আগের পর্ব – গ্রীষ্মের পাখি  

এবারের পর্ব দিয়ে শেষ করব নর্থ ক্যারোলিনার ডাঙার পাখিদের কথা। এবারের সঙ্গী শিকারি পাখিরা। শিকারি পাখিরা আকারে বড় বলে সহজে চোখে পড়ে যেমন, তেমনি তাদের প্রখর দৃষ্টিশক্তির কারণে ফোটোগ্রাফার মশাইও সহজেই তাদের চোখে পড়ে যান। ফলে এদের ছবি তোলা খুব সহজ নয়। তবে এদের অনেককেই মাথার ওপর উড়তে দেখা যায় প্রায়শই। জলের কাছাকাছি গেলে মেছো চিল, মেঠো অঞ্চলে গেলে ফ্যালকন, বিভিন্ন জায়গায় অন্যান্য চিল বা বাজপাখি জাতীয় পাখিদের দেখা যায়। আছে আমেরিকার প্রিয় পাখি বল্ড ইগলও।

হক, কাইট, ফ্যালকন, ঈগল ইত্যাদিরা সকলেই শিকারি পাখি হলেও তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। বেশি টেকনিকালিটিতে ঢুকবনা, এমনিতেই আমেরিকানরা পাখির নামকরণের সময় বিজ্ঞানসম্মত শ্রেণীবিভাগের ধার ধারেনা, এবং আলাদা প্রজাতির পাখিদের একই নামে ডাকে, তাই সেসব ব্যাপারে বেশি চাপ না নেওয়াই ভাল।

Red Shouldered Hawk

Red Shouldered Hawk

হক দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় Red Shouldered Hawk এবং Red Tailed Hawk দের। ছবি দেখলেই নামকরণের সার্থকতা পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু আদতে এরা নাকি "হক"ই নয়। বুঝুন ঠ্যালা! সে যাকগে, রেড শোলডারড হক প্রথম দেখেছিলাম ডিউক গার্ডেনে। গাছের পাতার আড়ালে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল, ডাক শুনে খুঁজে পাই। না না, রেড শোলডারড হকের ডাক নয়, রবিন, স্টার্লিং আর মকিংবার্ডের কিচিমিচি শুনে। আশেপাশে শিকারি পাখি এলেই এইসব ছোটো পাখিরা দল বেঁধে তার পিছনে লেগে তাকে ভাগানোর চেষ্টা করে, নিজেদের সুরক্ষার খাতিরেই… সেইসঙ্গে যোগ দেয় কাকরাও। কাকেদের সাথে শিকারি পাখিদের সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়।

Red Tailed Hawk

Red Tailed Hawk

এই দুই হক এরই দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর, আকারে বেশ বড়ো, ঠোঁটটা অত্যন্ত ধারালো, উঁচু থেকে নেমে এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় পাখি, ইঁদুর, খরগোশ, সবই। এ অঞ্চলের আরেকজন নিয়মিত সদস্য Osprey এর নজর কিন্তু মাছের দিকে। এই মেছো চিলকে প্রায়ই দেখা যায় লেকের জলে ঝাঁপ দিয়ে মাছ শিকার করতে এবং সেই মাছ পায়ে করে ধরে উড়ে যেতে।

Osprey with fish

এছাড়া আছে Cooper's Hawk এবং Sharp Shinned Hawk, যাদের দেখতে প্রায় একই রকম। খুব খুঁটিয়ে না দেখলে তফাত করা যায়না। এরা আকারে সামান্য ছোটো, পিঠের রঙ স্লেটের মত, আর বুকে কমলা বাদামী দাগ। এরা যদিও সারাবছরই থাকে, কিন্তু শীতকালে দেখা যায় বেশি।

Cooper's Hawk

Sharp Shinned Hawk

সবচেয়ে বড়ো সাইজের শিকারি হল Bald Eagle, মাথার রঙ সাদা বলে সম্ভবত এমন নাম হয়েছে। এরাও মাছ খেতে খুব ভালবাসে, তবে তাছাড়াও অন্যান্য শিকারও করে থাকে। বল্ড ঈগলরা এক জায়গায় অনেকে দল বেঁধে থাকে, কিন্তু সেরকম কোনো জায়গায় গিয়ে উঠতে পারিনি। এরা সংরক্ষিত পাখি, এবং এদের পালক রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখলেও কুড়োবেননা, পুলিশে জানতে পারলে জেলে যেতে পারেন! বল্ড ঈগলরা শীতকালে মেটিং করে, যেটা এ অঞ্চলের অন্যান্য পাখিরা সাধারণত করেনা।

Bald Eagle

ফ্যালকন জাতীয় পাখিরা আকারে অনেক ছোটো হয়, এরা গ্লাইড করে অনেক কম, ডানা ঝটপটিয়ে ওড়ে, এমনকি একই জায়গায় উড়ে থাকতে পারে। এরা সাধারণত মেঠো অঞ্চলে থাকে এবং ইঁদুর টিঁদুর ধরে খায়। ফ্যালকনদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল Peregreine পৃথিবীর দ্রুততম পাখি, ছোঁ মারার সময় এদের স্পীড ২৪০ মাইল/ঘন্টা অবধি হতে পারে। তবে এদের কখনো দেখিনি, যাদের দেখেছি তারা হল ফ্যালকনদের মধ্যে আবার সবচেয়ে ছোটো সাইজের American Kestrel। অসাধারণ দেখতে, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেই উড়ে পালায় বলে বহু কসরত করে তবে এদের ছবি তুলতে হয়েছে।

American Kestrel

শিকারি পাখিদের বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় উড়ন্ত অবস্থায়। নিচে একটা ছবি দিলাম কোন পাখিকে উড়ন্ত অবস্থায় তলা থেকে কেমন লাগে বোঝাবার জন্য। ক্লকওয়াইজ দেখলে এরা যথাক্রমে রেড শোলডারড হক, অস্প্রে, রেড টেইলড হক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক বল্ড ঈগল। তবে যাকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় আকাশে উড়তে, তাদের কথাই বলা হয়নি। আকারে এরা বল্ড ঈগলের চেয়েও বড়ো হতে পারে, অন্যদের মত সরাসরি শিকার না করলেও এদের শিকারি পাখিদের দলেই রাখা হয়। ঠিক ধরেছেন, শকুন। নর্থ ক্যারোলিনায় এমন দিন খুব কম গেছে যেদিন বেড়াতে বেরিয়ে আকাশে একটাও Turkey Vulture উড়তে দেখিনি। আমাদের দেশে শকুনরা বিপন্ন হলে কি হবে, এখানে রাশি রাশি শকুন। টার্কি ভালচারদের মুণ্ডুটা টার্কির মত লাল, তাই এমন নাম। সমগোত্রীয় Black Vulture দের মাথাটা কালো। এরা অনেক সময় দুই প্রজাতি পাশাপাশি বাস করে।

Turkey Vulture

Turkey Vulture scavenging

Black Vulture

শেষ যে পাখির কথা বলে শেষ করব, তারা আমার অত্যন্ত প্রিয় – প্যাঁচা। এখানে অনেক জাতের প্যাঁচা থাকলেও মাত্র একটি প্রজাতিকেই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তার নাম Barred Owl। আকারে বিশাল বড়ো, জঙ্গলে থাকে। দিনের বেলাতেও মাঝেসাঝেই দেখা যায় ডালে বসে ঝিমোতে। আশেপাশে কাকের চিৎকার একটা বড় ক্লু। বারড আউলের ডাক বেশ ভয়ঙ্কর, আগে না শুনে থাকলে রাত্রেবেলায় হঠাত শুনলে চমকে যাওয়ার সম্ভাবনা। ইউটিউবে সার্চ করে শুনতে পারেন। সন্ধ্যে নামতেই এদের আসল চেহারা বেরোয়। তখন এরা উড়ে উড়ে শিকার ধরে। ইঁদুর জাতীয় জিনিস সবচেয়ে প্রিয় হলেও, ছোটো-বড় নানারকম খাদ্যই খেয়ে থাকে এই প্যাঁচারা।

Barred Owl

Barred Owl

পরের পর্ব থেকে হাজির হব নর্থ ক্যারোলিনার জলের পাখিদের নিয়ে। ডাঙার পাখিদের চেয়ে তারা কিন্তু কিছু কম যায়না! 

 

** ছবিগুলি আমার ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস এবং পাওয়ারশট এসএক্স ৫০ এইচ এস দিয়ে তোলা।

 

নর্থ ক্যারোলিনার পাখি (১৩) – শিকারি পাখি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments