দৃশ্য ১

ঘরের দরজাটা লাল রং-এর। দরজা ঠেলে যদি ভিতরে ঢোকেন, দেখতে পাবেন ঘরটা আকারে বেশ ছোটই বলা চলে। বাম দেওয়াল ঘেঁসে একটা খাট। দুই কোনা থেকে ঝুলছে বহুদিনের না কাচা তেলচিটে একটা মশারি। খাটের পাশে একটা টেবিল আর একটা চেয়ার। টেবিলে একগাদা বইখাতা রাখা। চেয়ারেও। সেটা বোধহয় বসার কাজে বিশেষ ব্যবহার করা হয়না। টেবিলের তলা থেকে উঁকি মারছে একখানা ট্রাঙ্ক। তার ওপর একটা দাবার বোর্ড এবং আরও কিছু বই। মেঝেও অব্যাহতি পায়নি বই-এর স্তূপের হাত থেকে। খাটের উল্টো দিকের দেওয়াল ঘেঁসে মেঝের উপরই অজস্র স্তূপীকৃত বই রাখা রয়েছে। আরও দেখতে পাবেন দেওয়ালের হুক থেকে ঝুলছে দুটো জীন্সের প্যান্ট আর আকাশী রং-এর একটা টেরিলিনের শার্ট। ভাল করে লক্ষ করলে উত্তর দিকের দেওয়ালে সবুজ কালি দিয়ে লেখা একটা কবিতাও চোখে পড়বে। সেটার পাশে সেলোটেপ দিয়ে লাগানো রয়েছে একটা কাগজের ফুল। কিন্তু ঘরের মেঝেতে কোনও লাশ পড়ে নেই।


…………………………………


আবার একটা গপ্পো ফেঁদে বসেছি। বহুদিন পর। লেখালিখি তো করাই হয়না বিশেষ। মাথায় আইডিয়াই আসেনা তেমন। এবারে একটা কায়দা করেছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্লট আর আইডিয়া চুরি করে… দেখা যাক আপনারা ধরতে পারেন কিনা। অন্তত ৯টা জায়গা থেকে চুরি করেছি, সবই বিখ্যাত লোকেদের সৃষ্টি। মনে তো হয়না কোনও একজন পাঠক সবকটা ধরতে পারবেন বলে। কেউ সবকটা ধরতে পারলে  আমার থেকে তাঁর ট্রীট পাওনা রইল। আপাতত এগোনো যাক…


দৃশ্য ২

কাউকে না কাউকে খুন করতেই হবে ওকে। দিনদিন মরিয়া হয়ে উঠছে কৃশানু। ওই তিনটে লোককে কোনদিন খুঁজে পাবে কিনা জানেনা ও। কিন্তু যেভাবেই হোক প্রতিশোধ নেবে! ওই লম্বা কালো লোকটা, অথবা সেই লোকটা যার গোঁফ নেই কিন্তু দাড়ি আছে… কিম্বা সেই শুওরের বাচ্চা ল্যাংড়াটা…অন্তত একজনকে ও খুঁজে বার করবেই! আর তারপর শেষ করে দেবে! সেইসঙ্গে সরোজিনীর কাছেও প্রমাণ করে দেবে ও পারে, ইনভার্টিব্রেট দুর্বল কীট নয় ও। কিকরে করবে ও জানেনা, জানেনা কোথায় আছে ওই তিনটে শয়তান। কিন্তু করতে ওকে হবেই!


দৃশ্য ৩

সন্ধ্যে নেমে আসছে। নাঃ এবার শিমুলগাছের বাসাটায় ফিরতে হবে – মনে মনে ভাবল ছোট্ট দোয়েলটা। একদম ছোট্টও বলা চলেনা অবশ্য, সবে যৌবনে পা রেখেছে। দেখতে শুনতেও বেশ সুন্দর। তবে একটু বেশিই চঞ্চল। অন্তত দোয়েলীর তো তাই মনে হয়। দোয়েলী ওর বৌ ঠিক নয়, এখনও ওরা সেভাবে সংসার পেতে বসেনি। বলা চলে গার্লফ্রেন্ড। থাকেও অন্য একটা বাসায়। কাছেই অবশ্য। কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময়টাই ওদের একসাথে কাটে – লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গান গেয়ে। সুয্যিমামা ওথার আগেই উঠে পড়ে দোয়েলী – কালো কুচকুচে গায়ের রং, মাঝে কিছুটা সাদা ছোপ – দেখতে খুব সুন্দর। ভোরের মিষ্টি রোদে একটু গা টা ধুয়ে নেয়। তারপর উড়ে যায় দোয়েলের বাসায়, ওকে ঘুম থেকে ডাকতে। বেশিরভাগ দিনই অবশ্য সে এর মধ্যেই উঠে রেডি হয়েই থাকে। দুজনে বেরিয়ে পড়ে। তারপর সারাদিন? শুধু গল্প গল্প আর গল্প…
আজ অবশ্য দোয়েল একাই বেরিয়েছিল। দোয়েলীর শরীরটা ভাল নেই। দেখে বোঝা যায়না অবশ্য। কে জানে, দোয়েলের কেন জানি মনে হয় কিছু একটা হয়েছে দোয়েলীর। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে ও বলতে চায়না। সন্ধ্যার মুখে বাসায় ফিরতে ফিরতে এইসবই সাতপাঁচ ভাবছিল ও। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল 'বন্ধু'র সাথে -  সে ওরই সমগোত্রীয়, ছেলে দোয়েল। ওর সাথে নতুন পরিচয়। খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেছে এই কদিনে। ওকে দোয়েল 'বন্ধু' বলেই ডাকে। খুব মিষ্টি স্বভাবের। দেখা হতেই মনটা খুশি হয়ে গেল দোয়েলের। 'কি খবর বন্ধু?' বলে জাঁকিয়ে বসল একটা বেলগাছের ডালে। একটু পরে বাসায় ফিরলেও চলবে…


…………………………………

এই রে, আপনারা এইমাত্র টিভি খুলে বসলেন বুঝি? এই তো কেলো করলেন! এখন তো আদ্ধেক জিনিস বুঝতেই পারবেন না। কি মুস্কিলে ফেললেন বলুন দেখি। এখন আবার আপনাদের জন্য আগের গল্পগুলো বলতে হবে। দাঁড়ান, কি আর করা, আবার বলি ভূমিকা বাদ দিয়ে পরের ঘটনা গুলো।


দৃশ্য ২'

কাউকে না কাউকে খুন করতেই হবে ওকে। দিনদিন মরিয়া হয়ে উঠছে কৃশানু। ওই তিনটে লোককে কোনদিন খুঁজে পাবে কিনা জানেনা ও। কিন্তু যেভাবেই হোক প্রতিশোধ নেবে! ওই লম্বা কালো লোকটা, অথবা সেই লোকটা যার গোঁফ নেই কিন্তু দাড়ি আছে… কিম্বা সেই শুওরের বাচ্চা ল্যাংড়াটা…অন্তত একজনকে ও খুঁজে বার করবেই! আর তারপর শেষ করে দেবে! সেইসঙ্গে সরোজিনীর কাছেও প্রমাণ করে দেবে ও পারে, ইনভার্টিব্রেট দুর্বল কীট নয় ও। কিকরে করবে ও জানেনা, জানেনা কোথায় আছে ওই তিনটে শয়তান। কিন্তু করতে ওকে হবেই!


দৃশ্য ৩'

সন্ধ্যে নেমে আসছে। নাঃ এবার শিমুলগাছের বাসাটায় ফিরতে হবে – মনে মনে ভাবল ছোট্ট দোয়েলটা। একদম ছোট্টও বলা চলেনা অবশ্য, সবে যৌবনে পা রেখেছে। দেখতে শুনতেও বেশ সুন্দর। তবে একটু বেশিই চঞ্চল। অন্তত দোয়েলীর তো তাই মনে হয়। দোয়েলী ওর বৌ ঠিক নয়, এখনও ওরা সেভাবে সংসার পেতে বসেনি। বলা চলে গার্লফ্রেন্ড। থাকেও অন্য একটা বাসায়। কাছেই অবশ্য। কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময়টাই ওদের একসাথে কাটে – লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গান গেয়ে। সুয্যিমামা ওথার আগেই উঠে পড়ে দোয়েলী – কালো কুচকুচে গায়ের রং, মাঝে কিছুটা সাদা ছোপ – দেখতে খুব সুন্দর। ভোরের মিষ্টি রোদে একটু গা টা ধুয়ে নেয়। তারপর উড়ে যায় দোয়েলের বাসায়, ওকে ঘুম থেকে ডাকতে। বেশিরভাগ দিনই অবশ্য সে এর মধ্যেই উঠে রেডি হয়েই থাকে। দুজনে বেরিয়ে পড়ে। তারপর সারাদিন? শুধু গল্প গল্প আর গল্প…
আজ অবশ্য দোয়েল একাই বেরিয়েছিল। দোয়েলীর শরীরটা ভাল নেই। দেখে বোঝা যায়না অবশ্য। কে জানে, দোয়েলের কেন জানি মনে হয় কিছু একটা হয়েছে দোয়েলীর। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে ও বলতে চায়না। সন্ধ্যার মুখে বাসায় ফিরতে ফিরতে এইসবই সাতপাঁচ ভাবছিল ও। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল 'বন্ধু'র সাথে -  সে ওরই সমগোত্রীয়, ছেলে দোয়েল। ওর সাথে নতুন পরিচয়। খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেছে এই কদিনে। ওকে দোয়েল 'বন্ধু' বলেই ডাকে। খুব মিষ্টি স্বভাবের। দেখা হতেই মনটা খুশি হয়ে গেল দোয়েলের। 'কি খবর বন্ধু?' বলে জাঁকিয়ে বসল একটা বেলগাছের ডালে। একটু পরে বাসায় ফিরলেও চলবে…


দৃশ্য ৪

বাতাসপুর। সাহেবগঞ্জ লুপ লাইনের ছোট্ট একটা স্টেশন। দিনে গুটিকয়েক লোকাল ট্রেন থামে।আর এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো থ্রু পাস করে যায়।তবে এই অঞ্চলটা বিখ্যাত বা কুখ্যাত অন্য একটা কারণে – ওয়াগন ব্রেকিং। দিনের পর দিন মালগাড়ি থামিয়ে ওয়াগন ব্রেকার-রা মাল চুরি করে পালায়। কারোরই টনক নড়েনা।
এরকম একটা জায়গায় স্টেশন মাস্টার হয়ে এসেছে কুশল। স্টেশন মাস্টারদের হিসেবে বয়স কমই বলা চলে। নতুন জায়গাটা মন্দ লাগছেনা ওর। বেশ নিরিবিলি। ছোট্ট একটা রেল কোয়ার্টার। নিজের মত করে গুছিয়ে নিয়েছে। দুবেলা রান্না আর ঘরের ছোটোখাটো কাজ করে দিয়ে যায় শিখা। বছর আঠেরোর একটি মেয়ে। বেশ মিষ্টি চেহারা। কিন্তু খুব চুপচাপ স্বভাবের। কুশল দুয়েকবার গল্প করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বহুকষ্টে এটুকু জানতে পেরেছে যে মেয়েটার বাবা ওর ছোটোবেলাতেই মারা গেছেন। বাড়িতে আছে মা আর এক ভাই। কষ্টের সংসার। স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। ক্লাস টু এর পর আর পড়েনি।এদিক ওদিক এরকম কাজ করেই ওর আয়। এহেন মেয়ে একদিন কুশলকে ডেকে বলল – “দাদা, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে। আমাকে একটা সাহায্য করবেন?”


দৃশ্য ৫

১২/৬/২০০৯।
স্থানঃ আদিত্যর বাড়ির ছাদ।
সম্বুদ্ধ, অভিষেক, দেবজ্যোতি, আদিত্য আর অতসী আলোচনায় বসেছে।

ওরা তরুণ রাজনীতিবিদ। না, ভুল হল। ওরা বিপ্লবী।
আদিত্য বলছিল – “এই নবারুণবাবু কে আমাদের হঠাতেই হবে, যে করে হোক। যতদিন উনি থাকবেন আমাদের মতাদর্শকে দাঁড়াতে দেবেননা কিছুতেই।"
- “ঠিক বলেছ", বলে উঠল অতসী, “দিনের পর দিন উনি অত্যাচার করে চলেছেন গরীব মানুষের ওপর।”
সম্বুদ্ধ একটু বেশি ডাকাবুকো। আর ওর মুখে কিছুই আটকায়না। সে বলল – “বড্ড বাড় বেড়েছে হারামজাদাটার!”
- “কিন্তু একটা জিনিস তোমরা ভুলে যাচ্ছ কেন”, দেবজ্যোতি বলল, “শুধু উনি তো নন, এই সিস্টেমের প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই এরকম দুর্নীতি। এই ব্যবস্থাটাকেই ভাঙ্গতে হবে আমাদের, দরকার হলে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে।"
- “হ্যাঁ, রাষ্ট্রের এই সন্ত্রাস বন্ধ করতেই হবে।"
এতক্ষণ চুপ করে ছিল অভিষেক, সে এবার বলল – “কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো, উই শুড থিঙ্ক অফ এ ক্লিয়ার অল্টারনেটিভ, এই রাষ্ট্রের সন্ত্রাস বন্ধ করতে শুধু নবারুণবাবুকে গদি থেকে হটানোটাই একমাত্র কাজ নয়।"
- “কেন? অল্টারনেটিভ কি আমাদের নেই? এই শাসনব্যবস্থার মাথায় যদি আমরা উঠতে পারি তাহলে এইরকম তো আমরা করবনা, আমাদের শাসনে সব মানুষ হবে সমান, সবার থাকবে সমান অধিকার।"
- “উত্তেজিত হয়োনা আদিত্য”, বলল দেবজ্যোতি, "চল বাজে না বকে আমরা বরং কালকের প্ল্যানটা ঠিক করি। যে সংগ্রাম আমরা শুরু করেছি সেটাকে পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শুধু আবেগ দিয়ে আজকের দিনে কিছু হবেনা।"

পাঁচটা মাথা একসঙ্গে বসে আলোচনায় ডুবে গেল।

 

দৃশ্য ৬

“বস তোমায় ডেকে পাঠিয়েছেন", বলল কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোকটা। ও তখনও বিহ্বল হয়ে বসে আছে। তাই দেখে লোকটা ধমকে উঠল আবার – “কথা কানে যাচ্ছেনা?”
ধমক খেয়ে উঠে দাঁড়াল ও। লোকটার পিছন পিছন যেতে যেতে ভাবতে লাগল কে জানে কি আছে ওর কপালে। কি কুক্ষণেই না এসেছিল এখানে চাকরির সন্ধানে, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে। বাবা মারা গেছেন একমাস হল। এখুনি একটা চাকরি না জোটাতে পারলে না খেয়ে থাকতে হবে ওদের। কিন্তু এই ঠিকানায় এসে বেল বাজানো মাত্র যখন দরজাটা খুলে দিয়েছিল কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা একটা লোক, এই লোকটা নয়, অন্য একজন, তখন ওর একটু ভয় ভয়ই করেছিল। তবু চাকরির লোভে লোকটার সাথে ভিতর ঢুকেছিল সে। ঢুকতেই লোকটা ভিতর থেকে তালা দিয়ে দিল দরজায়। তারপর বলল – “এসো আমার সাথে”। ও যন্ত্রের মত লোকটার পিছু পিছু এসে বসেছিল ওই ঘরটায়। লোকটা বলেছিল – “বসতে হবে এখানে কিছুক্ষণ, কিন্তু চলে যাবার চেষ্টা কোরোনা, বেরোতে পারবেনা।”
ভয়ার্ত গলায় ও বলেছিল “কিন্তু আমি যে চাকরির…”
-”চুপ! চেঁচিয়োনা! চাকরির খোঁজেই এখানে আসে সবাই। আর চাকরি তুমি পাবে, এসে পড়েছ যখন। কিন্তু চাকরি না নিয়ে যেতে পারবেনা।” – বলে লোকটা চলে গেল। ও বসে থাকল হতভম্বের মত।
তার কিছুক্ষণ পরেই এই দ্বিতীয় লোকটার আগমন। দেখেই ওর বুকটা আবার ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। নিজেকে বোঝাল চাকরিটা ওর একান্তই দরকার। আজকের দিনে কে-ই বা এমন ডেকে ডেকে চাকরি দেবে। তাই এখন লোকটার সাথে সাথে পুতুলের মত যাচ্ছে ও। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা সিঁড়ির সামনে এসে উপস্থিত হল ওরা। কাপড়ে মুখ ঢাকা লোকটা বলল – “এসো আমার সঙ্গে, ওপরে…”


……………………………………………

নানারকম গল্পের চক্করে কনফিউসড হয়ে পড়েননি তো? আমি নিজেই একটু কনফিউসড হয়ে গেছিলাম, কোনটা কিভাবে লিখব সেই নিয়ে। তারপর বেশ কিছুদিন লেখা থামিয়ে রাখার পর আবার বসেছি।
এবার আপনাদের বলব স্বপ্নটার কথা।বেশ কিছুদিন হল এরকম দেখছি আমি। চোখ বুজলেই দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে। খুব যে স্পষ্ট তা নয়, অনেক সময়ই বরং এলোমেলো। কিন্তু খুব বাস্তব মনে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় ওই লোকটার জায়গায় বোধহয় আমি আছি। চমকে চোখ খুলি। দেখি, না, পুরোটা স্বপ্নই বটে।
কি নাম লোকটার? কে জানে। আপনাদের সুবিধের জন্য একটা নাম দেওয়া যাক। ধরুন ওর নাম অতনু। চোখ বুজতেই দেখি…


দৃশ্য ৭

অতনু ছুটে চলেছে। একটা সরু রাস্তা দিয়ে। দুধারে শালগাছের সারি। না তো, শাল নয়, আরও সরু সরু, আরও উঁচু গাছগুলো। কি জানি কি গাছ। তার মধ্যে দিয়ে চলেছে ও। কেন চলেছে জানা নেই। কিন্তু দেখে মনে হয় খুব তাড়া আছে ওর। প্রাণপণে ছুটে চলেছে তাই।
জায়গাটা একটা জঙ্গলের মত। মানুষজন এদিকে বিশেষ আসে বলে তো মনে হয়না। আদিবাসীরা বোধহয় আসে মাঝে মাঝে কাঠ টাঠ কুড়োতে। তাদের পায়ে পায়েই এই সরু রাস্তাটা তৈরি হয়েছে।
সময়টা বিকেল। সূর্য ডুবতে এখনো দেরি আছে কিছুক্ষণ। কিন্তু রোদ পড়ে এসেছে। শীতকাল। লালচে মাটির ধুলো উড়ে এর মধ্যেই অতনুর সাদা শার্টটা লালচে হয়ে এসেছে। ওর কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই। ও এগিয়েই চলেছে।
এই গাছগুলোর পাতাগুলো বড় অদ্ভুত। কাস্তের মত অনেকটা। সেগুলোর ওপর পড়ন্ত বিকেলের রোদ পড়ে চকচক করছে। ওর সেসব খেয়াল নেই। ও ছুটেই চলেছে। কোনও অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে…


দৃশ্য ৮

সরোজিনী বলেছিল কোনওদিন কৃশানুকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা ও। তারপর কি যে হয়ে গেল! বসে বসে ভাবে কৃশানু। ওরা দুজন একে অপরকে খুব ভালবাসত। বাসত কি বলছি, কৃশানু তো এখনও… সেই রাতটার কথা দুস্বপ্নের মত বারবার ভেসে ওঠে ওর মনের মধ্যে। ডিনারের পর দুজন হাঁটতে হাঁটতে একটু বেশিই দূর চলে গেছিল সেদিন। সরোজিনী বলেছিল "চল ফিরে যাই"। কৃশানু ওকে ভরসা দিয়েছিল "ভয় কি, আমি তো আছি।" কিন্তু তারপর… যখন লোক তিনটে এসে ঘিরে ধরল, কিছুই করতে পারেনি কৃশানু। লোকগুলো ওর গলার সামনে ছুরি ধরে রেখেছিল, নড়তে পর্যন্ত দেয়নি ওকে। আর ওর চোখের সামনেই ওরা সরোজিনী কে ধরে… নাঃ আর ভাবতে পারেনা কৃশানু। কিন্তু দৃশ্যগুলো যে কিছুতেই মুছতে চায়না মন থেকে। সেদিন কিছুই করতে পারেনি ও, কিছুই করার ছিলনা। পরে মনে হয়েছে ওই দৃশ্য দেখার থেকে মরে গেলেই ভাল হত। তবু ওই ঘটনার পর খারাপ হওয়ার আরও কিছু বাকি ছিল। হঠাৎই সরোজিনী সমস্ত যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দেয় ওর সাথে। কেমন যেন হয়ে গেছিল ও। কৃশানু অনেক চেষ্টা করেছিল ওকে স্বাভাবিক করে তুলতে। কিন্তু ও তো কথাই বলতে চাইতো না। শেষপর্যন্ত একদিন বলেই দিল কৃশানুর সাথে আর কোনও যোগাযোগ রাখতে চায়না সে। যার ওপর এতটুকু ভরসা করা যায়না, তার সাথে জীবন কাটানো ওর পক্ষে সম্ভব নয়।
সেদিন থেকেই কৃশানু এরকম পাগলের মত হয়ে গেছে। যাকে ও এত ভালবাসত তাকে ওই জঘন্য লোকগুলোর হাত থেকে বাঁচাতে  পারল না – এটাই কি ওকে আঘাত দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না? তারপর আবার…
সেদিনই কৃশানু প্রতিজ্ঞা করেছিল খুন করবে লোকগুলোকে। কোথায় পাবে জানেনা। ধরা ওরা পড়েনি যথারীতি, কিন্তু ও খুঁজে বার করবেই। এই চিন্তা ওকে আরও পাগল করে দিয়েছে। মুখে কাউকে বলেনি কিছু, তবে সবাই বুঝতে পারে যে ও ঠিক মানসিক ভাবে সুস্থ নেই। ও কিন্তু মনস্থির করে ফেলেছে… যেভাবেই হোক শেষ করে দেবে লোকগুলোকে। তারপর গিয়ে দাঁড়াবে সরোজিনীর সামনে।


দৃশ্য ৯

এরকম কথা শুনে একটু অবাক হয়েছিল কুশল, সেটা সামলে নিয়ে শিখাকে বলল "বল, সম্ভব হলে নিশ্চয়ই করব।" শিখা বলল – “আমার একটা চিঠি এসেছে, কিন্তু আমি পড়তে পারিনা ভাল, আপনি একটু পড়ে দেবেন?” প্রস্তাবটা শুনে কুশলের বিস্ময় বাড়ল বই কমলনা। শিখা পড়তে পারেনা, শুধু নাম সইটুকু পারে, এ হেন পাড়াগাঁয়ের মেয়েকে কে চিঠি লেখে? আর কেনই বা লেখে?
ওর মনের অভিব্যক্তিটা বোধহয় মুখের ভাবে প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। শিখা নিজেই বলল যে চিঠিটা লিখেছে সুকুমার। ওর চেয়ে দুবছরের বড়, বাড়ি নলহাটিতে। ওখানের একটা মেলাতে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎই পরিচয় হয়েছিল ওদের। তারপর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। যোগাযোগ হয়না বিশেষ, অথচ শিখা ছটফট কঅরে ওর সাথে কথা বলার জন্য। তাই সে-ই চিঠি লেখার প্রস্তাবটা দিয়েছিল। দাদাবাবুকে দিয়ে পড়িয়ে নেবে। ওর সাথে কথা না বলে থাকতে পারেনা সে। বলতে বলতে লজ্জা পেয়ে যায় শিখা।
এভাবে অপরের প্রেমপত্র পড়া বেশ অস্বস্তিকর। তবু ওর মুখের দিকে চেয়ে না করতে পারেনা কুশল। চিঠিটা খুলে পড়তে থাকে। বেশ গোটা গোটা হাতের লেখা। নিচে অদ্ভুত একটা সই। কাজের কথা বিশেষ কিছুই নেই। ইনিয়ে বিনিয়ে নানানভাবে প্রেম নিবেদন করেছে সুকুমার। পড়তে পড়তে শিখার দিকে তাকিয়ে দেখে সে অন্যমনস্ক হয়ে জানলার বাইরে চেয়ে আছে। কিন্তু বেশ বোঝা যায় চিঠির কথাগুলো মন দিয়ে শুনছে সে। হয়তো শুনতে শুনতে মানসচক্ষে সে সুকুমারের কথা কল্পনা করছে। চিঠিটা পড়া শেষ হবার কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত সে উদাস হয়েই থাকে। তারপর হঠাৎ করে বলে ওঠে – “আপনি এর একটা জবাব লিখে দেবেন? যা ভাল বোঝেন লিখবেন। আমি পারিনা এসব। দেবেন লিখে?”
কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা কুশল। শিখা যেন মরিয়া হয়ে হাতজোড় করে বলে আবার – “আপনি না লিখে দিলে আমি যে জবাব দিতে পারব না ওকে।" শিখাকে বুদ্ধিমতী, বাস্তববোধসম্পন্ন মেয়ে বলেই জানত কুশল। এখন ওকে এরকম করতে দেখে বুঝল শিখা গভীরভাবেই প্রেমে পড়েছে। কিন্তু কিন্তু করেও শেষপর্যন্ত রাজি হয়ে গেল সে। কলেজ জীবনে প্রেমপত্র লেখার অভিজ্ঞতা ছিল কুশলের। তা বলে অন্যের হয়ে লেখা? এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা বটে। কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসল সে।


দৃশ্য ১০

দোয়েলের অপেক্ষায় অনেকক্ষণ বসে থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়েছিল দোয়েলী। ঘুম ভাঙ্গল দোয়েলের ডাকে।
- “ফিরতে এত দেরি করলে যে আজ?” – বলল সে।
- “এই নানারকম কাজে কাজে দেরি হয়ে গেল। বল কেমন আছ। শরীর ঠিক তো?”
রোজকার মত গল্পে মেতে ওঠে দুজন। অনেকক্ষণ গল্প চলে, রাত অবধি। দোয়েলীর মনটা খুশি খুশি হয়ে গেল। অনেকদিন পর প্রাণ খুলে গল্প হল দোয়েলের সাথে।
রাত্রে শুতে যাওয়ার আগে বিদায় নিয়ে চলে গেল দোয়েল। দোয়েলীর মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। বসে বসে সাতপাঁচ ভাবে। এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছে সে। দুদিন আগেও ও ভাবছিল ওর কি সময় হয়েছে এবার দোয়েলের সঙ্গে ঘর বাঁধার? এতদিন পর সে নিশ্চিত হয়েছিল দোয়েলের সঙ্গে থেকে সুখী হতে পারবে সে। তারপরই দুদিন আগে দোয়েলের "বন্ধু" কে দেখেই মাথা ঘুরে গেল ওর। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেল দোয়েলী। দোয়েলের মত অত সুন্দর দেখতে সে নয়, কিন্তু অদ্ভুত এক আকর্ষণী ক্ষমতা আছে তার মধ্যে। দোয়েলী কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি এমনটা হতে পারে। তারপর থেকেই ওই "বন্ধু"কে দেখতে না পেলে কেমন একা একা লাগে। মনমরা হয়ে পড়ে থাকে দোয়েলী। সে বুঝে উঠতে পারেনা সে কি করবে। "বন্ধু"ও কি তাকে ভালবাসে? বলে দেখবে একবার "বন্ধু"কে? কিন্তু বেচারি দোয়েলের কি হবে? সে যে দুঃখ পাবে। তার সঙ্গে এতদিন থেকে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া শুধু যে ওদের সমাজে নীতিবিরুদ্ধ তাই নয়, সেটা করলে ওর এতদিনের সাথী দোয়েল কিরকম কষ্ট পাবে সেটা ভেবেই মন খারাপ হয়ে যায় দোয়েলীর। মনস্থির করে উঠতে পারেনা কিছুতেই।
অনেকক্ষণ আকাশ পাতাল ভাবার পর দোয়েলী স্থির করল সে বলবে… আগে "বন্ধু"কে বলবে ওর ভালবাসার কথা… সে-ও নিশ্চয়ই পছন্দ করবে দোয়েলীকে… তারপর দুজনে মিলে গিয়ে বলবে দোয়েলকে। বুঝিয়ে বলবে, ক্ষমাও চেয়ে নেবে। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল দোয়েলী।


দৃশ্য ১১

কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোকটার সাথে ও এসে উপস্থিত হল একটা ঘুপচি ঘরে। প্রায় অন্ধকার, মিটমিট করে একটা আলো জ্বলছে। একপাশে একটা খাটিয়া, তার ওপর বসে আছেন এক ভদ্রলোক। মুখে সিগারেট, আর একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব। বুদ্ধির ছাপ চোখেমুখে।
- “বসো", বললন ভদ্রলোক।
ও বসল। বলল – “একটা চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে…”
- “হ্যাঁ, চাকরি একে বলা যায় কিনা জানিনা, তবে কাজ বটে একরকম। কুড়ি হাজার টাকা পাবে এই কাজটা করতে পারলে।"
- “কি কাজ?” জিজ্ঞাসা করল ও।
- “এসো আমার সঙ্গে, বুঝিয়ে বলছি", বলে পাশের আরেকটা ঘরে ওকে নিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
এই ঘরটা আরও অন্ধকার। কেন কেউ এখানে ঠিক করে আলো জ্বালায়না কে জানে। ওর বুকের দুরু দুরু ভাবটা বেড়েই চলেছে। তারপর ভদ্রলোক যা বললেন সেটা শোনার পর ওর প্রায় অজ্ঞান হবার জোগাড়। একটা খুন করতে হবে ওকে! বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে। এ কোথায় এসে পড়ল ও?
- “এ কাজ আমি করতে পারবনা, আমার দরকার নেই চাকরির" বলে উঠে দাঁড়াল।
শান্ত স্বরে ভদ্রলোক বললেন – “এখানে একবার যে আসে কাজ হাতে না নিয়ে সে বেরোয়না। তুমি চাইলেই যেতে পারবেনা। কাজটা তোমায় করতেই হবে, নইলে তোমার লাশই কাল গঙ্গায় ভাসবে।"
বুক ফেটে কান্না পাচ্ছিল ওর। কেন এল এখানে? এখন উপায় কি? মুখ দুহাতে ঢেকে বসে রইল কিছুক্ষণ। দরদর করে ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে। মায়ের মুখটা মনে পড়ল। কিছুক্ষণ ভেবে ও উপলব্ধি করল রাজি হয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
 ইতিমধ্যে রহস্যময় ভদ্রলোক ওকে বুঝিয়ে দিয়েছেন পরিস্থিতিটা খুবই সহজ, ওর ধরা পড়ার ঝুঁকি একটুও নেই। কেবল ঠাণ্ডা মাথায় সুযোগ বুঝে একটা ছুরি ব্যবহার করতে হবে। তাও এমন একটা জায়গায় যেখানে আর কেউ থাকবেনা। সুতরাং কোনও রিস্ক নেই, কাজটা করে টাকাও পাওয়া যাবে। তার চেয়েও বড় কথা ও রাজি না হলে ওকে ওরা প্রাণে মেরে ফেলবে, পাছে ও পুলিশের কাছে গিয়ে সব ফাঁস করে দেয়।
“আমি রাজি" – শেষপর্যন্ত মুখ তুলে বলল ও। একটা বাঁকা হাসি হেসে ভদ্রলোক বললেন – “শোন তবে, কিভাবে কি করতে হবে বলি তোমায়…”


দৃশ্য ১২

১৪/১১/২০০৯
আজ ভোটের রেসাল্ট। আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে আদিত্য, সম্বুদ্ধ, অতসীরা। মানুষ বুঝেছে যে এই নবারুণবাবুকে গদি থেকে না হঠালে দুর্নীতি বেড়েই চলবে। আদিত্যদের প্রচারে কাজ দিয়েছে ভাল। জনগণের রেস্পন্স যে ওদের দিকেই সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। সবারই মতে এই তরুণ দল একটা পরিবর্তনের হাওয়া এনে দিয়েছে। আর সেই হাওয়াতেই গা ভাসাতে চায় তারা… দুর্নীতি আর অত্যচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে। তাই ভোটে নবারুণবাবুর বিরুদ্ধে আদিত্যের জয় প্রায় নিশ্চিত।
হঠাৎ খবর এল রেসাল্ট বেরিয়ে গেছে। প্রায় দুহাজার ভোটে জিতেছে আদিত্য। একে অপরকে জড়িয়ে ধরল ওরা… আদিত্য, সম্বুদ্ধ, দেবজ্যোতি, অতসী, অভিষেক। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল এলাকার মানুষের প্রবল জয়ধ্বনির মধ্যে দিয়ে ফিরছে ওরা।
আজ ওদের অনেকদিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। যৌবনের বিপ্লবের কাছে হার মেনেছে দুর্নীতির জাঁতাকল। এবার শুধু সামনে এগিয়ে চলা…


দৃশ্য ১৩

পাগলের মত টলতে টলতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল কৃশানু। মদ গিলেছে বেশ খানিকটা। রাত তখন সাড়ে বারোটা। পথঘাট শুনশান। গলির মুখটার কাছে গিয়ে হঠাৎ ওর চোখে পড়ল একটা লোক কালভার্টের উপর বসে আছে। খুব নেশা করেছে মনে হচ্ছে, হুঁশ নেই বিশেষ। নিজের মনেই ভুল বকছে কিসব। লোকটার চেহারাটা চেনা চেনা লাগছে না? আরে এ তো সেই লোকটা! গোঁফ নেই, দাড়ি আছে। চিনতে অসুবিধে হলনা কৃশানুর। পা থেকে মাথা অবধি একটা খুনে রাগ জেগে উঠল ওর। একটা আধলা ইঁট কুড়িয়ে নিল রাস্তা থেকে। লোকটার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল ধীরে ধীরে। তার তখন এসব দিকে খেয়ালই নেই। দেহের সর্বশক্তি দিয়ে কৃশানু আধলা ইঁটটা মারল লোকটার ব্রহ্মতালুতে। একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লোকটা, বিড়বিড় করে কি যেন বলতে গেল, তারপর স্থির হয়ে গেল মাথাটা।মরে গেছে! একটা অদ্ভুত আনন্দ জেগে উঠল কৃশানুর মনে। আশ্চর্য তৃপ্তি! ও পেরেছে! সরোজিনী! কোথায় তুমি? দেখে যাও…
একটা প্যাঁচা ডাকছে পাশের কাঁঠাল গাছটায় বসে। লোকটার মাথা থেকে টুপটুপ করে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ছে… নাকি টপটপ করে?
সরোজিনী! দেখে যাও… কি করেছি আমি! শেষ করে দিয়েছি শয়তানটাকে!
মোবাইলের আলোটা লোকটার মুখের ওপর ফেলল কৃশানু। ওর মুখের এক্সপ্রেশনটা দেখবে। আলোটা মুখের ওপর পড়তেই চমকে ছিটকে গেল ও। এ কে? এ তো মোড়ের পানের দোকানের তপেন! মাথার মধ্যে কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে ওর। ভাবতে পারছেনা কিছুই। ঝিম মেরে মৃতদেহটার পাশে বসে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে টলতে টলতে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।


……………………………………………


কি? এইসব নিষ্ঠুর খুনোখুনি অসহ্য লাগছে? সে কি? অভ্যেস হয়ে যায়নি এখনও? রোজ তো খবরের কাগজে দেখেন এরকম দশটা খুনখারাপির খবর। সেগুলো দেখে যেমন উদাসীন ভাবে পাতা উল্টে যান এখানেও সেরকমই করুন নাহয়। যাই হোক, স্বপ্নটার কথা বলি। দেখলাম…


দৃশ্য ১৪

ছুটতে ছুটতে একটা জলার ধারে এসে পৌঁছেছে অতনু। খুব তেষ্টা পেয়েছিল। নিচু হয়ে আঁজলা ভরে জল খেল খানিকটা। জলার ধারে কাদার ওপর নানারকম জানোয়ারের পায়ের ছাপ। তবে এখন আশেপাশে নেই কেউ।
জল খেয়ে একটু তরতাজা হয়ে আবার এগিয়ে চলল অতনু। একটু চলার পর সামনে দেখতে পেল চলার পথটা সরু হয়ে এসেছে ক্রমশ। এদিকে বোধহয় লোকজন একদমই আসেনি কখনও। সামনে কিসব বুনোগাছের ঝাড়, গুল্ম জাতীয়। তার ভিতর দিয়ে হাঁটা কষ্টকর। কিন্তু অতনুর কি যেন রোখ চেপেছে। জুতোর ফিতেটা একবার শক্ত করে বেঁধে নিয়ে ঢুকেই পড়ল ওই বুনোগাছের জঙ্গলের ভিতর।


দৃশ্য ১৫

সকাল সকাল নিজের ঘরে বসে কাগজপত্র গোছাচ্ছিলেন সোদপুর থানার ওসি ইন্সপেক্টার ভাদুড়ী। গত কদিন ধরে পরপর খুন হয়ে চলেছে এলাকায়। সবগুলোই ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে। অদ্ভুত ব্যাপার হল এই যে, যে তিনজন খুন হয়েছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নির্বিবাদী ভালোমানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁদের কেউ কেন খুন করবে এটাই কেউ বুঝে উঠতে পারছেনা। আবার কোনও চুরি ডাকাতিও হয়নি। কে কেন খুন করছে বোঝা যাচ্ছেনা। তবে সবগুলোই একই লোকের কাজ বলেই ধারণা ভাদুড়ীর। বসে বসে এইসব ভাবছেন এমন সময় একটা লোক ঢুকল ঘরে। বছর পঁচিশ বয়স হবে, দেখে মনে হয় গত কয়েকরাত ঘুমোয়নি। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাথার চুল উস্কোখুস্কো। ঝড়ের মত ঢুকে ততোধিক ঝড়ের গতিতে অনেককিছু বলে গেল লোকটা। অসংলগ্ন কথাবার্তা। সব শুনে ভাদুড়ী বুঝলেন ওর প্রধান বক্তব্য হচ্ছে যে ও, কৃশানু বিশ্বাস, গত কয়েকদিন ধরে খুনগুলো সব ও-ই করেছে। যদিও ও নাকি অন্য কাউকে মারতে চেয়েছিল, কিন্তু ভুল করে এদের মেরে ফেলেছে।
প্রথমদিকে ওর কথা উৎসাহভরে শুনলেও শিগগিরই ভাদুড়ী বুঝলেন সবই পাগলের প্রলাপ। ছেলেটি মানসিকভাবে ডিসব্যালান্সড কোনো কারণে। আর এই অবস্থায় এরকম নিখুঁতভাবে খুন করা ওর পক্ষে সম্ভব না। তাছাড়া ওর কথার মধ্যে সামান্যতম বিশ্বাসযোগ্যতাও নেই। কথা শুনলেই মনে হয় ভুল বকে চলেছে ক্রমাগত।
একসময় আর সহ্য করতে না পেরে ওকে থামাতে বাধ্য হলেন ভাদুড়ী, বললেন – “ঠিক আছে, তুমি বাড়ি যাও, আমি তদন্ত করে দেখছি।"
কোনওভাবে ওকে ভাগানো দরকার আপাতত।
- “আপনি তাহলে আমায় গ্রেফতার করবেন না?” বলল কৃশানু, “বুঝেছি, আপনি বোধহয় বিশ্বাস করতে পারেননি আমার কথা।"
- “ঠিক তা নয়, কিন্তু ব্যাপারটা আরো তলিয়ে না দেখে গ্রেফতার করা যায়না। যতক্ষণ না কোনো প্রমাণ পাচ্ছি…”
- “কিন্তু আমি তো নিজে কনফেস করছি!”
- “সে তো তুমি অন্য কাউকে বাঁচানোর জন্যও করতে পারো।এনিওয়ে তুমি এখন এসো, ফোন নাম্বার আর ঠিকানা রেখে যাও, দরকার হলে আমি ডেকে পাঠাবো।"
হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল কৃশানু, “আসল কথা আপনি আমায় বিশ্বাস করেননি। কি মনে হয়? আমি দুর্বল? খুন করতে পারি না? আমি… আমি…”
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের সামনে যা পায় ছুঁড়তে শুরু করে কৃশানু। একটা পেপারওয়েট তো সটান ছুঁড়ে মারে ভাদুড়ীর দিকে।
কপালে আঘাত পেয়ে এবার উঠে দাঁড়ান ভাদুড়ী। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে! কনস্টেবল কে ডেকে বলেন "একে লক আপে রাখো!” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যান তিনি।


দৃশ্য ১৬

১৫/৭/২০১১
অভিজিতের বাড়ির ছাদে মিট করেছে ওরা আটজন। আলোচনাটা বেশ উত্তেজিত অবস্থাতেই হচ্ছে। কথাবার্তাটা অনেকটা এরকম…
প্রথম ব্যক্তি – “এই আদিত্যবাবু কে আমাদের হঠাতেই হবে, যে করে হোক। যতদিন উনি থাকবেন আমাদের মতাদর্শকে দাঁড়াতে দেবেননা কিছুতেই।"
দ্বিতীয় ব্যক্তি – “ঠিক বলেছ, দিনের পর দিন উনি অত্যাচার করে চলেছেন গরীব মানুষের ওপর।”
তৃতীয় ব্যক্তি – “বড্ড বাড় বেড়েছে হারামজাদাটার!”
চতুর্থ ব্যক্তি – “কিন্তু একটা জিনিস তোমরা ভুলে যাচ্ছ কেন? শুধু উনি তো নন, এই সিস্টেমের প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই এরকম দুর্নীতি। এই ব্যবস্থাটাকেই ভাঙ্গতে হবে আমাদের, দরকার হলে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে।"
প্রথম ব্যক্তি – “হ্যাঁ, রাষ্ট্রের এই সন্ত্রাস বন্ধ করতেই হবে।"
পঞ্চম ব্যক্তি – “কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো, উই শুড থিঙ্ক অফ এ ক্লিয়ার অল্টারনেটিভ, এই রাষ্ট্রের সন্ত্রাস বন্ধ করতে শুধু আদিত্যবাবুকে গদি থেকে হটানোটাই যথেষ্ট নয়।"

আলোচনা চলতে থাকে…

শেষ

 

দৃশ্য ১৭

আজ "বন্ধু"কে নিজের মনের কথা বলবে ভেবেছিল দোয়েলী। সকাল সকাল দোয়েল এলে পরে ওকে বলবে আজ তার কাজ আছে, বলে টুক করে চলে যাবে বন্ধুর বাসায়। ভাবতেই বুক ঢিপ ঢিপ করে দোয়েলীর। সেই সঙ্গে কিভাবে দোয়েলকে সব বলবে সেই চিন্তাও ঘুরতে থাকে মাথায়। কিন্তু সকাল হয়ে সুয্যি মাথার ওপর উঠল, এখনও দোয়েলের কোন পাত্তা নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর দোয়েলী বেরিয়ে পড়ে। সোজা "বন্ধু"র বাসার দিকে। আজ দিনটা বড় সুন্দর। শীতের দুপুরের রোদ গায়ে পড়েছে। ঠাণ্ডাও নেই বেশি। আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে। সেই মেঘের সাথে ভাসতে ভাসতে ও এসে হাজির হল ওর গন্তব্যে।
ওই তো দূর থেকে দেখা যাচ্ছে "বন্ধু"র বাসা। ওকে দেখাও যাচ্ছে দূর থেকে অস্পষ্টভাবে। কিন্তু আরো কে যেন একটা আছে ওর বাসায়। আরো একটা পাখি। দূর থেকে বোঝা যাচ্ছেনা ভাল করে। আরেকটু কাছে আসতেই চেনা গেল… এ তো দোয়েল স্বয়ং! কিন্তু… এ কি?…
ওরা দুজনে বড্ড বেশি শরীরী ঘনিষ্ঠতায়! হ্যাঁ, ভুল দেখেনি দোয়েলী, ওরা নিজেদের মধ্যে… না! এ হতে পারে না! ওরা দুজনেই যে পুরুষ পাখি! ওরা… ওরা তাহলে… আর ভাবতে পারেনা দোয়েলী। একরমটা যে ও একেবারেই আশঙ্কা করেনি।

বড্ড ভারী লাগছে ডানাদুটো। মনে হচ্ছে মটিতে পড়ে যাবে ও। একটা অদ্ভুত কুয়াশা ওর মনের ভিতর। নাঃ! নিজেকে সামলে নিল দোয়েলী। আর সামনের দিকে এগোবেনা ও। এক ঝটকায় গতিপথ পাল্টে নিল। তারপর উড়ে চলল সোজা এক অজানা দিগন্তের দিকে… কে জানে, হয়তো সুখী রাজপুত্রের দেশের সন্ধানে।

শেষ


দৃশ্য ১৮

দুদিন ধরে লক আপেই আছে কৃশানু। তাতে ওর আপত্তি নেই। ও তো এটাই চেয়েছিল। কিন্তু ওর মাথাটা গরম হয়ে যাচ্ছে যখনই শুনছে যে ওর বিরুদ্ধে চার্জটা তিনটে খুনের নয়, বরং ওসি কে ভায়োলেন্টলি আক্রমণ করার।
বারবার করে সবাইকে ও বলছে "বিশ্বাস করুন, খুন গুলো সব আমিই করেছি, আমিই। এই কৃশানু বিশ্বাস। কি প্রমাণ চাই বলুন! সত্যিই আমি করেছি। দরকার হলে আমার হাতের ছাপ নিন, ঘটনাস্থলেও পাবেন এই ছাপ…”
কেউ ওকে পাত্তাই দিচ্ছেনা, আঙ্গুলের ছাপ নেবে কি। গত দুদিনে অন্তত দুশো বার ও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছে "আমিই খুনী! আমিই মেরেছি ওই তিনজন কে!”
হঠাৎ সেদিন বিকেলে কনস্টেবলটা এসে বলল একজন নাকি দেখা করতে এসেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কৃশানুকে অবাক করে দিয়ে সেখানে ঢুকল… ও ঠিক দেখছে তো?… হ্যাঁ সরোজিনীই বটে।
সরোজিনী ওর সামনে এসে বলল – “কি পাগলামো করছ? মাথা ঠাণ্ডা কর। ওসি তোমায় ছেড়ে দিতে চান যদি তুমি শান্তভাবে বাড়ি ফিরে যাও। এরকম কোরোনা। বাড়ি যাও, কদিন বিশ্রাম নাও। তুমি অসুস্থ, কিন্তু ঠিক হয়ে যাবে। চল বাড়ি যাবে।"
- “তুমি কোথা থেকে খবর পেলে যে আমি এখানে?”
- “শুনলাম কানাঘুষোয়। তবে তোমার বাড়ির লোকেরা বোধহয় জানেনা এখনও। হোস্টেল থেকে চলে এসেছ বোধহয়…”
- “তুমি আমায় ভালোবাসো এখনও?” ওকে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ বলল কৃশানু।
- “আমি তো আগেই বলেছি তোমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়। আবার কেন জিজ্ঞেস করছ? কিন্তু তোমাকে এই পাগলামো করা থেকে আটকানো আমার কর্তব্য মনে হল। তাই…”
- “তুমি বিশ্বাস কর, এটা পাগলামো নয়। আমি… আমি সত্যিই খুন করেছি তিনজনকেই। কিন্তু আমি ওদের মারতে চাইনি। আমি সেই লোকগুলোকে মরতে চেয়েছিলাম যারা তোমায়…”
- “থাক না ওইসব কথা! চল, এসব বন্ধ কর। বাড়ি যাবে…”
- “তুমি বিশ্বাস করছ না, না? সরোজিনী আমি সত্যিই…”
- “কৃশানু প্লীজ! তোমায় আমি খুব ভাল চিনি। দরকারের সময় একটা মশা পর্যন্ত পারতে পারোনা, তুমি করবে মানুষ খুন?”
হঠাৎ কৃশানুর মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। কি ভর করল ওর ওপর কে জানে। গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত দুটো বাড়িয়ে চেপে ধরল সরোজিনীর গলা। সরোজিনী দুহাতে বাধা দিয়েও ছাড়াতে পারলনা। তখন রাক্ষুসে শক্তি ভর করেছে কৃশানুর মধ্যে… “দেখবি আমি পারি কিনা  মানুষ খুন করতে? দেখবি?” বলে আরও জোরে চেপে ধরল সে।

কনস্টেবলটা চিৎকার শুনে দৌড়ে এসে যখন ছাড়িয়েছে, ততক্ষণে সব শেষ! লকআপের ভেতর মেঝের ওপর বসে পড়ল কৃশানু। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সরোজিনীর মৃতদেহটার দিকে। হ্যাঁ এতদিনে ও সবার সামনে প্রমাণ করতে পেরেছে আর যাই হোক, দুর্বল নয় ও…

  শেষ

…………………………………………


ধীরে ধীরে আমি কেমন করে জানি স্বপ্নটার সাথে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছি। মনে হচ্ছে অতনুর জায়গায় যেন আমি আছি। আমিই অতনু, অতনুই আমি। আমিই যেন ছুটে চলেছি জংলি ঝোপের ভিতর দিয়ে। তারপর…


দৃশ্য ১৯

বুনো গাছগুলোর মধ্যে ঢোকার পর বোঝা গেল বাইরে থেকে ঝোপটাকে যতটা ঘন মনে হয়েছিল আসলে তার থেকেও ঘন। তাড়াতাড়ি হাঁটা যায়না, পায়ে জড়িয়ে যায় লতাপাতা। তবু এগিয়ে এগিয়ে চললাম। কিসের আকর্ষণে কে জানে। অদ্ভুত এক আকর্ষণ সেই জঙ্গলের। একটা বুনো গন্ধ চারপাশে। কেউ যেন ফেরোমনের ডাকে ডাকছে আমায়। আরও এগিয়ে যেতে হবে।
চলতে চলতে অনেকক্ষণ কেটে গেছে। ধীরে ধীরে গাছগুলো আরও লম্বা হয়েছে। এখন সেগুলো প্রায় দেড় মানুষ উঁচু। চারিদিকে চাইলে কিছু দেখা যায়না। শুধু একই রকম বুনো ঝোপের সারি, যেদিকেই তাকাইনা কেন। হঠাৎ উপলব্ধি করলাম এই বুনো জঙ্গলের মধ্যে আমি হারিয়ে গেছি। কোন পথ দিয়ে এসেছি বোঝা সম্ভব না। যেদিকেই যাই সব একই রকম লাগে। মনে হতে লাগল এ বনের শেষ নেই। এ বুনো গাছের ঝাড় যেন আদি-অন্তহীন… কার জাদুতে যেন গোটা পৃথিবী… সমস্ত পাহাড় পর্বত নদী শহর সব এই জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। সমস্ত চরাচরে আর কেউ নেই, শুধু আমি আর এই সর্বনাশা জঙ্গল!
মাথার উপর পড়ন্ত সূর্যের রোদ এসে পড়েছে। বেশ বুঝতে পারছি আর আধঘন্টা পরেই নেমে আসবে সন্ধ্যার অন্ধকার। তারপর? আর ভাবতে পারছিনা। মাথা বিকল হয়ে গেছে। সারা শরীরও অসাড় হয়ে আসছে। অদ্ভুত বুনো গন্ধটা যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে হিপনোটাইজ করে ফেলছে। তারপর… তারপর আর কিছু মনে নেই…

শেষ


দৃশ্য ২০

দেখতে দেখতে তিনটে মাস কেটে গেছে কুশলের। দিব্যি সুখেই আছে। কাজও নেই বিশেষ। দিনে গুটিকয়েক ট্রেন থামে। অল্পসঙ্খ্যক কিছু প্যাসেঞ্জার অল্প কিছু সময়ের জন্য ছাড়া স্টেশনের নীরবতায় বিঘ্ন ঘটায়না কেউ। সব মিলে ভালই চলছে।
একটাই গোলমাল হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে শিখা আসছেনা। হঠাৎই ডুব মেরেছে কিছু না বলেই। কে জানে কি হল। ওর সেই প্রেমঘটিত ব্যাপার নয় তো? গত তিনমাসে নয় নয় করে পাঁচ ছয়টা চিঠি এসেছে সুকুমারের। প্রতিটাই পড়ে দিয়েছে, জবাবও লিখে দিয়েছে কুশল। কেবল সইয়ের জায়গাটা ফাঁকা রাখতে বলত শিখা। সইটা সে নিজেই করবে।
চিঠি পড়ে স্পষ্টই বোঝা যায় দুজনের গভীর প্রেম চলছে। ভালই লাগে কুশলের। অন্যের চিঠি পড়ার ও লেখার প্রাথমিক অস্বস্তিটা একটু কেটেছে। কিন্তু হঠাৎ কি এমন হল যে টানা এক সপ্তাহ আসছেনা শিখা?
বসে বসে এইসব ভাবছে, এমন সময় দেখে গেট খুলে ঢুকছেন রামবিলাস বাবু। রামবিলাস বাবু বাতাসপুরের সবচেয়ে বড় বাড়ির মালিক। আগে জমিদারী ছিল বিহারের কোথাও। আপ্যায়ন করে ওনাকে এনে বসাল কুশল। জানা গেল শিখা ওনার বাড়িতেও কাজ করে। কুশলের এখানে সেরে ওখানে যায়। অ্যাদ্দিন না আসায় চিন্তিত হয়ে উনি খবর নিতে এসেছেন এখানে আসছে কিনা শিখা। আসছেনা শুনে গম্ভীর হয়ে বললেন "দেখুন, একটা ব্যাপার হয়তো জানেননা। ও সম্প্রতি একটা ছেলের প্রেমে পড়েছিল। কে জানে তার সাথেই পালিয়ে বিয়ে টিয়ে করল কিনা।"
- “কিন্তু আপনি জানলেন কি করে? আপনাকে বলেছিল বুঝি প্রেম করছে?” জিজ্ঞেস করল কুশল।
- “ওহ সে এক কাণ্ড! ও তো লিখতে পড়তে পারেনা। চিঠি এলে আমিই পড়ে শোনাতাম। আবার জবাবটাও লিখে দিতে হত আমায়। ভাবুন একবার। হাঃ হাঃ হাঃ… এই বুড়ো বয়েসে প্রেমপত্র লিখছি। তাও আবার অন্যের হয়ে!”
কুশল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে দেখে রামবিলাসবাবু নিজেই বললেন "এই দেখুননা আজই একটা চিঠি এল ডাকে", বলে ওর হাতে দিলেন চিঠিটা।
চিঠিটা খোলার পর কুশলের মুখের হাঁ-টা আরেকটু বড় হয়ে এল। অবাক দৃষ্টিতে ও চেয়ে থাকল গত বুধবার ওরই লিখে দেওয়া চিঠিটার দিকে… নিচে ওর ফাঁকা রেখে দেওয়া জায়গাটায় কাঁপাকাঁপা হাতে সুকুমারের সই।

শেষ


দৃশ্য ২১

সেই অদ্ভুত ভদ্রলোকের কথা মত এখানে এসে হাজির হয়েছে ও। ছুরিটা উনিই দিয়েছেন। মাঝে মাঝে পকেটে হাত দিয়ে সেটার উপস্থিতি যাচাই করে নিচ্ছে। স্বপ্নেও ভাবেনি ও কোনদিন মানুষ খুন করতে আসবে। অথচ এখন ও উপায়ান্তরবিহীন। আসার পথে যে কবার পিছন ফিরে তাকিয়েছে, দেখেছে একটি বিশেষ লোক ফলো করছে। পালাবারও উপায় নেই ওর। আর টাকাটাও যে বড্ড দরকার।
জায়গাটা একটা ইন্সটিটিঊট এর হোস্টেল। ছেলেদের হোস্টেল। তাই ঢুকতে গিয়ে কোনও অসুবিধে হয়নি।স্মার্টলি হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে বার করল ওর গন্তব্য ঘরটা। যদিও মনে মনে যথেষ্ট নার্ভাস লাগছে।
যে ছেলেটিকে খুন করতে হবে তার নামও জানেনা। দরজার ওপর দেখল ফোন নাম্বার লেখা রয়েছে – ৯৮৭৪৩৭১৩০২… এক ঝলকে নাম্বারটা দেখে নিল, কাজে আসতে পারে। দরজাটা আধ খোলা ছিল। ভিতরে ছেলেটা একটা ডায়রিতে কিসব লিখছে। প্রায় পিছন ঘুরেই বলা চলে। পাশের ঘরে তারস্বরে গান বাজছে। সেটা ওকে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকতে সাহায্য করল। পকেট থেকে ছুরিটা বার করে খুলে ফেলল ও। এক মুহূর্তের সংশয়। তারপর আর না ভেবে প্রায় চোখ বন্ধ করেই ছুরিটা আমূল ঢুকিয়ে দিল ছেলেটার পিঠের বাঁ দিকটায়।

শেষ


…………………………………………

অনেক তো হল, এবার এই গপ্পোটা শেষ করা যাক।
অদ্ভুত কিছু ব্যাপার স্যাপার নিয়ে… আঃ… পিঠে প্রচণ্ড যন্ত্রণা… বাঁ দিকটায়… আমি আর…

 

দৃশ্য ২২

ঘরের দরজাটা লাল রং-এর। দরজা ঠেলে যদি ভিতরে ঢোকেন, দেখতে পাবেন ঘরটা আকারে বেশ ছোটই বলা চলে। বাম দেওয়াল ঘেঁসে একটা খাট। দুই কোনা থেকে ঝুলছে বহুদিনের না কাচা তেলচিটে একটা মশারি। খাটের পাশে একটা টেবিল আর একটা চেয়ার। টেবিলে একগাদা বইখাতা রাখা। চেয়ারেও। সেটা বোধহয় বসার কাজে বিশেষ ব্যবহার করা হয়না। টেবিলের তলা থেকে উঁকি মারছে একখানা ট্রাঙ্ক। তার ওপর একটা দাবার বোর্ড এবং আরও কিছু বই। মেঝেও অব্যাহতি পায়নি বই-এর স্তূপের হাত থেকে। খাটের উল্টো দিকের দেওয়াল ঘেঁসে মেঝের উপরই অজস্র স্তূপীকৃত বই রাখা রয়েছে। আরও দেখতে পাবেন দেওয়ালের হুক থেকে ঝুলছে দুটো জীন্সের প্যান্ট আর আকাশী রং-এর একটা টেরিলিনের শার্ট। ভাল করে লক্ষ করলে উত্তর দিকের দেওয়ালে সবুজ কালি দিয়ে লেখা একটা কবিতাও চোখে পড়বে। সেটার পাশে সেলোটেপ দিয়ে লাগানো রয়েছে একটা কাগজের ফুল। আর ঘরের মধ্যে দেখবার মত বলতে রয়েছে একটা লাশ! খাট থেকে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়েছে… উপুড় হয়ে। পিঠের বাঁ দিকে ঢুকে রয়েছে একটা ধারালো ছুরি!

পাঁচটা গল্প আর একটা স্বপ্ন
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments