পরমাণু বললেই অনেক সময় আমাদের মনে যুদ্ধের কথাটা চলে আসে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে আমরা দেখেছি পরমাণু বোমার বীভৎসতা । তারপর থেকে আর কোনও হিরোশিমা বা নাগাসাকি না ঘটলেও আমরা প্রতি মুহূর্তেই একটি পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধের আতঙ্কের মধ্যে কাটাচ্ছি, এমন কথা হয়তো অত্যুক্তি মনে হতে পারে, তবে কথাটাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো অবস্থাতেও বোধহয় আমরা নেই ! প্রকাশ্যে অথবা গোপনে বহু দেশের হাতে আজ পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভার । কিন্তু পরমাণু নিয়ে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটি যুদ্ধ যে ঘটে গেছে এই গ্রহের বুকে, এটা আমরা অনেকেই হয়তো জানি না । এ যুদ্ধে কোনও রক্তপাত হয়নি, একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে কোনও প্রাণনাশও হয়নি, তবু এ যুদ্ধের তীব্রতা কোনও অংশে কম ছিল না । সর্বোপরি এই যুদ্ধ সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম যুদ্ধ ! ইতিহাসে আমরা সপ্তবর্ষের যুদ্ধ, তিরিশ বছরের যুদ্ধ, এমনকি শতবর্ষের যুদ্ধের (যা আবার প্রকৃতপক্ষে চলেছিল 116 বছর ধরে) কথা শুনেছি । কিন্তু একটি যুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে মাত্রই গত শতাব্দীর প্রারম্ভে, এমন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কথা সম্ভবত অতি বড়ো ঐতিহাসিকও কল্পনা করতে পারবেন না !

ভূমিকা না বাড়িয়ে এবার আসল কথা বলা যাক । পরমাণুতত্ত্ব সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা আজকের দিনে প্রায় প্রত্যেকেরই আছে । এই তত্ত্ব অনুসারে বিশ্বজগতের প্রত্যেকটি বস্তু অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি । এই কণাগুলিকে পরমাণু বা অ্যাটম বলে । দুই বা ততোধিক পরমাণু নিজেদের মধ্যে জোট বেঁধে তৈরি করে অণু বা মলিকুল । অণু বা পরমাণু এতই ছোট যে এদের চোখে দেখা তো দূরের কথা, সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও দেখা যায় না । কিন্তু এদের অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানী বা সাধারণ মানুষের কোনও সংশয় নেই । অথচ ভাবলে বিস্ময় জাগে, যে পরমাণুকে আজ আমরা এত সহজে মেনে নিচ্ছি, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা তাকে মোটেই সহজে মানতে চাননি । বহু সন্দেহের বেড়াজাল টপকে, বহু প্রশ্নের জবাব দিয়ে পরমাণুকে জায়গা করে নিতে হয়েছে মানুষের চিন্তাজগতে । পরমাণুর ধারণার ক্রমপরিণতির সেই ইতিহাস কোনও রোমহর্ষক যুদ্ধকাহিনীর চেয়ে কম চিত্তাকর্ষক নয় ।

এই কাহিনীর সূত্রপাত প্রাচীন গ্রীস দেশে, যে দেশ আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম জন্মভূমি । দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা – সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে ইউরোপের এই ছোট্ট দেশটি । খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে সেই গ্রীস দেশের এক দার্শনিক ও তাঁর শিষ্য – তাঁদের নাম লিউসিপ্পাস ও ডেমোক্রিটাস – তাঁরা প্রথম বললেন পরমাণুর কথা । তাঁরা বিজ্ঞানী ছিলেন না, কোনও পরীক্ষানিরীক্ষা করে তাঁরা পরমাণুর খোঁজ পেয়েছিলেন এমন নয় । বরং এ ছিল একান্তই তাঁদের চিন্তাপ্রসূত ধারণা । তাঁরা বললেন, সমস্ত বস্তু অসংখ্য অতিক্ষুদ্র, অবিভাজ্য পরমাণু দিয়ে তৈরি । এইসব পরমাণুর সৃষ্টিও নেই, ধ্বংসও নেই । অনন্তকাল ধরে তারা শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে ইতস্তত ছোটাছুটি করছে । এই অবস্থায় মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে । তখন কিছু পরমাণু মিলিত হয়ে বস্তুর সৃষ্টি করে । আবার অন্য এক ঝাঁক পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে সেই বস্তু ধ্বংস হয়ে যায় । বাহ্যিক জগতের যা-কিছু পরিবর্তন আমরা দেখি, তা সবই এই পরমাণুদের অন্ধ ছোটাছুটির ফল ।

লিউসিপ্পাস ও ডেমোক্রিটাসের এই মতবাদ কিন্তু তখনকার অধিকাংশ গ্রীক দার্শনিক সহজে মানতে পারেলন না । প্রাচীনকাল থেকে তাঁদের ধারণা ছিল, মহাবিশ্ব পদার্থ দ্বারা নিশ্ছিদ্র ভাবে পরিপূর্ণ, সেখানে কোথাও কোনও শূন্যস্থান নেই । কিন্তু মহাবিশ্ব যদি পরমাণু দ্বারা গঠিত হয়, তাহলে তো পরমাণুদের মাঝে ফাঁক বা শূন্যস্থান থাকবে । এই শূন্যস্থান ব্যাপারটা তাঁরা ঠিক মানতে পারতেন না । পরমাণুবাদ না মানার আরেকটা প্রধান কারণ ছিল এই তত্ত্বের মধ্যে নিরীশ্বরবাদের গন্ধ । প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে (বা তাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে), ঈশ্বর মানুষের জন্য এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের মঙ্গলের জন্যই তিনি একে ঠিকঠিক ভাবে চালনা করছেন । সুতরাং মানুষের উচিত ঈশ্বরকে তুষ্ট করা আর তার উপায় হল মর্ত্যলোকে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি পুরোহিত সম্প্রদায় ও তাদের সাগরেদ শাসক সম্প্রদায়কে তুষ্ট করা, তারা যা বলবে তা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করা । এদিকে পরমাণুবাদ বলছে কিনা পরমাণুদের কেউ সৃষ্টিও করেনি, কেউ চালনাও করছে না, তারা নিজেরাই অনন্তকাল ধরে অন্ধের মতো ছোটাছুটি করছে, আর তাতেই নাকি জগতটা চলছে । সুতরাং বেশির ভাগ দার্শনিক, যারা আসলে শাসক ও পুরোহিত সম্প্রদায়ের ধামাধরা ছিলেন, তাঁরা যে পরমাণুবাদকে উড়িয়ে দেবেন তাতে আর আশ্চর্য কী ?

তবুও মুষ্টিমেয় কিছু দার্শনিকের মধ্যে পরমাণুবাদ টিকে ছিল । কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এই মতবাদকে চরম আঘাত হানলেন গ্রীসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক অ্যারিস্টটল । তিনি তাঁর গতির তত্ত্ব দিয়ে শূন্যস্থানকে নাকচ করে দিলেন । অ্যারিস্টটলের মতে সমস্ত গতির জন্য একজন চালকের প্রয়োজন হয় । ঘোড়ায় রথ টানে, মাঝি দাঁড় টেনে নৌকা চালায় । তাহলে ধনুক থেকে ছিটকে বেরনো তীরকে কে টেনে নিয়ে যায় ? অ্যারিস্টটল বললেন, বাতাস ! তীরের সামনের বাতাস বিদীর্ণ হয়ে পথ করে দেয় আর তীরটি এগিয়ে গেলে পিছনের বাতাস সেই ফাঁক ভরাট করে দেয় । এইভাবে বাতাসই তীরটিকে চালিয়ে নিয়ে যায় । তাহলে গতির জন্য যদি বাতাসের প্রয়োজন হয় আর সব জায়গাতেই যেহেতু গতি সম্ভব, সুতরাং বায়ুশূন্য স্থান কোথাও থাকবে না । কারণ সেখানে চালকের অভাবে গতি স্তব্ধ হয়ে যাবে । সুতরাং শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে পরমাণুদের ছোটাছুটির তত্ত্ব একেবারে খারিজ হয়ে গেল ।

আজকে আমরা জানি, অ্যারিস্টটল পুরোপুরি ভুল বলেছিলেন । গতির জন্য বাতাসের প্রয়োজন হয় না, বরং বাতাস গতিকে বাধা দেয় । বাতাস ছাড়া গতি সম্ভব না হলে আমরা চাঁদে রকেট পাঠাতে পারতাম না, কারণ পৃথিবী ও চাঁদের মাঝখানে বেশির ভাগ জায়গাই তো বায়ুশূন্য । কিন্তু সেযুগে এবং তার পরবর্তী প্রায় দুহাজার বছর ধরে অ্যারিস্টটলের এমনই প্রভাব ছিল যে, তাঁর ভুল ভাঙার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ষোড়শ শতাব্দীতে গ্যালিলিওর কাল পর্যন্ত । অ্যারিস্টটলের কিছু পরবর্তী অন্য একজন দার্শনিক এপিকিউরাস পরমাণুবাদের কিছু পরিবর্তন করে তাকে আবার প্রচার করার চেষ্টা করেন । কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে পরমাণুবাদ ধীরে ধীরে মানুষের মন থেকে মুছে যায় ।

গ্রীস থেকে এবার প্রাচীন সভ্যতার আরেক পীঠস্থান ভারতবর্ষের দিকে চোখ ফেরানো যাক । “হিন্দু” দর্শনের ছয়টি শাখার মধ্যে অন্যতম দুটি হল ন্যায় ও বৈশেষিক । ন্যায় দর্শনের রচয়িতা গৌতম এবং বৈশেষিক দর্শনের রচয়িতা কণাদ ভারতে পরমাণুবাদের অবতারণা করেন । তাঁদের মতবাদের সঙ্গে গ্রীক মতবাদের কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল বক্তব্য মোটামুটি একই ছিল । তবে গৌতম ও কণাদের সময়কাল লিউসিপ্পাস ও ডেমোক্রিটাসের আগে না পরে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না । ফলে ভারতীয় মতবাদ গ্রীক মতবাদকে প্রভাবিত করেছিল, না গ্রীক মতবাদ ভারতীয় মতবাদকে প্রভাবিত করেছিল, নাকি দুটি মতবাদই স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে । যাইহোক, গৌতম ও কণাদের মতবাদ তাঁদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় । আধুনিক ভারত তাঁদের উত্তরাধিকার বহন করতে পারেনি । নইলে হয়তো আমাদের দেশ থেকেই একজন ডালটনের জন্ম হত ।

ইউরোপের ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটা হয়নি । অ্যারিস্টটলের আঘাতে দীর্ঘকাল ঘুমিয়ে থাকার পর সপ্তদশ শতাব্দীতে পরমাণুবাদের পুনর্জাগরণ হয়েছে । দুজন ফরাসী দার্শনিক রেনে দেকার্ত ও পিয়ের গ্যাসেন্দি দুরকম ভাবে এই পুনর্জাগরণ ঘটালেন ।

দেকার্তকে অনেক সময় আধুনিক দর্শনের জনক বলা হয় । তিনি পরমাণুবাদকে কিছুটা পরিবরতিত করে নিলেন । এই পরিবর্তিত মতবাদকে কণিকাবাদ বা করপাসকুলারিয়ানিজম বলা হয় । তাঁর মতে পরমাণু অবিভাজ্য নয়, তাকে ভাঙা যায় । তাই তাকে পরমাণু বা অ্যাটম বলা ঠিক নয়, কারণ অ্যাটম কথাটা এসেছে গ্রীক অ্যাটোমোস শব্দ থেকে, যার অর্থ অবিভাজ্য । সুতরাং দেকার্ত পরমাণু না বলে বললেন করপাসল বা কণিকা । পরমাণুবাদের বিরুদ্ধে যেটা প্রধান অভিযোগ, সেই শূন্যস্থান বা ভ্যাকুয়ামকে বাদ দিয়েই তিনি তাঁর মতবাদকে সাজাতে চেষ্টা করলেন । তিনি বললেন, এই অতিসূক্ষ্ম কণিকাগুলি ঘূর্ণির আকারে একস্থান থেকে অন্যস্থানে এমনভাবে ধেয়ে চলেছে যাতে কোথাও শূন্যস্থান না থাকে । অর্থাৎ একটি কণিকা সরে গিয়ে তার পিছনের কণিকাকে জায়গা করে দিচ্ছে, সে আবার জায়গা করে দিচ্ছে তার পিছনের কণিকাকে । এইভাবে চক্রাকারে চলছে ।

অন্যদিকে গ্যাসেন্দি কিন্তু এপিকিউরাসের পরমাণুবাদকেই প্রায় অবিকৃত আকারে মেনে নিলেন । তিনি শুধু ওই মতবাদের নিরীশ্বরবাদের বদনাম ঘোচানোর চেষ্টা করলেন । তিনি বললেন, পরমাণুগুলি অনন্তকাল ধরে ছোটাছুটি করছে না । ঈশ্বর বিশ্বসৃষ্টির সময় সেগুলিকে তৈরি করে ঠেলে দিয়েছিলেন । সেই ঐশ্বরিক ঠেলার জোরেই তারা ছুটে চলেছে । একে আমরা বলতে পারি পরমাণুবাদের একটা  “ডেইস্ট” ভাষ্য । এই ভাষ্যের ফলে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না । আর শূন্যস্থান সংক্রান্ত অভিযোগের উত্তর দেওয়ার জন্য গ্যাসেন্দি সমসাময়িক পদার্থবিজ্ঞানের উপর নির্ভর করলেন । 1643 সালে গ্যালিলিওর ছাত্র টরিসেলি বায়ুর চাপ মাপার যন্ত্র ব্যারোমিটার আবিষ্কার করেছেন । ব্যারোমিটার আসলে একটা মিটার খানেক লম্বা একমুখ খোলা কাচের নল । এই নলকে পারদ দিয়ে ভর্তি করে অন্য একটা পারদপূর্ণ গামলার মধ্যে নলের খোলা মুখটা ডুবিয়ে রাখা হয় । এর ফলে নলের পারদ প্রথমে আপন ভারে নামতে থাকে । এইভাবে নামতে নামতে যখনই নলের পারদস্তম্ভের দৈর্ঘ্য 76 সেন্টিমিটার হয়, তখন পারদ আর না নেমে স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে । টরিসেলি বললেন, এর কারণ হল বায়ুমণ্ডলের চাপ । বায়ুমণ্ডলের চাপ 76 সেন্টিমিটার দীর্ঘ পারদস্তম্ভের চাপের সমান, তাই বায়ুমণ্ডল অতটা দীর্ঘ পারদস্তম্ভকে ধরে রাখে । ভালো কথা । আর পারদস্তম্ভের উপরে নলের যে ফাঁকা জায়গাটা রয়েছে ? ওখানে কী আছে ? টরিসেলি পরীক্ষা করে দেখালেন, ওখানে কিচ্ছুটি নেই, এমনকি বাতাসও না । অর্থাৎ সেই শূন্যস্থান, যা কিনা বহু শতাব্দী আগে অ্যারিস্টটল যুক্তি দিয়ে নাকচ করে দিয়েছিলেন । পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম স্থায়ী শূন্যস্থান বা ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি করে দেখালেন টরিসেলি (প্রকৃতপক্ষে  “টরিসেলির শূন্যস্থান” পুরোপুরি শূন্য নয়, সেখানে সামান্য পারদবাস্প থাকে, তবে তার পরিমাণ নগণ্য) । তাঁর দেশ ইতালি থেকে এই আশ্চর্য সংবাদ সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল । ফ্রান্সে বসে গ্যাসেন্দিও পেলেন সেই সংবাদ । আর সঙ্গে সঙ্গে পরমাণুবাদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগটির জুতসই জবাব পেয়ে গেলেন তিনি । এতদিন বলা হত, যেহেতু প্রকৃতিতে শূন্যস্থানের অস্তিত্ব নেই, তাই পরমাণুরও অস্তিত্ব নেই । এখন শূন্যস্থানের অস্তিত্ব প্রমাণ হয়ে গেছে । সুতরাং পরমাণুকে মানতে আর অসুবিধা কোথায় ?

গ্যাসেন্দি 1687 সালে তাঁর পরমাণুবাদ প্রচার করলেন । সেইসঙ্গে করে দেখালেন টরিসেলির পরীক্ষাটি । তাঁর মতবাদ দেকার্তের মতবাদ থেকে আলাদা হওয়ায় দেকার্তের সঙ্গে তাঁর বিতর্ক শুরু হল । শেষ পর্যন্ত যেসব দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা দেকার্তের কষ্টকল্পিত ঘূর্ণির তত্ত্বকে মানতে পারেন নি, তাঁরা গ্যাসেন্দির মতকেই বরণ করে নিলেন । খ্রিস্টধর্মের কেষ্টবিষ্টুরাও আপত্তি করলেন না । কিন্তু পরমাণুবাদের বিপদ একেবারে কেটে গেল, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই । সবে যুদ্ধের প্রথম ধাপটা সে পার হয়েছে । এখনও অনেক পথ বাকি । সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের অনেকে পরমাণুবাদ মেনে নিলেন, কিন্তু অনেকেই মানলেন না । তাঁদের বক্তব্য, পরমাণুবাদ নিছক একটি দার্শনিক মতবাদ । কোনও পরীক্ষানিরীক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, এই মতবাদ নিতান্তই কল্পনাপ্রসূত । এরকম কল্পনার মূল্য দর্শনে থাকতে পারে, বিজ্ঞানে এর মূল্য কোথায় ?

এই যখন পরিস্থিতি, তখন একটা ঘটনা ঘটল । 1738 সালে ড্যানিয়েল বারনৌলি নামে একজন সুইশ পদার্থবিজ্ঞানী এমন একটি কাজ করলেন যাতে পরমাণুবাদ সামান্য হলেও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পেল । আমরা জানি, কোনও গ্যাসকে একটা পাত্রের মধ্যে রাখলে গ্যাসটি পাত্রের দেওয়ালে চাপ দেয় । বেলুন ফোলানোর সময় গ্যাসের এই চাপের প্রমাণ পাওয়া যায় । বারনৌলি বললেন, এই চাপের কারণ হল গ্যাসের পরমাণুগুলোর গতি । পরমাণুগুলো ছোটাছুটি করতে করতে পাত্রের দেওয়ালে অনবরত ধাক্কা দেয় আর তার ফলেই চাপের সৃষ্টি হয় । এখন কোনও বস্তুকণা একটি দেওয়ালে ধাক্কা দিলে কতটা বল প্রয়োগ করবে, তা নির্ণয়ের উপায় অর্ধশতাব্দী আগে আইজ্যাক নিউটন বলে গিয়েছিলেন । বারনৌলি নিউটনের সূত্র কাজে লাগিয়ে অঙ্ক কষে বের করলেন গ্যাসের চাপ । তিনি দেখলেন যে, গ্যাসের আয়তন বাড়লে চাপ কমে আর আয়তন কমলে চাপ বাড়ে । ঠিক এই কথাটাই পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করে গিয়েছিলেন নিউটনের সমসাময়িক আরেক ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল । এবার বারনৌলির অঙ্ক কষে পাওয়া সূত্র বয়েলের পরীক্ষালব্ধ সূত্রের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় পরমাণুবাদ যে নির্ভুল এটাই প্রমাণ হল । কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, বারনৌলির কাজ যে-কারণেই হোক, সেকালের অন্য সব বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ গ্রাহ্য হল না । ফলে পরমাণুবাদ যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রইল ।

এর পরের ঘটনা 1799 সালে । ফরাসী রসায়নবিদ জোসেফ প্রাউস্ট একটা নতুন কথা বললেন । আমাদের চারপাশে আমরা যে অজস্র পদার্থ দেখি, বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে সেগুলো আসলে মাত্র কয়েকটা পদার্থের সমন্বয়ের ফসল । এই কয়েকটা পদার্থই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানাভাবে নিজেদের মধ্যে যুক্ত হয়ে তৈরি করে অন্য সব পদার্থ । এই পদার্থগুলোকে বলা হয় মৌলিক পদার্থ বা মৌল, আর এরা যুক্ত হয়ে যেসব পদার্থ তৈরি করে তারা হল যৌগিক পদার্থ বা যৌগ । যেমন – হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন হল মৌলিক পদার্থ, আর এরা যুক্ত হয়ে যে জল তৈরি করে তা হল যৌগিক পদার্থ । এখন প্রাউস্ট নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করে বললেন, একটা যৌগিক পদার্থে তার উপাদান মৌলগুলির ওজনের অনুপাত একেবারে নির্দিষ্ট । যেমন – আটভাগ ওজনের অক্সিজেনের সঙ্গে একভাগ ওজনের হাইড্রোজেন মিশে জল হয় । এখন আপনি পৃথিবীর যেখান থেকেই জল আনুন না কেন (অবশ্য সেটা বিশুদ্ধ হতে হবে), তাতে ওই ওজনের অনুপাত একই থাকবে । আবার হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিশিয়ে জল তৈরি করতে হলেও তাদের ঠিক ওই অনুপাতেই মেশাতে হবে । সামান্য ইতরবিশেষ হলেও চলবে না ।

জন ডালটন নামে একজন ইংরেজ রসায়নবিদ প্রাউস্টের সূত্র নিয়ে ভাবতে বসলেন । প্রাউস্টের সূত্র কেন সত্যি হয় ? কেন একটা যৌগিক পদার্থ সবসময় A মৌলের 8 ভাগ ও B মৌলের 1 ভাগ মিলেই তৈরি হয় ? কেন কখনোই A মৌলের 8.1 ভাগ বা 7.9 ভাগ আর B মৌলের 1 ভাগ মিলে তৈরি হয় না ? পদার্থ যদি অবিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে তো এরকম হওয়ার কথা নয় । কিন্তু পদার্থ যদি অসংখ্য ছোট ছোট পরমাণু দিয়ে তৈরি হয় ? ধরা যাক, A-এর একটি পরমাণু ও B-এর একটি পরমাণু যুক্ত হয়ে একটি যৌগিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা বা অণু তৈরি করে । আরও ধরা যাক, A-এর একটি পরমাণু B-এর একটি পরমাণুর চেয়ে 8 গুণ ভারি । তাহলে যৌগিক পদার্থটির মধ্যে ঠিক A-এর 8 ভাগ ওজন ও B-এর 1 ভাগ ওজনই থাকবে । এই অনুপাতটিকে পাল্টাতে হলে B-এর একটি পরমাণুর সঙ্গে A-এর একটি পরমাণুর চেয়ে সামান্য বেশি বা কম অংশ যুক্ত করতে হবে । কিন্তু পরমাণুকে ভাঙা যায় না বলে সেটা সম্ভব নয় । সুতরাং ডালটন দেখলেন, পদার্থ পরমাণু দিয়ে তৈরি বলে ধরে নিলে প্রাউস্টের সূত্র তার একটা স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হিসেবেই এসে পড়ে । 1808 সালে ডালটন তাঁর পরমাণুতত্ত্ব প্রকাশ করলেন । এই প্রথম পরমাণুবাদ দর্শনের মোড়ক থেকে বেরিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত হল ।

ডালটনের পরমাণুতত্ত্ব প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে রসায়নবিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে পদার্থের পারমাণবিক গঠনে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন । এই বিষয়ে তাঁরা অনেক কাজও করতে লাগলেন । হাইড্রোজেন পরমাণুর ওজন এক ধরে তার সাপেক্ষে তাঁরা অন্যান্য মৌলিক পদার্থের পরমাণুর আপেক্ষিক ওজন নির্ণয় করলেন (পরমাণু এতই ক্ষুদ্র যে তার প্রকৃত ওজন নির্ণয় করার কথা তখন কল্পনাও করা যেত না) । এই কাজ ডালটন শুরু করলেও বার্জিলিয়াস পরে অনেক নিখুঁতভাবে এটি সম্পন্ন করেছিলেন । এছাড়া বার্জিলিয়াস পদার্থের পারমাণবিক গঠন অনুযায়ী তার সংকেত লেখার প্রচলন করেন । তাঁর দেখানো পথেই আজও আমরা জলের সংকেত লিখি  – অর্থাৎ দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু মিলে জলের একটি অণু তৈরি হয় ।

ওদিকে পদার্থবিজ্ঞানীদের অধিকাংশই কিন্তু তখনও পরমাণুকে কাল্পনিক ধারণা বলেই মনে করতেন । ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে অল্প কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী – হয়তো রসায়ন বিজ্ঞানীদের কাজ দেখে উৎসাহিত হয়েই – একশো বছর আগের ড্যানিয়েল বারনৌলির দেখানো পথে হাঁটতে শুরু করলেন । অর্থাৎ পরমাণুর ধারণা থেকে পদার্থের বাহ্যিক ধর্ম আবিষ্কার করতে চাইলেন । এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন তিনজন – জার্মানির রুডলফ ক্লসিয়াস, স্কটল্যান্ডের জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, এবং অস্ট্রিয়ার লুডভিগ বোলজম্যান । এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন মূলত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী । এঁদের গাণিতিক দক্ষতা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের । এঁদের গবেষণার ফলে জন্ম নিল পদার্থবিদ্যার দুটি নতুন শাখা – কাইনেটিক থিওরি অফ গ্যাসেস এবং স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স । প্রথমটির জন্মদাতা ক্লসিয়াস ও ম্যাক্সওয়েল, দ্বিতীয়টি মূলত বোলজম্যানের মানসসন্তান ।

এইসব তত্ত্বের মূলকথা হল, বস্তুজগতের দুটো দিক আছে । একটা হল তার বাইরের দিক, সেটা আমরা দেখতে পাই আর সেখানে অবিরত ঘটে চলেছে নানা বিচিত্র ঘটনা । এটা হল ম্যাক্রোস্কোপিক বা দৃশ্য জগত । কিন্তু এই বাহ্যিক জগত ছাড়াও আরেকটা অদৃশ্য জগত আছে বস্তুসমূহের অভ্যন্তরে । সেটা হল অণু-পরমাণুর জগত বা মাইক্রোস্কোপিক জগত । চাঁদের একটা পিঠের মতো আমরা শুধু ম্যাক্রোস্কোপিক জগতটাকেই দেখতে পাই, মাইক্রোস্কোপিক জগতটা থেকে যায় আমাদের দৃষ্টির বাইরে । কাইনেটিক থিওরি বা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্সের কাজ হল এই দুই জগতের মেলবন্ধন ঘটানো । অর্থাৎ অণু-পরমাণুর গতির সাহায্যে পদার্থের বাহ্যিক ধর্মকে আবিষ্কার করা । এ যেন বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন – সমুদ্রের প্রতিটি জলের ফোঁটাকে দেখে সমুদ্রের বাইরের রূপটাকে বোঝার চেষ্টা করা । এই তুলনা থেকেই বোঝা যায়, কাজটা কতটা কঠিন । আর এই কঠিন কাজটা ওই বিজ্ঞানীরা করতে পেরেছিলেন তাঁদের গাণিতিক দক্ষতার সাহায্যে । প্রোব্যাবিলিটি বা সম্ভাবনা তত্ত্ব আর স্ট্যাটিস্টিক্স বা পরিসংখ্যান তত্ত্ব – গণিতশাস্ত্রের এই দুই শক্তিশালী অস্ত্রের সাহায্যে তাঁরা আবিষ্কার করলেন পদার্থের বিভিন্ন বাহ্যিক ধর্ম । আশ্চর্যের ব্যাপার হল, তাঁদের এইসব অঙ্ক কষে পাওয়া ফলাফল একেবারে মিলে গেল হাতেকলমে পরীক্ষা করে পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে । ফলে তাঁদের তত্ত্ব যে শুধু সঠিক প্রমাণিত হল তাই নয়, সেইসঙ্গে প্রমাণিত হল অণু-পরমাণুর অস্তিত্বও ।

কিন্তু তবুও একদল বিজ্ঞানী ও দার্শনিক এইসব তত্ত্বের বিরোধিতা করতে লাগলেন । এঁদের নেতৃত্বে ছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ তথা দার্শনিক আর্নেস্ট ম্যাখ এবং জার্মান রসায়নবিদ উইলহেম অসওয়াল্ড । এঁরা  “ভিয়েনা সার্কেল” নামে একটি “পজিটিভিস্ট”  দার্শনিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন । এঁদের বক্তব্য ছিল এই যে, বিজ্ঞানে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় না, এমন ধারণার কোনও স্থান নেই । পরমাণুর অস্তিত্বকে ধরে নিয়ে কাইনেটিক থিওরি বা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স যতই কেন সঠিক ফলাফল বের করুক, যতদিন পর্যন্ত কেউ সরাসরি পরীক্ষার সাহায্যে পরমাণুর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে না পারছে, ততদিন বিজ্ঞানে তার কোনও স্থান নেই ।

ম্যাখ ও অসওয়াল্ডের এই সমালোচনা যাকে সবচেয়ে বেশি বিব্রত করেছিল, তিনি হলেন বোলজম্যান । কুড়ি বছর বয়সে তিনি যখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন তাঁর অধ্যাপক তাঁকে পড়তে দিয়েছিলেন কাইনেটিক থিওরির উপর লেখা ম্যাক্সওয়েলের কিছু পেপার বা গবেষণাপত্র । সেই পেপার পড়ে তরুণ বোলজম্যান এতটাই অভিভূত হলেন যে, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সারাজীবন ওই বিষয় নিয়েই গবেষণা করবেন । আর করলেনও তাই । শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা সাধারণত একাধিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন । কিন্তু বোলজম্যান সারাজীবনে যা-কিছু উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন, সব ওই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে – স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স, তাঁর মানসসন্তান । এহেন স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স আক্রান্ত হওয়ায় পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে বোলজম্যানের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ল । জীবনের শেষের দিকে বোলজম্যান নতুন কোনও গবেষণা করেন নি, তখন তাঁর একমাত্র কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্যান্য বিজ্ঞানীদের পরমাণুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করানো । এমনকি পরমাণুতত্ত্বের সপক্ষে দার্শনিক যুক্তিটা পোক্ত করার জন্য তিনি বৃদ্ধ বয়সে দর্শন পড়তেও শুরু করেছিলেন । কিন্তু এত করেও কিছু হল না । 1904 সালে পদার্থবিদ্যার একটি সম্মেলনে অধিকাংশ বিজ্ঞানী স্পষ্টভাবে পরমাণুকে প্রত্যাখ্যান করলেন । এমনকি ওই সম্মেলনে বোলজম্যানকে পদার্থবিদ্যা বিভাগে আমন্ত্রণ করা হল না, তাঁর জায়গা হল ফলিত গণিত বিভাগে ।

বোলজম্যান এমনিতেই ছিলেন মানসিক অবসাদের রোগী, তাঁর পক্ষে এসব আঘাত সহ্য করা সম্ভব হল না । কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর 1906 সালে স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে তিনি আত্মহত্যা করলেন । তাঁর স্ত্রী ও কন্যা তখন সুইমিং পুলে গিয়েছিলেন । ফিরে এসে দেখেন, ছাদ থেকে ঝুলছে অবসাদগ্রস্ত, বৃদ্ধ বিজ্ঞানীর নিথর দেহ । দৃশ্য ও অদৃশ্য লোকের মধ্যে যিনি সেতুবন্ধন করার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি চলে গেলেন অন্য এক সুদূর অদৃশ্য লোকে । বোলজম্যানের সমাধির উপর খোদিত আছে তাঁর আবিষ্কৃত একটি ছোট্ট সমীকরণ, যা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্সের স্তম্ভ রূপে বিবেচিত হয় :

S = k log W.

বোলজম্যান হয়তো জানতেন না, তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে 1905 সালে পদার্থবিদ্যার একটি জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় । লেখক সুইশ পেটেন্ট অফিসের একজন অখ্যাতনামা ক্লার্ক, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি পরে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্য জগদ্বিখ্যাত হবেন । গবেষণার বিষয় হল ব্রাউনীয় গতি যা ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন 1827 সালে আবিষ্কার করেছিলেন । ব্রাউন জলে ভাসমান কিছু পরাগরেণুকে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন । মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে তিনি একটা অদ্ভূত দৃশ্য দেখলেন । পরাগরেণুগুলো অনবরত এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে । এই এলোমেলো গতির যেন কোনও শেষ নেই । অথচ পাত্রের জল দৃশ্যত স্থির । শুধু পরাগরেণু নয়, পরে তিনি অজৈব সূক্ষ্ম কণা নিয়ে পরীক্ষা করেও একই দৃশ্য দেখলেন । এই রহস্যময় ঘটনাটি ব্রাউনীয় গতি নামে বিখ্যাত হয়, যদিও ব্রাউন বা অন্য কেউ এর কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি । 1905 সালের ওই পেপারে আইনস্টাইন দাবি করলেন, ব্রাউনীয় গতি আসলে অণু-পরমাণুর অস্তিত্বকেই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করছে । জলের অণুগুলি নিরন্তর ছোটাছুটি করার সময় পরাগরেণুগুলিকে যে ধাক্কা দিচ্ছে, তার জন্যই তাদের এই গতি । নির্ভুল গাণিতিক যুক্তির সাহায্যে আইনস্টাইন তাঁর বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করলেন ।

কিন্তু গণিত ও তত্ত্ব কোনদিনই বিজ্ঞানে শেষ কথা নয় । পরীক্ষার কষ্টিপাথরে যাচাই হলে তবেই কোনও তত্ত্ব সঠিক বলে গৃহীত হয় । এখন আইনস্টাইনের তত্ত্ব পরীক্ষার সাহায্যে যাচাই করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ । কিন্তু ফরাসী বিজ্ঞানী জ্যাঁ-ব্যাপতিস্তে পেরিন 1908 থেকে 1913 সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে সেই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করলেন । একাজে তিনি ফটোগ্রাফিকে ব্যবহার করেছিলেন । সূক্ষ্মকণা মিশ্রিত এক ফোঁটা জলের হাজার হাজার আলোকচিত্র নিলেন তিনি । তিনি যে শুধু অণু ও পরমাণুর অস্তিত্বই প্রমাণ করলেন তা নয়, সেইসঙ্গে তিনি অণুর আকার এবং কোনও নির্দিষ্ট পরিমাণ পদার্থে উপস্থিত অণুর সংখ্যাও নির্ণয় করলেন । 1913 সালে প্রকাশিত তাঁর বই  “দি অ্যাটমস” পরমাণুর অস্তিত্ব নিয়ে দুই সহস্রাব্দ ব্যাপী যাবতীয় বাদানুবাদের উপর স্থায়ী যবনিকা টেনে দিল । শুধু একটাই দুঃখ, সেদিন পেরিনের কাজের প্রশংসা করার জন্য কোনও বোলজম্যান ছিলেন না । নিঃসন্দেহে বলা যায়, বেঁচে থাকলে পেরিনের কাজ দেখে তিনিই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন ।

না, জ্যাঁ-ব্যাপতিস্তে পেরিন বাঁচাতে পারেন নি লুডভিগ বোলজম্যানকে, কিন্তু বাঁচিয়ে দিলেন তাঁর মানসসন্তান স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্সকে । আর কে না জানে, সন্তানের মধ্যেই বেঁচে থাকেন সন্তানের পিতা । তাইতো লুডভিগ বোলজম্যান আজও বেঁচে আছেন সেইসব মানুষের মনে যারা তাঁরই মতো বিজ্ঞানের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন ।

পরমাণু ও একটি অন্য যুদ্ধের গল্প
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments