নর্থ ক্যারোলিনাতে আসার পর প্রথম কদিন এখানের গাছপালা, ঝকঝকে রোদ, নীল আকাশ দেখে বেশ ভাল লাগলেও কিছুদিন পর থেকেই বোর লাগতে শুরু করে। সবই কেমন একই রকম। সেই একই গাছ, একই রকম জঙ্গল, রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি তো একঘেয়ে বটেই। বিশেষ করে রাজ্যটার মধ্যভাগের এই সমতল অঞ্চলটায় বৈচিত্রের বড়ই অভাব। তাই কিছুদিন পরই ভ্রমণপিপাসু মন বেরিয়ে পড়তে চায় এদিক ওদিক।

দুর্দান্ত জায়গা বলতে খুব বেশি নেই এই রাজ্যে। যে দুয়েকটা আছে তার মধ্যে একটি হল ফল কালার চলাকালীন ব্লু রিজ পার্কওয়ে এবং স্মোকি মাউন্টেন। নর্থ ক্যারোলিনার পশ্চিম দিকে এই জংলি পাহাড়ি অঞ্চল রাঙিয়ে ওঠে পাতা ঝরার মরসুমে। সেখানে গেলে মনে হবে কোনো অদৃশ্য চিত্রকর যেন রঙ-তুলি নিয়ে আঁকতে বসেছেন। অসাধারণ এক সিনিক ড্রাইভ, মার্কিন দেশে বসবাসকারী যে কারোর অন্তত একবার ঘুরে যাওয়া উচিত এই পাহাড়।

স্মোকি মাউন্টেনে ফল কালার
 
সেখানে গেছি গত বছর, মুগ্ধ হয়েছি যথারীতি। তবুও মনে হয়েছে বহমান প্রাণের ছোঁয়া সেরকমভাবে নেই। প্রকৃতির সৌন্দর্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তবু মানুষের জীবনপ্রবাহের অভাব রয়েই যায়। এই পর্যন্ত পড়ে হয়তো অনেকে নাক সিঁটকাবেন। আরণ্যক পৃথিবীর সৌন্দর্যপিপাসু যাঁদের মন, তাঁরা হয়তো বলবেন থাকো বাপু তুমি তোমার শহুরে জীবনপ্রবাহ নিয়ে, এসব তোমার জন্যে নয়। আমিও কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। আমি, যে কিনা চিরকাল জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতেই ভালবেসেছি, পাখ-পাখালি জীবজন্তুদের মধ্যে সময় কাটিয়েছি, মানুষ জাতিটাকে মোটের ওপর অপছন্দই করেছি, সে কেন হঠাৎ এরকম ভাবছে? বয়স বেড়ে যাবার লক্ষণ?

ইতিমধ্যে চোখে পড়ে নর্থ ক্যারোলিনার আরেক আকর্ষণীয় জায়গার কথা। আউটার ব্যাঙ্কস। পূর্বদিকে আটলান্টিকের মাঝে সরু এক ফালি দ্বীপ। মূল ভূখণ্ডের একেবারেই কাছে, তাই সেরকম দ্বীপ-দ্বীপ ভাবটা নেই। এর পূর্বদিকে রয়েছে দিগন্তবিস্তৃত আটলান্টিক মহাসমুদ্র, আর পশ্চিমে মূল ভূখণ্ড আর আউটার ব্যাঙ্কস এর মধ্যে রয়েছে পামলিকো সাউন্ড, যেটা অনেকটা সমুদ্রের খাঁড়ি ধরনের বলা চলে। ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখলাম অনেকেই প্রসংশায় পঞ্চমুখ। ভাবলাম যেতেই হবে একবার। এক লম্বা উইকেন্ডে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল, সঙ্গে এক পুরোনো বন্ধু। প্রায় পুরো দ্বীপটাই ঘুরলাম, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।  অনেকখানি ভাল লাগা নিয়ে ফিরে এলাম। আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নিজের কাজ নিয়ে। কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারলাম না এই সমুদ্রকে। সমুদ্র আগেও দেখেছি দেশে থাকতে বেশ কয়েকবার, কিন্তু নর্থ ক্যারোলিনার কোস্টাল এরিয়ার মত এভাবে টানেনি আগে কোনো সমুদ্র আমায়। বারবার ফিরে গেছি, কখনো উইলমিংটন, কখনো সানসেট বীচ, কখনো মারেলস ইনলেট, আরো একবার আউটার ব্যাঙ্কস… কিন্তু কেন? কোন নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে?

প্রশ্নটার উত্তর নিজেই জানি কিনা কে জানে, ব্লগ লিখে বোঝাতে গেলে তো আরোই কেলো। আসলে এ লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম কিছু ছবিকে একত্র করে ছবি ব্লগ বানানোর অভিপ্রায়ে। অনেকদিন ধরে করব করব করে করা হয়নি। যেদিন ফের নিয়ে বসলাম ছবিগুলো, কেমন যেন একটা অনুভূতি হতে লাগল। কোন অদ্ভুত জাদুতে আমায় ফের ডাকতে লাগল নর্থ ক্যারোলিনার সমুদ্রসৈকত। ভাবলাম, কেবল ছবি দিয়ে খালাস হলে পরে এই সমুদ্রসৈকত আর আমার সম্পর্কটার প্রতি অপরাধ করা হবে। সেজন্যই…
 

বছর দুয়েক আগে হঠাৎই হাতে এসে পড়েছিল একটা টিভি সিরিজ। নাম ডসনস ক্রীক। কয়েকটি ছেলেমেয়ের একসাথে বড় হয়ে ওঠার গল্প। সেরকম অসাধারণ কিছু নয়, নেহাতই পাতি টিনেজ ড্রামা। কিন্তু গল্পটা তৈরি হয়েছিল সমুদ্রতীরবর্তী একটা ছোটো শহরে। এই সিরিজের প্রায় সমস্ত শুটিং হয় নর্থ ক্যারোলিনার উইলমিংটন এবং আরও কিছু জায়গায়। আমাদের ছোটো শহর চ্যাপেলহিলেও শুটিং হয়েছে দু একটি পর্ব। এইসব কারণেই হয়তো উৎসাহ নিয়ে দেখতে শুরু করেছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে ভাল লেগে গেল বেশ। কাহিনী বা চরিত্রগুলোর পাশাপাশি শহরতলির দৃশ্যগুলোকেও। তখনই ভেবেছিলাম একবার ঘুরে আসতে হবে এই জায়গাগুলো। সুযোগ পেয়ে যখন প্রথম আউটার ব্যাঙ্কস গেলাম, দিন তিনেকের ট্যুরের জন্য বেশ প্ল্যান করেই গেছিলাম, যাতে পুরো আউটার ব্যাঙ্কসটা ঘুরে দেখতে পারি।
 
নর্থ ক্যারোলিনার আবহাওয়া বেশ আনপ্রেডিক্টেবল। দুমদাম ঝড় বৃষ্টি চলে আসে, আবার হঠাৎ থেমেও যায়। আমরা লম্বা উইকেন্ডের প্রথম দিন যখন বেরোলাম, দেখি আকাশের মুখ ভার। আদ্ধেক যেতে না যেতেই ঘন কালো মেঘ করে এলো। সঙ্গে জোরালো হাওয়া আর ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। আউটার ব্যাঙ্কস যাবার পথে বেশ কিছু জায়গায় সমুদ্রের খাঁড়ি পার হতে হয়। সেগুলোও ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তার মধ্যিখান দিয়ে ড্রাইভ করে যেতে খারাপ লাগছিল না। কিন্তু বৃষ্টির দৌরাত্মে সারাদিনের বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর প্ল্যানটা বুঝি মাটি হল, এই ভেবে মনটা ব্যাজার হয়ে গেল।
 

ঘন কালো মেঘ, আর দুধারে জল, তার মধ্যে দিয়ে যাত্রা *

দুপুর নাগাদ ঢুকে পড়া গেল আউটার ব্যাঙ্কসে। যদিও দ্বীপ বলে উল্লেখ করেছি আগে, কিন্তু মূল ভূখণ্ডের এতই কাছে যে পামলিকো সাউন্ডের ওপর দিয়ে স্রেফ একটা মাইলখানেক লম্বা ব্রিজ পেরোলেই ওই দ্বীপের চলে যাওয়া যায়। আমরা প্ল্যান করেছিলাম প্রথমেই চলে যাব দ্বীপের একদম উত্তরে। তারপর সেখান থেকে দুদিন ধরে ধীরে ধীরে ড্রাইভ করে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত যাব। সেই মতই চলা শুরু হল।

পামলিকো সাউন্ড, ওপারে নর্থ ক্যারোলিনার মূল ভূখণ্ড

আধো বৃষ্টি মাথায় করেই প্রথমে দেখতে গেলাম কিল ডেভিল হিলস। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় তাঁদের বানানো বিমানটি প্রথম উড়িয়েছিলেন এখানে। তার স্মারক হিসেবে এখানে একটি মনুমেন্ট এবং কিছু মিউজিয়াম গোছের ব্যাপার আছে। সেরকম দারুণ কিছু না, একবার ঢুঁ মেরে আসা গেল। আরও উত্তর গেলে কিটি হক, ডাক, করোলা ইত্যাদি ছোটো ছোটো শহর। মজার ব্যাপারটা হল দ্বীপটা এতই সরু যে যেকোনো জায়গায় পার্ক করলেই হাঁটা দূরত্বের মধ্যে সমুদ্র। কোথাও কোথাও তো রাস্তার দুধারে জল দেখা যায় গাড়ি চালাতে চালাতেই। আমাদের ইচ্ছে ছিল করোলায় গিয়ে সেখানের লাইটহাউস দেখব। এই মেঘলা আবহাওয়ায় কতটা কি দেখতে পাব ভাবতে ভাবতে রওনা দিলাম।
 
রাইট ব্রাদার্স মেমোরিয়াল *
 
করোলা যখন পৌঁছলাম তখন বৃষ্টি থেমে গিয়ে সুয্যিমামা উঁকি দিচ্ছেন। তাঁর অস্ত যাবার সময় প্রায় হয়ে এসেছে, তবু মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে গেল। করোলা জায়গাটা খাসা। ছিমছাম, বেশি ভিড় নেই। রাস্তার একদিকে লাইটহাউস এবং তার পাশে পামলিকো সাউন্ডের ধার ঘেঁষে একটা ক্লাবহাউসের মত। অন্যদিকে কিছুটা হেঁটে গেলেই সমুদ্রসৈকত। সেখানেও লোকজন বিশেষ নেই। সমুদ্রসৈকতের কিছুটা অংশে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভ করা যায়, কিন্তু তার জন্য ফোর হুইল ড্রাইভ ওয়ালা গাড়ি লাগবে, তাই সেটা বাদই রয়ে গেল। সাউন্ড এবং সমুদ্রের তীরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে সন্ধে-নাগাদ রওনা দিলাম হোটেলের দিকে। হোটেল খুঁজে পেতে গিয়ে সে এক কাণ্ড! জিপিএসে হোটেলের ঠিকানা দিয়ে তাকে অনুসরণ করে দিব্যি ড্রাইভ করছি। হঠাৎ একজায়গায় এসে জিপিএস বলে উঠলেন "ইয়োর ডেস্টিনেশন ইজ অন দ্য রাইট"। তাকিয়ে দেখি আমরা একটা ব্রিজের মাঝামাঝি রয়েছি! রাইটে গিয়ে হোটেলে ঢুকতে গেলে হোটেলটা জলের তলায় হওয়া ছাড়া গতি নেই! কি মুশকিল! যা হোক, বহু চেষ্টাচরিত্র করে যখন শেষমেষ হোটেলে পৌঁছলাম তখন অনেক রাত হয়ে গেছে। সারাদিনের ক্লান্তির পর ঘুম আসতে বেশি দেরি হল না।
 

পরদিন সকালে উঠে দেখলাম রোদ ঝলমল করছে। আজকের গন্তব্য জকিজ রিজ স্টেট পার্ক, বোডি আইল্যান্ডের লাইটহাউস, পী আইল্যান্ড ন্যাশনাল ওয়াইন্ডলাইফ রেফিউজ ইত্যাদি। তার আগে প্রথমে হোটেলের কাছের দুয়েকটা পার্কে টার্কে গিয়ে অত্যন্ত হতাশ হলাম, দশ ডলার দিয়ে টিকিট কাটিয়ে জলদস্যুদের খেলনা জাহাজ আর রেড ইন্ডিয়ানদের সভ্যতার জিনিসপত্রের প্লাস্টিক মডেল দেখে। আশা ছিল সত্যিকারের জিনিসগুলো দেখতে পাব। যা হোক, জকিজ রিজ স্টেট পার্ক হতাশ করলনা। নর্থ ক্যারোলিনার স্টেট পার্কগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর এটি। পুরো পার্কটা জুড়ে বিশাল বালিয়াড়ি, মনে হবে মরুভূমিতে এসে পড়েছি। অন্য ধরনের এক রুক্ষ সৌন্দর্য। সেই বালিয়াড়ির ওপর বাচ্চারা খেলা করছে, অনেকে ওড়াচ্ছে বিশাল বিশাল ঘুড়ি। হ্যাং গ্লাইডিং এর ব্যবস্থাও আছে। সব মিলে বেশ দারুণ অভিজ্ঞতা হবার মত জায়গা। তবে বালিতে হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।

জকিজ রিজ স্টেট পার্ক *
 
বোডি আইল্যান্ড হল আউটার ব্যাঙ্কসের মাঝামাঝি একটা উপদ্বীপ। জকিজ রিজ থেকে দক্ষিণে ঘন্টাখানেকের ড্রাইভ। এখানের লাইটহাউসটা সমুদ্রের তীরে নয়, বরং সমুদ্র থেকে বেশ কিছুটা দূরেই। সদ্য রিনোভেট করায় বেশ ঝকঝক করছে। বোডি আইল্যান্ডের মার্শ অঞ্চল পাখি-প্রেমীদের পক্ষে এক অনন্য আকর্ষণ। সেখানে যেতে দেখা গেল নানা ধরণের হাঁস আর কাদাখোঁচা জাতীয় পাখিদের। ঝোপঝাড়ে ভরা এই বিশাল জলাভূমির এক প্রান্তেই যাওয়া সম্ভব কেবল। অন্যদিকে একটা রাস্তা চলে গেছে পামলিকো সাউন্ডের দিকটায়। এ জায়গাটা নাকি মাছ শিকারীদের স্বর্গ। সেদিকে রুক্ষ মাঠের মধ্যে দিয়ে কিছুদূর হেঁটে এবং ঝোপেঝাড়ে উঁকিঝুঁকি মেরে আরও নানারকম পাখির দেখা পাওয়া গেল। বেশিরভাগই রেড উইংড ব্ল্যাকবার্ড, সঙ্গে কিছু বল্ড ঈগল। শুনেছি বল্ড ঈগলেরা এই অঞ্চলে ব্রীডিং করে। আমরা যখন গেছি তখন অবশ্য তাদের ব্রীডিং সীজন নয়।
 
বোডি আইল্যান্ড লাইটহাউস
 
বোডি আইল্যান্ড মার্শ
 
বোডি আইল্যান্ড মার্শ সংলগ্ন অঞ্চল
 
পাখিদের দেখার আরেকটা অসাধারণ জায়গা হল পী আইল্যান্ড ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রেফিউজ। এটা বোডি আইল্যান্ড থেকে আরো কিছুটা দক্ষিণে। এই ড্রাইভটা আউটার ব্যাঙ্কসের অন্যতম সেরা। রাস্তার একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে মাঝে মাঝে পামলিকো সাউন্ডের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। মাঝে মাঝে পী আইল্যান্ডের নীচু জলাভূমি। আমরা গ্রীষ্মের সময় গেছিলাম, তাই সেই জলাভূমির জল শুকিয়ে গিয়ে অনেক জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে মাডফ্ল্যাট। এই মাডফ্ল্যাট পক্ষী-প্রেমীর স্বর্গ। নর্থ ক্যারোলিনার মূল ভূখণ্ডে দুর্লভ এরকম অনেক প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে এখানে। উল্টোদিকের সমুদ্রতীরে গেলে দেখা যাবে নির্জন সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছে উইলেটের দল। কিম্বা স্যান্ডারলিং এর ঝাঁক সমুদ্রের ফিরতি ঢেউ এর পিছনে দৌড়চ্ছে বালিতে আটকে রয়ে যাওয়া ছোট শামুকের সন্ধানে। আবার ঢেউ ধেয়ে এলেই তিরতির করে দৌড়ে পিছু হটে আসছে সদলবলে। সে এক দারুণ মজার দৃশ্য। সারাদিন ধরে অক্লান্তভাবে তারা এরকম ঢেউ কে ধাওয়া করে যায় কিকরে কে জানে।
 
প্রতীক্ষারত উইলেট
 
খাবারের খোঁজে স্যান্ডারলিং

যাঁরা এসব ব্যাপারে আগ্রহী নন তাঁরা কেবল নির্জন সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। আউটার ব্যাঙ্কসের সমুদ্রতীরের মজা পুরোপুরি উপভোগ করতে গেলে মাঝে মাঝেই রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে সমুদ্রতীরে চলে যেতে হবে। একেক জায়গায় সমুদ্র একেকরকম। থেমে কাছে না গেলে বোঝার জো নেই। এইসব জায়গায় টুরিস্টদের ভিড় নেই। যাঁরা আছেন তাঁরা হলেন কিছু কিছু পাকা মেছুড়ে। তাঁরা এইসব নির্জন জায়গা খুঁজে বসে পড়েন মাছ ধরতে। একজন বলেছিলেন কিভাবে সী গালদের আধিক্য দেখে বোঝা যায় কোন জায়গায় মাছ বেশি রয়েছে। এঁরা বেশিরভাগই স্থানীয় জেলে। সারাবছর ঝড়জল উপেক্ষা করে এইভাবে মাছ ধরাই এঁদের কাজ। সারা আউটার ব্যাঙ্কস জুড়ে যেখানে সেখানে আছে অসংখ্য ফিশিন পিয়ার। প্রাইভেট পিয়ারগুলো আকারে ছোটো, আর আছে কিছু বিশালাকার পাব্লিক ফিশিং পিয়ার। পামলিকো সাউন্ডের দিকটাতেও আছে বেশ কিছু। সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের আলোয় জলের মধ্যে এগিয়ে থাকা এই ফিশিং পিয়ারগুলি দেখতে অসাধারণ লাগে।
 
সূর্যাস্তের আলোয় একটি ফিশিং পিয়ার *
 

 
পী আইল্যান্ড থেকে আরো দক্ষিণে গেলে হ্যাটেরাস আইল্যান্ড। আমাদের দ্বিতীয় রাত থাকার ব্যবস্থা ছিল এই হ্যাটেরাস আইল্যান্ডে। সৌভাগ্যবশত এই হোটেলটা খুঁজতে কোনো সমস্যা হয়নি। পরদিন সকালে উঠে বেরিয়ে পড়া গেল হ্যাটেরাস আইল্যান্ড লাইটহাউস দেখতে। এটি এই অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু লাইটহাউস। ভিতর দিয়ে পাকানো সিঁড়ি বেয়ে উপর উঠলে বহুদূর অব্ধি দেখা যায়। আর নীচের খুদে খুদে মানুষজনকে দেখতে বেশ মজা লাগে।
 
   
হ্যাটেরাস আইল্যান্ড এবং ওকরা কোকের লাইটহাউস
 
লাইটহাউসের ভিতর প্যাঁচানো সিঁড়ি *
 
লাইটহাউসের উপর থেকে নীচের দৃশ্য
 
লাইটহাউস পরিক্রমা শেষ করে আমরা গাড়ি সুদ্ধু গিয়ে উঠলাম ওকরা কোক দ্বীপে যাবার ফেরিতে। ওকরা কোক প্রকৃত অর্থেই দ্বীপ, অর্থাৎ নৌকো ছাড়া যাবার উপায় নেই। হ্যাটেরাস থেকে ঘন্টাখানেকের পথ। সেখানের সমুদ্র নাকি অসাধারণ, শুনেছিলাম। গিয়ে বুঝলাম কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। জলের রঙ এখানে আরো বেশি সবুজ, আর বীচগুলিও বেশ সুন্দর। সেই কারণেই হয়তো টুরিস্টের ভিড় বেশি। তবে চাইলেই সেই ভিড়কে পিছনে ফেলে সমুদ্রের ধার দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়া যায় অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায়। এদিনটা প্রথমে রোদ ঝলমলে থাকলেও মাঝে মাঝে এসে পড়ছিল কালচে মেঘ। সঙ্গে কেমন ধুলো ধুলো ভাব। মেঘের ফাঁক দিয়ে যখন রোদ এসে পড়ছিল, তখন গোধূলির মত একটা অদ্ভুত আলোর সৃষ্টি হচ্ছিল। সমুদ্রের তীরে এমন গোধূলি দেখার অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি।
 
অদ্ভুত ধুলো ধুলো ভাব
 
বালির উপর গোস্ট ক্র্যাব
 
বাবার হাত ধরে… ওকরা কোক বীচে
 
নর্থ ক্যারোলিনার সমুদ্রসৈকতে প্রায় সারা বছরই দেখা যায় ব্রাউন পেলিকানদের। এরা জলের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে মাছের সন্ধান পেলেই মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে সোজা ভার্টিকালি ঝাঁপ মারে জলে। শিকারি পাখিদের মত ছোঁ মারা নয় কিন্তু, দেখলে মনে হবে স্রেফ ফ্রি ফল। যেন উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে সুইসাইড করতে চায়। কিন্তু তাক বুঝে এই ঝাঁপ মেরে তারা মুখে ভরে নেয় একগাদা জল, তারপর সেই জলের মধ্যের মাছগুলো উদরস্থ করে আর জলটা ফেলে দেয় ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে। এরকমভাবে চলতে থাকে তাদের বারবার ওড়া আর ঝাঁপ দেওয়া। এই ব্রাউন পেলিকানদের আরেকটা মজার খেলা আছে। এরা মাঝে মাঝে ঢেউএর উপর দিয়ে স্বল্প উচ্চতায় ওড়ে আর ঠিক ঢেউগুলো ভাঙ্গার মুহূর্তে একদম নীচে নেমে এসে জলের ছিটে মেখে নেয় গায়ে। এই সমুদ্রের ধারে বসে থাকলে শুধু ব্রাউন পেলিকানদের মজা দেখতে দেখতেই কেটে যাবে সারাদিন। সঙ্গে আছে সমুদ্রের ধারে ওয়াকে বেরোনো মানুষজন, কিছু সাঁতারু, স্নানরত টুরিস্টরা, মেছুড়েদের দল, এবং আরো অনেক মানুষ। আমি নিজে সমুদ্রস্নান করিনা, কিন্তু এঁদের দেখতে দেখতে সময় কেটে যায় বেশ।
 
মেঘলা আকাশে পেলিকানের ঝাঁক
 
ঢেউ ভাঙ্গার মুখে জলে ছিটে গায়ে মেখে নিচ্ছে ব্রাউন পেলিকান – ১ *
 
ঢেউ ভাঙ্গার মুখে জলে ছিটে গায়ে মেখে নিচ্ছে ব্রাউন পেলিকান – ২

এদিন ওকরা কোক দেখে বাড়ি ফেরার কথা আমাদের। সেরা চমকটা বোধহয় শেষের জন্যই রাখা ছিল। ফেরার পথে ফেরিতে এবং তারপর হ্যাটেরাসের পথে যখন ড্রাইভ করছিলাম, তখন সূর্যাস্তের সময় হয়ে এসেছে। অনেক জায়গায় সূর্যাস্ত দেখেছি, কিন্তু এত সুন্দর কখনও লাগেনি। আকাশে তখন কমলা, গোলাপি, বেগুনি রনের খেলা, আর পশ্চিমের পামলিকো সাউন্ডের রঙ ঘন নীল। পূর্বে আটলান্টিকের দিকে তখন উঠছে পূর্ণিমার চাঁদ। সূর্যাস্তের গোলাপি রঙ ছিটকে গিয়ে লেগেছে তার গায়েও। ক্যামেরায় ধরে রাখতে পারিনি সবটা, কিন্তু এই রঙের খেলা মনের মধ্যে রয়ে যাবে অনেকদিন। 

ফেরি থেকে সূর্যাস্ত *
 
ফেরির জানলায় সূর্যাস্তের আলো

সূর্যাস্ত, কেপ হ্যাটেরাস
 
সূর্যাস্তে সী গাল
 

 
সেবারে মনে ভরে প্রকৃতির রঙ রূপ দেখে ফিরে এসেছিলাম আউটার ব্যাঙ্কস থেকে। কিন্তু সেখানেই গল্প শেষ নয়। নর্থ ক্যারোলিনার কোস্টাল এরিয়ার টানে আবারও ফিরে গেছি। বারবার। কখনও বন্ধুদের সাথে, কখনও একা। ফিরে গেছি ব্রাউন পেলিকান, টার্ন আর সীগালের আমন্ত্রণে… সেখানের স্থানীয় মানুষদের টানে… পিয়ারগুলোর কাছে মেছো গন্ধের টানে… ছোটো মফস্বল শহরগুলোর জীবনপ্রবাহের টানে।  টুরিস্ট সীজনে টুরিস্টদের ভিড় লেগে থাকলেও অফ সীজনে এলে আরো ভাল করে চেনা যায় এখানের স্থানীয়দের। এই শহরগুলোকে এখনও স্পর্শ করেনি বড় শহরের ক্লেদ। মানুষগুলো অনেক প্রাণখোলা, অনেক সহজে আপন করে নেওয়া যায় তাঁদের। স্যাম নামে এক জেলের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বলছিলেন কিভাবে সারা বছরই প্রকৃতির নানান রোষের মোকাবিলা করতে হয় তাঁদের। বারবার হারিকেন আছড়ে পড়ে এইসব অঞ্চলে। বহু ঘরবাড়ি ভেঙ্গে যায়। আবার সব সামলে ঘুরে দাঁড়ান তাঁরা। তবু এই অঞ্চল ছেড়ে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে থাকার কথা ভাবতে পারেননা।
 
সমুদ্র আর পামলিকো সাউন্ড, দুইএরই ধারে আছে মানুষজনের একত্র হবার নানা উপায়। রেস্টোর‍্যান্ট, পার্ক, বসে আড্ডা দেবার জায়গা, ফিশিং পিয়ার… বড় শহরের মত চার দেওয়ালে আবদ্ধ নয়, বেশিরভাগই বাইরে। সেই রেস্টোর‍্যান্টে পাবেন টাটকা সী ফুড… বিয়ার নিয়ে জলের ধারে বসে শুনতে পাবেন স্থানীয় শিল্পীদের গান, নানান বাদ্যযন্ত্রও। বেশিরভাগই কান্ট্রি মিউজিক, ইলেক্ট্রিক ইন্সট্রুমেন্ট আর ড্রামসের বাড়বাড়ন্ত নেই। গায়ে এসে লাগবে সমুদ্রের নোনা হাওয়া…
 
সাউন্ডের ধারে লোকের ভিড়, গানবাজনা


এখনও চোখ বুজলে শুনতে পাই

Imagine there's no countries
It isn't hard to do
Nothing to kill or die for
And no religion too
Imagine all the people
Living life in peace…
 
পুরোনো ছবিগুলো দেখতে বসলে ইচ্ছে করে ওই পাতি টিনেজ ড্রামার কয়েকটা এপিসোড আবার চালাতে। ন্যাগস হেড এর বিশাল ফিশিং পিয়ারটার ওপর দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে। পিয়ারের নীচে আশ্রয় নিতে আসা ভিজে ডানার বার্ন সোয়ালোর ঝাঁক, সূর্যাস্তের গোলাপি চাঁদ, ফ্রোজেন মার্গারিটার গ্লাস হাতে স্যামের সাথে আড্ডা, ওকরা কোকের সেই ধুলো-মাখা হলদে আলো, জন লেননের কল্পনা… সব মিলে মিশে এক হয়ে যায়।
 

( * মার্কা ছবিগুলোর ফোটোগ্রাফার আমার বন্ধু এবং সহব্লগার প্রোজ্জ্বল। বাদবাকি ছবিগুলি আমার তোলা, আমার ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস দিয়ে। )

পারের কথা
  • 4.50 / 5 5
2 votes, 4.50 avg. rating (87% score)

Comments

comments