গুরুজনের সহ্যের পরিসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বাঙালি খোকা খুকুরা আশৈশব তাহাদের যেইরূপ ধাতানি বা ক্যালানি খেয়ে থাকে – সেটাই আমাদের সহিষ্ণুতার প্রথম পাঠ। রাস্তায় বেরিয়ে একটা চার আনার লেবেনচুস (তখনকার দিনে) কিম্বা দশ নয়া পয়সার ঘুঘনি (এটা বোধ হয় ওই তখনকার দিনের থেকেও আগের কথা ) নিয়ে একটু দাবি দাওয়া যেই না জানান হলো, অমনি রাজ্যের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও বাইরের খাবারের মুন্ডপাতের পাঁচালির টেপ চালু হয়ে যেত, ও তা মুখ বুজে সহ্য করাটাই ছিল সাবেকি রেওয়াজ। ক্রমশ সেটা বেঁকে যেত অমুকের ছেলে বা মেয়ে কত ভালো কেননা তারা ‘বাইরে বেরোলে পরে করেনা কো বায়না , ঘুঘনি বা কুলপি কিছু খেতে চায়না।’ ও অদ্ভূত ভাবে পুরো সেশন টা ইতি হত, গত পরীক্ষায় পাওয়া নম্বর ও তার লুপ্তপ্রায় ফিগারের সাথে রাস্তার ধারের হাবিজাবি খাওয়ার ভেতরে নিহিত কার্য কারণ বিশ্লেষণ দিয়ে । বড় হয়ে ওঠার সাথে এইরূপ অসহিষ্ণুতা জড়িয়ে থাকলে সেটার সুদুরপ্রসারী ফলটাও নিছক অনভিপ্রেত নয় ! বাঙালি জাত অসহিষ্ণু ও সেটার অমোঘ সাক্ষী হিসেবে লোকাল ট্রেনে বগলের গন্ধ নিয়ে ঝগড়া থেকে ইডেন উদ্যানে ম্যাচ ভন্ডুল কোনটাই বাদ পরবেনা। বাঙালি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের জন্যে অন্যদের মাউরা , খোট্টা , উড়ে , ত্যামলা , চিনে, কোরে ইত্যাদি বলতে ছাড়ে না, সুধু অন্যরা ‘বং’ বললেই তাদের মাথায় ‘ ঢং ঢং’ করে দমকলের মত ঘন্টি বেজে ওঠে- একেই কি বলে সহিষ্ণুতা ? আসি ওপার বাংলার কথায়, অনেকে বলে বাংলাদেশ। আমি মনে করি আমরা যাদের বাংলাদেশী বলি ভাষাগত দিক থেকে বিচার করলে তারা এপার বাংলার বাঙালিদের থেকে বোধহয় একটু বেশি বাঙালি, সুতরাং ওটা বাংলাদেশ না বলে অতি-বাংলা আর ওখানকার নিবাসীরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু অতি-বাঙালি। আমার ওপারের এক বন্ধু আছে যে কিনা হিন্দু ও বেশির ভাগ সময় এপারেই কাটায় , ব্যবসা বাণিজ্যর কাজে কিম্বা সখে। মুখে যদিও বলে সে দাঙ্গার সময় এপারে আসে শেল্টার নিতে কিন্ত আমি জানি আসলে সে ওপার থেকে চিকিত্সা করানোর জন্য বা কলেজে ভর্তি করানোর জন্য ক্লায়েন্ট নিয়ে এপারে আসে। যাক সে কথা , সে অদ্ভূত ভাবে এপারে এসেই এখানকার সহিষ্ণুতা নিয়ে প্রচন্ড প্রসংসা মুখর হয় , আর ওপারে গেলেই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে তার বাঙালদেশের বর্তমান অসহিষ্ণু পরিবেশ নিয়ে লম্বা চওড়া পোস্ট দিতে থাকে। আমি বুঝিয়ে বললাম ওপারে যা এপারেও তাই কিন্ত সে মানতে নারাজ , ” কি যে বলেন দাদা, এখানে কলম ধরলেই চাপাতি দিয়া ফিনিশ কইরা দিতাসে..” আমি বললাম , ” এপারেও তাই , কলম ধরলে তো বটেই, একটু মাংস টাংস খেলেও পিটিয়ে মারা হচ্ছে..মৌলবাদীদের দেশ কাল ধর্ম থাকেনা.. .” কথা আর বাড়েনা তবে সহিষ্ণুতাও বাড়েনা , বেড়ে চলে বন্ধুর এফবি টুইটারে পোস্টের বহর। আবার হালে দেখতে পাচ্ছি একটা অদ্ভূত যুক্তি ঘোরা ফেরা করছে এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় – এরকম কি আগে ঘটেনি, ১৯৮৪ তে কংগ্রেস কি করেছিল? মুঘলরা কি ধোয়া তুলসীপাতা ছিল ? ইংরেজ কি আদপে বর্বর ছিল না? বেশ কিছু শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও সায় দিচ্ছে তাতে , ” ঠিক…ঠিক..” আর বাকিরা ঘাপটি মেরে চুপটি করে তামাশা দেখে যাচ্ছে। আগে ঘটেছে, এখন ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে- এটাই জনঅরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ!!

আসলে মানুষ এই ঘোল খাওয়ানো সময় অসহিষ্ণুতা, প্রতিবাদ, ক্ষোভ,বিদ্বেষ এসব শব্দের মধ্যে বেজায় ঘেঁটে রয়েছে। ইংরেজিতে ইনটলারেন্স ও জিরো-টলারেণ্সের মধ্যে যে সুক্ষ বিভেদটা ধরা পরে সেটা বাংলা ভাষায় ঠিকঠাক গুছিয়ে ধরা দিচ্ছে না। এই যেরকম আমার ছোট মামা, তাকে আমি তুই তোকারি করি, খিস্তি মারি, গরু খাই, বিড়ি খাই -কিছু বলবে না, এতটাই সহিষ্ণু ! কিন্ত যেই বললাম , “৩৪ বছর তোমরা যে কি শাসন করলে…..” ব্যাস মামা অমনি কংসের ন্যায় অসহিষ্ণু মূর্তি ধারণ করে আমার মুন্ড ধ্বংস করতে উদ্ধত হয়ে থাকে। যতই বোঝাই সে বামই হোক বা রাম , কাম না হলে সাধারণ মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে পড়বেই। এই নিয়ে সারা রাত তর্ক করে গেলেও নিট ফল হলো মাতুলালয়ের ছাদের নিচে ‘বাম আমলের লালা বাংলার’ সমালোচনা করা যাবেনা , করলে মামার জিরো-টলারেন্স নাকি ইনটলারেন্স আমার ওপর উপচে পড়বেই । সুনেছি চিনের মিডিয়া নাকি অন্ধ , মানে যা লিখতে বলা হয় তাই লেখে। মার্কিন বা ইউরোপীয় মিডিয়া আবার এতটাই স্মার্ট ও ক্ষমতাবান যে চাইলেই সরকার উল্টে পাল্টে রেখে দিতে পারে। আর আমাদের জন গণ মন অধিনায়কের দেশের মিডিয়া তাদের বারোটা চোখ , আঠারোটা হাত , ছাপ্পানোটা পা ও পৌনে এক গুবরে পোকার মগজ নিয়ে কি ভাববে, কি বুঝবে আর কি লিখবে তা ঠাওর করে উঠতে পারেনা । লিখলেই হলো আর বলতে পারলে তো কোনো কথাই নেই। প্রশ্নের ধরন শুনলেই মনে হয় ব্যাটারা সিরিয়াসলি এত দিন সিরিয়ার আইসিস ঘাঁটিতে জমাদারের কাজ করেছিল ! “আমাদের সাথে আছেন এক বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ চ্যাপ্টামগজ ঢিলেস্ক্রুওয়ালা , আমরা ওনার কাছ থেকেই জেনে নেব যে এই পার্থ রায়ের দিদির কঙ্কাল আগলে রাখাটা কি একটা নিছক অসহিষ্ণু আচরণ নাকি স্রেফ একটা মানসিক উন্মাদনা?” উত্তরদাতাও তথৈবচ, “না আমি মনে করি পার্থ বাবুর ওপর নেতাইয়ের কঙ্কাল কান্ডের এতটাই প্রভাব পরেছিল, বিশেষ করে আপনাদের চ্যানেলে বারবার ওই ঘটনা টা দেখার পর , যে উনি দিদির কঙ্কাল আঁকড়ে ধরেই বাকি জীবনটা কাটানোর মত এক অভিনব সিদ্ধান্ত নেন .. ”
আচ্ছা পরের প্রশ্নে আসি , ” আপনি কি মনে করেন যে এই যে বার বার আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছেন, এই যে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কথায় কথায় বলছেন যে তিনি গুন্ডা নিয়ন্ত্রণ করেন – এগুলোর সাথে কি তাদের সহিষ্ণুতা জড়িয়ে আছে ? ”
” সহিষ্ণুতা তো বটেই, বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা এসব ব্যাপারও জড়িয়ে আছে এর সাথে। ”
একটা ছোট্ট বিজ্ঞাপনের কথা মনে পরে প্রায়সই, যখন পুরো দেশ সহিষ্ণুতা নিয়ে চ্যাঁচমেচি করে, সেই একটা বাচ্চা খেতে বসে দেখল তার পছন্দের সস ফুরিয়ে গেছে…সে অমনি দুরে ছুটে গেল সেই ব্র্যান্ড-এর সস কিনতে, সে কি মুখের অভিব্যক্তি ঐটুকু শিশুর !! এরাই বড় হয়ে পছন্দ মত ‘নারী-দ্রব্য’ না পেলেই তো নির্ভয়া কান্ড ঘটাতে এরা কালোতিবিলম্ব করবে না। যা পাওয়ার নয় তা পাওয়ার আশা জাগতেই পারে মনে , কিন্ত তা না পেলে যদি সেটা ‘কে পেল’ তার ওপর আমাদের নজর যায় তাহলে তো একটু অসহিষ্ণু হবই আমরা। কে লিখে সুখ পেল – মার শালাকে, কে খেয়ে সুখ পেল আবার মার ! কার স্মার্টফোন আমার চেয়ে ভালো, কার নাক আমার চেয়ে চোখা, কার গাল তোবরানো , কাকে দেখলেই আমার মনে হয় বমি করি….অসহিষ্ণুতার মূলের ছড়াছড়ি। রাস্তা বা পার্কের জন্য যে নিজের এক ইঞ্চি জমি ছাড়েনা তার দাওয়ায় গরিব মুসলমান ভিকিরি ভর দুপুরে সুধু বসতে চেয়েছিল , গোস্ত দিয়ে দুটো ভাত খাবে বলে , তাকে কি সে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে? ছাড়া যায় না, অনেক কিছুই ছাড়া যায়না। শেষ করব এক বিখ্যাত উর্দু সায়রের একটা লাইন দিয়ে, ” অন্দর আগ লাগাও, বাহার আপনে আপ জলেগী…” আর আমরা এই অন্ধ পৃথিবীর সহিষ্ণুতা রক্ষার জন্যে সুধু হাতে ধরা মোমবাতির শিখায় আগুন লাগিয়ে হেটে চলেছি।

না সহ্যতে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments