ছোটবেলায় আমার প্রিয় ক্লাস ছিল পরিবেশ পরিচিতি। আমাদের ইস্কুল, অর্থাৎ পাঠভবনে, ছোটবেলায় বিজ্ঞান বলে কিছু পড়ানো হত না। তার বদলে ছিল এই ক্লাস। প্রাইমারি থেকে হাই স্কুলে ওঠার পর "বিজ্ঞান" পড়ানো শুরু হয়। অবশ্য আমাদের ইস্কুলে প্রাইমারি-হাই এর আলাদা কোনো ভাগ ছিলনা, স্রেফ বোঝাবার সুবিধের জন্য বলছি।

শান্তিনিকেতনে যে গাছের তলায় ক্লাস হয় তা অনেকেই জানেন। অনেকে এমনও ভাবেন যে এতে করে নাকি ভাল করে পড়াশুনা করা যায়না। মন অন্যদিকে চলে যায়। আসলে ঠিক উলটো। বাইরের ফ্রেশ হাওয়ায় বসে প্রকৃতির মধ্যে শিক্ষার এই যে প্রচলন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার জবাব নেই। ঝড়-জল না হলে এর মত সুন্দর ব্যবস্থা হয়না। বিশ্বভারতীতে হাজারটা সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু শিশুদের শিক্ষার যে পরিবেশ সেখানে রয়েছে, তা চমৎকার! বরং পরে যখন অন্য জায়গায় পড়াশুনা করেছি, বদ্ধ ক্লাসরুমের মধ্যে নীলচে কৃত্রিম আলোয় বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুম পেয়ে যেত। যাই হোক, সে সব নিয়ে রবি ঠাকুর অনেক অনেক লেখা লিখেছেন, শিক্ষাবিদরাও দিস্তে দিস্তে কাগজ খরচ করে ফেলেছেন। সে নিয়ে নয়, আজ বলব ওই পরিবেশ পরিচিতির কথা।

বিষয়টার নাম শুনেই হয়তো কিছুটা আঁচ করতে পারছেন কি ধরণের জিনিস শেখানো হত। এক্কেবারে ছোটবেলায়, অর্থাৎ ক্লাস ওয়ান-টু তে গল্পের ছলেই শেখানো হত নানা জিনিস। মাঝে মাঝে শিক্ষক বা শিক্ষিকা ছেলেমেয়েদের নিয়ে দল বেঁধে ঘোরাতেন আশ্রম চত্বরের বিভিন্ন জায়গায়, চিনিয়ে দিতেন কোনটা দেবদারু গাছ, কোনটাই বা ছাতিম, জারুল, অর্জুন কিম্বা শিশু। বেশ মজার ছিল এই আউটিং গুলো।

খুব সম্ভবত ক্লাস থ্রি নাগাদ প্রথম খোকাদার ক্লাস করি। খোকাদা (ভাল নাম মনোরঞ্জন দা, কিন্তু খোকাদা নামেই সর্বত্র পরিচিত ছিলেন) ছিলেন পরিবেশ পরিচিতির বিখ্যাত শিক্ষক। আসলে কেমিস্ট্রির লোক, কিন্তু তাঁকে বেশি মনে রয়েছে এই ক্লাসের জন্যই। বড়সড় চেহারা, গায়ের রঙ কালো, মাথায় চুলের অভাব, সেই সঙ্গে জাঁদরেল ব্যক্তিত্ব। সব মিলে দেখে একটু ভয় ভয়ই করত। মাঝে মাঝেই মজার মজার কথা বললেও হাবেভাবে আর গম্ভীর গলার আওয়াজে সবসময়ই যেটা থাকত সেটাকে এখন আমরা বলি "অ্যাটিচিউড"। ব্যাটারির মত মোটা মোটা আঙুল ওয়ালা ওই হাতের একটা থাপ্পড় খেলে কি দশা হবে সেই নিয়ে বন্ধুরা বলাবলি করতাম।

এ হেন খোকাদার ক্লাস নেবার কায়দাটা ছিল বেশ অন্যরকম। ক্লাসের মধ্যমণি হয়ে থাকতেন তিনি, আর চারপাশে অনেক দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসিয়ে দিতেন ছেলেমেয়েদের। তারপর কুইজের স্টাইলে নানান প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নগুলো হত এই ধরনের -  "একটি পাখির নাম লেখো যারা বীরত্ব দেখাতে অনেএএএক উঁচুতে উড়ে যায়, তারপর ডানা বন্ধ করে ধপ করে পড়ে মরে যায়!" কিম্বা "একটি উদ্ভিদের নাম লেখো যারা চলাফেরা করতে পারে"। একটা করে প্রশ্ন দিতেন, আর ছাত্রদের কাজ ছিল উত্তর লিখে নিয়ে গিয়ে উঠে গিয়ে ওনাকে দেখিয়ে আসা। বেশ খেলা খেলা ব্যাপার ছিল একটা, সবাই উত্তর লিখে হুড়মুড়িয়ে ছুটত খাতা দেখাতে। ঠিক হলে টিক আর ভুল হলে ঘ্যাচাং করে কেটে দিয়ে সবার দেখানো হলে উত্তরটা বলে দিতেন – "যাদের হয়নি, সবাই লিখে নাও… "

খোকাদা মাঝে মাঝে গল্প বলতেন। ওনার গল্প বলার স্টাইল ছিল অনবদ্য। সাধারণত গল্পগুলো হত ভূতের গল্প কিম্বা থ্রিলার। সাধারণ ক্লাসের ঠিক উলটো হত সেদিন। সবাই ওনার বেদীর একদম কাছে ঘনিয়ে এসে বসত। দু হাত নেড়ে গলার মধ্যে অদ্ভুত রহস্য রোমাঞ্চের ছোঁয়া এনে যেভাবে বলতেন, দিনের আলোতেও শুনে গা ছমছম করত। গল্প উনি নিজে থেকেই বলতেন, মাঝে মাঝে আমরা বায়নাও করতাম বটে, তবে ওনার কাছে বেশি ঘ্যান ঘ্যান করার মত সাহস ছিলনা।

পরে একটু বড় হয়ে, যখন প্রথম ডার্টি জোকস ইত্যাদি শিখছি, তখন একটা গল্প শুনেছিলাম। একবার নাকি টীচার্স ডের দিন একটি সিনিয়র ছাত্র বাচ্চাদের ক্লাস নিতে গিয়ে খোকাদাকে নকল করে গল্প বলছিল। ওনার স্টাইলকে নকল করে হাত নেড়ে খিল্লি করাই বোধহয় তার উদ্দেশ্য ছিল। সে নাকি বলেছিল "একটা ব্রিজ… কুয়াশায় ঢাকা… দু দিক থেকে দুটো ট্রেন আসছে একই লাইনে! আরও কাছে আসছে… ব্রিজের মাঝামাঝি এসে দুম করে তাদের মধ্যে ধাক্কা লাগল! …আর খোকাদার ইয়েটাও দুম করে ফেটে গেল!" সে বেচারা জানতনা খোকাদা কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। হঠাৎ পিঠে কিল চড়ের বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়! এখন ভাবলে মনে হয় এ গপ্পটা নির্ঘাত আমার ফচকে বন্ধুগুলোর কারুর মস্তিষ্কপ্রসূত, কিন্তু তখন একেবারেই অবিশ্বাস্য মনে হয়নি।

হ্যাঁ, খোকাদা মাঝেমধ্যে কিল চড় লাগাতেন বটে, তবে যতটা গর্জাতেন তত বর্ষাতেন না। মাঝে মাঝেই বলতেন "ধোপার কাপড় কাচা দেখেছ? অ্যাঁ? ওইরকম করে তুলে আছাড় মারব!" তাঁর ধমকানোর আরেকটা প্রিয় ডায়ালগ ছিল "বৃন্দাবন দেখেছ? বৃন্দাবন? এক থাবড়া মেরে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দেব!" ওই পাঞ্জা দেখলে মনে হত সত্যি দিলেও দিতে পারেন। আমাদের বন্ধু অর্ণব মিত্র ছিল ভারি ফাজিল। সে একবার "বৃন্দাবন দেখেছ" এর উত্তরে "হ্যাঁ!" বলে উঠেছিল। তারপর এমন ধমক খেয়েছিল যে আর পালানোর পথ পায়নি। আরেকবার পরিবেশ পরিচিতির একটা প্রশ্ন – "একটি প্রাণীর নাম লেখো যারা দল বেঁধে নাচগান করে" – যার উত্তর হবে ডলফিন – এর উত্তরে অর্ণব লিখেছিল "মানুষ"। খোকাদা ধমক দিলেও পরে নিজের প্রশ্নের ফাঁকটা বুঝতে পেরে প্রশ্নটা পালটে নিয়েছিলেন – "…যারা মানুষের মত দল বেঁধে নাচগান করে"।

পরিবেশ পরিচিতির পাট চুকিয়ে হাই স্কুলে ওঠার কিছুদিন পরই অর্ণব আমাদের ছেড়ে চলে যায়। ব্লাড ক্যান্সারে। খোকাদাও অবসর নিয়েছেন বেশ কিছুদিন হল। হঠাৎ ভাবতে গিয়ে মনে হল এর মাঝে অনেএএক গুলো বছর কেটে গেছে। এখনকার পাঠভবনে পরিবেশ পরিচিতির ক্লাস কেমন হয় কে জানে?

 

পরিবেশ পরিচিতি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments