বাংলার প্রবাদ – কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। অর্থ সবার জানা। বুঝতে পারিনা, এই রকম অর্থ কেন করা হবে? সে ছেলে চোখে দেখতে না-ই পেতে পারে, কিন্তু তার চোখ দুটি তো আছে, সেই চোখ পদ্মের মত দেখতে হলেই বা ক্ষতি কি? কাজেই রবীন্দ্রনাথ যতই প্রশ্ন তুলুন না কেন “একটি ছোটো মানুষ তাহার একশো রকম রঙ্গ তো / এমন লোককে একটি নামেই ডাকা কি হয় সংগত”। কানা ছেলে হয়ত খানিকটা সঙ্গত কারনে ক্রুদ্ধ হতে পারে তাকে পদ্মলোচন নামে না ডাকলে, কিন্তু যার চোখের দিকে তাকালে নিজের চোখ ফেরান না যায়, তার নাম যদি কানাই হয় আর সেও যদি রাগে ফেটে পড়ে, কেউ, এমনকি আদর করেও, তাকে পদ্মলোচন বলে ডাকলে, তাকে অসঙ্গত বলা যায় না। অতএব নাম অতি বিষম বস্তু। বহুদিন আগে এক চা নির্মাতার বিজ্ঞাপনে উল্লেখ থাকত নামে কিছুই যায় আসে না যদি না সে নামটি হয় উক্ত নির্মাতার নাম। কাজেই আসলে “নামের আমি, নামের তুমি, নাম দিয়ে যায় চেনা” (ইদানিং অবশ্য যেভাবে নাম দিয়ে চেনা যাওয়ার অপব্যবহার হচ্ছে, তাতে মজার চেয়ে আতঙ্কই বেশি জাগছে)। এই পর্যন্ত পড়ে নিশ্চয় কোথায় ধান ভানা হচ্ছে সেই ব্যাপারে অনেকের আগ্রহ জাগছে, সেই কারনেই এবার মূল বিষয়ে চলে যাচ্ছি।

আজি হইতে প্রায় চত্বারিংশ বর্ষ পূর্বে এক যুবক এক পুত্রসন্তান লাভ করে। যুবক অত্যন্ত আনন্দের সহিত শাস্ত্রীয় পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া উক্ত সন্তানের নামকরণ করে ‘পরিচয়’। নামকরণের শাস্ত্রীয় পদ্ধতিটি যাঁহাদের নিকট অজ্ঞাত, তাঁহাদের উদ্দেশ্যে। পদ্ধতিটি কিঞ্চিৎ এই প্রকার। একাধিক ঘৃতপ্রদীপের বিভিন্ন নামকরণ করিয়া তাহাদিগকে প্রজ্জ্বলিত করা হয়। যে প্রদীপ সর্বাধিক কাল প্রজ্জ্বলিত থাকে, সেই প্রদীপের নাম সদ্যজাতর নাম হিসাবে গৃহীত হয়। আমাদের নায়কের নামকরণ কালে এই পদ্ধতিটি অনুসৃত হইলেও দুষ্টজনে বলিয়া থাকে যে পূর্ব হইতেই ‘পরিচয়’ নামাঙ্কিত প্রদীপটির গর্ভে তুলনায় অধিক ঘৃত স্থাপিত হইয়াছিল। যাহাই হইয়া থাকুক, কালে কালে সেই সন্তান কোনও অজ্ঞাত কারনে নিজস্ব পদবিটির প্রতি বিরাগভাজন হইয়া পড়ে অথবা তাহার নামটির প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হইয়া পড়ে এবং নিতান্ত অপারগ না হইলে পদবিটির শরণাপন্ন হইতে দ্বিধান্বিত বোধ করিতে থাকে। কারণটি অজ্ঞাত হইলেও আমার একটি নিজস্ব পর্যবেক্ষণ বর্তমান। তাহা হইল – বর্তমানে একটি বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণীকক্ষে একই নামধারী ছাত্র-ছাত্রী লুপ্তপ্রায় গোষ্ঠী হইলেও ইহা তৎকালের অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য ছিল। ফলত ভবিষ্যতের জনপ্রিয় গোষ্ঠীর আদিতম না হইলেও আদিতর পুরুষ হিসেবে সন্তানটির প্রচ্ছন্ন অহংকার তাহাকে পরবর্তি সময়ে পদবিটিকে প্রায় ত্যাগ করিতে প্ররোচিত করে। এবং ‘অহংকার পতনের মূল’। পতিত না করিয়াও অহংকার কিরূপে বিড়ম্বিত করিতে পারে, কাহিনির অবশিষ্ট অংশে তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

একটা লোক, তাকে সবাই চিনবে বা নাম জানবে এমন কোনও মানে নেই। কিন্তু আমাদের গল্পের নায়কের এইসব জিনিস মাথায় থাকলে তো। একদিন অফিসে একটি ফোন এল। উদ্দিষ্ট ব্যাক্তির বদলে ফোনটি ধরলেন নায়ক। এরপর কথোপকথন

ফোনকারী – ক আছেন?

নায়ক – না। আপনি কে বলছেন?

ফোনকারী – আমি খ। গ থেকে বলছি। ক-এর সাথে ঘ নিয়ে কিছু কথা হয়েছিল, সেই ব্যাপারেই

নায়ক – ঠিক আছে। ক এলে আমি বলে দেব।

ফোনকারী – হ্যাঁ আমাকে একবার ফোন করতে বলবেন। আপনি কে বলছেন?

নায়ক – পরিচয়।

ফোনকারী – আমি খ। গ থেকে বলছি। ক-এর সাথে ঘ নিয়ে কিছু কথা হয়েছিল, বললেই বুঝতে পারবেন।

ফোন কেটে গেল। কিন্তু নায়কের মনে খটকা। ভদ্রলোক দু’বার একই কথা বললেন কেন। একদিন আলাপ হল খ-এর সাথে। মাধ্যম – ক। দুয়েকটা কথার পর খ নিজেই দূর করলেন নায়কের সেইদিনের খটকা। “আসলে আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার পরিচয় জানতে চাইছেন। পরে আপনার নামটা জেনেছি।”

নায়ক আরেকদিন একটা অফিসে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলেন। সাধারণত যে ধরনের অফিসে ঢুকতে গিয়ে নায়কের এই হেনস্থা, সেই ধরনের অফিসে নায়ক বিনা বাধায় ঢোকেন।  বাধাটা কি? নিরাপত্তারক্ষী প্রথমে নাম জানতে চাইলেন। বিনা বাক্যব্যয়ে নায়ক জানালেন

  • পরিচয়

নিরাপত্তারক্ষী একবার তাকালেন, তারপর পরের সাক্ষাৎপ্রার্থীর সাথে বাক্যালাপ করে তাঁকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। নায়ক অপমানিত হলেন এবং বাধ্য হয়ে আরেকবার তাঁর আসার উদ্দেশ্যটি ব্যক্ত করলেন। আবার প্রশ্ন – “নাম?” উত্তরেরও পুনরাবৃত্তি

  • পরিচয়
  • দেখতেই তো পাচ্ছেন সিকিওরিটি
  • দেখছি তো
  • তাহলে নামটা বলুন
  • নামটাই তো বলছি
  • আপনার নাম পরিচয়

নায়ক বিগলিত ভাবে মৃদু হেসে সম্মতি জানালেন।

  • পরিচয় কি

এবার সেটিও প্রকাশ করতে হল। সঙ্গে কানে এল রক্ষীর বিড়বিড়ানি – “আগেই তো পুরোটা বললে হয়ে যায়”। নামধাম, ঠিকানা, আসার উদ্দেশ্য সব লিখে নেওয়ার পর বয়স্ক রক্ষী একটু ধমকের সুরেই যেন বললেন – “যান”

আবার ফিরি বাংলার প্রবাদে। “স্বভাব যায় না ম’লে, ইল্লত যায় না ধুলে।” এত সব ঘটনার পরেও আমাদের নায়ক সতর্ক হননি। তিনি সেই ‘পরিচয়’ নিয়েই চলছেন। কারন আমাদের নায়ক মূর্খ।

নাম (পুরনো একটা লেখা নতুন করে)
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments