মধুপুরে গণ্ডগোল

 

বেড়াতে এসে যে এমন বিপদে পড়তে হবে তা ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি।

তাহলে ব্যাপারটা গোড়া থেকেই খুলে বলি। অজয়, অমল ও অতনু তিন ভাই। তারা ঠিক করেছিল এবারে পুজোয় তারা মধুপুরে বেড়াতে যাবে। বেড়াতে এসে ওরা এক জায়গায় পিকনিক করতে যায়। সেখানে তারা একটা প্যাকেট খুঁজে পায় যাতে বড় করে লেখা ‘আ’। তারা সেই প্যাকেটটাকে পুলিশের হাতে জমা করে দিল। পুলিশ অফিসার বললেন, “কালকে প্যাকেটটা খুলে দেখব।” অতনু বলল, “আমাদের বলবেন কি আছে?”

– “তাতে তোমাদের কি দরকার হে ছোকরা? যাও ভাগ। বেশী কৌতূহল ভাল নয়। যাও।”

ওরা বেরিয়ে এল। এইখানে ঘটনা শেষ। ওরা থানা থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে এল। হঠাৎ অমল বলল, “বুঝেছি প্যাকেটের মধ্যে কি আছে। আফিম।”

– “কি ভাবে বুঝলি?”, অতনুর জিজ্ঞাসা। “ও হ্যাঁ, বুঝেছি।” পরক্ষণেই সামলে নেয় অতনু।

অজয় বলল, “এখন আর ওসব ভেবে কাজ নেই। জানিস বাবুর্চি আজ কি রেধেছে? বিরিয়ানি আর মাংস কষা।”

আচ্ছা এবার একটু পরিচয় হয়ে যাক। আগেই বলেছি অজয়, অতনু ও অমল তিন ভাই। সবচেয়ে বড় অতনু এবং ছোট অমল। মাঝে কে বলার দরকার নেই। অতনু পড়াশোনায় ভাল। বুদ্ধিও প্রখর। অমল ভাল ছবি আঁকে। আর অজয় খেলাধূলা ও পড়াশোনায় দুটিতেই ভাল। বলা যায় অলরাউন্ডার। আর আমি ওদের ছোট মামা। লেখক। আমি ওদের মুখে এই গল্প শুনে লিখছি। অতনু গোয়েন্দা গল্পের পোকা। তাই ওর ইচ্ছা বড় হয়ে ফেলুদার মত গোয়েন্দা হওয়ার। কিন্তু ছোট বলে কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। স্কুলের ছেলেরা তাদের বলে “থ্রী মাসকেটিয়ার্স”। বোঝাই যায় অজয় একটু খাদ্য রসিক। অমল বুদ্ধি রাখে। যাই হোক মনে হচ্ছে পরিচয় দিতে দিতেই গল্প শেষ করে দেব। তা নয় এখনই শেষ করছি। তার আগে বলে নেই ওদের মা অর্থাৎ আমার দিদি গত বছর গত হয়েছেন। 

মাংস ও বিরিয়ানি গলাধঃকরণ করে ওরা ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন ভোরের দিকে হঠাৎ অতনুর ঘুম ভেঙ্গে গেল। যেন একটা ঢিল তার গায়ে কেউ ছুড়ে মাড়ল। তার সন্দেহ নির্ভুল। তার পাশে একটা ঢিল কাগজে পেঁচানো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কাগজটা খুলে সে দেখে একটা চীরকূট। চীরকূটটা পড়তে পড়তে তার ভুরু কুঁচকে গেল। তারপর অমল এবং অজয়কে ডাকল। ওরা উঠে সবকথা শুনে দারুণ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। অজয় বল্ল, “অমল তুই চিঠিটা পড়ে শোনা।” অমল পড়তে লাগল –

খোকারা,

তোমরা মনে হয় পিকনিক করতে গিয়ে একটা প্যাকেট পেয়েছ যাতে লেখা ‘আ’। শোনো সেটা যেখান থেকে পেয়েছ সেখানেই রেখে আসবে। তিন দিনের মধ্যে।

ইতি,

তোমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী।

 

পড়া শেষ করে অমল জিজ্ঞেস করল, “এখন আমাদের কর্তব্য কি?” অতনু বল্ল, “দুরবীন।”

– “মানে?”

– “মানে হইতেছে দুরবীন চোখে লাগিয়ে বসে থাকা।”

তারপর তাদের কিছুক্ষণ আলাপ চলল। শেষে অতনু বল্ল, “এখন ঘুমিয়ে পড়”।

দ্বিতীয় বার ঘুমের পাট সেরে ব্রেকফার্স্ট করে অতনু থানাতে গেল। তার সঙ্গে সেই চিঠিটা। আর অজয় দুরবীন চোখে লাগিয়ে বসে রইল। আর অমল ঝোপের ধারে লুকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর অমল একটা জিনিষ ছুড়ে দিল অজয়কে। সেটা একটা চিঠি। তাতে লেখা একজন লোককে দেখা যাচ্ছে। অজয়ের পড়া শেষ হতেই সে নেমে এল। তারপর দুজনে কিছু দূর গিয়ে একটা বাড়িতে চিহ্ন দিয়ে ফিরে এল। তারপর কিছুক্ষণ পরে অতনু এল। তারপরে তিনজনে কিছু কথা বলল। তারপর তারা খেয়ে রেস্ট নিয়ে অতনু আবার গেল থানায় আর অজয় ও অমল সেই বাড়িটার দিকে নজর রাখল। অজয় ছিল জালনার একটু দূরে। সে দেখল টেলিফোন হঠাৎ বেজে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পাশের টেলিফোন বুথে গিয়ে জিজ্ঞেস করল কে ফোনটা করেছে। ওপার থেকে বলল, “শিব প্রসাদ দুলাল।” তারপর সে জানতে চাইল লোকটা কি বলেছে। ওপার থেকে গলা ভেসে এল, “বলেছে শিয়ালদায় জয় মুখাজীর বাড়ি কাল রাত নটায় জরুরী মিটিং। সবাই যেন আসে।”

 অজয় যেন হাতে স্বর্গ পেল। বাড়িটার কাছে এসে সে দেখে অমল নেই। খানিক খোঁজাখুজির পর সে ভাবল ও হয়ত বাংলোয় ফিরে গেছে। কিন্তু সে আসাও বিফল হল। অমল বাংলোতেও নেই। বরং সে বাংলোয় এসে ইটে চাপা দেওয়া একটা চিঠি পেল। তাতে লেখা –

খোকারা,

যদি তোমরা তোমাদের প্রাণের ভাই অমলকে ফিরে পেতে চাও তবে কাল সকালে ভোরের ট্রেনে কলকাতাতেই ফিরে যাও। তোমাদের ভাইও কাল কলকাতা পৌছে যাবে।

যাবার সময় প্যাকেটটাও ফিরিয়ে দিও।

ইতি,

শুভাকাঙ্ক্ষী (আগে ছিলাম)।

এরপর অমলের লেখা –

বড়দা ও ছোড়দা,

তোরা আমার জন্য চিন্তা করিস না। আমি ভালই আছি।

ইতি,

অমল।

হঠাৎ অজয় কাগজটাকে আলোর সামনে নিয়ে গেল। তাতে দেখা গেল আরও কয়েকটি বাক্য। যথা –

ওদের কথা শুনে আমি বুঝতে পেরেছি কাল রাত নটায় আমাকে এখানে রেখে ওরা শিয়ালদায় জয় মুখার্জীর বাড়ি মিটিং করবে।

ইতি,

অমল।

এবার অতীতে ফিরে যাই। অজয় যখন টেলিফোন বুথে গেল তখন অমল অজয়ের পেছন পেছন যেতে গিয়ে ধরা পড়ল। তারপর তাকে এক বিরাট হলঘরে নিয়ে যাওয়া হল। তখনই সে শুনতে পায় জয়ের বাড়ি মিটিং-এর কথা। যাই হোক ওরা চিঠি লিখে অমলকে ঐ কাগজ ও কলম দিয়ে একটা ঘরে ঢুকিয়ে বলল, “এইখানে চিঠি লিখে দিবি। অন্যরকম কিছু দেখলে আমরাও ছেড়ে কথা বলব না কিন্তু।” তখন অমল ঐ চিঠি লেখে। তারপর কিভাবে ও অন্য কথা লিখে দিল তা পড়ে বললেই চলবে।

এইবার আবার বর্তমানে ফিরে আসি। অমল চিঠি লিখে ঘরটি ঘুরে দেখতে লাগল। ঘরের বর্ণনাটা এই – মাঝারি মাপের ঘর। কোনও জানলা নেই। পূবদিকে বোধহয় একটা জানলা ছিল সেটা বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরে কেবলমাত্র একটি দরজা দক্ষিণ দিকে ও বাইরে থেকে আসা ও যাওয়ার একটি রাস্তা উত্তর দিকে। সে দক্ষিণ দিকের দরজাটা খুলে ফেলল। দেখল বাথরুম। কল আছে, শাওয়ার আছে ও জামা কাপড় আছে। একটি শুকনো চৌবাচ্চা ও লম্বা জলের পাইপও আছে।

অমল পাইপটা নিয়ে কলের সঙ্গে লাগিয়ে কলটা চালিয়ে দিল ও পাইপের মুখ চেপে হঠাৎ ছেড়ে দিল। জল বিদ্যুৎবেগে বেরোবার দরজায় গিয়ে লাগল। অমল বল্ল, “আরে তাইতো।” বলেই সে আবার পাইপের মুখ চেপে ধরল ও চেঁচিয়ে উঠল, “আরে সাপ। সাপ। বাঁচাও বাঁচাও।” ওধারে দরজা খুলবার শব্দ হল। দরজা খুলে একটা লোক মখ বাড়াতেই অমল পাইপের মুখ ছেড়ে দিল। জল আবার বিদ্যুৎবেগে লোকটার চোখে গিয়ে লাগল। লোকটি মুখ চেপে বসে পড়তেই পাইপ ছেড়ে অমল স্প্রীং-এর মত লাফিয়ে লোকটার মুখে এক জোরে লাথি কষাল। একটি লাথিতেই লোকটি অজ্ঞান হয়ে পড়ল। তারপর অমল ব্যালকনির সামনে দাঁড়াল। তারপর নীচে লাফিয়ে পড়ল। একতলা বাড়ি তাই লাগল না। নেমেই সে দৌড়ে চলে এল বাংলোতে। এসে দেখে সেখানে বসে আছে ইনস্পেক্টর, অতনু আর অজয়। অমলকে দেখেই ওরা তিনজন লাফিয়ে উঠল। অমল বল্ল, “কোনও কথা নয়। ইনস্পেক্টরবাবু কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে এখুনি চলুন। চোরাচালানকারীদের ধরেছি।”

– “সত্যি! তাহলে এখনি চল।”

ইনস্পেক্টর শিগগিরী কয়েকজন কনস্টেবল ও ত্রীমূর্তিকে নিয়ে রওয়ানা দিলেন। অমলের কথামত গাড়ী চালিয়ে এনে ঐ বাড়িতে ঢুকলেন। অ্যারেস্ট করার অভিযোগ শুনে সে তো খুব তম্বি তম্বা করতে লাগল। বল্ল, “প্রমাণ আছে?” তখন সকলেই নিশ্চুপ হয়ে পড়ল। হঠাৎ অজয় বানিয়ে বলে বসল, “শিব প্রসাদ দুলাল সব স্বিকার করেছে।” সাথে সাথে লোকটার মুখ প্রথমে রাগে লাল হয়ে গেল। তারপর সে বলল, “শিব যখন ধরা পড়েছে তখন আমি সব কথা বলে দিচ্ছি।”

– “ইনস্পেক্টরবাবু রেকর্ড প্লেয়ার।”

একজন কনস্টেবল টেপ রেকর্ডার বের করে মুখে ধরল। তার সমস্ত কথা টেপ হয়ে গেল।

উপসংহারে ২/৩ টি কথাই বলব।

১) জয় মুখার্জীর বাড়িতে শিবপ্রসাদ আর জয় দুজনকেই ধরা হয়েছে।

২) এই গোয়েন্দাগিরির সমস্ত প্রশংসা অতনু অমলকে দিয়েছে।

৩) অমল যে অদৃশ্য কালি দিয়ে লিখেছিল তার রহস্য হচ্ছে পেঁয়াজের রস ভরা পেন।

৪) চোরাচালানকারীরা ধরা পড়ার পর ইনস্পেক্টর হালদার ত্রীমূর্তিকে বাড়িতে এনে ভরপেট খাইয়েছিলেন।  

 

সমাপ্ত

২৮/১১/৯০ (১০ বছর ৬ দিন বয়সে লেখা)

পুরনো ডাইরি থেকে – ৪
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments