নবযুগের প্রথম খন্ডের লেখাটা লিখতে গিয়ে আমাকে বেজায় বেগ পোহাতে হয়েছিলো।মাঝরাতে স্বপ্নের মাঝে নবী করিম প্রশ্ন করলো ‘কোনটা প্রিয় – হুর, বকরী ,ইলিশ না আপনজন?’ আমি বললাম ‘ ইয়া নবী আপনার প্রশ্ন থেকে বোঝা যাচ্ছেনা যে আমি এদের মাংস খাবো না এদের ওষ্ঠে চুম্বন? একটু টেনে টুনে ছিলাম আরকি, ব্যাস নবী খেপে গ্যালো আমার ব্যায়াদপিপানা দেখে ! এবং একটুও ভাবনা চিন্তা না করে প্রপার ইসলামী অভিশাপ দিয়ে উনি আমাকে একটা খচ্চররুপি খোঁজা বানিয়ে ছেড়ে দিলেন।গালিব ও রুমি আমার গুরু, ওদের রেফারেন্স ব্যবহার করে ওনার এইসব পাগলুক্রেটিক পলিসি নিয়ে ক্রিটিসাইজ করতে গেলাম, তর্ক বেঁধে গেলো । তর্ক থেমে গেলে ভালো হতো, কিন্ত উনি থামলেন না। বেজায় খেপেছিলেন, ভেবেছিলাম বেড়াল বা টিকটিকি কিছু একটা বানিয়ে ছেড়ে দেবে। অবশ্যি শেষমেশ ব্যাপারটা অতদূর আর গড়ায়নি, শুধু উনি আমাকে আমার অভ্যন্তরীণ পাকপন্থা মেনে হারামবর্জিত হালালমার্কা লেখা লেখি করে প্রায়শ্চিত্ত করার নিদান দিয়ে দিলেন।উনি এও বললেন যে ওনার বাতলে দেওয়া সহি পথ মেনে চললে আমি নাকি এক সময় বেহেস্তে আনলিমিটেড হুর-পড়ি নিয়ে হালাল ফস্টিনস্টি করতে পারবো ! আমিও অগত্যা দিনে ঘাম ঝরিয়ে,রাতে বাতি জ্বালিয়ে ও হাজার সোশ্যাল সেন্সরশিপের চোখরাঙ্গানি ফাঁকি দিয়ে নিছক শব্দের বিন্যাসে মনমত ভাবের মর্মগুলি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগলাম! লিখতে বসলেই নিজেকে মনে হতো আমি হনু এক হালাল যার-আর-পর-নাই গোছের কেউকেটা কিছু অথচ লেখা শেষ করে ফেলার পরেই কেমন যেন একটা হারাম চাপা অস্বস্তি ভেতর ভেতর জাঁকিয়ে বসতো ! মনে হতো মনের কথা লিখতে গিয়ে যদি কেউ এইরকম ভাবে হালাল হারামেরে টানে ভোগে তাহলে তো তার ততক্ষনাত লেখালেখি বন্ধ করে রাঁচি গিয়ে নিজের মতো মনের মানুষ খোঁজা উচিত। রাঁচিতে তো গেলুমই না বরঞ্চ কলম(পড়ুন মাউস/কীবোর্ড) বা কাগজ (পড়ুন স্ক্রিন) কোনটার হাল না ছেড়ে দিয়ে উল্টে পাল্টে বারবার পড়তে লাগলাম আমার সেই বালখিল্য লেখাগুলিকে ! কোথাও পড়লাম রাজ্যের মন্ত্রী ব্যাপক রাজস্ব আদায়ের পরেও কাটমানি না পেয়ে বেজায় ফ্রাস্টু খেয়ে গিয়েছে – গিয়েছে তো গিয়েছে কিন্ত ফের সে ফিরে এসে রাজার সৌচাগারে খোঁচর বসিয়ে রাখতে মাসে মাসে কোতোয়ালকে উত্কোচও দিচ্ছে ! আবার পড়লুম কোথাও সেই কোতোয়াল ঘুসের পয়সায় হিমসাগর আম কিনে জামাইসষ্ঠী করতে চলেছে ও রাজপেয়াদা ফাঁক বুঝে সেই আম ঝেড়ে নিয়ে পেয়ারাগাছের ওপরে ঝুলিয়ে রেখে রাজকুমারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।ওদিকে রাজা সেই পেয়ারা গাছে আম ফলেছে দেখে ভাড়া করা বৈজ্ঞানিককে সহস্র স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ধান গাছে পোস্ত ফলানোর বায়না করার আবদার করছেন। এতো চাহিদা ও দাবিদাওয়া ঘিরে নিজের লেখা পরে নিজেই শেষে অশান্ত হয়ে গেলুম।ক্রমে মন শান্ত হলো ও দ্বিতীয় খন্ডে হাত দেওয়ার আগে আমি আগের হালাত বুঝে নিজেই খানিকটা নিজেকে সামলিয়ে নিলুম।
শুরুর দিক থেকেই বেয়াড়া ভাষা ও বেয়াক্কেলে কথাবাত্তা এক্কেবারে চোখ বুজে সেন্সর করে দিলুম। ঘষে মেজে যা দাড়ালো তা মোটের ওপর সামাজিক ভাবে গ্রহনযোগ্য হলো ও শালীনতার বাউন্ডারী উল্লঙ্ঘন না করার জন্য সাবেকি নিন্দুকদেরও মানপত্রও মিললো। ভেবেছিলাম নবযুগের চারখন্ড লেখা হবে সমসাময়িক ফ্যান্টাসিমুখর চারখানি যুগ নিয়ে। বাড়তি আহ্লাদ ছিল যে চারটে অধ্যায়ই সময়সাপেক্ষে অভিনব ও কন্টেন্টের দিক থেকে স্বাধীন হবে। দ্বিতীয় খন্ড তাই তেড়ে লিখলুম ও এবারে বেড়ে দাড়ালো লেখাটা ! লিখতে গিয়ে শালা নিজেরই দিব্ব্য ভালো লেগে গেলো, সবাই বললে পরে সেটা হুড়ুমতালে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে পোস্টও করে দিলুম । এক কথায় লেখার পরে সেটা পড়ে অন্যের ভালো লাগাটা যে নিজের লিখতে পারার ভালো লাগার সাথে এক খাপে ঢোকাতে পেরেছি, এইটে ভেবে নিজেকে একটা খাঞ্জাখা বলেই মনে হতে লাগলো !! খাপে খাপ না হলেও এই অধ্যায়ে আব্দুল্লার বাপও ছাড় পেতো না। পেতো না বলেই আব্দুল্লার বাপ না থাকলে যে আব্দুল্লা হত না সেটা বেশ গুছিয়ে লিখলুম, আব্দুল্লা না থাকলে যে মর্জিনাও হতনা সেটাও লিখলুম।কিন্ত এরা দুজনে থাকলে কি হবে? আলিবাবা ও তার বউ না থাকলে যে চিচিং ফাঁক হত না সুধু সেটা লিখতে পুরো ভুলে মেরে দিলুম। ব্যাস এই গুল্লু এপিসোডের পরে তৃতীয় খন্ড লিখতে গিয়ে মাথা আরো গুলিয়ে গেল। অবসাদগ্রস্ত মন নিয়ে জবরদস্তি লিখতে গিয়ে টের পেলুম যে হাঁপিয়ে যাওয়া অক্ষরগুলো বলছে প্রাচীন জনগণতান্ত্রিক নবযুগের সাথে নয়াগণতন্ত্রের সমীকরণ মিলেমিশে গিয়েছে। আমি যখন লিখিনা তখন অন্যের লেখা গপগপিয়ে পড়ি কিন্ত এবার আমার লেখার মাঝ থেকে বাসী সবদেহের গন্ধ ছড়াচ্ছে।বিকট মাথার যন্ত্রণা ও নিদ্রাহীনতার তাড়নায় আমি আবার লেখা বন্ধ করলুম! এক্কেবারে রাইটার্স পেন ম্যাচিং উইথ দ রিডার’স ব্লক।
অবিশ্যি বেশিদিন লেখালিখি ছাড়া থাকতে পারলুম না। ঘনঘন জল খেয়ে অম্লশূল ও ঘোল খেয়ে পাইলস হবে , এই ভেবে আবার লিখতে বসে গেলুম। তিন অধ্যায় তো ওদিকে ত্রিভঙ্গ মুরারির মত ঝুলেই খালাস, চতুর্থ ও শেষ খন্ড দিয়ে ঠ্যাকনা না দিলেই নয় ! ঠ্যাকাতে গিয়ে ঘটনা ঠেকলো সেই উত্তর কলকাতার ঠেকের গল্পে যেখানে কাঁচা সিমেন্টে ঝাঁটার কাঠি দিয়ে অজ্ঞাত কেউ লিখে দিয়েছিল ‘বকম বকম পায়রাগুলোর/আকাশে ওড়ার সখ/মোদের আকাশ ছুঁতে মানা /তাই মাটির বুকেই রক।” উত্তর হোক কিম্বা দক্ষিন, রোয়াক কিম্বা ফ্ল্যাটের ছাদ, গনগনে রোদ কিম্বা বৃষ্টি ভেজা দুপুর- অনেক কিছুই লেখা আছে ইঁটের ফাঁকে ফোঁকরে আটকে থাকা সবুজ শ্যাওলায়। নবযুগের চতুর্থ অধ্যায়ে শ্যাওলা বা জোনাকির গল্প নেই ! নেই লম্বা গাছের আগায় নুইয়ে পরা শিমুলফুলের কুঁড়ির কিম্বা ঝোপের কোণে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট লজ্জাবতী গাছের পাতাগুলির।এ যুগে শ্যাওলা থাকলেই বা কি, পা পিছলে পড়লে তো কেউ এগিয়েও আসবেনা ! নদীর জলে ডুবে মরলেও কেউ আসবেনা বলে আমার প্রিয় নদীটি শুকিয়েই গেল, এখন তার ধার ঘেসে সারি সারি ট্রাক জড়ো হচ্ছে , তাজা বালি তুলে নিয়ে যাচ্ছে বড় বড় বাড়ি আর ব্রিজ তৈরী হবে বলে। বাড়ি, গাড়ি, ব্রিজ, রাস্তা দিয়ে আমরাও ফি বছর উঠোন সাজাতুম ঝুলনের দিনে, তখন নকুল দানা ছিল টোল ট্যাক্স আর বাতাসা হলো ফাইন ! ঝুলনের পাট চুকলেই মিউনিসিপালিটি ভোটের আগে শেতলা পুজো দিয়ে কমরেড শেফালী মিত্র যখন মার্কস এঙ্গেলসের ফটোতে জবাফুল ঠ্যাকাতো তখন অবশ্য নবযুগীয় ভাইবেরাদেরা ভূমি সংস্কারের পরে বেঁচে যাওয়া অবৈধ জমির জরিপ করতেই ব্যস্ত থাকতেন।এখন কেউ আর জমি জরিপ নিয়ে মাথা ঘামায় না কেননা জমিমন্ত্রী থেকে রাস্তামন্ত্রী সকলেই মুখ্যমন্ত্রীর অনুদেশ মেনে উন্নয়নমন্ত্রকের হাত ধরে পিন্ডিখেকো সিন্ডিকেটে পুজো দিচ্ছে।
ঠাকুমা বলতো ভোররাতের স্বপ্ন সত্যি হয়, দিদা বলতো ঐ সময় পেচ্ছাব পেলে স্বপ্নের জোর আরো বেড়ে যায় ! সব হারিয়ে যাচ্ছে তবু আছে ভোররাতে স্বপ্নের মাঝে এসে উঁকি দিয়ে যাওয়া অজানা অশরীরীর করুণ প্রশ্ন, “অবনী, বেঁচে আছো?” এই খন্ডের মাঝঅব্দি যখন লেখাটা এগুলো তখন ভাবলুম অবনী নিশ্চই বেঁচে আছে এবং ভালো আছে। তবে অবনী সত্যিই বাড়িতে আছে কিনা বা কেউ তাকে কড়া নেড়ে বিরক্ত করে কিনা তা আর শেষমেষ খোজ নেওয়া হলো না ! নবী করিম বললো খোঁজ নেবে কি করে? এ যুগে অবনীর দরজায় তো আর কড়া নেই, কলিং বেলও নেই, এমনকি ওর মোবাইল নম্বরও নেই যে একটা মিস্ড কল দিয়ে বুঝে দেখবো যে সত্যি নাপাক অবনীটা বেঁচে আছে কিনা ! পাক নবী করিম এও বলেছেন যে মানুষের বাঁচা মরা নিয়ে যারা ভাবে তাদের আর লেখার সময় কোথায় তাই অবনীর বাঁচা মরা নিয়ে তাই আর কেউ ভাবছে না ! সাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লামের দিব্বি লিখতে লিখতে অনেক ব্যালা হলো ,যাই হালকা করে গিয়ে মুতে, এদিক ওদিক কোনো দিকেই না তাকিয়ে, অবনীর আত্মাকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে ফের পাশ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ি !

নবযুগ – চতুর্থ ও শেষ খন্ড
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments