সকাল সকাল আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির পাম্পটা এমন কর্কশ স্বরে ডেকে উঠলো , মনে হলো খাটের তলায়ে কেউ যেন ভাইব্রেশন মোডে নাক ডাকছে। ঘড়িতে থুড়ি মোবাইলে দেখি সময় তখন মোটে সাতটা। ও তাহলে নাকটা আমিই ডাকছিলুম, সেটা পাম্পের ইলেকট্রোমেকানিকাল আওয়াজের দাপটে এই মাত্র বন্ধ হয়ে গেল বোধহয় ! সে যাই হোক , এলার্ম যখন বাজেনি এখনো , তখন আরেকটু ঘুমানো যাক , এটা সব বিপ্লবীরই জন্মসিদ্ধ অধিকার। আর বাজলেই বা কি, স্নূজিং অপসনটা তো আর vestigial নয়। রবিবার ছিল ‘বাংলা’ দোল, ভরপুর ভাং মেরে ঘুমিয়েছি । পরের দিন সমগ্র ভারতের হোলি, ছুটির দিন দেখে টপ আপ মেরে টপাটপ আরো ভাং গিলেছি এবং আবারও ঘুমিয়েছি । ক্যাআআঁক ক্যাঁক (আসলে শব্দটা টিং টং) ….এলার্মের মতন কেন কলিং বেল স্নূজ করা যায়না ? যায় না আর তাই সেই বিদঘুটে স্বরে কলিং বেলটা পর পর কবার বাজলো । মনে হচ্ছিল রিমোট দিয়ে শালা ওই বেল টাকে ‘আল কায়েদার’ মতন উড়িয়ে দি, সাথে বেল বাজানেওয়ালাও বেকায়দায়ে উড়ে যাক ! কিন্তু এখনো অব্দি জীবনে যত মোটিভেশন ওয়ার্কশপে জ্ঞান আহরণ করেছি , তাতে করে জেনেছি ইতিবাচক চিন্তাভাবনা দিয়ে সব কিছু বিচার করতে হয়! সেই বিচার বিবেচনার ওপর পূর্ণ আস্থাজ্ঞাপন করে, তেরে বেঁকে কোনরকমে যখন দরজা খুললুম দেখলুম ব্যাটা ধোপা এসে হাজির । হিন্দুস্তানি হোলির পরের দিন তাজা রং মেখে সং সেজে সে দাঁত ক্যালাচ্ছে। সকাল সকাল তার হোশ ফিরে পাওয়ার পর , প্রথম আবদারটা বুঝি আমাকেই করল , “দাদা হোলি মে কাপড়া গন্দা হুয়া হোগা , দে দিজিয়ে…” দোল খেলার byproduct মানে হলদে সবুজ রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি আর ওরাং ওটাং মার্কা জাঙ্গিয়াটাকে তাকে ধরিয়ে দিয়ে আমিও পাল্টা আবদার করলুম ,”ইয়ে দোনো ,অরিজিনাল করকে লানা ! ” অমনি সে পান্তভুতের জ্যান্ত ছানার মতন মুখ করে কেটে পড়ল। এই ঘটনার পরেই ফিরে গিয়ে বিছানা হিট করতেই, আবার সেই বিরক্তিকর বেল ….ঘ্যাং ঘং (আসলে শব্দটা তখনও কিন্তু টিং টং)…..এবারে কাজের মাসি ! আমি কোনরকমে নিজে রামগরুড়ের ছানার মতন মুখ করে খানিকক্ষণ তার কাম কাজ পর্যবেক্ষণ করলুম, নিজের বাড়ির নোংরা যত শর্টকাটে সাফ করা যায় তার উপায়ও বাতলে দিলুম। সেও কাঁচা শিক্ষানবিসের মত ঝটপট সব ইন্সট্রাকশন মেনে, জব ডেসক্রিপশনের ফরমাট অনুযায়ী, যা যা করনীয় তা উতরে দিয়ে বিদায় নিল। নাঃ এখনো ন’টা বাজেনি, দিব্বি আরেকটু ঘুমানো যাবে। শুয়ে সবে বাঁ পাটা পাসবালিশে ঠেকিয়েছি, এবার পরিষ্কার কানে বাজলো ‘টিং টং ‘! উঠে গিয়ে দেখলুম কাগজওয়ালা অম্লান বদনে জানাচ্ছে যে আজকে কাগজ হবে না। এমন ভাবে সেটা জানালো, যেন এই সিদ্ধান্তে আমার সিলমোহর না লাগালে, সে এক্ষুনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাগজ বিলি করা চালু করে দেবে । নাঃ তা সে করবে না , তবে তার সাথে সে এটাও জানালো যে আমার সাবস্ক্রিপশন শেষ , অতয়েব ফর্ম , চেক, সই… গুষ্ঠির পিন্ডি …..পড়বনা কাগজ। আমার desperate ফর্ম দেখে সে ফর্ম গুটিয়ে নিয়ে কাঁচুমাঁচু মুখ করে বলল , “ইলেকশন এর মরশুম, কাগজ না পড়লে হবে? আচ্ছা কাল আবার আসবখন। ” আবার কাল… আবার ‘টিং টং ‘ ! নাঃ , আমি তত্ক্ষনাত ফর্ম ভরে সই সাবুদ করে তাকে চেক দিয়ে দিলুম।
ক’টা বাজে? সাড়ে ন’টা, গতকাল সমগ্র ভারতবর্ষে দোল মানে হোলি উত্সব উজ্জাপিত হয়েছে , সব্বাই নিজ নিজ গৃহে বিশ্রাম করছে। এদিকে প্রাচ্যের এই কলকাতায়ে আপামর জনগণ সার্ভিস দিয়ে দিয়ে সকাল থেকে আমার নিদ্রাভঙ্গম করার জন্য অভিনব সব শব্দব্যূহের রচনা করে যাচ্ছে । নাঃ, এবারে আমি ঘুমাবই। বেশ ক্লান্ত এবং যথেষ্ঠ পরিশ্রান্ত বোধ করছি সত্যই । হোটেল হলে ‘ডোন্ট disturb’ লেবেল ঝুলিয়ে দিতুম ডোর knob-এ। নেহাত বাড়ি, তাই ঘুমোবার ৩৩% আশা ও ১০০% ইচ্ছা নিয়ে যেই না আবার বিছানায়ে বডিটা ফেলেছি , ঠক ঠক ঠক ঠক , দরজায় ক্রমাগত ধাক্কা। এবারে বেল নেই! নেই কেন ? আজ এখানে sure লাশ পড়বে ! উঠে গিয়ে আইহোল দিয়ে দেখলুম স্বয়ং নবুদা দরজায়ে, মাথা নিচু করে এক ভাঁড় আবির হাতে দাড়িয়ে। বলা বাহুল্য ডান দিকে তাকিয়ে বেল দেখে টেপার অবস্থায়ে সে নেই……তাই ঠক ঠকাচ্ছে। আমি এক রাশ বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলে দিয়েই বললুম , “বাঙালি , হিন্দুস্তানি সবরকম রঙের উত্সব হয়ে গেছে , তা তুমি আজ আবির নিয়ে… ”
নবুদা আমার কথাকে কোনো পাত্তা দিল না। উল্টে জামশেদ নাসিরির মতন আমাকে সাইড কাটিয়ে সোজা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে গোত্তা মেরে রঙের ভাঁড় টা রাখল। তার পর টেলে টুলে ওপরের মোড়কটা খুলতে তার প্রায় দেড় মিনিট লাগলো। খোলার পর টলতে টলতে আবির মাখাল আমাকে , আমিও নবুদার এদিক সেদিক রং মাখালুম। ঝাঁট জালানো একটা হাসি সহকারে এবার নবুদা মুখ খুলল, ” দোলে দোদুল দোলে দুলোনা…. দোল খেলতেই কি শুধু আবির আর ভাং লাগে ? যে কোনো celebration-এই লাগতে পারে । কমিসানারেটের বড় বাবুর সেদিনকে এমন ‘লেগেছে’ যে তার সুপারিশের জোরে ভোটার ও আধার কার্ড দুটোই এক সাথে হয়ে গেল…. এবার আমার ভোট দেওয়া আটকায়ে কে.. হেঃ হেঃ…. ” এই বলে নবুদা ঝোলার থেকে পেপসির ৫০০ ml এর বোতলে ভাং বার করলো। তারপর, পর পর বেরোলো বাংলুর পাঁইট , বাসী বিরিয়ানির ফয়েল , ট্রেন থেকে কেনা বুলবুল ভাজা , গাঁজার কল্কে , বেনীমাধব শিলের ফুল পঞ্জিকা , একটা পকেট ক্যালেন্ডার, গার্ডারে বাঁধা গোটা বিশেক দাঁত খুচুনি ও গুচ্ছ বাসের টিকিট।
নবুদা ট্রেনে টিকিট কাটেনা , কিন্তু বাসে সে সব সময় টিকিট কেটে থাকে ! কারণ জিগ্যেস করলে বলে , ” ট্যাক্সি , অটো বা বাসের ভাড়া অনেক বেশি সাইন্টিফিক, কিলোমিটার অনুযায়ী বাড়ে। ওদিকে শালা ট্রেনে উল্টোডাঙ্গা গেলে ৫ টাকা নিচ্ছে , এদিকে সিয়ালদাহ হলেই দশ টাকা ! বুঝলি, একবার রেল বাজেটের পর স্টেশন মাস্টার কে বুঝিয়ে বলেছিলাম যে এটা ঠিক না , বার্গেনের একটা জায়গা রাখুন। ব্যাটা অকাট মুখ্যটা বলে কিনা, ” আপনি ১০ টাকা দিয়ে মল্লিকপুর অব্দি যান না। কে মানা করেছে ?”
আমি ঘটনাটা শুনছিলাম , আরো অনেকে ঘিরে ধরে শুনছিল তখন । বাপ্পা বলল “ঠিকই তো বলেছেন উনি , তুমি ১০ টাকায়ে কতদূর যেতে পারছ সেটা দেখো !”
নবুদা ক্ষেপে গিয়ে বাপ্পাকে বলেছিল , “ধর তোর বাড়িতে ফ্রিজ নেই , ৩ জন খেতে আসবে। মুরগির দোকান যদি বলে হয় ১ কিলো নিন আর না হলে ২ কিলোই নিতে হবে , কি করবি ? হুঃ, শালা , পেপসি আর কোকের বাইরে কোলা পাই না, ওদিকে শালারা জোর গলায় বলে কিনা ‘ফ্রিডম অফ চয়েস’ !”
যাই হোক , এই হেন নবুদা যখন ভোট দেবে ,সবারই জানতে ইচ্ছে করে যে সে কাকে এবং কেন তার ওই অমূল্য ভোটটি দেবে । ঘুমের মায়া অনেকক্ষণ আগে ভুলেছি , চোখ রগড়াতে রগড়াতে তাই জিগ্যেস করলাম , “তাহলে এবার কাকে ভোট দিচ্ছ ?”
নবুদা পায়জামার গিঁট ছাড়াচ্ছিলো , মাথা না তুলেই বলল , “সিক্রেট ব্যালট , ভাং খেয়ে টেয়ে সব বলে দেব ভাবলে, ভুল করছিস !! ”
“বেশ, কোন পার্টি কি করতে চাইছে আর তা সম্বন্ধে তুমি যা বুঝছ , তা একটু অন্তত খোলসা করে বল ……” আমিও ছাড়বার পাত্র নই !
” হুমম, টাইমস-এর অর্নব-এর মত প্রশ্ন করতে শিখেছিস দেখছি ?”
নবুদা এবার কলকে তে মশলা গুঁজে দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে সেটা খুঁচিয়ে ফস করে আগুন লাগলো। তারপর দুটো ‘অগ্নি আর পৃথ্ভি’ মার্কা মিসাইল রেঞ্জের টান মেরে বলল, “যে যা করছে, তা সে তাদের বিজনেস, সংবিধান স্বীকৃত ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যাপার । তাতে, তোর্ এত গাত্রদহন হচ্ছে কেন ? ”
আমি গুছিয়ে একটা কিছু বলব ভাবছিলুম । কিন্তু কিছু বলতে পারার আগেই সে আবার শুরু করলো ,
“তোদের স্বভাবে বাপু, ভাবের বড় অভাব। খুঁজে পেলি না হ্যালিন্চা পাতা, তবুও খুঁজছিস নকশী কাঁথা ….একেবারে নীলগাইয়ের দুধে ফ্যালা কাঁঠালের আমসত্ত মাইরি ! ”
আমার এসব ফালতু হ্যাজানিতে আরো ঘুম পাচ্ছিল। নবুদা ওদিকে বাসী বিরিয়ানি দিয়ে দিব্ব্য বাংলু সাঁটাচ্ছে আর ক্ষণে ক্ষণে গীতার শ্লোক ঝাড়ছে , দেশের কুরুক্ষেত্র সম নির্বাচনের analysis করার উদ্দেশ্যে। ঘুমের ঘোরে আমার কানে শব্দ গুলো কিরকম গুলিয়ে যাচ্ছিল …. মনে হলো নবুদা হটাত গীতা ছেড়ে মদন মোহন তর্কালঙ্কারের “প্রভাত” টাকেই বোধহয় কিরকম জানি বিকৃত করে আউরাচ্ছে …..
পার্টি সব করে জপ
ভোট যে আইলো
সুভাষিনী আলী শেষে
এখানে খাড়াইলো
নেতারা ক্যাডার দের
লয়ে যায় মাঠে
ব্রিগেডেতে ভিড় করে
ফন্দি যে আঁটে !
উঠিল মমতাময়ী
মুকুল যে ছুটিল
কিসের লোভেতে
আন্না আসিয়া জুটিল
রাহুল গান্ধী তাই
বলে সবে শোন্
মোদির চমকে আজ
পুলকিত মন !!!
না খেলে দোষ নাই
বিলেতি দিশির
দরকার রয়ে যায়
হাগু বা হিসির
জাগো শিশু ভোট দাও
হয়ে নিয়ে ফ্রেশ
ঝাঁট বিকশিত হউক
কেটে ফেল কেশ !!

নিদ্রাভঙ্গম
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments