আমার জঙ্গলে ঘোরার নেশার কথা অ্যাদ্দিনে ব্লগের সবাই জেনে গেছেন। হঠাৎই হাতে একটা ডিজিটাল ক্যামেরা এসে পড়ায় কিছু নতুন ধরনের ছবি তুলতে শুরু করি মাসদুয়েক আগে থেকে। নতুন ধরন বলতে জীবজন্তু, পাখ-পাখালির ছবি, যা এতদিন আমার মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে সম্ভব ছিল না। আজ বলব আমার চারপাশের পাখিদের কথা। এখানে যে ছবিগুলো দিয়েছি সেগুলো সবই আমার নিজের তোলা। তথ্যগুলোও নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা। ইন্টারনেট ঘেঁটে জানা আরও অনেক তথ্য দেওয়া যেত, তবে আপাতত শুধু নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলাম। এ অঞ্চলের অনেক পাখিকেই ক্যামেরাবন্দী করতে পেরেছি। আবার অনেক পাখি বহুবার দেখেও তাদের যুতসই ছবি তুলতে পারিনি, কখনও তাদের অতি-চঞ্চলতার জন্য, কখনও বা নিজের ক্যামেরা-অপটুতার জন্য। এখানের সব ছবিও হয়তো খুব পরিস্কার নয়। সেজন্য আগাম মাফ চেয়ে রাখছি। চেষ্টা করব পরে আরও ভাল ছবি দেওয়ার।]
মনে আছে এখানে এসে প্রথম প্রথম সব অন্য-রকমের মাঝে কাক-শালিখ-চড়াই দেখে উল্লসিত হতাম। সব অচেনার মধ্যে একটু চেনার ঝিলিক। অবশ্য তারাও সবক্ষেত্রে একদম আমাদের দেশের মত নয়। কাকগুলো যেমন এক্কেবারে কাকেশ্বর কুচকুচে, অনেকটা দাঁড়কাকের মত। শালিখের মত দেখতে অনেকটা যে পাখিটা, সেই American Robin কিন্তু আসলে ঠিক শালিখের সমগোত্রীয় নয়। এরা হাঁটে, তবে হপ করতে অর্থাৎ লাফাতেও পারে, আর শালিখের মত দুলে দুলে হাঁটে না। House Sparrow অর্থাৎ আমাদের দেশের মত চড়াই আছে যেমন, তেমনি আছে আরও অনেকরকম চড়াই। তাদের কয়েকজনের ছবি নীচে দিলাম।

American Robin

 

American Robin

 

Song Sparrow

 

Singing Song Sparrow

 

Chipping Sparrow

Chipping Sparrow

 

House Sparrow (female)

 

White Throated Sparrow

 

এদের মধ্যে আমার সবচেয়ে পছন্দ Song Sparrow কে। সাধারণ কিচিরমিচির নয়, এরা অপূর্ব সুরেলা গলায় গান গায়। বাড়ির আশেপাশে প্রায়ই Song Sparrow-দেরচোখে পড়ে এবং গানও শোনা যায়। পেটে ছিটছিট দাগ দেখে সহজেই চেনা যায় এদের। Bright brown টুপি পরা Chipping Sparrow রাও গান করে, তবে সে গান অনেকটা কিচিরমিচির-ধর্মী। এদের গলার জোর প্রশংসনীয়। তবে সবচেয়ে সুন্দর দেখতে বোধহয় White Throated Sparrow। গলার কাছটা সাদা, দুই গালে নীলচে ভাব আর কপালের হলুদ রঙ, সব মিলে খুব আকর্ষণীয়।

একটু বড় জাতের চড়াই Eastern Towhee এর গায়ে কালো, খয়েরী আর সাদার বাহার। গাছের নীচে ঝরে পড়া পাতার মধ্যে ঝড় উঠেছে দেখলে বুঝবেন সেখানে কোনওEastern Towhee পোকা খুঁজছে। প্রায়শই ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে থাকলেও এদের দেখা পাওয়া খুব মুশকিলও নয়।

Male Eastern Towhee

 

Female Eastern Towhee

আরেকটা খুব চেনা পাখি হল Mourning Dove,অর্থাৎ আমাদের ঘুঘু পাখি। ফিঙ্গে জাতীয় বেশ কিছু পাখি দেখা যায় আশেপাশে। তার মধ্যে লাল-বুক ওলা সুগায়ক House Finch রা যেমন আছে, তেমনি আছে ছোট্ট হলুদ American Goldfinch। কৌতুহলী দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকানো House Finch-এর বাচ্চাটার ছবি তুলে খুব মজা পেয়েছিলাম।

 

Mourning Dove

 

Male House Finch

 

Male and Female House Finch

 

Young House Finch

 

American Goldfinch

 

Tufted Titmouse, Carolina Chickadee বা Nuthatch দের হামেশাই দেখতে পাওয়া যায় Bird Feeder -এ। এরা সকলেই অত্যন্ত চঞ্চল, একজায়গায় স্থির হয়ে বসতে এদের চরম আপত্তি। Tufted Titmouse দের ঝুঁটিটা, আরও অনেক পাখির মতই, সবসময় খাড়া থাকে না। বরং মিশে থাকে মাথার সঙ্গে। কেবলমাত্র উত্তেজিত হলে বা ঝগড়ার মেজাজে থাকলে ঝুঁটিটা ক্রমশ মাথার উপর খাড়া হয়ে ওঠে। Nuthatch এর ট্রেডমার্ক হল এদের খাড়া গাছের গায়ে বসে মাথা তুলে তাকানোর ভঙ্গিটা… ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে, ঠিক সেরকম…

Carolina Chickadee

 

Tufted Titmouse

 

Brown Headed Nuthatch

 

ঝোপেঝাড়ে ঘুরে বেড়ানো পাখির মধ্যে Brown Thrasher আমার অসম্ভব প্রিয়…তাদের সুন্দর ছিটছিট জামার জন্য। এছাড়া রয়েছে Common Grackle,এদের ওপর ভয়ঙ্কর রাগ হত যখন এরা Bird Feeder এ হানা দিয়ে অন্য সব পাখিদের ভাগিয়ে দিত। তবে গায়ের চকচকে কালো পালকে রোদ পড়ে যখন, তখন Common Grackle কে বেশ আকর্ষণীয় লাগে। মাঝেমধ্যেই Eastern Phoebe আর Willow Flycatcher রা উঁকি মারে গাছের ফাঁক থেকে। একটা অত্যন্ত শিশু Willow Flycatcher কে হাতে ধরার সুযোগ হয়েছিল একবার। সে বেচারা পথ হারিয়ে জলের কাছে চলে এসেছিল। তখনও উড়তে শেখেনি ভাল করে। শেষ পর্যন্ত তার বাপ-মা কে খুঁজে বার করতে পেরেছিলাম। তার ছবিও এখানে দিলাম।

Brown Thrasher

 

Common Grackle

 

Eastern Phoebe

 

Baby Willow Flycatcher

 

এবার বলব নর্থ ক্যারোলিনার স্টেট বার্ড Northern Cardinal এর কথা। পুরুষ Cardinal রা টুকটুকে লাল হলেও, মেয়েরা সবজেটে ধূসর রঙের। এদের ঝুঁটিটা অনেকটা আমাদের বুলবুলির মত। গান গাওয়ার লড়াইতেও কারও থেকে পিছিয়ে নয়এরা। বরফে মোড়া পাতাঝরা শীতকালের পর বসন্তের প্রথম রঙ হিসেবে Northern Cardinal-রা এসে পড়ে যখন, তখন মনটা খুশি খুশি না হয়ে যায় কোথায়?

   Male Northern Cardinal

 

Female Northern Cardinal

 

রূপের লড়াইতে পিছিয়ে থাকবেনা উজ্জ্বল নীল রঙের পিঠ আর খয়েরী রঙের বুক ওলা Eastern Bluebird। তবে এদের ক্ষেত্রেও মেয়েরা যথারীতি একটু কম উজ্জ্বল। নীল রঙের আরেক পাখি Blue Jay ও অসম্ভব সুন্দর দেখতে। এরা কিন্তু কাকজাতীয় পাখি। গলার স্বরও বেশ কর্কশ, এবং ঝগড়াঝাঁটি করতে এক্কেবারে ওস্তাদ।

Eastern Bluebird (male)

 

Eastern Bluebird (male)

 

Eastern Bluebird (female)

 

Blue Jay

 

Blue Jay

 

আরেকটি বিশেষ ধরনের পাখি হল Red Headed Cowbird। এ হেন নামকরণের কারণ এরা গোরুর দলের পিছুপিছু ঘোরে এবং গোরু চরার আর ঘাস খাওয়ার সময় ঘাসের ফাঁক থেকে যেসব পোকামাকড় বেরিয়ে আসে, সেগুলো খায়।

Red Headed Cowbird (male)

 

Red Headed Cowbird (male)

 

Red Headed Cowbird (female)

 

এখানে তিন রকমের কাঠঠোকরা নজরে পড়েছে আমার। যার মধ্যে Red Bellied Woodpecker এবং Downy Woodpecker এর ছবি তুলতে পেরেছি। তাও ব্যাটা Red Bellied টা কিছুতেই আমার দিকে মুখ ফেরালো না!

Downy Woodpecker

 

Red Bellied Woodpecker

আরেক শ্রেণীর পাখি Mockingbird, যাদের কাজই হল অন্য কে ভেংচানো। এর মধ্যে প্রধান হল Northern Mockingbird আর Gray Catbird। এরা শুধু যে অন্য প্রাণীকেই ভেংচায় তা নয়, যা শোনে তাই নকল করার চেষ্টা করে। একটা Northern Mockingbird কে আমি বাড়ির কলিং বেলের আওয়াজ অবধি নকল করতে শুনেছি। এই প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি। বহুদিন আগে তারাপদ রায়ের ডোডো তাতাই সিরিজের একটা মজার গল্প পড়েছিলাম… “পাখিরা কখন দাঁড়ায়”… তাতাইবাবুর গবেষণা করতে শখ হয়েছে পাখিরা কখন দাঁড়ায়। ওরা কি আসলে দাঁড়িয়েই থাকে? তাহলে বসে কখন? কন্সেপ্ট টা বেশ পছন্দ হয়েছিল তখন। কিন্তু এই জঙ্গলে ঘোরাঘুরি শুরু করার পর লক্ষ করলাম আসলে অনেক পাখিরই দাঁড়ানো আর বসার (resting position) মধ্যে বেশ স্পষ্ট তফাত আছে। যেমন Gray Catbird দাঁড়ানোর সময় লেজটা উপরে তুলে রাখে (ছবির মত), কিন্তু বসলে পরে সে লেজটা ঝুলিয়ে পাখার মত মেলে দেয়। হাঁস জাতীয় পাখিরাও প্রায়শই পা গুটিয়ে পেটের ওপর ভর দিয়ে বসে রোদ পোহায়।  

Northern Mockingbird

 

Northern Mockingbird

 

Grey Catbird

Swallow জাতীয় পাখিদের উড়ান একটা দেখার মত জিনিস। কাঁচির মত লেজ আর ডানা নাড়িয়ে প্রচণ্ড গতিবেগে ওড়ে এরা। এই অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত দুটি Swallow হল Barn Swallow আর Purple MartinBarn Swallow এর যে ছবিটা এখানে দিলাম তাতে এর আসল রূপ বোঝা যাচ্ছে না। গাঢ় নীল ডানা, খয়েরী গলা আর Off White পেট… যখন সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে ওড়ে, সেটা দেখার মত হয়। দুর্ভাগ্যবশত বহু চেষ্টাতেও সেরকম কোনও ছবি তুলতে পারিনি। প্রতিবারই ওদের ওড়ার বেগ আমার Shutter Speed কে টেক্কা দিয়েছে। তবে আপনারা যে কোন সময় ইন্টারনেটে উড়ন্ত Barn Swallow এর ছবি দেখে নিতে পারেন।  Purple Martin রা বরং তুলনায়  অনেক কম ছটফটে। পাখিদের জন্য বানানো Bird house গুলো কেন জানি এদের খুব পছন্দ। সুযোগ পেলেই ওরকম Bird House এ এসে আড্ডা জমায়।

Barn Swallow

 

Eastern Kingbird

 

Purple Martin

 

   Purple Martin

এবার বলি কিছু জলের পাখির কথা। Mallard, অর্থাৎ আমাদের পরিচিত হাঁস এবং তাদের পরিবারের বেশ কিছু ছবি এখানে দেওয়া গেল। এছাড়া আছে উজ্জ্বল রঙের Common Shelduck (এরা আসলে ইউরোপের পাখি), পরমাসুন্দরী Mandarin Duck, ছুঁচলো লেজ ওলা Northern Pintail আর Black Necked Swan

Mallard (male)

 

Mallard (female)

 

Mallard Duckling

 

Young Mallards taking a sunbath

 

Mallard family, mon and young ones

 

Northern Pintail

 

Mandarin Duck

 

Common Shelduck

 

Black Necked Swan

 

এছাড়া রয়েছে Great Blue Heron বা Green Heron, যাদের মাছের অপেক্ষায় বসে থাকার ধৈর্য্য দেখে মনে হয় আমার যদি এর সিকি ভাগও থাকত! Canada Goose আর Barnacle Goose দের দুলকি চালে হাঁটা দেখতেও বেশ মজা লাগে। লম্বা গলার নীচে এদের চেহারাটাও বেশ হৃষ্টপুষ্ট। মায়ের পিছু পিছু চলা এক কম বয়সী Canada Goose এর ছবিও এখানে দিলাম।

Great Blue Heron

 

Great Blue Heron

 

Great Blue Heron

 

Green Heron

 

Canada Goose

 

Canada Goose

 

Young Canada goose with mom

 

Barnacle Goose

সমুদ্রের কাছাকাছি গেলে দেখা যায় বিভিন্ন রকমের Sea Gull আর উড়ন্ত Brown Pelicanএর ঝাঁক। এছাড়া মাঝে মধ্যে দেখা দেয় Royal Tern এর দলও।

Common Gull

 

Black Headed Laughing Gull

 

Flying Brown Pelicans

 

Flying Royal Tern

ওহো! জলের পাখিদের মধ্যে একজনের কথা তো বলাই হয়নি। তিনি হলেন Double Crested Cormorant, অর্থাৎ পানকৌড়ি। Double Crested কারণ এদের জোড়া ঝুঁটি আছে। যদিও সে ঝুঁটি খুব কম সময়ই দেখা যায়, বেশিরভাগ সময়ই তা মাথার সঙ্গে মিশে থাকে। মাছ ধরার জন্য এদের ধৈর্য্যও দেখার মত। তবে এরা জলে সাঁতারও কাটে মাঝেমধ্যেই, যা আবার Heron দের একেবারেই নাপসন্দ।     

Double Crested Cormorant

 

Double Crested Cormorant

 

Double Crested Cormorant

চিল জাতীয় অনেক রকম পাখিই আছে এখানে, তার মধ্যে Red Shoudered Hawk, Osprey আর Bald Eagle এর ছবি এখানে দিলাম। একবার একটা মাছ নিয়ে একটা Osprey আর একটা Bald Eagle কে ধুন্ধুমার মারপিট করতে দেখেছিলাম। সেটা কখনও ভুলব না।

Red Shouldered Hawk

 

Osprey

 

Bald Eagle

 

আজকের মত নটে-গাছটিকে এখানেই মুড়োতে বলা যাক…

ভবিষ্যতে যেসব পাখি বাকি রয়ে গেল তাদের কথা এবং অন্য সীজনের অন্য পাখিদের কথা নিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করব।

সবশেষে বলি, আমি কোন পক্ষী-বিশারদ নই। স্বল্প সময়ের অভিজ্ঞতায় যা যা জেনেছি আর যেসব পাখি দেখেছি তাদের কথা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য এই লেখা। কোন তথ্যগত ভুল-ত্রুটি নজরে পড়লে শুধরে দিতে দ্বিধা করবেন না… ।

***সবগুলি ছবি আমার Canon Powershot S3 IS ক্যামেরায় তোলা।
 

নর্থ ক্যারোলিনার পাখি রা
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments