদের অবস্থাও একই প্রকার, না পারে তারা রাস্তার এঁটো খেতে আবার না তাদেরকে কেউ দুটো বাসি রুটি ছুড়ে দেয়। রাতারাতি শেষ হয়ে গ্যালো নগরজোড়া কৃত্তিম মানব সভ্যতা। সব থেকে আনন্দ পেলো ওই শহরের কোণঘেষে বা রেললাইনের ধারে বস্তিতে বেড়ে ওঠা লাওয়ারিশ কুকুরগুলি। হৈ হৈ করে ছুটলো পাউরুটি ফ্যাক্টরি, চালের গুদাম ও দুধের ডিপোর দখল নিতে। এমনিতে এরা নিজেদের মধ্যে ঘেউ ঘেউ করলেও এবারে তারা একসাথে দলবল নিয়ে টহল দিতে থাকলো শহরময়, সবাই এদেরকে চিনতে লাগলো ‘কালা’ গোষ্ঠীর নামে। ওদিকে বাংলো ও অট্টালিকার সুখী সারমেয়েরাও হাতগুটিয়ে বসে নেই। তারা তাদের ফ্রিজে কিংবা বেসমেন্টে লোকানো রসদের জেরে বেশ জোরে জোরেই হাঁকা হাঁকি করতে লাগলো, নামডাকও ছড়ালো এদিক ওদিক ও এদের নাম হলো ‘ধলা’ গোষ্ঠী। এই দুদলের মাঝে পড়ে মধ্যবিত্ত এলাকার কুকুরদের কাহিল দশা। এদের না আছে রসদ আর না পারবে কেড়ে খেতে। অগত্যা এদের মধ্যে কিছু গিয়ে ভিড়লো ধলাদের দলে মানে তাদের কাজ বড়লোকি কুত্তাদের ফাই ফরমাশ খাটা, এটা সেটা কুড়িয়ে বাড়িয়ে এনে দেওয়া ও ছোটলোকি কুত্তাদের অর্থাৎ কালাদের খবরাখবর যোগান দেওয়া। আবার কিছু মাঝারি কুকুর যারা ওই ফসসা হোঁদলকুতকুত ধলাদের দলে যোগ দিলো না তারা ওই কালাদের নেতা হয়ে গেলো। নদীর ওপারে ববিন তো ব্রিজের এপারে রাঙ্গা। ইতিমধ্যে অনেক ধলাই প্রাসাদ ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। অতর্কিতে হানা দিচ্ছে কালাদের বস্তিতে। লুট করছে কালাদের কষ্ট করে জোগাড় করা দুধ, পাউরুটি ও মাংস।

এমন সময় শহরের দক্ষিণ প্রান্তে নাম শোনা যেতে লাগলো উঠতি দুই ‘কালা’ নেতার- তাদের নাম লালু ও ভুলু। শোনা যায় ধলারা যখন শহরের দক্ষিণ প্রান্ত প্রায় দখল করে ফেলেছিলো, তখন লালু ও ভুলু তাদের গেরিলা বাহিনী নিয়ে হুল্লাট বাওয়াল দেয়। দিনের পর দিন না খেয়ে না ঘুমিয়ে কি তাদের সংগ্রাম! অবশেষে দক্ষিণ প্রান্তের এক ছোট্ট পাড়া তারা পুরোপুরি দখল করে ফেলে। অনেক রক্ত ঝরিয়ে তৈরী হয় তাদের মুক্তাঞ্চল। লালু সেই অঞ্চলের দেখা শোনা করা শুরু করলেও ভুল আরো পশ্চিমের দিকে রওনা দেয় ধলাদের কেলিয়ে বিদায় করবে বলে, লালু বারণ করলেও সে শোনেনি। অনেক দূর এগিয়েও কিন্তু সে শেষ মেশ পারেনি। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে পশ্চিমের জঙ্গলে ধলাদের গুলিতে লুটিয়ে পরে ভুলুর দেহ। এর পর সেই কুখ্যাত দক্ষিণ প্রান্তে হেনে আসে ধলাদের একের পর এক বর্বরোচিত আক্রমণ। অনেক চেষ্টা করেও তারা লালুকে কিস্সু করতে পারেনি। অনেক বছর কেটে গেছে , ধলাদের নতুন নেতা এখন বাম্পি। বৃদ্ধ কালাদের আর সেরকম দেখা যায়না আজকাল। হটাৎ খবর পেলাম বয়সজনিত রোগের কারণে কাল লালুও তার প্রিয় মুক্তাঞ্চল ছেড়ে দিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে।

নগরারণ্য ( সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার সাথে এ লেখার মিল থাকলে তা নেহাতই কাকতালীয় নয় !!)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments