আগের পর্ব – কালো তা সে যতই কালো হোক  

এবারের পর্বের অতিথিরা হল আমরা সবচেয়ে প্রিয় পাখি কাঠঠোকরা। এদের চেহারা, রঙের বাহার, ক্রমাগত ঠুকরে যাবার অসম্ভব ক্ষমতা, বিশেষ জিভের কেরামতি (আগে একটি লেখায় বলেছি এর কথা), সবকিছুই দারুণ আকর্ষণীয়। আমাদের দেশের মত এখানেও নানান রকমের কাঠঠোকরা আছে। নর্থ ক্যারোলিনায় মোটামুটি ৬-৭ রকম দেখা যায়।

কাঠঠকরা দের কাজ, কে না জানে, দিবারাত্রি গাছের ডালে ঠুকরে যাওয়া। কিন্তু কেন ঠোকরায় এরা? প্রধান কারণ অবশ্যই গাছের গায়ের থেকে পোকাদের বার করে উদরসাৎ করা। কিন্তু সেটাই একমাত্র নয়। গাছের গুঁড়ি ঠুকরিয়ে ফুটো করে বাসাও বানায় এরা। এছাড়া আরেকটা ব্যাপারও আছে। কাঠঠোকরারা সুগায়ক নয়। তা বলে কি মেয়েদের ইম্প্রেস করবেনা? এরা ভোকাল মিউজিকে পটু না হলেও ইন্সট্রুমেন্টালে বিশেষ ক্ষমতা আছে। গাছের গায়ে ঠুকরে ড্রাম বাজিয়ে মেয়ে পাখিদের আকৃষ্ট করে এরা। বিভিন্ন জাতের কাঠঠোকরার ড্রামিং বিভিন্ন রকম। শুধু ডাক নয়, তাদের ঠোকরানোর আওয়াজ শুনেও তাই সহজেই চেনা যায় অনেক সময়। মানুষ এদের বাসস্থান দখল করে নিচ্ছে, সেই সঙ্গে এরাও পরিচিত হচ্ছে মানুষের বানানো জিনিসের সঙ্গে। একটু শহুরে অঞ্চলে দেখেছি কাঠঠোকরারা শুধু গাছের গায়েই নয়, ল্যাম্পপোস্ট, বাড়ির ছাদ, লেটারবক্স, এসব জায়গাতেও ড্রাম বাজানো প্র্যাকটিস করছে।

Downy Woodpecker

Downy Woodpecker

আকারে সবার চেয়ে ছোটো, পুঁচকে কাঠঠোকরা হল Downy Woodpecker। গায়ে সাদা কালোর ডিজাইন এ অঞ্চলের বেশিরভাগের মধ্যেই দেখা যায়, সেই সঙ্গে এদের আছে মাথার পিছন দিকে উজ্জ্বল লাল রঙের দাগ। ঠোঁটের আকারও খুব ছোটো, তাই এদের ঠোকরানোর আওয়াজও অপেক্ষাকৃত মৃদু। একেবারে একই রকম দেখতে Hairy Woodpecker দের চেনার উপায় হল এদের সাইজ। আকারে এরা ডাউনি দের চেয়ে কিছুটা বড় হয়, এছাড়া আরো কিছু সূক্ষ্ণ তফাত রয়েছে। এরা অপেক্ষাকৃত কম আসে মানুষের আশেপাশে, জঙ্গলে না গেলে এদের দেখা পাওয়া ভার। 

Hairy Woodpecker

আরেকটি বেশ কমন প্রজাতি হল Red-bellied Woodpecker। চেহারা দেখে প্রথম প্রশ্ন জাগবে রেড হেডেড না হয় রেড বেলিড কেন? অনেকটা আমাদের নীলকণ্ঠের মত ব্যাপার (যাদের কণ্ঠ বাদে বাকি প্রায় সবই উজ্জ্বল নীল)। আসলে রেড হেডেড উডপেকার নামে আরেকটি প্রজাতি রয়েছে। তাই নামকরণের বেলায় পেটই সই। এদের পেটে আবছা লালচে ছোপ রয়েছে (নিচের তিন নম্বর ছবি দেখুন)। এরা আকারে ডাউনি বা হেয়ারির চেয়ে কিছুটা বড়, ঠোঁটও বেশি শক্ত, আর ঠোকরানোর আওয়াজও তাই। 

Red-bellied Woodpecker

Red-bellied Woodpecker

Red-bellied Woodpecker

Red-headed Woodpecker রা একই রকম সাইজের, তাদের মাথার রঙ টুকটুকে লাল, সেই সঙ্গে কালো পিঠ আর সাদা বুক মিলে দেখতে অসাধারণ। এদের গাছের গা ছাড়াও অন্যভাবে পোকা ধরে খেতে দেখা যায়, এমনকি ফ্লাইক্যাচারদের মত শূন্যে ধরেও। রেড বেলিডদের মত অত বেশি দেখা যায়না। শুনেছি এদের সংখ্যা নাকি ক্রমশ কমে আসছে। তবে একটু জঙ্গলে গেলে প্রচুর রেড হেডেড উডপেকার দেখতে পাই।

Red-headed Woodpecker


Red-headed Woodpecker

Yellow-bellied Sapsucker দের স্বভাব একটু অন্যরকম। এরা গাছের গায়ে ঠোকর মেরে ফুটো করে সেখান থেকে চুঁইয়ে পড়া রস (Sap) খায়। জঙ্গলে হাঁটতে গিয়ে বিভিন্ন গাছের গায়ে পরপর ছোটো ছোট অগভীর ছিদ্র দেখলে বুঝতে হবে সেটা স্যাপসাকারদের কাণ্ড। এমনিতে বেশিরভাগ কাঠঠোকরারা শুকনো গাছ বা এমনকি মরা আধপচা গাছ ঠোকরাতে বেশি পছন্দ করে। কিন্তু এরা স্বভাবতই তাজা গাছ প্রেফার করে। এদের অত্যধিক ঠোকরানোর ফলে কখনো কখনো গাছগুলো মরেও যেতে পারে। ছেলে ইয়েলো ব্রেস্টেড স্যাপসাকারের কপাল ছাড়াও গলায় লাল রঙ দেখা যায়, মেয়েদের ক্ষেত্রে কেবল কপালে। মেয়েদের রঙও অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল। এদের ডাক শুনলে মনে হয় বাচ্চাদের ভেঁপুওয়ালা পুতুলের আওয়াজ।

Yellow-bellied Sapsucker (male)

Yellow-bellied Sapsucker (female)

Northern Flicker কাঠঠোকরা দের মধ্যে বেশ অন্যরকম। কাঠঠোকরা বললেই গাছের গায়ে খাড়া ভাবে বসে থাকার দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে, কিন্তু এরা বেশিরভাগ সময়ই অন্য পাখির মত অনুভূমিকভাবে বসে গাছের ডালে। এমনকি মাঝে মাঝেই এদের মাটির কাছাকাছি নেমে এসে ঘাসের ফাঁকে পোকা খুঁজতেও দেখা যায়, যা অন্য কাঠঠোকরাদের ক্ষেত্রে বিরল। নর্দান ফ্লিকাররা দেখতে খুব সুন্দর। বুকে পেটে কালো ডট, পিঠ বাদামী ঘেঁষা এবং ডিজাইন করা, মাথায় ও গালে লাল আবির। ডানার নীচে আর লেজের নীজে উজ্জ্বল হলুদ রঙ ওড়ার সময় স্পষ্ট দেখা যায়। হঠাত যদি দেখেন মাথার ওপর দিয়ে হলুদ রঙ ঝলসে উড়ে গেল একটা পাখি, সেটা নর্দান ফ্লিকার হবার সম্ভাবনা।

Northern Flicker

এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কাঠঠোকরা হল Pileated Woodpecker। আকারে বাকি সবার থেকে অনেকটাই বড়, কালচে বাদামী রঙের গা, আর মাথায় টুকটুকে লাল ঝুঁটি। এরকম দেখতে কিছু কাঠঠোকরা আমাদের দেশেও দেখা যায়। আকারে বড় বলে এদের ঠোঁটও অনেকটা বড় আর খুব শক্ত। এদের ঠোকরানোর আওয়াজ বহুদূর থেকে শোনা যায়। এমনিতে এদের জঙ্গল ছাড়া দেখা ভার হলেও একবার ভোররাত্রে আমার জানালার বাইরে এর ঠকঠক আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেছিল। জানলা দিয়ে দেখি ইনি বসে আছেন পাশের গাছে। তখনই পুটুস করে তুলে নিই নিচের ছবিটা।

Pileated Woodpecker

পরের পর্বে বলব সোয়ালো আর মার্টিনদের কথা। শিগগিরই ফিরে আসতে পারব আশা করি।

 

পরের পর্ব – সোয়ালো  

*** সমস্ত ছবি আমার Canon Powershot S3 IS দিয়ে তোলা।

 

নর্থ ক্যারোলিনার পাখি (৯) – কাঠঠোকরা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments