কার লেখা ভুলে গেছি, তবে লাইনদুটি বিলকুল মনে আছে – ভাগ্যিস আছিল নদী জগৎসংসারে, তাই লোকে পয়সা দিয়া পারাপার করে। দিন বদলেছে, আজকের দিনে জীবিত থাকলে নিশ্চিত লিখতেন যে – ভাগ্যিস মরল বাপ্পা তাড়াতাড়ি করে, তাই লোকে সাহিত্য বলে কাঁচা খিস্তি মারে।

উৎপাতটা আগে অনেক কম ছিল বললেও হয়ত ভুল, আসলে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্য দেহ রাখতেই বাড়াবাড়ি শুরু হয়ে গেল। নবারুণ যখন লিখতে পেরেছেন তখন আমিই বা কিসে কম ? বাংলা টাইপাতে পারি না নাকি ভাঁড়ারে র’ মাল বাড়ন্ত ? কোনটিই নয়, অতএব চল পানসি বেলঘরিয়া। ধান ভানার গানে যদি যথেষ্ট গালি দেওয়ার জায়গা না থাকে তাহলে শিবস্তোত্র কি করতে রয়েছে ?

কিন্তু মুশকিলটা হল এই যে ধারালো তরবারি ব্যবহার করার কিছু পদ্ধতি রয়েছে, সেই পদ্ধতি অনায়ত্ত্ব রেখে সেটা নিয়ে খেলা করা বিপজ্জনক। যে দুটি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের মোড় এক ঝটকায় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেই ‘প্রজাপতি’ এবং ‘বিবর’-কেই আপাতত উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করি। এই দুটি উপন্যাস বেছে নেওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ এদের স্রষ্টা একই ব্যক্তি। ‘প্রজাপতি’-তে সুখেনের বর্ণনায় ‘জামাটাও এমন, পিঠের অনেকখানি দেখা যায়। দেখেই মনে হয়, পিঠটা খুব মিহিন একটু রোঁয়া রোঁয়া ভাবের। জামার নিচেটা আলগা হয়ে রয়েছে। হাত দিলেই ঢুকে যাবে। এখন ওর জামার ডোরাগুলোকে মনে হচ্ছে শিকের গরাদের মত। তার নিচে, আবার সেই পিঠ, শিরদাঁড়াটা একটু একটু ফুটে আছে। সকালবেলা তো এখন, চানটান করেনি। শায়াটা আলগা আলগা, গোলাপী রঙের মোটা শাড়িটা কোনরকমে গোঁজা। তার জন্যেই কোমরের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। শিরদাঁড়ার হাড়টা সেখানেই একটু দেখা যাচ্ছে। তারপরেই পিঠটাকে চিরে, ঠিক যেন সরু নালী। ওর নিশ্চয় খেয়াল নেই, শায়াটা অত ঢিলে হয়ে গেছে। পিঠের যেখানে শেষ, আর কোমরের যেখানটায় সুরু, সেই সরু জায়গাটা ছাড়িয়ে, নিচের দিকে বেশ খানিকটা দেখা যাচ্ছে।’ পাশাপাশি একই দেহাংশের এবার বিবরণ ‘বিবর’ থেকে – ‘ওর মেদহীন সুগঠিত খোলা পিঠ, এত সুন্দর আর স্বাস্থ্যপূর্ণ, শিরদাঁড়ার মাঝখানটা যেন দু’পাশ থেকে ঢালু হয়ে নেমে এসে একটি তীক্ষ্ণ গভীর রেখায় আঁকা পড়েছে। নিটোল কোমল ফর্সা পিঠ, জামা নেই। পিঠটা যেন ক্রমাগত ত্রিভুজের রেখায় কোমরের দিকে নেমে গেছে।’ উপন্যাসের প্রায় শুরুতেই লেখক দু’জন নায়কের সামাজিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন এইটুকু বিবরণ দিয়েই।

কিন্তু আজকের দিনে কিছু নব্যফেবুসাহিত্যকদের সমস্যা হল এতশত ভাবতে গেলে সময় লাগবে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে আর এইসব করেই যদি দূর্মূল্য সময় খরচ হয়ে যায় তবে কবেই বা লিখবে আর কবেই বা লাইক কুড়োবে, অতএব তাঁরা এসব কিছুরই ধারপাশ না মারিয়ে যত্রতত্র গালাগাল গুঁজে দিতে পারলেই খুশি। লাইক-ও জুটল সঙ্গে প্রগতিশীল তকমা আবার প্রথাভাঙার সম্রাটের মুকুটও মাথায় চাপিয়ে নেওয়া গেল। আর কে না জানে লাইক এবং খিস্তি ডিরেক্টলি প্রোপর্শনাল ? আমি খেয়াল করে দেখেছি এঁদের অনেকের লেখা পড়লে মনে হয় স্কুলে একসাথে পড়াশোনা করা একদল ছেলে বা মেয়ে তারা আজ যে বয়সেই পৌঁছে গিয়ে থাকুক না কেন নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় প্রতিটা বাক্য শেষ করবে পুরুষাঙ্গের নামে।

কিন্তু আদতে, জীবনের এতগুলো ধাপ পেরিয়ে এসে বুঝতে পারি, যে এটা বাস্তবে অসম্ভব। অসম্ভব বলা ভুল, বরং বলা ভাল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ক্ষেত্রে এটি একটি অবাস্তব ধারণা। যে সোসাইটিতে ব্যক্তিগতভাবে আমি বসবাস করি, এখন এই বয়সে পৌঁছে একটা পরিণত মানসিকতা নিয়ে কথায় কথায় গালিগালাজ করা ব্যাপারটা বেশ চাপের হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তববোধ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র ‘আমিও জানি, আমিও যে কোনও জিনিস টাইপ করে প্রকাশ্যে চিপকে দিতে সক্ষম,’ এইটুকু সম্বল করে কি সৎ সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব ? হয়ত অনেকেই এবার হাংরি জেনারেশনের উদাহরণ টেনে আনবেন, কিন্তু বুকে হাত রেখে বলুন তো হাংরি জেনারেশনের লেখালেখিতে একটা মেসেজ ছিল, কিন্তু এখনকার মত – ধরুন ভাবছি আপেলের রচনা লিখব – ভূমিকাতে লিখে দিলাম – ধোর বাঁড়া টাইমপাস করতে হবে তো, লে বাল আপেলেরই পোঁদ মারি – এই দিয়ে কি কাজ এগোনো যাবে ? সে মূল আপেলের রচনাটি যত উন্নতমানেরই হোক না কেন ?

ফেসবুকসাহিত্যের একটি দিক নিয়ে কিছু ভাবনা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments