হারমোনিয়াম

 

সেই সকাল থেকে টুপটাপ বৃষ্টি পরেই চলেছে। এই একঘেঁয়ে বৃষ্টির মধ্যেও ত্রীমূর্তি অর্থাৎ অতনু, অজয় ও অমলের (মধুপুরের রহস্য সমাধান করার পর এদের নাম হয়েছে ত্রীমূর্তি) আনন্দ পাচ্ছে। কারণ আমি ওদের বাড়িতে এসেছি। এমি এবার বেশ কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে এসেছি। আর আমাকএ তো পেলেই ওরা গল্পে মেতে যায়। স্নান খাওয়ার পাট সেরে আমরা বসেছি গল্প করতে। এমন সময় একজন ডাকপিওন এসে একটা চিঠি দিল। ওপরে লেখা –

মিঃ ইউ. কে. হালদার.

মধুপুর

৫, কলোনি রোড, বিহার।

অতনু চিঠি খুলে পড়তে শুরু করল।

ভাই অতনু,

এখানে আবার চোরাচালানকারীদের ঝামেলা হয়েছে। আসলে জান কি, মধুপুরে ও. সি. হয়ে আমি একেবারেই বসে থাকার সুবিধে পাচ্ছি না। এবারকার ঘটনা অবশ্য মধুপুরে নয়, তবে এর পাশেই কুঞ্জগ্রামে।

ওখানকার এক বনেদী পরিবারে (মালিকের নাম অভয় মল্লিক) এই ঘটনা ঘটে। একদিন তার বাড়িতে সে একটা হারমোনিয়াম পায়। আবার পরের দিন তা অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই অভয় আমার কাছে এসেছিল। আবার কাল বড়বাবুর কাছ থেকে খবর পেলাম, আবার নাকি এখান থেকে মাল পাচার হয়ে যাচ্ছে। তা তোমরা গতবারে যেমন বুদ্ধি করে ওদের ধরেছিলে এবারও সেভাবে ধরো ভাই, প্লীজ। তোমরা যদি আবার এখানে এসে এটার রহস্য সমাধান কর তবে আমি তোমাদের একটি পুরস্কার দেব। তোমরা এখানে চলে এস। চিঠিতে বিস্তারিত খবর দিতে পারব না তাই তোমরা এখানে চলে এস। তখন আরও বিস্তারিত খবর পাবে।

তা তোমরা কেমন আছ? ভাল আছ তো?

স্নেহাশিস নিও,

ইতি,

হালদারদা।

চিঠি পড়া শেষ করে অতনু সকলের মুখের দিকে একবার করে চাইল। তারপর বল্ল, “কি যাবি নাকি?” অজয় বল্ল, “হ্যাঁ যাব।” অমল বল্ল, “এবার ছোটমামাকেও নিয়ে যাব।” আমি তো ভাবছিলাম ওদের সঙ্গে যাব বলে আবেদন করব। বিনা অনুমতিতেই আদেশ পেয়ে আমি তো একলাফে লম্বা। বল্লাম, “হ্যাঁ, এবার তোদের সঙ্গে আমিও যাব।”

যাই হোক এরপর থেকে আমাদের গোছগাছ শুরু হল। একদিন অজয় গিয়ে টিকিট কেটে আনল। যথা সময়ে আমরা ট্রেনে চেপে বসলাম। মধুপুরে পৌঁছলাম রাত ৯ টায়। যাই হোক তখন রাত্রিতে স্টেশনের কাছে হালদারবাবুর বাড়িতে আমরা গেলাম। কড়া নাড়তেই একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। অতনু বল্ল, “বৌদি, কেমন আছেন? ভালো তো। হালদারদা কোথায়?” উনি বললেন, “আরে দেখো দেখো কারা এসেছে। ও তো খেতে বসেছে। তোমরা ভেতরে এস।” তারপর ভেতরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওগো! দেখো কে এসেছে?”

– “অতনুরা নাকি?”

– “হ্যা, তা তোমরা ভেতরে এস। সারাদিন কিছু খাওনি তো। হাত পা ধুয়ে রেডি হও। আমি খেতে দিচ্ছি।”

হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম। খেয়ে দেয়ে ঘুমতে গেলাম। তারপর তোফা ঘুম লাগালাম।

পরেরদিন সকালে হালদারদার সঙ্গে আমরা গেলাম অভয় মল্লিকের বাড়ি। সেখানে অভয় মল্লিকের বক্তব্য শুনে যা বোঝা গেল তা হল এই:

একদিন সকালে উঠে অভয় মল্লিক দেখল যে তার বাড়িতে বেশ বড় একটা হারমনিয়াম পায়। আবার তার আগের দিন তার মেয়ে বায়না ধরেছিল তার হারমনিয়াম চাই। বিনামূল্যে হারমনিয়াম পেয়ে তার খুব আনন্দ হয়েছিল। দিনটা ছিল শনিবার অলুক্ষনে দিন। তাই সেদিন হারমোনিয়ামটাকে না তুলে তারপরের তুলবে ঠিক করল। আবার তার পরের দিন এসে দেখে হারমোনিয়ামটি উধাউ।

অভয় সরকার বক্তিতা শেষ করার পর হালদারবাবু (তাঁর পুরো নাম উদয় কুমার হালদার) বললেন, “কি হে ত্রীমূর্তি বুঝলে কিছু?” “কিছু বুঝতে পেরেছি।” বল্ল অতনু।

– “কি বুঝলে?”

– “এখনো বলার সময় হয়নি।”

বাড়িতে ফিরে আবার একটি ঘটনার সম্মুখিন হতে হল। সেটাই বলছি।

বাড়ি ফিরতেই বৌদি বললেন, “ওগো শুনছ। একটা চিঠি এসেছে।” বলে চিঠিটা দিয়ে চলে গেলেন। হালদারদা চিঠিটা পড়ে গম্ভীর হয়ে অতনুকে দিলেন। অতনু জোরে জোরে পড়তে লাগল:

হালদার মশাই,

আপনাকে, ঐ তিন ছোঁড়াকে ও তাদের মামাকে সাবধান করে দিচ্ছি। এই ব্যাপারে নাক গলাবেন না।

ইতি,

লাল শয়তান।

Harmonium

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এই চিঠি পাবার পর আর কি কারুর ধৈর্য থাকে। আমারও হল তাই। প্রথমে খুব আসতে চেয়েছিলাম। এখন আর ভাল লাগছে না।

যাই হোক ওরা কিন্তু আমার মত ভয় পেল না। বরং বল্ল, “ওসব চিঠি অনেক পেয়েছি।”

পরের দিন আবার খবর পেলাম অভয়ের বাড়িতে আবার হারমনিয়ামের পদার্পন ঘটেছে। খবর পেয়ে আমরা আবার এলাম তার বাড়িতে। অভয় হারমোনিয়ামটিকে দেখাল। সাধারণ হারমোনিয়ামের মতোই কিন্তু লমবায় বড়। অতনুকে দেখলাম এক দৃষ্টিতে হারমোনিয়ামটির দিকে চেয়ে আছে। হঠাৎ সে বলে উঠল, “হালদারদা, রহস্যের সমাধান করে ফেলেছি।” সবাই বলে উঠল, “কিভাবে কিভাবে?” অতনু গলায় আশ্চর্য রকমের শান্ততা এনে বল্লে, “ধৈর্য ধরুন। জানেন তো সবুরে মেওয়া ফলে।” আমরা সবাই রুদ্ধশ্বাসে দেখতে লাগলাম। অতনু একটা একটা করে কালো রিড টিপতে লাগল। কিন্তু কৈ কালো রিড তো শেষ হয়ে গেল। কিছু ঘটল না। তারপর সে সাদা রিড টিপতে লাগল। হঠাৎ সাদার ৫ নম্বর রিড টেপার সঙ্গে সঙ্গে খট করে একটা শব্দ হল। আর অভয় মল্লিকের গলা শোনা গেল, “এইডা কিতা করলেন। অমন সুন্দর হারমনিয়ামডা নষ্ট করি লাইলেন?” দেখা গেল হারমোনিয়ামের পেছন দিক ঝুলে পড়েছে। ও তার থেকে উঁকি মারছে একটা প্যাকেট। হালদারদা ওটি তুলে চেখে বললেন, “আরে এযে দেখি হিরোইন।” অমল বল্ল, “ওকে ধরুন হালদারদা।” তার আগেই অজয় দৌড় দিয়েছে তার দিকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে পাকড়াও করল। হালদারদাকে বল্ল, “এখন থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করলেই সব কথা হড়হড়িয়ে বলে দেবে। তা টেপ করে রাখবেন কিন্তু।”

কাজ সেরে আমরা তার পরের দিন বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। তারপর এ গল্প লিখেছি।

একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। হালদার বাবু ওদের পূর্ব প্রতিশ্রুত পুরস্কার হিসেবে একটি লাইসেন্স সহ রিভালবার দিয়েছিলেন। অতনু রিভালবার চালাতে শিখে গেছে।

সমাপ্ত

১৭/১১/৯০ (১০ বছর ২৬ দিন বয়সে লেখা)

পুরনো ডাইরি থেকে – ৫
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments