[লেখাটা "সুতীর্থ" পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় (জানুয়ারি ২০১৭) প্রকাশিত হয়েছিল। এদিক ওদিক টুকটাক যোগ-বিয়োগ করে ও কিছু প্রাসঙ্গিক ছবি যোগ করে চর্যাপদের বন্ধুদের জন্য তুলে দিলাম। উল্লেখ্য, "বাংলা" বলতে এই প্রবন্ধে এসেন্সিয়ালি বৃহত্তর অবিভাজ্য বাঙলার কথা বলতে চাওয়া হলেও প্রকৃতপ্রস্তাবে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ নামক প্রতিবেশী বাঙালি রাষ্ট্রের বিপুল বৈচিত্রময় খাদ্য-সংস্কৃতির সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণা করবার সুযোগ এই অধমের হয়নি। তাই নিজগুণে মার্জনা করবেন এবং "গবেষণার স্বার্থে" দাওয়াত দিয়ে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করবেন। ধন্যবাদ।]
  
 

নুন-নেবু-নঙ্কা

আজ থেকে কয়েক মাস আগে সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটা ছোট্ট ঘটনা- ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রীতিভোজে উপস্থিত হয়েছেন এবং সেই প্রীতিভোজের মেনুতে পদ্মার ইলিশ নেই, ঢাকার বিখ্যাত কাবাব ও কাচ্চি বিরিয়ানি নেই। রয়েছে কেবল একশ রকম নিরামিষ পদ!

এই ছোট্ট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে (বৃহত্তর) বাঙালি এবং আপামর রেস্ট অফ দা ইন্ডিয়ার (খাদ্য) সংস্কৃতির একটা উল্লেখযোগ্য ফারাক। যুগ যুগ ধরে যে ফারাক ইতিহাসের প্রতি পদে পদে বাঙালির সংস্কৃতিকে বাকিদের চেয়ে সতন্ত্র্য হিসাবে চিহ্নিত করেছে, যে ফারাক হজম করতে না পেরে বৈদিক মুনি-ঋষিরা তাঁদের রচনায় বাঙালিকে গালমন্দ করে গেছেন, যে কারনে বঙ্গদেশে পদার্পণ করলে হিন্দু স্মৃতিকারেরা প্রায়শ্চিত্তের বিধান দিয়ে গেছেন, যে কারনে বল্লাল সেন কর্তৃক বাঙলায় কনৌজ থেকে পঞ্চ ব্রাহ্মণ আনয়নের ঘটনা আজও বাঙালির সমাজচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মার্কার হিসাবে রয়ে গেছে। আসলে বাঙালির সামাজিকতার প্রতি পদে পদে অহিন্দু-অনার্য সংস্কৃতির প্রভাব বিদ্যমান। আর এই সামাজিকতার মধ্যে খাদ্য, বলা বাহুল্য, একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর পাঁচটা জিনিসের মতই খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারেও বাঙালি সাত্ত্বিক নয়। বাঙালি প্যাঁজ-রসুন মাছমাংস খায়, বাঙালি শাস্ত্র মানেনা। এবং শুধু না মেনেই সে ক্ষান্ত হয়না, সে নিজের মত করে শাস্ত্রকে বদলে নেয়, বদলে নেয় তার আচারকে, ধর্মকে। কারন বাঙালি চিরকাল র‍্যাডিকাল, আউট-ল। এই লেখাতে আমি মূলত বাঙালির বর্ণময় খাদ্যাভ্যাস ও তার ইতিহাস সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো এবং তার মাধ্যমে বাঙালি জীবনের বিচিত্র ও বহুমুখী পঞ্চরঙ্গ আচার ও রুচির কিছু সুনির্দিষ্ট মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরতে চাইবো। 

 

 

 

শাকভাত

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের টুকটাক কিছু ছিন্নচিত্র রয়েছে এমন বেশ কিছু প্রামান্য গ্রন্থ পাওয়া যায়। মোটামুটি সেই সমস্ত বই-পত্তর ঘাঁটলে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাঙালি আসলে চিরকালই ভেতো-বাঙালি। ভৌগলিক কারনেই হোক কিম্বা আদিবাসী-কৌম সমাজের উত্তরাধিকারের ফলেই হোক, কৃষিপ্রধান বাঙলার প্রধান আহার্য ভাত। আর সেই খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে চতুর্দশ শতকের ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ গ্রন্থে যেখানে ভাগ্যবান স্বামীকে কলা পাতায় গরম ভাত, ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল ও নলিতা শাক পরিবেশনের কথা জানতে পারি-   

“ওগগরা ভত্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা

মোইলি মচ্ছা নলিতা গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা(ই) পুনবস্তা।”

 

আবার চতুর্দশ শতকেই রচিত ‘চর্যাপদ’-এর একটি সহজিয়া-বৌদ্ধ গানে দেখি যে বাড়িতে প্রতিবেশী এসেছে এদিকে হাঁড়িতে ভাত নেই বলে কবি দুঃখ করছেন। অন্যদিকে ‘নৈষধচরিত’ গ্রন্থে দময়ন্তীর বিয়ের ভোজে যে বিপুল আয়োজনের বর্ণনা রয়েছে তাতে সুসিদ্ধ ও সুস্বাদু ভাত ও পরমান্নের বর্ণনা পাচ্ছি। পঞ্চদশ শতকে কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে সার্বভৌম ভট্টাচার্যের বাড়িতে মহাপ্রভুর ভোজনের যে বর্ণনা পাই তাতে প্রথমেই রয়েছে আঙ্গট পাতায় গরম গরম ঘি আর ভাতের কথা।  

ফলে মোটামুটি যা দেখা যাচ্ছে ভাত না হলে বাঙালির চলে না। তবে শুধু ভাত তো খাওয়া যায়না, তাই ভাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানাবিধ ব্যাঞ্জন। এ প্রসঙ্গে প্রাকৃত পৈঙ্গলের কথা আগেই বলেছি যেখানে নলিতা শাকের কথা আছে। তবে শাকের বর্ণনা দেওয়ার জন্য বেশী শব্দ খরচ না করে পনেরশ শতকে রচিত কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য থেকে কয়েকটা লাইন তুলে দেওয়াই যথেষ্ট-

“নটে রাঙ্গা তোলে শাক পালঙ্গ নলিতা,

তিক্ত ফলতার শাক কলতা পলতা।

সাঁজতা বনতা বন পুঁই ভদ্র পলা,

হজলী কলমী শাক জাঙ্গি ডাঁডি পলা।

নটুয়া বেথুয়া তোলে ফিরে ক্ষেতে ক্ষেতে,

মহুরী শুলকা ধন্যা ক্ষীর পাই বেটে।

ডগি ডগি তোলে যত সরিষার আজ…” ইত্যাদি।

আবার এই পনেরশ শতকের মধ্যভাগে রচিত ‘চৈতন্য ভাগবত’ গ্রন্থেই প্রায় কুড়ি রকমের বিভিন্ন স্বাদ ও রঙের শাকের বর্ণনা রয়েছে। সব মিলিয়ে দেখতে গেলে ঘি দিয়ে মাখা গরম ভাত ও শাক হচ্ছে বাঙালির স্টার্টার বা অ্যাপেটাইজারের সমতুল্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে “দশবিধ শাক” এর সঙ্গেই “নিম্ব তিক্ত শুক্তার ঝোল” এর কথা বলা আছে।

 

ডালভাত

ঘি সহযোগে শাকভাত যদি বাঙালির স্টার্টার কোর্স হয় তাহলে এর পরেই আসে মেন কোর্স। যদিও বাঙালির খাওয়া দাওয়াকে এই ইউরোপীয় থ্রি বা ফাইভ কোর্স মিলে ভাগ করা যায় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। মোটামুটি ভাবে দেখতে গেলে, একটা ফাইভ কোর্স মিলের প্রথমে থাকে অ্যাপেটাইজার (বাঙালির ক্ষেত্রে তেতো বা শাক), তারপর স্যুপ (ডাল), এরপর যথাক্রমে মাছ, মাংস ও ডেজার্ট বা মিষ্টি। বাঙালির ক্ষেত্রে একটা অবধারিত সংযোজন হল অম্বল বা টক। যাই হোক, এই তুল্যমূল্য বিচারে না গিয়ে আমরা বরং এর ভারতীয় সংস্করণটির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিই, যেখানে আহারকে ছয়টি স্বাদের (অম্ল, তিক্ত, মধুর, লবণ, কটু ও কষায়) ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে এবং এই ছটি স্বাদের ভিত্তিতে আবার চারটি ভাগে (চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়) বিভক্ত করা হয়েছে। এই চতুর্বিধ খাদ্যের মধ্যে রয়েছে চার শ্রেণীর খাদ্য, যথা- জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ এবং উদ্ভিদ্দাজি। এই হল মোটামুটি বাঙালি রান্নার তত্ত্বগত বিচার। এবার এই কচকচানি থেকে বেরিয়ে যে কথা বলছিলাম সেখানে ফিরে যাই। অর্থাৎ ডালভাত।     

প্রাচীন বাঙালি ডাল খেত কিনা তা নিয়ে নীহার রঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে একটি প্রশ্নচিহ্ন তুলেছেন। এক তো কোনো প্রাচীন গ্রন্থে বাঙালির ডাল খাওয়ার কোনো খবর নেই, উপরন্তু এই অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী-কৌম সমাজের খাওয়া দাওয়ার মধ্যেও ডাল খাওয়ার চল দেখতে পাওয়া যায়না। যদিও ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে ডালের উল্লেখ না থাকলেও বড়ির উল্লেখ রয়েছে, আর কে না জানে যে বড়ি তৈরির একটি প্রধান উপাদান ডাল। তবে সে যুগে ডাল ছাড়াও বড়ি তৈরির অন্য কোনো উপকরণ ছিল কিনা তা জানা যায়না। সে যাই হোক, সেকালে চল না থাকলেও পরবর্তীকালে বাঙালির রান্নায় ডাল ক্রমে একটি অতি অবশ্যকীয় পদ হয়ে ওঠে সম্ভবত দক্ষিণ থেকে সেন রাজবংশ ও উত্তর-পশ্চিম থেকে ইসলামের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই। তার প্রমান পাই ‘ব্যাঞ্জন রত্নাকর’ নামক আধুনিক বাঙলা ভাষায় রচিত প্রথম রান্নার বইতে। এই বইতে ডাল রান্নার একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে যেখানে মুদগ, অরহর, মসুর ও কলাই ইত্যাদি ডাল রান্নার বিভিন্ন পদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। 

তবে প্রাচীন বাঙালির মেনুতে ডাল থাকুক আর নাই থাকুক, কিন্তু আজকের বাঙালির মেনুতে বর্ষার দিনে চাল ডাল ও নানাবিধ সবজি বা মাংস সহযোগে তৈরি খিচুড়ি আর পাঁপড় ভাজার যে কোনও বিকল্প নেই সে কথা কে না জানে। কিন্তু খিচুড়ি যে প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম ভারত থেকে আগত মুসলিম শাসকদের প্রিয় একটি পদ এবং বাংলায় ও গুজরাটে বৈষ্ণব-প্রভাবের ফলে মাংস বর্জিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে সে খবর পশ্চিম বাংলার অনেকেই রাখেন না।      

 

মুসলিম বংশোদ্ভূত খিচুড়ি, বাঙালির শ্রেষ্ঠ কমফোর্ট ফুড  

 

সবজিভাত

ডাল ভাতের পরেই অথবা সঙ্গেই এসে পড়ে নানাবিধ ব্যাঞ্জন ও তরি-তরকারি। আজকের দিনে তরকারি বলতে প্রথমেই যে নামটা মনে আসে তা হল আলু। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, বাঙালির হেঁশেলে আলুর আগমন হয়েছে সপ্তদশ শতকের শেষদিকে। আলু, টমেটো, কাঁচালঙ্কা এ সবই ইউরোপীয়, মূলত পর্তুগীজদের দান। কিন্তু বাঙালির রান্নায় আলুর “সর্বঘটে কাঁঠালি” হয়ে ওঠার আগে বাঙালি যে সমস্ত সবজী খেত তার মধ্যে রয়েছে কচু, বেগুন, লাউ, উচ্ছে, কুমড়ো, পটোল, ঝিঙে, কাঁচকলা, নারকেল ইত্যাদি। পঞ্চদশ শতকে রচিত “মনসামঙ্গল” ও “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে এই সমস্ত সবজি দিয়ে রান্না করা অজস্র বিচিত্র নিরামিষ পদের বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পর্তুগীজরা ভারতে এসে কেবল বিভিন্ন সবজি ইন্ট্রোডিউস করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা সেই সমস্ত সবজি দিয়ে বিভিন্ন পদও রান্না করতো যার কিছু কিছু আজও আমাদের বাঙালি রান্নার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে রয়ে গেছে। যেমন ধরুন শুক্তো। উচ্ছে ও অন্যান্য সবজী দিয়ে তৈরি করা এই লোকপ্রিয় পদটি পর্তুগীজদেরই আবিষ্কার বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন যাকে বাঙালিরা আরও মডিফাই করে আজকের রূপ দান করেছে।   

তবে সবজি ছাড়াও আরো একটা পদ এর সঙ্গেই এসে পড়ে, তা হল ছানা। ছানার দালনা একটি অতি প্রাচীন বাঙালী পদ যা বহু যুগ ধরে বাঙালীর রসনাকে তৃপ্ত করে আসছে। তবে ইদানিং ছানার পরিবর্তে বাঙালীর রান্নাঘরে পনীর নামক যে বিস্বাদ উত্তর ভারতীয় (আ)পদটির আমদানি হয়েছে তার সম্পর্কে যত কম শব্দ খরচ করা যায় ততই মঙ্গল।        

 

বাঙালির প্রিয় পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত "শুক্তো" 

 

“মৎস্য মারিবো খাইবো সুখে”

বাঙালীর প্রিয় খাদ্য মাংস নয়, মিষ্টি নয়, বিরিয়ানিও নয়, আরো এক জলজ বিস্ময়… অর্থাৎ মাছ। মাছ খাওয়ার জন্য বাঙালী কি না করেছে! একদিকে যেমন বাঙালীর এই অত্যাধিক মৎস্য-মাংস প্রীতিকে ব্রাহ্মণ্য ভারত ভালো চোখে দেখেনি, ক্রমাগত বাঙালীর ছায়া এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে আবার বাঙলার বৌদ্ধদের সঙ্গে কম্পিটিশানে এঁটে ওঠার জন্য ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বজ্রআঁটুনিকেও আলগা করতে হয়েছে। বাঙালীর প্রধান দুই হিন্দু স্মৃতিকার ভবদেব ভট্ট ও শ্রীনাথাচার্যকে বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথি ও শাস্ত্র থেকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করে প্রমাণ করতে হয়েছে যে হিন্দুদের মাছ খাওয়া জায়েজ! বৃহর্দ্ধমপুরাণে রুই, ইলিশ, পুঁটি, সোল ইত্যাদি মাছকে নিরামিষ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ব্রাহ্মণ্যের ভক্ষ্য বলে বিধান দেওয়া হয়েছে। যদিও আঁশবিহীন মাছ ও আরো বেশ কিছু মাছ খাওয়ার ব্যাপারে বিধি-নিষেধ আছে বটে, কিন্তু মোদ্দা কথা ধর্মের শিকল বাঙালীকে বেঁধে ফেলতে পারেনি। ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধর্ম- এই ফিলজফিকে সম্বল করে বাঙালী সমস্ত ধর্মীয় বিধি-নিষেধকে অক্লেশে বদলে ফেলেছে।

অবশ্য কেবল হিন্দুধর্মই নয়, মাছ ধরা ও মাছ খাওয়া নিয়ে বৌদ্ধদের সঙ্গে বাঙালীর সংঘাতের কাহিনী ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ নামে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। যাকে অনেক ঐতিহাসিকই মনে করেন ভারতের প্রথম সত্যিকারের সফল রাষ্ট্রবিপ্লব। প্রথম শতকের শেষ দিকে বাঙলার কট্টর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের সঙ্গে মৎস্যজীবী বা জেলে শ্রেণীর কৈবর্ত সম্প্রদায়ের মানুষদের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় যার প্রধান কারন ছিল মাছ ধরা। যেহেতু বৌদ্ধরাজার সমস্ত প্রকার প্রাণীহত্যার বিরোধী ছিলেন তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের সঙ্গে মৎস্যজীবী শ্রেণীর মানুষের বিরোধ বাধে। এই দ্বন্দ্বের প্রাথমিক ভাবে কৈবর্ত শ্রেণীর আধিপত্য কায়েম হলেও পরে পালরাজা রামপাল তাঁদের পরাস্ত করেন। কিন্তু বিদ্রোহের অন্তিম পরিণতি যাই হোক না কেন, এ কথা বুঝতে অসুবিধা হয়না যে কতোটা শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হলে সমাজের তথাকথিত নিম্নস্তরের একটা সম্প্রদায় দেশের রাজার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে অবতীর্ণ হতে পারে!

আর এর সুদূর প্রসারী ফলাফল কিনা বলতে পারবো না, তবে এর কয়েকশ’ বছরের মধ্যেই কঠিন নিয়মনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ কৃচ্ছসাধনের ধর্ম বৌদ্ধধর্ম বাঙালীর পাল্লায় পড়েই গোল্লায় গেছে। তার সবচেয়ে বড় উদাহরন চর্যাপদ-খ্যাত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য লুইপা যিনি নাকি মাছের পটকা খেতে খুবই ভালোবাসতেন বলে জানা যায়। আদিবাসী সমাজের লোকায়ত ধর্ম ও শাক্ত তন্ত্রের সঙ্গে বৌদ্ধধর্ম মিলেমিশে বাঙলায় যে সহজযানের জন্ম হয় তার নিয়মনীতি দেখলে এক এক সময় রীতিমত ভিরমি খেতে হয়। কে বলবে যে বৌদ্ধধর্ম অহিংসা ও কৃচ্ছসাধনের ধর্ম! বিভিন্ন বৌদ্ধ দেবদেবীর পুজোতে নানা প্রকার মাছ ও মাংস নৈবেদ্য হিসাবে প্রচলিত ছিল। আবার যে হিন্দুধর্মের বলিদানের বিরোধিতা ছিল গৌতম বুদ্ধের নতুন ধর্ম প্রচারের অন্যতম প্রধান ইউ.এস.পি, সেই বৌদ্ধধর্মকেই বাঙলায় দেখতে পাই তন্ত্রের সঙ্গে মিলেমিশে এক হাজার বছরের মধ্যে ছাগল, ভেড়া, মুরগি তো আছেই, এমনকি হাতি বলি দেওয়ারও বিধান দিচ্ছে! আর এই সমস্ত বলিপ্রদত্ত প্রসাদী মাছ-মাংস যে সাধকের পেটেই যেত, আর সাধকও যে বাঙালীই ছিল তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে আর বলে দিতে হবেনা।

 

কোলকাতার বাঙালি বাবু মাছওয়ালীর কাছ থেকে মাছ কিনছেন। কালীঘাট পটচিত্র, অষ্টাদশ শতক। 

 

যাই হোক, ধর্ম-শাস্ত্রের কথা বাদ দিলে মধ্যযুগের বাঙালীর বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য গুলোতে মৎস্য মাংস ভোজনের বিপুল ও বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। বিভিন্ন মনসামঙ্গল কাব্যে রুই, কাতলা, চিতল, মাগুর, খরসুল, চিংড়ি, কৈ, ইলিশ, রিঠা, পাবদা, শাল, সোল ইত্যাদি মাছের নানা পদের লোভনীয় সব বর্ণনা দেখতে পাই। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে মাছ রান্নার যে বিশাল তালিকা পাচ্ছি তার মধ্যে ভেটকি, কাতলা, কই, চিতল, ফলুই, খড়কী, চিংড়ি, খয়রা, মায় কাছিমের ডিমের কথাও বলা হয়েছে, যার আরেক নাম নাকি ‘গঙ্গাফল’ এবং যা খেতে নাকি অমৃত সমান!

মাংসের কথা বলতে গেলে প্রথমত চর্যাপদে ভুসুকু পা-এর একটি গানে হরিণ শিকারের বর্ণনা পাই। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলে দেখা যায়, “মাংসেতে দিবার জন্য ভাজে নারিকেল / ছাল খসাইয়া রান্ধে বুড়া খাসীর তেল” ইত্যাদি। কবিকঙ্কনের চণ্ডীমঙ্গলে এক ব্যাধপত্নীর বেজী ও শজারুর মাংস রান্না করার বর্ণনা পাই। প্রসঙ্গত, পঞ্চনখ বিশিষ্ট এই ধরণের বিভিন্ন ছোট প্রাণী খাওয়ার ব্যাপারে যে বিশেষ বিধি নিষেধ ছিলনা এ কথা ভবদেব ভট্টও স্বীকার করে গেছেন। আবার ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে ছাগ মাংসের যে সমস্ত পদের সন্ধান পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় যে ততদিনে মুঘলাই রান্নাঘরের সঙ্গে বাঙালীর পরিচয় হয়ে গেছে। তবে ব্রাহ্মণ্য সমাজে গরু, উট, শূকর, মোরগ, হাঁস, কাঁকরা ইত্যাদি মাংস যে নিষিদ্ধ ছিল তা জানা যায়। যদিও ব্রাহ্মণ্য সমাজের পরিসরের বাইরে যে বৃহৎ বঙ্গ ছড়িয়ে রয়েছে তাকে এই স্মৃতির বিধান দিয়ে আটকায় তা কার সাধ্যি!

 

মিষ্টিমুখ

মিষ্টি না হলে বাঙালীর ভুরিভোজ সম্পূর্ণ হয়না। আজ বাঙালীর মিষ্টি বিশ্ববিখ্যাত এবং বাঙালীর অন্যতম গর্বের বস্তু হলেও প্রাচীন বাঙলায় মিষ্টির সিনারিওটা ছিল কিঞ্চিত অন্যরকম। সেকালে মিষ্টি বলতে বোঝাতো মূলত নাড়ু, পিঠে ও পায়েস। সন্দেশ নামে আলাদা করে কোনো মিষ্টির অস্তিত্ব ছিলোনা। সেকালে এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে যখন চিঠি বা খবর পাঠানো হত তার সঙ্গে মিষ্টি পাঠানো হত। এই সংবাদ বা সন্দেশের সঙ্গে পাঠানো মিষ্টিই কালক্রমে ‘সন্দেশ’ নামে পরিচিত হল। নাড়ুর মধ্যে চালের নাড়ু, মুড়ির নাড়ু, তিলের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, শুণ্ঠিখণ্ড নাড়ু ইত্যাদির প্রচলন ছিল। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি ও পিঠের বর্ণনা পাই যার মধ্যে রয়েছে অমৃত গুটিকা, কাঞ্জিবড়া, ক্ষীরখন্ড, ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি, ছানাবড়া, পায়েস, নালবড়া, পাতপিঠা, দুগ্ধলকলকি, মনোহরা ইত্যাদি। খেজুরের রস ও আখের রস থেকে গুড় ও পাটালি গুড় তৈরি হত। এছাড়া পানীয় হিসাবে এই রস পান করা হত। মোটামুটি আজকের মতই সেকালেও ক্ষীর ও ছানার বিভিন্ন রকম মিষ্টি তৈরি হত বলে জানা যায়।

তবে ভারতের ব্রাহ্মণ্য সমাজ মাছ-মাংসের মতই বাঙালীর ছানা খাওয়াকেও মোটেই ভালো চোখে দেখত না। যেহেতু দুধ কেটে গিয়ে বা নষ্ট হয়ে গিয়ে ছানা তৈরি হয় তাই হিন্দুশাস্ত্রে ছানা খাওয়ার ব্যাপারে বিধি নিষেধ ছিল। তবে বাঙালী, অ্যাজ ইউজুয়াল, এই নিষেধকেও গুরুত্ব দেয়নি এবং সে কারনেই আজ সারা ভারতে বাঙালীর ছানার মিষ্টি শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার। যদিও কয়েকদিন আগেই রসগোল্লার প্যাটেন্ট নিয়ে প্রভূত জলঘোলা হল, কিন্তু কেউ কেউ মনে করেন যে ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে উল্লেখিত ‘ছেনাবড়া’ই হয়ত রসগোল্লার পূর্ব অবস্থা।

বাঙালির প্রিয় ছানার রসগোল্লা, শাস্ত্রগত ভাবে যা হিন্দু বামুনের "হারাম"
   

মুখশুদ্ধি             

বাঙালী সমাজে খাওয়া দাওয়ার পর মুখশুদ্ধি করার প্রচলন চিরকাল ছিল। চর্যাপদে পান ও কর্পূরের কথা পাই। মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে গুয়া পানের কথা আছে। পান, সুপারি, হরিতকী ইত্যাদি মুখশুদ্ধি হিসাবে ব্যবহৃত হত বলে জানা যায়।

 

শেষপাতে

বাঙালীর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এই সংক্ষিপ্ত চর্চার শেষে এ কথা আবারো বলা যায়, যে আদিবাসী-কৌম সমাজের উত্তরাধিকার স্বরূপ বাঙালি খাদ্যের প্রয়োজনে চিরকাল প্রকৃতির মুখাপেক্ষী হয়েই থেকেছে। গোটা ভারত যখন গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মের শিকলে আবদ্ধ হয়েছে, বাঙলার মাঠেঘাটে তখন খেলে বেরিয়েছে স্বাধীন স্বেচ্ছাচারের খোলা হাওয়া। আর প্রকৃতির প্রতি এই নির্ভরশীলতার কারনেই প্রাচীন বাঙালির বিভিন্ন লৌকিক আচার বা রিচুয়ালের মধ্যেও তার প্রয়োজনীয়তার বস্তু গুলি স্থান করে নিয়েছে, আজও যে সব স্মৃতিচিহ্নকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। কখনও তা দেখা দেয় আশীর্বাদের ধান-দূর্বায়, কখনও তা ধরা দেয় ব্রতপালনের মাটির সরায় শস্যের অঙ্কুররূপে, কখনও বা শাকম্ভরী দুর্গা রূপে। বাঙালীর সর্বাপেক্ষা প্রিয় খাদ্যবস্তু মাছ তাই হয়ে ওঠে “নেক্সট বেস্ট থিং” সফল যৌনতার প্রতীক। আর পাঁচটা মাতৃতান্ত্রিক কৌম সমাজের মতই বাঙালীর লৌকিকতায় তাই ফল ও ফসল দাত্রী মাতৃরূপের স্থান সর্বোচ্চ। ব্রাহ্মণ্য-আর্য সমাজে যেখানে পুরুষ দেবতাদেরই প্রাধান্য ও শাসন, বাঙালীরা সেখানে মাতৃকাশক্তিকেই আদ্যাশক্তি রূপে বরণ করে নিয়েছে। যুগ যুগ ধরে নানা রূপে, বিভিন্ন নামে বাঙালী এই অন্ন-পূর্ণারই সাধনা করে এসেছে। আর বাঙালীর এই আদিম উত্তরাধিকারই হয়ত তাকে সমস্ত দিক থেকে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী জাতি হিসাবে গড়ে তুলেছে।

 

[ছবি: ইন্টারনেট]

বাঙালীর খাদ্যাভ্যাস প্রসঙ্গে দু’ চার কথা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments