নাস্তিক, মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক, লালন অনুগামী অধ্যাপক, এলজিবিটি আন্দোলনের কর্মীর পর এবার বাংলাদেশের শিয়া, খ্রিশ্চান, বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষের ওপর চাপাতি চালানো শুরু করেছে ইসলামি গুপ্তঘাতকরা। হুমকির মুখে পড়েছে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনও। মুক্তমনাদের ওপর আক্রমণের সময় হাসিনা সরকার "ধর্মানুভূতি" রক্ষার খাতিরে ঘাতকদের আড়াল করার চেষ্টা চালালেও এবার তারা খানিক নড়েচড়ে বসেছে। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে কয়েক হাজার লোককে আটক করেছে প্রশাসন। যদিও এই তৎপরতা আন্তরিক নাকি শুধুই দেখনদারি সেটা স্পষ্ট নয়। গণজাগরণ মঞ্চ ও বামপন্থীদের একটা অংশও নীরবতা ছেড়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সরকার ও জনমতের চাপে লক্ষাধিক ওলেমা ও মুফতি ভিনধর্মের মানুষের ওপর অত্যাচারকে ইসলামবিরোধী বলে ফতোয়া জারি করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরাও নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ না করে প্রতিরোধের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও প্রশাসনের সহায়তায় ডিফেন্স ফোর্স তৈরী হয়েছে। এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকের ওপর হামলাকারী জঙ্গিকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন স্থানীয় মানুষ। আবার সেই জঙ্গির "এনকাউন্টার" হত্যা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বাংলাদেশ প্রশাসনের সদিচ্ছাকে।

  

এদিকে ঘোলাজলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে এদেশের হিন্দুত্ববাদীরা। আসামে জিতে ও পশ্চিমবঙ্গে খাতা খুলে তারা বেশ ফূর্তিতে আছে। তাদের সরকার বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা করেছে। ইসলামিস্টরা ওপারে হিন্দুদের মেরে তাড়ালে এপারে তাদের ভোটব্যাঙ্ক মজবুত হবে, এটাই হিন্দুত্ববাদীদের অঙ্ক। অন্যদিকে একদল বুদ্ধিজীবি খাড়া করেছেন নতুন থিয়োরি, যে বাংলাদেশ বাংলাস্তান হয়ে গেছে ও বামেরা বামাতি হয়ে গেছে। যদিও বাংলাদেশের রাজাকারদের পক্ষে মিছিল করা সিদ্দিকুল্লাকে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রীসভায় দেখতে তাদের অসুবিধে নেই। আরেকদল বুদ্ধিজীবি কোরান আর হাদিসের কোটেশন লেখা নোটবই নিয়ে ঘুরে বেড়ান এটা প্রমাণ করতে যে ইসলাম ধর্মটাই এই হিংসার মূল এবং জঙ্গিরা কোরান খুঁটিয়ে পড়ে তবেই খুনখারাপি চালাচ্ছে!!

  

তবে ভণ্ডামিতে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি নাকি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারে যারপরনাই দুঃখিত!! রামকৃষ্ণ মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন। অথচ গুজরাতে মুসলিম নিধন যজ্ঞের হোতা ছিলেন এই ব্যক্তিই। গুলবার্গ সোসাইটির ৬৯ জন সংখ্যালঘু বাসিন্দাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিল তাঁর গেরুয়া ব্রিগেড। ঐ সোসাইটির বাসিন্দা প্রাক্তন সাংসদ এহসান জাফরি নিরাপত্তা চেয়ে তাঁকে ফোন করলে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তিটি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, "আপনি এখনো বেঁচে আছেন?!! এতক্ষণে তো আপনার পটল তোলার কথা!!" তারপর জাফরিকেও পুড়িয়ে মারা হয় মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যাশা অনুযায়ী। সেই গুলবার্গ সোসাইটির মামলায় শাস্তি ঘোষণা হয়েছে। ১১ জনের যাবজ্জীবন, ১ জনের ১০ বছর ও ১২ জনের ৭ বছরের জেল হয়েছে। এরা বেশীরভাগই চুনোপুঁটি। গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা, নীরব দর্শকের ভূমিকা নেওয়া পুলিসকর্তারা খালাস হয়ে গেছেন অদৃশ্য হাতের কলকাঠিতে। একইভাবে নারোদা পাটিয়া হত্যাণ্ডের আসামি গুজরাত সরকারের মন্ত্রী মায়া কোদনানিকেও জামিনে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে। এক মোদিভক্ত বন্ধু একবার বলেছিল "সম্রাট অশোক যেমন কলিঙ্গ যুদ্ধের বীভৎসা দেখে চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে পরিণত হয়েছিলেন, তেমনি গুজরাত কাণ্ডের পর মোদিজিরও হৃদয় পরিবর্তন হয়েছে"। কিন্তু পুণের মহসিন, দাদরির আখলাককে যখন হিন্দুত্ববাদীরা পিটিয়ে মারে ধর্ম অবমাননার দায়ে, যখন একের পর এক চার্চ আক্রান্ত হয়, যখন বাংলাদেশের কায়দাতেই যুক্তিবাদী লেখকদের খুন করা হয়, যখন দলের নেত্রী "মুসলিম মুক্ত ভারত" গঠনের সংকল্প ঘোষণা করেন তখন প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসে তিনি মৌনেন্দ্র অবতার ধারণ করেন। নিজের দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাস চালিয়ে পাশের দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জনকে ভণ্ডামি ছাড়া কি বলা যায়?!

 

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিধন ও মৌনেন্দ্রর কুম্ভীরাশ্রু
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments