প্রাচীন পথ শ্বেতবর্ণ মেঘমালা – বুদ্ধদেবের পথে পথ চলা

(এই লেখাটি থিক নাট হান প্রণীত Old path white clouds নামে বইটির রূপান্তর )

প্রথম অধ্যায়

পথ চলার জন্যই পথ চলা

স্বস্তি নামের তরুণ ভিক্ষুটি বাঁশবনের ছায়ায় হাঁটু মুড়ে বসে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি লক্ষ রেখে মনোযোগ দিয়ে ধ্যান করছিল। প্রায় এক ঘন্টার ওপর তার ধ্যান হযে গেল । বাঁশবন মঠে আরো কয়েকশ’ ভিক্ষুও বাঁশগাছের ছায়ায় নয়ত নিজের পর্ণকুটিরে বসে ধ্যান করছিলেন।

মহাগুরু গৌতম, যাঁকে লোকে ভালবেসে “বুদ্ধদেব” নামে ডাকত, তিনি এই মঠে প্রায় চারশ শিষ্যের সঙ্গে বসবাস করতেন। মঠটি জনাকীর্ণ হলেও খুবই শান্ত। মঠটির চারপাশ ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় চল্লিশ একর জমি, মগধের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ধরণের বাঁশগাছ নিয়ে সাজানো। বাঁশবন মঠ থেকে উত্তরদিকে মগধের রাজধানী রাজগৃহ মাত্র তিরিশ মিনিটের হাঁটা পথ, মহারাজ বিম্বিসার এই মঠটি বুদ্ধদেব ও তাঁর সম্প্রদায়কে সাত বছর আগে উপহার দিয়েছিলেন।

স্বস্তি দুহাত দিয়ে চোখ ডলে স্মিত হাসল। তারপর পা দুটো ধীরে ধীরে সামনে ছড়িয়ে দিল সে। দু’পা টনটন করছে তার। এখন তার একুশ বছর বয়স, তিন দিন আগে বুদ্ধদেবের অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ শিষ্য সারিপুত্তের কাছে সে সন্ন্যাস নিয়েছে। সন্ন্যাসের সময় তার খয়েরী ঝাঁকড়া কেশদাম কেটে ফেলে সে এখন মুণ্ডিত মস্তক সন্ন্যাসী।

বুদ্ধদেবের সংঘের একজন হতে পেরে স্বস্তি খুবই আনন্দিত। এখানে বহু ভিক্ষুই অতি অভিজাত বংশজাত, যেমন শ্রদ্ধেয় নন্দ, যিনি সম্পর্কে বুদ্ধদেবের ভ্রাতা, তারপর দেবদত্ত, অনুরুদ্ধ, ও আনন্দ। স্বস্তির সঙ্গে যদিও এঁদের কারুর পরিচয় হয়নি, সে কেবল তাঁদের দূর থেকেই দেখেছে। যদিও তাঁদের মলিন বসন, তবুও তাঁরা যে অভিজাত মানুষ, বুঝতে ভুল হয়না।

স্বস্তি মনে মনে ভাবল, “এমন সব উচ্চকূলজাত মানুষজনের সঙ্গে সখ্যতা হতে ঢের দেরী আমার।” অথচ, বুদ্ধদেব, যিনি স্বয়ং রাজপুত্র, তাঁর সঙ্গে স্বস্তি দূরত্ব অনুভব করত না। স্বস্তি জাতিতে “অস্পৃশ্য”, সেকালে ভারতে জাতিভেদ প্রথানুযায়ী যতদূর নিম্নজাতির কথা ভাবা যায়, তাদের সকলের চেয়ে সে দরিদ্র, নিম্নতম জাতির মানুষ। দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে সে মহিষ চরিয়ে এসেছে, এই এখন দু সপ্তাহের ওপর এখানে সে অন্য সব সাধুদের সঙ্গে একত্র বসবাস করে। এখানে সকলেই তার প্রতি সদয়, তাকে দেখে আন্তরিক ভাবে হাস্যপূর্বক অভ্যর্থনা করে, তাকে দেখে গভীর সম্ভ্রমে মাথা নত করে, তবু, কেন যেন স্বস্তি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। স্বস্তির নিজের ধারণা তার ধাতস্থ হতে বেশ কয়েক বছর লাগবে।

এমন সময়, হঠাৎই, রাহুলের কথা মনে হতে তার হৃদয়ের গভীর হতে যেন আকর্ণবিস্তৃত হাসি জেগে উঠল। রাহুল বুদ্ধদেবের সন্তান, তার আঠারো বছর বয়স। রাহুল এই সঙ্ঘে তার দশ বছর বয়স থেকে আছে, মাত্র দু-সপ্তাহের মধ্যেই রাহুল আর স্বস্তির মধ্যে দারুণ সখ্যতা হয়েছে। রাহুলই স্বস্তিকে শিখিয়েছিল কিভাবে ধ্যানের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি নজর দিতে হয়। রাহুল ভিক্ষু না হলেও বুদ্ধদেবের শিক্ষা খুব ভালভাবে বুঝতে পারে। ২০ বছর না হওয়া অবধি রাহুলকে সন্ন্যাস গ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

স্বস্তির সেই দিনটির কথা মনে পড়ল। মাত্র দুসপ্তাহ আগের কথা। গয়ার কাছে তার গ্রাম উরুভেলা, সেখানে বুদ্ধদেব এসেছেন তাকে সন্ন্যাস গ্রহণের আমন্ত্রণ করতে। বুদ্ধদেব যখন তাদের বাড়িতে এলেন, তখন সে আর তার ভাই রূপক মোষ চরাতে গিয়েছিল, ঘরে ছিল তাদের দুই বোন, ষোল বছরের বালা, আর ১২ বছরের ভীমা। বালা বুদ্ধদেবকে দেখেই চিনতে পেরেছিল। সে দৌড়ে স্বস্তিকে ডাকতে যাচ্ছিল, বুদ্ধদেব বললেন, তার দরকার নেই। বুদ্ধদেব বললেন, তিনি সশিষ্য রাহুলসহ নদীর কাছে গিয়ে স্বস্তিকে নিজে খুঁজে নেবেন। বেলা পড়ে এসেছে, নৈরঞ্জনা নদীতে স্বস্তি আর রূপক মোষেদের গা ধোয়াচ্ছে, এমন সময় বুদ্ধদেব ও তাঁর শিষ্যগণ তাদের কাছে এলেন। বুদ্ধদেবকে দেখা মাত্রই স্বস্তি আর রাহুল দৌড়ে এল, দুহাত জুড়ে পদ্মপাণি হয়ে মাথা নত করে পরম ভক্তিভরে প্রণাম করল।

“কত বড় হয়ে গেছ তুমি স্বস্তি,”, বুদ্ধদেব স্বস্তি আর রূপককে বললেন। স্বস্তি তখন বাকরুদ্ধ। বুদ্ধদেবের প্রশান্ত মুখমণ্ডল, তাঁর আন্তরিক স্মিত হাসি, তাঁর উজ্জ্বল, গভীর আঁখিদ্বয় দর্শণ করে তাদের চোখে জল এসে গেল। বুদ্ধদেব একটি গেরুয়া রঙের পোষাক পরেছিলেন, তাতে ধানক্ষেতের প্যাটার্নে ছিট ছিট কাপড় দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সেলাই করা। বুদ্ধদেব নগ্নপদে হাঁটতেন, সেই দশ বছর আগেকার মতন, যখন প্রথমবার এই জায়গাতেই প্রায় স্বস্তি তাঁকে দেখেছিল। দশ বছর আগে নৈরঞ্জনা নদীতীরে এখান থেকে দশ মিনিটের হাঁটাপথে বোধি বৃক্ষের তলায় সে আর বুদ্ধদেব ঘন্টার পর ঘন্টা একসঙ্গে বসে কাটাত।

স্বস্তি বুদ্ধদেবের সঙ্গী কুড়িজন শিষ্যদের দিকে চেয়ে দেখল। তাঁরাও বুদ্ধদেবেরই মতন, নগ্নপদ, তাঁদেরও, বুদ্ধদেবেরই মতন, গায়ে ছিট কাপড় দিয়ে সেলাই করা গেরুয়া আলখাল্লা। স্বস্তি আরো ভাল করে দেখল। বুদ্ধদেবের পরণের পোষাক অন্যদের তুলনায় আরো একহাত মতন দীর্ঘ। বুদ্ধদেবের পাশে প্রায় স্বস্তির বয়সী আরেকটি যুবক, সে স্বস্তির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে মৃদু হাসল। বুদ্ধদেব স্নেহভরে স্বস্তি আর রূপকের মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, রাজগৃহে যাবার পথে তিনি দেখা করতে এসেছেন। বললেন, স্বস্তি আর রূপক মোষদের চান করিয়ে নিক, ততক্ষণ তিনি ও তাঁর শিষ্যরা সানন্দে অপেক্ষা করবেন, যাতে সবাই মিলে একসঙ্গে স্বস্তিদের পর্ণকুটিরে হেঁটে যেতে পারেন।

যেতে যেতে বুদ্ধদেব স্বস্তি আর রূপকের সঙ্গে রাহুলের, যে যুবকটি স্বস্তির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসছিল, পরিচয় করিয়ে দিলেন। রাহুল স্বস্তির থেকে তিন বছরের ছোট, তবে মাথায় মাথায়। রাহুল তখন শমনীর, যদিও সে অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুদের মতনই পোষাক পরেছিল। রাহুল স্বস্তি আর রূপকের মধ্যে হাঁটছিল, রূপকের হাতে ভিক্ষাপাত্রটি ধরিয়ে দিয়ে স্বস্তি আর রূপকের কাঁধে দু-হাত বিছিয়ে দিয়ে হাঁটছিল সে। রাহুল তার বাবার কাছে স্বস্তি আর তার পরিবারের কথা এতবার শুনেছে যে রাহুলের মনে হল যে সে এদের দুজনকে কতদিন ধরেই যেন চেনে। রাহুলের ভালবাসায় স্বস্তি আর রূপকও খুবই প্রীত।

স্বস্তিদের বাড়ি পৌঁছে, বুদ্ধদেব স্বস্তিকে ভিক্ষুসংঘে যোগদান করে তাঁর সঙ্গে ধর্মচর্চা করার আমন্ত্রণ জানালেন। দশ বছর আগে, যখন স্বস্তির সঙ্গে বুদ্ধদেবের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল, স্বস্তি তখন তাঁর সঙ্গে ধর্মচর্চা করার অভিপ্রায় পেশ করেছিল, ও বুদ্ধদেব স্বস্তিকে তাঁর শিষ্যত্বে বরণ করে নিতে রাজি হয়েছিলেন। এখন স্বস্তির ২১ বছর বয়স, বুদ্ধদেব ফিরে এসেছেন। বুদ্ধদেব তাঁর প্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হন নি।

রূপক তাদের মালিক রামভুল বাবুর কাছে মোষগুলো ফেরত দিয়ে এল। বুদ্ধদেব স্বস্তিদের কুটিরের বাইরে একটি ছোট টুলের ওপর বসলেন, অন্যান্য ভিক্ষুরা তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে রইলেন। স্বস্তিদের মাটির একচালা ছোট কুঁড়েঘর, সেখানে সশিষ্য বুদ্ধদেবের সকলের জন্য জায়গা হবে না। বালা স্বস্তিকে বলল, “দাদা, তুমি বুদ্ধদেবের সঙ্গে চলে যাও। আমি বাড়িঘর সামলাতে পারব, রূপকদাদার গায়ে যথেষ্ট শক্তি, তুমি ওর বয়সে যা ছিলে তার থেকেও বেশী, ও মোষগুলোকে সামলে নেবে। তুমি তো দশ বছর ধরে আমাদের পালন করে এলে দাদা, আমরা এখন নিজেরা নিজেদের সামলে নিতে পারব।”

কুটিরের এক প্রান্তে বৃষ্টির জল ধরে রাখার একটি জলপাত্র ছিল। তার পাশে ভীমা বসে ছিল। ভীমা তার দিদির দিকে অপলক নেত্রে চেয়ে রইল। স্বস্তি ভীমার দিকে তাকাল। ভীমা মেয়েটা বড় মিষ্টি। স্বস্তির সঙ্গে যখন বুদ্ধদেবের প্রথম আলাপ হয়, তখন বালার বয়স ছয়, রূপকের তিন, ভীমা তখন কোলের শিশু। সেই বয়সে বালা তাদের সংসারের জন্য রান্নাবান্না করত, রূপক মাটিতে খেলা করে বেড়াত।

তার ছ’মাস আগে তাদের বাবা মারা গেছেন, মা ভীমার জন্মের সময়ই মারা গেছেন। এগার বছর বয়সে স্বস্তিই তখন তাদের পরিবারের অভিভাবক। সে মোষ চরানোর কাজ পেল; স্বস্তি যেহেতু মন দিয়ে কাজ করত, যা পেত তাতে সংসারটুকু চলে যেত। এমনকি ভীমার জন্য মোষের দুধও নিয়ে আসত সে।

ভীমা জানে স্বস্তি তার মনের ভাব বুঝতে চাইছে। সে স্মিত হাসল। তারপর ক্ষণমাত্র থমকে মৃদুস্বরে বলল, “যাও দাদা, বুদ্ধদেবের সঙ্গে যাও।” বলেই চোখের জল আড়াল করার জন্য মুখ ঘুরিয়ে নিল সে। ভীমা স্বস্তির মুখে তার বুদ্ধদেবের কাছে শিক্ষাগ্রহণের ইচ্ছের কথা এতবার শুনেছে যে সেও মনে প্রাণে চাইত দাদা বুদ্ধদেবের কাছে শিখতে যাক। এখন যখন সেই ক্ষণ সমাগত, সে আর চোখের জল চাপতে পারল না।

এমন সময় রূপক ফিরে এল। ভীমার কথা,“যাও দাদা, বুদ্ধদেবের সঙ্গে যাও”, তারও কানে এল। সে বুঝল সময় সমাগত। স্বস্তির দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ দাদা, তুমি বুদ্ধদেবের সঙ্গে যাও।” তারপর গোটা পরিবার চুপ করে রইল। রূপক বুদ্ধদেবের পানে চেয়ে বলল, “প্রভু, আশা করব আপনি আমার দাদাকে আপনার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে অনুমতি দেবেন। আমি আমার পরিবারের দেখভাল করতে প্রস্তুত।” রূপক স্বস্তির দিকে চেয়ে তার চোখের জল রুদ্ধ করে বলল, “তবে দাদা, তুমি বুদ্ধদেবকে অনুরোধ কর যেন তিনি তোমাকে মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে এসে দেখা করতে দেন।”

বুদ্ধদেব উঠে দাঁড়িয়ে ভীমার চুলে স্নেহভরে হাত বুলোলেন। “হে মোর সন্তানগণ, তোমরা খাবার খেয়ে নাও। কাল সকালে আমি স্বস্তির জন্য আবার ফিরে আসব। আমরা সবাই একসঙ্গে রাজগেহে যাব। আজ আমি ও অন্যান্য ভিক্ষুগণ বোধিবৃক্ষের তলায় রাত্রি যাপন করব।”

বুদ্ধদেব যখন বাহির দরজায় পৌঁছলেন, তখন স্বস্তির দিকে পেছন ফিরে তাকালেন, ও বললেন, “স্বস্তি, কাল সকালে তোমাকে কিছু নিয়ে আসতে হবে না, যা পরে আছ, তাতেই হবে।”

সেদিন চার ভাইবোন গভীর রাত অবধি জেগে রইল। বিদায়কালে পিতার ন্যায় স্বস্তি তাদের যত্ন নেবার ব্যাপারে, গৃহ দেখভাল করার ব্যাপারে উপদেশ দিলে। সে সবাইকে অনেকক্ষণ ধরে গভীরভাবে আলিঙ্গন করল। ভীমা আর থাকতে পারল না, কাঁদতে লাগল। তারপর সে দাদার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মিতহাস্যে চেয়ে রইল। সে চায় না স্বস্তি দুঃখ পাক। লণ্ঠনের নিভু নিভু আলোয় দেখা যায় কি না যায়, স্বস্তি ভীমার স্মিত হাসি দেখে অন্তরে আপ্লুত বোধ করল।

পরের দিন ভোরে, স্বস্তির বন্ধু সুজাতা বিদায় জানাতে এল। আগের দিন বিকেলে সুজাতা যখন নদীতীরে যাচ্ছিল, এমন সময় তার সঙ্গে বুদ্ধদেবের দেখা হয়। তখন বুদ্ধদেব তাকে বলেন যে স্বস্তি তাঁর ভিক্ষুসঙ্ঘে যোগ দেবে। সুজাতা গ্রামাধ্যক্ষের কন্যা, সে বয়সে স্বস্তির চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। সেও স্বস্তির মতই, গৌতম যখন বুদ্ধদেব হননি, সেই সময় থেকে তাঁকে চেনে। সুজাতা স্বস্তিকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি জড়িবুটির ওষুধের শিশি দিল। একটু কথাবার্তা বলতে না বলতেই সশিষ্য বুদ্ধদেব এসে পড়লেন।

স্বস্তির ভাইবোনেরা দাদাকে বিদায় জানাবে বলে আগে থেকেই জেগে আছে। রাহুল সকলের সঙ্গে কথা বলল, মন শক্ত করে সকলে সকলের যাতে দেখভাল করতে পারে, সে কথা বলল। বলল, যখনই উরুভেলার কাছে আসবে, তাদের সঙ্গে দেখা করে যাবে। সুজাতা ও স্বস্তিরা সকলে বুদ্ধদেব ও অন্যান্য ভিক্ষুদের সঙ্গে নদীতীর অবধি এল, তারপর তারা করজোড়ে বুদ্ধদেব, অন্যান্য সন্ন্যাসীগণ, রাহুল, আর স্বস্তিকে বিদায় জানাল।

স্বস্তি আনন্দে ভয়ে হতবিহ্বল। পেটে তার জট পাকিয়ে গেছে। এই প্রথমবার সে উরুভেলা ছেড়ে বেরিয়েছে। বুদ্ধদেব বললেন, রাজগৃহ পৌঁছতে দশ দিন লাগবে। বেশীর ভাগ লোক এ পথ আরো দ্রুত পেরিয়ে যেত, কিন্তু বুদ্ধদেব ও তাঁর ভিক্ষুরা পরমানন্দে স্তিমিত পায়ে পথ হাঁটতেন। স্বস্তির চলন ক্রমশ ধীরগতি হল, তার হৃদয়ের চাঞ্চল্য কমে এল। এখন সে বুদ্ধে, ধর্মে, সঙ্ঘে সম্পূর্ণ সমর্পিতপ্রাণ, সে জানে এই তার পথ। একবার শেষবারের মতন সে তার জন্মভূমি আর চেনা মানুষজনের দিকে পিছন ফিরে চেয়ে দেখলে, তার পরিবার আর সুজাতা অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায় ক্রমশ অপসৃয়মান।

স্বস্তির বোধ হল, বুদ্ধদেব যেন কেবল পথ হাঁটার আনন্দের জন্যই পথ হাঁটেন। কোথাও যে আদৌ পৌঁছতে হবে সে বিষয়ে তিনি যেন সম্পূর্ণ উদাসীন। ভিক্ষুদেরও অবস্থা তদ্রূপ। গন্তব্যে পৌঁছনোর ব্যাপারে কারো কোন প্রকার উদ্বেগ কি তাড়াহুড়ো নেই। প্রতিটি মানুষের পদক্ষেপ ধীর, স্থির, শান্ত। যেন সকলে মিলে মজা করে বেড়াতে বেরিয়েছেন। কাউকে ক্লান্ত দেখায় না, অথচ সকলে সারাদিনে অনেকটা পথ হাঁটেন।

প্রত্যেক দিন সকালে তাঁরা কাছাকাছি একটি গ্রামে থেমে সেখানে মাধুকরী করতেন। বুদ্ধদেবকে সামনে রেখে তাঁরা একটি সরল রেখায় হাঁটতেন। স্বস্তি রাহুলের পিছনে সকলের শেষে থাকত। তাঁরা শান্তমনে একাগ্রচিত্তে সম্ভ্রমে আপনাপন শ্বাস ও পদক্ষেপের প্রতি নজর রেখে হাঁটতেন। মাঝে মাঝে যখন গৃহস্থেরা তাঁদের ভিক্ষাপাত্রে খাবার দিত, তখন থেমে যেতেন। কোন কোন গ্রামবাসী পথের ধারে নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানাত। ভিক্ষুরা যখন খাবার গ্রহণ করতেন, তাঁরা মানুষের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করতেন।

ভিক্ষা শেষে তাঁরা ধীরে ধীরে গ্রামের বাইরে গাছের ছায়ায় কি মেঠো প্রান্তরে জায়গা খুঁজে বার করে খাবার গ্রহণ করতেন। তাঁরা গোল হয়ে বসে খাবার সমান ভাবে ভাগ করে নিতেন, যাতে সকলের বাটিতে সমান খাবার থাকে, কারো বাটি যেন অপূর্ণ না থাকে। রাহুল কাছাকাছি কোন নদী বা জলাশয় থেকে ঘড়া করে জল নিয়ে এসে বুদ্ধদেবের কাছে পরম শ্রদ্ধাভরে নামিয়ে রাখত। বুদ্ধদেব হাত জোড় করে পদ্মপাণি হতেন, তখন রাহুল বুদ্ধদেবের হাতে সেই জল ঢেলে হাত ধুইয়ে দিত। সকলের জন্যই রাহুল এই কাজটি করত, সকলের শেষে সে স্তস্তির কাছে আসত। স্বস্তি তখনো ভিক্ষাপাত্র পায়নি। রাহুল তাই তার খাবারের অর্ধাংশ একটি নতুন কলাপাতায় তুলে তার বন্ধুকে দিত। অন্ন গ্রহণের পূর্বে ভিক্ষুগণ হাত জোড় করে প্রার্থনা করতেন। তারপর তাঁরা নিঃশব্দে, পরম মনোযোগ সহকারে প্রতিটি খাবার গ্রহণ করতেন।

খাবার শেষ করে, কোন কোন ভিক্ষু হাঁটার ধ্যানাভ্যাস করতেন, কোন কোন ভিক্ষু বসে ধ্যান করতেন, আবার কেউ কেউ অল্প করে ঘুমিয়ে নিতেন। তারপর খুব গরম যখন পড়ে আসত, তখন আবার পথে নামতেন। প্রায়ান্ধকার হওয়া অবধি হাঁটতেন। রাত কাটানোর সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা নিরুপদ্রব জঙ্গল, তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত একটি উপযুক্ত জায়গা পাওয়া যেত, তাঁরা হাঁটতেন। প্রতিটি ভিক্ষুর যাঁর যাঁর নিজের নিজের আসন ছিল; অনেকে প্রায় মাঝরাত অবধি পদ্মাসনে বসে ধ্যান করতেন, তারপর নিজের পরিধেয় পোষাক মাটিতে বিছিয়ে শুয়ে পড়তেন। প্রত্যেক ভিক্ষু দুটি করে বস্ত্র সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন, একটা পরতেন, আরেকটা ব্যবহার করতেন দমকা হাওয়া কি শীতলতার প্রকোপ থেকে বাঁচবার জন্য। স্বস্তিও অন্যান্যদের মত ধ্যানে বসত, সেও মাটিতে গাছের শিকড়কে বালিশ করে শুতে শিখে গেল।

স্বস্তি যখন পরের দিন ঘুম থেকে উঠত, দেখত বুদ্ধদেব ও অন্যান্য ভিক্ষুরা শান্তমনে ধ্যানে বসে আছেন, তাঁদের শরীর হতে চতুর্দিকে গভীর শান্তি ও মহত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ছে। ক্রমশ প্রভাত-সূর্য দিগবলয় অতিক্রম করত, তখন প্রত্যেক ভিক্ষু তাঁদের নিজ নিজ পরিচ্ছদ গুটিয়ে নিয়ে ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে, দিনের যাত্রা শুরু করতেন।

এইভাবে দিনে পথ চলে, আর রাতে বিশ্রাম নিয়ে দশ দিন পরে তাঁরা মগধের রাজধানী রাজগৃহে পৌছলেন। স্বস্তি সেই প্রথম শহর দেখল। রাজপথের চারপাশে জনাকীর্ণ গৃহ, রাজপথে অশ্ববাহিত শকট ছুটে যাচ্ছে, হাস্য-কোলাহলে চতুর্দিক মুখরিত। তবে যে শান্ততায় ভিক্ষুগণ নদীতীর বা ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন, সেই একই রকম শান্ত পদচারণায় তাঁরা নিঃশব্দে এই শহরের রাজপথেও হেঁটে চললেন। নাগরিকদের কেউ কেউ তাঁদের দেখে থামলেন, কেউ কেউ বুদ্ধদেবকে দর্শণ করে মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানালেন। ভিক্ষুগণ শান্ত শোভাযাত্রায় হেঁটে চললেন। এই করে তাঁরা নগরের প্রান্তে বাঁশ বন মঠে উপস্থিত হলেন।

বুদ্ধদেব প্রত্যাবর্তন করেছেন, এই বার্তা মঠের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। ক্ষণকালের মধ্যে, চার শত ভিক্ষু তাঁকে অভ্যর্থনা করতে সমবেত হলেন। বুদ্ধদেব বিশেষ কিছু বললেন না, শুধু সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন, আর তাঁদের ধ্যান কেমন চলছে জিজ্ঞাসা করলেন। রাহুলের ধর্মগুরু সারিপুত্তের হাতে স্বস্তিকে সমর্পণ করলেন। বাঁশ বন মঠে যাঁরা নবাগত, সারিপুত্ত তাঁদের গুরু, তিনি পঞ্চাশ জন নবাগত তরুণ সন্ন্যাসীর অধ্যয়নের তত্ত্বাবধান করতেন, এঁরা সকলেই মঠে তিন বছরের কম থেকেছেন। এই মঠের যিনি মঠাধীশ, তাঁর নাম কৌণ্ডিন্য।

স্বস্তিকে মঠের জীবন সম্বন্ধে — কেমন ভাবে হাঁটতে হবে, কেমন ভাবে ধ্যানে বসতে হবে, কেমন ভাবে মানুষকে অভ্যর্থনা করতে হবে, কেমন করে হাঁটা ও বসে ধ্যান করতে হবে, কেমন করে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস অবলোকন করতে হবে — এই সব শিখিয়ে দেবার দায়িত্ব রাহুলের ওপর পড়ল। সে স্বস্তিকে দেখিয়ে দিল কিভাবে সন্ন্যাসীর পোষাক পরতে হয়, কিভাবে মাধুকরী করতে হয়, কিভাবে প্রার্থনা করতে হয়, কিভাবে ভিক্ষাপাত্র পরিষ্কার করতে হয়। পর পর তিন দিন এই সব কাজ শিখে নিতে হবে, তাই, স্বস্তি রাহুলের পাশ থেকে নড়ল না। রাহুল মন দিয়ে স্বস্তিকে শিখিয়ে দিয়েছিল, তাহলেও স্বস্তি জানত যে এ সব কাজ যথাযথ স্বাভাবিক ভাবে করতে গেলে বছরের পর বছর অভ্যাস করে যেতে হবে। এইসব প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হলে সারিপুত্ত স্বস্তিকে কুটিরে ডেকে নিলেন ও তাকে ভিক্ষুর কি করণীয় তা বুঝিয়ে বললেন।

যিনি ভিক্ষু, তিনি বুদ্ধদেবের অনুগামী হবার জন্য তাঁর পরিবার পরিজন ত্যাগ করবেন, করে, বুদ্ধদেবকে গুরু, ধর্মকে জাগরণের পথ, এবং সংঘকে সে পথে অগ্রসর হবার পাথেয় মেনে অনুসরণ করবেন। ভিক্ষুর জীবন সহজ সরল। অন্নগ্রহণের নিমিত্ত ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করলে নম্রতাবোধের প্রতিপালন করা হয়, এতে করে গৃহীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়, ও বুদ্ধদেব যে প্রেম-বোধির পথের শিক্ষা দিয়েছিলেন তা তাদের বোঝানো যেতে পারে।

দশ বছর আগে বোধিবৃক্ষের নীচে স্বস্তি ও তার বন্ধুরা বুদ্ধদেবের কাছে জাগরণ, প্রেম, বোধির কথা শুনেছিল, তাই সারিপুত্ত যে কথা বললেন, সে সব তার পক্ষে হৃদয়ঙ্গম করা সহজ ছিল। সারিপুত্তের মুখে যদিও গাম্ভীর্য ছিল, তাঁর দুচোখ আর স্মিত হাসিটিতে প্রতিভাসিত অন্তরের উষ্ণতা আর করুণা । তিনি স্বস্তিকে জানালেন যে সংঘে তাকে গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ অনুষ্ঠান করা হবে, এবং সে অনুষ্ঠানে স্বস্তিকে কি বলতে হবে তাও শিখিয়ে দিলেন।

সারিপুত্ত স্বয়ং দীক্ষাগ্রহণ অনুষ্ঠানের পৌরোহিত্য করলেন। প্রায় ২০ জন ভিক্ষু তাতে অংশগ্রহণ করলেন। স্বস্তির দেখে বড় আনন্দ হল যে স্বয়ং বুদ্ধদেব ও রাহুল তাতে উপস্থিত ছিলেন। সারিপুত্ত নীরবে একটি গাথা স্তব করলেন, তারপর নিজের হাতে স্বস্তির মাথার চুলের কিছু অংশ কেটে দিলেন। তারপর রাহুলের হাতে ক্ষুর তুলে দিলেন, সে স্বস্তির মাথা কামিয়ে দিল। সারিপুত্ত রাহুলকে তিনটি পরিধেয় বস্ত্র দিলেন, একটি ভিক্ষাপাত্র দিলেন, ও একটি জল পরিশ্রুত করার যন্ত্র দিলেন। রাহুল তো তাকে শিখিয়েই দিয়েছে কিভাবে সন্ন্যাসীর পরিধান পরতে হবে, সে তাই সহজেই তার বস্ত্র পরিধান করল। সে বুদ্ধদেব ও অন্যান্য উপস্থিত ভিক্ষুদের সামনে নতমস্তক হয়ে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করল।

পরে সেইদিন সকালবেলায় স্বস্তি জীবনে প্রথমবার দীক্ষিত ভিক্ষু হয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ভিক্ষা অন্বেষণে বেরোল। বাঁশবন মঠের ভিক্ষুরা রাজগৃহে ছোট ছোট দলে একত্রিত হয়ে মাধুকরীতে বেরোতন, স্বস্তি সারিপুত্তের দলে চললেন। মঠের থেকে কয়েক পা বেরিয়েই স্বস্তি স্মরণ করলেন যে পথ অবলম্বন করতে গেলে ভিক্ষাবৃত্তি এ পথে একটি যান। নীরবে মনোনিবেশপূর্বক প্রতিটি পদক্ষেপ নিলেন, শ্বাস প্রশ্বাসের প্রতি অবলোকন করতে থাকলেন। রাহুল তাঁর পেছন পেছন রইলেন। এখন তিনি ভিক্ষু হতে পারেন, কিন্তু স্বস্তি জানেন যে রাহুলের তুলনায় তাঁর অভিজ্ঞতা নেহাতই কম। আপন অন্তরে নম্রতা ও সদগুণ পালনের জন্য তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন।

প্রাচীন পথ শ্বেতবর্ণ মেঘমালা – প্রথম অধ্যায়
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments