আমি একটা বিরাট পড়ুয়া এমন দাবি করার আগে আমার খুব ঘনিষ্ঠ মানুষজনও নিজের ভাবনাটা যাচাই করে নিতে চাইবেন। জন্ম হওয়ার সাথে সাথেই মা সরস্বতী যে তাঁর বামহাতের কড়ে আঙুল আমার ডানহাতের কড়ে আঙুলে খুব যত্ন করে ছুঁয়েছিলেন সে বিষয়ে আমি অন্তত নিঃসংশয়। তবু সামান্য যেটুকু পড়াশোনা করার অভ্যেস আছে সেটা নিয়ে আজকাল খুব বিব্রত বোধ করছি। নিজের বিচার বিবেচনার ওপর ইদানিং যথেষ্ট সন্দেহ জেগে উঠেছে।

আজকাল ইন্টার্নেট আরও প্রিসাইজলি বলতে গেলে ফেসবুকের দৌলতে লেখা বেশ সহজ হয়েছে। সহজ হয়েছে ইন দ্য সেন্স একটু গুগলাও, উইকির দু’চার লাইন ওপর ওপর পড়ে একের পর এক বেশ গ্রাম্ভারী প্রবন্ধ নামিয়ে দেওয়া নেহাতই আ ম্যাটার অফ ফিউ সেকেন্ডস ওনলি। তারপরে ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে পোস্ট, লাইক এবং ‘আরিব্বাস, কি দারুণ’, ‘কত কিছু শিখলাম’, 'কত অজানারে জানাইলে তুমি' জাতীয় কমেন্টের সুনামি। অথচ মন দিয়ে পড়লে হয়ত দেখা যাবে লেখা হয়েছে 'সূর্য পুব দিকে ওঠে'। এই অব্দি ঠিক আছে। চূড়ান্ত অন্তঃসারশূন্য প্রবন্ধও কিছু ভাবনার খোরাক জোগান দিতে সক্ষম। বিষয়টা নিয়ে আগ্রহীরা আরও পড়াশোনা করে জেনে নিতে পারেন।

কিন্তু নিখাদ সাহিত্যচর্চা নিয়েই হয়েছে মুশকিল। বলা বাহুল্য, বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে সফট টার্গেট হল কবিতা। স্কুল থেকে বেরিয়ে কলেজে ঢোকার ঠিক আগে প্রায় যে তিনমাস সময় অতীতে পাওয়া যেত, এখন একটু কমেছে মনে হয়, এই সময়ে কবিতা চর্চা করেনি এইরকম বাঙালি বিরল। তারপরে জীবনের নানা ওঠাপড়া, ঘাত প্রতিঘাতের দিনে কবিতার বাঁধা পাখি খোলা পেল ফেসবুকের স্বপ্নে। কবিতাচর্চার যে কত অজস্র গ্রুপ তৈরি হল তা গুণতে বসা এককথায় হরিচরণীয় কর্ম। প্রতি কবি পিছু একেকটা গ্রুপ অথবা পেজ। বলা বাহুল্য, কোনও সাধারণ মানের কবিতা এইসব গ্রুপে কিংবা পেজে প্রকাশিত হয় না। প্রতিটি কবিতাই অসাধারণ।  অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছলো কবিতার প্রতি অনাগ্রহী বেশ কিছু গ্রুপের নিয়মাবলীতে ঢুকিয়ে দিতে হল একটি লাইন – এখানে কেউ কবিতা পোস্ট করবেন না।

তো এইসব বাধাবিপত্তির সামনে পড়ে এখন কবিতায় খুব সামান্য হলেও ভাঁটা পড়েছে। কিন্তু প্রকৃতিতে শূন্য বলে কিছু থাকতে পারে না। অতএব তার জায়গায় দ্রুত উঠে আসছে অণুগল্প। বল্গাহীন ভাবোচ্ছ্বাস যেমন মোর দ্যান অসাম কবিতার মূল সম্পদ, তেমনই মাত্রাছাড়া লাইন বিটুইন দ্য লাইনস–এর ব্যবহার হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া অণুগল্পের একমাত্র অঙ্গভূষণ। এইসব পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে প্রচন্ড রাগ হয় বনফুলের প্রতি। মনে হয় কে বলেছিল ভদ্রলোককে এই প্যান্ডোরার বাক্সটাকে নিয়ে খেলা করতে? যাই হোক, পড়তে হচ্ছে। প্রতিবারই ভাবছি এই বুঝি ভাল কিছু লেখা হল, খানিক এগিয়েই বুঝছি সে গুড়ে বালি।

সমস্যা হচ্ছে যে এইসব স্বঘোষিত কবি সাহিত্যিক এবং তাঁদের তথাকথিত ভক্তবৃন্দ কিছুতেই বুঝতে পারছেন না যে বাংলা সাহিত্যের কি পরিমাণ ক্ষতি তাঁরা জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে প্রতিনিয়ত করে চলেছেন। ভক্তের ভগবান ফেসবুকীয় সিউডো পপুলার লেখক গাঁটের কড়ি খসিয়ে বই ছাপিয়ে চলেছেন আর মূল্য ধরে দিতে হবে শুনেই ভক্তের দল প্রচন্ড সময়াভাবে ভুগতে শুরু করছেন। অনিবার্য ফল হিসেবে সত্যিকারের ভাল লেখা হারিয়ে যাচ্ছে এইসব নির্বুদসংখ্যক অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয় লেখালেখির ভিড়ে। কারণ একজন খুব সিরিয়াস পাঠকও খড়ের গোলায় ছুঁচ খুঁজতে গিয়ে অধৈর্য হয়ে উঠতে পারেন। সামান্য অচেনা নামও হয়ে উঠতে পারে সিঁদুরে মেঘ।

যা বুঝতে পারছি ভবিষ্যতে হয়ত কমেন্ট এবং লাইকের ম্যাটার দিয়েই প্রমাণ করতে হবে এইস্থানে অ্যান্টিম্যাটারের অস্ত্বিত্ব ছিল। কিন্তু এই পরিমাণ অ্যান্টিম্যাটার খুঁজে বের করতে যে বুদ্ধিমত্তার দরকার পড়বে তা কি মানুষের আয়ত্ত্বাধীন ? সংশয় আছে।

ফেসবুক সাহিত্য
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments