রোব্বারে সাড়ে আটটা পর্যন্ত যার ভোরবেলা থাকে না তিনি মুনি ঋষি ছাড়া আর কিছুই নন। আর আমাকে মুনিঋষি বলে গালি দেওয়ার হিম্মত আমার গিন্নিরও নেই। রোব্বারের ভোরবেলা। জানলার ফাঁকফোকর দিয়ে রোদ্দুর চলকে চলকে ঘরে ঢুকছে। আড়মোড়া ভেঙে এক চোখ বুজে খুব কষ্ট করে অন্য চোখের পাতা একটু ফাঁক করে দেখলাম দেওয়াল ঘড়িটা। আটটা বাজতে মিনিট সাতেক বাকি। এই কাকভোরে ঘুমটা চটকে যেতেই মেজাজটাও গেল চটকে। গায়ের চাদরটা যেমনি মাথা পর্যন্ত টেনে নিয়ে পরবর্তী রাউন্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছি ওমনি ভেসে এলো সেই কাঁসরঘণ্টার মত সুরেলা আওয়াজ,
- “কি গো! ঘুমচ্ছ নাকি মটকা মেরে পড়ে আছো?”
- “ঘুমচ্ছি, ডোন্ট ডিস্টার্ব..”

-

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালাম। সূয্যিদেব তখন সবে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথা টপকেছেন। একটা মালবাহী জাহাজ পোর্টে ঢুকছে। সেটা দেখতে দেখতেই কানে এলো কে যেন “দাদা দাদা” বলে ডাকছে। নিচে তাকিয়ে দেখি বাজারের থলি হাতে মেরিন আপিসের হেড ক্লার্ক মোহান্তিবাবু। পান দোক্তা রঞ্জিত বত্রিশপাটি বিকশিত করে জিজ্ঞেস করলেন,
- “কি দাদা চা খাচ্ছেন নাকি?
মনে মনে বললাম “না না, গিন্নি হল্লিকস দিয়েছে, বাড়ন্ত বয়েস তো..”, কিন্তু সেকথা মুখে আনি কি করে। মেরিন আপিসের বড়বাবু বলে কথা, আমাদের মাইবাপ। তাই আমার ব্রাশ না করা বসি দাঁত কেলিয়ে উত্তর দিলাম,
- “হ্যাঁ ভাই চা-ই খাচ্ছি।
আমার উত্তর পেয়ে ভীষণ উৎসাহে ওনার সেই পরবর্তী প্রশ্ন, যেটা গত বছর পাঁচেক ধরে প্রায় প্রত্যেক রোব্বার তিনি আমায় করেন, ছুড়ে দিলেন আমার দিকে।
- “রোব্বারে আপনার তো ছুটি?”
আমার সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ানো না দেখেই মোহান্তিবাবু রোজকারের মত হাঁটা দিলেন বাজারের দিকে। আমার খুব আক্ষেপ, গত পাঁচ বছর ধরে এই প্রশ্ন করেই উনি ফুড়ুৎ করে কেটে পরেন, আমার উত্তরটা না শুনেই। খুব ইচ্ছে করছিল তিনতলা থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে ওনাকে বলে আসি যে আপনার মতই রোব্বারে আমারও ছুটি। কিন্তু হলনা। গিন্নির তলব। বাজারের থলে।

-

আমার বাজার করার একটা আলাদা স্টাইল আছে। প্রথমেই সবজির দোকানের ছোকরাকে আলু, পেঁয়াজ, লঙ্কা ইত্যাদি প্রভৃতি ওজন করতে বলে সোজা মাছবাজারে। মাছ কিনে কাটতে দিয়ে চিকেনের দোকানে। চিকেনের দোকানে হাফ কেজি কিমা আর এককেজি মিডিয়াম সাইজ অর্ডার করে বেঞ্চে বসেছি। কিছুক্ষণ পরেই চৌধুরীদার আগমন। চৌধুরীদাও বাঙালীই, কিন্তু জম্ম কম্ম সবই এই পারাদ্বীপে। ওই সিগারেটের নেশাটা আর বিজয়ার দিন দেখা হলে শুভেচ্ছা আদান প্রদান ছাড়া বাঙালিত্ব আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তা চৌধুরিদাও চিকেনের অর্ডার দিয়ে আমার পাশেই বসল। পকেট থেকে প্যাকেট বের করে আমার দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
- “চিকেন নেবেন?”
- “না না! মাছের বাজারে বড্ড ভিড় বলে এখানে একটু রেস্ট নিচ্ছি..”
বলেই আমার থলেতে চিকেন ঢুকিয়ে হাঁটা দিলাম মাছবাজারের দিকে….

-

বাজার সেরে সোজা ‘শ্রীজগন্নাথ সুইটস’-এ। গিন্নির আজ কিসের যেন ব্রত তাই একবেলা ফলাহার। তার জন্যে রসগোল্লা, সন্দেশ, দই ইত্যাদি ইত্যাদি। গিন্নিদের এই ব্রতগুলো দেখলেই খুব হিংসে হয়। ইশ্! আমাদেরও যদি ব্রত থাকতো! নেই যখন তখন আর দুক্ষু করে কি লাভ। দই-মিষ্টি ভর্তি ক্যারিব্যাগ হাতে দোকানের বাইরে আসতেই দেখা ব্যানার্জিদার সাথে। অনেকদিন পরে দেখা। বেশ গদগদ হয়ে বললেন,
- “আরে, তুষার যে? মিষ্টি কিনতে বুঝি?”
মনে মনে চার অক্ষরের উপাধিতে ভূষিত করে বললাম, “হুইস্কি কিনতে এসেছি”, কিন্তু মুখে সেই ভদ্দরলোকের মুখোশ আর জিভে ধার করা মধু। ঈষৎ দাঁত কেলিয়ে বললাম,
- “হেঁ হেঁ হেঁ দাদা, ঠিকই বলেছেন। মিষ্টির দোকানে বিয়ার আর মেলে কই…”

-

ঘেমে নেয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই সাড়ে দশটা বাজে। খিদেয় পেটে ছুঁচোর ডন বৈঠক। গিন্নি মধুর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
- “তোমার খিদে পায়নি তো? মাছ মাংসগুলো ধুয়ে জলখাবার দিচ্ছি..”
- “না না, এই তো সবে সাড়ে দশটা…”
এগারোটা নাগাদ দুটো প্লেট হাতে গিন্নি এলেন। একটাতে চাউমিন আর অন্যটাতে দুটো রসগোল্লা আর একটা সন্দেশ। মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। নাঃ, গিন্নিকে দেখে নয়, হাতের প্লেটদুটো দেখে। মনোযোগ দিলাম জলখাবারে। চাউমিন উদরস্থ করে সবে সন্দেশে কামড় বসিয়েছি ওমনি বেজে উঠল মোবাইলের রিং। অচেনা নম্বর তবুও ধরতেই হল। “হ্যালো” বলতেই অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে এলো সুরেলা প্রমীলা কণ্ঠ,
- “হ্যালো! আমি কি মিঃ তুষার সেনগুপ্তের সাথে কথা বলছি?”
- “নাহ্! তুষার সেনগুপ্তের মোবাইলে জগদম্বা পাণ্ডে বলছি..”
বলতেই অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে এলো হাস্যপ্রলেপিত ভাষ্য,
- “ইউ আর জোকিং স্যার! আমি শ্রেয়া, আমি আইসিআইসিআই প্রুডেন্সিয়া থেকে……….”
কলটা না কেটেই মোবাইলটা টেবিলে রেখে মনোনিবেশ করলাম অর্ধভক্ষিত সন্দেশ আর রসগোল্লায়।

-

রোব্বারের দুপুর মানেই গুরুভোজন আর সাথে বোনাস দিবানিদ্রা। শীত দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই দুরে এঙ্কারেজে অপেক্ষমাণ জাহাজের আড়ালে সূর্য। লালচে আকাশের বুকে উদ্ধত ভাবে কালো ধোঁয়া ছেড়ে রিফাইনারির চিমনি জানান দিচ্ছে সন্ধে নামছে। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতেই নজরে এলো বিজু নায়েককে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছে। সামনের মার্কেটে ওর ইস্ত্রির দোকান। দিনের বেলায় ইস্ত্রি করে আর রাতে গাঁজা খায়। ইশারায় ওকে ডাকতেই জিজ্ঞেস করল,
- “ইস্ত্রি করার কাপড় জামা আছে?”
মনেমনে বললাম, “নাহ্! তোর কাছে গাঁজার পুরিয়া নেওয়ার জন্যে ডাকছি”, কিন্তু মুখে বললাম,
- “হ্যাঁ, আছে, নিয়ে যা।”
বিজুর হাতে কাপড় জামার থলেটা দিয়ে মনে পরল সিগারেট শেষ, আনতে হবে। মানিব্যাগটা নিয়ে নিচে গেলাম। দেখলাম মার্কেটের মুখেই হ্যান্ডেলে পা তুলে সিটের ওপর বসে আরাম করে বিড়ি ফুঁকছে রিকশাচালক হাবু। আমার মনে সারাদিনের প্রশ্নবাণের জ্বলুনি আর অসম্ভব প্রতিশোধস্প্রিহা। সব বেটাকে ছেড়ে শেষে হাবু ব্যাটাকে ধর। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
- “এটা তোর রিক্সা?”
প্যাসেঞ্জার জুটেছে ভেবে নড়েচড়ে বসে উত্তর দিল হাবু,
- “আজ্ঞে হ্যাঁ”
- “বড়পড়িয়া বাজারে যাবি?”
জিজ্ঞেস করতেই সিটে বসে হাবু একেবারে রেডি-স্টেডি-গো।
“যা!” বলেই পা বাড়ালাম সিগারেটের দোকানের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে দেখলাম কিংকর্তব্যবিমুঢ় বদনে তাকিয়ে আছে হাবু।

প্রশ্নগুলো_সহজ_আর_উত্তরও_তো_জানা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments