বাংলায় ভরা বসন্তেও কোকিলেরা বেজায় ঘেঁটে থাকে আজকাল। পুবের আকাশ একটু ফর্সা হতেই যেই সবে গলা ছেড়ে একটু ডাকবে ভেবেছে অমনি সামনের কুন্ডু বাড়িতে বাতি জ্বলে উঠলো। এই পাইকারী পরীক্ষার মরশুমে আধো ঘুম চোখেই বক্রেশ্বর কুন্ডুর নাতি বই খুলে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ গুলো গাইঁ গুইঁ স্বরে আওড়াতে লাগলো। যেই পড়া থামে অমনি তার মা গাঁক গাঁক করে চেল্লায়, ‘ কিরে আওয়াজ পাচ্ছি না কেন?’। ছেলেটি আগের চেয়ে ২০ ডেসীবেল আওয়াজ বাড়িয়ে দিয়ে বাবর থেকে আবার শুরু করে। কোকিল বেচারা কি আর জানত যে সমরকন্দ থেকে উত্তর ভারতে আগত চেঙ্গিস খানের এক উত্তরসুরীর জন্য ভবিষ্যতে তাদের এতো ঝামেলা পোহাতে হবে ! কয়েকটা নম্বরের জন্য বসন্তের ভোরে আলো ফোটার আগেই তাদের ডাক ছাপিয়ে ঘরে ঘরে ছেলে মেয়েরা এইরকম নির্মম ভাবে সমবেত কন্ঠে পরীক্ষার প্রস্তুতুতি নেবে। খেয়াল করবেন আজকাল কোকিলেরা তাই পাগলের মত গ্রীষ্মকালে দুপুরের ঠাটা রোদে বা বর্ষা কালে মাঝরাতে ব্যঙ্গের ডাক বা ঝি ঝি পোকার আওয়াজ ছাপিয়ে কাতর স্বরে ‘কুহু কুহু ‘ করে ডেকে ওঠে। ঝি ঝি পোকা থেকে মনে পড়ল টেনিদার সেই প্যালারাম, হাবুল সেনদের নিয়ে ক্রিকেট খেলা ! কি ছক্কাটাই না হাঁকড়েছিল, ওফফ। তা এই বসন্তেও নিউজিল্যান্ডেও কম ছক্কা উড়ছে না , ছোটো ছোটো মাঠ পেয়ে সুযোগ বুঝে সব দেশের ব্যাটসম্যানরাই আইপিএলের মেজাজে একের পর এক বল মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছে। ওদিকে বি গ্রুপে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সাথে ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলাটাই দু দলেরই লিগ পর্যায় শেষ খেলা ছিল। খেলার আগে শোনা যাচ্ছিল যে এক ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় এসে আছড়ে পড়তে পারে শহরের বুকে। ক্যারেবিয়ান অধিনায়ক স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তিত ছিলেন এই ভেবে যে বৃষ্টি বাদলার জন্য খেলা ভন্ডুল হলে মাত্র এক পয়েন্ট পাবে তারা আর সেই কারণে কোয়ার্টার ফাইনালে না পৌছাতে পারলে হয়ত তার কাপ্তেনি কেন, দলে জায়গাটাও বেমক্কা চলে যেতে পারে। উল্টোদিকে আরব আমিরশাহির অধিনায়ককেও এই আবহাওয়াজনিত কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। যারা কিনা প্রতিযোগিতায় সব কটা খেলাতে হেরে বসে আছে তাদের নতুন করে এত চাপ নেওয়ার কারণ থাকতে পারে না কিন্ত সেই প্রশ্নটা তাকে করাতে সে নিরুপায় হয়ে জানালো যে তাদের দেশে দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়েরা যে কোম্পানিতে চাকরি করে সে কোম্পানিরাই সোমবারে তাদের ফেরার টিকেট কেটে রেখেছে। এখন যদি ঝড় বৃষ্টির দরুন এই খেলা বাতিল হয় তাহলে তাদের এক পয়েন্ট নিয়ে কোনো অসুবিধে নেই কিন্ত যদি সেই কারণে তাদের দেশে ফেরার ফ্লাইট ক্যানসেল হয়ে যায় তাহলে কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী তাদের নিজেদের পয়সায় নতুন টিকেট কাটতে হবে আর দেরী করে ফেরার জরিমানা স্বরূপ দেশে ফিরে তাদের ওই সবেধন চাকরিটাও খোয়াতে হতে পারে। প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয়ের জন্য কোয়ার্টার ফাইনাল বা দেশ – কোথাও একটা পৌছাতে না পারাটা যেন দু দলের কাছেই আলাদা হয়েও একই রকমের নিষ্টুর বাস্তব! প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ক্রিকেট কে যদি আরো কোনো কমন সুত্রে বাঁধতে হয় তাহলে সেটা পারে বাংলাদেশ। প্রবল ঘুর্নিঝড়ের মুখে তামাম বাংলা যেমন এককাট্টা হয়ে দাড়ায় সেরকমই যে কোনো দেশের পেস বা স্পিনের বিরুধ্যে দাড়াতে পারে ওই দেশের মাহমুদুল্লাহ ও মুশফিকেরা। এক একটা জয়ের কিম্বা দারুন লড়ে হেরে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে এই বাঙালি যুবকেরা বুঝিয়ে দেয় যে তারা আর আজ কাউকে ডরায় না। ভারতবর্ষ বিশাল দেশ , উপমহাদেশের ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলির সে স্বঘোষিত জ্যেষ্ঠভ্রাতা। যদিও পাকিস্তান তা মানতে মোটেই রাজি নয় ও আম পাকিস্তানিরা চাইছে এবার অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ফাইনাল ম্যাচে এই চিরপ্রতিদ্বন্ধী দু দেশই খেলুক। তখনই ‘আসলি মউকা’ মিলবে ও বোঝা যাবে কে দাদা আর কে ভাই। কিন্ত দেখা যাচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালে ভারত বাংলাদেশকে আর পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়াকে হারালে তাদের দেখা সেমি ফাইনালেই হয়ে যাবে, ফাইনাল অব্দি দুজনে এক সাথে কোনো ভাবেই গড়াবে না। ভারত বাংলাদেশকে হারাবে এ কথা হলফ করে যদিও কেউ বলছেন না, ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছে পরিসংখ্যানের দিক থেকে ভারত এগিয়ে। আবার পরেই একটা ছোট্ট মতামত জুড়ে দিচ্ছে যে রুবেল , মাহমুদুল্লাহ , মুশফিক , মোর্তাজারা দারুন ফর্মে আছে। সৌম্যর মত নতুন প্রতিভা আর তামিম-সাকিবদের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই দলটি যখন তখন একটা বড় অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশী সমর্থকেরা তো ২০০৭ এর বিশ্বকাপের সেই বাংলাদেশের ভারতকে হারানোর রিপিট টেলেকাস্ট দেখতে চাইছে আগামী ১৯ তারিখের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে। আর ভারতীয় সমর্থকেরা অনেকদিন পর সেহবাগ-সচিন বিহীন দলের টানা ৬টা খেলা জেতার কৃতিত্ব দিচ্ছে ধোনির পোড় খাওয়া ক্রিকেট মস্তিষ্ককে। তবে কোহলি, রায়না ও ধোনিকে বাদ দিলে ২০১১-এর সচিন, সেহবাগ , যুবরাজ , গম্ভির, হরভজন , জাহিরের তুলনায় ২০১৫-তে ভারতীয় দলে সেই অর্থে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নেই বললেই চলে।

দু দলের অবস্থা এক নয়, তাদের শক্তি ও দুর্বলতাও আলাদা। কিন্ত খেলোয়াড়দের চেয়ে বেশি চিন্তিত এবারে ফেসবুকে বাংলাভাষী ভারতীয় ও বাংলাদেশী সমর্থকেরা। তারা তাদের কমন মাতৃভাষায় একে অপরকে কাছে পেলেই দু কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ছে না। কথার মর্ম ও ভাষার মান ক্রমশ এবিপি আনোন্দের সুমন দের অনুষ্ঠানকেও ফিকে করে দিচ্ছে। পাড়ার ম্যাচের আগে এরকম প্যাঁকযুক্ত হাঁকা হাঁকি শোনা যেত কিম্বা মনে পরে বর্ডার সিনেমাতে কিরকম সানি দেওযল চিল্লে চিল্লে পাকিস্তানি কমান্ডিং অফিসার কে খিস্তি করছিল। আবার কিছু সমর্থক ওৎ পেতে বসে থাকে কোন পোস্টে কে তাকে ট্যাগাচ্ছে অমনি সেই পোস্টে গিয়ে পুরোটা না পড়েই ‘চালু শুরু আরম্ভ’ হয়ে গেল তার টাইপিং। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে হুর মুর করে বাকিরাও এসে জুটল ও গুচ্ছ ডেটা ছোড়াছুড়ি করে চলল অপ্রাসঙ্গিক সব তুলনা ও এঁড়ে দাবি দাওয়া। কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা আলোচনা বিহীন সমবেত কেওস তৈরী হলো সেই থ্রেডটা-তে। দুটো ভিখারী ও করাপ্টেড দেশের আম জনগণ মেতে থাকলো রাতভর ধরে চলা ৩০০ প্লাস কমেন্ট যুক্ত ক্যাঁওতালি মার্কা আলোচনার গর্বিত শরিক হিসেবে। কিছু লিখতে গেলেই আমি প্রথমে ভারতীয় না বাঙালি , হিন্দু না মুসলমান, মানুষ না তেঢ্যামনা , গোমাংসাশী না বরাহভূক, নিরোধ না কোহিনুর – এই সব ইসু টেনে নামানো হলো সেই জাম্বো চর্চাভূমিতে। পোশাকের ক্ষেত্রে আমার লুঙ্গি পড়তে ভালো লাগে না অথচ দক্ষিন ভারতীয়রা প্রায় সকলেই লুঙ্গি পরেন যেরকম পরে ইনজামাম, এরশাদ ও আমার বাবা, তাহলে উপমহাদেশে লুঙ্গি পরা প্রতিযোগিতা হলে আমি কোন দেশ কে সাপোর্ট করব তাই ভাবছি ? অবশ্য বারমুডা পড়তে ভালোবাসলে এখনকার হিসাবে আমাকে তাহলে বারমুডা দেশ টাকেই যে কোনো খেলার ক্ষেত্রে সমর্থন করতে হয়। আমার মাদ্রাজি ইদলি দোসা কিম্বা রাজস্থানী দাল বাতি চুরমার চেয়ে বিহারী লিট্টি চোখা কিম্বা চাঁটগার শুটকির ভর্তা খেতে ভালো লাগে। তাহলে আমি হয় রাষ্ট্রবিরোধী কিম্বা নেহাতই আঞ্চলিক মনস্ক। আমার সাকিবের বোলিং আর ধাওয়ানের ব্যাটিং এক সাথে ভালো লাগতে পারে না কেননা আগামী ১৯এ মার্চ আমাকে যে কোনো একটা বেছে নিতেই হবে! শুধু এই আমরা ওরার চক্করে কেন জানিনা ক্রমশ কোয়ার্টার ফাইনাল দেখার ইচ্ছেটাই আমার ভেতরে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। উপমহাদেশে ক্রিকেট বিগত পঞ্চাশ বছরে অনেক এগিয়েছে কিন্ত এক রয়ে গেছে এখানকার বুরবক জনতার সমর্থন করার বেলেল্লাপনা। ১৯৯৬ তে ইডেন-এ সেমিফাইনাল ভন্ডুল করা নিয়ে অনেকেই এখনো বেশ গর্ববোধ করে। মজার ব্যাপার এখানকার মিডিয়াও সুযোগ বুঝে এই সুপ্ত মৌলবাদী মনোভাবকে তলে তলে ধোয়া দিয়ে হয় ওপারের না হয় এপারের খেলোয়ারদের মুন্ডপাত করতে পিছপা হয় না। এই ‘ভদ্রলোকের’ খেলাটি যেই ভদ্রলোকেরা উদ্ভাবন করেছিলেন তারা এবারে হেরে যাওয়ার পরে প্রথমবার দেখলাম তাদের মিডিয়ায় আর সেই ঝাঁঝ নেই। নাহলে একসময় এরাই গাওয়ার, গুচের বাত্কম্মের আওয়াজেও কাট ড্রাইভের মধুর শব্দ খুঁজে পেত। আমাদের জন্য সচিন ভগবান না কোহলি পরবর্তী সচিন এ নিয়ে উস্কানিমূলক লেখার থেকে ফুরসত পেলে আমাদের মিডিয়ারাও আশা করি একদিন ইতিবাচক কিছু লিখবে এই উপমহাদেশের ক্রিকেট নিয়ে। আর আমাদের এই না খেতে পাওয়া অর্ধ উলঙ্গদের দেশগুলোর অর্ধশিক্ষিত গাম্বাট জনগণও হয়ত সেদিন এই ‘লড় কে লেঙ্গে ‘ মানসিকতার থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের ক্রিকেটের ভালোর জন্য দুটো ভালো কথা লিখে সভ্যভাবে আলোচনা শুরু করতে পারবে কোনো এক ফেসবুক ফোরামের থ্রেডে।

বসন্তকালে ক্রিকেট কুহু কুহু
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments