রাক্ষসের দেশে রাজপুত্র

সাত সমুদ্র তের নদীর পারে যে একটা দ্বীপ আছে; কেউ জানে না সেখানে তিনটি রাক্ষস থাকে। তারা বড় ভয়ঙ্কর। কেবল বলে, “হাঁউ! মাঁউ! খাঁউ! মানুষের মাংস চাঁউ!”

এদিকে এক রাজ্যে রাজা বুড়ো হয়েছেন। তিনি তাঁর ছেলের হাতে রাজ্য দেবেন। রাজপুত্র যেন মানুষ নয় এক সোনার টুকরো। রুপে, গুণে, বিদ্যায়, বুদ্ধিতে তার সমকক্ষ কেউ নেই। তার ওপর তিনি অস্ত্র চালণায় প্রথম। বিশেষ করে তরোয়াল চালণায় অদ্বিতীয়। কিন্তু অভিষেকের তিন দিন আগে তিনি বললেন যে তিনি ভ্রমনে বেরোবেন। রাজা রাণির মাথায় যেন বাজ পড়ল। গঙ্গা নদী থেকে জল আনতে চলে গেছে কয়েকজন। যে জলে অভিষেকের সময় চান করানো হবে। কিন্তু কি করা যাবে। একটি মাত্র ছেলে তার কথা তো রাখতেই হবে। অতএব রাজা অনিচ্ছা সত্বেও রাজী হলেন। তবে বললেন যে সৈন্য নিয়ে গেলে ভাল হয়। তবুও বাদ সাধলেন রাজপুত্র যে তিনি একাকী যাবেন। তাও মানতে হল রাজাকে। একটি তেজী ঘোড়ায় চেপে, হাতে তরোয়াল নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। অনেকদিন পর তিনি এসে পৌছালেন সাত সমুদ্র তের নদীর পারে। ততক্ষণে রাত্রি হয়ে পড়েছিল। তখন তিনি ঘোড়াটাকে নীচে বেঁধে গাছে শুয়ে পড়লেন। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াতে তিনি দেখলেন একটি অজগর সাপ তাঁর ঘোড়াটির দিকে তাকিয়ে আছে আর ঘোড়াটি ঘুমিয়ে রয়েছে। তারপর অজগরটি ঘোড়াটির দিকে এগোতে লাগল খাবে বলে। সাপটি আরেকটু কাছে আসতেই রাজপুত্র লাফ দিয়ে নেমে অজগরটিকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন। তারপর অবাক হয়ে দেখলেন অজগরের মাথা থেকে একটি মনি বেরিয়ে এল। তিনি বিস্মিত হয়ে মনিটিকে নিজের কাছে রাখলেন। তারপরদিন সকালে তিনি মনিটিকে হাতে নিয়ে স্নান করতে জলে নাবলেন। আবার তিনি অবাক হয়ে দেখলেন জলে নাবার সাথে সাথে জল দুফাঁক হয়ে একটি পথ হয়ে গেল। তিনি বুঝলেন এতি মনির গুণ। তিনি যত এগোন তত জল সরে পথ হয়ে যায়। আর পিছনে জল আবার এক হয়ে যায়। ঘোড়াটি কিন্তু পাড়েই রইল।

রাজপুত্র এগোতে এগোতে অনেক দূর এসে যখন থামলেন; তখন সামনে দেখা গেল একটি দ্বীপ। রাজপুত্র ভাবলেন এটি প্রবাল দ্বীপ। কিন্তু আসলে তা নয়। এটি সেই তিন রাক্ষসের অধীন দ্বীপ। রাজপুত্র ফিরে জাচ্ছিলেন কিন্তু তাঁর মনে হল দেখিই না কি আছে শেষে? এই ভেবে তিনি এগোতে লাগলেন। খানিকটা গিয়ে আবার জল পড়ল। একই ভাবে তিনি এটিও পেরিয়ে গেলেন। এভাবে মনির দৌলতে তিনি একে একে পেরিয়ে গেলেন কুড়িটি জলাশয় ও উনিশটি স্থল। তারপরে তিনি এসে থামলেন এক আশ্চর্য দ্বীপের সামনে। সেই দ্বীপে গাছপালা পশুপাখি (পশুপাখি অবশ্য আগের দ্বীপগুলিতেও ছিল না) কিছুই নেই। তবে দূরে একটি প্রাসাদ দেখতে পেলেন রাজপুত্র। তিনি ঠিক করলেন ঐ প্রাসাদে যাবেন। তাছাড়া এখন রাত্রি হয়ে গেছে ওখানে। তিনি আশ্রয় নেবেন বলে ঠিক করলেন। এবার তিনি এগোতে লাগলেন প্রাসাদের দিকে। প্রাসাদের জানলায় এসে তিনি শুনতে পেলেন কে যেন বলছে, “আজকে আমি তিনটি মানুষ, একটি ঘোড়া ও একটি হাতি খেয়েছি। এখনও আমার খিদে আছে।” তখন আরেকজন বলল, “আমি আজ তিনটি ঘোড়া ও চারটি হাতি খেয়েছি।” আবার আরেকজন বল্ল, “আমি আটটি হাতি খেয়েছি।” শুনে রাজপুত্র বুঝতে পারলেন এরা রাক্ষস ও তিনি এখানে এসে ভুল করেছেন। তিনি তার শক্তি ও বুদ্ধি পরীক্ষার জন্য এদের সঙ্গে লড়াই করবেন ঠিক করলেন। তিনি একটি গাছের ওপর শুয়ে রাত কাটালেন। তার পরের দিন তিন রাক্ষস বেরিয়ে গেল খাবার খেতে। তখন রাজপুত্র দেখলেন এই সুযোগ মহলে ঢুকবার। তিনি আস্তে আস্তে মহলে ঢুকলেন। হঠাৎ কান্নার আওয়াজ পেয়ে তিনি সেদিকে গেলেন। দেখলেন একটি ছোট রাক্ষস বসে বসে কাঁদছে। রাজপুত্র জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে? কাঁদছ কেন?” সে উত্তর দিল, “আমাকে ওই তিন রাক্ষস খালি কষ্ট দেয়। তারা আমার বাবামাকে মেরে আমাকে নিয়ে এসেছে। এখানে আমাকে খালি খাটায়।” তারপর হঠাৎ খেয়াল হওয়াতে সে বলল, “তুমি এখান থেকে চলে যাও। ওরা তোমাকে খেয়ে ফেলবে।” রাজপুত্র বললেন, “ওরা আমাকে খেতে পারবে না আমি অদেরকে মেরে তোমাকে উদ্ধার করব। কিন্তু কয়েকদিন লাগবে।” রাক্ষসটি খুশী হয়ে বলল, “আচ্ছা।” রাজপুত্র আবার বললেন, “এই মহলটাতে আমাকে একটা লুকোবার জায়গা করে দাও।” রাক্ষসটি বলল, “আমি একবার পালাবার জন্যে সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিলাম। তুমি সেখানে লুকোও।” তারপর রাজপুত্র সুরঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে পড়লেন।

তারপর একজন রাক্ষস এসেই ছোট রাক্ষসটিকে বলল, “মানুষের গন্ধ কোত্থেকে পাইরে?” বলে সারা মহল খুঁজতে লাগল। রাজপুত্র একফোঁটাও ভয় না পেয়ে লুকিয়ে রইলেন। রাক্ষসটি রাজপুত্রকে না পেয়ে ফিরে গেল ভাবল মনের ভুল। বাকী দুই রাক্ষস এসেও খুঁজতে লাগল কিন্তু পেল না। তারপর একে একে নিজের গুণকীর্তন করতে লাগল। তারপরের দিন আবার তারা বেরিয়ে গেল। রাজপুত্র ছোট রাক্ষসের কাছে খাবার চাইল। সে রাজপুত্রকে কিছু খাবার দিল। এবার রাজপুত্র চাইলেন কিছু দড়ি। রাক্ষসটি একটি বড় দড়ি নিয়ে এল। রাজপুত্র কি করেন তা দেখার জন্যে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকল। রাজপুত্র একটি ফাস তৈরি করলেন ও ফাসটি দরজার সামনে ঝুলিয়ে রাখলেন। এবার ছোট রাক্ষসটিকে বললেন, “তুমি লুকিয়ে পড়ো। আমি যা করার করব।” এবলে দুজনেই লুকিয়ে পড়লেন। এরপর এল এক রাক্ষস। সে এসে ফাঁসে পড়তেই রামচ্যাঁচানি লাগিয়ে দিল। কিন্তু সে সুযোগ আর রইল না রাজপুত্র এসে তাকে মেরে ফেললেন। এরপর তিনি বাড়ির বাইরে চলে এলেন। এরপর এল দ্বিতীয় রাক্ষস। সে মৃত রাক্ষসটিকে ঝুলতে দেখে ছোট রাক্ষসটিকে গাল দিতে লাগল। তারপর সে যখন দেখল সে মারা গেছে মৃত রাক্ষসটির দিকে তাকিয়ে রইল। রাজপুত্র এই সুযোগে তার মাথা কেটে ফেললেন। এদিকে রাজপুত্র লক্ষই করেননি শেষ রাক্ষসটিও চলে এসেছে। সে হাত তুলে রাজপুত্রকে মারতে যেতেই ছোট রাক্ষসটি একটি পাথর দিয়ে তার মাথায় মারল ও রাক্ষসটি পড়ে গেল। রাজপুত্র সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় তার মাথা কেটে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখতে পেলেন যে ছোট রাক্ষসটি একটি তরুণে পরিণত হল। রাজপুত্র তো বিস্মিত। “এ কেমন করে হল?” এ প্রশ্ন করতেই ছেলেটি বল্ল, “আমি এক রাজপুত্র ছিলাম ভোজদেশের। আমাকে এই রাক্ষসরা ধরে এনে চেহারা বদলে দিয়েছিল। আমার মানুষ জীবনের কথা রাক্ষস জীবনে কিছুই মনে ছিল না। কেবল মনে ছিল আমার বাবামাকে মেরে আমাকে তারা নিয়ে এসেছে। যাতে আমি পালাতে না পারি তাই এই ব্যবস্থা।” শুনে রাজপুত্র আনন্দে অভিবুত হয়ে বললেন, “চল আমরা আমার বাড়ি ফিরে যাই।” শুনে ছেলেটি বলল, “এই ভয়ঙ্কর সমুদ্র তুমি পার হবে কি করে?” রাজপুত্র বললেন, “দেখই না কাণ্ড।” বলে তাঁরা মনি নিয়ে কুড়িটি জলাশয় পেরিয়ে আপন দেশে পৌঁছাল। তারপর পড়ে গেল মহা ধূম ধাম ও ভোজদেশের রাজা হলেন কাঞ্চন (অপর রাজপুত্রের নাম)। কাঞ্চনের দেশের রাজকন্যাকে বিবাহ করে মহাসুখে রাজপুত্র দিন কাটাতে লাগলেন।

 

সমাপ্ত

১৫/১০/৯০ (৯ বছর ৩৫৮ দিন বয়সে লেখা)

পুরনো ডাইরি থেকে – ১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments