এই পর্বে লিখছেন সুস্মিতা বোস।পেশাতে হোলটাইম গৃহিণী। নেশা বই পড়া… আর নিজের আনন্দে লেখা… ছোট ফ্ল্যাটের দক্ষিণের জানালার মতোই।

 

অদ্ভুত এক শীতের আমেজ এখন চারপাশে। লালচে রোদ- ঝকমকে নীল আকাশ- বাজারে রঙিন সব্জীর পশরা -নতুন গুড়ের সন্দেশ -রাস্তায় মানুষের ঢ্ল-আর মিষ্টি মিষ্টি পৌষালি সুখ দু:খ- গাঢ় ফিকে সুতোয় বোনা মানুষের একঘেয়ে রোজকার জীবন যেন নতুন করে ধরা দেয় শীত আসলেই। রাস্তায় লোকজন অযথা খেঁকিয়ে ওঠেনা। অটো ড্রাইভার খুচরো না থাকলেও কিশোরের গান শুনিয়ে হাসিমুখে নামিয়ে দিয়ে বলে 'দিদি কাল কিন্তু খুচরো চাই।' বাজারের পরিচিত সব্জীওয়ালা জোর করে সবুজ ক্যাপসিকাম, লাল টমেটো, সাদা ফুলকপি ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয়। রাত নটা বাজলে মন বলে একটু কফি হয়ে যাক। এভাবেই শীত কখন যেন অজান্তে ঢুকে পরে আমার রান্নাঘরে। শোবার ঘরের জানলা দিয়ে অল্প অল্প রোদ যখন গায়ে এসে পরে- আরামের অনুভূতি ছড়িয়ে যায় অলস শরীরে। ভীষণ ভালো লাগে- বুঝি শীত এসে গেছে।…..

সারা বছর এই দুটো মাসের জন্য অপেক্ষা করি- গরমের অসহ্য তাপে যখন অসুস্থ হয়ে পড়ি, তখন ভাবি এই শীতের কথা। মনে হয় সে তো আসবে….. আমার ছোটবেলায় শীত মানেই ছিল ফাইনাল পরীক্ষা। সে যে কি দু:সহ দিন গেছে! সান্টা আসতো না আমার জন্য,আসতো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নামক বিভীষিকা! আজ যখন বাড়ীর খুদে সদস্যটির জন্য সান্টার গিফট গুছিয়ে রাখি তার বালিশের পাশে-বড় মায়া লাগে তার নিষ্পাপ মুখ দেখে। উপহারের সাথে অনেকটা স্বপ্ন বুনে দিই ওর জন্য। সান্টাকে বলি মনে মনে – 'কিছু দিতে হবেনা দাড়ি দাদু- শুধু ভালোবাসা দাও- লড়াইয়ের শক্তি দাও ওকে।'

ভোরবেলায় ছাদে উঠে দেখি কমলা সূর্য – গাছের পাতা থেকে তখনো টুপটুপ ঝরছে শিশির – বছরের প্রথম গোলাপ ফুটবো ফুটবো করছে – এক মায়াবী অপার্থিব জগত – ভালোবাসা, আলো, উত্তাপ নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমার দিকে।আবার বাঁচতে ইচ্ছে করে নতুন করে…… সব মালিন্যকে দূরে সরিয়ে রেখে।…..

কেউ জানে না – শীত এলেই আমি অপেক্ষা করি তার চিঠির – বহু বছর আগে এমনই এক শীতের দুপুরে এসেছিল তার চিঠি – অর্ধেক জীবন হয়ে গেলো – এখনো তাকে উত্তর দেওয়া হয়নি।…… সে কি আজও খোঁজে আমাকে? জলঙ্গীর পাড়ে অথবা বইয়ের ভাঁজে রাখা শুকনো ছাতিম ফুলে…. সে কি জানে অষ্টাদশী মেয়েটি আজও সুখ খুঁজে বেড়ায় – যে সুখ সে জমা রেখেছিল তার প্রথম পুরুষের চোখে।….. সুবলদার চায়ের দোকানের পাশে আজো কি রাখা আছে তার সাইকেল.. নিস্তব্ধ দুপুর বেলায় সেই অষ্টাদশী যখন যেতো পাড়ার লাইব্রেরীতে….জংলা ফুল ছাপা সালোয়ার কামিজ জানতো উস্কোখুশকো চুল আর দুচোখ ভরা মায়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যাদুকর….. রাস্তার মোড়ে….. তার জন্য।…. যাকে এক পলক দেখলেই মফস্বলের পাঁশুটে বিকেলগুলো জেমস লজেন্সের মতো রঙের ফোয়ারা হয়ে যেত…..।

শীত আসে – যায় – আবারও আসে। চিঠি আসেনা। ডাকবাক্স খালি পড়ে থাকে আজও।…….. 'সান্টাদাদু তাকে বলোনা আমায় একটা চিঠি লিখতে – এবার আমি ঠিক উত্তর দেবো – প্রমিস।'

 

 

 
 
 

 

পরিযায়ী
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments