রাত ১ বেজে ৩৫ মিনিট । পুরো কোলকাতা নিস্তব্ধ । মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে নৈশ-প্রহরী এর বাঁশির আওয়াজ । ওঘরে আমার রুমমেট ঘুমের মধ্যে মৃদু নাসিকা গর্জন করছে । এসবের মধ্যেই হঠাৎ ইচ্ছে হল কিছু লেখার ।

দিন যায় দিন আসে । রোজই নতুন নতুন অনেক ঘটনা দেখি । কিছু কিছু মনে থাকে আর বেশীরভাগই ভুলে যাই । যত বড় হচ্ছি তত ভুলে যাওয়ার পরিমাণ টা বাড়ছে । ছোটবেলায় কিন্তু এরকম ছিলনা । তখন তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসও ঠিক মনে থাকতো । যতই বড় হচ্ছি ততই স্বার্থপর আর ভুলো-মনা হয়ে উঠছি যেন । নিজের কথা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারি না । অথচ ছোটবেলায় যখন কোনো মহাপুরুষের জীবনী পড়তাম অথবা কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্মত্যাগের কথা শুনতাম তখন যেন নিজের অজান্তেই দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কিছু করার কথা ভাবতাম । তারপর অনেক দিন কেটে গেছে । সময় এগিয়েছে, দেশ এগিয়েছে, আমিও অনেকটাই বড় হয়েছি । আজ স্বাধীন ভাবে সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা করতে পারি আগের থেকে অনেক বেশী । নিজের কাছে করা ছোটবেলার সেই প্রতিজ্ঞাগুলো আজ ভুলতে বসেছি । অবাক হয়ে ভাবি যে স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পন্ন একজন ছেলের সমাজের প্রতি কৃতকর্মের মান শূন্য । শুধুমাত্র ভোটদান ছাড়া আজ পর্যন্ত কিছুই করিনি আমি । সেই ভোটদানের ফলে সাধারণ গরীব লোকেদের ঠিক কি উন্নতি হয়েছে তা আমার চিন্তাজগতের বাইরে । ছোটবেলায় মানুষের যেরকম দুর্দশা দেখে এসেছি এখনো তাই দেখছি । শুধুমাত্র বাইরের জগতের পরিবর্তন হয়েছে । ঝাঁ চকচকে কিছু শপিং মল, রাস্তার উপর কিছু বিদেশী কোম্পানির মোটরগাড়ি আর লোকের হাতে হাতে হরেকরকমের ফোন । কিছু করতে চেয়েও পারছি না । রাস্তার গরীব কোনও ছেলে বা মেয়েকে কয়েকটা টাকা দিয়ে অথবা কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে কিছু সাহায্য কতোটাই বা সাহায্য করবে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো কে ?

নিজের স্মৃতি থেকে কিছু কিছু ঘটনা তুলে ধরছি -

ঘটনা ১ – উত্তরবঙ্গের একটি অখ্যাত গ্রাম । গ্রামের লোক ইলেকট্রিকের মুখ তখনো দেখেনি । গ্রামের মধ্যে একটি বাড়ী – পাটকাঠির বেড়া, ছনের ছাউনি, ২ টো ঘর । বাড়ীর উঠোনে ৪ টি ছোট ছেলে মেয়ে একটি বাটি থেকে হাপুস- হুপুস করে পান্তাভাত খাচ্ছে । কারণ তারা জানে এইবেলাই তাদের দিনের একমাত্র খাওয়া এরপর সারা দিনে কিছু নাও জুটতে পারে ।

ঘটনা ২ – দুজন বাচ্চা ছেলে হাতে প্লাস্টিক নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে । অনুসন্ধিৎসা-বশত আমি ওদের ডেকে প্লাস্টিকের ভেতর কি বই আছে দেখার চেষ্টা করছি । দেখি শুধু একটা থালা আর জলের বোতল । বই নেই কেন কারণ জিজ্ঞাসা করাতে উত্তর পেলাম ওরা স্কুলে শুধু মিড ডে মিল খেতেই যায় । তারপর বাড়ীতে ফিরে আবার মাঠে কাজে যেতে হয় । ভালো লাগলো এটা ভেবে যে একবেলা পেট-পুরে খেতে পারছে অন্তত ছেলেগুলো ।

ঘটনা ৩ – অনেক অভাব অনটন সত্ত্বেও ভালোভাবে এইচ এস পাশ করে ছেলেটি ভর্তি হল শহরের ভালো একটি কলেজে গ্রাজুয়েশনের পর ইচ্ছে ছিল মাষ্টার ডিগ্রী করার । কিন্তু অপ্রতুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা । তাই মোটামুটি রেজাল্ট থাকা সত্ত্বেও ছেলেটিকে ইচ্ছা পূরণের জন্য যেতে হল ভিনরাজ্যে । ছেলেটির একবারের যাতায়াতের একটা নমুনা দেওয়া যাক বাড়ী থেকে ১ ক্রোশ হেঁটে বা সাইকেলে নদী । নৌকায় নদী পার হয়ে আরো কিছুটা দূর হেঁটে ট্রেকার স্ট্যান্ড । খুব কম সংখ্যক ট্রেকার চলে তাই অনিশ্চিত অপেক্ষা । এরপর ট্রেকারে চেপে ৩০ মিনিট । তারপর বাসে চেপে ১ ঘণ্টা ও আরেকটি বাস-স্ট্যান্ড । সেখান থেকে আবার বাসে চেপে ১ ঘণ্টা । এরপর অটোতে চেপে রেলস্টেশন । তারপর ট্রেনে চেপে গন্তব্য-স্থল । এতো কষ্ট করেও ছেলেটি নিজের ইচ্ছাপূরণ করতে পারেনি । পিতামাতার অসুস্থতার কারণে অথবা আর্থিক দৈন্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় । এখন জমিতে চাষ করা ও চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হল তার দৈনন্দিন রোজনামচা ।

ঘটনা ৪ – ট্রেন চলছে খুব জোরে স্টেশনের পর স্টেশন পার হয়ে যাচ্ছে । আর আমাদের দেশের কিছু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাদামের খোসা, ঝালমুড়ির প্যাকেট, চায়ের কাপ যেখানে সেখানে ফেলে নোংরা করে চলেছে ট্রেনের কামরা । হঠাৎ একটি বাচ্চা ছেলের আগমন, পড়নে নোংরা প্যান্ট হাতে একটি ঝাঁটা । নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করে পরিষ্কার করে ফেলল কামরাটি । ইতিমধ্যে একটি বৃহন্নলার আগমন । নিজেদের মানসম্মান বাঁচাতে লোকজন তখন যা পারছে দিয়ে দিচ্ছে মানিব্যাগ থেকে । এরপর যখন বাচ্চা ছেলেটি এসে কিছু সাহায্য চাইল তখন লোকগুলো এমন ভাব দেখালো যেন বাচ্চাটা পরিষ্কার করে অন্যায় কিছু করে ফেলেছে ।

ঘটনা ৫ – রাত ৩ টে – পশ্চিমবঙ্গের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলের সামনের রাস্তা । ছেলেরা খিদে মেটাতে বিস্কুট, ডিম, গজা খাচ্ছে ইচ্ছেমত । হয়তো খেয়েছিল ১০০ টাকার ফেরার সময় দামটা দিল ৮৫ টাকা । অতো ছেলের ভিড়ের মধ্যে দোকানিও বুঝে উঠতে পারেনি কে কি নিয়েছে । তাই ব্যাপারটা চাপা পড়ে গেল । এটা হল পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত ভালো শিক্ষিত ছাত্রদের একটা রূপ ।

ঘটনা ৬ – কোলকাতার একটি জনবহুল রাস্তা । আমি আর আমার বন্ধু আইসক্রিমের দোকানের সামনে আইসক্রিম কিনবো বলে দাঁড়িয়েছি । সেইসময় একটা বাচ্চা ছেলে এসে সাহায্য চাইছিল । আমি পকেট থেকে টাকা বের করবো কিনা ভাবছি – দেখি আমার বন্ধু একটা আইসক্রিম কিনে বাচ্চাটার হাতে তুলে দিয়েছে । বাচ্চাটার চোখের সেই দৃষ্টি আমার মনকে যে আনন্দ দিয়েছিল তা কোনোদিন ভুলবো না । আর আমার সেই মহানুভব বন্ধুকেও যতদিন বাঁচবো ততদিন মনে রাখবো – যে আমায় সেদিন এক নতুন পথ দেখিয়েছিল ।

অনেক ঘটনাই বলে ফেললাম । সব ঘটনাই সত্যি । এছাড়াও অনেক ঘটনা আছে যা আমার মনে পড়ছে না । যা নিজে ভাবি সেগুলো এই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে বোঝাতে চাইলাম । জানি না পারলাম কি না । তবুও স্পষ্ট করে বলে দিতে হয়না – সমাজের এই অবস্থার জন্য দায়ী কে । আমি জানি আমি দায়ী । আমি জানি তুমিও দায়ী ঠিক আমার মতোই  ।

মুখে আমরা সাম্যবাদের কথা বলি আর সুযোগ পেলেই নিজেদের আখের গোছাবার চেষ্টা করি । সকালে বিকেলে চায়ের দোকানে বসে সমাজের দুর্দশা সম্পর্কে জ্বালাময়ী ভাষণ দিতে খুব ভালোবাসি । ফেসবুকে সমাজের বিভিন্ন জিনিসের সুফল অথবা কুফল সম্পর্কে বিশদে আলোচনা করি আর জ্ঞান জাহির করি । আমরাই পত্র পত্রিকায় বেশ রক্ত গরম করা প্রবন্ধ লিখি । আমরাই রাজনীতির নামে বিপক্ষের মানুষের উপর হামলা করি । আমরাই সেই স্বাধীন ভারতবর্ষের নাগরিক যে ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন গান্ধিজী, ক্ষুদিরাম, সুভাষচন্দ্র বসু । আমরাই সেই শিক্ষিত ছাত্রসমাজের অংশ যে ছাত্র সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।

কর্তব্য, দ্বায়িত্ব, লক্ষ্য, মানবিকতা, প্রতিজ্ঞা – বারেবারে ভুলে যাই, বারেবারে ভুলে যাই ।

বারেবারে ভুলে যাই, বারেবারে ভুলে যাই
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments