এটা যে সময়ের কথা সেটা একটা উত্তাল সময়। বক্সার যুদ্ধে শাহ আলম ও মীরকাশেমের যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করে ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে বাংলার খাজনা আদায়ের ক্ষমতা গেছে মাত্র ৫ বছর হয়েছে। সকলেই এই গোলমেলে সময়ে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। প্রভু ব্যস্ত তার নতুন প্রজাদের ভালো করে চিনে নিতে, আর প্রজারা ব্যস্ত নবাবের শাসন ভুলে নতুন নিয়মে অভ্যস্ত হতে। এরকমই একটা সময়ে ব্রিটিশ কোম্পানীর সমস্ত কুঠিগুলিকে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় নিয়ে এসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে আরও গভীরে প্রোথিত করার উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা হল কোম্পানি রাজ। যার রাজধানী হল কলকাতা আর যার গভর্নর জেনারেল নির্বাচিত হলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সির ভূতপূর্ব রাজ্যপাল ওয়ারেন হেস্টিংস। সালটা ১৭৭৪।

ওয়ারেন হেস্টিংসের স্ট্রাগলের ইতিহাস বলার স্থান এটা নয়, আমাদের শুধু এটুকু জানলেই চলবে যে ভদ্রলোক ১৭৫০ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানীর চাকরী নিয়ে ভারতবর্ষে পদার্পণ করেন এবং তারপরের দীর্ঘ ২২ বছর এদেশের সাত ঘাটের জল খেয়ে, নানাবিধ সংকটের মধ্যে দিয়ে অবশেষে পেশাদারী জীবনে সাফল্যের চুড়ায় পৌঁছন। হেস্টিংস এর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দূরদৃষ্টি ছিল প্রখর। এদেশের মানুষের সঙ্গে কাটানোর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এবং তীক্ষ্ণ ব্রিটিশ বেনিয়া বুদ্ধির ফলে তিনি বুঝেছিলেন যে নেটিভদের ভাষা বোঝা ও সেই ভাষায় কথা বলাটা জরুরী। শুধুমাত্র গা-জোয়ারির দ্বারা লংটার্ম ব্যবসার ক্ষেত্রে  বিশেষ সুবিধে হবার নয়। সে কারণে তিনি উর্দু ফার্সি বাংলা ইত্যাদি ভাষাগুলি মনোযোগ দিয়ে আয়ত্ত করেছিলেন। অবশ্য এই কথা যে হেস্টিংস প্রথম বুঝেছিলেন তা নয়। বস্তুত পলাশীর যুদ্ধের পর পরই রবার্ট ক্লাইভ এই সত্য অনুধাবন করেন এবং প্রত্যেক রাজ কর্মচারীর দেশীয় ভাষা শিক্ষার ব্যাপারে জোর দেন। সে যুগে, এমনকি, দেশীয় ভাষা না শেখার অপরাধে ব্রিটিশ কর্মচারীর চাকরী খোয়ানোর দৃষ্টান্তও দুর্লভ নয়! ক্লাইভের প্রিয়পাত্র হেস্টিংস ক্ষমতায় এসে তাঁর পূর্বজের চিন্তাধারাটিকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ফিরিঙ্গী মহলে নেটিভের ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি চার্লস উইলকিন্স ও নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড নামক দুই তরুণ বিদ্যোৎসাহীকে বেছে নিলেন।

ওয়ারেন হেস্টিংস

নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের জন্ম লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টারের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তিনি ১৯৬৮ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে তাঁর আলাপ হয় প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম জোন্সের সঙ্গে। জোন্সের অনুপ্রেরণায় অক্সফোর্ডে থাকাকালীন হ্যালহেড ফার্সি ও আরবী ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন এবং এর চার বছর পর ১৭৭২ সালে তিনি মিস্‌ লিনলে নামক এক নারীর প্রেমে দাগা খেয়ে কোম্পানির রাইটারের চাকরী নিয়ে কোলকাতায় এসে পৌঁছন। কোলকাতায় এসে তিনি কেরানীর চাকরিতে যোগ দিলেন বটে, কিন্তু এর পাশাপাশি তাঁর প্রাচ্যবিদ্যার কাজও চলতে লাগলো পুরোদমে। কোলকাতার নেটিভ ভাষা বাংলা শেখবার উদ্দেশ্যে তিনি দোভাষী, নাপিত, ল্যান্ডলেডী কাউকে জ্বালাতে বাদ রাখেননি। এবং এই করতে গিয়েই তিনি বুঝতে পারলেন যে এদেশের সংস্কৃতিকে বোঝা ও বাংলা ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য আগে সংস্কৃত ভাষা শেখাটা জরুরী। কিন্তু সেকালে একজন ম্লেচ্ছ ফিরিঙ্গীর পক্ষে দেবভাষা শেখা চাট্টিখানি কথা ছিলনা। জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন থেকে হরিদাস তর্কপঞ্চানন- কেউই তাঁর সমস্যার সুরাহা করতে পারলেন না। অবশেষে বহু চেষ্টায় একজন অনামী সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতকে পাওয়া গেল যিনি দীর্ঘ এক মাসের উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্তের (যার মধ্যে ছিল নির্জলা উপবাস থেকে গোমূত্র সেবনের মাধ্যমে ম্লেচ্ছত্ব নিবারণ পর্যন্ত সমস্ত প্রকারের টর্চার!) পর হ্যালহেডকে সংস্কৃত ভাষায় দীক্ষা দিতে রাজী হলেন। আর এই সময়তেই হ্যালহেডের সঙ্গে আলাপ হল চার্লস উইলকিন্স নামক এক ভদ্রলোকের।

চার্লস উইলকিন্স কোম্পানির চাকরী নিয়ে ভারতে আসেন ১৭৭০ সাল নাগাদ এবং অল্প দিনের মধ্যেই তিনি মালদহের ব্রিটিশ কুঠির সুপারিন্টেনডেন্ট হয়ে বসেন। যদিও, বলা বাহুল্য, তাঁর মূল আগ্রহ ছিল প্রাচ্যবিদ্যা ও মুদ্রণশিল্প। মালদহে থাকা কালে তিনি আরবি ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করেন এবং রাজা নন্দকুমারের সভাপণ্ডিত বাপুদেব শাস্ত্রীর কাছে সংস্কৃত শিক্ষা করেন। এবং অচিরেই তাঁর এই প্রাচ্য অনুসন্ধিৎসার কারণে তিনি হেস্টিংস সাহেবের সুনজরে পড়েন।

হেস্টিংস, উইলকিন্স ও হ্যালহেড- এঁরা তিনজনই দেশজ বাংলা ভাষা রপ্ত করবার সময় যে প্রধান সমস্যাটির সম্মুখীন হন তা হল বাংলা ভাষার নির্দিষ্ট কাঠামোর অভাব। দেশজ পণ্ডিত মহলে ভাষা হিসাবে বাংলার কৌলীন্য বা শাস্ত্র রচনাগত উপযোগিতা কোনও কালেই ছিলোনা। ফলে কেউই এই ভাষার ব্যকরন নির্মাণ নিয়ে কস্মিন কালেও মাথা ঘামানোর কথা ভাবেননি। তবে ইউরোপীয় বণিকদের কাছে স্থানীয় ভাষার কদর প্রথম থেকেই ছিল। তাই এ ব্যাপারে পর্তুগীজরাই প্রথম এগিয়ে আসেন। ১৭৩৪-৩৫ সাল নাগাদ পর্তুগীজ পাদ্রী মানোএল দা-আস্‌সুম্পসাঁও (Manoel da Assumpção) লিসবন থেকে রোমান হরফে “বাংলা ও পর্তুগীজ ভাষার শব্দকোষ ও ব্যাকরণ” (Vocabulario em Idioma Bengalla e Portuguez) নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তবে ব্রিটিশদের কাছে সে বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা বা সহজলভ্যতা ছিল কিনা বলা যায়না। ফলে ইউরোপীয় স্ট্রাকচারাল শিক্ষায় শিক্ষিত ব্রিটিশ প্রভুদের খপ্পরে পড়ে বাংলা ভাষার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে গেল! ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মনীতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসাবে হ্যালহেডকে একটি বাংলা ভাষার ব্যকরন রচনার ভার দিলেন। এবং এই ব্যকরন পুস্তকাকারে ছাপাবার জন্য যে মুদ্রণ প্রণালীর প্রয়োজন তা নির্মাণের ভার গিয়ে পড়লো চার্লস উইলকিন্সের ওপর। এই ঘটনার মাধ্যমে কিভাবে বাংলা সাহিত্যের জগতে এক নতুন দিগন্ত খুলে যাবে এবং বাংলা ভাষা তার শৈশব থেকে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবার বল পাবে সে বিষয়ে একটু পরে আসছি। কিন্তু তার আগে অতি-সংক্ষেপে ভারতবর্ষে ছাপাখানার ইতিহাসটা একবার দেখে আসা যাক।

ভারতবর্ষে সর্ব প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা হয় ১৫৫৬ খৃষ্টাব্দে গোয়ায় কয়েকজন পর্তুগীজ জেসুইট পাদ্রীর আনুকূল্যে। একটি জাহাজে করে ছাপাখানাটিকে পর্তুগাল থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে আবিসিনিয়া (আজকের ইথিওপিয়া) নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং মাঝপথে গোয়াতে বিশ্রামের জন্য জাহাজটি দাঁড়ায়। তারপর যে কোনও কারণেই হোক আবিসিনিয়াতে না গিয়ে সেই ছাপাখানা গোয়াতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। জন দা বুসামেন্ট (Jóão de Bustamante) নামক এক স্পেনীয় ধর্মযাজক ও মুদ্রাকর এই ছাপাখানা থেকে “Conclusœs” নামে একটি পর্তুগীজ ভাষায় রচিত ও রোমান অক্ষরে মুদ্রিত ধর্মপ্রচার মূলক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এটিই ভারতবর্ষে মুদ্রিত প্রথম বই। এরপর সেই প্রেসে আরও বেশ কিছু গ্রন্থ ছাপা হয়। কিন্তু সবই ওই পর্তুগীজ ভাষায় ও রোমান হরফে। ভারতীয় ভাষায় ছাপা প্রথম গ্রন্থটি আসতে আরও ২২ বছর সময় লেগেছিল। ১৫৭৮ খৃষ্টাব্দে কেরালার কুইলন থেকে “Doutrina Christā” নামক একটি পর্তুগীজ বইয়ের তামিল অনুবাদ গ্রন্থ “Christya Vannakanam” প্রকাশিত হয় যা ভারতীয় ভাষায় ও ভারতীয় হরফে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ। আর এই গ্রন্থ নির্মাণের জন্য তামিল মুদ্রাক্ষরগুলি তৈরির মাধ্যমে যিনি ভারতীয় মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে পথিকৃৎ হয়ে থাকলেন তিনি একজন জেসুইট পাদ্রী, নাম জোহানেস গনজালভেস (Joannes Gonsalves)।

এরপর আমরা অবলীলায় দুশো বছরের একটা লম্বা লাফ দিয়ে চলে আসবো ১৭৭৮ সালে, হুগলীর ডাচ কলোনির লাগোয়া জন অ্যান্ড্রুজ নামক এক ব্রিটিশ পুস্তক বিক্রেতার সদ্য-নির্মিত বাংলার প্রথম ছাপাখানায়। যেখানে হ্যালহেড লিখিত প্রথম বাংলা ব্যকরনের বইটি ছাপার জন্য চার্লস উইলকিন্স একজন বাঙালী ধাতুশিল্পী কে সঞ্চালনযোগ্য বাংলা হরফ নির্মাণের জটিল ও সুক্ষ্য পদ্ধতিগুলি হাতে ধরে শেখাচ্ছেন। বাঙালী ধাতুশিল্পীটির নাম পঞ্চানন কর্মকার।

পঞ্চানন ছিলেন হুগলীর পার্শ্ববর্তী ত্রিবেণী বাশবেড়িয়া অঞ্চলের একজন লিপিকর। ইস্পাত ও লোহার ওপর লিপি খোদাইয়ের কাজে পঞ্চাননের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল, যার জন্য এঁর পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি খানের কাছ থেকে ‘মল্লিক’ উপাধি লাভ করেন। পঞ্চাননের সঙ্গে উইলকিন্স ও হ্যালহেডের কিভাবে আলাপ হয়েছিল তা বলা মুশকিল। দুটি প্রচলিত মতের একটি হল, বাঁশবেড়িয়ার রাজবাড়িতে পঞ্চানন বেশ কিছু লিপি খোদাইয়ের কাজ করেছিলেন এবং রাজবাড়ির সূত্রেই এই প্রতিভাবান খোদাই শিল্পীর সঙ্গে দুই ব্রিটিশ রাজ-কর্মচারীর যোগাযোগ হয়। এঁরা দুজনেই সে সময় কোম্পানির কাজে হুগলীতে পোস্টিং ছিলেন।

অন্য আরেকটি মত অনুযায়ী হ্যালহেডকে পঞ্চানন কর্মকারের সন্ধান দেন হুগলীর তৎকালীন ডাচ গভর্নর অস্কার রিবাউট, যাঁর মেয়ে হেলেনার সঙ্গে কিছুকাল পরে হ্যালহেড সাত পাকে বাঁধা পরবেন। পঞ্চানন হয়ত সে সময় হুগলীর ডাচ দুর্গ গ্যাস্টাভাসে (Fort Gustavus) কিছু খোদাইয়ের কাজ করে থাকবেন এবং হ্যালহেড যখন হুগলীতে জন অ্যান্ডুজের ছাপাখানায় তাঁর সদ্য রচিত বাংলা গ্রামার বইটি ছাপাবার উদ্দেশ্যে বাংলা টাইপ বানানোর জন্য একজন ধাতুশিল্পীর সন্ধান করছেন তখন অস্কার রিবাউটের কাছ থেকে তিনি পঞ্চানন কর্মকারের কথা জানতে পারেন।

মোট কথা পঞ্চাননের সঙ্গে উইলকিন্স ও হ্যালহেডের যোগাযোগ যেভাবেই হয়ে থাকুক, সেটা ছিল প্রকৃত সুবর্ণযোগ। ধাতুর ওপর সুক্ষ হরফ মুদ্রণের পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও উইলকিন্সের মত অভিজ্ঞ গাইড পেয়ে পঞ্চানন যে বাংলা হরফগুলি তৈরি করেন সেগুলির নিপুণতা দেখলে আজও বিস্মিত হতে হয়। হ্যালহেডের বইটি যদিও মূলত ইংরাজি ভাষাতেই লেখা, তবে বিশেষ বিশেষ অংশের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসাবে এতে একাধিক বাংলা কাব্যের উদ্ধৃতি (কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীরাম দাসের মহাভারত, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল ইত্যাদি) ব্যবহৃত হয়েছে। আর এই উদ্ধৃতিগুলির জন্যেই প্রয়োজন হয় বাংলা মুদ্রণ শৈলীর। কিন্তু মূল সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়। বস্তুত সেদিনের সমস্যাটা আজকের দিনে কল্পনা করাও বেশ দুরূহ, কেননা আমরা ছোটবেলা থেকেই বইয়ের ছাপা অক্ষর দেখতেই অভ্যস্ত। কিন্তু প্রথমবার ছাপাবার উদ্দেশ্যে যে বাংলা হরফগুলি নির্মিত হবে সেগুলো তৈরির জন্য হ্যালহেড বা উইলকিন্সের কাছে কোনও স্ট্যান্ডার্ড সর্বজনগ্রাহ্য উদাহরণ ছিলোনা। তাঁদের তখন খান-কতক হাতে লেখা পুরনো বাংলা পুঁথিই সম্বল। এবং বলা বাহুল্য, প্রতিটা পুঁথির হস্তাক্ষর লেখক বিশেষে আলাদা আলাদা! ফলে প্রথম ছাপা বাংলা অক্ষরগুলি কেমন দেখতে হবে তাই নিয়ে হ্যালহেড ও উইলকিন্সকে বিস্তর বিপাকে পড়তে হয়। এমত অবস্থায় অবশেষে এই সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁরা শরণাপন্ন হলেন হুগলী নিবাসী জনৈক খুসমৎ মুন্সীর, যার সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্য এলাকায় সুনাম ছিল। এবং এই খুসমৎ মুন্সীর সুচারু হস্তাক্ষরের আদলেই লোহার ওপর ছেনী ও হাতুড়ির শৈল্পিক কারসাজীতে পঞ্চানন গড়ে তুললেন বাংলার প্রথম সঞ্চালনযোগ্য বাংলা হরফের ছাঁচ। আর এই হরফ ব্যবহার করেই ১৭৭৮ খৃষ্টাব্দে হুগলী থেকে প্রকাশিত হল ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড রচিত “A Grammar of the Bengal Language”।

হ্যালহেড তাঁর এই ব্যকরন বইয়ের শুরুর আখ্যাপত্রে লিখেছিলেন “ফিরিঙ্গিনামুপকারার্থ”। কিন্তু ফিরিঙ্গীদের উপকারের সঙ্গে সঙ্গে এই বই বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা করলো। এর মাধ্যমে মূলত কাব্যধর্মী বাংলা সাহিত্যর সামনে গদ্য রচনার উপযুক্ত এক নতুন নির্মাণের পথ খুলে গেল। আর ব্রিটিশ প্রভুরাও এর সুযোগে বাঙালী তথা সমগ্র ভারতবর্ষকে আগামী দেড়শ বছর শাসন করার পথে আরও এক কদম এগিয়ে গেলেন। শুধু দুঃখের বিষয় একটাই, যে নেটিভ মুদ্রাকরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও অসামান্য প্রতিভায় প্রথম সঞ্চালনযোগ্য বাংলা হরফগুলি প্রস্তুত হল সেই পঞ্চানন কর্মকারের নাম হ্যালহেড একবারের জন্যও উচ্চারণ করলেন না। তাঁর বইয়ের লম্বা ভূমিকায় উইলকিন্স সাহেবকেই তিনি যাবতীয় কৃতিত্ব দিয়ে গেলেন। আর ইতিহাসও চার্লস উইলকিন্সকেই বাংলা ছাপাখানার জনক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে দিলো। চির-পরিচিত ব্রিটিশ জাত্যাভিমানের বিদ্বেষমূলক ট্র্যাডিশানের স্বীকার হয়ে ইতিহাসের অগুনতি অকথিত নায়কদের সঙ্গে ইতিহাসের ফুটনোটের এক কোণে নিঃশব্দে রয়ে গেলেন আমাদের ঘরের ছেলে বাংলার প্রথম মুদ্রণ শিল্পী হুগলীর পঞ্চানন কর্মকার।

ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত 

প্রথম ছাপা বাংলা বই ও এক অকথিত নায়ক
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments