[গভীর ভোর। লিখবার তরে মন আঁকুপাঁকু। আয়রনি হোক বা হিউমার , মিলিয়ে মিশিয়ে কিছু একটা জগঝম্প । কপি জঙ্গুলে হোক বা খাঁচার , লেজ তুলে লাফালেই চিত্তির ; ফুলকপি দেশী হোক বা ধাপার , খ্যাঁটনযুগ্যি হলেই জমে ক্ষীর। কিন্তু আপাত-দৃষ্টিকোণে সব সাবজেক্ট এবসোলিউট সিলুয়েটে , তায় আবার ব্যাক টু ক্যামেরা। তাই নিভন্ত বা জীবন্ত কিসসু দাঁড়াচ্ছে না। সাপের ফনা জাগানো কোন উদীয়মান সুজ্জিমামার দেশের তরল খাতার সাদা পাতায় ঢেলে দেখলে হয় কিনা ভাবতে ভাবতে প্রেসেনট কন্টিনিউয়াসে কলম চোষা এবং ঘুম ঘুম ভাব। আসে বিদঘুটে স্বপ্ন। অতীত ঘাঁটলে ফ্যাকাসে লোহিত ঘোর আর বর্তমান দেওয়াললিখনে আগাছার মত কিছু জংলী ফুলের জড় ; তাই স্বপ্নের মধ্যেই বসন্তের জন্য বিলাপ না করে গড়পড়তা মানুষের মত ভবিষ্যত আঁচড়ানোর চেষ্টা চালাই। গুচ্ছের স্পট ফিক্সিং এবং জ্যাকপট ইনকামের মাঝে মাঝে একজন ট্যাবলেট মহিলা লোকজনের বেডরুম , বাথরুমের প্রাইভেসিতে ঢুকে অদ্ভুত নেচে নেচে বলেন – “সিরফ দেখনে ক্যা নেইইই..."।আমি কাকা নেচে গপ্পাতে পারব না , তাই লিখে রাখছি।

শহর কলকাতা তথা বাংলা মায় ভারত কোন এক অজানা মারণ ভাইরাসে মানবহীন , বাক্যহীন। “গো গোয়া গন”এর ছিবড়ে জম্বি নয় , ধড়াচুড়ো ক্যানাইন বাগানো কাউনট নন , স্রেফ ভারতীয় ভূত শহরময়। ভালো জিনিস এমনিই আমার রেটিনায় বন্ধ বা খোলা কোন অবস্থাতেই ফোকাসে আসে না। আর এ তো নিতান্তই ইনোসেন্ট স্বপ্নের স্ক্রিপ্ট। তাই চরিত্রে যারা রয়েছেন তাদের কাউকে কাউকে মনপছন্দ না হলেও কিসসু করার নেই...]

উল্টোডাঙ্গার ভাঙা ব্রিজের নীচে জুম ইন করতেই চোখে পড়ল বসে আছেন শ্রীমতী ক্ষমতা দেবী। হাতে ঝ্যাঁটা। জীবিতাবস্থায় এভাবেই সমস্ত বাদ অপবাদ ঝেটিয়ে বিদেয় করতেন। তাকে না বলে কেউ তর্ক করতে পারবে না , আঁকতে পারবে না , লিখতে পারবে না , ইচ্ছেমত কাগজপত্র পড়তে পারবে না ইত্যাদি ইত্যাদি । মন্ত্রীদের যখন তখন ওঠবস করাচ্ছেন , ফেবুতে তার কার্টুন ছাপালেই খাঁচায় পুরছেন… ।
সে এক মজার ইতিহাস। আসলে সোনার কেল্লায় বসেই মুণ্ডু ঘুরে গিয়েছিলো । ভাইরাস তাকে মেরে বাঁচিয়েছে বলা চলে । পচা ডোবার আশেপাশে তার সাঙ্গোপাঙ্গরা । কেউ কেউ আবার আধো চাঁদের আলোতেই জলে ছিপ ফেলে বসে রয়েছেন। দেরিদা অথবা সারদা , কিছুতেই আপত্তি নেই। যেখানে টাকার বাড়বাড়ন্ত সেখানেই বঁড়শি খেলিয়ে টাকা তোলেন। আপাতত তারা জুতো , চটি , ছেঁড়া টায়ার যা উঠছে সাইড করে রাখছেন।

ব্রিজের ভাঙা অংশটার ওপরে বগলে নিজের মুণ্ডুটা চেপে ধরে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন রিক্ত সেন। মাঝে মাঝে হাত লম্বা করে গাছ থেকে বেল পেড়ে লোফালুফি করছেন। ইনি এখন একজন বিরক্ত এবং পিওর স্কন্দকাটা। তুমুল চিটিং করবার পরেও পুলিশি হেফাজত থেকে বেকসুর খালাস পান তিনি। অতঃপর একজন পুরনো অমানতকারি রাঁচি থেকে পালিয়ে এসে তার পুরো মুড়োটাকেই খ্যাচ করে অমানত হিসেবে নিয়ে যায় । দেড়েল দেব , হোঁদল মিত্ররা নীচের থেকে ডাকাডাকি করছেন। কেস কিচাইন হওয়ার সময় ছিল কোথায় এরা ? তখন আম আদমি মেরে আমড়াগাছি করতে বাধে নি ; আর এই সামান্য ভাঙা ব্রিজের রিস্ক ! বলে উঠলেন
“ভুতের আবার মরবার ভয় কি রে শালা ? পয়সা খেয়েও টাইমলি সেভ করতে পারিস নি। গোয়েন্দার মার, ক্যাওড়াতলা পার। ক্ষমতা দিদি না বাঁচালে তো…”।

থামের আড়ালে ছড়িয়ে বসে হলুদ হাফপ্যান্ট পরা বাচাল ঘোষ একটা পুরনো হলদে ভুডু পুতুলের পা চুষছিলেন। এখন জিভ ক্ষয়ে গেলেও পুরনো অভ্যাস তো। আওয়াজ শুনে গলা বাড়াতেই রিক্ত সেন টিপ করে একটা কৎবেল ছুঁড়লেন। লাগতেই আড়াল থেকে কুঁই কুঁই করে অভিযোগ এলো -
“দেখুন মাননীয়া ক্ষমতা দেবী, একজন সাংবাদিককে বেল দিয়ে ইয়ে… আই উইল স্ক্রিউ দ্যাট স্কাউন্দ্রেল”।
রিক্ত সেনও কড়কে উঠলেন-
“গুঁফো হাড়গিলে । লক্ষ লক্ষ টাকা গিলে আবার লুকোচুরি ? মিডিয়া হ্যান্ডেলিং কি বারোয়ারি পুজোর খিচুড়ি ?”
দেড়েল দেব বাঁটুলের স্যাঙাৎ লম্বকর্ণের পোজে কান পেতে ছিলেন –
“বাচালটা ইংরেজিতে কি বলল রে”?
হোঁদল দেব ভাও খেয়ে গেলেন। একটা ঝোপে বেকহ্যাম স্টাইলে কিক ঝেড়ে খিক খিক করে হেসে বললেন –
“অ তুই তো আবার কলেজ ফেলটু মাল। স্কাউন্দ্রেল একটা বিদেশী বাসের কোড। ওটার স্ক্রু ট্রু খোলার কথা বলছে। এককালে কত্ত পুড়িয়েছি…”।
হোঁদল বাবুর নষ্টাল হওয়ার মাঝেও তাচ্ছিল্য লুকিয়ে ছিল। দেড়েল দেব অবশ্য এসব তুচ্ছ ব্যাপারে রাগ করেন না। তার কাছে ন্যানোটিউব আর ইউটিউব একই বস্তু,ফোর জি আর দর্জি একই ব্যাক্তি। নেতা হতে গেলে রেলের কামরা গুনতে , ঘাড় নাড়তে আর সইসাবুদ করতে পারলেই হয়। ভাগ্য ভালো হলে কার্টুনে পাবলিসিটিও হয়। তাই উল্টে ফিক করে হেসে ফেললেন।

এদিকে মনমরা রিক্ত সেন ভালোই জানেন যে ঝাড় হওয়া পছন্দের বই , বাজেয়াপ্ত হওয়া চিটফান্ডের টাকা ফেরত পাওয়া আর কেটে নেওয়া মাথা জুড়ে দেওয়া অনেকটা টিউবে নিজের হাতে টুথপেস্ট ঢোকানোর মতই অসম্ভব। এসব ভাবতে ভাবতেই কয়েকটা ভাঙা কংক্রিটের টুকরো নীচে ছুঁড়ে ফেললেন। তক্ষুনি এন কে সলিলের বাওয়াল ভাষায় রাগত মহিলা কণ্ঠ শোনা গেলো –
কে খুলছে বে খাপ ? আমি রাফ এন্ড টাফ। ওপর থেকে পাথর ছোঁড়ায় নিষেধাজ্ঞা নিয়ে একটা বিল আনতে হবে দেখছি।
কাগুজে বিল তো দূরের কথা। ভূত হয়ে যে সব্বাই খাল বিলে বাস করছে সেটাই বেমালুম ভুলে গেছেন তিনি। মাথা না থাকায় লুকোনোর কিছু নেই তাই রিক্ত সেন চট করে পা তুলে লুকিয়ে পড়লেন। তুলির অভাবে ঝাঁটায় কাদা লাগিয়ে ছবি আঁকছিলেন ক্ষমতা দেবী। আগামী আধ ঘণ্টায় পার মিনিটে একটা হিসেবে ছবি এঁকে যেতে চান তিনি। তারপর চিত্রশিল্পী হাসিখুশি ঘোড়েলকে দিয়ে ফিনিশিং টাচ দেবার আছে। এটুকু না পারলে পাবলিকের কড়ি গচ্চা দিয়ে আর্টিস্ট পোষা কেন ! তাই আশেপাশে বিশেষ আমল দিলেন না।

কুয়াশা ঠেলে দুজন বয়স্ক ভূত আদুর গায়ে লাল লুঙ্গি পরে ডোবার পাড়ে এসে জুত করে বসলেন। একজন একটা বিড়ি মুখে নিয়ে পাশের জনকে বললেন -
“ আগুন দেবেন কম রেড বিকল ? আনতে ভুলে গেছি। বারবার ভুল হয়… বারবার”।
বিকল বলে যাকে ডাকা হল তিনি বার দুই জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিয়ে খ্যাঁক করে উঠলেন।
“সবসময় ভুল ভুল করে তুই শালা ইলেকশনটাকেই ঝুলিয়ে দিলি। এটা কি “পক্বকেশ বুড়োর দল” নাকি দেশলাইয়ের শপিং মল ”?
রাগ করবেন না কম রেড। প্রেসিতে থাকার আউটবার্সট । তাছাড়া সিনেমা সাহিত্য নিয়ে কালচারে চা বিড়ি মাস্ট।
আপনিও মশাই ক্ষমতা দেবীর স্কেলেই চলছেন। কেউ গোপনে খুন করে, কেউ ঘোষণা করে ; কেউ খোঁজে কার্ল মার্ক্স , কেউ রবিঠাকুরে।
বেয়ার গ্রাইলস স্টাইলে আগুন জ্বালাবার জন্য পাথরে কাঠ ঘষতে ঘসতে প্রথম বুড়ো বিড়বিড় করলেন
“সব গেছে যত ঘটি বাটি ; রাইটার্স বাড়ি যেন ঝলসানো রুটি”।

দুই বুড়োর তক্ক তারিয়ে তারিয়ে ওভার ব্রিজের সিঁড়ির ধাপে বসে থেকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছেন আর একজন পাঞ্জাবী বুড়ো। ইনি সর্দার যন্ত্রমোহন । সানি দেওলেরও মুখে রাগ বলে একটা অনুভুতি দেখা যায় , এনার তাও নেই । এদিকে দেশের সেরা অভিনেতা বললে ভুল হবে না । আশ্চর্য এই জেগেও কোমায় থাকার ডাইকোটোমা । নামের শেষে এক জোড়া সিং ছিল। কিন্তু কোনদিন কাউকে গুঁতোতে পারেন নি , সেই লজ্জায় ওটা বাদ দিয়ে দিয়েছেন। এমনকি হাইকমান্ডের ধমকের ভয়ে মরে গিয়েও এখনো সিঁড়ির ওপরের ধাপে বসতে ভয় পান। শান্তিতে বইপত্র পড়েন , পড়েছেন ও অনেক। মহাভারতে তার প্রিয় একটা চরিত্র আছে। ওই ভীষ্ম বধের সময়…।সে যাকগে। গদি আঁকড়ে থাকলেই তো মস্তি। সেলাম মেলে হাজার। এক্ষেত্রে যদিও কেউ তাকে লক্ষ্যও করল না।

কয়েক ফুট দূরে একটা গাছের নীচ থেকে গীটারের টুং টাং আর একটা গম্ভীর খোনা গলায় থোকা থোকা গান ভেসে আসছে। অসাধারন লিখতেন , গাইতেন এবং ভাবাতেন এই গানওলা গুই মহাশয়। এখন নিজেই ভাবেন কোন আক্কেলে জার্মানি থেকে এই পোড়া শহরে এসে আধপাগলা স্যানডউইচ হয়ে আছেন। নিজের হযবরল সিদ্ধান্তের আক্ষেপে এখন চুলকে চুলকে একটিও চুল দাড়ি নেই।
ক্ষুদ্ধ – ওই যে গানওলা গুই। চ দেখি নতুন গান বাধল কিনা শুধোই ?
বিকল- বয়েই গ্যাছে। ও ব্যাটা আমাদের সংগঠনের প্রজ্ঞা কে অবজ্ঞা করে ওদের হয়ে ব্যাট ধরেছিল। আগে বলত মরব দেখে বিশ্ব জুড়ে যৌথ খামার। শেষে হল কিনা ফুলদানীতে ডায়না পামার।
ক্ষুদ্ধ – ভাষায় লাগাম দে। বয়েস তো হল। আমাদের আমলেও জমি , ফ্ল্যাট , রাইটার্স এর দপ্তরগুলো পকেটের পার্স হাতিয়ে চলত। সব জানি আমি।
বিকল দেব মাথা নামিয়ে নেন।
ক্ষুদ্ধ – আর এখন তো ও রিটায়ার্ড। রিটায়ার্ড বার্ড। নিজের মনে থাকে। সিনেমা করে , গান টান গায়। মাঝে মাঝে চ্যানেলে ধারালো বাইট দেয়।
বি- কামড়ে টামরে দেবে না তো রে ?
ক্ষুদ্ধ – গ্যেটে বলেচেন – পাগলা রাই সুস্থ। আর বোবা কালা রাই মন্ত্রী।

নিজের জোকসে খুশি হয়ে খিলখিলিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়লেন ক্ষুদ্ধ বাবু। তক্ষুনি ওপরে শোনা গেলো কে একটা মিনমিন করে গাইছে – “সিং ইজ কিং, সিং ইজ কিং…”।
বিকল দেব ওপর দিকে তাকালেন।
ওই যো সুইস ব্যাংকের পাহারাদার রোবোকপ। ওদের মেম্বারগুলো সব ঢপের চপ। ব্যাটা রেলের কুপেগুলোকেও সামার সেলে ছেড়েছিল।
গানওলা গুই গীটারের টিউনিং মেলাচ্ছিলেন। হঠাৎ ভাঁটার মত চোখ তুলে বললেন -
“ওপর থেকে নীচে আমুল কোরাপটেড ভাই, আমার আর কিচ্ছু করার নেই, কোথাও যাওয়ার নেই…”।
এমনিও তার কোথাও যাওয়ার বিশেষ তাড়া আছে বলে মনে হল না। শুধুমুধু হুমকি ঝাড়ছেন। বিকল দেব ভড়কে গিয়ে পালাবার মতলব কষছিলেন। গানওলা গুই হেঁকে বললেন-
"মহাশয়, ও কি ল্যাঙট , নাকি লুঙ্গির বোন ? এমন দশায় থাকে তো জানি সানি লিওন"।
সাহস করে ক্ষুদ্ধ বাবু মুখ খুললেন- "আমরা সব্বহারার দল। তাই কিছু না পেয়ে পার্টির ফ্ল্যাগ দিয়ে লজ্জা নিবারণ…"।
ঢেকে ঢুকে রাখবেন মশাই। মেঘ জমছে। তাহলেই বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি হলে ঝোড়ো হাওয়া। আর চলতি হাওয়ার দমকে কত ফ্ল্যাগ উড়ে যায়। আমি দেখেছি মশাই… আমি দেখেছি।
বিকল দেব বলে ফেলেন
"কি দেখেছেন এমন, বকছেন চ্যাটাং চ্যাটাং" ?
মুখ তুললেন গানওলা গুই।
"গবেট নাকি মশাই ? মাফ করবেন। স্লিপ অফ টাং। আপনারা তো ভুলেই গেলেন, নীচেও একটা পৃথিবী আছে। সেখানেও মানুষ বাঁচে"।
মাথা নাড়েন ক্ষুদ্ধ বসু। তার সাথে স্বগতোক্তি।
"বায়রন চটকে দিলেন পাহাড় , জঙ্গলে ম্যাওদের হাত। তার ওপর দিল্লীর করাত । সংগঠনের পিরামিডটা হয়ে গেলো… একটা বিন্দুর টিম। হোয়ার ডাজ অল দা ফ্লাওয়ারস গন ! লং টাইম পাসিং…" ?
"মুঠো মুঠো ভোট পেয়েও এতদিনে ঠুঁটো জগন্নাথের প্রসব ঘোড়ার ডিম। আর শিকনি ছড়িয়ে লাভ নেই ভাই। বন্দুকের শাসন পাবলিক তাড়াবেই"।
বলেই উদাস হয়ে যান গানওলা গুই। তারপর আবার গীটারে মন দিলেন।

এদিকে ক্ষমতা দেবী দলবল নিয়ে কিছু পচা শুঁটকি মাছ খেতে খেতে মিটিং করছিলেন। বেঁচে যাওয়া মাছগুলো দেবেন পাড়ায় পাড়ায় জুনিয়র ভুতুড়ে ক্লাবগুলোতে ছড়িয়ে । পাবলিসিটি স্টানট। বাচাল ঘোষ তার হাঁটুর কাছে বসে ড্যারেন সামির মত করে মুখে চুষি কাঠি পুরে মাইক দোলাচ্ছেন।

ক্ষমতা- আজকের মিটিং এর এজেণ্ডা হল – আমি বলব আর আপনারা শুনবেন।
ফিক করে কে যেন হাসল। আসলে নিজেকে রিলেট করতে পেরে সর্দার যন্ত্রমোহন আর সামলাতে পারেন নি। হঠাৎ করে আকাশ থেকে দৈববাণী হল- “জিটো জিটো”।
ইতালিয়ান থেকে ইঞ্জিরি করলে যার মানে দাঁড়ায় “শাট আপ”।ব্যাস কম্যান্ড শুনে সর্দার আবার স্পিকটি নট। শুধু পেন্ডুলামের মত ঘাড় নাড়তে লাগলেন।
দেড়েল দেব- ভুতেদের অসাধারন ইলেকশন সামনে। কদিন পরেই দেওয়ালে দেওয়ালে , দিদি হাসবেন আপন খেয়ালে।
হোঁদল মিত্র- বিলবোর্ডে , পোস্টারে , গানে ; মুখ ঢেকে যাক বিজ্ঞাপনে।

ক্ষমতা দেবী স্নেহভরে দেড়েল দেবের দাড়ি নেড়ে দিয়ে স্মিত হাসলেন।
ওই যে দেখতে পাচ্ছ দেড়েল। কিলা উইয়ের সোনালী তট। খৈনির দাম বাড়াব ঝটপট। নো চিন্তা ফর মানি। বেশি করে খান চৈনি খৈনি।
বাচাল ঘোষ , হোঁদল মিত্ররা আনন্দে হই হই করে উঠলেন। বিকল দেব পিটিশন , স্ট্রাইক ইত্যাদি বলে চ্যাঁচ্যাতে লাগলেন। উত্তেজনায় ক্ষুদ্ধ বাবুর জিভটা টাকরায় লেপটে গেলো। কিছুই বেরোল না গলা দিয়ে। রিক্ত সেন যাকে তাকে টিপ করে বেল ছুঁড়ছেন। তার হিসেবে তো দোষী সব্বাই। ক্ষমতা দেবী হাতে সাদা একখানা স্যান্ডেল হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বলতে লাগলেন –
চক্রান্ত চক্রান্ত। সবকটাকে চাবকানো উচিৎ।
শুনে বিকল দেব তেড়ে যাচ্ছিলেন। এমনঅবস্থায় পাশের পাকুড় গাছ থেকে শীর্ষেন্দুর ব্র্যান্ডেড ভুতের মত গোলগাল কে একটা লাফিয়ে নেমে “টি আর পি , টি আর পি ; মেক আপ , মেক আপ” বলে উদ্দাম নেত্ত করতে লাগলো।
“যক্ষ দের লক্ষ্য অনুষ্ঠানে আপনাদের স্বাগত। আমি বলিয়ে খোকন। এই টক-ব্যাক কই , ক্যামেরা কই।”
খোকন বাবু জীবিতাবস্থায় একটা লালচে চ্যানেলে দাঁড়িয়ে এত বেশি কথা বলতেন ও বলাতেন যে বিরক্ত হয়ে ছোকরা ভুতেরা মুখে টেপ মেরে পাকুড় গাছে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছিল। কিভাবে যেন সেখান থেকে সটকে পালিয়ে নেমেছেন। তবে অনেক দিন উল্টো করে ঝুলে থাকায় মাথার সমস্ত লোবগুলো এদিক ওদিক হয়ে গেছে। তবে বেসিক বর্মগুলো ভোলেন নি। তাই ক্যামেরা-ট্যামেরা চাইছেন।
“আহা আমি রয়েছি তো, তোরা চালিয়ে যা বার্তালাপ । এই দ্যাখ আমার কানে নমিনেশনের ছাপ”।
কথা শুনে সবাই তাকিয়ে দেখল খ্যাতনামা পরিচালক আঁতেল সামন্ত একটা ৩৫ মিমির অ্যারি ক্যামেরাতে লুক থ্রু করে দাঁড়িয়ে আছেন। কাঁধে একটা চটের থলি। চেয়ে চিন্তে আনা বিজাতীয় পুরস্কারগুলোর মায়া ছাড়তে পারেন নি ; তাই এখনো ওগুলো সঙ্গে নিয়েই ঘুরে বেড়ান। ভুতেদের কিছুই আন্দাজ করা যায় না। বাকি ভুতেরাও বলতে পারে না কখন কে উধাও হচ্ছে আর কেই বা হামলে পড়ছে। আঁতেল সামন্তকে তাই শুধিয়েও লাভ নেই যে ক্যামেরাটা এলো কোত্থেকে অথবা উনি এটা আদৌ চালাতে জানেন কিনা ।
“আমার ভীষণ ব্যক্তিগত ছবি তো আর আমি ছাড়া কেউ দেখে না , তাই আজকাল এসবেই কেরিয়ার গড়ব। নিজেকে অকারনে পৃথিবীময় আরও রাষ্ট্র করব”।
একটা ফিচেল ছোকরা ভূত ভিড়ের মাঝখান থেকে মিমিক্রি করে বলে উঠল-
“আঁতেল বাবু , আপনি রেডিওতে যান। আপনার ছবি তো চোখ বন্ধ করেও দেখা যায়। ছবি কই ! শুধু শব্দের বাগান”।
আঁতেল সামন্ত ওড়না ঝাঁকিয়ে ককিয়ে উঠলেন। কে সেটা বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু খুঁজেপেতেও টিকির নাগাল পেলেন না । মরেও নিস্তার নেই। আসলে বহুদিন ধরে চ্যানেলের এক ছোকরা হরবোলা তাকে টুকে টুকে আক্কেল গুড়ুম করে দিয়েছিল। তারপর নালিশ , ঝগড়া , খুনসুটি ইত্যাদি সারতে সারতে তার মনে পড়েনি যে ছবি করাই ভুলে গিয়েছেন ।
তবে এসব হট্টগোল দেখে বলিয়ে খোকন চরম তুষ্ট হলেন। ডোবার জলে আর একবার মেক আপ দেখে নিয়ে করোটিতে খানিক পড়ে থাকা সাদা সিমেন্ট ঘষে গলা খাঁকারি দিলেন। হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলেন-
জোকার হয় অনেকপ্রকার । আমরা তাদের পোষণ করি , তোষণ করি , দর্শকের ইমোশনের সাপেক্ষে টি আর পি চোষণ করি। এনারা শাহিদের কিসিতে আছেন, বিলিতি – দেশীতে আছেন আবার ড্রিবলিঙে মেসিতে আছেন। কোথায় নেই বলুন তো ? ওবামা থেকে বারাসাত, ধর্ষণ থেকে চোলাই, রিগিং থেকে র্যা গিং কোথায় নেই ? অবাধ যাতায়াত মহাশূন্য থেকে পৃথিবীতে। আধুনিক ফুল ভাঁড়-নে দের নিয়ে আমার সংসার। আমি স্বয়ং মোটা চামড়ার বলিয়ে খোকন নিজেই মাঝে মাঝে কেলিয়ে যাই। তারপর ঝগড়ার তোড় দেখে দর্শক তাই তাই করে তালি দিলে নিজেকে ল্যারি কিং মালুম হতে থাকে। আসলে আমি বলতে চাই…
মাথা বিগড়ে যাওয়ায় এতদিনকার সাব-কনশাস মনের জমানো কথা ভিসুভিয়াস হয়ে বেরিয়ে আসছে । ভাবছেন এক আর বলছেন সত্যি। বেচাল দেখে ভিড়ের মধ্যে থেকে দু একজন জেলখাটা চকচকে তাজা ভূত বেরিয়ে এসে বলিয়ে খোকনকে মুখ চেপে ধরে কোথায় একটা নিয়ে গেলো। আবার পাকুড় গাছেই ঝোলাবে মনে হয়। আঁতেল সামন্ত সেটাকেই ছবি তুলে সিনেমা বানাবেন বলে পেছন পেছন দৌড়ে গেলেন।

বেশ কিছুক্ষন চারিদিক চুপচাপ। সময় যেন থমকে আছে। হঠাৎ করে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামলো। মেঘের গর্জনে কেঁপে উঠল চারিদিক। দূর থেকে গানওলা গুই চোখ মটকালেন
“বলেছিলাম না। ঝড় আসবে।”

এই বৃষ্টির জল টুকুরই বোধহয় দরকার ছিল । দস্যু মোহনের দলের মতই মাটি আকাশ বাতাস ফুঁড়ে হাজার হাজার ছায়ামূর্তি ছুটে আসতে লাগলো। এরা সাধারন মানুষ-ভূত । এরা বোকা বাক্সে সময় নষ্ট করে ঝগড়া দেখেছে, ভাষণ শুনে অকারণ মঞ্চে হাততালি দিয়েছে , পাড়ার মোড়ে মোড়ে ধর্ষণ দেখেও চুপ মেরে থেকেছে , গভীর রাতে কাছের মানুষের মৃত্যু দেখেও পরদিন শার্প দশটায় অফিসে ঢুকেছে। এরা বুথ দখল দেখেছে , আধপেটা দিন গুজরান করেছে , বেকারত্বে চা সিগারেটের বিল বাড়িয়েছে , তবুও ভোটটা ঠিক দিয়েছে , বিলি হয়ে যাওয়া ক্রিকেট খেলায় নির্ঘুম রাতভর টিকিটের লাইন দিয়েছে ।
কিন্তু সমস্ত বোকামোর রিয়েলাইজেসন হয়েছে মরে গিয়ে। বৃষ্টির জলে অতীত ধুয়ে ফেলে তারাই দলে দলে ছুটে আসছে খ্যাপা ষাঁড়ের মত । সংখ্যায় অযুত লক্ষ্য নিযুত… গানওলা গুই গাইছেন- “আমার স্বপ্নে বিভোর হয়েই জন্মেছ বহুবার , আমিই ছিলাম তোমার কামনা বিদ্রোহ, চিৎকার”। বজ্রপাতের সাথে মিশে এক একটা শব্দ যেন এক একটা ব্যালাসটিক মিসাইল। একটু পরেই ছায়ামূর্তির দল পায়ে মাড়িয়ে সব ধুলো করে দিয়ে যাবে।

[ভুতেদের মৃত্যু নেই । কিন্তু স্বপ্নের কথা কে বলতে পারে...]

প্লাস মাইনাস শূন্য…
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments