এন্তন চেকভের “The crooked mirror” গল্পের ভাবানুবাদ।
————————————————-

পূর্বপুরুষের মাটির টানই বোধহয় আমাকে টেনে আনল সেই দু’পুরুষ আগে ছেড়ে আসা গ্রামে। শহরের ব্যস্ত জীবনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে অবশেষে মেয়ে বিদিশা আর বউ পারমিতাকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছলাম বাবার ছোটবেলার গ্রামে। প্রপিতামহের হাতে তৈরি বাড়ি ততদিনে পরিত্যক্ত হয়েছে। চার মহলা বিশাল বাড়ির সিংহ দরজার পথ আগলে দাঁড়িয়ে এক বিরাট বটগাছ। বাইরের দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পরেছে জায়গায় জায়গায়। শ্যাওলা ধরা ইটগুলো যেন অতি বৃদ্ধের ফোকলা মুখের হাসি। কার্নিশে কার্নিশে ঝুলন্ত লতানে আগাছার মাঝে মাঝেই বট অশ্বত্থও শেকড় গেড়েছে দেওয়ালের অনেক গভীরে। কিছুক্ষণ নিস্পলক তাকিয়ে থেকে মেয়ে বৌয়ের হাত ছেড়ে সিংহদরজায় ঝোলানো বড় তালা খুলতেই একটা দম বন্ধ করা বোটকা গন্ধের পিছু পিছু এক ঝাঁক বাদুর কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। কিছুটা অপ্রস্তুত ভাবেই পা বাড়ালাম ভেতরে। একটা বিশাল হলঘর। বুঝতে পারলাম বাবার মুখে শোনা গল্পের বৈঠকখানা ঘরে পা দিয়েছি। এই মাঝ দুপুরেও ঘরটা অন্ধকার। জানি না শেষ কবে ঘরের দরজা জানলা খোলা হয়েছে। হাতের চার ব্যাটারির টর্চটা চারদিকে ঘুরিয়ে দেখলাম। একটা জানলা খুলে দিলাম। ঘরকে বিশেষ আলোকিত না করলেও গুমোট ভাব আর ধুলোর বোটকা গন্ধটা কিছুটা যেন কাটল। সঙ্গে আনা বড় মোমবাতি তিনটে জ্বালিয়ে বিদিশা আর পারমিতাকে ডাকলাম ভেতরে।

ঘরের ভেতর আবলুস আর মেহগনি কাঠের কিছু এ্যান্টিক ফার্নিচার। ছাদে ঝোলানো একটা পেল্লাই টানাপাখার পাশেই ঝুলছে ভাঙাচোরা ঝাড়লন্ঠন। দেওয়ালে টাঙানো আমার পূর্বপুরুষদের কয়েকটা পোট্রেইট। হাতে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি ধরে বাবার মুখে শোনা গল্পের স্মৃতির উপর ভরসা করে পারমিতাকে পরিচয় করাচ্ছি পোট্রেইটের মানুষগুলোর সঙ্গে। শেষ পোট্রেইটে এসে থমকে দাঁড়ালাম। এই এতগুলো পুরুষের মাঝে একমাত্র মহিলার পোট্রেইট। অদ্ভুত কুদর্শনা মহিলার পোট্রেইটা দেখেই পারমিতা জানতে চাইল,

- “ইনি কে?”

- “আমার প্রপিতামহী। এনার সম্পর্কে অদ্ভুত এক গল্প শুনেছি বাবার মুখে। উনি নাকি জীবনের অধিকাংশ সময়টাই কাটিয়েছিলেন এক আয়নার সামনে। শুনেছি ওনার নাকি ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পরে এই আয়নাটাকেও যেন ওনার সাথে কফিনে রেখে কবর দেওয়া হয়। কিন্তু আয়নাটার বিশাল আকৃতির জন্যে তা সম্ভব হয়নি। সেই থেকে আয়নাটা….”

একটানা কথা বলতে বলতেই চোখ গেল পাশের কোনায় রাখা আয়নাটার দিকে। ব্রোঞ্জের চওড়া ফ্রেমে বাঁধানো একটা বিশাল আয়না। উপরে মোটা ধুলোর আস্তরণ। পারমিতা কখন যে ওই আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে জানতেও পারিনি। এক হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি ধরে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে ধুলোর আস্তরণ মুক্ত করছে আয়নাটাকে। ধুলোর আড়াল ভেদ করে আয়নার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকেই আমাদের হতচকিত করে দিয়ে এক হৃদয় বিদারক তীক্ষ্ণ চিৎকার করে হঠাত মাটিতে লুটিয়ে পড়ল পারমিতা। কিছু বুঝতে না পেরেই পারমিতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে শুইয়ে দিলাম গাড়ির পিছনের সিটে। গাড়ি ছোটালাম শহরের পথে।

—-

ডাক্তারবাবু সব শুনে বললেন,

- “কি দেখে হয়েছে জানিনা কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত যে প্রবল মানসিক চাপে এই রকম ঘটেছে। ওনাকে আর কোনরকম মানসিক চাপে পরতে দেবেন না। উনি যেরকমটা চাইবেন সেরকমটাই চেষ্টা করবেন….”

তিনদিন হাসপাতালে অচেতন থেকে জ্ঞান ফিরতেই আমার দিকে তাকিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন স্বরে পারমিতা জিজ্ঞেস করল,

- “আয়নাটা কোথায়?”

পারমিতাকে বাড়ি নিয়ে এলাম। গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসলাম আমার প্রপিতামহীর সেই রহস্যময় আয়নাটাও। আয়নাটা পেতেই পারমিতা আবার অনেকটাই স্বাভাবিক। আড়াল থেকে লক্ষ্য করতে লাগলাম আমার প্রপিতামহীর মতই পারমিতারও সমস্তটা দিন কাটছে ওই রহস্যময় আয়নার সামনে। এমনকি খাচ্ছেও ওই আয়নার সামনে বসেই। সেই রাতের মত পারমিতাকে বাকি সময়টুকু নিজের সাথে কাটাতে দিয়ে পাশের ঘরে শুতে গেলাম। ঘুম আসছে না কিছুতেই। গম্ভীর ঢং ঢং আওয়াজে দেওয়াল ঘড়িটা কিছুক্ষণ আগেই জানান দিয়েছে মাঝরাত অতিবাহিত হয়েছে। শুয়ে শুয়েই কানে এলো পারমিতার অসম্ভব আক্রোশ মেশানো চাপা গলার আওয়াজ। দ্রুতপায়ে উঠে গিয়ে দেখলাম একটা টুলের উপর পারমিতা আয়নার মুখোমুখি বসে। অদ্ভুত হিসহিসে গলায় স্বগতোক্তি করছে,

- “সব মিথ্যেবাদী! বাবা, মা, বন্ধুরা সবাই। আমার স্বামীও মিথ্যেবাদী। সবাই বলে আমি নাকি কুচ্ছিত, কিন্তু আমি যে……”

পারমিতাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চুপিচুপি গিয়ে দাঁড়ালাম ওর পিছনে। ওই আয়নায় নিজের মুখ দেখে হেসে ফেললাম। আয়নার প্রতিবিম্বে আমার অদ্ভুত বিকৃত মুখ। নাক চলে গেছে ডান গালের ওপরে, চিবুক যেন ছুঁতে চাইছে ওপরের ঠোঁট। বুঝতে পারছি আয়নাটা বিকৃত প্রতিবিম্বের সৃষ্টি করে। নিজের এইরকম হাস্যকর বিকৃত প্রতিবিম্ব দেখে হাসতে হাসতেই হঠাত দৃষ্টি আটকে গেল আয়নার ভেতর পারমিতার প্রতিবিম্বে। আমি অবাক হয়ে দেখছি পারমিতার অনিন্দ্য সুন্দর প্রতিবিম্ব। পারমিতার কুচ্ছিত মুখটাকে ভেঙেচুড়ে আমার প্রপিতামহীর আয়না সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব নারীমুখ। আস্তে আস্তে রহস্যের জট খুলছে। আমি বোধহয় বুঝতে পারছি মাইনাসে মাইনাসে গুন করলে এইভাবেই বোধহয় প্লাস হয়। আমার বিহ্বল অবস্থার মধ্যেই কানে এলো খিলখিল করে হাসতে হাসতে পারমিতা বলছে,

- “এবারে বিশ্বাস হল তো আমি আসলে কত সুন্দর?”

প্রতিবিম্ব
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments