নবারুণ ভট্টাচার্য মারা গেছেন, এটা নাকি নবুদা জানতো না !! তাই হুলো আর পচাও জানতে পারেনি । অবশ্য নবারুণ ভট্টাচার্য গত হলে বা টেনে হেঁচরে বেচে থাকলেও তাদের জীবনে যে কোনো 'নব অভ্যুথ্যান' হবে না সেটা তারা বেশ জানতো। হ্যাংলামুখো বিড়িখেগো বামুনেরা, যে কেউ মরলেই শ্রাদ্ধ্য খেতে দৌড় মারে, বিশেষত মাছ ছোঁয়ার দিনে ! আঁশ মুক্তি না পাওয়া অব্দি নাকি মৃতের আত্মা এ ভুলোকে আটকে থাকে। নবুদা ঠিক করলো তার প্রিয় লেখকের আত্মার মুক্তির জন্য এক সপ্তাহ ব্যাপী নিরামিষ খেয়ে থাকবে, ও তারপর চুটিয়ে মুরগির ছাঁট দিয়ে আঁশমুক্তি করে তার আত্মাকে এ-লোক থেকে ও-লোকে পাঠাবে। প্ল্যানটা শুনেই হুলোর মুখটা কিরকম পটল ভাজার মত হয়ে গেল। পচাও কিরকম ঝিমিয়ে গিয়ে জিগ্গেস করলো , " এক সপ্তাহ কেন? এক বা দু দিন শোক পালন করলেই তো হত। কে কোথায় মরেছে তার জন্য এখানে আমরা সাত দিন ভেজ খেয়ে ভিজে বেড়ালের মতন পরে থাকব, ওদিকে দুনিয়া ভর সবাই পাঁঠা মুরগি সাঁটাবে?"
নবুদা বলল , "আরে না রে বাবা , এটা লোকদেখানি আচার। দিনে সবার সামনে ওই ভুজ্জি গিলব আর রাতে খাসির ঝোল আর ভাত সাঁটাবো, বুঝলি কি না? দেখ না টু পাইস ইনকামও হয়ে যাবে এই যাত্রায় !!"
হুলো আর পচা এতে যারপরনাই আনন্দিত হলো ও স্টেশন চত্বরে এক কোনায় সাদা কাপড় পেতে, ওপরে একটা মিনি শামিয়ানা টাঙিয়ে, নবারুণ ভট্টাচার্জ্যের ছবির সামনে ধুপ ধুনো জালিয়ে নবুদা এন্ড কোং সারাদিন ধরে চুপ চাপ বসে থাকলো। হুলো এক সাইডে গাঁজায় টান মারতে মারতে হবিষ্যি রাঁধে আর সামনে রাখা এনামেলের কোয়ার্টার প্লেটে টুক টাক করে দু টাকা, পাঁচ টাকা পড়ে । মেনিদী সেদিন পুরসভা নির্বাচনের কাউন্সিলার প্রার্থী হিসেবে কাগজ জমা দিয়ে বেলঘরিয়া শশুরবাড়ি ফিরছিলো। জগা তার বাইক বাহিনী নিয়ে যোগ্য ভাই হিসেবে মেনিদিকে এসকর্ট করে স্টেশন অব্দি ছেড়ে দিতে আসলো। কিন্ত স্টেশন চত্বরে পৌছতেই, নবুদার কাজ কারবার দেখে একটু হকচকিয়ে গেল ভাই বোন্ দুজনেই। একটা ফটোয় মালা পরিয়ে জনগনকে খিচুড়ি খাওয়ানো হচ্ছে ,নবুদা কি তাহলে বিজেপির হয়ে দাড়াচ্ছে নাকি ?

মেনিদী ভাইকে বলল , "দাড়া তুই কোনো গোলমাল করিস না, আমি ব্যাপারটা বুঝে আসি। "
মেনিদী, " নবু , কে মোলো রে তোর্ , আহা রে ?"
নবুদা ঘুমাচ্ছিল , মাথা তুলেও তাকায়ওনি , সবাই ভাবলো বুঝি বাবা কাকা মরেছে তাই এরকম দুঃখে ডাউন মেরে গেছে। আসলে ওটা পচাকে ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করার সিগনাল মাত্র।
পচা সিগনাল বুঝে বলল , " মেনিদী, ওটা নবুদার গুরু , লাওয়ারিসরা আর মা বাপ কোথায় পাবে বল ?"
হুলো কান চুলকাতে চুলকাতে অমনি জুড়ে দিল , "জগার মত ভাই বা আর কজনের থাকে?"
মেনিদী যেন কিছু শুনতে পায়নি এমন ভাব করে , থালায় ১০০ টাকার নোট্ ফেলে দিয়ে সামনে থেকে সাষ্ঠাঙ্গে প্রনাম করলো !
হুলো তাড়াতাড়ি একটা খিচুড়ি ও লাবড়ার প্যাকেজ শালপাতায় করে মেনিদির হাতে ধরিয়ে এমন একটা হাব ভাব করলো যেন ৫০০ টাকা ফেললে সে রাতে চাঁপ বিরিয়ানি খাওয়াত !!

এবারে মেনিদির পার্টিতে হেভি ক্যাঁচাল , বিরোধীরা কেউ ভোটে দাড়াচ্ছে না অথচ নিজের পার্টির বিরোধী পক্ষ গোঁজ প্রার্থী দিয়ে ওয়ার্ড ভরিয়ে দিচ্ছে। জগা কতদিন বকুল বাবুর আসে পাশে ঘুরেছিলো কিন্তু তাতে সতিপ্রিয় বাবুর ছেলেরা জগাকে এমন কড়কালো যে জগা , যে কিনা বিজেপির সাথেও মাঝে একটু ইন্টুসিন্টু করেছিলো , হুট্ করে মেনি বেড়ালের মত গুটিয়ে গিয়ে মেনিদির ভালো ভাই হয়ে ব্যাপক প্রচার করতে লাগলো। আড়ালে আবডালে অবশ্য শোনা যায় যে জগা কোন এক বলিউডের উঠতি নায়িকা কে ক্যারিয়ার করে দেবে বলে সে তার সাথে বেজায় ফষ্টি নষ্টি করেছে। ওদিকে সারদা কেলেঙ্কারী তে ফেসে যাওয়ার পর জগার চেনা পরিচিত প্রোডিউসাররা হাত গুটিয়ে নেওয়ায় নতুন কোনো বই রিলিজ হচ্ছে না। সব বুঝে শুনে এবার নায়িকা সোজা থানায় তার নামে রেপ কেস করবে বলে হুমকিও দিয়েছে। মেনিদির যত জ্বালা , সিপিএম দূর হলো তো আস্ত একটা আহাম্মক ভাই এসে জীবন জেরবার করে দিছে।

এর মধ্যে স্টেশন চত্বরে আশা অনেকেই নবারুণ ভট্টাচার্যের ছবি দেখে ভবা পাগলা ভেবে দু তিনটে ভবা পাগলার গান শুনিয়ে চেল গেছে। বলা বাহুল্য তারা কোনো পয়সা না ঠেকিয়ে দিব্য হবিষ্যি চেটেপুটে মেরে দিয়ে গেছে। সারা দিন এই সব নমুনা দের সামলানোর পরে রাতে পচা আর হুলোর আর আমিষ রান্না করার শক্তি থাকছেনা। রোজ-ই দিনের শেষে যখন দুজনেই ঝিমুচ্ছে , তখন নবুদা ওদেরকে ওই সেদ্ধ ভাত ঘি দিয়ে মেখে মুখে ঠুসে দিয়ে বলেছে এই নে কোর্মা খা , এই গেল বিরিয়ানি। পচা আর হুলোর ক্লান্তির নেশায় আর সব নেশা ভুলে গেছে। আর নবুদাও কোনো ঝামেলা ছাড়া একটা অনাবিল নিরামিষ সপ্তাহ কাটিয়ে দেওয়ার শখ মিটিয়ে নিচ্ছে । বাধ সাধলো কমিসনারেটের নতুন মেজবাবু , মৃগাঙ্ক মাইতি। এই জাঁদরেল অফিসারকে মেনিদী চুগলী করেছে যে স্টেশন চত্বরের এই লাওয়ারিশ প্রাণী গুলো প্রজন্ড বিপজ্জনক, ব্যবস্থা নিন । মেজবাবু বলল, " চিন্তা করবেন না , দু মিনিটে ওদেরকে তুলে নিয়ে আসছি ম্যাডাম, নেক্সট হবিষ্যি ওরা লকাপে খাবে। " মেজবাবু সাইটে পৌঁছে দেখল একটা টেম্পোরারি স্ট্রাকচার আর তাকে ঘিরে ধরে কাঁড়ি কাঁড়ি লোক গান বাজনা করছে আর নবুদা দুলে দুলে তাল দিছে। হুলো আর পচা দাঁত কেলিয়ে সব্বাইকে শালপাতায় খিচুড়ি আর লাবড়া বিতরণ করছে। মেজবাবু দলবল নিয়ে শান্ত ভাবে পেছনে বসে পড়ল। হাতে দেওয়া খিচুড়ি প্রসাদ খেল , না খেলে উপায় নেই কেননা কোনো ফেলার জায়গা আসে পাশে দেখতে পেল না তারা । জনগণ ভাবলো পুলিশ প্রোটেক্সান দিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে তাহলে সিওর ভিআইপি ব্যাপার স্যাপার। আরো বেশি লোকজন এসে জুটল। কেউ সাই বাবার , কেউ লোকনাথ তো কেউ অনুপ জালোটার ভজন গেয়ে গেয়ে ভিড় বাড়াতে লাগলো। অবস্থা ভালো না বুঝে বুঝে মেজবাবু আলতোভাবে ভিড় ঠেলে দলবল নিয়ে কমিসনারেটে ফিরে গেল।

থানায় ফিরে মেজবাবু তো ক্ষেপেই অস্থির, "আজকাল বিজেপির জমানা, এরকম একটা ধর্মীয় কর্মকান্ডের মধ্যে থেকে দুম দাম করে কাউকে তুলে আনা যায় নাকি?"
এসআই শ্রীধর পুততুন্ডু এক কালে অনেক বেআইনি ধরপাকড় করেছে, সে বলল, "স্যার , ধৈর্য্য হারাবেন না। অশ্বথামার মত আমাদেরকেও রাতের অপেক্ষায় থাকতে হবে। "
মেজবাবু বলল , "'দিনেই কিছু করতে পারলাম না , তো রাতে…"
শ্রীধর, " স্যার, খবর আছে, রাতে ওই ধার্মিক মাল গুলো চিংড়ির ছাঁট দিয়ে বাংলু প্যাদায়। "
মেজবাবু, "তাই নাকি, আগে বলনি কেন? নবারুণ বাবুর মতন এক এক মহাপুরুষের স্বরনসভায় , নিরামিষ আচার তাও আবার দেশীয় সুরা সংযোগে!! এ ঘোর অন্যায় তো আর হতে দেওয়া যায় না !! "

আজ সাত দিন শেষ হয়েছে। কথা অনুযায়ী আজ আমিষ মোচ্ছব হবে। হুলো অনেক দিন পর মাথা খসা চিংড়ি এনেছে খালপার থেকে, রসুন আর কুঁচো পেয়াজ দিয়ে ভাজবে বলে । পচা নিয়ে এসেছে পাঁঠার ঘিলু দেওয়া ঘুগনি, ফুলুরি আর তিন বোতল বারদুয়ারীর বাংলা, পার হেড একটা , কোনো খাবলা খাবলি চলবে না । নবুদা এক সপ্তাহের ধকলের পরে রেল পুকুরে ঝপাঝপ দুটো ডুব মেরে বাকি আয়োজন করছে এমন সময়….দুটো কি তিনটে পুলিশের জীপ্ ঘিরে ধরল তাদের। ধর্মীয় আবেগে আঘাতের দায়ে বামাল সমেত গ্রেপ্তার হলো নবুদারা। শুনেছি ওরা সেই পুরোনো জেলেই আছে। ডিম, মাছ কিম্বা রবিবারে মাংশ কিছুই খাচ্ছে না তারা । যদি ইচ্ছে থাকে ওদের সাথে গিয়ে দেখা করতে পারেন, তবে একটু খিচুরী ও ফুলুরি নিয়ে যেতে ভুলবেন না।

নিরামিষ নবুদা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments