ব্রাজিল দেশে বিশ্বকাপ হওয়া মানে অনেকটা মস্কোতে ভদকা পার্টি বা পদ্মাপারে ইলিশ উৎসব হওয়ার মত। এমনিতে গরিব দেশ তবু ফুটবল পাগল লোকেরা বিশ্বকাপের সময় ঘরদোর বেচে অন্য দেশে ব্রজিলকে সমর্থন দিতে ছুটত। এবার কোথাও যেতে হচ্ছে না তাই তারা ভেবেছিল যে ফুটবলের জন্য সব হারিয়েছি এক কালে, তাই এবার দেশের জন্যে কিছু করি। তাদের মৌলিক দাবি ছিল যে ফুটবলের আয়োজনের সাথে সাথে রাষ্ট্র তাদের অনাহারে মরা শিশুদের জন্যে খাদ্যের ব্যবস্থাও করুক। আপামর জনগণ মোটের ওপর বোঝাতে চেয়েছিল যে সারা বিশ্ব, ফুটবল দেখতে এসে উলঙ্গ কদাকার শিশুদের চেহারা দেখে তাদের দেশ সম্বন্ধে অন্যরকম ধারণা নিয়ে ফেরত যাবে সেটা কখনই হতে দেওয়া যায় না। গাম্বাট সরকার কি বুঝলো কে জানে , দুম দাম নির্বোধ পুলিশ মিলিটারি লেলিয়ে দিলো তাদের ওপর। সারা বিশ্বের চোখ যখন নেইমারের পায়ের খেল দেখতে ব্যস্ত , নেইমারের বয়সী অনেক যুবকেরই মারের চোটে কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। এক সপ্তাহ হয়ে গেছে তাই সে রক্তও এতদিনে শুকিয়ে গেছে বোধহয়। কাল রাতে বিভৎস এক দুঃস্বপ্ন দেখলাম , ব্রাজিলের ছোট ছোট শিশুদের মুন্ডু কেটে তাদেরই গায়ের চামড়া দিয়ে সেগুলো মুড়িয়ে , রং করে , বিদেশে ফুটবল হিসেবে রপ্তানি করা হচ্ছে। আমাদের দেশের বাচ্চারা সেই সব বল গুলো দিয়ে বর্ষা ভেজা মাঠে সরাত করে স্লাইড মেরে জমিয়ে ফুটবল খেলেছে। আস্তে আস্তে চামড়ার বলের সেলাই গুলো জলে ভিজে খুলে যাচ্ছে ও বাংলার মাঠে জমা বর্ষার জল ব্রাজিলের শিশুদের রক্তের রঙে লাল হয়ে উঠছে। সাইড থেকে কিছু উল্লসিত দর্শক চিৎকার করছে, "ভুলবে না বাংলা ব্রাজিলের নাম…লালে লালে লাল সেলাম। "
ঘুম ভেঙ্গে গেল, গলা শুকিয়ে গেছে। জল খেতে খেতে মনে হলো বিশ্বকাপ যেটাকে বলছে সেটা তো ছোটখাটো একটা সোনালী মুগুরের মত দেখতে, কাপও না টাম্ব্লারও না ! বাজার চাইলে কি না করতে পারে! কোনদিন দেখব এক সফ্ট ড্রিংক কোম্পানি পুরো বিশ্বকাপটাই কিনে নিয়েছে ও বিশ্বকাপটা তাদের পানীয়ের বোতলের আকারে তৈরী করেছে, বিশ্বকাপ হবে বিশ্ববোতল। বিজ্ঞাপণে দেখানো হবে পুরো বিশ্ববাসীর স্বপ্ন , বোতল খুললেই হুসসসস করে ফ্যানা ছিটকে পড়ছে বিশ্বের গায়, কি exciting ! সে কোম্পানি অবশ্য এখনই বিশ্বকাপের অর্ধেক কিনে নিয়েছে আর বাকিটা কিনেছে ডাকসাইটে এক ইলেকট্রনিক ও মিডিয়া কোম্পানি। আমার এক প্রতিবাদী কমরেড বন্ধু ছাত্রাবস্থায় কোকা কোলা খেতেন না , কেননা তার পার্টি তাকে বুঝিয়েছিল যে প্রত্যেকটা কোকা কোলার বোতলে ইরাকি ও আফগান শিশুদের রক্ত মিশে আছে। দশ বছর পরে সেই বন্ধুকে দেখলাম কোকা কোলার লোগো লাগানো লাল স্ট্রিপড জামা পরে ইয়া বড় বড় টেরিটোরি সামলাচ্ছে। জিগ্যেস করলাম, "কিরে তুই তাহলে শেষ মেশ ইরাকি শিশুদের রক্ত পান করছিস?" হেসে বলল , "না রে, খোজ নিলাম ওটা কোকা কোলা নয় ওটা পেপসি। আর আমার কাজ লোককে খাওয়ানো , নিজে খাবার আর সময় কই ?" অনেক দিন বাদে দেখা তাই আর কথা বাড়িয়ে পরিবেশ তিক্ত করলাম না। বরঞ্চ সে আমায় গঙ্গার জলের মত পবিত্র কোকা কোলায় তিক্ত রাম মিশিয়ে খাইয়ে নিজের প্রাচীন পাপ খানিকটা স্খলন করলো। বললাম না বাজার পারে না হেন কিছু নেই!
বীরভুম জেলায় অনেক গুলো পাথর খাদান আছে। মহম্মদবাজার অঞ্চলে যখন আদিবাসী মজুররা দুপুরের টিফিন খেতে স্থানীয় বাজারের দোকান গুলোতে ভিড় করত তখন লুচি তরকারী , পাউরুটি ডিম ছাড়া কিছুই পাওয়া যেত না সেখানে। সেই বাজারের হটাত একদিন গৌর মিষ্টান্ন ভান্ডারে মজুররা অবাক হয়ে দেখলো যে লাল লাল বাক্স করে কালো কালো বোতল নামছে আর গৌর বাবু তা গুনে গুনে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখছে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে সুবল মুর্মু জিগ্যেস করলো , "ইঠো কিরকম বোতল গো বটে ?" দোকানদার উত্তর দিল , "এটার নাম 'খোকা খোলা' বটে , ৫ টাকা দাম, বল তো খুলে দিবো, একবার তুই খেয়ে দেখ। " সুবল ১০ টাকা দিয়ে দু বোতল ঢকঢকিয়ে মেরে দিল। নাঃ বেশ খেতে, আরো খেতে হবে, আবার দু বোতল মারলো সে। শেষে বিরক্ত হয়ে বলল, "বিশঠো টাকা গেলো কিন্তু দু টাকার মহুয়াতে যা লিশা হয় , ইঠোতে সিটা হলোনি। " গোমুখ্য সাঁওতালটা বুঝতেও পারেনি যে কি ভাবে জনৈক বাজারে গিয়ে সে বিশ্ব বাজারের কবলে পড়ে গেছে। কবলে অবশ্য অনেক শিক্ষিত কেষ্ট বিষ্টুরাও পড়েছে , স্রেফ পড়ার সময়ে তারা এতটাই মত্ত ছিল যে সেরকম ভাবে পড়াটা টের পায়নি। বাঁকুড়ায় একবার এক রিকশাওয়ালার সাথে বেদম বাওয়াল, ফেরার ভাড়া ১৫ টাকা চাইছে, এসেছি ১০ টাকাতে। মাথা ঠান্ডা রেখে জিজ্ঞেস করলাম যে দুপুর হতেই ৫ টাকা ভাড়া কেন বেশি চাইছে সে? জবাব এলো , "গরমে খাটনি বেশি তাই খিদে লাগবে, খাবারের জন্য ৫ টাকা বেশি !" আমি বললাম যে আমিও খাবো ও তাকেও ক্যান্টিনে ভাত খাইয়ে দেবো তবে ভাড়া দেব ১০ টাকা! কিন্ত সে তাতে একেবারেই নারাজ। অনেক পিরাপিড়ির পরে সে বলল সে ভাত খাবে না , সে ৫ টাকা extra চায় , তা দিয়ে সে হাঁড়িয়া খাবে তাতে তার পেটে পেট ভরবে আর লিশায়ে লিশা হবে !
বাজার এক আজব কিসিমের ব্যাপার। বাজারী হলে সবাই কিনতে চায় আর না হলে বাঁচতে গেলে সেই বাজারে গিয়েই সব্বাইকে কিছু না কিছু বেচতে হয়। হয়ত কালকে বাজার এতটাই উঁচু হবে যে বাজারের সাথে সাথে ওরাও এ মাটি ছেড়ে ওই ওপরে উঠে যাবে। তখন ওপরে ওদের মেঘের রাজ্যে পসার মেলে দিন রাত বিক্রি বাট্টা হবে। সব থেকে উঁচু মলটার থেকেও উঁচুতে কেনা বেচা যা আমরা কেউ দেখতে পাবো না। দেখতে পেলেও চোখ বন্ধ করে থাকব পাছে নিচের বাজারে ওপরওয়ালাদের নোংরা অভিশাপ লাগে । ওপর তলার বাজারবৃত্তির বিষ্ঠা ফেলা হলে তা মাধ্যাকর্ষণের দায়ে মুখমন্ডলের আনাচে কানাচে ছিট ছিট করে লেগে রবে। বোধহয় কাজের দোহাই দিয়ে পেটের দায়ে আবার বাজারবৃত্তিতে বাজারের বৃত্ত পূর্ণ হবে !!

বাজারবৃত্তি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments