“There is much more to be discovered about the nature of the human mind. In particular, there is much more for us to understand about how the mind can transform itself from a mere reservoir of greed, hatred, and delusion into an instrument of wisdom and compassion. Students of the Buddha are very well placed to further our understanding on this front, but the religion of Buddhism currently stands in our way.”

- Sam Harris, “Killing the Buddha”, Shambhala Sun, March 2006

 

1. সূচনা : বৌদ্ধধর্ম ও যুক্তিবাদ

যুক্তিবাদের সঙ্গে ধর্মের বিরোধকে দুভাবে দেখা যায় – সাধারণভাবে ও বিশেষভাবে । সাধারণভাবে যুক্তিবাদ অনুযায়ী কোন বিষয়কে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি হল বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর রচিত যৌক্তিক বিচার, যুক্তিবাদে অন্ধবিশ্বাসের কোনও স্থান নেই । কিন্তু ধর্ম বলে, কিছু কিছু বিষয় শুধু যুক্তি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে জানা সম্ভব নয়, সেগুলি অন্ধভাবেই বিশ্বাস করতে হবে : “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর” । এই হল যুক্তিবাদের সঙ্গে ধর্মের বিরোধের সাধারণ দিক । আর বিশেষভাবে দেখতে গেলে এই বিরোধের ক্ষেত্রগুলিকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় । প্রথমত, প্রায় সব ধর্মে বিশ্বের স্রষ্টা ও বিশ্বনিয়ন্তা একটি অলৌকিক শক্তির অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয় । দ্বিতীয়ত, ধর্মগুলি মৃত্যু-পরবর্তী বিভিন্ন ধারণাকে স্বীকার করে, যেমন – স্বর্গ, নরক ও পুনর্জন্ম । এই দুটি বিষয়ের কোনটিই যুক্তিবাদীর পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয় ।

বর্তমান প্রবন্ধে যেহেতু আমাদের আলোচ্য বিষয় বৌদ্ধধর্ম, তাই বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে যুক্তিবাদের বিরোধের ব্যাপারটি দেখা যাক । উপরে যুক্তিবাদের সঙ্গে ধর্মের যে সাধারণ বিরোধটির কথা বলা হল, বৌদ্ধধর্মের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী বৌদ্ধধর্মের ক্ষেত্রে সেটি খাটে না । বৌদ্ধধর্মে সাধারণভাবে অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই মূল্য দেওয়া হয় । পালি ত্রিপিটকের কালাম সুত্তে বুদ্ধ মৌখিক পরম্পরা, জনশ্রুতি, ধর্মগ্রন্থ বা গুরুবাক্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে যাচাই করে তবেই কোনও মতকে গ্রহণ করার উপদেশ দিয়েছেন । অন্যত্র তিনি তাঁর নিজের বক্তব্যকেও স্বর্ণকার যেভাবে সোনাকে পুড়িয়ে যাচাই করে, সেভাবে যাচাই করতে বলেছেন । নেহাত কারও কথায় বিশ্বাস না করার এই নীতি আধুনিক বিজ্ঞানের একটি মূল ভিত্তি । রয়্যাল সোসাইটির মূলমন্ত্র হল  “Nulias in verba” । ল্যাটিন বাক্যাংশটির ইংরেজি তর্জমা হল  “On the words of none” । সুতরাং এদিক থেকে বৌদ্ধধর্ম প্রায় আধুনিক বিজ্ঞানের মতোই যুক্তিবাদী ! অন্তত তার নিজের দাবি তা-ই ।

কিন্তু এই সাধারণ দাবি যুক্তিবাদের সঙ্গে ধর্মের বিরোধের বিশেষ ক্ষেত্রগুলিতে কতটা খাটে, সেটাও আমাদের দেখতে হবে । এই বিরোধের প্রথম বিশেষ ক্ষেত্র হল বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বনিয়ন্তা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস । অধিকাংশ ধর্মের প্রচারককে ঈশ্বরের দূত হিসেবে দেখানো হয় । ধর্মের বক্তব্যগুলি আসলে ঈশ্বরেরই বক্তব্য, প্রচারকরা সেগুলি মানুষের কাছে নিয়ে এসেছেন মাত্র । স্বাভাবিকভাবেই এসব ধর্মের মূল বিষয় হল ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি ও আনুগত্য । পরবর্তীতে বৌদ্ধধর্মের কোনও কোনও শাখায় বুদ্ধের উপর কিছুটা অলৌকিকতা আরোপ করা হলেও তিনি নিজেকে ঈশ্বরের দূত বা ঐরকম কিছু হিসেবে দাবি করেন নি । তিনি একজন সাধারণ মানুষ যিনি নিজের চেষ্টায় পরম জ্ঞান লাভ করেছেন । অন্য যেকোন মানুষ চেষ্টা করলে তাঁর মতো ওই জ্ঞান লাভ করতে পারে । তাঁর প্রচারিত ধর্মও তাই ঈশ্বরপ্রেরিত (revealed) নয় এবং এই ধর্মে ঈশ্বরের ধারণারও কোনও স্থান নেই । বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করার জন্য এক সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করার একেবারেই কোনও প্রয়োজন নেই । সুতরাং বৌদ্ধধর্ম যুক্তিবাদী এই সাধারণ দাবি ঈশ্বরবিশ্বাসের ক্ষেত্রে খাটে, একথা মোটের উপর বলা যায় ।

এবার যুক্তিবাদের সঙ্গে ধর্মের বিরোধের দ্বিতীয় বিশেষ ক্ষেত্রটিতে আসা যাক : মৃত্যু-পরবর্তী জগতে বিশ্বাস । দুঃখের বিষয়, এক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মের যুক্তিবাদী হওয়ার দাবি আর খাটে না । বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন, মানুষেরা তাদের নিজ নিজ কর্ম অনুসারে মৃত্যুর পর নতুন জন্ম লাভ করে । নতুন জন্ম যে মানবজন্মই হবে, তার কোনও মানে নেই । কর্মের উপর নির্ভর করে মানুষ ইতর প্রাণী হয়েও জন্মাতে পারে, আবার স্বর্গের দেবতা, নরকের জীব, অসুর কিংবা প্রেত হয়েও জন্মাতে পারে ! এই কর্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি বা নির্বাণই হল বৌদ্ধধর্মের চরম লক্ষ্য ।

তাহলে বৌদ্ধধর্মের মধ্যে আমরা একটা অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতি দেখতে পাচ্ছি । একদিকে বৌদ্ধধর্ম দাবি করছে যে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সমর্থন ছাড়া কোনকিছু বিশ্বাস করার দরকার নেই । আবার অন্যদিকে বৌদ্ধধর্ম মৃত্যুর পর পুনর্জন্মের কথা বলছে, বাস্তব অভিজ্ঞতায় যার স্পষ্টতই কোনও প্রমাণ পাওয়া সম্ভব নয় । একই ধর্মের মধ্যে এই বৈপরীত্য কেন ? যে বুদ্ধ কালাম সুত্তের প্রবক্তা, তিনি পুনর্জন্মের তত্ত্ব প্রচার করতে পারেন না । আর যদি তিনি সত্যিই পুনর্জন্মের তত্ত্ব প্রচার করে থাকেন, তাহলে কালাম সুত্ত তাঁর উক্তি হতে পারে না । এই অসঙ্গতি একটা সন্দেহের জন্ম দেয় : সত্যিই বুদ্ধ মৃত্যুর পর পুনর্জন্মের কথা বলেছিলেন, নাকি পরবর্তীকালে তাঁর অনুগামীরা তাঁর ধর্মে এই যুক্তিহীন বিশ্বাসের প্রচলন করেন ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সবার আগে বৌদ্ধধর্মের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসটা এক নজরে দেখে নেওয়া প্রয়োজন ।

 

2. গৌতম বুদ্ধ থেকে আজকের বৌদ্ধধর্ম : একটি সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

বুদ্ধের সঠিক জীবনকাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে । মোটামুটি ভাবে যে মতটি অধিকাংশ আধুনিক পণ্ডিত স্বীকার করেন সেই মত অনুসারে বুদ্ধের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব 563 সালে এবং মৃত্যু খ্রিস্টপূর্ব 483 সালে । তাঁর জন্মস্থান নেপালের লুম্বিনি । ঊনত্রিশ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করেন । ছয় বছর অনুসন্ধানের পর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বোধগয়ায় তিনি পরম জ্ঞান বা বোধি লাভ করেন । এরপর সারনাথে প্রথম ধর্মপ্রচার ও ভিক্ষুসঙ্ঘ গঠন । অবশেষে পঁয়তাল্লিশ বছরের কর্মজীবনের শেষে কুশিনারায় মৃত্যু ।

মৃত্যুর আগে বুদ্ধ সঙ্ঘের কোনও নেতা নির্বাচিত করে যাননি । তিনি বলেছিলেন, তাঁর উপদিষ্ট বিনয় (সঙ্ঘের নিয়মাবলী) ও ধর্মের উপর ভিত্তি করে সংঘ চলবে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে । এখনও পর্যন্ত খ্রিস্টানদের পোপ বা মুসলিমদের খলিফার মতো বৌদ্ধধর্মের কোনও সর্বোচ্চ নেতা নেই (দলাই লামা শুধুমাত্র তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের একটি শাখার নেতা) । যেহেতু বিনয় ও ধর্মই এখন থেকে তাঁদের পথপ্রদর্শক হবে, তাই বুদ্ধের শিষ্যেরা এই দুটি বিষয় সংকলন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন । এই উদ্দেশ্যে বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েক মাস পরে রাজগিরে প্রথম বৌদ্ধ সংগীতির আয়োজন করা হয় । এখানে প্রথম বিনয় ও ধর্ম মৌখিক ভাবে সংকলিত হয় । তৎকালীন ভারতবর্ষে লিপির প্রচলন ছিল, কিন্তু তা কেবল বাণিজ্য ও প্রশাসনের কাজে ব্যবহৃত হত । পণ্ডিত ও দার্শনিকেরা লেখাকে ছোট নজরে দেখতেন, লেখার চেয়ে হৃদয়ে ধারণ করাকে বেশি মর্যাদা দেওয়া হত । এই মানসিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থও দীর্ঘকাল মৌখিক ভাবে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হয় । কোনও একজন ভিক্ষুর পক্ষে সম্পূর্ণ ধর্মগ্রন্থ মনে রাখা স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব ছিল না । তাই একেকজন ভিক্ষু একেকটি অংশ মনে রাখতেন এবং তিনি সেইটুকুই তাঁর শিষ্যদের শিখিয়ে দিয়ে যেতেন ।

বুদ্ধ তাঁর জীবদ্দশায় মূলত তৎকালীন মগধ ও কোশল (মোটামুটি বর্তমান বিহার ও উত্তরপ্রদেশ) রাজ্যের মধ্যেই ধর্মপ্রচার করেন । তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীরা তাঁর প্রচারিত ধর্মের বাণী বহন করে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেন । খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের ধর্মান্তরের পর বৌদ্ধধর্মের বিস্তার নতুন গতি পায় । কিন্তু ভিক্ষুসঙ্ঘের ভৌগোলিক বিস্তার ও ভিক্ষুর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন বিপদ দেখা দেয় । বিনয় ও ধর্মের বিভিন্ন সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে সঙ্ঘের মধ্যে মতভেদ শুরু হয় । এরকম মতভেদ সৃষ্টির একটি বিশেষ কারণ হল বৌদ্ধধর্মে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর জোর দেওয়ার প্রবণতা, যা আমরা এই প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করেছি । রাজগিরের সংগীতিতে বিনয় ও ধর্মের মূল বিষয়গুলি সংকলিত হলেও সেগুলিকে বিভিন্ন ভিক্ষু নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন । এই প্রবণতার অনিবার্য পরিণাম ছিল একটাই : বৌদ্ধ সঙ্ঘে বিভাজন ।

এই বিভাজনের প্রক্রিয়া বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে চলেছিল এবং এই বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রের অপর্যাপ্ততা ও অসঙ্গতির জন্য এই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে । আমরা সেসব জটিলতায় না গিয়ে যে মূল বিষয়গুলো নিয়ে সবাই মোটামুটি একমত, সেগুলোই উল্লেখ করব । বুদ্ধের মৃত্যুর আনুমানিক 140 বছর পরে সঙ্ঘ প্রথম দুভাগে বিভক্ত হয় : স্থবিরবাদ ও মহাসঙ্ঘিক । এরপর এই দুটি মূল শাখা আবার ক্রমান্বয়ে বিভক্ত হতে থাকে । এই ক্রমবিভাজন প্রক্রিয়া মোটামুটি খ্রিস্টের জন্মের সমকাল (বা কিছুক্ষেত্রে তারও পর) পর্যন্ত চলতে থাকে । এর ফলে বুদ্ধের মৃত্যুর পাঁচশো বছরের মধ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘ অনেকগুলি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায় । প্রচলিত বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থে এরকম আঠারোটি শাখার কথা শোনা যায়, কিন্তু এই সংখ্যাটি অনেকটাই প্রতীকী এবং প্রকৃত সংখ্যা কিছুটা “উনিশ-বিশ” হতে পারে । স্থবিরবাদ থেকে যে শাখাগুলি সৃষ্টি হয়, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সর্বাস্তিবাদী, বাতসিপুত্রীয়-সাম্মতীয়, মহীশাসক, ধর্মগুপ্তক প্রভৃতি । অন্যদিকে মহাসঙ্ঘিক থেকে সৃষ্টি হয় গোকুলিক, একব্যবহারিক, বহুশ্রুতীয় প্রভৃতি ।

এইসব শাখাগুলি প্রত্যেকে তাদের নিজেদের মতো করে বিনয় ও ধর্মকে ঢেলে সাজায় । সেইসঙ্গে ধর্ম বিষয়ে নিজেদের মতকে আরও বিস্তারিত ও গভীর ভাবে বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে তারা অভিধর্ম নামে একটি নতুন সাহিত্যের সৃষ্টি করে । অভিধর্মও প্রথম দিকে বিনয় ও ধর্মের মতো মৌখিক ভাবেই প্রচলিত ছিল । খ্রিস্টের জন্মের কিছু আগে-পরে (অর্থাৎ বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় পাঁচশো বছর পরে) বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন শাখাগুলি যারযার বিনয়, ধর্ম ও অভিধর্ম লিপিবদ্ধ করে । এই তিনটি বইকে আলাদা আলাদা ঝুড়ি বা পিটকে রাখা হত বলে এদের যথাক্রমে বিনয় পিটক, সূত্র পিটক ও অভিধর্ম পিটক এবং একসঙ্গে ত্রিপিটক বলা হত ।

খ্রিস্টের জন্মের সমসাময়িক কাল থেকে বৌদ্ধধর্মে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারার সৃষ্টি হয় যার নাম মহাযান । এই ধারার প্রবক্তারা বেশ কিছু নতুন সূত্র রচনা করেন যেগুলি সূত্র পিটকে নেই । এগুলি “মহাযানী সূত্র” নামে পরিচিত । নতুন সূত্রগুলির প্রামাণ্যতা দেখানোর উদ্দেশ্যে মহাযানীরা অদ্ভূত দাবি করেন । এই সূত্রগুলি নাকি স্বয়ং গৌতম বুদ্ধই বলেছিলেন কিন্তু তাঁর মানুষ শিষ্যেরা এগুলি বুঝতে না পারায় সংগ্রহ করে রাখেন নি । কিছু অলৌকিক প্রাণীর দ্বারা অলৌকিক স্থানে এগুলি এতদিন সংরক্ষিত ছিল । বলা বাহুল্য, এমন দাবির ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা শূন্য । খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে প্রখ্যাত দার্শনিক নাগার্জুন এই সূত্রগুলিকে দার্শনিক ভিত্তি দেন । তাঁর প্রচারিত দর্শনের নাম মাধ্যমিক বা শূন্যবাদ । খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে অসঙ্গ ও বসুবন্ধু নামে আরও দুজন দার্শনিক মহাযানী সূত্রগুলির অন্য একটি দার্শনিক রূপ প্রচার করেন । এই দর্শনের নাম যোগাচার বা বিজ্ঞানবাদ । মহাযানী সূত্র, মাধ্যমিক ও যোগাচার – সব মিলিয়ে তৈরি হয় মহাযান বৌদ্ধধর্ম । মহাযান কিন্তু একটু আগে উল্লিখিত “আঠারোটি” শাখার মতো বৌদ্ধধর্মের কোনও নতুন শাখা নয় । মহাযানীদের কোনও স্বতন্ত্র ত্রিপিটক নেই । ওই শাখাগুলির মধ্যে কোনও কোনও শাখার একটি অংশ তাঁদের ত্রিপিটকের সঙ্গে সঙ্গে মহাযানী সূত্র ও দর্শনকেও গ্রহণ করেন । এঁরাই মহাযানী হিসেবে পরিচিত হন ।

বৌদ্ধধর্মের এই অভিনব রূপটির মহাযান নামকরণের কারণ আছে । পূর্ববর্তী ভিক্ষুরা মনে করতেন, তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য নিজেদের পুনর্জন্ম রোধ করা । মহাযানীরা বললেন, এ তো সুস্পষ্ট স্বার্থপরতা । পৃথিবীর এত অজ্ঞ প্রাণী পুনর্জন্ম রোধ করতে না পেরে দুঃখ পাবে আর আমি একা নির্বাণ লাভ করব ? তার চেয়ে ভালো, আমি এইসব অজ্ঞ প্রাণীদের নির্বাণ লাভে সাহায্য করার জন্য বারবার জন্মাব । এই মহত্ত্বের কারণে তাঁরা নিজেদের বললেন মহাযানী আর প্রাচীনপন্থীদের হীনযানী (যদিও বলা বাহুল্য, প্রাচীনপন্থীরা মহাযান নামটি মানলেও নিজেদের কখনোই হীনযানী নামে উল্লেখ করতেন না) ।

মহাযানের প্রচলনের পর কিন্তু ভারতের সমস্ত বৌদ্ধ মহাযানী হয়ে যান নি । বরং হীনযানী বৌদ্ধদের সংখ্যাই ভারতে বরাবর বেশি ছিল । কিন্তু খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে বৌদ্ধধর্মে তান্ত্রিক ক্রিয়াকাণ্ডের প্রবেশ ঘটে । এই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম বজ্রযান নামে পরিচিত হয় এবং একসময় তা হীনযান ও মহাযান উভয়কেই অনেকটা গ্রাস করে ফেলে । এইসময় থেকে ভারতে বৌদ্ধধর্মের অধঃপতনের সূত্রপাত হয় । পুনর্জাগ্রত হিন্দুধর্ম ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্মকে কোণঠাসা করে ফেলে । দশম-একাদশ শতাব্দীর পর বৌদ্ধধর্ম ভারতীয় সমাজে প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে তুর্কি সেনাদের দ্বারা নালন্দা ও বিক্রমশীলার ধ্বংসলীলার সাথে সাথে গৌতম বুদ্ধের নিজের ভূমিতে তাঁর ধর্মের চূড়ান্ত অবলুপ্তি ঘটে ।

বৌদ্ধধর্ম যদি কেবল ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে হয়তো আজ পৃথিবীতে এই ধর্মের কোনও অস্তিত্বই থাকত না । সৌভাগ্যের বিষয়, বৌদ্ধধর্ম বিভিন্ন সময়ে ভারতের বাইরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল । এই বিস্তারের সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে । সম্রাট অশোকের পুত্র ভিক্ষু মহেন্দ্র ও কন্যা ভিক্ষুণী সঙ্ঘমিত্রা শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন । তখনও মহাযানের উদ্ভব হয়নি । শ্রীলঙ্কায় যে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয়, তা ছিল স্থবিরবাদের একটি শাখা । এঁরা পালি ভাষায় বৌদ্ধধর্মের চর্চা করতেন । পরবর্তীকালে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধরা নিজেদের মূল স্থবিরবাদী বলে দাবি করেন এবং থেরবাদ (সংস্কৃত শব্দ স্থবিরের পালি রূপান্তর হল থের) নাম গ্রহণ করেন । শ্রীলঙ্কা থেকেই এই থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস ও কম্বোডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে । অন্যদিকে খ্রিস্টীয় অব্দের শুরু থেকেই মধ্য এশিয়ার রেশম পথ ধরে বৌদ্ধধর্ম চীনদেশে প্রবেশ করে । সেদেশে মহাযান বৌদ্ধধর্মই প্রাধান্য লাভ করে । চীন থেকে মহাযান বৌদ্ধধর্ম খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে কোরিয়ায় এবং সেখান থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে জাপানে পৌঁছায় । আবার বজ্রযান বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে তিব্বতে গিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে । ফলে ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম সম্পূর্ণ লুপ্ত হলেও এর তিনটি রূপই এশিয়ার কোনও না কোনও অঞ্চলে প্রচারিত হয়ে আজ পর্যন্ত টিকে আছে : শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হীনযানী থেরবাদ; চীন, কোরিয়া ও জাপানে মহাযান; এবং তিব্বতে বজ্রযান ।

এই তিন শাখার মধ্যে যদিও কোনটিই আদি বৌদ্ধধর্ম নয়, তবু এদের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে প্রাচীন হল থেরবাদ । কিছুটা এই কারণে এবং কিছুটা শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক যোগাযোগের ফলে আন্তর্জাতিক পণ্ডিত মহলে থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে । আমরাও এই প্রবন্ধে থেরবাদী গ্রন্থগুলিকেই মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করব । থেরবাদী ত্রিপিটকের ভাষা পালি এবং এর তিনটি অংশ : বিনয়, সুত্ত ও অভিধম্ম । সুত্ত পিটকেই মূলত বুদ্ধের ধর্ম সংক্রান্ত বক্তব্যগুলি পাওয়া যায় । সুত্ত পিটকের পাঁচটি অংশ । এই অংশগুলিকে নিকায় বলা হয় । এগুলি হল – দীঘ নিকায়, মজ্ঝিম নিকায়, সংযুত্ত নিকায়, অঙ্গুত্তর নিকায় ও খুদ্দক নিকায় । এদের মধ্যে খুদ্দক নিকায়ের অধিকাংশ অংশ পরবর্তী রচনা, যে অল্প কিছু অংশ প্রাচীন সেগুলিও বুদ্ধের মতবাদ জানতে বিশেষ সহায়ক নয় । তাই পণ্ডিতেরা খুদ্দক নিকায়কে বাদ দিয়ে প্রথম চার নিকায়কেই বেশি গুরুত্ব দেন । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জাতকের গল্পগুলি খুদ্দক নিকায়ের এরকম পরবর্তী সংযোজন । বুদ্ধ নিজে কখনও তাঁর পূর্বজন্মের কাহিনী শোনান নি ।

 

3. বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদের বিকৃতির সম্ভাব্য কারণ : প্রসঙ্গ-বিচ্ছিন্নতা ও আক্ষরিকতা

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসের যে রূপরেখা আমরা দেখলাম, তার থেকে স্পষ্ট যে, আজকের প্রচলিত বৌদ্ধধর্মকে হুবহু গৌতম বুদ্ধের প্রচারিত আদি বৌদ্ধধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার কোনও কারণ নেই । বরং অন্য সবকিছুর মতো বৌদ্ধধর্মও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা বিকৃত হয়েছে, এটা মনে করাই স্বাভাবিক । বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা পণ্ডিত রিচার্ড গমব্রিচ (অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের প্রাক্তন বোডেন অধ্যাপক এবং বর্তমানে “Oxford Centre for Buddhist Studies”-এর অধ্যক্ষ) তাঁর “How Buddhism Began” বইতে বৌদ্ধধর্মের বিকৃতির দুটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেছেন ।

প্রথমত, গৌতম বুদ্ধ কোনও ধর্মীয় শূন্যতার পরিমণ্ডলে ধর্মপ্রচার করেন নি । তাঁর সময়ে ভারতে অন্য অনেক ধর্মমত প্রচলিত ছিল যাদের মধ্যে অবশ্যই প্রধান ছিল বেদ-উপনিষদ ভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য ধর্ম । স্বাভাবিকভাবেই ধর্মপ্রচারের সময় বুদ্ধকে মূলত ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বিতর্কের মধ্য দিয়ে তাঁর মতকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল । তিনি ব্রাহ্মণদের অনেক মতকে অস্বীকার করেন এবং তার উপর ভিত্তি করে নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করেন । সুতরাং বুদ্ধের প্রকৃত মতকে সম্যকরূপে বুঝতে হলে তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যধর্মের (মূলত উপনিষদের) পটভূমিকায় তাঁর বক্তব্যকে বিচার করা প্রয়োজন । উপনিষদ থেকে তাঁর বক্তব্যকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেখলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থেকে যায় । দুর্ভাগ্যক্রমে বুদ্ধের পরবর্তীকালে ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল । তাঁর মৃত্যুর দুয়েক শতাব্দী পরে যখন বৌদ্ধ সঙ্ঘের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মমতও নিজেই একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল, তখন আর তার উপনিষদের মতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কোনও প্রয়োজন রইল না । ফলে পরবর্তী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা উপনিষদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বুদ্ধের বক্তব্যকে দেখতে শুরু করলেন এবং সম্ভবত অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে ভুল বুঝলেন । এই বিষয়টিকেই আমরা বৌদ্ধধর্মের “প্রসঙ্গ-বিচ্ছিন্নতা” বলতে চেয়েছি ।

দ্বিতীয় যে কারণে বৌদ্ধধর্ম বুদ্ধের মত থেকে সরে আসতে পারে, তা হল তাঁর বক্তব্যকে সবসময় আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা । বুদ্ধের সব উক্তিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে আমরা অনেক সময় তাঁকে ভুল বুঝব । এর কারণ হল তাঁর কথা বলার একটি বিশেষ কৌশল । এই কৌশলটি উদাহরণের সাহায্যে সবচেয়ে ভালো বোঝা যাবে । দীঘ নিকায়ের (31) সিগালক সুত্তে আমরা বুদ্ধকে সিগাল নামে এক যুবকের মুখোমুখি হতে দেখি । সেই সময় ভারতে দিকপূজার প্রচলন ছিল । মানুষ বিশ্বাস করত, ছয় দিকের (পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঊর্ধ্ব ও অধঃ) পূজা করলে তারা সুরক্ষিত থাকতে পারবে । সিগাল নামের যুবকটিও তাই সকালে স্নানসিক্ত বসনে ছয় দিকে ঘুরে ঘুরে প্রণাম করছিল । বুদ্ধ তাকে এর কারণ জানতে চাইলে সে তার বিশ্বাসের কথা জানাল । তখন বুদ্ধ তাকে বললেন যে, ছয়দিকের পূজা নিশ্চয় করা প্রয়োজন, তবে কিনা সে যেভাবে করছে সেভাবে নয়, এই পূজার পদ্ধতি অন্য । এরপর স্বাভাবিকভাবেই যুবকটি বুদ্ধের কাছে ছয়দিকের পূজার সঠিক পদ্ধতি জানতে চাইবে । এবং সেই সুযোগে বুদ্ধ এবার তার দর্শনটিকেই সম্পূর্ণ পালটে দেবেন । যা ছিল সামান্য কুসংস্কার, তাই হয়ে যাবে মূল্যবান জীবনদর্শন । বুদ্ধ বললেন, ছয়দিক বলতে নেহাত পূর্ব, পশ্চিম ইত্যাদি দিককে বুঝলে চলবে না । নিজের মাতাপিতাকে পূর্বদিক, স্ত্রী ও সন্তানদের পশ্চিমদিক, বন্ধু ও সহকর্মীদের উত্তরদিক, শিক্ষকদের দক্ষিণদিক, দাসদাসিদের অধোদিক এবং শ্রমণ-ব্রাহ্মণদের ঊর্ধ্বদিক রূপে বুঝতে হবে । এরপর বুদ্ধ এইসব মানুষদের কার প্রতি কেমন ব্যবহার করা উচিত, তা বিস্তারিতভাবে বলেন । উপসংহারে তাঁর বক্তব্য : “বৎস, পৃথিবীর ছয়দিকে তোমার প্রণামের কোনও প্রয়োজন নেই । সেই ছয় দিক যথেষ্ট সুরক্ষিতই আছে । তুমি বরং তোমার ছয়দিকে যারা তোমাকে ঘিরে রয়েছে, তাদের প্রতি সেবা, যত্ন ও ভালোবাসা দেখিয়ে নিজের ছয়দিক সুরক্ষিত কর ।” এই হল বুদ্ধের মতে দিকপূজার সঠিক পদ্ধতি !

এরকম উদাহরণ সুত্ত পিটকে আরও অনেক আছে কিন্তু আশা করি, এই একটি থেকেই বুদ্ধের জনসংযোগের কৌশলটি বোঝানো গিয়েছে । বুদ্ধ খুব উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাকে প্রথমে গ্রহণ করতেন এবং তারপর সেই ধারণার খোলনলচে পালটে দিয়ে তাকে কার্যত নিজের মতের বাহক করে তুলতেন । মানুষের মতকে পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে খুব কার্যকর পদ্ধতি এবং ধর্মপ্রচারক হিসেবে বুদ্ধের ব্যাপক সফলতার এটি একটি অন্যতম কারণ । কিন্তু এই কৌশলের একটা ঝুঁকিও আছে । তা হল, মানুষ পরে বুদ্ধের আরোপিত ব্যাখ্যা ভুলে গিয়ে আবার বিষয়টির আক্ষরিক অর্থে ফিরে যেতে পারে । উপরের উদাহরণে একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির কথা ভাবা যাক । ওই যুবক পরে তার কোনও বন্ধুকে বুদ্ধের প্রবর্তিত “দিকপূজার” কথা বলল । কিন্তু বিষয়টি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারার ফলে বন্ধুটি ভাবল, বুদ্ধ আক্ষরিক অর্থেই ছয়দিকের পূজা করতে বলেছেন । তাঁর সব উপদেশকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার বিপদ সম্পর্কে বুদ্ধ নিজেও অবহিত ছিলেন এবং তিনি এই ব্যাপারে তাঁর শিষ্যদের সতর্কও করেছিলেন । মজ্ঝিম নিকায়ের (22) অলগদ্দওপম সুত্তে দেখা যায়, একজন ভিক্ষুর মনে ধর্ম সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল । অন্যান্য ভিক্ষুরা তাঁকে বোঝাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিষয়টি বুদ্ধকে জানান । বুদ্ধ প্রথমে তাঁর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করার জন্য সেই ভিক্ষুকে ভর্ৎসনা করেন । এরপর তিনি সমস্ত ভিক্ষুদের উদ্দেশে বলেন যে, অনেক বিপথগামী ব্যক্তি সূত্র, গাথা, গীত, উদান, উদ্ধৃতি, ব্যাখ্যা, উপমা ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্ম শেখে ঠিকই, কিন্তু তারপর সেইসব শিক্ষার অন্তর্নিহিত অর্থ নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে বিচার করে না । ফলে তারা ধর্মের প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করতে পারে না । তাদের অধীত শিক্ষা কেবল অন্যদের সমালোচনা করতে বা তর্ক জিততেই কাজে লাগে, কিন্তু তাদের নিজেদের সুখী করতে পারে না (যা কিনা ধর্ম শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য) । অন্যদিকে যারা নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে ধর্মের প্রকৃত অর্থ বিচার করে, তারাই ধর্মের অনুশীলন করে সুখী হয় । একটি উপমা দিয়ে বুদ্ধ এই পার্থক্যটি বুঝিয়েছেন । প্রথম শ্রেণীর ব্যক্তিরা যেন একটি বিষধর সর্পকে ধরতে গিয়ে তার লেজ ধরে টানে, ফলে সর্প তাদের ফিরে দংশন করে । কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যক্তিরা চিমটে দিয়ে সর্পের ঘাড়ে ধরে । তাঁর ধর্মকে অর্থ না বুঝে গ্রহণ করলে তা যে কত ক্ষতিকর হতে পারে, এই সর্পের উপমাই তার প্রমাণ ।

এরপর বুদ্ধ আরও একটি উপমা দিয়েছেন । ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি নদী পার হতে গিয়ে দেখল, কোনও সেতু বা নৌকা নেই । তখন সে গাছের ডালপালা ও লতাগুল্ম সংগ্রহ করে একটি ভেলা বানিয়ে তার সাহায্যে নদী পার হল । এরপর সেই ব্যক্তি যদি ভাবে, এই ভেলা আমার অনেক কাজে লেগেছে, সুতরাং আমি এটিকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাব, তাহলে সেটা নিশ্চয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে না । বুদ্ধের ধর্মে সূত্র, গাথা, গীত, উদান, উদ্ধৃতি ইত্যাদির ভূমিকাও ওই ভেলার মতো । এগুলি আমাদের ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থে পৌঁছাতে সাহায্য করে মাত্র, কিন্তু তারপর এদের আঁকড়ে ধরে থাকার কোনও মানে হয় না ।

অবশ্য বৌদ্ধধর্মের সমস্ত বিষয়কেই যে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে তা নয় । কোনও কোনও বিষয় সরাসরি বলা হয়েছে, সেগুলির ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই । আবার কোনও কোনও বিষয় ইঙ্গিতে বলা হয়েছে, সেগুলি ব্যাখ্যার প্রয়োজন । বুদ্ধের ধর্মকে তারাই সঠিকভাবে প্রচার করে যারা যে বিষয়ের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই তার ব্যাখ্যা করে না এবং যে বিষয়ের ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে তার ব্যাখ্যা করে । যারা উল্টোটা করে তারা বুদ্ধের ধর্মের অপপ্রচার করে (অঙ্গুত্তর নিকায় 2.24-25) ।

 

4. পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা : মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম

পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মে পুনর্জন্মের ধারণার সঙ্গে আত্মার ধারণা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত । এসব ধর্মে স্বীকার করা হয়, মানুষের দেহের অতিরিক্ত একটি সূক্ষ্ম সত্তা থাকে যা স্বতন্ত্র ও অপরিবর্তনীয় । এই সত্তাটি দেহের মৃত্যুর পরেও টিকে থাকে এবং অন্য দেহ ধারণ করে । এই সূক্ষ্ম সত্তাকেই আত্মা বলা হয় । বৌদ্ধধর্মে পুনর্জন্মকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না কারণ বৌদ্ধধর্মে আত্মাকেই স্বীকার করা হয় না । এই ধর্মের একটি ভিত্তিপ্রস্তর হল “অনাত্মা”-র তত্ত্ব । এই তত্ত্ব অনুসারে মানুষের দেহের মধ্যে স্বতন্ত্র ও অপরিবর্তনীয় কোনও সত্তা নেই যাকে সে “আমি” বলে ভাবতে পারে । মানুষ মোহের বশে এরকম একটি আমিত্বে বিশ্বাস করে এবং এই মোহই তার দুঃখের কারণ । প্রচলিত বৌদ্ধধর্মে একটি মানুষকে পাঁচটি অংশে বিভক্ত করা হয় : রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান । এই অংশগুলিকে একেকটি স্কন্ধ বলা হয় । এই পঞ্চ স্কন্ধ (five aggregates) মিলেই হয় মানুষ । রূপ (form) বলতে বোঝানো হয় মানুষের জড় দেহকে । বেদনা (feeling) হল সবরকম অনুভূতি : সুখের অনুভূতি, দুঃখের অনুভূতি বা নিরপেক্ষ অনুভূতি (লক্ষণীয়, বর্তমান বাংলা ভাষায় বেদনা বলতে শুধু দুঃখের অনুভূতিকে বোঝায় কিন্তু পালিতে তা বোঝাত না । সুতরাং বৌদ্ধধর্মের পরিভাষাগুলিকে সবসময় বর্তমান বাংলা অর্থে গ্রহণ করলে ভুল হতে পারে । এজন্য পরিভাষাগুলির ইংরেজি অর্থও দেওয়া হল ।) । সংজ্ঞা (perception) হল কোনও বিষয়কে সনাক্ত করা । সংস্কার (volitional action) বলতে বোঝায় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কর্ম । বিজ্ঞান (consciousness) হল চেতনা (পুনরায় লক্ষণীয়, বর্তমান বাংলায় বিজ্ঞান শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন ।) । এখন এই রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানের প্রত্যেকটিই পরিবর্তনশীল এবং এদের কোনটিকেই কেউ “আমার” বলে দাবি করতে পারে না । সুতরাং পঞ্চস্কন্ধের কোনটিই আত্মা নয় । আর মানুষ যেহেতু পঞ্চস্কন্ধের সমষ্টি, তাই মানুষের মধ্যে আত্মা বলে কিছু নেই । এই হল অনাত্মার তত্ত্ব ।

তাহলে আত্মাকে বাদ দিয়ে বৌদ্ধধর্ম কিভাবে পুনর্জন্মকে ব্যাখ্যা করে ? বৌদ্ধধর্ম অনুসারে মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই পাঁচটি স্কন্ধের সম্পূর্ণ বিনাশ হয় না, বরং এরা আবার নতুন রূপে সংযোজিত হয়ে নতুন একটি মানুষ (বা অন্য কোনও প্রাণী) সৃষ্টি করে । এইভাবে পঞ্চস্কন্ধের মাধ্যমে পুনর্জন্মের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় “প্রতীত্য-সমুৎপাদ” (dependent origination) তত্ত্বে । প্রতীত্য-সমুৎপাদকে বৌদ্ধধর্মের সারবস্তু বলা হয় । বুদ্ধ এই তত্ত্ব সম্পর্কে বলেছিলেন, “যিনি প্রতীত্য-সমুৎপাদ জানেন, তিনি ধর্ম জানেন । আর যিনি ধর্ম জানেন, তিনি প্রতীত্য-সমুৎপাদ জানেন ।” (মহাহত্থিপদওপম সুত্ত, মজ্ঝিম নিকায় 28) । এই তত্ত্বে বারোটি বিষয় (এই বিষয়গুলিকে নিদান বলা হয়) একটি কার্য-কারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে । এই বিষয়গুলির প্রত্যেকটি তার পূর্ববর্তী বিষয়টির ফল এবং পরবর্তী বিষয়টির কারণ । তত্ত্বটি হল এরকম : অবিদ্যা (ignorance) থেকে সংস্কার, সংস্কার থেকে বিজ্ঞান, বিজ্ঞান থেকে নাম-রূপ (name and form), নাম-রূপ থেকে ষড়ায়তন (six sense bases), ষড়ায়তন থেকে স্পর্শ (contact), স্পর্শ থেকে বেদনা, বেদনা থেকে তৃষ্ণা (craving), তৃষ্ণা থেকে উপাদান (clinging), উপাদান থেকে ভব (becoming), ভব থেকে জাতি (birth) এবং জাতি থেকে জরামরণ (decay and death) ও দুঃখ (suffering) উৎপন্ন হয় । আবার অবিদ্যার নিরোধে সংস্কারের নিরোধ, সংস্কারের নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ, বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ, উপাদানের নিরোধে ভবের নিরোধ, ভবের নিরোধে জাতির নিরোধ এবং জাতির নিরোধে জরামরণ ও দুঃখের নিরোধ হয় ।

প্রচলিত বৌদ্ধধর্মে প্রতীত্য-সমুৎপাদের তত্ত্বটিকে তিনটি জন্ম বা জীবনকাল জুড়ে ব্যাখ্যা করা হয় । অতীত জন্মের অবিদ্যা অর্থাৎ অজ্ঞতা এবং সেই অজ্ঞতা জনিত সংস্কারের ফলে আমরা মাতৃগর্ভে এমন একটি বিজ্ঞান বা চেতনা নিয়ে আবির্ভূত হই যা ওই অতীত সংস্কারের দ্বারা নিরূপিত । এই চেতনাই আবার আমাদের নাম-রূপ অর্থাৎ মানসিক ও দৈহিক সত্তা সৃষ্টি করে যা নিয়ে আমরা ভূমিষ্ঠ হই । ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে আমাদের ষড়ায়তন অর্থাৎ ছয়টি ইন্দ্রিয়ের (বৌদ্ধধর্মে পাঁচটি বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে মনকেও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হিসেবে ধরা হয় ।) সঙ্গে বাইরের (ও ভেতরের) বিভিন্ন অভিজ্ঞতার স্পর্শ বা যোগাযোগ ঘটে । এই যোগাযোগের ফলস্বরূপ আমরা বিভিন্ন প্রকার অনুভূতি বা বেদনা অনুভব করি । এইসব অনুভূতির মধ্যে কিছু আমরা পছন্দ করি, আবার কিছু অপছন্দ করি । অর্থাৎ আমাদের মধ্যে তৃষ্ণা বা আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয় । তৃষ্ণার ফলে আমরা কিছু অনুভূতির প্রতি আকৃষ্ট হই ও কিছু অনুভূতির প্রতি বিকর্ষণ অনুভব করি । একে বলা হয় উপাদান । এইভাবে বারবার আকর্ষণ ও বিকর্ষণের ফলে একসময় এগুলিই আমাদের স্বভাব হয়ে যায়, কিংবা অন্যভাবে বললে আমরা নিজেরাই এগুলি হয়ে যাই । একে বলা হয় ভব । এতদূর পর্যন্ত গেল বর্তমান জন্মের কথা । মৃত্যুর পর বর্তমান জীবনের ভবের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আমরা আবার নতুন জন্ম বা জাতি লাভ করব । এবং একসময় জরাগ্রস্ত হয়ে আমাদের মৃত্যু হবে ।

সংক্ষেপে বলা যায়, প্রচলিত বৌদ্ধধর্মে প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রটিকে তিনটি জন্ম জুড়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

প্রথম জন্ম – অবিদ্যা, সংস্কার ।

দ্বিতীয় জন্ম – বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, বেদনা, তৃষ্ণা, উপাদান, ভব ।

তৃতীয় জন্ম – জাতি, জরামরণ ।

তাহলে দেখা গেল, অবিদ্যা বা অজ্ঞতাই আমাদের বারবার জন্মগ্রহণ ও দুঃখভোগের মূল কারণ । অজ্ঞতা যতক্ষণ না সম্পূর্ণ দূর হয়, ততক্ষণ এই জন্মমৃত্যুর চক্র চলতেই থাকবে । কিন্তু একবার অজ্ঞতাকে সম্পূর্ণভাবে দূর করতে পারলেই প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রটি ছিন্ন হয়ে যাবে এবং আমাদের আর জন্ম হবে না । আমরা নির্বাণ লাভ করব । বলা বাহুল্য, এই অজ্ঞতা কোনও বিশেষ বিষয়ের অজ্ঞতা নয় । এই অজ্ঞতা হল জগত ও জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক সঠিক দৃষ্টির অভাব ।

 

5. পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যার সমস্যা : বৌদ্ধধর্মের অন্যান্য ধারণার সঙ্গে অসঙ্গতি

এখন প্রশ্ন হল, পুনর্জন্মের যে প্রচলিত তত্ত্বটি আলোচনা করা হল, তা কি গৌতম বুদ্ধের নিজের প্রচারিত মত, নাকি পরবর্তীকালের বিকৃতি ? যদিও আজকের যুগে যেকোনো সাধারণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলে তিনি এই তত্ত্বকে স্বয়ং বুদ্ধের দ্বারা প্রচারিত বলেই দাবি করবেন, কিন্তু সেই দাবিকে যথার্থ বলে মানার ক্ষেত্রে কতকগুলি গুরুতর সমস্যা রয়েছে ।

সমস্যা 1 : পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা অভিজ্ঞতাবাদের বিরোধী

আমরা এই প্রবন্ধের শুরুতেই দেখেছি যে, পুনর্জন্মের প্রচলিত তত্ত্ব বৌদ্ধধর্মের অভিজ্ঞতাবাদের সম্পূর্ণ বিরোধী । মৃত্যুর পর আমাদের পুনর্জন্ম হবে কিনা তা জানতে হলে আগে আমাদের মরতে হবে ! তার আগে এই জীবনে সেটা জানা সম্ভব নয় । পালি সুত্ত পিটকের কিছু কিছু সুত্তে দেখা যায়, বুদ্ধ পুনর্জন্মের এই অভিজ্ঞতাবাদ-বিরোধী চরিত্রের জন্য তাকে ভ্রান্ত বলেছেন । সংযুত্ত নিকায়ের (36.21) সীবক সুত্তে মোড়িয়সীবক নামে একজন পরিব্রাজক বুদ্ধকে প্রশ্ন করছেন, “কিছু কিছু শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যে প্রচার করেন, মানুষ যাকিছু দুঃখ বা সুখ অনুভব করে তা অতীত কর্মের ফল, তাঁদের এই মতবাদ সম্পর্কে প্রভু বুদ্ধের বক্তব্য কী ?” এর উত্তরে বুদ্ধ আয়ুর্বেদের “ত্রিদোষবাদ” ব্যবহার করে বলেন যে, কোনও ব্যক্তির শরীরে বায়ু, পিত্ত বা কফের অনিয়মের ফলে শারীরিক কষ্ট হলে সে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই কষ্টের কারণ জানতে পারে । কিন্তু অতীত কর্মের ফলে দুঃখ বা সুখ অনুভূত হয়, এই তত্ত্বকে এরকম অভিজ্ঞতা দিয়ে যাচাই করা যায় না । সুতরাং ঐসব শ্রমণ ও ব্রাহ্মণদের তত্ত্ব ভ্রান্ত ।

বুদ্ধের সঙ্গে নিগ্রন্থ অর্থাৎ জৈনদের কথোপকথনের একটি বর্ণনা পাওয়া যায় মজ্ঝিম নিকায়ের (101) দেবদহ সুত্তে । জৈনরা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেন । তাঁরা মনে করেন, মানুষ অতীত কর্মের কারণেই সুখ বা দুঃখ অনুভব করে । সুতরাং তপস্যা বা কৃচ্ছসাধনের দ্বারা অতীত কর্মের ক্ষয় করলে এবং নতুন কর্ম না করলে দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে । উল্লিখিত সুত্তে বুদ্ধ কয়েকজন নিগ্রন্থকে প্রশ্ন করেন যে, তাঁরা কি জানেন তাঁরা অতীতে জন্মেছিলেন কিনা ? উত্তরে নিগ্রন্থরা জানান যে, তাঁরা তা জানেন না । এরপর বুদ্ধ তাঁদের পরপর আরও কয়েকটি প্রশ্ন করেন । তাঁরা কি জানেন তাঁরা অতীতে কি কি খারাপ কর্ম করেছিলেন ? তাঁরা কি জানেন কৃচ্ছসাধনের ফলে তাঁদের দুঃখের কতটা নিরোধ হয়েছে আর কতটা বাকি আছে (যার জন্য আরও কৃচ্ছসাধনের প্রয়োজন) ? নিগ্রন্থরা সবগুলি প্রশ্নেরই নঞর্থক উত্তর দিলে বুদ্ধ বলেন যে, সেক্ষেত্রে তাঁদের মতবাদ ভিত্তিহীন । যদি তাঁরা সত্যিই জানতেন যে, তাঁরা অতীতে জন্মেছিলেন, অতীতে এই এই খারাপ কর্ম করেছিলেন এবং বর্তমান জীবনে কৃচ্ছসাধনের ফলে তাঁদের এতটা দুঃখের নিরোধ হয়েছে ও এতটা বাকি আছে, তবেই তাঁদের মত যুক্তিযুক্ত হত । এরপর বুদ্ধ একটি উপমার সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন । কোনও ব্যক্তি বিষাক্ত তীরের আঘাতে আহত হলে চিকিৎসক এসে তীরটি বের করে ওষুধ লাগিয়ে দেন । সুস্থ হওয়ার পর ওই ব্যক্তি মনে করতে পারে যে, সে পূর্বে তীরের আঘাতে কষ্ট পেয়েছিল এবং চিকিৎসার ফলে সেই কষ্টের নিরসন হয়েছে । সম্পূর্ণ ব্যাপারটি সে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে জানতে পারে । কিন্তু নিগ্রন্থদের বিশ্বাসের এরকম কোনও অভিজ্ঞতা-নির্ভর ভিত্তি নেই ।

সমস্যা 2 : পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা অনাত্মার তত্ত্বের বিরোধী

বাস্তব অভিজ্ঞতায় পুনর্জন্মের কোনও প্রমাণ না পাওয়া গেলেও মানুষ যে এটি বিশ্বাস করে তার কারণ কী ? এই প্রশ্নের উত্তর বৌদ্ধধর্মের মধ্যেই রয়েছে । মানুষ তার আমিত্বের প্রতি মোহের কারণে এটা কিছুতেই মানতে পারে না যে, মৃত্যুর পর তার এই প্রিয় “আমি”-টির আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না । তাই একপ্রকার আত্ম-সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সে আত্মা ও পুনর্জন্মের কল্পনা করেছে (ঠিক যেমন আত্ম-সুরক্ষার জন্য সে কল্পনা করেছে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের) । বৌদ্ধধর্ম অনুসারে এই আমিত্বের প্রতি মোহই মানুষের দুঃখের মূল কারণ । সেই কারণে বুদ্ধ অনাত্মার তত্ত্ব প্রচার করেছেন । সেদিক থেকে অনাত্মা ও পুনর্জন্ম একেবারে বিপরীতমুখী । যে ধর্মে অনাত্মাকে কেন্দ্রে স্থান দেওয়া হয়েছে, সেই ধর্মে পুনর্জন্ম থাকে কিভাবে ? যার আমিত্বের প্রতিই কোনও মোহ নেই, তার পুনর্জন্মের কল্পনারও কোনও প্রয়োজন নেই (ঠিক এই কারণে বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বরের কল্পনারও কোনও প্রয়োজন হয়নি) ।

সত্যি কথা বলতে কি, আমি কে, আমি কোথা হইতে আসিয়াছি বা আমি কোথায় যাইব ইত্যাদি যে প্রশ্নগুলি মানুষের মনে পুনর্জন্মের মতো কাল্পনিক ধারণার সৃষ্টি করে (এবং যে প্রশ্নগুলি আবার সাধারণত ধর্মজিজ্ঞাসুর মৌলিক প্রশ্ন রূপে বিবেচিত হয়), অনাত্মা-কেন্দ্রিক বৌদ্ধধর্মে সেই প্রশ্নগুলিরই কোনও স্থান নেই, উত্তর তো দূরের কথা । মজ্ঝিম নিকায়ের (2) সব্বাসব সুত্তে ধর্মে প্রশিক্ষণহীন সাধারণ মানুষের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা মূর্খের মতো চিন্তা করে, “আমি কি অতীতে ছিলাম ? থাকলে আমি কী ছিলাম বা কেমন ছিলাম ? অতীতে আমি কী থেকে কী হয়েছিলাম ? কিংবা আমি কি ভবিষ্যতে থাকব ? থাকলে আমি কী হব বা কেমন হব ? ভবিষ্যতে আমি কী থেকে কী হব ?” এরকম ব্যক্তি বর্তমান সম্পর্কেও বিভ্রান্ত থাকে : “আমি কী বা আমি কেমন ? আমি কোথা থেকে এসেছি ? আমি কোথায় যাব ?” এ তো গেল ধর্মে প্রশিক্ষণহীনদের কথা । ধর্মে প্রশিক্ষিতরা কি এরকম চিন্তা করে ? মজ্ঝিম নিকায়ের (38) মহাতনহাসঙ্খয় সুত্তে বুদ্ধ একদল ভিক্ষুকে ধর্মোপদেশ দেওয়ার পর তাঁদের প্রশ্ন করছেন, তাঁরা উপরের মতো ভাবেন কিনা এবং তাঁরা একসঙ্গে জানাচ্ছেন যে, তাঁরা এরকম ভাবেন না ।

সংযুত্ত নিকায়ের (22.85) যমক সুত্তে যমক নামে এক ভিক্ষুর মনে এরকম ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, কোনও ভিক্ষুর আসবের ক্ষয় হলে (আসব হল মনের কলুষতা, আসবের ক্ষয় হওয়ার অর্থ নির্বাণ লাভ করা) তাঁর দেহের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বিনাশ ঘটে এবং তাঁর আর কোনও অস্তিত্ব থাকে না । লক্ষণীয়, প্রচলিত বৌদ্ধধর্ম অনুসারে এটি মোটেই ভুল ধারণা নয় । যাইহোক, অন্যান্য ভিক্ষুরা যমকের এই ভুল সংশোধন করতে না পেরে বুদ্ধের প্রধান শিষ্য সারিপুত্তকে বিষয়টি জানালে তিনি যমকের ধারণার পরিবর্তন করতে সমর্থ হন । সারিপুত্ত মূলত অনাত্মার তত্ত্বকেই তাঁর যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন । তাঁর যুক্তি ছিল এরকম : যমক মৃত্যুর পর যে ভিক্ষুর অনস্তিত্বের কথা ভাবছেন, তাঁর কি মৃত্যুর আগেই কোনও অস্তিত্ব আছে ? জীবিত অবস্থাতেও তো ওই ভিক্ষু পরিবর্তনশীল পঞ্চস্কন্ধের সমষ্টি মাত্র এবং ওই স্কন্ধগুলির মধ্যে কোনটিকেই “ওই ভিক্ষু” বলে চিহ্নিত করা যায় না । সুতরাং মৃত্যুর আগেই যার কোনও অস্তিত্ব নেই, তার মৃত্যুর পরে কি হবে তা ভাবাটাই অনর্থক । সারিপুত্তের যুক্তি থেকে স্পষ্ট যে, অনাত্মাকে মানলে পুনর্জন্ম নিয়ে ভাবার কোনও প্রশ্নই আসে না ।

সমস্যা 3 : পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা মজ্ঝিম পন্থার বিরোধী

সকলেই জানেন, বৌদ্ধধর্মকে মজ্ঝিম পন্থা বা মধ্য পথের ধর্ম বলা হয় । এই নামকরণের যে কারণটি সাধারণত প্রচলিত সেটি হল এই যে, বৌদ্ধধর্ম অতিরিক্ত ভোগ এবং অতিরিক্ত কৃচ্ছসাধনা এই দুই চরম পথকে পরিহার করে মধ্যবর্তী পথ অনুসরণ করতে বলে । এই কারণটি হয়তো ভুল নয়, কিন্তু মজ্ঝিম পন্থা নামকরণের অন্য একটি কারণ আছে যা অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ । বৌদ্ধধর্ম হল তৎকালীন ভারতবর্ষে প্রচলিত দুটি চরম মত শাশ্বতবাদ ও উচ্ছেদবাদের মধ্যবর্তী । শাশ্বতবাদে মৃত্যুর পরে পুনর্জন্মকে স্বীকার করা হত এবং মানুষের সুখদুঃখের জন্য তার পূর্বজন্মের কর্মকে দায়ী করা হত । এই মত অনুসারে ভালো কাজের ভালো ফল এবং খারাপ কাজের খারাপ ফল হতে বাধ্য, এই জন্মে না হোক পরের জন্মে তা হবেই । এই মতের প্রচারক ছিলেন ব্রাহ্মণ ও জৈনরা । অন্যদিকে উচ্ছেদবাদীরা মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম মানতেন না । ফলে তাঁরা শাশ্বতবাদীদের মতো কোনও মহাজাগতিক ন্যায়বিচারকেও স্বীকার করতেন না । এঁদের কাছে রাজার বিচার ছাড়া নৈতিকতার আর কোনও ভিত্তি ছিল না । লোকায়ত বা চার্বাকপন্থীরা ছিলেন এই মতের প্রচারক । উচ্ছেদবাদীদের একালের nihilist-দের সঙ্গে তুলনা করা যায় । ধর্মপ্রচারের সময় বুদ্ধ খুব সযত্নে এই দুটি মতকেই পরিহার করেছিলেন । তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে যাচাই করার নীতির কারণে তাঁর পক্ষে ওই দুটি মতের কোনটিকেই গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না । বস্তুত তিনি কোনোদিন এমন কিছুই বলেন নি যাকে অভিজ্ঞতার নিরিখে যাচাই করা সম্ভব নয় । এই কারণে তিনি সরাসরি ঈশ্বর নেই একথা বলেন নি । তিনি শুধু বলেছেন, যদি কেউ নিজের অভিজ্ঞতায় ঈশ্বরকে খুঁজে পায় তবেই সে ঈশ্বর আছে বলে দাবি করতে পারে । তিনি ঈশ্বর আছে তাও বলেন না, আবার ঈশ্বর নেই তাও বলেন না । কিন্তু তাঁর ধর্মে তিনি ঈশ্বরকে কোনও স্থান দেননি । শাশ্বতবাদ ও উচ্ছেদবাদের বিতর্কেও (যা সেই সময়ের একটি “উষ্ণ বিতর্ক” ছিল) বুদ্ধ এইরকম অবস্থান নিয়েছিলেন । কেউ তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি হ্যাঁও বলতেন না, নাও বলতেন না । বৌদ্ধধর্মে এই সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি “অব্যক্ত” হিসেবে পরিচিত । মজ্ঝিম নিকায়ের (63) চুলমালুঙ্ক্য সুত্তে মালুঙ্ক্যপুত্ত নামে এক ভিক্ষু বুদ্ধের কাছে এই প্রশ্নগুলি করে বলেন যে, এগুলির উত্তর না পেলে তিনি ভিক্ষুত্ব ছেড়ে গৃহী জীবনে ফিরে যাবেন : জগত শাশ্বত নাকি অশাশ্বত, জগত সসীম নাকি অসীম, জীবাত্মা ও শরীর এক নাকি ভিন্ন, মৃত্যুর পরে তথাগতের (সাধারণত বুদ্ধকেই তথাগত বলা হত, তবে তথাগত বলতে মুক্তি লাভ করেছেন এমন যেকোনো ব্যক্তিকেও বোঝাতে পারে) পুনর্জন্ম হয় নাকি হয় না, নাকি একইসঙ্গে পুনর্জন্ম হয় এবং হয় না, নাকি পুনর্জন্ম হয় এটাও ঠিক নয় এবং পুনর্জন্ম হয় না এটাও ঠিক নয় ? বুদ্ধ উত্তরে মালুঙ্ক্যপুত্তকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি কখনও তাঁকে এই প্রতিশ্রুতি দেন নি যে, ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করলে তিনি এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেবেন । বুদ্ধ আরও বলেন যে, যদি কেউ স্থির করে, বুদ্ধ যতদিন না ওই বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করবেন ততদিন সে ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করবে না, তাহলে সেই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তার মৃত্যুকালও উপস্থিত হতে পারে কারণ তখনও বিষয়গুলি অব্যাখ্যাতই থাকবে ।

আমরা লক্ষ্য করতে পারি, উপরের প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার অর্থ হল শাশ্বতবাদ ও উচ্ছেদবাদের মধ্যে একটিকে গ্রহণ করা । শাশ্বতবাদ অনুসারে জগত শাশ্বত ও অসীম । তবেই তো প্রাণীরা চিরদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে জন্মানোর সুযোগ পাবে ! উচ্ছেদবাদ অনুসারে জগত অশাশ্বত ও সসীম । জীবাত্মা ও শরীরকে এক বলার অর্থ হল শরীরের বিনাশের সাথে সাথেই জীবের বিনাশ, অর্থাৎ উচ্ছেদবাদ । জীবাত্মা শরীরের থেকে ভিন্ন হলে শরীরের বিনাশের পরেও জীবের জন্মানোর সুযোগ থাকছে, অর্থাৎ শাশ্বতবাদ । একইভাবে শাশ্বতবাদ অনুসারে মৃত্যুর পর তথাগতের পুনর্জন্ম হবে, আর উচ্ছেদবাদ অনুসারে হবে না । শেষ দুটি প্রশ্ন সম্ভবত শাশ্বতবাদ ও উচ্ছেদবাদের কোনও জটিল সংমিশ্রণ ।

বুদ্ধ এই প্রশ্নগুলির উত্তর না দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি মৃত্যু-পরবর্তী বিষয়ে আদৌ আগ্রহী নন, তাঁর চিন্তার ক্ষেত্র হল মানুষের বর্তমান জীবন যার অস্তিত্ব নিয়ে কোনও তর্ক চলে না । সম্ভবত তাঁর এই অবস্থানটি পরিষ্কার করার জন্য তিনি এরপর মালুঙ্ক্যপুত্তকে একটি উপমা দেন । কোনও ব্যক্তি বিষাক্ত তীরের দ্বারা আহত হলে তার আত্মীয়েরা একজন শল্য চিকিৎসককে ডেকে আনে । এই অবস্থায় সেই ব্যক্তি নিশ্চয় চিকিৎসককে বলবে না যে, কে তীর ছুঁড়েছিল, তার জাতি-গোত্র কী, সে দেখতে কেমন, তার ধনুকটিই বা কেমন, তীরের গোড়ায় কোন পাখির পালক রয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর না পেলে সে তীরটি বের করতে দেবে না । এরকম করলে বিষের ক্রিয়ায় ওই ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটতে পারে কিন্তু সে ঐসব প্রশ্নের উত্তর পাবে না । ঠিক সেইরকম মানুষ মৃত্যু-পরবর্তী বিষয় নিয়ে ভাবলে তার বর্তমান জীবনের দুঃখের অবসান হবে না । বুদ্ধ হলেন সেই চিকিৎসক যার কাজ বর্তমান জীবনের দুঃখের নিরসন করার পথ বাতলে দেওয়া, মৃত্যুর পর কী হবে তা বলা নয় ।

তাহলে এই হল বুদ্ধের মজ্ঝিম পন্থার প্রকৃত তাৎপর্য । এখন প্রশ্ন, পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা কি এই মজ্ঝিম পন্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ? আমাদের দৃষ্টিতে তো তা ছদ্ম-শাশ্বতবাদ ছাড়া আর কিছু নয় ।

সমস্যা 4 : পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা এই জীবনে নির্বাণের বিরোধী

গৌতম বুদ্ধের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায় না । তবে যে সামান্য কিছু আলোচনা আছে, সেখানে একটা বিষয়ে সবাই একমত : বুদ্ধ ঊনত্রিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেছিলেন, পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে নির্বাণ লাভ করেছিলেন এবং আশি বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় । কোথাও একথা লেখা নেই যে, তিনি মৃত্যুর পর নির্বাণ লাভ করেছিলেন । প্রথম দিকের সমস্ত গ্রন্থে মৃত্যু বোঝাতে পরিনির্বাণ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে (বুদ্ধের মৃত্যুর ক্ষেত্রে মহাপরিনির্বাণ) । নির্বাণ ও পরিনির্বাণ স্পষ্টতই ভিন্ন যদিও পরবর্তীকালে অনেক সময় পরিনির্বাণকে নির্বাণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার একটা প্রবণতা চোখে পড়ে । এছাড়া অন্যান্য বহু ভিক্ষুর সম্পর্কেও বলা হয়েছে যে, তাঁরা মৃত্যুর আগেই নির্বাণ লাভ করে অর্হত হয়েছিলেন । সুত্ত পিটকের অসংখ্য স্থানে আমরা বুদ্ধের মুখে শুনি যে, তাঁর ধর্মের চূড়ান্ত ফল এই জীবনেই পাওয়া যায়, মৃত্যুর পরে নয় ।

এই বিষয়টিতেও পুনর্জন্মের প্রচলিত ব্যাখ্যা সমস্যার মুখে পড়ে । এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী নির্বাণ ও দৈহিক মৃত্যু একসঙ্গে ঘটা উচিত । নির্বাণ লাভের পর কারও পক্ষে জীবিত থাকা সম্ভব নয় । অর্থাৎ এই তত্ত্ব অনুসারে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই বুদ্ধের মৃত্যু হয়ে যাওয়া উচিত ছিল । কিন্তু ঘটনা হল, বুদ্ধ আরও পঁয়তাল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন ।

তাছাড়া প্রতীত্য-সমুৎপাদকে তিন জন্ম জুড়ে ব্যাখ্যা করার ফলে কেউ যে বর্তমান জীবনের শেষেই নির্বাণ লাভ করতে পারবে, তেমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যাচ্ছে না । সেটা নির্ভর করছে সে প্রথম, দ্বিতীয় না তৃতীয় কোন জন্মে আছে তার উপর । যদি কেউ প্রথম জন্মে থাকে, তাহলে অবিদ্যা ও সংস্কারের নিরসন করে সে এই জন্মের শেষেই নির্বাণ লাভ করতে পারে । কিন্তু কেউ দ্বিতীয় বা তৃতীয় জন্মে থাকলে তার প্রথম জন্মের অবিদ্যা ও সংস্কারের জন্য প্রতীত্য-সমুৎপাদের বর্তমান চক্রটি চলতে থাকবে এবং নির্বাণ লাভের জন্য তাকে পরবর্তী প্রথম জন্মের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ।

প্রসঙ্গত, প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রটি তিন জন্ম জুড়ে ক্রিয়া করলে তিনবার জন্ম ও তিনবার মৃত্যুর উল্লেখ থাকার কথা । কিন্তু চক্রটিতে একবার করেই জন্ম ও মৃত্যুর উল্লেখ আছে ।

 

6. পুনর্জন্মের বিকল্প ব্যাখ্যা : এই জীবনেই পুনর্জন্ম

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, পুনর্জন্মকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে তাকে বৌদ্ধধর্মের সামগ্রিক মেজাজের সঙ্গে মেলানো কঠিন । তৃতীয় পরিচ্ছেদে রিচার্ড গমব্রিচ উল্লিখিত বৌদ্ধধর্মের বিকৃতির যেদুটি কারণ আমরা দেখেছি, তার মধ্যে দ্বিতীয়টি হল সমস্ত ধারণাকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার প্রবণতা । পুনর্জন্মকে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে মেলাতে হলে তাকে আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে অন্য কোনও উপায়ে ব্যাখ্যা করতে হবে । তার জন্য পুনর্জন্ম সংক্রান্ত কিছু কিছু বিষয়কে আমাদের একটু অন্যভাবে বুঝতে হবে ।

আমরা শুরু করব নাম ও রূপ এই দুটি বিষয় দিয়ে । এই দুটি বিষয়কে আমরা একসঙ্গে পেয়েছি প্রতীত্য-সমুৎপাদের চতুর্থ নিদান হিসেবে এবং কেবল রূপকে পেয়েছি পঞ্চস্কন্ধের প্রথম স্কন্ধ হিসেবে । প্রচলিত বৌদ্ধধর্মে রূপ বলতে বোঝানো হয় আমাদের জড় দেহকে । নামরূপকে ব্যাখ্যা করার সময় বলা হয়, নাম হল পঞ্চস্কন্ধের বাকি চারটি স্কন্ধ, অর্থাৎ বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানের সমষ্টি । এই চারটি স্কন্ধ মানুষের মানসিক দিককে প্রকাশ করে যেমন রূপ প্রকাশ করে দৈহিক দিককে । ফলে নামরূপ বলতে বোঝায় মানুষের সামগ্রিক সত্তাকে, যার মধ্যে নাম হল মন ও রূপ দেহ । অথচ প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রটি ব্যাখ্যা করার সময় নামরূপের এই সংজ্ঞাকে সামান্য পরিবর্তিত করে বলা হয়, বিজ্ঞান নামের অংশ নয় । নাম হল কেবল বেদনা, সংজ্ঞা ও সংস্কারের সমষ্টি । এইভাবে বিজ্ঞানকে নাম থেকে বাদ দেওয়ার ফলে নামরূপের যে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যাটি উপরে দেওয়া হল, তার হানি ঘটে । প্রচলিত ব্যাখ্যাকাররা এই অসঙ্গতি ঘটাতে বাধ্য হন কারণ প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রে নামরূপের ঠিক আগেই বিজ্ঞান আছে । একই জন্মে দুবার বিজ্ঞানের সৃষ্টি হতে পারে না (প্রচলিত মতে বিজ্ঞান থেকে ভব পর্যন্ত একটি জন্ম) । কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা হয় কি ? প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রে একটু পরেই আমরা পাই বেদনাকে যা ওই একই জন্মের অন্তর্গত । তাহলে হিসেবমত বেদনাকেও নামের অংশ বলা চলে না । প্রচলিত ব্যাখ্যাকাররা বোধহয় এই ব্যাপারটা ভেবে দেখেন নি ।

এই প্রসঙ্গে রিচার্ড গমব্রিচের উল্লিখিত বৌদ্ধধর্মের সম্ভাব্য বিকৃতির প্রথম কারণটি বিবেচনা করা যাক । বুদ্ধের মতবাদকে সমসাময়িক ব্রাহ্মণ্যধর্মের মতবাদের পরিপ্রক্ষিতে বিচার করলে অনেক সময় আমরা বুদ্ধের প্রকৃত বক্তব্যকে সহজে বুঝতে পারি । গমব্রিচের ছাত্রী সিউ হ্যামিলটন তাঁর “Identity and Experience” (যা গমব্রিচের তত্ত্বাবধানে করা তাঁর গবেষণা-সন্দর্ভের পুস্তকাকার) বইতে দেখিয়েছেন, উপনিষদ ও অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যে নাম ও রূপকে কখনোই মন ও দেহ হিসেবে ধরা হয় নি । সেখানে বরং এই দুটি শব্দকে তাদের আক্ষরিক অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে : নাম হল কোনকিছুর ধারণাগত পরিচয় এবং রূপ হল তার দৃষ্টিগ্রাহ্য আকার । এরপর হ্যামিলটন সুত্ত পিটকের কিছু কিছু অংশ উল্লেখ করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, বুদ্ধও সম্ভবত নাম ও রূপকে আক্ষরিক অর্থেই বুঝতেন । নাম ও রূপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা একে অপরের পরিপূরক । নাম রূপকে একটি ধারণাগত বা বিমূর্ত অভিব্যক্তি দেয় এবং বিপরীতক্রমে রূপ নামকে একটি দৃশ্যগত বা মূর্ত অভিব্যক্তি দেয় । পরবর্তীকালে বৌদ্ধরা উপনিষদের পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাওয়ার ফলে এই দুটি ধারণার অন্যরকম অর্থ করতে শুরু করেন । হ্যামিলটন এটাও উল্লেখ করেছেন যে, নাম ও রূপকে উপনিষদের অর্থে গ্রহণ করলেই আমরা প্রতীত্য-সমুৎপাদের সূত্রটিকে অধিকতর যুক্তিগ্রাহ্য ভাবে বুঝতে পারি ।

রূপ বলতে যে দেহ বোঝাতে পারে না, তা আমরা অন্যভাবেও বুঝতে পারি । রূপ হল পঞ্চস্কন্ধের একটি স্কন্ধ । এখন বুদ্ধ এই পঞ্চস্কন্ধের তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছিলেন মূলত ব্রাহ্মণ্যধর্মের আত্মার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য । তাঁর যুক্তি ছিল এরকম : রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানের কোনটিই স্বতন্ত্র, অপরিবর্তনীয় ও “আমার” নয় । অথচ আত্মার সংজ্ঞা অনুযায়ী এই বৈশিষ্ট্যগুলি না থাকলে কোনকিছুকে আত্মা বলে দাবি করা যায় না । সুতরাং পঞ্চস্কন্ধের কোনটিকেই আত্মা বলা যায় না । আমরা জানি, ব্রাহ্মণ (ও জৈনরা) আত্মা বলতে কখনোই দেহকে বুঝতেন না, দেহাতিরিক্ত কোনও সত্তাকে বুঝতেন । সুতরাং রূপ বলতে যদি দেহকে বোঝানো হয়, তাহলে “রূপ আত্মা নয়” এই যুক্তির কোনও অর্থ হয় না । এরকম যুক্তি দিলে আত্মার সমর্থকরা নিশ্চয় বুদ্ধকে বলতেন, “আমরা তো দেহকে আত্মা ভাবিই না । কাজেই দেহ আত্মা নয় বলে আপনি নতুন কি বলছেন ?” সুত্ত পিটকে আত্মার সমর্থকদের এরকম কোনও উক্তি পাওয়া যায় না । বরং দেখা যায় যে, আত্মার সমর্থকরা রূপকেও আত্মা বলে দাবি করছেন (যদিও বুদ্ধ পরে সেই দাবিকে খণ্ডন করছেন) । মজ্ঝিম নিকায়ের (35) চুলসচ্চক সুত্তে সচ্চক (সত্যক) নামে একজন জৈন বুদ্ধের সঙ্গে তর্ক করতে গিয়ে এরকম দাবি করেছিলেন ।

তাছাড়া বৌদ্ধধর্মে দেহ বোঝানোর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিভাষা ছিল : কায়া । যেসব ক্ষেত্রে স্পষ্ট করে দেহের প্রসঙ্গ এসেছে, সেখানে কায়া শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে, রূপ নয় । আমরা কায়া ও রূপের পার্থক্য এইভাবে বুঝতে পারি : কায়া হল মানুষের জড় দেহ এবং রূপ হল সেই জড় দেহের বাহ্যিক, দৃষ্টিগ্রাহ্য আকার । কায়ার ভিত্তির উপর রূপের প্রতিষ্ঠা । মানুষ আনন্দে থাকলে তার একরকম রূপ হয়, দুঃখে থাকলে আরেকরকম, আবার রেগে গেলে আরেকরকম । এই সবরকম রূপই কিন্তু তার জড় দেহ বা কায়ার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে । পঞ্চস্কন্ধের দৈহিক দিকের মধ্যে এই রূপকেই রাখা হয়েছে, কায়াকে নয় ।

পঞ্চস্কন্ধের দৈহিক দিককে এইভাবে ভাবলে তা মানসিক দিকের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ হয় । পঞ্চস্কন্ধের মানসিক দিক হল বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান । এখন এই চারটি বিষয়ের কোনটিই কিন্তু মানুষের “মন” নয়, এগুলি মনের ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা কিছু বিষয় । এখানে আমরা “মন” বলতে মানুষের মনের শূন্য আধারটিকে বোঝাচ্ছি । একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে । ধরা যাক, একজন মানুষ স্বপ্নহীন, গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন । এই অবস্থায় তার বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার বা বিজ্ঞান কোনটিরই অস্তিত্ব নেই । তাহলে কি আমরা বলব যে, ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের মনের অস্তিত্ব থাকে না ? মনের শূন্য পাত্রটা থাকে, কিন্তু তার মধ্যে কোনও অনুভূতি থাকে না । বৌদ্ধধর্মে এই শূন্য মনের জন্য একটা পরিভাষা আছে : চিত্ত । চিত্ত হল সেই আধার যার উপর ভিত্তি করে বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানের অস্তিত্ব । চিত্ত কিন্তু পঞ্চস্কন্ধের অংশ নয় । স্পষ্টতই, আমরা পঞ্চস্কন্ধের দৈহিক দিকের ক্ষেত্রে কায়াকে যে স্থান দিয়েছি, মানসিক দিকের ক্ষেত্রে চিত্তের স্থান তাই । এইভাবে ভাবলে আমরা পঞ্চস্কন্ধের একটা সুষম চিত্র পাই । একজন মানুষের দুটি দিক : দৈহিক ও মানসিক । দৈহিক দিকের আধার কায়া, মানসিক দিকের আধার চিত্ত । কায়ার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে রূপ । আর চিত্তের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান । এই রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞানকেই একসঙ্গে বলি পঞ্চস্কন্ধ ।

নাম ও রূপকে নতুনভাবে বুঝে নেওয়ার পর এবার আমরা প্রতীত্য-সমুৎপাদের সূত্রটিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে পারি । এযুগে থাইল্যান্ডের দুজন প্রখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষু বুদ্ধদাস ভিক্ষু এবং প্রায়ুধ পায়ুত্তো প্রতীত্য-সমুৎপাদের একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দিয়েছেন । এঁদের মতে প্রতীত্য-সমুৎপাদ আমাদের মনের মধ্যে আমিত্বের ধারণার উৎপত্তি ও বিনাশকে বর্ণনা করে । যদিও বৌদ্ধধর্ম অনুসারে আমাদের মধ্যে কোনও স্বতন্ত্র “আমি”-র অস্তিত্ব নেই, কিন্তু আমরা নিজেদের অজ্ঞতা বশত প্রতিনিয়ত এরকম একটি “আমি”-র মিথ্যে ধারণার জন্ম দিচ্ছি এবং নিজেদের দুঃখের কারণ হচ্ছি । অজ্ঞতা দূর করতে পারলেই এই মিথ্যে আমিত্বের ধারণার আর জন্ম হবে না এবং আমরা দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে নির্বাণ লাভ করব । এই হল বৌদ্ধধর্মের পুনর্জন্মের প্রকৃত অর্থ । বলা বাহুল্য, পুনর্জন্মের এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক । এখানে আক্ষরিক অর্থে মানুষের মৃত্যুর পর পুনরায় জন্মের কথা বলা হচ্ছে না, মৃত্যুর আগেই মানুষের মনে একটি ধারণার জন্মের কথা বলা হচ্ছে ।

এবার এই নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রটিকে বিস্তারিত ভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক ।

অবিদ্যা থেকে সংস্কার : আমরা সাধারণভাবে জীবন ও জগতকে যে দৃষ্টিতে দেখি তা ভুল । আমাদের দৃষ্টি আমাদের আমিত্বের ধারণা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে, আমাদের ভেতরে একটি স্বতন্ত্র, অপরিবর্তনীয় “আমি”-র অস্তিত্ব আছে । এই ভ্রান্ত বিশ্বাসই হল আমাদের অবিদ্যা বা অজ্ঞতা । এই অজ্ঞতা থেকে আমরা কিছু কিছু স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কর্ম করি যেগুলি আমাদের অভ্যাস বা সংস্কার হয়ে যায় । আমরা যেহেতু মনের ভেতরের গতিবিধি নিয়ে কখনও গভীরভাবে ভাবি না, তাই আমরা জানতেও পারি না যে, আমরা যা করছি তা আসলে আমিত্বের মিথ্যে বিশ্বাস থেকে করছি ।

সংস্কার থেকে বিজ্ঞান : এবার আমাদের এই সংস্কারগুলিই ঠিক করে দেয় আমাদের বিজ্ঞান বা চেতনাগুলি কিভাবে কাজ করবে । একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে আমরা কি দেখব বা শুনব তা নির্ভর করছে আমরা কি দেখতে বা শুনতে চাইছি তার উপর । আবার আমরা কোন পরিবেশে থাকব তাও অনেকটা আমাদের ইচ্ছের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় । উদাহরণের দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট হবে । আমরা যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে কোনও বই পড়ি, তখন আশেপাশের শব্দ শুনতে পাই না । শুনতে পাই না, তার কারণ এই নয় যে, আমাদের কর্ণেন্দ্রিয় খারাপ হয়ে যায় । শুনতে পাই না কারণ ওই সময় আমাদের কর্ণ-বিজ্ঞান নিষ্ক্রিয় থাকে । একইভাবে আমরা তন্ময় হয়ে গান শোনার সময় সামনের দৃশ্যও দেখতে পাই না কারণ চক্ষু-বিজ্ঞান কাজ করে না । এই দুটি উদাহরণে আমরা দেখলাম, নির্দিষ্ট পরিবেশে সংস্কার কিভাবে আমাদের বিজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করে । আবার সংস্কার আমাদের পরিবেশকেও ঠিক করে দিতে পারে । যে বই পড়তে ভালোবাসে, সে গ্রন্থাগারে বেশি সময় কাটাবে । আবার যে গান শুনতে ভালোবাসে, গানের জলসায় তাকে বেশি পাওয়া যাবে ।

বিজ্ঞান থেকে নামরূপ : কোনও নির্দিষ্ট মুহূর্তে আমাদের কোন বিজ্ঞানগুলি কতটা সক্রিয় আছে, তার উপর আমাদের নাম ও রূপ নির্ভর করে । আমরা যখন বই পড়ি, তখন নিজেকে একজন পাঠক হিসেবে ভাবি এবং গান শোনার সময় ভাবি, আমি একজন শ্রোতা । এইভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের একটা নাম তৈরি হয়ে যায় । একইভাবে আমাদের রূপও অবস্থা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয় । বই পড়া আর গান শোনার সময় নিশ্চয় আমাদের দেহের আকার-আকৃতি একরকম থাকে না ।

নামরূপ থেকে ষড়ায়তন : বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে যেমন আমাদের নামরূপ পরিবর্তিত হয়েছিল, তেমনি এবার এই পরিবর্তিত নামরূপই ঠিক করে দেয়, আমাদের কোন ইন্দ্রিয়গুলি কতটা সক্রিয় থাকবে । আগের দুটি উদাহরণের জের টেনে বলা যায়, বই পড়ার সময় আমাদের চোখ সক্রিয় হয় এবং গান শোনার সময় কান সক্রিয় হয় ।

ষড়ায়তন থেকে স্পর্শ : আমাদের ছয়টি ইন্দ্রিয় যেমন যেমন সক্রিয় হয়, তেমনিভাবেই বাইরের ও ভেতরের বস্তুর সঙ্গে তাদের স্পর্শ বা সংযোগ ঘটে । এইভাবে চোখের সঙ্গে দৃশ্য বস্তুর, কানের সঙ্গে শব্দের, নাকের সঙ্গে গন্ধের, জিভের সঙ্গে স্বাদের, ত্বকের সঙ্গে স্পর্শযোগ্য বস্তুর এবং মনের সঙ্গে চিন্তার সংযোগ ঘটে ।

স্পর্শ থেকে বেদনা : স্পর্শ হলেই আমাদের মধ্যে তিন প্রকার বেদনা বা অনুভূতির একটি সৃষ্টি হয় – সুখ, দুঃখ ও উপেক্ষা (না-সুখ না-দুঃখ) ।

বেদনা থেকে তৃষ্ণা : আমরা স্বাভাবিকভাবেই সুখের প্রতি আকৃষ্ট হই, দুঃখের প্রতি বিকর্ষণ অনুভব করি এবং উপেক্ষা আমাদের কাছে একঘেঁয়ে লাগে । এই তিন প্রকার প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় তৃষ্ণা বা আকাঙ্ক্ষা ।

তৃষ্ণা থেকে উপাদান : তৃষ্ণা শক্তিশালী হয়ে একসময় উপাদান বা আসক্তিতে পরিণত হয় । আমরা পছন্দের ব্যক্তি বা বস্তুকে আঁকড়ে ধরতে চাই এবং অপছন্দের ব্যক্তি বা বস্তুর থেকে দূরে পালাতে চাই ।

উপাদান থেকে ভব : এই উপাদান বা আসক্তিগুলি একসময় আমাদের এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে তোলে যে, এগুলি তখন আমাদের স্বভাবের বৈশিষ্ট্য হয়ে যায় । অন্যভাবে বলতে গেলে, এগুলিই আমরা হয়ে যাই । একে বলা হয় ভব । এটি হল আমিত্বের ধারণার জন্মের প্রথম ধাপ ।

ভব থেকে জাতি : আমিত্বের ধারণা যখন সম্পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তাকে বলা হয় জাতি বা জন্ম ।

জাতি থেকে জরামরণ : আমিত্বের ধারণা সম্পূর্ণরূপে তৈরি হওয়ার পরেই আসে সেই ধারণাকে রক্ষা করার চাপ । বাইরের জগত প্রতিনিয়ত আমাদের আমিত্বকে আঘাত করে । ফলে আমরা দুঃখ, বিরক্তি, হতাশা, রাগ, অবসাদ ইত্যাদি অনুভব করি । আবার এইসব আঘাতের ফলে আমাদের আমিত্বের ধারণাও দুর্বল হতে থাকে এবং একসময় তা ধ্বংস হয়ে যায় । এই ঘটনাকে মানুষের শরীরের পরিণতির সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে জরামরণ ।

প্রতীত্য-সমুৎপাদের চক্রটি এখানেই শেষ হয় ঠিকই, কিন্তু আমাদের মধ্যে যতক্ষণ না অবিদ্যার সম্পূর্ণ নিরসন হচ্ছে, ততক্ষণ একের পর এক চক্র চলতেই থাকে এবং আমরা একের পর এক আমিত্বের মিথ্যে মূর্তি গড়ে তুলতে থাকি । পরিবেশের আঘাতে মূর্তি ভাঙে, আমরা কষ্ট পাই, আবার নতুন মূর্তি গড়ে তুলি । এই হল সাধারণভাবে আমাদের জীবন ! এই দুঃখের চক্র থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল সম্যক চেষ্টার দ্বারা চক্রের মূল কারণ অবিদ্যাকে সমূলে উৎপাটিত করা ।

 

7. উপসংহার : যুক্তিবাদীর ধর্ম বৌদ্ধধর্ম

প্রবন্ধের শুরুতে আমরা দেখেছিলাম, যুক্তিবাদের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মকে মেলানোর ক্ষেত্রে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বাধা হল পুনর্জন্মের ধারণা । সেই কারণেই এতক্ষণ এই ধারণাটিকে নতুন আলোকে বিচার করার চেষ্টা করা হল । এই দীর্ঘ আলোচনার সারসংক্ষেপ হিসেবে নিচের বিবৃতিগুলি করা যেতে পারে :

প্রথমত, বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস থেকে একথা বলা যায় যে, বর্তমানে প্রচলিত বৌদ্ধধর্মের সমস্ত ধারণাই স্বয়ং বুদ্ধের দ্বারা প্রচারিত, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই ।

দ্বিতীয়ত, পুনর্জন্মের প্রচলিত তত্ত্ব অর্থাৎ দৈহিক মৃত্যুর পর পুনর্জন্মের ধারণাকে বুদ্ধের দ্বারা প্রচারিত ভাবলে আমরা বেশ কিছু গুরুতর অসঙ্গতির সম্মুখীন হই যেগুলির কোনও উত্তর পাওয়া যায় না ।

তৃতীয়ত, পুনর্জন্ম বলতে আমরা যদি এই জীবনেই আমাদের মনের মধ্যে ভ্রান্ত আমিত্বের ধারণার পুনর্জন্ম বুঝি, তাহলে পূর্বোক্ত অসঙ্গতিগুলি আর থাকে না ।

এই বিবৃতিগুলি থেকে আমরা একটিই স্বাভাবিক যৌক্তিক সিদ্ধান্ত টানতে পারি : প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধধর্মে পুনর্জন্ম বলতে মনের মধ্যে আমিত্বের ধারণার পুনর্জন্মই বোঝাত । বুদ্ধ নিজে এই অর্থেই পুনর্জন্মের তত্ত্ব প্রচার করেন । পরবর্তীতে এই তত্ত্ব বিকৃত হয়ে মৃত্যুর পর পুনর্জন্মের তত্ত্বে পরিণত হয় ।

এবং এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের যুক্তিবাদী হওয়ার ক্ষেত্রে যে একটিমাত্র বাধা ছিল, তাও অপসৃত হয়ে যায় । আমরা আগেই দেখেছিলাম, বৌদ্ধধর্ম সাধারণভাবে অন্ধবিশ্বাসকে সমর্থন করে না এবং এই ধর্মে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরেরও কোনও স্থান নেই । এখন আমরা বলতে পারি, বৌদ্ধধর্মে মৃত্যু-পরবর্তী জগতে বিশ্বাস করারও কোনও প্রয়োজন নেই । একজন যুক্তিবাদী এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারেন ? ধর্ম মানেই অযৌক্তিক বিশ্বাসের কারখানা, এই পূর্ব ধারণাকে বর্জন করে যুক্তিবাদী ব্যক্তিরা এই নতুন আলোয় বৌদ্ধধর্মকে দেখার চেষ্টা করতে পারেন । তাতে হয়তো তাঁরা এক নতুন জীবনদর্শনের সন্ধান পেতে পারেন, “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী”-তে যে জীবনদর্শন আমাদের খুব বেশি করে প্রয়োজন ।

 

তথ্যসূত্র :

Edward Conze, Buddhism : A Short History, Oneworld, Oxford, 2008
A. K. Warder, Indian Buddhism, Motilal Banarsidass, Delhi, 2004
Richard Gombrich, How Buddhism Began : The conditioned genesis of the early teachings, Routledge, 2006
Richard Gombrich, What the Buddha Thought, Equinox, 2009
Walpola Rahula, What the Buddha Taught, Grove Press, New York, 1974
Rupert Gethin, The Foundations of Buddhism, Oxford University Press, 1998
Maurice Walshe, The Long Discourses of the Buddha, A Translation of the Digha Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 1995
Bhikkhu Nanamoli & Bhikkhu Bodhi, The Middle Length Discourses of the Buddha, A Translation of the Majjhima Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 2009
Bhikkhu Bodhi, The Connected Discourses of the Buddha, A Translation of the Samyutta Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 2000
Bhikkhu Bodhi, The Numerical Discourses of the Buddha, A Translation of the Anguttara Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 2012
Sue Hamilton, Identity and Experience : The Constitution of the Human Being According to Early Buddhism, Luzac Oriental, London, 1996
Buddhadasa Bhikkhu, Paticcasamuppada : Practical Dependent Origination
P. A. Payutto, Dependent Origination : The Buddhist Law of Conditionality, Buddhadhamma Foundation, Bangkok, 1994

বৌদ্ধধর্ম, যুক্তিবাদ ও পুনর্জন্ম
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments