শীতকালের ভোরবেলা, ধরুন সাড়ে চারটে কি বড়ো জোর পাঁচটা, আকাশে অন্ধকার একটু একটু করে ফিকে হয়ে আসছে, দু চারটে বাড়িতে আস্তে আস্তে একটা করে আলো যেন জ্বলে উঠেই আবার নিভে গেলো, ছেঁড়া স্বপ্নগুলো জানলা দিয়ে আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে কলের শব্দ আর বাসনের আওয়াজের সাথে, এমনি সময় ঠাহর করলে দেখবেন, বনহুগলীর ঝিলের পাশে একটা গুমটি ঘরে আলো জ্বলে উঠলো, তাপসদা জল চাপালেন একটা স্টোভে, আর একটায় সসপ্যানে তেলের ছ্যাঁকছোঁক আওয়াজ …

এতো সকালে যখন উঠেই পড়েছেন, ভিতরে চলে আসুন … একটা ফাঁকা জায়গা দেখে এইবেলা বসে পড়ুন, আরেক রাউন্ড স্পেশাল চা এসেই যাবে এক্ষুনি, কোনটা যে কার কেউ জানে না, আর নেভি কাটের প্যাকেট তো অক্ষয় তূণ – খুঁজলে একটা আধটা সিগারেট ঠিক-ই পেয়ে যাবেন … চলুন আপনাকে নতুন একটা স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাই ! স্পটলাইট তো কবেই নিভে গেছে, এইবেলা স্টেজে উঠলেই বা দোষ কি?

 আমাদের বাড়ির ঠিক পিছনেই এক-কালে দু-দুটো বিশাল পানাপুকুর ছিলো, তাদের একটার পাশে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট জমি – আইনি মারপ্যাঁচে ফেঁসে গিয়ে যে দেশলাই বাক্স হতে হতে হয়ে গেলো আমাদের খেলার মাঠ, আদরের নাম "প্রবাহ" … নামটা কে দিয়েছিলো আজ আর মনে পড়ে না, তবে তার দূরদৃষ্টি যে অসামান্য তা স্বীকার না করে উপায় নেই, Y2K ক্রমে আসতে আসতে যে কয়েকটা জিনিষ হারিয়ে যায় সবার অলক্ষ্যে, প্রবাহ তাদেরই একজন … তো প্রবাহ যে শুধুই পুকুরে ফুটবল ফেলে আর একটা বিশেষ বাড়ির অ্যাসবেস্টসের ছাদে ক্যাম্বিস বল তুলেই দিন কাটায় না, সেইটা প্রমাণ করার দরকার পড়লো অচিরেই – এক বিকেলে মাঠে গিয়ে দেখি ওমা উইকেটের জায়গায় মাদুর পাতা । পাশাপাশি দু-দুটো নাটকের রিহার্সাল চলছে । একটা তো সেই রবি ঠাকুরের "পেটে খেলে পিঠে সয়", আর একটায় বোধকরি একটা ভয়ের গল্প। ভয় মানে বেশ ভালো ভয় – একজন হাবাগোবা লোক মিউজিয়ামে ঢুকে হারিয়ে গেছে আর রাত্রে মূর্তিগুলো জেগে উঠে তাকে গলা-ফলা টিপে ধরে বীভৎস কান্ডকারখানা । তো আমারও প্রথম রোল ওই মোমের মূর্তি, ডায়লগ নেই, মুখেচোখে কুটিল এক্সপ্রেশানও নেই – খালি রুমাদি ইশারা করলে পা টিপে টিপে এগোও … কিন্তু পানাপুকুরের পাশে মাঠ, মশা-রা কি আর নাইট্যশালা বোঝে? বার পাঁচেক কানমোলা খেয়ে বোধহয় নিরীহ গলায় কিঞ্চিৎ প্রতিবাদ করেছিলাম … পরের তিন মাসে বুঝলাম, পেটে খাও বা না খাও, নাটক করলে পিঠে অনর্গল সইতেই হবে, না হলে তুমি বাদ …

কিলে কাজ দিয়েছিলো, সেই কচি বয়সের পর বহুদিন রিহার্সাল শুনলেই চোঁচা দৌড় দিতাম যেন ব্রিগেডে টিয়ারগ্যাস পড়েছে । কিন্তু ওই ডেস্টিনি, কোথায় আর যাবে, একদিন টিফিনে স্কুলের পিছনের সেই ক্রিকেটের মাঠে ক্লাস টেনের দাদাদের কাছে একটা সুখটান দেবো বলে তীর্থের কাকের মতো বসে আছি ঝোপের ধারে, হঠাৎ শুনি কংক্রিটের পিচের উপর জলদ্গম্ভীর গলায় কে যেন চেঁচিয়ে উঠলো, "আর ভয় নাই, সুপ্ত সিংহ জেগেছে ! ভীমসা !!" …

ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে দেখি স্টেজের উপর দুইটি বেচারা ছেলে প্রাণপণে ডায়লগ গাঁতাচ্ছে । যেটা লম্বা সে সেজেছে প্রতাপ, আরেকটি বেশ নাদুস-নুদুস, সে শক্ত সিংহ ! তো খানিক ধরা পড়ার ভয়ে, আর বাকিটা ডি এল রয়ের ডায়লগে রক্ত গরম হয়ে, উঠেই পড়লাম স্টেজে – এদিকে বিধি কিন্তু সমানে বাম, যেন অ্য্যাডিলেডের মাঠে শচীনকে আউট করতে নেমে পড়েছেন ম্যাকগ্রা আর ড্যারিল হার্পার … আমাকে যে রোলটা দিলো, সে একটা সভাকবি, ছেলেদের স্কুল তাই নাটকে কোনো নারী চরিত্রই নেই – অত্তগুলো ডায়লগ জলে যাবে, তাই ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো আমি – ইদিকে আবার রামকৃষ্ণর নামে স্কুল, প্রতাপের ভোকাল টনিকে সৈন্যদল উত্তেজিত হয়ে গান গাইবে, "ধাও ধাও সমরক্ষেত্রে", হঠাৎ স্বামীজি মহারাজ এসে বায়না জুড়ে বসলেন না ওইখানে "জয় রামকৃষ্ণ জয়তু' গানটা গাইতেই হবে …

নাটক অবিশ্যি বিশাল হিট হলো, ডি এল রয়ের সেইসব জ্বালাময়ী ডায়লগ শুনে জনতা রেগে গেলেন, প্রতাপ আর শক্তের ঝগড়ায় চোখ ছলোছলো করলেন, এমনকি চেতক মারা যাওয়ার সময় যা কান্নার রোল উঠলো শুনে পেত্যয় যাবেন না যে স্টেজে ঘোড়াও ছিলো না, চাট্টি ঘাস-ও না … আমি যে খুব ক্ল্যাপ পেলাম তা নয় – স্টেজের উপর সময় দু-মিনিট দুলে দুলে কি বলেছিলাম জানিনা, অটোয় করে ফেরার সময় মা বললেন, 'বাবা পরের বার আর একটু জোরে গলায় বলিস, কেমন'? 

সেই যে শ্লা রোখ চেপে গেলো, গলা শুনিয়েই ছাড়বো সে আর যাওয়ার নয়, এ পাড়া, ও পাড়া, ইস্কুল-কলেজ যেখানেই দেখি ম্যারাপ বেঁধে নাটক হবো হবো ভাব, গিয়ে নাম লিখিয়ে দিই … কিন্তু কপালের নাম গোপাল, গলা কেউ-ই শুনতে পাবে না বলে পার্মানেন্ট জায়গা স্টেজের পাশে, হাতে একতাড়া চোতা নিয়ে প্রম্পটার … লাগুক না লাগুক, গোটা নাটক বিড়বিড় করে আউড়ে যাও – কার কবে গাঁত উল্টোবে সেই আশায় …

উল্টালোও, তবে গাঁত নয় – শিশি ! পাড়ারই নাটক ছিলো হবে, হিরো আমাদের সমাজের উপরে ঘেন্নায় মিনিট পয়ঁতাল্লিশ চিল্লমিল্লে লাস্ট সিনে বিষ খাবে – সব ডায়লগ বলা শেষ, অডিয়েন্সে তখন রুমাল খোঁজার হিড়িক পড়েছে চাদ্দিকে – এমন সময় হিরো বুঝলো, পকেটে চোতা থাকলেও বিষের শিশিটা ফেলে এসেছে ড্রেসিং রুমে … আবার না মরলেও চলে না, এ তো আর কোয়েন ব্রাদার্স নয়, যা হোক করে শেষ করে দিলেই হলো – হিরোর মাথায় বাল্ব জ্বলে উঠলো, গোটা একটা অডিয়েন্স হাঁ করে দেখলো প্রতিবিপ্লব কেমন নিজের গলা নিজেই টিপে আঁকুপাঁকু করে মরে গেলো।

কলেজে এসে দেখলাম, নাটকের ছড়াছড়ি – বছরে দুটো কালচারাল ইভেন্ট, রিপলস আর স্পটলাইট … স্পটলাইটে সব ব্যাচ-ই একটা করে নাটক নামায়, আমরাও লেগে গেলাম হইহই করে … প্রথম বছর ঠিক হলো বিরিঞ্চিবাবা … দিব্যি নেমেও গেলো সেটা … আমার রোল ছিলো নিবারণদা, রুমমেট ছিলো সত্য আর বিরিঞ্চিবাবা আর তার শাগরেদ ব্যাচের দুজন বাঘা অ্যাক্টর … রিহার্সাল চলছে, আমরা গল্প থেকে স্ক্রিনরাইটিং করছি … এক জায়গায় আছে সত্য হাসি চাপতে মনে মনে কল্পনা করছে ট্রেনের কলিসান হয়েছে আর রক্তারক্তি কান্ড, এক সিনিয়র দাদা রিহার্সাল দেখতে এসে আইডিয়া দিলো, "এই সিনটায় সব্বাই সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়বি, যেনো হাসপাতালের বেডে শয়ে শয়ে মৃতদেহ … আর একটা ছেলে এইসময় কালো টিশার্ট পরে ঘরের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চলে যাবে" … আমরা তো এসব শুনে ট্যান,রুমমেটের চিরটা কাল-ই খুব সাহস, আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা কালো টিশার্ট টা কিসের প্রতীক?" সিনিয়র দাদা গম্ভীর মুখে বললেন, "মৃত্যুর কালো হাওয়া" …

তো ফি বছর একটা করে নাটক হতো, সব-ই মজার গল্প, সেকেন্ড ইয়ারের নাটক হলো 'পানু গোয়েন্দা আর উডি অ্যাসিস্টান্ট', সেটা যে ঠিক কি ছিলো, whodunnit না ভূতের গল্প এখন আর ভালো মনে পড়ে না … তবে রিহার্সালগুলো ছিলো দারুণ আড্ডা ! কিছু কিছু লোক হয় না, অসম্ভব এন্থু, আর ততোধিক এনার্জি, যেনো ওবেলিক্সের মতন ছোটোবেলায় রেডবুলের চৌবাচ্চায়র পড়ে গেছিলো, তাই বড় হয়ে আর কিছু লাগে না- আমাদের ব্যাচেও ছিলো ! অর্ণব বরাট ! তাঁর মহিমাকীর্ত্তন করতে গেলে বই লেখা হয়ে যায়, তাও ধরুন এই আপনি সন্ধ্যেবেলায় ক্লান্ত শরীরে ভাবছেন, আহ একটা এগরোল, অমনি দেখবেন ম্যাজিকের মতন সামনে বরাট, হাতে একটি বোর্নভিল … আমরা নিশ্চিৎ ছিলাম তার বরাটের আসল টাইটেল ভগবান, অথবা ঈশ্বরের ন-লক্ষ কোটি নাম থাকতে পারে, কিন্তু পদবী একটাই, বরাট !

পরের বছর আরেক কাঠি সরেস, টাইম মেশিনে করে ঝিলাম নদীর পারে, সেই আলেকজান্ডার আর পুরুর সময় … নাটকের নাম "সত্য সেলুকাস", তাঁর স্ক্রিপ্টখানা ছিলো হীরক রাজার দেশের মতন, কবিতায় ঠাসা … আর মধ্যে মধ্যে এল্ভিস-এর গান … সেসব বড়ো সুখের সময় ! 

আরেক বছর বড় হলাম যখন, দেশে তখন আগুন জ্বলছে ! নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরের ছবি দেখে শিউরে ওঠা তখন রুটিন … কিছু একটা বলার ইচ্ছে গলা বেয়ে উঠে আসে কিন্তু বেরোতে পারছে না … সে বছরে আমরা নাটক করলাম, নাম "ব্যাঙ্গমঙ্গল" … সেই অ্যাবসার্ডিস্ট প্লট, রাজসভায় দুই রাজা, বুদ্ধু আর ভুতুম, তাদের বিপক্ষে এক ক্ষমতাময়ী দিদি আর তার চ্যালা বিব্রত, আর প্রোটাগনিস্ট – মার্স থেকে জমির লোভে এসে পড়া দুই অ্যালিয়েন, মঙ্গল আর পান্ডে … এত কিছু থাকবে আর স্টার আনন্দ আসবে না, তাই হয়? ক্যারেক্টার তৈরী হলো সাংবাদিক কুমন দে …

নাটক তখন আমাদের সবকিছু জুড়ে, কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে হাতে পেলাম অজিতেশের অনুবাদ চেকভের পাঁচটি একাঙ্ক (অতীশ দাশগুপ্ত এক্ষুণি বকে দিয়ে বলবেন, ওটা চেকভ নয়, শেকভ!) … আর টিউশনি করতে যাওয়া এক বাড়িতে একের পর এক দারুণ নাটকের বই … এক সন্ধ্যায় মেসের বাইরে নোটিশ পড়লো, হইহই কান্ড, রইরই ব্যাপার, আ গিয়া ড্রামা ক্লাব …

দারুণ শুরুয়াৎ হলো, সপ্তাহে সপ্তাহে মিনি ওয়ার্কশপ গোছের রিহার্সাল, নাটক ও চলছে, কিন্তু তার ডায়লগ কেউ মুখস্ত করবে না … পরিস্থিতি বুঝে নিজেরাই লিখে নেবে নিজেদের সংলাপ ! গল্প সমানে তৈরী হতো, রিহার্সালের ভিতরে-বাইরে – আমরাও কোনো এক কোণে বসে মুহুর্তে মুহুর্তে লিখে ফেলতাম কত গল্প, আর রাত বাড়লে অ্য্যাশট্রে তে ছাইয়ের সঙ্গে তাদের ফেলে চলে যেতাম ছাদের মালপার্টিতে … আমার এফ এম-এ শ্রীকান্ত আর ওল্ড মঙ্ক !

বীজ থেকে গাছ হতে লাগলো পাক্কা একটা গোটা বছর ! কলেজের জিওলজি অডিটোরিয়ামে একসাথে দু-দুটো নাটক নামলো সেবার, একটার নাম 'চেক-মেট' আরেকটা 'প্রস্তাব' …

চেক-মেট আসলে ঠিক নাটক নয়, একটা পালানোর গল্প – হঠাৎ করে অনেকদিন আগে ফেলে, মাড়িয়ে আসে অতীত যদি সামনে এসে বলে 'বাবু দুটো পয়সা দে' … কি করবেন সেই কলেজের অধ্যাপক? একটা ঠান্ডা নল, একটা দুর্বল মুহুর্ত  - আর এস্কেপ? নাহ, হাসালেন … 

উল্টোদিকে প্রস্তাব ছিলো দারুণ মজার, ওই অজিতেশের বই থেকেই … মাত্র তিনজনের কাস্ট, প্রাণগোপাল, রমা, আর রমার বাবা – দুই জুনিয়র দুটো মেন রোল, আর রমার বাবা – আমার ক্লাসমেট এবং গ্লাসমেট… সিনে সিনে অডিটোরিয়াম ফেটে পড়ছে হাত্তালিতে … কোনো বন্ধুর মুখ হয়তো একটু গোমড়া, অনস্ক্রিন আর অফস্ক্রিন ঘেঁটে যাচ্ছে থেকে থেকে, তবু বুকে পাথর রেখে সেও হাততালি দিয়ে যাচ্ছে সমানে … সেই বছরেই শ্রুতিনাটক কম্পিটিশানে, দুই বন্ধু করে ফেললো অজিতেশের দু-দুটো একাঙ্ক, 'তামাকু সেবনের অপকারিতা' আর 'নানা রঙের দিনগুলি' …

নাটক সিরিয়াস হোক বা মজার, রিহার্সালগুলো ছিলো খিল্লিবাজির ঠেক … স্টেজেও কি কম হতো? চেকমেট হওয়ার সময়, উইংসের উপর থেকে আলো কন্ট্রোল করার কথা দুই বন্ধুর … এদিকে এক সিনে ছিলো পাড়ার গুন্ডারা মূল চরিত্রকে মারধর করছে খুব, হঠাৎ দেখি উইংস ফেলে সব্বাই গিয়ে প্রোটাগনিস্টের প্রতিবাদী পাছায় দমাদ্দম লাথি ! পুষে রাখা রাগ, আর কি !

আই-এস-আইও এদিকে শেষ হয়ে আসছে, এই সময় একদিন বাবুদার দোকানে চা খেতে গিয়ে রাস্তায় দেখি একটা পুঁচকে বেড়াল, বেচারা-কে কাকে ঠোকরাচ্ছে খুব … একটা পেপ্সির ক্রেটে তাকে ভরে নিয়েই চলে এলাম হোস্টেলে, নাম রাখা হলো ঘঞ্চু, ভালো নাম তেজেন্দ্রনারায়ণ বসু (কেন বসু তা বলতে গেলে ঝুলি থেকে যে আরও কটা বেড়াল বেরোবে কেউ জানেনা, তাই চেপে গেলাম) …

ঘঞ্চু বলাই বাহুল্য একা এলো না, এলো অনেককে নিয়ে, যাঁরা বেড়াল ভালোবাসেন, যাঁরা বেড়ালকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের বড়োই ভালোবাসেন (অর্থাৎ সেকেন্ড অর্ডার পশুপ্রেমী) , যাঁদের বেড়াল দেখলে তিড়িতঙ্ক হয় কিন্তু তা-ও হৃদয় অবাধ্য ম্যাও … অচিরেই দেখা গেলো সন্ধ্যে নামলেই আমার রুমে প্রচুর লোকের কিলবিল, আর আমরা সেই তাপসদার চায়ের আড্ডায় ! এই "আচ্ছে দিন"-এর জোয়ারেই হয়তো হবে বা, ড্রামা ক্লাব-ও হঠাৎ সুদিন ফিরে পেলো … বিমলদা বললেন, টাকা নিয়ে ভাবিস না, একটা ড্রামা ফেস্ট শুরু করে ফ্যাল ! ব্যাস ! শুরু হয়ে গেলো প্রতিচ্ছবি ২০০৮ !

প্রতিচ্ছবির পোস্টার ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন? সেই ছোট্টবেলায় সরস্বতী পুজোর নেমন্তন্ন নিয়ে রাজকুমারী যেতাম, সেই আর এই … একদিন যাদবপুর, তো একদিন জেভিয়ার্স … সকালে কৌশিক সেনের গ্রীন্রুম তো বিকেলে নান্দীকারের অফিসে স্বয়ং রুদ্রপ্রসাদ । একদিন আমি আর এক বন্ধু চলে গেলাম শান্তিনিকেতন, দারুণ একজন লোকের সাথে আলাপ হলো, তারক সেনগুপ্ত – বললেন সঙ্গীত ভবন তোতাকাহিনী নিয়ে আসবে । জেভিয়ার্সের দল এলো, যাদবপুরের-ও । প্রত্যেক রাত্রে তখন আম্রপালী-তে রিহার্সাল, সেই আম্রপালী – উৎপল দত্ত যেখানে মন্ত্রমুগ্ধ করে গেছেন দর্শকদের আমি জন্মানোরও আগে । ঝিঁঝিঁ ডাকা রাত্তির, স্টেজের উপর বলে-কয়ে একটামাত্র লাইট, আর শেষ না-হওয়া মঞ্চে আমরা কজন …

শান্তিনিকেতন-এর দল যেদিন পৌঁছবে, তার আগের দিন তারকদা এসে দেখে গেলেন সব – আমরাও রেডি, চুয়ান্ন জন কলাকুশলী, তাঁদের রাখা হবে আইসেক-এর গেস্ট হাউসে, সব মেস-এ নোটিশ পৌছেঁ গেছে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করার । আসার দিন সক্কালবেলা বাস যখন স্টেশন থেকে ফিরলো, দেখি সেই চুয়ান্ন জনের মধ্যে পঞ্চাশজন-ই শান্তিনিকেতনের ছাত্রী …

সেদিন ক্যাম্পাসে যা হুড়োহুড়ি তেমন বুঝি বয়েজ হোস্টেলের ছাদে বোম ফাটলেও হতো না । সকালে হয়তো ভজমুরারীবাবু (আসল নাম নয়) প্যান্টে শার্ট গুঁজে ক্যাম্পাস যাচ্ছিলেন হেলেদুলে, হঠাৎ একদঙ্গল মেয়ে দেখে ব্যাগ কাঁধেই মেসে গিয়ে তিনবাটি সম্বর খেয়ে, চারবার বোতলে জল ভরে ফেললেন । যে ছেলেটি জিন্দেগিতে ক্লাস ডুব মারেনি নোট না পাওয়ার ভয়ে, সে-ও দেখি কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত ও যারপরনাই বলিপ্রদত্ত হয়ে ঘুরতে লাগলো সাউথ উইং-এর করিডরে …

সেবার যে নাটক করেছিলাম, তার কথা আজ বরং থাক (সব কথা কি খুলে বলতে পারবো কোনোদিন?) শুধু এইটুকু বলা যায় সে নাটকের নাম ছিলো "সব চরিত্র কাল্পনিক নয়" (এবং না টুকি নি, আমাদের নাটক ঋতুপর্ণ বাবুর ছবির আগেই বেরিয়েছিলো) । আর নাটকের লাস্ট সিনে যে শিখাটা নিভে গিয়েও নিভলো না, সেটা আর যাই হোক, কাল্পনিক নয় । নাটক হিট করেছিলো জানেন? তবে অডিয়েন্স ডাহা ফেল … 

সেই যে সেদিন স্টেজ থেকে নামলাম, জানতাম না সেটাই শেষ স্পটলাইটের আলো । তারকদা নাটকের পরে যখন এসে বললেন, নাটক তো দারুণ হলো বাবা – কিন্তু এ তো শুধুই হতাশা, শুধুই অন্ধকার – এর থেকে উত্তরণ কোথায়? বলেছিলাম, সেও একদিন হবে তারকদা, আরো বড়ো হই !

তারপর ? তারপর যা হয়, তা-ই … বড়ো হলাম, বুড়ো হলাম, কোথায় সেসব রিহার্সালের দিন, কোথায় সেই সব কুশীলব, যে যার পার্ট বুঝে নিয়ে, লাইন মুখস্ত করছে নিজের নিজের ঘরে বসে । স্পটলাইট নিভে যায় এইভাবেই, আমাদের অজান্তে । এক একদিন এখনো ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসি ভোর চারটে, সাড়ে চারটেয় – বাথরুমের আলোটা হঠাৎ জ্বলে উঠলে মনে হয় যেনো উইংসের ধারে ভুল করে একটা দেড় হাজারের হ্যাজাক লাগিয়ে গেছে বাপ্পাদা । আবার সেই পুরোনো ভয়টা ফিরে আসে – নেক্সট উইকে স্টেজ রিহার্সাল আর এখনো একটা গোটা সিন লেখা বাকি ! এক একদিন বাড়ি ফেরার রাস্তায় ক্লান্ত পা টললে নিজেই নিজেকে বলে উঠি, "প্রে ডু নট মক মি, আই অ্যাম আ ফুলিশ, ফন্ড ওল্ড ম্যান" !

তাও সেই ভোরবেলায় জানলার কাঁচে কুয়াশার মতন লেগে থাকে দু-একটা ছেঁড়া স্বপ্ন !

এক স্বপ্নে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই সেই পুরোনো পুকুরের পাড়টায়, রিহার্সাল জাস্ট শেষ হয়েছে, দোকান এখনো খোলেনি তাই একটা স্পেশাল তিন বন্ধু কাউন্টারে খাচ্ছি, 'আরেকটু কি ভালো হতো ওই সিনটা?', 'ভয়েস ওভারটা কি লম্বা হয়ে গেলো খুব'? 'এই – ঠিক এই কবিতাটাই কি বলতাম আমি, তাকে?' আমরা তিনজনেই চুপ, তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয় … 

আরেক স্বপ্নে আমি নিজেকে খুঁজে পাই সেই আম্রপালীর মাঠটায়। দেখি খুব ভিড় হয়েছে, লোক দাঁড়িয়ে গেছে গেট পেরিয়ে … স্টেজে সেই লাস্ট সিনটা হচ্ছে আর দেশলাই কাঠিটা জ্বলেও জ্বলছে না । উইংসের ধারে কয়েকজন পায়চারি করছে কপালে ভাঁজ ফেলে, আর হাতের সিগারেট টা টানতে ভুলেই যাচ্ছে টেনশনে … 'আব্বে ড্রপসিন, ড্রপসিন এখন, দড়িটা টান শিগগিরি !'

মঞ্চের বাইরে, একটু দূরে ভিড়ের মধ্যে আমি তখন, মনে মনে ভেবে ফেলছি আরেকটা নাটকের প্লট … এবার আর কলেজ ক্যাম্পাস না, একধাক্কায় গিরীশ মঞ্চ, পরেরবার অ্যাকাডেমি, বুঝলেন? 

নানা রঙের দিনগুলি
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments