বেশ মাস কয়েক ধরে সূর্য মামার তেজে ভাজা ভাজা হতে হতে সেদিন FB-তে একজনের কাতর আকুতি দেখছিলাম, আকুতি আর কিছুই নয়, ‘ সূর্যমামার এক বউ জুটুক, কেউ তো অন্তত থাকবে লাগাম টানার আর বেচারাকে আর এত কষ্ট করে প্রমান করতে হবে না যে সে যথেষ্ট hot :P ’। যাকগে, সেসব দেখতে দেখতেই দেখলাম, কবে যে সূর্যমামী জুটেও গেছে, আর মামু মাঝে মাঝেই মাইমার আঁচলে মুখ লুকাচ্ছেন। আর তারপরেই ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছে বোধ হয়, মাইমার সে কি কান্না…দেখতে দেখতে বর্ষা চলে এলো। বসন্তের পরেই বর্ষা বোধ করি কবিদের প্রিয় ঋতু; রোম্যান্টিক মানুষজনের কাছে বসন্ত অপেক্ষাও বর্ষা কখনো বেশি প্রিয়। কিন্তু ঐ আর কি, রোম্যান্টিক মানুষদের তো আবার সাংসারিক বুদ্ধি একটু কম থাকে, বর্ষার-ও তাই; নিজে তো এলোই, সাথে জুটিয়ে আনলো গুচ্ছেত খারাপ খারাপ অসুখ, মশা, ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, জমা জল ইত্যাদিকেও। তাই একাকি মানুষজন যখন গাইছে ‘এই মেঘলা দিনে একলা, ঘরে থাকে না তো মন…” অথবা প্রেমে পড়া মানুষজন গাইছে “এমন দিনে তারে বলা যায়…” তখন মায়েদের গান “আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে মা, না হয় অসুখ বিসুখ”। বর্ষা তো আসবেই, আনুসঙ্গিক সমস্যাও থাকবে, তবে কিছু নিয়ম এবং বিশেষ যত্ন মেনে চললে আশা করা যায় মায়েদের সন্তানরা দিব্য দুধে ভাতে থাকতে পারবে বৈকি। আমরা এখানে সেসব নিয়েই একটু আলোচনা করব।

• অসুখ-বিসুখঃ
১। ভাইরাল ইনফেকশন; সবথেকে বড় সমস্যা, ঋতু পরিবর্তনের সময় এমনিতেই ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে, আর শিশুরা আক্রান্ত হয় সব থেকে তাড়াতাড়ি।অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে কাজ হয় না; কয়েকদিন সময় লাগে সারতে। সাধারনতঃ জ্বর, মাথাব্যাথা, জয়েন্ত-পেন, হাঞ্চি-কাশি থাকে।
আক্রান্ত ব্যাক্তির থেকে দূরে রাখা, ভিড়ের মধ্যে না যাওয়া, সবসময় হাত ধুয়ে বাচ্চাকে কোলে নেওয়া, ডায়পার ছাড়ানোর আগে পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং বাচ্চাকেও ধোয়ান, অতিরিক্ত ঠান্ডা জলে স্নান না করানো ইত্যাদি সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।
২। ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যাঃ পেটে ক্রাম্প, পেটব্যাথা, পাতলা পটি, বমি ইত্যাদি হতে থাকলে ডাক্তারএর কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত বাচ্চাকে। (ডায়রিয়া-র ডায়েট নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব)
খাওয়ানোর আগে পরে ভালো করে হাত-মুখ ধোওয়া, নজর রাখা বাচ্চা যেন মাটি থেকে কোন কিছু মুখে না দেয়, বাড়ি পরিস্কার রাখা, ডিস-ইনফেকট্যান্ট দিয়ে মোছা ইত্যাদি সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।
৩। মশাবাহিত রোগঃ দেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, ব্রেন ফিভার ইত্যাদি অসুখ বর্ষা কালে মশা থেকে হতে থাকে।
নজর রাখা উচিত যেন মশা না কামড়াতে পারে, ঘরে মশারি এবং পার্কে গেলে মশক-তাড়নী মলম ব্যবহার করা উচিত।
৪। অ্যাসমা সংক্রান্ত সমস্যাঃ নাক বুজে যাওয়া, স্বাশ নিতে না পারা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়।
বাড়ি পরিস্কার রাখা, ঘরে ভিজে জামাকাপড় শুকোতে না দেওয়া, বদ্ধ ঘরে ধূপ, মশার ধূপ ইত্যাদি না জ্বালানো, বাথরুম এবং ঘরে ঝুল, ড্যাম্প জমতে না দেওয়া, সপ্তাহে একবার বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় বদলানো বিশেষ সাবধানতা হিসেবে পালন করা উচিত।

• শিশুদের পরিচ্ছন্নতাঃ
সাধারনত বর্ষাকালে আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে, ঘাম হয়। শিশুদের জথাসম্ভব শুকনো রাখা, দিনে একবার ভালো করে স্নান করিয়ে শুকনো করে মুছিয়ে দেওয়া দরকার। স্নান করানোর সময় গলা, ঘাড়, কান ইত্যাদি সমস্ত খাঁজে যেন ঘাম না জমে থাকে দেখা উচিৎও ভালো করে পরিস্কার করানো উচিত। নখ বড় যেন না হয়। খাবার খাওয়ানোর আগে পরে, দায়পার বদলয়ানর আগে পরে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ানো উচিত। বেশি ঠাণ্ডা আবহাওয়া থাকলে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত মুছিয়ে দেওয়া উচিত, স্কুল-গোইং বাচ্চাদের ব্যাগে স্যানিটাইজার রাখা দরকার।
বাইরে ত্থেকে এলে ভালো করে হাত-পা খোলা অংশ মুছিয়ে শুকনো করে দেওয়া উচিত। যদি বৃষ্টি তে ভিজে বাড়ি আসে, তাহলে গরম জলে ভালো করে ২ মিনিট পা ডুবিয়ে রেখে মুছে শুকনো করে দেওয়া দরকার। বাড়িতে চটি/মোজা পরিয়ে রাখতে পারলে ভালো হয়।

• পোশাক-পরিচ্ছদঃ
সাধারনত বর্ষার দিনে সারাদিন তাপমাত্রা পরিবর্তন হতে থাকে, বেশি আর্দ্র থাকলে, হাল্কা সুতির জামা পড়ানো উচিত, ঠাণ্ডা থাকলে একাধিক সুতির জামা ব্যবহার করা দরকার। আর ঠাণ্ডা থাকলে সোয়েটার-ও পরানও যেতে পারে; তবে সোয়েটার না লাগলেও অনেক সময় কান এবং পা ঢেকে রাখলে ঠান্ডা কম লাগবে। তবে দেখতে হবে বাচ্ছা যেন ঘেমে না যায়, তাহলে আবার উল্টো বিপত্তি হবে
বেশিরভাগ সময়েই জামাকাপড় ভালো করে শুকয় না, আয়রন করে নিতে পারলে ভালো হয় সেক্ষেত্রে; মোট কথা শুকনো এবং পরিস্কার জামাকাপড় পরানো দরকার।
ডায়াপার পড়ানো থাকলে ২/৩ ঘন্টা অন্তর দেখে নিতে হবে ভিজে গেছে কিনা, কারণ বর্ষাকালে তুলনামূলক বেশি সুসু হয়। ভিজে ডায়াপার পড়ে থাকলে ঠান্ডা লাগতে পারে এবং র্যািশ-এর সম্ভাবনা থাকে।

• ডায়েটঃ
Prevention is always better than cure. তাই বর্ষা শুরু হওয়ার আগে থেকেই, খাবারে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি দিতে হবে, যাতে ঠান্ডার বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। টক জাতীয় জিনিষে যেমন পাতিলেবু, আমলকী, মুসাম্বি লেবু ইত্যাদিতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
বাইরের খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। খেলেও শুধুমাত্র পুরো সিদ্ধ এবং গরম খাবার খাওয়া উচিত। কাটা ফল, স্যালাড খাওয়া উচিত নয়।
বর্ষাকালেো যথেষ্ট পরিমানে জল খাওয়ানোর দরকার আছে, সাধারণত তেষ্টা থাকে না বলে জল খাওয়া যেন কম না হয়।

• আনুসঙ্গিক পরিচ্ছন্নতাঃ
১। বাসনপত্রঃ শিশুর বাসনপত্র, দুধের বোতল, গরম জলে ধুয়ে স্টেরিলাইজ করে নেওয়া উচিত (বোতল, গ্লাস, বাটি ইত্যাদি কুকারে দিয়ে একটা সিটি দিয়ে নিলেই স্টেরিলাইজ হয়ে যায়!!) খাওয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে না ধুতে পারলে অন্তত জল ঢেলে রাখা উচিত বাসনে।
২। আনাজপাতিঃ শাক জাতীয় জিনিষ এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ সাধারনত মাটি কাদা লেগে থাকে; ভালো করে ধুয়ে তবেই রান্না করা উচিত। ভালো হয় যদি সব্জি-শাক নুন-হলুদ মিশানো জলে আধ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখা যায় রান্নার আগে।
৩। ঘরদুয়ারঃ দিনে দুবার ডিস-ইনফেক্ত্যান্ট দিয়ে ঘর মোছা উচিত। বাথরুমের মেঝে শুকনো রাখা উচিত, যাতে ড্যাম্প না হতে পারে। বেডশীট, পর্দা ইত্যাদি সপ্তাহে একবার কেচে নেওয়া উচিত।
৪। মশাঃ বাড়ির আশেপাশে যেন জল না জমতে পারে দেখা উচিত, ঘরে কোন ইন্ডোর প্ল্যান্ট থাকলে নিয়মিত জল বদলানো উচিত, যাতে মশা না জন্মাতে পারে। কর্পূর জ্বালিয়ে রাখলে মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়; এছাড়াও ঘরের কোণে জলে ভিজিয়ে এক টুকরো কর্পূর রেখে দিতে পারেন।
এত কিছু করা সত্বেও বাচ্চা অসুখে পড়তেই পারে, সেক্ষেত্রে প্রথমে হোমিও first-aid (আগে পোষ্ট করেছি হোমিও কিট নিয়ে)দিয়ে দেখতে পারেন, যদি না কমে, দেরী না করে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। ততক্ষণ খুশি মনে বর্ষা উপভোগ করুন; চিন্তা করুন কিন্তু দুশ্চিন্তা নয়!!!

বর্ষাকালে শিশুর বিশেষ যত্ন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments