(বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ এই গল্পের সমস্ত ঘটনা কাল্পনিক, মনগড়া, আজগুবি এটসেটেরা। আসলে বাংলা মিডিয়ামের ছেলেরা আদৌ আমার মতন ল্যাদাভ্যারুস না, বরং অনেক স্মার্ট হয় ! কাউকে কাউকে দেখে, সত্যি বলছি, একচুলও বোঝা যায় না ! ঠিক তেমনি এটা যদিও তর্কের খাতিরে মেনেও নিই যে সব ট্যাঁশই ইংলিশ মিডিয়াম, আপনাকে-আমাকে আর মদন-মামাকে মানতেই হবে যে সব ইংলিশ মিডিয়াম-ই ট্যাঁশ নয়! 

আর না মোটেও লজ্জা-টজ্জা পাই না, বরং বিশ্বাস করি বাংলাভাষা আমার উত্তরাধিকার, অস্বস্তিকর জন্মদাগ নয় – তবে আলিমুদ্দিনও একদিনে 'জাঙ্গিয়া পড়েনি, আর কথাঞ্জলিও রাতারাতি লেখা হয়নি ! বাইরে যখন বৃষ্টি ছিলো, তখন অনেক পাতা এদিক ওদিক গাছ-গাছালি, কূট-কচালি, বাপের খ্যাদানি আর প্রেমের প্যাঁদানিতে ভরিয়েছিলাম আমরা ! জলে ভিজে, উইয়ে ধরে সব নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে দেখি যদি একটুও উদ্ধার করা যায় – এই শীতের মিঠেকড়া রোদ্দুরে আচারের বয়ামের পাশে অমনি কয়েকটা পাতা ! যেরকম পেলাম তেমনি রেখে দিলাম পাশাপাশি, কেমন?)

তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?
আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে …

তো সেটা কত সাল আমার মনে নেই, এটা মনে আছে যে কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত তখন ওপেন করতেন আর ক্যামন নাক-ফাক কুঁচকে এদিক-উদিক চার-ছয় হাঁকাতেন। এইসময়েই একদিন আমার বাবা এসে থার্ড আম্পায়ারের মতন আউট ঘোষণা করে জিজ্ঞেস করলেন, "সারাদিন যে হাঁ করে টিভি গিলছো, কি হবে বড় হয়ে?" আমিও সপাটে স্টেপ আউট করে বললাম, "ওই যে শ্রীকান্ত"! বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, 'ম্যান অব দ্য ম্যাচের ইন্টারভিউটা দেখেছো? কির'ম সুন্দর ইংরেজি বলছে? পারবে?' আমি বিপদ বুঝে বললাম, 'ঠিকাছে, তা'লে কপিল দেব' … বাবা কিয়ৎকাল রণে ভঙ্গ দিলেন বটে, কিন্তু আমি বুঝলাম সত্যি ঘোর বিপদ … নিশীথস্যার বেত হাতে যে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শুরু করেছেন, এ জীবনে তা বোধকরি আর ঘোচার নয় !

এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, আমার বাবা নেহাৎ দিনে রেলে চাকরি আর রাতে ব্রাইয়োনিয়া-বেলাডোনা করে ইহজীবন কাটিয়ে দিলেন বটে, আসলে কিন্তু ওনার মধ্যে হাল্কা করে একটা ত্রিকালজ্ঞ ব্যাপার ছিলো, অন্ততঃ আমাকে নিয়ে – যখন যা ভয় পেতেন, মাস খানেকের মধ্যে 'ফলিবেই ফলিবে' !

এবারেও তার ব্যত্যয় হলো না ! নিশীথদা একগাদা ট্রান্সলেশান দিলেন পরীক্ষায়, আর আমিও তো বাংলার বাঘ ! কোশ্চেন দিলো, 'আমি রোজ ভাত খাই', আমি ভেবে দেখলাম eat বললে তো খাই মনেই হয়, কিন্তু এই যে আমি রোজ রোজ শুধুই ভাত-ই খাই, রোজ ম্যাগি নয়, রোজ বিরিয়ানি নয়, যেন অনন্তকাল ধরে সিসিফাসের পাথর তোলার মতন প্রতিবাদ না করে শুধুই ভাত-ই খেয়ে যাচ্ছি, সেটা কি শুধু eat বললে মেটে? নাঃ ! দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিখে দিলাম 'I eats rice'!

খাতা বেরুলো যেদিন, দেখি ভদ্রলোক সবার উপরে আমারটা নিয়ে এসেছেন, ক্লাসে পড়ে শোনাবেন বলে … পাক্কা পনেরো মিনিট নিশীথদা আর সেকশান-ডি হ্যাহ্যা করে হাসলো, আমিও মনে মনে বেশ পুলক অনুভব করলাম, কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখি আবহাওয়া থমথমে, বাবার হাতে একটা লাল বই, রেন অ্যান্ড মার্টিন, আর চেয়ারে একজন পুরুষ্টু গোঁফওয়ালা নতুন মাস্টারমশাই !

মাস্টারমশাইয়ের জেদ ছিলো সাংঘাতিক, আমাকে তিনি দেখলেন যেন অমল দত্ত দেখছেন রেলিগেশানের মুখে মোহনবাগান ! কি-ই না করতেন, মাঝে মাঝে ইংরেজি কাগজ ঠুসে বলতেন পড়ে যাও একপাতা, আমিও নিকুচি করেছে বলে প্যারা-ফ্যারা উড়িয়ে কংগ্রেস-ডায়ানা-হাওয়ালা-আজহার সব একসাথে পড়ে যেতাম! মাঝে মাঝে পাশে তাকিয়ে দেখতাম দিদি হাসি চাপতে ইতিহাসের বইতে মুখ লুকোচ্ছে আর বাবার ভ্রূ শুয়োঁপোকা থেকে শুয়োঁপোকা-তর হচ্ছে ক্রমশঃ …

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলেছিলো বহুদিন, এবং কবে কি করে যে সেই মাস্টারমশাই শেষমেশ রণে ভঙ্গ দিয়ে পালালেন তা আর মনে নেই এক্কেবারেই, তবে শাপে বর হলো সত্যি – যাঁকে পেলাম, তাঁকে ইংরেজির টিচার বলা মানে রবীন্দ্রনাথকে ট্রাফিক পুলিশ বলা ! তিনি দেখলেন একে দিয়ে গ্রামার-ট্রামার হবে না, এর পাস্ট অতিশয় ইনডেফিনিট, ফিউচার ততোধিক টেন্স ! হাতে ধরিয়ে দিলেন দুটি বই, অস্কার ওয়াইল্ডের পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে আর টি এস ইলিয়টের কবিতাগুচ্ছ! ইংরেজি একফোঁটা বলতে বা দু-কলম লিখতে না পারলেও যে দিব্যি পড়ে মুগ্ধ হওয়া যায় … সেটা সেই জানলাম !

বছর দেখতে দেখতে ঘুরে যায়, নরেন্দ্রপুরে ঢুকে দেখলাম, সব বই ইংরেজি হয়ে গেছে – ভয়ানক চাপ ! শুধু কেকুলের সাপ বুঝলে চলবে না, সে সাপ ছোটে না কি হাঁটে না, অন্ততঃ বাংলায় চাটে না … একবার কেমিস্ট্রির ল্যাবে কি কান্ড, ঢুকে দেখি সারি সারি শিশিবোতল – গায়ে বড় বড় করে লেখা INFLAMMABLE ! এদিকে তো রেন অ্য্যান্ড মার্টিন গাঁতিয়েছি, in মানেই নঞর্থক ! এই যেমন ধরুন ঃ

incapable – আমার মতন অপদার্থ,

inaudible – মিনমিনিয়ে কতা কয়, কেউ শুনতে পায় না,

incurable – যা সারে না, শাহ্রুখখানের তোতলামো, আর আমার ক্যাবলামো,

invisible – যা দেখা যায় না, গাঙ্গুলীর কভার ড্রাইভ !

infallible – যা একবার উঠলে আর পড়ে না (এটার উপমা আর দিলাম না) …

 তো আমিও মনের আনন্দে ঠাউরে নিয়েছি, ইনফ্লেমেবল নিশ্চয়ই হিন্দু আত্মার মতন অদাহ্য – অক্লেদ্য কিছু একটা হবে, আমিও এটাসেটামিক্স করবো বলে দুটো বোতল হাতে নিয়ে পিছন ফিরেছি – দেখি দীনবন্ধু স্যার ভয়ার্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে !

 

এইবেলাই বুঝলাম, জানেন, যে জীবনে এমন কিছু পড়াই ভালো, যেখানে খুব বেশি ইঞ্জিরি না মাড়িয়ে পাতার পর গ্রীক লেটার আর চাউমিন সিম্বল দিয়ে ভরিয়ে দিলেও দিব্যি চলে যাবে … টুক করে স্ট্যাটে চলে এলাম … আই-এস-আই-তে বছর পাঁচেক আমার ইংরেজি ওই পিসি-র অমর কবিতার মতন, "তোমার নাম? হ্যালো হাই / বাবার নাম? সি ইউ বাই!" 


তখন বাংলা শুধুই রন্ধ্রে নয়, রক্তেও ! এক রোববার GRE দিয়েই ছুটতে ছুটতে আমি আর পানু চলে গেলাম খালাসিটোলায় ! হাফ ওপেন স্কাই ছাদের তলায় স্কুলবেঞ্চ পাতা, একদিকে বাংলা বিক্রি হচ্ছে ঢেলে, একদিকে মাছভাজা-আলুকাবলি, আর খালি বোতল ফেরৎ দিলে তিন টাকা সাতাত্তর পয়সা ! সে অন্ধকারে মাটির ভাঁড়ে প্রেম-অপ্রেম যেন গলে জল হয়ে এলো ! এক চুমুক দিয়েই দেখলাম বিকেলের আকাশে সবকটা মুখ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো – হঠাৎ পানু বললে, ভেবে দ্যাখ জেডি, কমল্কুমার ক্লাসের ফাঁকে এসে এক পাত্তর ঢেলে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছেন এককোণে, বা হয়তো তুষার রায় সদ্য লেখা কবিতাটা শোনাচ্ছেন শক্তি-সুনীলদের ! ফেরার সময় মনে আছে, ট্যাক্সিকাকুকে কিছুতেই মনে করে বলতে পারছি না কোথায় নামতে চাই, পানু অনেক কষ্টে বললো, নর্থ ক্যালকাটা ! 


জীবনটা চলে যাচ্ছিলো, দিব্যি চলেই যেতো, পাঁচ বছর যে আসলে ইনফিনিটি নয় সেটা কেউ বললেও বিশ্বাস করতাম না  - কিন্তু তাও, কলকাতা থেকে মুম্বাই, মুম্বাই থেকে আবার পালাতে পালাতে অর্ধেক পৃথিবী দূরে, দিন-রাতের অন্যদিকটায় !


'পড়ে রইলো যে, পড়েই থাকতো … সে লেখা তুলবে বলে, 

কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে …'


বলেছিলাম এখন লজ্জা পাই না, তখন কিন্তু খুব হতো … খু-উ-ব, বলে আর শেষ হওয়ার নয় সে গপ্পো ঃ একদিন সাবওয়ের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বলেই যাচ্ছি বাবা দুটো পেয়াঁজ আর লঙ্কা দে, ব্যাটা হাঁ করে তাকিয়ে আছে যেন অর্জুন বিশ্বরূপ দর্শন করছে … আরেকদিন আবার হলে ঢুকে সবাইকে জিজ্ঞেস করছি ভাই লিফটটা কোনদিকে, তারা এমন ভাব করছে যেন আপনি শ্যালদা স্টেশানে পক্ষীরাজ ঘোড়া খুঁজতে বেরিয়েছেন … অনেক কষ্টে একদিন ঘন্টা দেড়েক ধস্তাধস্তি করে এক ব্যাটাকে বানান করে বোঝালাম যে আমার জীবন ইন্টারনেট ছাড়া অচল, সে পরেরদিন দরজায় প্যাকেট রেখে পালিয়ে গেলো, উপরে নাম লেখা 'Jyoeis Daha' ..


তারপর তো কত-কত-দিন গড়িয়ে গেছে, দিকে দিগন্তরে বক্তিমে দিয়েছি, ছাত্রদের বুঝিয়েছি কোরিলেশান আসলে কজেশান নয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা দুরুদুরু যায়নি পুরোপুরি – সেই প্রথমবার যখন আইনক্সে অ্যানাকোন্ডা দেখতে ঢুকে বুঝেছিলাম হলের সিনেমায় শালারা সাবটাইটেল দেয় না, আর নিতান্ত বাধ্য হয়েই শুধু লোপেজ দিদিকে দেখেই ফিরে এসেছিলাম – সেরকম অনেকটা ! এখনও আগে পুরো বাক্যটা মনে ভেবে নিই, তারপর ভাবি নিশীথস্যার ক্যালাবে, তারপর ট্রান্সলেট করি,  একটু হি-শি-হ্যাজ-হ্যাভ দেখে টেখে নিয়ে বলি – ভুল্টুলও কমে, লোকেও নির্ঘাৎ একটা গ্রাম্ভারি গেছোদাদা টাইপের কিছু একটা ভেবে নেয় !!


তবে হারাতে হারাতেও, ভেসে যেতে যেতেও, শ্যাওলা-খড়কুটো ধরে কি করে যেন একটু সেই খালাসিটোলার সন্ধ্যেটা রয়ে গেছে গ্লাসের তলায় লেগে ! অঙ্ক-টঙ্ক যেদিন নামে না, বা যেদিন খুব ইচ্ছে করে দাঁড়ে বসে ডানা ঝাপটাতে, সেদিন খাতা খুলে একটা বাতি জ্বালিয়ে বসি … এক বন্ধুর দেওয়া ফাউন্টেন পেনটা যত্ন করে পরিষ্কার করে কালি ভরে একটু লিখি একটা সাদা পাতায় … হয়তো একটা প্রিয় শব্দ, একটা আদরের নাম … একটা চেনা কবিতা মাথায় আসে, গুনগুন করে,


' তবু সে এখনও মুখ 

দেখে চমকায়

এখনও সে মাটি পেলে 

প্রতিমা বানায়' 


আস্তে আস্তে জটগুলো ছেড়ে যায় তখন ! এই বন্ধ পড়ার ঘরের ঘুলঘুলি আর আনাচ কানাচ দিয়ে কি করে যেন ক্যাট-ব্যাট-ডগ-ফিশ পেরিয়ে ঢুকে পড়ে একরাশ বাংলা ভাষা ! পরম মমতায় আমার হাতের আঙ্গুল ছুঁয়ে থাকে সে … আমি আবার স্বপ্ন দেখি !

 
নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments