মমি

 

এই মাঠ পেরোলেই দেখা যাবে বাড়িটাকে। চার বন্ধু মিলে এখন বাড়িটাতে আছে। দেখলে মনে হবে যেন পোড়ো। কিন্তু যেই ভিতরে যায়, চমকে যায়। ফ্রিজ, টিভি কি না নেই বাড়িটায়। নীচের তলায় থাকে চার বন্ধু। কলেজে পড়ে তারা। বাড়িটা আগে পোড়ো বাড়িই ছিল। কিন্তু একরাতে ভোলই বদলে গেল বাড়ির ঐ চার ছেলের হাতে পড়ে।

নীচের তলায় প্রথম ঘরটিতে থাকে বিমল। কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ে। একটু আধটু গোয়েন্দাগিরিও করেছে। কিন্তু পসার হয়নি। তার পরের ঘরে থাকে বিজ্ঞানের ছাত্র বিদ্যুৎ। তার পাশের ঘরে তার ল্যাবরেটারি আছে। তাতে একটা মমিও যোগার করে এনে রেখেছে। তারপরের ঘরে যথাক্রমে দীপক ও অঞ্জন ও দুজনেই পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়ে। অঞ্জন ধনীর ঘরের দুলাল।

পরিচয় তো দেওয়া হল। এই সময় তারা কি করছে দেখা যাক। বিমল বিলিতি ম্যাগাজিন পড়ছে। বিদ্যুৎ মমিটাকে পরীক্ষা করছে ও বাকী দুজন সামনের দোকানে গেছে কিছু কিনতে।

“উঃ! রাস্তাটা কি অন্ধকার।” নিজের মনেই বল্ল লোকটি। হঠাৎ একটা হাত এসে তাকে চেপে ধরল। লোকটি বল্ল, “আরে আরে একি?” অপর লোকটি বল্ল, “চুপচাপ যা আছে তা দিয়ে কেটে পড়। পুলিশকে ডাকলে গুলি খাবে।” লোকটি হঠাৎ আগুন্তুকের মুখে টর্চের আলো ফেলল। তারপরে একটা অস্ফুস্ট চিৎকার করে মাটিতে ধরাশায়ী হল। আগুন্তুক তার টর্চটা নিয়ে লোকটির পকেট থেকে টাকা বের করে, ঘড়ি খুলে ও গলার সোনার চেনটি নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

“অফ! আবার সেই মমি”। টেবিল চাপড়ে বল্লেন ইনস্পেক্টর। “এর আগেও দু তিনজনের মুখে এই গল্প শুনেছি। আর কত শুনতে হবে? যতসব গাঁজাখুরি গল্প। যান, বেরিয়ে যান।”

থানা থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে এসে লোকটি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল। হঠাৎ কে জন পিছন থেকে ডাকল, “আরে জ্যোতিকাকা চললে কোথায়?” লোকটি বল্ল, “এস ভাই বিমল। এক যা ফেসাদে পড়েছি।” বিমল বল্ল, “ঘরে চল, সেখানে কথা হবে।” জ্যোতি বল্ল, “চল, আর কি।”

ঘরে এসে বিমল বল্ল, “দাঁড়াও, চা আনি।” বলে সে চলে গেল রান্নাঘরে। পাঁচ মিনিটেই সে চা নিয়ে এল। তারপর শোব কথা বিমল শুনল। বল্ল, “ব্যাপার ঘোরতর, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে এ ব্যাপারে কারও হাত আছে।”

– “ও ভূত টাকা পয়সা কেড়ে নিতে যাবে কেন বল”

– “আচ্ছা চলতো ঐ ঘটনাস্থলে।”

– “চল।”

ওরা ভাবতেও পারেনি ঐ ঘটনাস্থলে এসে একটা মৃতদেহও দেখা হয়ে যাবে। প্রথমে ভেবেছিল বুঝি অজ্ঞান হয়ে আছে। তারপর বুঝল সন্দেহ ভুল। বিমল সঙ্গে সঙ্গে পাশের টেলিফোন বুথ থেকে ইনস্পেক্টরকে ফোন করে দিল। ইনস্পেকটরের সঙ্গে রিপোর্টার অনেকেই এলেন। বিমল ইতিমধ্যে মৃতদেহে হাত না দিয়ে তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। ইনস্পেক্টরকে সে বল্ল, “কাজটা সেই মমি করেছে।”

– “আবার সেই মমি! তোমরা আমাকে জ্বালাবে নাকি?”

– “প্রমান চান, চলুন। দেখুন মানুষের পা এমন হয়?” বলে সে গোল করে পাঁচটা ছোট গর্তকে দেখাল। তখন ইনস্পেক্টর বল্ল, “যে কেউ তো রণপা ব্যবহার করতে পারে।” বিমল বল্ল, “এই আঙুলের পরিমান দেখুন। এত সরু আঙুল হলে লোকটির চলা সম্ভব হত না। আর দেখুন গলাটাকে যেভাবে দুমড়ানো হয়েছে সেটা যে লোহার মানুষের কাজ সেটা বোঝা যায়।” “সত্যিই তো, সত্যিই তো!” বল্লেন অফিসার, “ঠিক বলেছ একেবারে।” বিমল বল্ল, “এখুনি মৃতদেহটা ময়না তদন্তে পাঠান এবং দেখুন তারা কি বলে। আমি বাড়ী যাই।” বলে সে চলে গেল।

কয়েকটা দিন চলে গেছে। সেই মমির হাতে আরও দুজন খুন হয়েছে। এদিকে বিমলও কিছু করতে পারছে না। হঠাৎ একদিন সে খবর পেল মমির হাতে আরেকজন খুন হয়েছে। বিমল খবর পেয়েই ছুটে গেল ঘটনাস্থলে। সে এসে দেখে পায়ের ছাপ তাদের বাড়ির দিকে গেছে। সে চিন্তিত হল।

বিমল ও বিদ্যুতের আজ খুব তাড়া। তারা ও আরও কয়েকজন পিকনিক করতে যাবে। দীপক ও অঞ্জনও যাবে। বিমল জুতোটা গলিয়েই বাইরে গিয়ে হাক পাড়ল, “বিদ্যুৎ, আমি রেডি।” বলে সে বিদ্যুতের ল্যাবরেটরিতে ভুল করে ঢুকে পড়ল। “আরে ওকি।” বিমল থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে মমিটাকে দেখতে পেয়েছে। তবে কি বিদ্যুতই।

“ওরে বাবা রে।” জ্যোতিকাকার গলা শুনে বেরিয়ে এল বিমল। বিমলকে দেখেই জ্যোতিকাকা বল্ল, “মমিটা এখানে আশ্রয় নিয়েছে।” বলে বিদ্যুতের ল্যাবরেটরির দিকে দেখাল। বিমল দেখল বিদ্যুৎ কলেজে যাবার সময় ল্যাবরেটরিতে তালা লাগাতে ভুলে গেছে। আর জ্যোতিকাকা কৌতূহলবশতঃ উঁকি মেরেছে। এদিকে অঞ্জন, দীপক দুজনেই এল। বিমল বল্ল, “তুমি নিসন্দেহে বলতে পার যে এই মমিটাকেই তুমি দেখেছিলে?”

– “হ্যাঁ! অবশ্যই ও নিশ্চই।”

– “অঞ্জন, দ্যাখ তো বিদ্যুতের ক্লাস কটা থেকে কটা?”

অঞ্জন দেখে বল্ল, “চারটের সময় ওর ক্লাস শেষ হবে।”

– “খুব ভাল। তাহলে এখন আমরা ভিতরে ঢুকে অনুসন্ধান করব।”

– “তুই বিদ্যুতকে সন্দেহ করছিস?”

– “হ্যাঁ।”

– “তবে চল।”

খানিকক্ষণ পরে বিমল বেরিয়ে এসে বল্ল, “জ্যোতিকাকা ঠিক ধরেছে। এটা সেই মমি।”

গভীর রাত। একজন লোক হেঁটে চলেছে। হঠাৎ একটি হাত তাকে চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে আগের লোকটি পিঁ পিঁ করে বাঁশি বাজিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো পায়ের ধুপ ধাপ শব্দ এবং ইনস্পেক্টরের গলা শোনা গেল, “বিদ্যুতবাবু ইউ আর আণ্ডার অ্যারেস্ট।”

বিমল বলে চলেছে ও শ্রোতা জ্যোতিকাকা, ইনস্পেক্টর, অঞ্জন ও দীপক, “তারপর অঞ্জনকে বলে দিলাম বিদ্যুতকে বলতে যে বিমল তোর ঘরে ঢুকে কি পরীক্ষা করে বলেছে এই মমিটাই খুন খারাপি করছে। তখনই বিদ্যুৎ আমার ফাঁদে ধরা পড়ল ও তার রোবট মমির সঙ্গে আমাকে খুন করতে চেয়েছিল। ও জানত যে আমি ঐ সময়টাতে টিউশন করে ফিরি। তাই ও ধরা পড়ল।”

সমাপ্ত

১৮/০১/৯১ (১০ বছর ৮৮ দিন বয়সে লেখা)

পুরনো ডাইরি থেকে – ৬ (শেষ কিস্তি)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments