আজকাল লক্ষ্য করছি যে রাস্তায় ঘাটে কাউকে হাই তুলতে দেখলে আমার আর হাই পাচ্ছে না। অথচ কাউকে ঢেকুর বা হেঁচকি তুলতে দেখলে হাসি পাচ্ছে কিম্বা ঘুম না এলে বা পায়ের বুড়ো আঙ্গুল ও ডান চোখের পাতা একসাথে নেচে উঠছে ! বেগতিক দেখে এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করাতে সে বলল যে ও এমন কিছুনা, কোনো কারণে নার্ভের ওপর একটু বেশি রকমের চাপ পড়েছে তাই দেহের স্নায়ু সার্কিট সিস্টেম ঠিক মত কাজ করছে না। চিন্তা ভাবনার থেকে নিজেকে দুরে রেখে একটু রেস্ট নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্ত আমি এমনিতেই কর্মশ্রি মানপত্র পাওয়া বেকার, এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে যাও বা দু পাইস কামাই হয়, রেস্ট নিলে সেই রেস্তও বা আসবে কোত্থেকে? তাই আবার সেই ডাক্তার বন্ধুকে বললাম ব্যারামের ওষুধ যদি আরাম করাই হয় তাহলে এ’কদিন তোর বাড়িতেই আমাকে থাকতে দে না বাপু । তোর্ হারামের কামানো টাকার কিয়দংশ না হয় একবারটি আমার আরামের পেছনে খরচ করলি! আমার ওরকম একটা অকপট সুপ্রস্তাব শুনেই সে একটা অচেনা বিজাতীয় গালাগাল দিয়ে ফট করে ফোনটা কেটে দিল । যাই হোক আমার এই চোখ ফরফরে ও আঙ্গুল নড়বড়ে অবস্থা দিনে দিনে বেড়ে যেতে লাগলো। এ ডাক্তার সে হাসপাতাল করার পর এক বড় ডাক্তারবাবু শেষ মেষ এ ব্যামো যে কি তা ঠাওর করতে পারলেন। তিনি জানালেন এর নাম পিং পং সিনড্রোম – এযাবৎ কোটিতে পৌনে সাতটা কেস পাওয়া গেছে । এমনিতে কোনো ঝামেলা নেই তবে রোগটি ভীষণ ছোয়াঁচে। এ রোগের নানা সময় নতুন নতুন সিম্পটম দেখা দেয়-এই যেরকম হটাত হয়ত কানটা ফর ফর করেত করতে পুরো চুরুটের মত রোল করে সামনের দিকে গুটিয়ে এলো অথবা নিমেষের মধ্যে চুলগুলো হুট করে ফুট দশেক বেড়ে গিয়ে নিজের থেকেই বটগাছের শেকড়ের মত সামনের দিকে ঝুলতে লাগলো।শুনেছি একবার এক বৌদি যে কিনা এ রোগের ৩ নম্বর ভিকটিম ছিলেন মাঝরাতে উঠে অম্বল হওয়াতে জল খেয়ে বমি করতে যান ও সেই বমির সাথে নাকি চন্দ্রমল্লিকার গন্ধওয়ালা তুঁতে রঙের সিমেন্টঘোলা জল বের হয়েছিল !
ওদিকে ছুলেই এ সব হয়ে যাবে শুনে আমার বন্ধুরা আমার ধরে কাছে ঘেসা বন্ধ করে দিলো। এই জন্য শাস্ত্রে বলে ‘বিপদকালে যঃ পলায়াতি সঃ জীবতি’ কিন্ত যেটা বলেনা সেটা হলো ‘ বিপদকালে যঃ নাহ পলায়তি সঃ বান্ধব’। আমি মনের দুঃখে কান নাড়াতে নাড়াতে ও আঙ্গুল নাচাতে নাচাতে হাওড়া ইষ্টিশনে এসে একটা নাম না জানা ট্রেনে চেপে বসলাম, যেদিক দু চোখ যায় যাব, কাশি গিয়ে ডুবে মরব।ট্রেনে ভিক্ষুকদের টিকেট চেকিং হয়না এটা জানতাম আর আমি তো আবার পিং পং ভিক্ষুক , ভয় পেলে কখনো ভ্রু নাচছে তো স্ট্রেস বাড়লে কখনো জিভ দুফুট লম্বা হয়ে ঝুলে যাচ্ছে । লোকজন দেখে আনন্দ পেয়ে দু এক টাকা ছুড়ছে ও আবার কেউ কেউ ওপরয়ালার কেরামত ভেবে দশ কুড়ি টাকা দিয়ে পেন্নাম ঠুকে যাচ্ছে । যারা খুব কাছাকাছি দাড়িয়ে বসে থাকছে কিম্বা যাদের সাথে আমার ছোয়াছুই হচ্ছে তারা হয়ত বাড়ি গিয়ে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই টের পাচ্ছে যে কাঁপাকাঁপি বা টানাটানি কাকে বলে !
মাঝে এক রেলপুলিশ চোখ রাঙিয়ে জিগ্গেস করলো, ” এ লাইনে তোর ম্যাজিক তো আগে দেখিনি , নাম কি ?”
আমি বললাম , ” আমার নাম তকাই।”
“হুমম তা কি ম্যাজিক আছে একটু দেখা দেখি। ”
” আমি কোনো ম্যাজিক দেখাই না ওসব মাঝে মাঝে নিজের থেকে হয়ে যায় !”
” চ্যাংরামো হচ্ছে ?” বলে যেই না সে রডের দু ঘা লাগিয়েছে অমনি আমার টেনসানের চোটে বুকের ভেতর তা কিরকম ধরপর ধরপর করতে লাগলো। ও তার পরেই সবাই দেখল যে আমার মুখ দিয়ে হৃদপিন্ড ও দু নাক দিয়ে দুটো কিডনি বেরোচ্ছে আর ঢুকছে , একেবারে লুব ডুব ও পিং পং ছন্দ একাক্কার হয়ে যাচ্ছে।
আবার শাস্ত্রে বলা আছে যে ‘ঋণং কৃত্ব ঘৃতং পিবেত, যবন জিবেত সুখম জিবেত’। তবে এখানে ঋণ না হোক চলমান দানের মহিমায় সুখের জীবন মন্দ চলছিল না। বেছে বেছে তীর্থ ক্ষেত্র গুলিতে ট্রেন থেকে নেমে যাও। রিক্সা টাঙ্গা যা মেলে তাতে চেপে একটা ভালো হোটেলে ওঠো তারপর চান করে ফ্রেশ হয়ে পেটপুরে খেয়ে একটা জম্পেশ ঘুম মারো। কিন্ত বেশি রেস্ট নিলেই পিং পং সিনড্রোম আবার কাজ করে না তাই ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খেয়েই বিকেল বিকেল পাবলিক প্লেসে গিয়ে প্রচন্ড জটিল চিন্তা ভাবনা করে স্ট্রেস বাড়াও ও কিছু না কিছু খেল দেখিয়ে কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা জোটে তা নিয়ে সোজা হোটেলে ফিরে এস। এক শহরে সাত আট জায়গায় নানা রকম ভেলকি দেখিয়ে চল নতুন শহরের উদ্দ্যেশ্যে। কোথায় যায়নি? গয়া ,পাটনা, কাশি, ঝাঁসী , উজ্জয়ন ওদিকে তিরুপতি, রামেশ্বরম, মাদুরাই, তিরুচি তান্জাভুর কিছুই বাদ রাখিনি। যেই দেখে, যখন দেখে, ভেলকে গিয়ে মাথা চুলকোয় কেউ কিছু বোঝার আগেই আমি সেখান থেকে পগার পার। আমার পিং পং টুরে প্রথম বাধ সাধলো ঘরের কাছে চাইবাসায় ।বাজারের মাঝে এক অতি কুত্সিত দেখতে সাধু বাবা আমার খেল দেখে আমার কানে কানে বলল “এ জাদু নয় ,এ ডেঞ্জার রোগ আছে !”
আমি তো হাঁ,” তাজ্জুব, ডাক্তাররা ধরতে পারল না , পরীক্ষায় ধরা পড়ল না! আপনি কি করে জানলেন বাবা?”
“হামি সাধু বাবা নেহি , হামি মাঝি হারেম আছি।শুঁকে বলে দিতে পারি যে কার কি বিমারী আছে। ”
“কিন্ত এ রোগ সেরে গেলে অনেক লস হয়ে যাবে হারেম কাকা , এটাই তো আমার জীবিকা! ”
“আমার দাদার এ রোগ ছিলো । সেও পায়সা কমাতে গিয়ে সারাদিন টেন্সনিয়ে থাকতে লাগলো। শেষে সারাক্ষণ কুছু না কুছু তার বডি তে নাচছে তো কাভি হিলছে , বললাম তো ডেঞ্জার বিমারী। ” কথায় কথায় জানলাম যে মাঝি হারেম মানে সাঁওতালদের ওঝা গোছের কেউ। আমি আবার ইনিয়ে বিনিয়ে জিগ্গেস করলাম ” ইয়ে আপনার দাদা বেঁচে আছে তো?”
“আলবাত আছে , তার রোগ তো হামি সরাইলাম ”
“যা লাগবে আমি দেবখন তুমি আমার এ রোগ সরিয়ে দাও কাকা ।”
হারেম কাকা ও তার চ্যালারা তালের খোলা , ছাগলের লোম, ঘুঁটের বড়ি আরও অনেক হাবি জাবি জিনিস যোগার করে কিছু পুড়িয়ে ছাই করলো তো কিছু বেটে ফেলল। তারপর মন্ত্র ফুঁকে আমার গায়ে বাঁটা লাগিয়ে মাথায় ছাই মাখিয়ে ডোবায় চ্যাংদোলা করে ফেলে দিল। মাথা ধরে পাক্কা দু তিন ডুব মারতেই শরীরের ভেতরটা কেমন চনমন করতে লাগলো। সাত দিনে চাইবাসায় সেই গ্রামেই ছিলাম। আর চোখ নাচেনি, আঙ্গুল দোলেনি। এখন অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখলেই আমিও হাই তুলি।
যাই হোক রোগ সরিয়ে ফিরে এলাম কলকাতায় । এসেই সেই ডাক্তার বন্ধুটাকে ফোন করে বললাম ” ফিরে এসেছি রে, আমার মতন আর কোনো রুগী জুটল ?”
সে বলল, ” নাহ কোটিতে গুটি তো এ জম্মে আর জুটবে বলে মনে হয় না !”
আমি বলাম ” তবু জুটলে বলিস, তোর্ দ্বারা তো কিছু হবে না, পার্টি চাইলে চিকিত্সার ব্যবস্থা আমি করে দেব খন। ”
সে কি বুঝলো কে জানে আবার সে এক বিজাতীয় খিস্তি মেরে ফোনটা খট করে নামিয়ে রেখে দিল।

পিং পং সিনড্রোম
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments