গত কিছুদিন ধরে ব্লগের আবহাওয়াটা বেশ রোম্যান্টিক হয়ে আছে। ভাবলাম একটু স্বাদবদল করা যাক। বিছে-দা বা তনুশ্রীদির ও দেখা নেই অনেকদিন। আজ আমার রান্নার কিছু গপ্প শোনাতে এলাম তাই। আমি খাদ্যরসিক মানুষ (চেহারা দেখে ভুল বোঝার আশঙ্কা আছে অবশ্য)। আবার অন্যদিকে আমি বৈচিত্রের বড় ভক্ত। নতুন নতুন রান্না খেতে না পারলে দুদিন পরই মনটা আনচান করে। তাই প্রায়ই বেরিয়ে পড়ি নতুন স্বাদের সন্ধানে। ভারত, পাকিস্তান, আমেরিকা, ইটালি, চীন, জাপান, নাইজেরিয়া, হনোলুলু… কোন দেশের খাবারেই অরুচি নেই।

যখন প্রথম বিদেশ এলাম গবেষণা করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে, আসার আগে থেকেই লোকে ভয় দেখাত “নিজে রান্না করতে হবে কিন্তু!” সত্যি কথা বলতে একটু যে ভয় করতনা তা নয়। জীবনে রান্নাঘরের ধার মাড়াইনি। হাতা খুন্তি হাতে নিয়ে প্রথমেই একটা ম্যাসাকার হয়ে যাবে এই ভয় হওয়াই স্বাভাবিক। ঈশ্বরের কৃপায় এখনও পর্যন্ত বারদশেক স্মোক অ্যালার্ম বাজানো, গোটাতিনেক পাত্র পুড়িয়ে ফেলে নষ্ট করা, আর একবার রান্নাঘরে আগুন লাগানো ছাড়া বিশেষ ম্যাসাকার করিনি।

আসার আগে মায়ের কাছে একটু আধটু রান্না শিখে আসার ইচ্ছা থাকলেও অলসতার কারণে সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। এখানে আসার পর একেবারেই অপ্রস্তুত অবস্থায় রান্নাঘরে ঢুকেছিলাম প্রথমদিন। সবে একদিন হল মার্কিন দেশে পা রেখেছি। সদ্য কিছু বাজার করে দিয়ে গেছে সিনিয়ররা। কি না কি কেলেঙ্কারি করব, চক্ষুলজ্জার খাতিরে সব্বাই চলে যাওয়ার পর তবেই ঢুকেছি রান্নাঘরে। কড়ায় তেল দিয়ে জয় মা কালী বলে আলু, পেঁয়াজ, ডিম, টমাটো, ক্যাপ্সিকাম যা যা ছিল সব দিয়ে দিলাম। সেই উদ্ভট জিনিসটা অন্যলোকে খেলে কি বলত খোদায় মালুম, গরমভাতে নিজের হাতে করা প্রথম রান্না আমার অন্তত অমৃত টাইপেরই কিছু একটা মনে হয়েছিল। সেই শুরু…

তারপর থেকে কিকরে যে ধীরে ধীরে ওটাই বাড়ির মধ্যে আমার প্রিয় ঘর হয়ে গেল কে জানে। কদিন রান্না করতে না পারলেই এখন কেমন জানি লাগে। ইউনিভার্সিটির কাজের প্রচন্ড চাপের মধ্যে একটা রিফ্রেশমেন্ট হিসেবে কাজ করে। সারাদিন মাথার ওপর স্ট্রেস যাওয়ার পর সেই স্ট্রেস থেকে মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে নতুন কিছু একটা বানানোর আনন্দ। সব মিলে দারুণ লাগে। দু বছরে নয় নয় করে অনেক রান্নাই শিখেছি, এর ওর থেকে, কখনও ইউটিউবের ভিডিও দেখেও। কেবল রেসিপি বই পড়ে রান্না করার প্রতি আমার একটা অ্যালার্জি আছে। ওই ১/২ চা চামচ ধনে আর ২ টেবিল চামচ জিরে দিয়ে নাড়ার কথা শুনলেই অসহ্য লাগে, মনে হয় স্রেফ চাকরের মত অর্ডার পালন করছি। ছোটবেলায় অঙ্ক মুখস্থ করে পরীক্ষায় নামানোর প্রতি যেমন অনীহা ছিল, ঠিক একই রকম কারণে রান্না মুখস্থ করতেও আমার আপত্তি। হয়তো একথা সত্যি যে কিছু কিছু রান্নার জন্য পরিমাণগুলো নিখুঁত না হলে ঠিক জমে না, তবু বলব অঙ্কের মত রান্না ব্যাপারটাতেও কন্সেপ্ট তৈরি হয়ে গেলে নিজেই বুঝে নেওয়া যায় কোন জিনিস কতটা দিলে আর ঠিক কোন সময় দিলে স্বাদ আর গন্ধটা খুলবে। একজন শিল্পীকে যদি বলে দেওয়া হয় এইবারে তুলিটায় ৫ মিলিলিটার লাল রঙ লাগিয়ে ক্যানভাসের (৩,৭) স্থানাঙ্কে লাগাও তাহলে ব্যাপারটা তাঁর কাছে যেমন বিরক্তিকর হবে, একজন রন্ধনশিল্পীর কাছে রেসিপি বই এর নির্দেশাবলী ও সেরকম। তাই রন্ধনশিল্পে উৎসাহী কেউ থাকলে তাঁকে বলব প্রথম প্রথম অভিজ্ঞ ব্যাক্তিদের থেকে পরামর্শ নেওয়া বা ট্রিক গুলো শিখে নেওয়া জরুরী, তারপর একবার ব্যাপারগুলো বুঝে নিয়ে চলুন বেরিয়ে পড়া যাক নতুন স্বাদের সন্ধানে। নতুন নতুন জিনিস ট্রাই করুন আর এক্সপেরিমেন্ট সফল হলে সেই আইডিয়াগুলো ভাগ করে নিন অন্যদের সাথে। তবেই না আরও নতুন নতুন স্বাদের রান্নার চলন হবে!

দু বছর ধরে করা এইরকম কিছু সফল (আমার জিভের মাপকাঠিতে) এক্সপেরিমেন্টের আইডিয়া আজ আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করব। কোনক্ষেত্রেই পেটেন্টের দাবি করবনা, কারণ হয়ত একই ধরণের রান্না আগেই কেউ করেছেন, আমার কাছে এগুলো সম্পূর্ণ মৌলিক কারণ এগুলো আমি নিজের কল্পনা থেকে করেছি, কারও কাছে শিখিনি, এই পর্যন্ত। আমি সবকিছুই চোখের আন্দাজে দিই, তাই নিখুঁত মাপগুলো বলতে পারবনা বলে আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম। এগুলো কেবল আইডিয়াই, রেসিপি নয়। নিজের মত করে চেষ্টা করে দেখতে পারেন এগুলো নিয়ে, খারাপ হবে না এই গ্যারান্টি দিতে পারি।

আমার প্রথম খাবারের নাম মেটে সরষে। এটার জন্য আপনার লাগবে মুরগির মেটে (পাঁঠার মেটে বেশি শক্ত বলে ঠিক জমে না), পেঁয়াজ, সরষে বাটা, কাঁচালঙ্কা, নুন, হলুদ আর অল্প ধনে-জিরে বাটা (বা গুঁড়ো)। প্রথমে গরম তেলে পেঁয়াজটা অল্প ভেজে কয়েকটা কাঁচালঙ্কা চিরে দিন তার মধ্যে। কাঁচালঙ্কার সুন্দর গন্ধ বেরোলে তার মধ্যে মেটে গুলো দিয়ে একটু ভাজা ভাজা করুন। পরিমাণ মত নুন হলুদ দিন, খুব সামান্য ধনে-জিরে বাটাও দিয়ে দিন। কাঁচালঙ্কায় ঝাল বেশি না থাকলে একটু শুকনোলঙ্কার গুঁড়োও দিতে পারেন। এই রান্নাটা একটু ঝাল ঝাল না হলে ঠিক জমে না। অন্যদিকে সরষে বাটা অল্প নুন দিয়ে ভিজিয়ে রাখবেন, তাহলে অনেকসময় সরষের যে তেতো ভাবটা থাকে সেটা কেটে যায়। মেটে গুলো নরম হয়ে গেলে অল্প ভেঙ্গে ভেঙ্গে গিয়ে মাখা মাখা একটা ভাব আসবে, সেই পর্যায়ে সরষেবাটা টা দিয়ে ঢাকা দিয়ে অল্প আঁচে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখুন। মেটে সরষে তৈরি।

অনেকে মেটে বিশেষ পছন্দ করেননা। তাঁদের জন্য আজকের মেনুতে আরেকটা আমিষ পদ দেওয়া যাক। এটার নাম ডিমের মটর কারি। এটা বেশি বিস্তারিত আলোচনা করব না। ডিমের কারি বানাতে সবাই জানেন আশা করি। ডিম সিদ্ধ করে অল্প ভেজে নেন অনেকে, এই রান্নাটার জন্য ভেজে নেওয়াটা আবশ্যক। আলু দিতে চাইলে বড় বড় করে কেটে সেটাও ভেজে রাখুন। পেঁয়াজ রসুন বাটা আর অল্প আদাবাটার সঙ্গে নুন হলুদ লঙ্কা ইত্যাদি দিয়ে গ্রেভিটা তৈরি করবেন সাধারণ ডিমের কারির মত। অন্যদিকে সম্পূর্ণ আলাদা জায়গায় একদম নরম করে সিদ্ধ করা সবুজ মটর থেকে জল একদম ঝরিয়ে তেলের মধ্যে জিরে ফোড়ন দিয়ে ওই গলা মটর টা নাড়ুন এবং একটূ শুকিয়ে আনুন। জিনিসটা দেখতে হবে অনেকটা কড়াইশুটির কচুরির পুরের মত। এবার এই মটরটা আগে করে রাখা গ্রেভির সাথে মিশিয়ে দিন। মনে রাখবেন পুরো জিনিসটা বেশি ঝোল ঝোল না হয়ে একটু গা মাখা হবে। সবশেষে আলু আর ডিম এই গ্রেভির মধ্যে দিয়ে ঢাকা দিয়ে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখলেই রান্না তৈরি।

এবার আজকের নিরামিষ পদ। এটা সাম্প্রতিক আমলে করা আমার সবচেয়ে পছন্দের রান্না। এটাকে বলা যেতে পারে বাঁধাকপির ঝাল। লাগবে একটা বাঁধাকপি, গোট শুকনো লঙ্কা, গোটা সরষে, নুন, চিনি, লঙ্কাগুঁড়ো, হলুদ (না দিলেও চলে)। খুব সিম্পল রান্না। কড়ায় তেল গরম করে শুকনো লঙ্কা ও সরষে ফোড়ন… সরষে ফাটতে শুরু করলে কুচি করে কেটে রাখা বাঁধাকপি তার মধ্যে দিয়ে নাড়তে থাকুন। ভুলেও জল দেবেননা। পরে প্রয়োজন মত নুন, লঙ্কা, চিনি (একটু বেশি, রান্নাটা ঝাল-মিষ্টি স্বাদের হবে) হলুদ দেবেন। বাঁধাকপি থেকে যে জল বেরোবে সেটা শুকিয়ে নিতে হবে। শুকনো শুকনো ঝাল ঝাল মিষ্টি মিষ্টি বাঁধাকপি ডাল ভাতের সাথে খেতে দারুণ লাগে।

এই গরমের দিনে এত ঝালদার খাবার খেয়ে যাতে পেট গরম না হয় তার জন্য সবশেষে বলি একটা হজম করানোর উপায়। এটা হল শসার সরবত। আগে থেকে করে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে, কারণ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা খেলে বেশি ভাল লাগে। উপাদান বলতে একটা মাঝারি সাইজের শসা (এতেই দু গ্লাস সরবত হয়ে যাবে), অনেকটা চিনি, সামান্য গোটা মৌরি (মৌরি গুঁড়োও চলতে পারে) আর খুব সামান্য আদা বাটা। আদাবাটা টার মধ্যে যেন আবার পেঁয়াজ রসুনের গন্ধ চলে না আসে খেয়াল রাখবেন, নইলে পুরো কেলেঙ্কারি হবে। সব কিছু একসাথে দিয়ে (আর প্রয়োজন মত জল দিয়ে) ব্লেন্ডারে একপাক ঘুরিয়ে দিলেই সরবত তৈরি। যদি গোটা মৌরি দেন তাহলে সেটা জলে ভিজে ফ্লেভারটা বেরোনোর জন্য একটু সময় দিতে হবে। ফ্রিজে ঘন্টা দুয়েক রেখে দিলেই যথেষ্ট।

 ব্যাস, আর কি, আজ এই পর্যন্তই থাক। এই মেনু টা একদিন ট্রাই করে দেখুন, কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না। সাহস করে নিজের এক্সপেরিমেণ্ট গুলোর কয়েকটা দিলাম। ভাল লাগলে পরে আবার আরও কিছু দেওয়া যাবে।

নতুন স্বাদের সন্ধানে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments