মাঝরাতে মোবাইলটা বেজে উঠল। চোখ বুজেই পাশের টেবিল হাতড়ে মোবাইলটা তুলে নিলো অনিন্দ্য। কে কল করেছে না দেখেই কলটা রিসিভ করল। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর-

- “অনিন্দ্য! সায়ন্তনিকে একটু দেবে?”

অনিন্দ্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে মাঝরাতের এই ফোনকলে সায়ন্তনিও ততক্ষণে জেগে গেছে।

- “কে গো এত রাতে?”

- “তোমার বড়কাকু…”

বলেই মোবাইলটা সায়ন্তনির দিকে এগিয়ে দেয় অনিন্দ্য। সায়ন্তনি মোবাইলটা কানে চেপে “হ্যালো” বলেই চুপ করে গেল। মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কথাগুলো সায়ন্তনি শুনছে নিরুত্তর ভাবে। অনিন্দ্যর মনে চাপা উত্তেজনা। মাঝরাতের ফোন মানেই যে কিছু না কিছু দুর্ঘটনা সেটা অনিন্দ্য জানে। ঘরের এই হালকা নীল আলোয় সায়ন্তনির মুখের বদলে যাওয়া রেখা দেখেও কিছু অনুমান করা কঠিন। অতএব কলটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

-

- “কি কি আনবো বাজার থেকে? মাছ আছে?”

চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঁচু স্বরে সায়ন্তনিকে জিজ্ঞেস করল অনিন্দ্য। কোনও উত্তর না পেয়ে পাশেই রান্নাঘরে গিয়ে দেখে গ্যাসের চুল্লিটাকে মেঝেতে রেখে সাবানজল দিয়ে স্ল্যাবটাকে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে সায়ন্তনি। অবাক হয়ে অনিন্দ্য জিজ্ঞেস করল-

- “কাজের দিদি আজ আসবে না? তুমি……”

অনিন্দ্যকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বেশ গম্ভীর এবং আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বলে উঠল সায়ন্তনি-

- “আমি আমার দাদুর নাতি নাতনিদের মধ্যে সব থেকে বড়। আমি যদি মেয়ে না হয়ে ছেলে হতাম তাহলে তো বড় নাতি হিসেবে দাদুর পারলৌকিক কাজ করতাম। তাই ঠিক করেছি আর কিছু না হোক এই কটাদিন নিরামিষ খাব..”

-

বাজারের থলেতে শুধুই কিছু সবজি, কিলোখানেক পনির আর ফলমূল নিয়ে বাজার ফেরতা অনিন্দ্য রিক্সায় গিয়ে বসে। মনে মনে সায়ন্তনির সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানায়। সত্যিই তো, ওর বংশে ওর প্রজন্মের ওইতো প্রথম সন্তান, তাই দাদুর বড়ই প্রিয়ও ছিল সায়ন্তনি। দাদুর প্রয়াণে ওর দুঃখ পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর অনিন্দ্য এটাও বোঝে যে চরম দুঃখের দিনেও খিদে-তৃষ্ণা-নিদ্রার মত অত্যাবশ্যক অনুভূতি গুলোও থেকে যায় স্বাভাবিক নিয়মেই। কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই অনিন্দ্যর মাথায় ঢোকে না যে দুঃখের সময়ে মানুষের আমিষ নয়, শুধুই ‘নিরামিষ খিদে’ পায় কেন।

পারলৌকিক
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments