কয়েকদিন আগে ফেসবুকের নিউজফীডে একটা খবর নজরে এলো, কোথাকার কোন এক বৈজ্ঞানিক নাকি তাঁর রাঁধুনির নামে প্রতারণার মামলা ঠুকে দিয়েছেন এই মর্মে যে সেই অব্রাহ্মণ রাঁধুনি নিজের আসল পরিচয় গোপন করে ব্রাহ্মণ পরিচয় দিয়ে তাঁকে রান্না করে খাইয়েছিল। ভাগ্য ভালো যে অজান্তে দোষ করলে পাপ হয়না, তাই সেই বৈজ্ঞানিক এ যাত্রা বেঁচে গেলেন! না হলে 'অজাত-কুজাতের' হাতে খাবার খেয়ে সেই বিজ্ঞান-সাধক মানুষটির যে কি পরিণতি হত তা ভাবলেই শিহরিত হচ্ছি!

 

খবরটা পড়তে পড়তে প্রায় তিনশ বছর আগের একটা ইতিহাসের গল্প মনে পড়ে গেল। ‘গল্প’ বলছি কারন এই পর্বের বিস্তারিত ইতিহাস অনেকাংশেই বিস্মৃতি ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঢাকা। অধিকাংশই লোকমুখে প্রচারিত গল্পকথার আকারে আমাদের সামনে আসে। এবং যেহেতু আজকের যুগের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এইসব আঞ্চলিক লোককথা ও গল্পকথারা ধীরে ধীরে ইতিহাস ভিত্তিক ক্রিটিকাল রি-ভিউ ও ডিকনস্ট্রাকশান, রিকনস্ট্রাকশান ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের স্থান করে নিচ্ছে, তাই এই ইতিহাসের গল্পটা চর্যাপদের বন্ধুদেরকে বলার লোভ হচ্ছে। 

 

***

 

মূল কাহিনীতে ঢোকবার আগে এই গল্পের প্রধান চরিত্র চন্দননগরের দেওয়ান বাবু ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরীর সম্পর্কে দু-চার কথা বলে নেওয়া দরকার।

 

কে এই ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরী? এক কথায় বললে, প্রি-পলাশী কলোনিয়াল বাঙলার ওয়ান অফ দা মোস্ট পাওয়ারফুল বাঙালির নাম ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরী। জন্ম যশোর জেলার সর্বরাজপুর গ্রামের এক জমিদার পরিবারে। অল্প বয়সে তাঁর বাবা মারা যান এবং সম্পত্তির লোভে তাঁর জ্যাঠামশাই ইন্দ্রনারায়নের বিধবা মা ও দুই সন্তানকে খুন করতে উদ্যত হলে পরিবারের বিশ্বস্ত নায়েব তাঁদের নিয়ে মুর্শিদাবাদে নবাব মুর্শিদ কুলি খানের আশ্রয়ে চলে আসেন। সেখান থেকে নবাবের বদান্যতায় তাঁরা ডাচ-হুগলী ও ফ্রেঞ্চ-চন্দননগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে (যার আগে নাম ছিল ব্রিটিশ-হুগলী, বর্তমান খাদিনামোড়-তালডাঙ্গা মধ্যবর্তী অঞ্চলে) জমি লাভ করে বসবাস শুরু করেন।

 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রনারায়ন ও তাঁর দাদা রাজারাম বড় হয়ে ওঠেন এবং রাজারাম মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে অ্যাকাউন্টস বিভাগে চাকরীতে নিযুক্ত হন। অন্যদিকে ইন্দ্রনারায়ন চন্দনগরের চাউলপট্টিতে চালের ব্যবসায় নামেন এবং এই ব্যবসায় দ্রুত উন্নতি করতে শুরু করেন। জানা যাচ্ছে ১৭২৯ সালে তিনি ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আরেক ট্রেডিং সেন্টার পন্ডিচেরিতে একটি চাল ভর্তি জাহাজ পাঠান এবং তা থেকে প্রভূত লাভের মুখ দেখেন। অবশ্য ফরাসি প্রভুদের সঙ্গে ইন্দ্রনারায়নের গা ঘষাঘষির শুরুটা অনেক আগে তাঁর ছেলেবেলাতেই হয়েছিলো তাঁর দাদার সূত্রে। মুর্শিদাবাদের নবাবের দান করা বিপুল পরিমাণ জমির কিছু অংশ রাজারাম ফরাসী বাবুদের বিক্রি করেন। সে যুগে ধনী ফরাসী বাবুরা ছুটির দিনে শহরের আউটস্কার্টে পাখি শিকার করতে আসতেন এবং বাগান বাড়িতে পিকনিক করতেন। ইন্দ্রনারায়ন সেই সময় থেকেই লোকাল গাইড হয়ে তাঁদের পিছন পিছন ঘুরতেন, এবং এই ভাবে তিনি অল্প বয়সেই ফরাসী ভাষা ও আদবকায়দা গুলি রপ্ত করে নিয়েছিলেন। এবং সম্ভবত সেই সুবাদেই ১৭৩০ সাল নাগাদ চাউলপট্টির মামুলি চাল ব্যবসায়ী ইন্দ্রনারায়ন মাসিক ২০ টাকা মাইনেতে ফরাসী কোম্পানিতে ‘কুর্ত্তিয়ে’ বা দালালের চাকরীতে নিযুক্ত হন। তাঁর কাজ ছিল বাঙলা, বিহার, ওড়িশা ও দক্ষিণ ভারত থেকে চন্দননগরে আসা মালপত্রের কোম্পানির তরফে তদারকি, বণ্টন ও রাজস্ব আদায় করা এবং সেই কাজের উপর তিনি ৩% কমিশন পেতেন। এর সঙ্গে ছিল তাঁর নিজস্ব সুদের কারবার, যাতে তিনি ১২% থেকে ২৪% হারে টাকা ধার দিতেন। আর এসবের সঙ্গে সঙ্গেই প্যারালালি চলতে লাগলো তাঁর নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসা।  

 

উল্লেখযোগ্য ভাবে, ১৭৩০-ই হচ্ছে সেই বছর যে বছর বাঙলার কলোনিয়াল বাণিজ্য মানচিত্রে চন্দননগর তথা হুগলী একটি প্রধান শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে ত্রিবেণীর সরস্বতী নদীর শুকিয়ে যাওয়া ও সপ্তগ্রাম বন্দরের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গের বাণিজ্যলক্ষ্মী ভাগীরথীর মূল ধারা বরাবর কলকাতা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। ফরাসডাঙা ছিল সেই যাত্রায় কোলকাতার আগে দ্বিতীয় স্টপেজ, হুগলীর ওলন্দাজ বন্দরের পর। যদিও ফরাসডাঙার এই বাণিজ্যিক প্রাধান্যের স্থিতিকাল ছিল মাত্র ২৬ টি বছর (অর্থাৎ ১৭৩০ থেকে ১৭৫৬ সালে রবার্ট ক্লাইভ কর্তৃক চন্দননগর সীজ করার আগে পর্যন্ত), কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই ফরাসী গভর্নর-জেনারেল জোসেফ ফ্রাসোয়াঁ ডুপ্লের বিচক্ষণ নেতৃত্বে হুগলী নদীতে ব্রিটিশ বাণিজ্য তরীর সংখ্যাকে ছাপিয়ে ফরাসীরা হয়ে ওঠে প্রধান খেলোয়াড়। সে সময় চন্দননগর ছিল দক্ষিণবঙ্গের চাল ও অন্যান্য পাইকারি ব্যবসার প্রধান আড়ত এবং অর্থনৈতিক বিচারে কোলকাতার চেয়ে কয়েকাংশে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র। ডুপ্লের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও সফল বাণিজ্য নীতির ফলে সেকালে ফরাসী বাণিজ্যতরী গুলি বাংলার চাল, মসলিন, তাঁত ও আফিম নিয়ে চন্দননগর থেকে চট্টগ্রাম, সুরাট, পন্ডীচেরি, কর্ণাটক হয়ে সুদূর জেড্ডা, ইয়েমেন, ইরান ও চীন দেশ পর্যন্ত যাত্রা করতো। তবে এসবের মধ্যে চালের ব্যবসাই ছিলো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। শোনা যায় চন্দননগরের লক্ষীগঞ্জ বাজারে মোট ১১৪ টি চালের গুদাম ছিলো, যার প্রতিটিতে গড়ে ৬০০০ মণ ধান রাখা হত। চন্দননগরের গঞ্জের বাজারের এই চাউলপট্টি দেখে ১৭৫৬ সালে রবার্ট ক্লাইভ নাকি চন্দননগরকে ‘বাঙলার শস্যভাণ্ডার’ বলেছিলেন! শুধুমাত্র ১৭৩০ সালেই চন্দননগরে ফরাসী কোম্পানির মোট ব্যবসার পরিমান ছিল আড়াই মিলিয়ন পাউন্ড যা ১৭৪৪ থেকে ১৭৫২ সালের মধ্যে তার পিকে পৌঁছায়। ফলে, স্বাভাবিক ভাবেই কোম্পানির দালাল ইন্দ্রনারায়নও অল্পদিনের মধ্যেই বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন। বিত্তের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাঁর প্রতিপত্তি ও গুরুত্ব। মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনি ‘দালাল ইন্দ্রনারায়ন’ থেকে হয়ে ওঠেন ‘দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ন’। ১৭৩২ সালে তিনি ফরাসী সরকারের কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা বাৎসরিক করের চুক্তিতে চন্দননগর শহরের জমিদারির ইজারা নেন।

ভারতের ফরাসী গভর্নর-জেনারেল জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লে  (ছবি- ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত)

 

বিভিন্ন বাণিজ্যিক নথিপত্র, লেনদেন ও সম্পত্তির খতিয়ান দেখলে অনুমান করা যায় যে, ইন্দ্রনারায়ন ছিলেন জাত-ব্যবসায়ী এবং তাঁর জনসংযোগের স্কিল ছিল ‘ফেনমেনাল’। ঠিক সময়ে ঠিক লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটা ছিল তাঁর সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। পন্ডিচেরি, সুরাট, ওড়িশা হয়ে হুগলীর ওলন্দাজ ও আর্মেনিয়ান, মায় গোঁদলপাড়ার ডেনিশ- একমাত্র ইংরেজ বাদে বাকি সকলের সঙ্গেই ইন্দ্রনারায়নের ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক ছিল বলে জানা যাচ্ছে। আর এর সঙ্গে চেরি অন টপ হিসাবে ছিল নিজের দাদার মুর্শিদাবাদ রয়্যালকোর্টের চাকরীরূপী সোনার হাঁস, যা নির্দিষ্ট সময় অন্তর তাঁকে একটি করে সোনার ডিম উপহার দিত। একদিকে পর্তুগীজদের ক্ষমতাহ্রাস, ডাচদের অতি-সতর্ক বিজনেস পলিসি এবং অন্যদিকে ইংরেজরা তখনও বাঙলায় সেভাবে গেঁড়ে বসতে না পারার ফলস্বরূপ এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে ফরাসীরাই হয়ে উঠেছিল বাঙলার প্রধান ইউরোপীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। তাই মুর্শিদাবাদস্থিত বাঙলার নবাবদের সঙ্গে তাঁদের নানা কারনে মোলাকাত হতেই থাকতো। এবার একই পরিবারের দাদা নবাবের অ্যাকাউন্টান্ট আর ভাই ফরাসীদের দেওয়ান হওয়ার সুবাদে এই দুই বাঙালির আত্মীয়তার সম্পর্কটা ফ্রেঞ্চ-মুঘল সম্পর্কের ডায়মেনশানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ছাপ ফেলবে, বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। একবার কি একটা ছোটখাট ঝামেলার ফলে নবাবের সৈন্যরা রণংদেহি মূর্তি ধরে চন্দনগরের সীমান্তে এসে পৌঁছলে ইন্দ্রনারায়নের তৎপর হস্তক্ষেপে দু'পক্ষের মধ্যে ব্যাপারটা মিউচুয়াল হয়ে যায়। এরকম একাধিক ইন্সট্যান্স আছে, সব ফিরিস্তি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মোটকথা ফরাসী সরকারের বাণিজ্যবৃদ্ধি ও মুঘল শাসকদের সঙ্গে ফরাসী গভর্ণমেন্টের সফল ডিপ্লোমেসি ইন্দ্রনারায়নকে দু’পক্ষের কাছেই বিশেষ সম্মানীয় উচ্চতায় উন্নীত করে এবং এর পুরষ্কার স্বরূপ ১৭৩৫ সালে ফরাসী গভর্নর-জেনারেল ডুপ্লের সুপারিশে ইন্দ্রনারায়ন ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুই-এর কাছ থেকে একটি স্বর্ণপদক লাভ করেন।

 

ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরী ১৭৪০ সালে (১১৪৬ বঙ্গাব্দ) বাংলার ক্লাসিক দো-চালা স্থাপত্য রীতিতে এই নন্দদুলাল জীউ মন্দিরটি নির্মান করান। প্রসঙ্গত, পলাশীর যুদ্ধে যাওয়ার পথে ইংরেজ জেনারেল রবার্ট ক্লাইভ ১৭৫৬ সালে তাঁর সেনা বাহিনী নিয়ে চন্দননগর আক্রমণ করেন এবং ফরাসী দুর্গ ফোর্ট অঁরল্যা ধ্বংস করবার পর তিনি ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরীর বসত বাড়িটি ধ্বংস করেন এবং এই মন্দির আক্রমণ করে বিগ্রহের নীচের গুপ্ত কুঠুরিতে লুকানো ধন সম্পত্তির আশায় নন্দদুলালের মুর্ত্তিটি খুঁড়ে তুলে ফেলেন ও মোট ৬৫ লক্ষ টাকা লুঠ করে নিয়ে যান। সেই ভগ্ন মুর্ত্তিটির পায়ের একটি অংশ বর্তমানে চন্দননগর স্ট্র্যান্ড রোডের ফ্রেঞ্চ ইন্সটিটিউট মিউজিয়ামে রাখা আছে। (ছবি- ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত)  

***

 

কিন্তু বিদেশী রাজার দেওয়া সম্মান ইন্দ্রনারায়নের কাছে যথেষ্ট ছিলনা। তিনি চেয়েছিলেন সামাজিক গোত্রপতির সম্মান, যা কেনা যায় না, যা অর্জন করতে হয় সমাজের বাকি মাথাদের মিউচুয়াল সম্মতির মাধ্যমে। আর এই সামাজিক মানরক্ষার লড়াইয়ে ইন্দ্রনারায়নের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল চন্দননগরের সাবেক গোত্রপতি হালদাররা। ইন্দ্রনারায়নের বিপুল অর্থ ও রাজ-অনুগ্রহ থাকলেও যা তাঁর ছিল না, এবং যা হালদারদের হাতে ছিল, তা আক্ষরিক অর্থেই ব্রহ্মাস্ত্র, অর্থাৎ বামুন সমাজের অনুগ্রহ! ব্রাহ্মণ সমাজকে নিজের পাশে না পেলে যত টাকা আর যত ক্ষমতাই থাক, গোত্রপতি হওয়ার স্বপ্ন দিবাস্বপ্নই থেকে যাবে। ইন্দ্রনারায়ন সেটা জানতেন। এবং সেই কারনেই ফরাসী রাজের কাছ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করার পর তিনি তাঁর বাড়িতে একটি গ্র্যান্ড মোচ্ছবের আয়োজন করলেন যেখানে গোটা চন্দননগর ঝেঁটিয়ে সমস্ত শ্রেনীর মানুষের কাছে তিন বেলা পাত পেড়ে খাওয়ার নিমন্ত্রণ গেল। এবং এই মোচ্ছবেই হালদার ও বামুনদের যৌথ কন্সপিরেসির শরে বিদ্ধ হলেন ইন্দ্রনারায়ন। এখন এই কন্সপিরেসির কারন কি ছিল তা নিয়ে বলতে গেলে প্রচুর কাসুন্দি ঘাঁটতে হয়। এতো শব্দ খরচা না করে সংক্ষেপে আপাতত এইটুকু জানলেই চলবে যে দুই হাতে মুসলমান নবাব ও খ্রেস্তান ফ্রেঞ্চদের মন্দিরা সদাই বাজাতে থাকা উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা ইন্দ্রনারায়ন ও তাঁর পরিবারকে সেকালের চন্দননগরের গোঁড়া হিন্দুসমাজের মাথারা মোটেই খুব একটা নেকনজরে দেখত না। ফলে যা হবার তাই হল। মোচ্ছবের মাঝ পথে হঠাতই জানা গেল যে, ব্রাহ্মণদের জন্য রান্না ও পরিবেশনের দায়িত্বে যারা ছিল সেই পরিচারকদের মধ্যে একজন নাকি ‘মুচির বৌ’ আছে যে নিজের আসল পরিচয় ভাঁড়িয়ে নিজেকে ‘ব্রাহ্মণী’ পরিচয় দিয়ে কাজে জুটেছিল এবং ব্রাহ্মণদের খাবার পরিবেশনের সময় একজন ব্রাহ্মণ তাকে চিনতে পেরে যায়। ব্যাস, খেলা শেষ! সাহেবের দেওয়া জমিদারী তো কাড়তে পারেনা, কিন্তু ব্রাহ্মণ সমাজের পক্ষ থেকে ইন্দ্রনারায়নকে হিন্দুসমাজ থেকে পতিত ঘোষণা করতে এক মিনিটও সময় লাগল না। অতঃপর গোত্রপতির স্বপ্ন তো কোন ছাড়, হিন্দু সমাজের ছায়া মারানোও ইন্দ্রনারায়নের নিষিদ্ধ হয়ে গেল।

 

***

 

তো বামুন ও হালদারদের যৌথ কন্সপিরেসির ফলে ইন্দ্রনারায়নের গোত্রপতি হওয়ার স্বপ্ন তো আপাতত ফরাসডাঙার গঙ্গার জলে বিসর্জন হয়ে গেল। সে যাক। জোয়ার-ভাঁটার খেলার মতই বড়লোকের স্বপ্নদের যাওয়া আসাও চলতেই থাকে। আপাতত সে স্বপ্ন জোয়ারের জলে বয়ে যাক। তারচেয়ে আসুন, আমরা বরং জল ছেড়ে ডাঙার দিকে যাই এবং ফরাসডাঙার কুঠি ঘাটের পাশেই নেটিব ঘাটের দিকে নজর রাখি, যেখানে কিছুক্ষণ আগে একটি সুসজ্জিত রাজকীয় বাজরা এসে নোঙর করেছে। ঘাটের সিঁড়িতে আপ্যায়নের জন্য এসে দাঁড়িয়েছেন সপারিষদ দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরী স্বয়ং। বাজরার সুসজ্জিত কক্ষ থেকে এক মুখ হাসি নিয়ে বেরিয়ে এলেন একটি কুড়ি-বাইশ বছরের তরতাজা সুশ্রী যুবক। যুবকটির সফিস্টিকেটেড রুচিশীল পোশাক-আশাকের জৌলুশ দেখে পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে এনার পরিচয়টি বুঝতে পেরেছেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছেন, ইনিই নবদ্বীপাধিপতি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। অবশ্য ইংরেজের দেওয়া ‘মহারাজা’ খেতাবটি পেতে তাঁর এখনো বেশ কিছুকাল দেরি আছে। আর তাঁর মুখে ঝুলে থাকা ওই মধুর হাসিটির সঙ্গেও তাঁর অন্তরের বর্তমান ভাবের কোনো সাদৃশ্য থাকবার কথা নয়। কারন তাঁর ঘাড়ে এখন ঝুলছে মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছে অনাদায়ী করের বিশাল বোঝা।

দেখা যাচ্ছে, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ইত্যাদি পঞ্চরসে গুণগ্রাহী ও সমঝদার হলেও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দিকটাতে কৃষ্ণচন্দ্র তখনও খুব একটা পারদর্শীতা লাভ করেননি। তাই নদীয়ার মত একটি শস্যশ্যামলা রাজ্যের রাজা হয়েও নবাবী রাজস্ব পরিশোধ করার জন্য তাঁকে বারবার ঋণের জ্বালে আবদ্ধ হতে হত। পরে তিনি এই অপরাধে নবাবের জেলেও যাবেন এবং তখনও তাঁকে এই ইন্দ্রনারায়নই বাঁচাতে এগিয়ে আসবেন, কিন্তু সে সব কথা থাক! আপাতত আজকের ইন্দ্রনারায়ন-কৃষ্ণচন্দ্র সাক্ষাৎ পর্বে ফিরি যেখানে তিনি এসেছেন ইন্দ্রনারায়নের কাছ থেকে কিছু পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসাবে গ্রহণ করতে। কৃষ্ণচন্দ্রের আগে তাঁর পিতা রঘুরাম রায়ও আর্থিক কারনেই ইন্দ্রনারায়নের কাছে আসতেন বলে শোনা যায়। ঋণের পরিমাণ গুলিও লক্ষাধিক টাকার কমে কখনই হত না। অন্নদামঙ্গল রচনার গল্পটাই দেখুন। ১৭৪২ সালে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি খান ১২ লক্ষ টাকা বাকি খাজনার দায়ে জেলে ঢোকান। পরে দেবী অন্নপূর্ণা নাকি জেলখানার ভিতরে স্বপ্ন দিয়ে তাঁকে জেল থেকে উদ্ধার করেন এবং দেবীর মাহাত্ত্য প্রচার করতে আদেশ দেন! এখন দেবীর স্বপ্নে দেখা দিয়ে ১২ লক্ষ টাকার এই নবাবী কারাবাসের প্রবলেম সল্ভ করে দেওয়ার ব্যাপারটা আপনি চাইলে বিশ্বাস করতেই পারেন, তাতে আমার কিছুই বলার নেই। আমি শুধু বলছি যে নবাব ও কৃষ্ণচন্দ্রের মাঝখানে একজন তৃতীয় রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন যিনি (দেবীর আদেশেই হয়ত) মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঋণের অঙ্কটি পরিশোধ করতে এগিয়ে আসেন। আর সেই ব্যক্তির নাম দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ন চৌধুরী। এই লেখার শুরুতে ইন্দ্রনারায়নকে কেন ‘মোস্ট পাওয়ারফুল বাঙালি’ বলা হয়েছিল তার কারণটা এবার হয়ত কিছুটা আঁচ করতে পারছেন আশা করি? এবং মজার কথা হচ্ছে, কৃষ্ণচন্দ্র এরকম বৃহৎ অঙ্কের ঋণ একাধিকবার গ্রহণ করেছিলেন এবং কোনোদিন এর একটা ঋণও তিনি পরিশোধ করতে পেরেছিলেন বলে খবর নেই। তাহলে ইন্দ্রনারায়ন তাঁকে এইসব ঋণ গুলো দিতেন কেন? সে ব্যাখ্যায় পরে আসছি। আপাতত মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অন্য একটা 'হিডেন এজেন্ডা'র ব্যাপারে বলে নিই।

 

***

 

ফরাসডাঙার চৌধুরী বাড়িতে কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে ইন্দ্রনারায়নের সমস্ত বৈষয়িক লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর সেদিন সন্ধ্যায় ইন্দ্রনারায়ন তাঁর বন্ধুর জন্য নিজস্ব প্রমোদ ভবনে একটু বিনদনের আয়োজন করেছেন। কৃষ্ণচন্দ্রের কাব্য-সাহিত্য ইত্যাদির প্রতি অনুরাগের কথা তাঁর অজানা ছিলনা। সেই কথা ভেবেই আজ তিনি আমন্ত্রণ করেছেন বর্তমানে তাঁরই আশ্রয়ে বসবাস করা এক প্রতিভাবান তরুণ কবিকে। এই তরুণ কবির নাম এখনও কেউ শোনেনি বটে, তবে সেরকম জহুরীর হাতে পড়লে এই পাথরের দ্যুতি সারা জগতের চোখ ঝলসে দিতে পারে, ইন্দ্রনারায়ন জানেন। কাব্য-সঙ্গীত-নৃত্য-পানাহার সম্বলিত এক মনোজ্ঞ সন্ধ্যারাত্রি কেটে গেল। উৎকৃষ্ট ফরাসী শ্যঁপার মদবিহ্বলতায় তূরীয় দুই বন্ধু গঙ্গার ধারে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। শব্দহীন জ্যোৎস্না রাত্রির গঙ্গার রূপ দেখতে দেখতে নেশা ক্রমে আরো গাঢ় হয়ে উঠলো। কৃষ্ণচন্দ্র ইন্দ্রনারায়নকে জিজ্ঞাসা করলেন এমন মনোরম আনন্দময় একটি সন্ধ্যা অতিবাহিত করার পরেও তাঁকে এরকম বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? আর নিজেকে আটকাতে পারলেন না ইন্দ্রনারায়ন। নিজের গোত্রপতি হওয়ার ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন থেকে সেদিনের সেই ‘মুচি বৌ’-এর ঘটনা এবং চন্দননগরের ব্রাহ্মণ সমাজের বিধান- গোটা ঘটনা তিনি অকপটে বলে ফেললেন তাঁর তরুণ বন্ধুটিকে। শুনে কৃষ্ণচন্দ্র কিছু বললেন না। কেবল তাঁর মুখের রেখা গুলোর নিঃশব্দে দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে লাগলো। ইন্দ্রনারায়ন দেখতে না পেলেও, আপনারা নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন যে গঙ্গার উপর দিয়ে ভেসে আসা বসন্তের হাওয়া মাখা জ্যোৎস্নার আলোয় তাঁর, কৃষ্ণচন্দ্রের, মুখে একটা উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠেছে এবং ক্রমশ সে হাসি চওড়া হচ্ছে।…

ব্যাপারটা একটু অত্যাধিক মেলোড্রামাময় হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি। হয়ত এতো কিছুই সেদিন ঘটেনি। বা হয়ত এরচেয়েও বেশী কিছু ঘটেছিল। কেই বা বলতে পারে! বাঙলায় রাজা-মহারাজাদের জীবন নিয়ে যথেচ্ছ ঢপ মারা জায়েজ। তবে পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডল ইত্যাদি কল্পনাপ্রসূত হলেও দুজনের এই শেষ কথোপকথনটা একদম সত্যি। এবং এই সত্যিটাই ইন্দ্রনারায়নের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নকে আবার জোড়া লাগাতে সাহায্য করবে।

অতঃপর পরের দিন কৃষ্ণচন্দ্র চন্দনগর থেকে কেষ্টনগরে ফিরে গেলেন, নবাব আলিবর্দির দরবারে করের বোঝা লাঘব করলেন, এবং যাতে এই ধারের টাকা কোনোদিন ফেরত দিতে না হয় সেই রাস্তা সিকিওর করলেন। কিভাবে? বলছি।

 

***

 

আমাদের টালিগঞ্জের এক্স-মহানায়ক বুম্বা দা সেই কবেই কি যেন একটা বইতে বলে গেছেন, “বাপেরও জানবি বাপ থাকে”। বুম্বাদার অধিকাংশ কথা বর্তমান মহানায়ক দেবদা মিথ্যা প্রমাণ করে দিলেও এইটি এখনো পারেননি। তাই মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরেই হাঁক দিলেন চন্দননগরের বামুনদের ‘বাপেরও বাপ’দের। অর্থাৎ নবদ্বীপের স্মৃতিকারদের। স্মৃতিকার হচ্ছে যারা হিন্দু স্মৃতিশাস্ত্রের পণ্ডিত, অর্থাৎ যারা হিন্দু সমাজের সমস্ত নিয়ম-কানুন তৈরি করতেন এবং নিজেদের সুবিধামত সেই সমস্ত নিয়ম মডিফাই করে পাবলিককে সর্বদা ঘেঁটে ঘ করে রাখতেন। এবং বলা বাহুল্য, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুরোধে নবদ্বীপের স্মৃতিকারদের পক্ষে ইন্দ্রনারায়নকে দেওয়া ফরাসডাঙার বামুনদের বিধানের ফাঁক বের করতে বিশেষ কাঠ খড় পোড়াতে হলনা। আর সেই বিধানের প্রতিবিধানের নিয়মও বেরিয়ে পড়লো।

পরদিন সকালে দূত ছুটলো কেষ্টনগর থেকে ফরাসডাঙার উদ্দেশ্যে। ইন্দ্রনারায়নও পত্রপাঠ সেই প্রতিবিধানকে কার্যকরী করতে মাঠে নেমে পড়লেন। কিন্তু ব্যাপারটা অতো সোজা নয়। বরং বেশ গোলমেলে। নবদ্বীপের স্মৃতিশাস্ত্রের পন্ডিতরা ইন্দ্রনারায়নকে বিধান দিয়েছিলেন যে তাঁর চার কন্যাকে চারটি মেলের চার কুলীন সন্তানের সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। চারটি কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবার তাঁর অনুগত থাকলে তিনি তাঁদের আত্মীয়-কুটুম্বদের একজোট করে নিজে স্বতন্ত্র দল গঠন করতে পারবেন এবং এই সংগঠিত পাঁচ পরিবারের ধারে-ভারে অটোমেটিকালি হালদারদের সরিয়ে তিনি নিজে গোত্রপতির সম্মান লাভ করতে পারবেন। এবার চারটি টপ কুলীন গোত্রের বিবাহযোগ্য পাত্র-পাত্রী খুঁজে বের করা তখনকার দিনে খুব একটা সহজ ছিলোনা। যাই হোক, ইন্দ্রনারায়ন তাঁর বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে অনেক খোঁজ খবরের পর অবশেষে তাঁর চার পুত্র-কন্যাকে চারটি টপ কুলীন গোত্রে বিবাহ দিলেন এবং তার ফলস্বরূপ তিনি হিন্দু সমাজে গোত্রপতির পদ লাভ করলেন। নবদ্বীপের চালে বাজিমাত হল চন্দননগর। 

 

***

 

গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু একটা ছোট্ট ঘটনার কথা উল্লেখ না করলে এপিসোডটা সম্পূর্ণ হয়না। ইন্দ্রনারায়নের মেয়েদের বিয়েতে সেদিন নিমন্ত্রিত হিসাবে বহু বিশিষ্ট অতিথিদের সঙ্গে চন্দননগরে উপস্থিত ছিলেন সপরিবার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। নির্ঝঞ্ঝাটে বিবাহপর্ব মিটে গেল। ইন্দ্রনারায়নকে চন্দননগরের ব্রাহ্মণ সমাজের পক্ষ থেকে হিন্দুসমাজের গোত্রপতি হিসাবে স্বীকৃতি দান করা হল। আরো যা যা হওয়ার সবই হল।

অবশেষে উৎসব শেষ হল। কৃষ্ণচন্দ্র ইন্দ্রনারায়নের কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসছেন। ইন্দ্রনারায়ন মহারাজকে নিজের আজীবন কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়ে ভবিষ্যতে যে কোনো প্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দান করলেন এবং মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে জানালেন যে তাঁর জন্য এই উপকারের কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ একটি ক্ষুদ্র উপহার আছে। কি সেই উপহার? ইন্দ্রনারায়ন সেদিনের সেই তরুণ কবিকে নিয়ে এসে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সামনে দাঁড় করালেন এবং বললেন যে মহারাজ আপনিই এই প্রতিভাবান কবির প্রতিভার যোগ্য মর্যাদা দিতে পারবেন। আমার তরফ থেকে আপনি এনাকে গ্রহণ করুন। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র যারপরনাই আনন্দিত হয়ে ইন্দ্রনারায়নের সেই উপহার গ্রহণ করলেন এবং তরুণ কবিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি যেন নামটা বলেছিলেন সেদিন”?

উত্তরে কবি মৃদুস্বরে উত্তর দিলেন, “শ্রী ভারতচন্দ্র রায়”। 

—   

 

তথ্য ঋণ-

  • The Prelude to Empire: Plassey Revolution of 1957- Sushil Chaudhury [Manohar] (2000)
  • History of the French in India- G.B. Malleson (1893)
  • Bengal Past and Present – Journal of the Calcutta Historical Society 
  • ক্ষিতীশ বংশাবলী চরিত- কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় (১৯৩২) 
  • নদীয়া কাহিনী- কুমুদ নাথ মল্লিক (১৯১০)
  • বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত 'তৈলবট' শীর্ষক গল্প
  • সংক্ষিপ্ত চন্দননগর পরিচয়- হরিহর শেঠ [চন্দননগর পুস্তকাগার]
  • চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী- চন্দননগর হেরিটেজ প্রকাশন  

 

    

বাংলার প্রথম ফরাসী বাবু ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ও কিছু অজানা ইতিহাস
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments