প্রথম পরিচ্ছেদ 
(সত্র্যজিত)
 
সকালে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। সারাদিন রোদের দেখা নেই। অবশ্য শ্রাবণ মাসের শুরুর দিকে এমনটা বিচিত্র কিছু নয়। পূর্বদিকের ঘোলাটে আকাশে কালচে ভাব ধরতে আরম্ভ করেছে সবে। রোজকার মত আজও দানীবুড়ো বসেছিল দত্ত পুকুরের ধারে। যতই ঝড়-বৃষ্টি হোক না কেন, বুড়োর খানিকক্ষণ পুকুরধারে এসে বসা চাই। শর্মিষ্ঠা একবার জানতে চেয়েছিল,
-' আচ্ছা দাদু, তুমি রোজ পুকুরের ধারে যাও?'
-' রোজ আর কই যেতে পারি দিদিভাই, হাজারটা কাজ। মায়ার বাঁধনে আটকে আছি যে।'
-'কি যে তোমার কাজ। খালি তো দুবেলা মন্দিরের ঠাকুরকে ফুল জল দাও।'
-' ও তো ফরমায়েশী পুজো। আসল পুজো ওই পুকুরধারে, বুঝলে দিদিভাই।'
-' কে জানে বাবা। ওই পুকুর ধারে যেতেই আমার ভীষণ ভয় করে। কী কালো জল। আচ্ছা দাদু, পুকুরটার বয়েস তোমার থেকেও বেশী?'
-' তা বেশী বই কি। আমার বাবার কাছে আমি ওই পুকুরের গল্প শুনেছি। তোমার ঠাকুরদার বাবা যখন এ তল্লাটের জমিদার ছিলেন, তখন উনি এই পুকুর আর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে ধর প্রায় একশ বছর আগের কথা।'
-' তুমি তো এখন চোখেও ভালো দেখতে পাও না। পুকুরধার থেকে অন্ধকারে ফিরতে অসুবিধা হয় না?'    
-' কালু আছে না। ওই আমাকে রোজ নিয়ে আসে।'
-' আবার তুমি ওকে কালু বলে ডাকছ' ঝাঁঝিয়ে ওঠে শর্মিষ্ঠা, ' বলেছি না কেতু বলে ডাকবে। কালু শুনলেই কেমন যেন কুকুরের নাম বলে মনে হয়।'
-' সে তোর সাথে যখন বিয়ে হবে, তুই ডাকিস।'
-' যাও তোমার খালি উল্টোপাল্টা কথা। ইশ অনেক বেলা হয়ে গেল, আমি এখন যাই।'
 
পুকুরের ধারে বসে সাতপাঁচ ভাবছিল বুড়ো। শর্মির বিয়ের বয়েস হয়ে এলো। সেই ছোট্ট থেকে ও আর কালকেতু বুড়োর বড় ন্যাওটা। কালকেতু দানীর নাতি। কালকেতুর যখন বছর দশেক বয়েস তখন বাস এক্সিডেন্ট হয়ে ওর মা এবং বাবা দুজনেই মারা যায়। শর্মি কেতুর থেকে বছর তিনেকের ছোট। একসাথে বড় হয়েছে ওরা। এখন ওদের চারহাত এক করে দিতে পারলে….এই পর্যন্ত ভেবেই আর এগুতে সাহস করে না দানী। সে জানে, শর্মির বাবা, অবসর প্রাপ্ত আর্মি মেজর নির্মলেন্দু দত্ত চৌধুরী কিছুতেই এ সম্পর্ক মেনে নেবেন না। দানী অনেকবার কালকেতু কে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। তার এক কথা। বিয়ে করলে শর্মিকেই করব নয়তো নয়। মা-বাবা মরা ছেলেটার জীবনে ওই মেয়েটার ভুমিকা অনেকখানি।
 
-'সবই রাধামাধবের ইচ্ছা।', আপন মনে বলে বুড়ো।
-' দাদু, চল অন্ধকার হয়ে গেছে। তোমার সন্ধ্যারতির সময় হলো।'
-' তুই কখন এলি বাবা, দেখতে পেলাম না তো।'
-' দিনের বেলাতেই দেখতে পাও না, এখন তো অন্ধকার প্রায়। এসো, এইদিক দিয়ে।'
 
দত্ত পুকুর থেকে চৌধুরী বাড়ি সিকি মাইল মত রাস্তা। বাড়ির চৌহদ্দির পাশেই চৌধুরীদের কুলদেবতা রাধামাধবের মন্দির। দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার, প্রতাপ নারায়ণ অনেক খরচা করে এই মন্দির তৈরী করেছিলেন। প্রায় দোতলা সমান উচ্চতা, বাইরের চারদিকের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ। প্রতাপ নারায়ণ বিষ্ণুপুর থেকে এক শিল্পী কে নিয়ে এসেছিলেন এই কাজ করার জন্য। মন্দিরের সামনে একটা ফুলের বাগান। তার মধ্যে দিয়ে লাল মোরাম বিছানো রাস্তা চলে গেছে মন্দিরের দরজা অবধি। ভেতরে কষ্টিপাথরে তৈরী রত্নখচিত রাধামাধবের যুগল মূর্তি। আর দুদিন পরেই ঝুলন পূর্নিমা। আজ সকালে চৌধুরীদের সিন্দুক থেকে সব গয়না নিয়ে এসে সাজানো হয়েছে মূর্তি দুটিকে। তাই মন্দির এখন বাইরের লোকেদের জন্য বন্ধ। রাস্তার পাশে পাশে কয়েকটা সিমেন্টের বেদী তৈরী করে দিয়েছেন নির্মলেন্দু। তারই একটায় দানীবুড়োকে বসালো কালকেতু।
 
-' আমি ভেতর বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে আসছি। তুমি উঠে কোথাও যেওনা।'
-' আমি পুরো অন্ধ নই রে কালু।'
-' না তাও। শর্মি গোলাপের চারা লাগিয়েছে। অসাবধানে যদি মাড়িয়ে ফেলো, আমার মাথা খেয়ে ফেলবে।'
 
আপনমনে হাসে দানী। আস্তে আস্তে কালকেতুর পায়ের শব্দ দূরে সরে যায়। আজকাল অল্পতেই খুব ক্লান্ত লাগে দানীবুড়োর। পেছনে হেলান দিয়ে নিকষকালো আকাশে মন্দিরের চূড়া খোঁজার চেষ্টা করে সে। চৌধুরী বাড়ির অবস্থা এখন পড়তির দিকে। কতদিন টিকবে বলা মুশকিল। অবসর নেওয়ার পরে জমিদারী ঠাট-বাট বজায় রাখতে গিয়ে অর্ধেন্দু একে একে সবই প্রায় হারিয়েছেন। থাকার মধ্যে এই বাস্তুভিটে, পুকুর আর মন্দির। এও কতদিন থাকে সে কথা স্বয়ং রাধামাধবই জানেন। বাগানের গেট থেকে চুঁইয়ে আসা আবছা হলদে হ্যালোজেনের আলোর দিকে তাকিয়ে কালকেতুর অপেক্ষা করতে থাকে দানী। আশেপাশে কোথাও একটা শঙ্খ বেজে ওঠে। আচমকা নিজের পেছনে কোনো একজনের উপস্থিতি অনুভব করে বুড়ো। ঘাড় ঘোরাতে যাবার আগেই মাথার পেছনে মোক্ষম এক আঘাত। হুমড়ি খেয়ে পাশের গোলাপের চারাগুলোর ওপরে মুখ থুবড়ে পড়ল সে। “হায়, রাধামাধব", অস্ফুট কাতরোক্তি বেরিয়ে এলো বুড়োর গলা দিয়ে। আস্তে আস্তে হলদে হ্যালোজেনের আলো ফিকে হতে হতে একেবারে মুছে গেল দানীর চোখের সামনে থেকে।
 
রবিবারের সকাল। প্রাত্যহিক শরীরচর্চা সেরে গোয়েন্দা জটিলেশ্বর সেন বাড়ির বৈঠকখানায় বসে খবরের কাগজের পাতায় চোখ রেখেছেন সবে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত হলেন লালবাজারের সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং জটিলের স্কুলের সহপাঠী সরোজ ঘোষাল।
 
-' আয় সরোজ। চা খাবি তো?'
-' আর চা, ওপরওয়ালাদের খপ্পরে পরে লাইফ হেল হয়ে গেল মাইরি।'
-' কৃষ্ণনগরের কেসটার কথা বলছিস?'
 
কথার খেই হারিয়ে ফেলেন সরোজবাবু। ভ্যাবাচাকা খেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে হালকা হেসে জটিল বলে,
 
-' গত তিনচার দিন ধরে এই খবরটা দেখছি কাগজে। সেখানেই দেখলাম লোকাল থানা থেকে লালবাজারের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। আর তোর ওপরওয়ালা সূর্যকান্ত এবং নির্মলেন্দু দত্ত চৌধুরী আর্মিতে একই ব্যাটেলিয়নে ছিলেন, জানিস নিশ্চয়। এছাড়া আজ রবিবার, সাতসকালে দাড়িটা পর্যন্ত ঠিক করে না কামিয়ে, তোর আমার কাছে ছুটে আসার কারণ আন্দাজ করাটা খুব কঠিন কাজ কিছু নয়।'
ব্যাখ্যা শুনে একটু ধাতস্থ হলেন সরোজবাবু। পকেট থেকে রুমাল বের করে অকারণে মুখটা মুছে বললেন,
 
-' খুব মুশকিলে পরে গেছি ভাই। পরশু রাতে কমিশনার ডেকে আমাকে কেসটা দিয়ে বললেন দিন সাতেকের মধ্যে আসামী কে পাকড়াও করা চাই। নইলে এবার পুরুলিয়ায় আমার বদলী কেউ আটকাতে পারবে না।'
-' অত উত্তেজিত হোস না। স্পটে গেছিলিস?'
-' গতকাল রাতে ফিরেছি। জায়গাটা কৃষ্ণনগরের কাছে ঘূর্ণি বলে একটা আধা শহর। কলকাতা থেকে ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা।'
-' পুরো ঘটনাটা প্রথম থেকে আর একবার বল।'
 
জবাবে সরোজবাবু যা বললেন তার সারমর্ম এই। চৌধুরীরা আগে ঘুর্নির জমিদার ছিলেন। জমিদারী প্রথা লোপ পাওয়ার পরেও বংশের চাকচিক্য বজায় রেখেছিলেন বিলক্ষণ। বর্তমানে বাড়ির কর্তা অর্ধেন্দু। বয়েস প্রায় আশির কোঠায়। লন্ডন থেকে ওকালতি পাশ করে এসে কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করতেন এককালে। স্ত্রী গত হয়েছেন বছর দশেক আগে। দুই ছেলে। নির্মলেন্দু আর কৃষ্ণেন্দু। নির্মলেন্দু আর্মিতে ছিল। রিটায়ার করার পরে কলকাতায় একটা সিকিউরিটি সংস্থার আধা অংশীদার। নির্মলেন্দুর স্ত্রীর নাম তাপসী। তিনি হাউস-ওয়াইফ। ইনাদের এক মেয়ে, শর্মিষ্ঠা। সে যাদবপুরে ইতিহাসে মাস্টার্স করছে। কৃষ্ণেন্দু পেশায় ডাক্তার। অনেক বছর ধরে দিল্লির বাসিন্দা। স্ত্রী মনিকা ইন্টেরিয়র ডিসাইনার। এঁদেরও একটি মেয়ে, ফুল্লরা। সে দিল্লির জেএনউ তে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনো করছে। শর্মিষ্ঠা আর ফুল্লরা প্রায় পিঠোপিঠি। চৌধুরীদের বাড়িতে এখনো বেশ জাঁকজমক করে জন্মাষ্টমী ও ঝুলন পূর্নিমা উদযাপন করা হয়। সেই সুত্রে হপ্তাখানেক আগে সবাই জমায়েত হয়েছিলেন ঘুর্নিতে। চৌধুরী বাড়ির কুলপুরোহিত ছিলেন দীননাথ চক্রবর্তী ওরফে দানীবুড়ো। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যেবেলা মাথার পেছনে প্রচন্ড আঘাতের কারণে মন্দিরের সামনে দানীর মৃত্যু হয়। পরে দেখা যায় মন্দির থেকে রাধামাধবের মূর্তিও উধাও। দুদিন পরেই জন্মাষ্টমী, তাই সেদিন সকালে বাড়ির মেয়েরা মিলে সমস্ত গয়নায় সাজিয়েছিল যুগলমূর্তি।
 
-' বাড়ির চাকর বাকর কেউ আছে?'
-' অক্ষয় বলে একটি ছেলে আছে। সে অর্ধেন্দু বাবুর সেক্রেটারি। বছর দশেক হল আছে। চৌধুরী বাড়ির মধ্যেই তাকে দুটো ঘর দিয়েছেন অর্ধেন্দু। বয়স ৩৫ মত। তার বৌ শ্যামলী অর্ধেন্দু বাবুর রান্নাবান্না করে। এদের ছেলে নীলাঞ্জন স্থানীয় স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। এছাড়া উড়িয়া মালী আছে একজন, নাম অমরনাথ। ড্রাইভার শ্যামাচরণ আর ঝি কমলি। সকলেই গত কুড়ি-পঁচিশ বছর ধরে চৌধুরী বাড়ির সাথে যুক্ত।'    
-' কালকেতু কী করে?'
-' ওর একটা ইলেকট্রিকের দোকান আছে বাজারে। ২৬-২৭ বছর বয়েস। ওর ছোটবেলায় গাড়ি দুর্ঘটনায় মা-বাবা মারা যায়। এককালে কলকাতায় ফার্স্ট ডিভিশনে ফুটবল খেলত। হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়াতে অকালে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। শ্যামলীকে জেরা করতে গিয়ে জানলাম শর্মিষ্ঠা আর কালকেতু একে অপরকে পছন্দ করত। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির লোকেদের এ সম্পর্কে ঘোরতর আপত্তি।'
-' সেকি, ফুল্লরা থাকতে কালকেতু শর্মিষ্ঠাকে পছন্দ করলো শেষে!' রহস্যময় হাসি জটিলের মুখে।
-' মানে?' নির্বাক বিস্ময়ে তাকায় সরোজ।
-' চন্ডীমঙ্গল মনে আছে? কালকেতু ধর্মকেতুর ছেলে। বর্ণিত আছে দেবী চন্ডীর বর পেয়ে গুজরাট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল সে। ফুল্লরা সেই কালকেতুর স্ত্রী ছিল।'
-' তার সাথে এই ঘটনার কি সম্পর্ক?'
-' কোনো সম্পর্ক নেই, আবার থাকতেও পারে। সেটা না গেলে বোঝা যাবে না। তুই গাড়ি এনেছিস নিশ্চয়। চল বেড়িয়ে পড়ি। একটার মধ্যে পৌছে যাব।'
-' তুই আমাকে বাঁচালি ভাই, কী বলে যে…'
-' তোর কাছে পোস্টমর্টেম এর কপি আর জেরার কাগজ পত্রগুলো আছে নিশ্চয়। গাড়িতে যেতে যেতে একবার দেখে নেব।'
 
উঠে পরে জটিল। মিনিট পনেরর মধ্যেই দুই বন্ধু রওনা হয়ে যায় ঘুর্নির উদ্দেশ্যে।
        
 
 
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
(হযবরল )

রবিবার শহরের ভেতরটা একটু ফাঁকা তাই ওরা খুব তাড়াতাড়িই NH ৩৪ ধরে ফেলল। হাইওয়েতে পড়েই ওদের গাড়ি ছুটতে লাগলো সোজা ঘুর্নির উদ্দেশ্যে । জটিলেশ্বর অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট আর বাকি কেসের কাগজ পত্র গুলো দেখছিল। কল্যানী পেরোতেই গাড়ির গতি খানিকটা মন্থর হতেই একটু চিন্তিত হয়েই জটিলেশ্বর বলল, " হুমম , রাস্তার যা অবস্থা তাতে পৌঁছতে ঘন্টা তিনেক লেগে যাবে। " সরোজ বলল " হ্যাঁ তা লাগবে বটে , তুই চিন্তা করিস না মাঝে ধাবা টাবা দেখে কোথাও একটা লাঞ্চ সেরে নেবখন। "

" আমি খাওয়ার চিন্তা করছি না। সাধারণত যখন  ক্রাইম স্পটে পৌঁছতে দেরী হয়  তখন প্রমাণ লোপাট করার সুযোগটাও অপরাধীরা বেশি করে পেয়ে যায় । পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দেখে তো মনে হচ্ছে হামলাটা পূর্ব পরিকল্পিত আর যে কোনো পরিকল্পনাই ঘটনাস্থলের আসে পাশে অনেক গুলো ক্লু তৈরী করে। "

" খুনির জুতোর ছাপ কিম্বা ছিটকে যাওয়া রক্তের দাগ বলছিস তো? "

" সেগুলোতো মৌলিক , কিন্তু ধর ওই বৃদ্ধ পুরোহিত দেখতে পেয়েছিল যে কে তাকে আঘাত করেছে ও সে হয়ত মরার আগে মাটিতে কোনরকম আঁচর কেটে তদন্তকারীদের জন্য তার খুনির উদ্দ্যেশ্যে কোনো ক্লু রেখে গেল ! আর আমরা সেখানে পৌঁছবার আগেই সেখানে বৃষ্টি হলো বা খুনি সেটা খেয়াল করতে পেরে সেটা সবার নজর বাঁচিয়ে মুছে দিল। ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছে কি?"

"একটু কষ্ট হচ্ছে বৈকি। কোনদিন এরকম ক্লু কেউ দেয় নি ভায়া। আর লালবাজার বা ভবানী ভবনের কোনো কেসে এরকম হয়েছে, তা শুনেছি বলেও মনে পড়ছে না। সাধে সকাল সকাল পড়িমরি করে তোর কাছে ছুটে আসি ! "

" হাঃ হাঃ হাঃ।  চল গাড়ি থামাতে বল, সামনে একটা ভালো ধাবা আছে , বেড়ে লস্সি করে। "

 

গাড়ি লাকি সিংহের 'ওয়েলকাম ধাবায়' দাড়ালো। রোববারের দুপুরের খাওয়া এত সাত সকালে বাঙালিরা খায় না। তাই এ ক্ষেত্রে জটিলের উপদেশ মেনে ব্রাঞ্চ-এর মতন ওরা সকলে আচার সহযোগে আলু পরোটা, পনির ভুর্জি ও লস্সি দিয়ে কোনরকমে দক্ষিন হস্তের কম্মটি সারলো। খাওয়ার শেষে সরোজকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে জটিল জিগ্যেস করলো ,

"হ্যাঁ রে জেরাতে যা দেখা যাচ্ছে তাতে অর্ধেন্দু বাবুর পসার বেশ ভালো ছিল বলেই তো মনে হলো?"

"হ্যাঁ মানে বেশ নামকরা ব্যারিস্টার ছিলেন বলেই খবর পেয়েছি , আর তা ছাড়া এত বড় জমিদারী মেইনটেইন করতেন যখন অর্থনৈতিক একটা জোর ছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। "

" জোর ছিল! মানে ইদানিং নেই সেটা বলছিস কি ?"

"নাঃ সেরকম কোনো আভাস তো পাইনি। তবে বছর দুয়েক আগে নির্মলেন্দুর সাথে তার বাবার অর্থাত অর্ধেন্দুর ওর সিকিউরিটির ব্যবসা নিয়ে একবার একটা কথা কাটাকাটি হয়েছিল। "

"ওঃ , সেটা কে জানালো? জেরা গুলোতে তো এরকম কিছু দেখলাম না ?"

"হ্যাঁ সেটা তোকে জানতাম, মাথা থেকে জাস্ট বেরিয়ে গেছিল। ওটা অফিসিয়ালি রেকর্ড করা হয়নি কেননা ওটা যে জানিয়েছিল সে এই শর্তেই তা জানায়। "

"কে সে ?"

"ওই অক্ষয় মানে ওই অর্ধেন্দু বাবুর সেক্রেটারি ছেলেটি। ও একদিন মাঝ রাতে অর্ধেন্দু বাবুর ঘর থেকে উঁচু গলায় কথা বার্তা শুনতে পেয়ে চুপি চুপি সেখানে গিয়ে আড়ালে কান পাতে । ও তাতে ও আন্দাজ করে যে টাকা পয়সা সংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে বাপ বেটাতে উত্তেজিত কথা বার্তা হচ্ছে। "

"হুমম, কি শুনতে পেল সে?"

"ওর বক্তব্য হলো যে ও যখন পৌঁছয় তখন কথা বার্তা প্রায় শেষের দিকে। তবে ও এইটুকু শুনতে পায় যে অর্ধেন্দুবাবু তার ছেলেকে জোর গলায় বলছিলেন যে উনি নির্মলেন্দুর ব্যবসার ক্ষেত্রে আর কোনো অর্থনৈতিক সাহায্য করবেন না। মদ্যপ অবস্থায় নির্মলেন্দু তার উত্তরে শুধু অসংলগ্ন ভাবে বিড়বিড় করছিল।"

"কিরকম অসংলগ্ন কথা, সেটা কিছু বলেছে কি ?"

"মানে ওই তুমি যক্ষের ধন আঁকড়ে মরবে , তোমার মুখাগ্নি করতে কে আসে দেখব ইত্যাদি। "

 

ঝিরঝির বৃষ্টি পরা শুরু হলো। ওরা সবাই গাড়িতে উঠে বসে আবার রওনা দিল গন্তব্যের উদ্দ্যেশ্যে। জটিল জানে যে সরোজের প্রাথমিক জেরা ও ঘটনাক্রমের বিন্যাসগুলো নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে হলে সেটা এই রাস্তায় সেরে ফেলতে হবে। দীননাথ চক্রবর্তীর হত্যার সাথে চৌধুরীবাড়ির একাধিক চরিত্রের স্বার্থ কোথাও একটা জড়িয়ে আছে এবং সেটা যে সহজে বের হবার নয় তা সে ইতিমধ্যেই টের পেয়েছে। শুধু এইটুকু পরিষ্কার যে একটা জমিদারী বংশের ঠাটবাট বজায় রাখতে এ বাজারে ভালো রকম অর্থের প্রয়োজন এবং সেই হিসেবটা আশা করা যায়  অক্ষয়ের কাছ থেকে আরো সময় নিয়ে খানিকটা আদায় করা যাবে। এখানে সবার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে পুরোপুরি না জানলে ক্রাইম আর মোটিভ মেলানো যাবেনা বিশেষ করে যখন খুনের মূল উদ্দেশ্য আপাতদৃষ্টিতে বহুমূল্য গহনা সহকারে মূর্তি চুরি। ওদিকে নির্মলেন্দু বাবুর বন্ধু যদি কোনো প্রভাবশালী পুলিশকর্তা হয় তাহলে তার সেই প্রভাব খাটানোর পেছনে হয় তার কোনো প্রচন্ড সৎ উদ্দ্যেশ্য কাজ করছে অথবা সাংঘাতিক অসৎ কোনো কারণ লুকিয়ে আছে! তার মানে নির্মলেন্দু বাবু সন্দেহের হয় এসপার না হলে ওসপার, মাঝামাঝি কিছু নয়। 

 

"আচ্ছা কালকেতু ছেলেটিকে কিরকম দেখলি, মানে দানীবুড়োর মৃত্যুতে ওর মানসিক অবস্থা কি হবে তা বলাই বাহুল্য।  কিন্তু জেরাতে তো ও সেরকম ভাবে কিছুই বলতে পারেনি। অথচ ঘটনার সময় ও স্পটের সব থেকে কাছে ছিল। "

"নাহ ছেলেটা এমনিতে দুম করে কোনো ক্রাইম করার মত বলে মনে হলো না। যেটুকু সময় ওর সাথে কথা বলেছি তাতে বুঝলাম যে ও নিতান্তই শোকস্তব্ধ। হয়ত এখন খানিকটা ধাতস্থ হয়েছে ও আমরা গেলে পরে আজ আরো কিছু বলতে পারে।"

"আর শর্মিষ্ঠা , সেও তো দেখছি বিশেষ কিছু বলেনি। "

"ওই মেয়েটিও বেশ ভেঙ্গে পরেছিল ,মানে যা হয় আর কি। কান্নাকাটি করছিল ও বলছিল আমাকে কে এখন থেকে পুকুরধারে গল্প শোনাবে ? "

"কৃষ্ণেন্দু বাবু জন্মাষ্টমীতে বাড়িতে এসেছিল নিশ্চই ? মানে সে কি এখনও ওই বাড়িতেই আছে ?"

"হ্যাঁ মানে প্রত্যেকবারের মতই পুরো চৌধুরী পরিবার জন্মাষ্টমীর সপ্তাহ খানেক আগে একত্রিত হয়েছিল। আর কৃষ্ণেন্দু বাবু এ কেসের সুরাহা না হওয়া অব্দি ফিরছেন না।"

"মানে খুনটা যখন হয়েছে অর্থাত জন্মাষ্টমীর দু দিন আগে মোটামুটি সবাই ওই বাড়িতেই ছিল। হুমম ইন্টারেষ্টিং !"

"হ্যাঁ তা সবাই ছিল বটে "

"আর কৃষ্ণেন্দু বাবুর স্ত্রী-কন্যা থাকছেন না?"

"ওনার স্ত্রী আপাতত আছেন তবে তার কি একটা জরুরি কাজ ডেলিভার করার আছে তাই সে খুব বেশি দিন থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। আর কন্যা মানে ফুল্লরা একটা ফিল্ড ওয়ার্ক নিয়েই এখানে এসেছে তাই ও থাকছে আরো বেশ কিছু দিন।" 

 

রানাঘাট পেরিয়ে গেল, আর বেশিক্ষণ নেই।  ঘুর্নির মাটির পুতুলের কদর এক সময় দেশে বিদেশে বহুচর্চিত ছিল।  চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বড়-বউ ও হুঁকো-মুখে বুড়ো স্থান পেয়েছিল তামাম পুতুল জাদুঘরে। পরবর্তী কালে জমিদারদের অবস্থা পরে যাওয়াতে এই শিল্পীদের পেশা মার খায়। এখন কিছু অর্ডার আসে বিদেশে অবস্থিত ভারতীয়দের থেকে তবে সে ক্ষেত্রে মনীষীদের চাইতে ডোনাল্ড ডাক, সচিন তেন্ডুলকার বা সাই বাবাদের মূর্তির চাহিদাটাই বেশি। পড়তি জমিদারির ছায়া মূর্তির ব্যবসায় পড়েছে আর হয়ত পড়েছে সেই জমিদার পরিবারের ভেতরে গোপন কোনো দ্বন্ধের ওপর। 

পৌনে দুটো নাগাদ হালকা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সরোজ ও জটিলেশ্বর ঘুর্নির চৌধুরীবাড়ির গেটে পৌঁছে গাড়ির হর্ন বাজাল। 

 

 

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
(পাগলা দাশু)

"জমিদারবাড়ির গ্ল্যামারটাই অন্য লেভেলের হয় বল," গাড়ি থেকে নেমে তিনতলা জমিদারবাড়ি, সামনের নাটমহল, পশ্চিমদিক থেকে উঁকি মারা মন্দিরের চূড়ো, বাড়ির সামনে সুন্দর করে সাজানো ফুলের বাগান সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে জটিলেশ্বর বলে উঠল। সরোজ এতক্ষণ চৌধুরীবাড়ির ড্রাইভার শ্যামাচরণের সাথে কথা বলছিল। গেটে দাঁড়িয়ে দু-চার মিনিট একনাগাড়ে হর্ন বাজানোর পর হন্তদন্ত হয়ে শ্যামাচরণই ছুটে এসে গেট খুলে দেয়। বাড়ির সবাই দুপুরের খাওয়া খেতে বসেছে, জানায় সে। সরোজ শ্যামাচরণকে বাড়ির ভেতরে খবর দিতে পাঠিয়ে জটিলের দিকে তাকিয়ে বলল, "জমিদারী যখন ছিল তখন এইসব মানা যায়। আজকের দিনে এতকিছু সামলাতে না পারলেও সব ঠাটবাট বজায় রাখতেই হবে, তার তো কোনও মানে নেই। এসবের জন্যই অভাব, টাকার লোভ আর তার থেকে একটা নিরীহ বুড়ো মানুষ খুন হল।"

- "সেটা কিন্তু আমরা এখনও ঠিক জানি না শুধু টাকার জন্য মূর্তি চুরিই মোটিভ ছিল কিনা। যাকগে, ড্রাইভার কি বলল? কোনও নতুন তথ্য?"

- "হ্যাঁ, সম্ভবত কাল সকালেই কৃষ্ণেন্দুর স্ত্রী চলে যাচ্ছেন। শ্যামাচরণকে সকাল সাতটায় গাড়ি রেডি করতে বলা হয়েছে দমদম যাওয়ার জন্য। আমি ধরে নিচ্ছি সেটা ওনার জন্যই। সেদিনই অবশ্য আমাকে বলে রেখেছিল যে এর মধ্যেই চলে যাবে। আর এদিকে অমরনাথ দেশের বাড়িতে যেতে চায়, ওর ছোট ছেলের নাকি প্রচণ্ড জ্বর। আমি খুনের কিনারা না হওয়া অবধি বাকি কাউকেই বাড়ি ছেড়ে যেতে বারণ করে গিয়েছিলাম। হয়তো আজ আমার কাছে ঝোলাঝুলি করবে।"

- "অমরনাথ মানে মালী তো? দেশের বাড়ি কোথায় যেন?"

"ওই তো ওড়িশার একটা গ্রাম," সরোজ বলে ওঠে, "যতদূর মনে পড়ছে নামটা রঘুরাজপুর। তবে আমি এখনই যেতে দিচ্ছি না। এমনিতে লোকটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। আর দানীর সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। তবু কিচ্ছু বলা যায় না।"

সরোজের কথা শেষ হতে না হতেই জমিদারবাড়ির একতলার দরজা দিয়ে শ্যামাচরণের সাথে আর একজনকে আসতে দেখা গেল। সরোজ মৃদুস্বরে জানালো "অক্ষয়"।

অক্ষয় সুপুরুষ না হলেও বেশ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। সেক্রেটারির কাজের পাশাপাশি সকাল-বিকেল রীতিমত শরীরচর্চা করেন বলে মনে হয়। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেও দেহে একফোঁটা মেদের চিহ্ন নেই। জটিলেশ্বরকে না চিনতে পেরে একটু অবাক চোখে দেখে সরোজের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনারা আজ আসবেন আগে থেকে বলেননি তো। তাহলে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা যেত।"

"আসলে আগে থেকে ঠিক ছিল না," বলে সরোজ জটিলের দিকে ইশারা করে বলল, "ও আমার বন্ধু, এই কেসে সাহায্য করবে। ও-ই বলল আজকেই আসবে, তাই চলে এলাম।"

অক্ষয় জটিলেশ্বরের দিকে তাকিয়ে নমস্কার জানালো। প্রতি-নমস্কার করে জটিল বলল, "খাওয়াদাওয়া নিয়ে সেরকম ব্যস্ত হতে হবে না। এমনি বাড়ির সবাই আছেন তো এখন? তাহলে সবার সাথেই একবার করে কথা বলব।"

"হ্যাঁ সবাইই আছেন। তবে ছোটবৌদি কাল চলে যাবেন। জরুরি কি একটা ফোন এল কাল। আপনারা ঘরে এসে বসুন, সবাই আসলে খেতে বসেছেন। আমি গিয়ে খবর দিচ্ছি।" অক্ষয়কে দেখে মনে হল সেও খেতে বসেছিল। ড্রাইভার গিয়ে খবর দেওয়ায় তড়িঘড়ি উঠে আসতে বাধ্য হয়েছে। জটিল বলল, "ঠিক আছে, আমরা বসছি। তুমিও খাওয়া শেষ করে এস আর বাকিদেরও বল।"

অক্ষয় ওদের দুজনকে বসার ঘরে ঢুকিয়ে অপেক্ষা করতে বলে ভেতরবাড়িতে চলে গেল। বসার ঘরটা বেশ সাজানো-গোছানো। একটা মেহগনি কাঠের টেবিল মাঝে রাখা। তার ওপরে সুদৃশ্য একটি নটরাজ মূর্তি। "জমিদারি ঐতিহ্য", সরোজকে দেখাল জটিল। ঘরের এক কোণে একটা বুককেসে বেশকিছু কবিতার বই রাখা। এছাড়া সমসাময়িক কিছু পত্রিকা আর অন্য কিছু বইও রয়েছে।

"কাকে দিয়ে শুরু করবি রে?" সরোজের গলায় দুশ্চিন্তা আর অধৈর্যের ছাপ স্পষ্ট। বেচারাকে দোষও দেওয়া যায় না। এখনও অবধি কোনও ক্লু নেই। ওকে একটু নিশ্চিন্ত করার জন্য জটিল বলল, "তুই একটু শান্ত হ আগে সরোজ। যে বা যারা এর সাথে জড়িত, তারা কিছু না কিছু ভুল করবেই। আজ অবধি সবাইই করেছে। কিন্তু তুই যদি অসহিষ্ণু হয়ে পড়িস, তাহলে সেই ভুলগুলো হয়তো চোখ এড়িয়ে যাবে। মনটাকে একটু রিল্যাক্স কর।"

সরোজ শান্ত হয়ে বসলে জটিলেশ্বর ওকে বলল, "তুই শুরু করবি জেরা। প্রথমে কৃষ্ণেন্দু আর তার পরিবারকে। ওরা যেহেতু বহুদিন ধরে বাইরে, আমার মনে হয় খুব বেশি কিছু জানবে না এখানকার সম্পর্কে। মূলত জানার চেষ্টা করবি মন্দির আর মূর্তির ইতিহাস নিয়ে। তার সাথে প্রত্যেককে বলবি মূর্তির এবং গায়ের গয়নার ডিটেইলস যতটা জানে বলতে। যে এই ব্যাপারে ইনভলভড ছিল, সে নিশ্চয়ই খুব ভালো করেই জানবে। তবে তার সাথে দেখাতেও চাইবে যে কিছুই জানে না। এখানেই তোর পুলিশি ব্যাপারটা কাজে লাগাবি।"

- "আর তুই?"

- "আমি শর্মিষ্ঠা আর কালকেতুকে নিয়ে মন্দিরের দিকে যাব। ওদের সাথে আলাদা করে একা কথা বলতে চাই। তুই সাথে থাকলে শেকি ফিল করতে পারে ওরা। বুড়োর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তো ওরা দুজনেই ছিল। একটু জমিয়ে নিতে পারলে অনেক কিছুই জানা যাবে। তবে তুই যত বেশি পারিস সময় নিস। নির্মলেন্দু, অর্ধেন্দু আর অক্ষয়ের পরিবার এদের সাথে কথা বলার সময় আমি থাকব।"

সম্মতি জানালো সরোজ। বন্ধুর ওপর অগাধ ভরসা ওর। মনটাকে আরও একটু রিল্যাক্স করার জন্য একটা সিগারেট চাইল সরোজ। ধরিয়ে দুবার টানতেই বাইরে গলাখাঁকারির আওয়াজ পাওয়া গেল। অক্ষয়ের সাথে ঘরে এসে যিনি ঢুকলেন তাকে দেখে জটিলেশ্বর সেনের বুঝতে অসুবিধে হল না ইনিই বিখ্যাত ব্যারিস্টার অর্ধেন্দুশেখর চৌধুরী। প্রায় আশি বছর বয়সেও রাশভারী চেহারা আর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সরোজ আর জটিল সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে উঠে দাঁড়ালো। গম্ভীর গলায় সরোজকে বলে উঠলেন অর্ধেন্দু, "কিছু এগোল আপনার তদন্ত?"

"কিছু সূত্র পেয়েছি, সেইজন্যই আবার আসা। কয়েকটা প্রশ্ন করব সবাইকে," যথাসম্ভব পুলিশি গাম্ভীর্য রাখার চেষ্টা করল সরোজ, "ইনি জটিলেশ্বর সেন, আমাকে সাহায্য করছেন।"

"গোয়েন্দা?" ভ্রূ কুঁচকে জটিলের দিকে তাকালেন অর্ধেন্দু।

হালকা হেসে জটিল বলল, "একবার শর্মিষ্ঠাকে ডেকে দেবেন? ওর সাথে গিয়ে একবার মন্দির চত্বরটা দেখে আসতাম।" অর্ধেন্দু অক্ষয়ের দিকে ইশারা করতে সে ভেতরে চলে গেল শর্মিষ্ঠাকে ডেকে আনতে। সরোজ বলল, "শুনলাম কৃষ্ণেন্দুবাবুর স্ত্রী কালই চলে যাচ্ছেন। ওনার সাথেই প্রথম কথা বলে নিই আমি। আর যদি কিছু মনে না করেন, আমি সবার সাথে আলাদা আলাদা ভাবে কথা বলতে চাই।"

"ঠিক আছে, আপনি যা ভালো বোঝেন," ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন অর্ধেন্দু, "আপনারা বুদ্ধিমান মানুষ। নিশ্চয়ই অপরাধীকে ধরে দেবেন। খালি এটুকু খেয়াল রাখবেন, টাকার লোভ বা অভাবে মানুষ আত্মীয়স্বজন বা পরিবারের মানমর্যাদা সবই ভুলে গিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে।"

অর্ধেন্দুশেখরের রাশভারী চেহারা চোখের আড়াল হতেই সরোজ বলল, "বড় ছেলেকেই সন্দেহ করছেন মনে হল।" উত্তরে জটিল সন্দেহ প্রকাশ করল, "তাই কি? আমার তো মনে হল কালকেতুর দিকে একটা আলগা সন্দেহের তীর ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন। টাকার জন্য বুড়ো দাদুকে খুন করেছে এরকম বলতে চাইলেন।"

ইতিমধ্যেই অক্ষয় আর শর্মিষ্ঠাকে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে জটিল উঠে দাঁড়াল, "আপনারা একটু বাড়ির বাইরেটায় দাঁড়ান, আমি আসছি।" তারপর সরোজকে বলল, "ও আর একটা জিনিস বলতে ভুলে গেলাম। খোঁজ নিস তো অর্ধেন্দুর উইলের ব্যাপারে কিছু জানতে পারিস নাকি। আমি দেখি ওদিকে কিছু করতে পারি কিনা।"

বাইরে বেরিয়ে অক্ষয়কে সরোজের কাছে পাঠিয়ে শর্মিষ্ঠাকে জটিল নিজের পরিচয় দিয়ে সমবেদনা জানালো প্রথমেই। তারপর জানতে চাইল কালকেতুর খাওয়া হয়ে গেছে কিনা। "ও তো আমাদের সাথে খায় না। নিজেই রান্না করে ও আর ওর দাদু খেত," একটু দুঃখের আভাস রয়েছে শর্মিষ্ঠার গলায়। জটিল অনুমান করল চৌধুরীবাড়িতে ওদের দুজনের সম্পর্কের জন্যই এই ব্যবস্থা।

- "ও থাকে কোথায়?"

- "ওই তো মন্দিরের চৌহদ্দিতে ঢোকার আগেই দুটো ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওখানেই ওরা থাকত। এখন হয়তো ঘরেই রয়েছে।"

- "ঠিক আছে চলো, আগে দেখি ও কেমন আছে। তারপর তিনজনে একসাথে মন্দিরের দিকে যাব। ছেলেটা নিশ্চয়ই প্রচণ্ড শক পেয়েছে?"

চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল মেয়েটার। "দাদু খুব ভালো ছিল, অনেক গল্প শোনাত আমাকে। যেই এরকম করে থাকুক না কেন, তাকে রাধামাধব কোনদিন ক্ষমা করবে না। একমাত্র দাদুই আমার কথা শুনত, বুঝতে চাইত। এখন জানি না কি হবে," একটু চুপ করে থেকে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে উঠল, "কেতুকে বাবা বোধহয় তাড়িয়েই দেবে।"

"সে কি! কেন?" যদিও সরোজ বলেছিল যে বাড়ির সকলের আপত্তি কালকেতু-শর্মিষ্ঠার সম্পর্ক নিয়ে, তাও সবকিছু শোনার উদ্দেশ্যে বিস্ময় প্রকাশ করল জটিল।

- "বাবা একেবারে পছন্দ করে না কেতুকে, শুধু দানীবুড়োর জন্য এতদিন ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি।"

- "পছন্দ না করার কারণ কি?"

- "আমি কিছুতেই বাবার কথা বুঝতে পারি না। এদিকে মাঝে মাঝেই কেতুকে তাড়িয়ে দেবে বলে, ওদিকে যখন কলকাতায় খেলত, তখন বাবার ওই সিকিউরিটি সংস্থায় একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল। তারপর চোট পেয়ে ওর খেলা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। ফিরে এল এখানে। তখন এই দোকান খোলার জন্যও বাবাই টাকা দিয়েছিল।"

ভীষণ অবাক হয়ে জটিল বলে উঠল, "স্ট্রেঞ্জ! আচ্ছা, কালকেতুর বাবা-মা তো খুব ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন, তাই না?"

- "হ্যাঁ, তবে আমি তখন খুবই ছোট। কিচ্ছু মনে নেই। কেতুকে এই নিয়ে জিগ্যেস করলে কিছুই বলতে চায় না। আমিও জোর করিনি কখনও। পরে দাদুর কাছে শুনেছি। দাদুই ছিল সেই ছোট থেকে ওর একমাত্র আশ্রয়।"

কালকেতুর জীবনে বুড়োর ভূমিকা বুঝতে অসুবিধে হল না জটিলের। "কেতু কাউকে সন্দেহ করে এর পেছনে?" জানতে চাইল জটিল।

"ওকেই জিগ্যেস করবেন সেটা," বলল শর্মিষ্ঠা, "ওই তো বসে আছে ও।" সামনে তাকিয়ে ঘরদুটোকে দেখতে পেল জটিল। ঘরের বাইরেই বসে ছিল বিষণ্ণ কালকেতু। এগিয়ে গেল দুজনে ছেলেটার দিকে।

 

 

চতুর্থ পরিচ্ছেদ
(তুষার সেনগুপ্ত)

পাশাপাশি দুটো ঘর, সামনেই লাগোয়া টানা লম্বা লাল মেঝের উঁচু বারান্দা। দেওয়ালে হেলান দিয়ে দু'হাঁটু বুকের কাছে এনে দু'হাতে জড়িয়ে থুতনিটা হাঁটুর ওপর রেখে কালকেতু নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের কদম গাছটার দিকে। দাদুর বড় প্রিয় ছিল কদম গাছটা। আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টির সাথে সাথেই যেন রাতারাতি চনমনে হয়ে উঠত গাছটা। এইতো পাঁচ'ছ দিন আগের কথা। হলুদ কদমফুলে ঢেকে গেছে ডালপালা, কালকেতু দোকান ফেরত দু'হাত ভরা কদমফুল নিয়ে পুকুরপাড়ে শানবাঁধানো ঘাটে দাদুর পাশে বসে দাদুর ধূতির কোঁচায় ঢেলে দিল। দাদু কালকেতুর মাথায় হাত বুলিয়ে অপার স্নেহ মাখানো গলায় বলে উঠল,

- কে? কালু এলি? তা হতভাগা এই কদমফুল এই বুড়োটাকে না দিয়ে শর্মিকে দিলেই তো পারিস!

- তোমার শর্মি তোমার রাধারানীর মত কদমফুলে তুষ্ট নয়গো, গোলাপে খুশি হন। চলো অনেক রাত হল, জোলো হাওয়ায় ঠাণ্ডা লাগলে হাঁপানির টানটা আবার বাড়বে-

কথা বলতে বলতে পুকুরপাড় থেকে দাদুর হাত ধরে এগোতে এগোতেই কালকেতুর কানে এলো দাদুর স্বগতোক্তি,

- কদমফুলই ভালো রে, কি মোলায়েম! গোলাপে বড্ড কাঁটা…..

 

আচমকা দমকা হাওয়ায় কয়েকটা কদমফুল মাটিতে ঝরে পড়তেই কালকেতুর দু'চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ভীষণ পরিচিত কণ্ঠে "কেতু" ডাকটা শুনেই চমকে তাকাল কালকেতু। শর্মি কখন এসে সামনে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি। শর্মির সঙ্গে আসা ভদ্রলোককে আগে কোনও দিন দেখেছে বলে মনে করতে পারলো না। শর্মিদের নিকট আত্মীয়রা মোটামুটি সবাই পরিচিত। হয়তো পুলিশের লোক। কালকেতু কি করা উচিত বুঝতে না পেরে বারান্দা থেকে নেমে ওদের মুখোমুখি হয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

- শর্মি? হঠাত এখানে? এই সময়? তা এনাকে তো ঠিক….

কালকেতুকে কথা শেষ করতে না দিয়েই জটিলেশ্বর নিজের পরিচয় দিতে বলে উঠল,

- আমি জটিলেশ্বর সেন, আপনাদের এখানে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটা নিয়ে আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।

- পুলিশ নাকি গোয়েন্দা? দাদুর হত্যাকারীকে খুঁজতে এসেছেন নাকি চৌধুরীবাড়ির উধাও হয়ে যাওয়া দুর্মূল্য রাধামাধবের মূর্তি আর মূল্যবান গয়না?

কালকেতুর স্বভাব বিরুদ্ধ কর্কশ ব্যবহারে শর্মি অবাক হয়ে জটিলেশ্বরের দিকে তাকাতেই জটিলেশ্বর আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে স্মিত হেসে মৃদু ঘাড় নাড়িয়ে কালকেতুর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

- তুমি বয়েসে অনেক ছোট তাই তোমাকে তুমি করেই বলছি। আর শর্মির মতই আমিও যদি তোমায় কেতু বলে ডাকি তুমি নিশ্চয় কিছু মনে করবে না?

কালকেতু মুখটা তুলে তাকাতেই জটিলেশ্বরের নজরে এলো ওর দুচোখের কোনে তখনও যেন জমাটবাঁধা কান্না। ভীষণ ক্লান্ত চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা, ঘটনার পর থেকে ঘুমিয়েছে বলে মনে হয়না। এইরকম বিষণ্ণ পরিবেশে জটিলেশ্বর ভীষণ অসোয়াস্তি বোধ করে, পরিবেশটাকে হালকা করার জন্যেই শর্মির উদ্দেশ্যে বলে,

- চলো, তোমরা দু'জন মিলে আমাকে একটু রাধামাধবের মন্দিরটা ঘুরিয় দেখাও।

সরু সিমেন্টবাঁধানো রাস্তা, দুধারে রকমারি ফুলের গাছ। গাঁদা, টগর, চাঁপা, বিভিন্ন রঙের গোলাপ, এমনকি কালো গোলাপও রয়েছে। সামনে সামনে কালকেতু আর শর্মি, ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা পেছনেই জটিলেশ্বর হাঁটছে। এতক্ষণে মনে হচ্ছে কালকেতু আস্তে আস্তে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে। কালকেতুর রক্ষ ব্যবহারে জটিলেশ্বর কিছুই মনে করেনি। কালকেতুর জায়গায় নিজেকে বসালে ও নিজেও বোধহয় এর থেকেও বেশী রুক্ষ ব্যবহার করত। দানীবুড়ো শুধু ওর দাদুই ছিল না, একই সাথে ওর মা-বাপও। ওদের মৃদু স্বরের কথাবার্তা জটিলেশ্বরের কানে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল মন্দিরের সামনে। মন্দিরের দরজায় একটা বড় তালা ঝুলছে, বোধহয় সরোজ আগেরদিন তদন্তে এসে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে। মন্দিরের পাশের একটা সিমেন্টের বেদি দেখিয়ে কালকেতু বলে উঠল,

- এই বেদিতেই দাদুকে বসিয়ে সেদিন সন্ধেবেলায় বড়দাদু, মানে শর্মির দাদুর কাছে মন্দিরের চাবি আনতে গেছিলাম, আর ফিরে আসার আগেই…

- তুমি কি চাবি নিয়েই ফিরেছিলে?

জটিলেশ্বরের অনুসন্ধিৎসু প্রশ্নে কালকেতুকে যেন খোঁচা দিল। রুক্ষ স্বরে কালকেতুর জবাব,

- জটিলেশ্বরবাবু! মূর্তি আর গয়না চুরি করার জন্যে আমার কিন্তু দাদুকে খুন করার দরকার হত না। দাদু এমনিতেই চোখে কম দেখত, সূর্য ডোবার পরেতো অন্ধই বলা যায়। মন্দিরের দরজার তালা বেশিরভাগ দিন আমিই লাগাতাম কখনো সখনো শর্মি আর চাবি থাকতো বড়দাদুর কাছে।

জটিলেশ্বর বুঝতে পারে কালকেতুর কাটাঘায়ে ছেটানো নুনের পরিমাণটা একটু বেশীই হয়ে গেছে। আঘাতে মলম লাগানোর জন্যে, যতটা সম্ভব মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
- কেতু! তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের ভুল অর্থ করলে। আমি যতদূর জানি স্বর্গীয় দীননাথ চক্রবর্তীর সবথেকে কাছের মানুষ হচ্ছ তোমরা দুজন। আমার বিশ্বাস দানীবাবুর খুন হওয়ার আর গয়নাসমেত রাধামাধবের উধাও হওয়া, দুটো কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। আমি দানীবাবুর খুনিকে খুঁজে বের করতে চাই আর সে ব্যাপারে তোমরা দুজনই আমাকে সবথেকে বেশী সাহায্য করতে পারো। কেতু তুমি আমাকে বলো সেদিন তারপর কি ঘটেছিল।

জটিলেশ্বরের একদমে বলে যাওয়া কথাগুলো যেন কালকেতুর কাছে বিশ্বাস্য লাগলো। তারপর কালকেতু বলে গেল সেদিনের ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ। অর্ধেন্দু চৌধুরীর কাছে মন্দিরের চাবি নিতে পৌঁছানোর আগেই চৌধুরীবাড়ির মালী অমরনাথ দৌড়তে দৌড়তে এসে কালকেতুকে বলেছিল দানীবাবুকে কে যেন পেছন থেকে লোহার ডাণ্ডা দিয়ে মাথায় মেরেছে, মাটিতে পড়ে আছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পাগলের মত ছুটে এসেছিল কালকেতু। দাদুর রক্তে লাল হয়ে গেছিলো ওর দু'হাত, ডাক্তার ডেকেও লাভ হয়নি।

রিস্টওয়াচে চোখ বোলাল জটিলেশ্বর। পৌনে পাঁচটা বাজে। সরোজের জেরাও বোধহয় অনেকদূর এগিয়ে গেছে। কালকেতুকে সমবেদনা আর বিদায় জানিয়ে শর্মিকে সঙ্গে নিয়ে পা বাড়াল চৌধুরীবাড়ির মুল ফটকের দিকে। অর্ধেন্দু, নির্মলেন্দু আর অক্ষয়ের সঙ্গে ও নিজেও কথা বলতে চায়।

 

 

পঞ্চম পরিচ্ছেদ
(দুর্বার)

দু পা হেঁটে একটু থমকালেন জটিলবাবু। বাড়িটার প্ল্যানটা অদ্ভুত। মন্দির থেকে বিশ হাত দূরে, বাগানের কোনায় দাঁড়িয়ে তাকালেন মূল বাড়ির দিকে। নাটমহলে প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে সামনেটা। দোতলা, তিনতলার সামনে টানা বারান্দা। অনুমান করে নেওয়া যায় বারান্দার পেছনের ঘরগুলো শোওয়ার ঘর। কিন্তু মন্দির যাওয়ার জন্য নাটমহল পেরিয়ে বাগান ঘুরে মন্দির যাওয়ার রাস্তাটা একটু লম্বা। বাড়ির মেয়েরা নিশ্চয় এতটা পথ পেরিয়ে মন্দির যায় না। মন্দির এর একটা কোনা বাড়ির লাগোয়া, কিন্তু সেখানেও কেয়ারি করা ফুল এর সারি। শর্মিকে জিজ্ঞেস করতে ও বলে উঠল, বাড়ির বাঁ দিকের কোনায় আরেকটা দরজা আছে যেটা দিয়ে শুধু পুরোহিত আর বাড়ির মেয়েরা মন্দিরে যাওয়া আসা করে। দোতলার বারান্দার পেছনের ঘরটা দাদুর, মানে অর্ধেন্দুর, মন্দিরের ঠিক মুখোমুখি।  মন্দিরের বিগ্রহর মুখ বাড়ির বাঁ দিকের দেওয়ালের দিকে  থাকতো, যাতে বাড়ির লোকজন ঘর থেকেই ঠাকুর প্রনাম করতে পারেন। একথা সেকথায় জানা গেলো, তিনতলার বারান্দার লাগোয়া ঘরে থাকে শর্মি, দাদুর ঘরের ঠিক ওপরেই। নির্মলেন্দু আর তাপসী থাকেন বারান্দার অন্য প্রান্তের ঘরে। ফুল্লরা আর তার মা মনিকা আছেন দোতলাতেই, তাপসী ও নির্মলেন্দুর ঘরের ঠিক নীচে। এক তলার ঘরে কেউ শোয়না, ঠাকুর চাকর রান্নাঘরের মেঝেতেই বিছানা করে। হিসেব মতন বাড়ির ডানদিকের ছোট ঘর দুটো তে থাকেন অক্ষয় এবং ওনার পরিবার। পুকুরটা এখান থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে মন্দির এর বামদিকে, মানে আরও পশ্চিমে। বাড়ির পেছন দিকটাতে কিছু বড় গাছ লাগানো। কেতু থাকে পুকুরের লাগোয়া চালা ঘরে, মন্দির থেকে দূরত্ব কিছু না হলেও প্রায় পঁচিশ মিটার। লোহার দরজার থেকে দু পা পিছিয়ে এসে। এবং বাগানের পরিপাটি আর গাছের সারি দেখে ধরে নেওয়া যায় ওপাশ থেকে লোকজন এলে তাঁরা মোরামের রাস্তা দিয়েই মন্দির অব্দি যান, নাহলে এই জল কাদার মরসুমে পায়ের ছাপ পাওয়া দুষ্কর হত না।

সুতরাং, চোর যিনিই হোন না কেন, তিনি বাড়ির ভেতর দিক থেকে এসেছিলেন বা গা ঢাকা দিয়েছিলেন মন্দির এর পেছন দিকে, সম্ভবত। কারন হিসেব মতন, দানি বুড়ো বসেছিলেন মন্দির এর রোয়াকে, কেতু চাবি আনতে গেছিল মোরামের রাস্তা ধরে।  মালী যদি কেতুকে দানি বুড়োর খবরটা দিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে মালি এবং কেতু দুজনেই আবার মোরামের রাস্তা ধরেই ফেরত আসে বুড়োর কাছে। এখানে দাঁড়িয়ে দেখলে বেসিক প্রশ্ন দুটো, ১। মালি কোথায় ছিল এবং কিভাবে দানীর খবর পেলো, কারন কেতুর চাবি আনতে বেশিক্ষণ লাগার কথা না, এইটুকু সময়ের মধ্যে খুনি নিজের কাজ করে ফেরার। ২। চোর এবং খুনি কি একজন? কারন এই অল্প সময়ের মধ্যে খুন এবং চুরি বাস্তবিক অসম্ভব। আবশ্যই কেতু কে সন্দেহের বাইরে রেখে। সেক্ষেত্রে অবধারিত পরের প্রশ্ন, চুরি কি তাহলে খুন এর আগেই হয়ে গেছিল?

-   কি হল, আসুন?

শর্মি’র গলা শুনে চমকে উঠলেন জটিল, নাহ গোয়েন্দাগিরি করতে এসে কারোর ওপরে মায়া পড়ে গেলে মুশকিল।

-   হ্যাঁ চল, আসলে মাথার ভেতর অনেকগুলো জিনিস একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে তো।

 

মুচকি হেসে ঘরে ঢুকলেন জটিল। সরোজকে দেখে আরও হাসি পেয়ে গেলো, বেচারা ঘেমে নেয়ে একশা।

-   কিরে, কতদুর কি এগুলো?

-   ধোর। কোথায় ছিলিস এতক্ষণ। আজে বাজে প্রশ্ন করে মাথা ধরে গেলো। কিসসু বোজা গেলনি।

-   কাকে কাকে প্রশ্ন করলি?

-   মনিকা, মানে ফুল্লরার মা আর ফুল্লরা।

ইতিমধ্যে বেয়ারা এসে দু কাপ চা দিয়ে গেছে। জটিল উঠে গিয়ে অক্ষয় বাবুর কাছ থেকে কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে এসেছেন, কয়েকটা জরুরি কথা সেরে নেওয়ার তাগিদে। সরোজ চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু করলো ফুল্লরার কথা। ছোটবেলায় বেশ কিছুটা সময় এবাড়িতে কাটালেও, খুব একটা টান নেই ঘূর্ণির প্রতি। প্রতি বছর একবার, কোনও কোনও বার বাবার জোরাজুরিতে দুবার এখানে আসে। মন্দির বা মূর্তি নিয়ে আলাদা কোনও আগ্রহ নেই। কাকে সন্দেহ করো জিজ্ঞেস করাতে স্পষ্ট বলল ‘বাড়ি থেকে অপ্রয়োজনীয় লোকজন দের আগেই বিদেয় করলে এই ঘটনা ঘটত না’। যদিও ইঙ্গিত সরাসরি কেতু, দানি বুড়ো বা অক্ষয় কার দিকে বোঝা যায়নি।  

মনিকা অপেক্ষাকৃত অনেক মার্জিত। যদিও মূর্তি বা গয়নার এই বাজারে দাম সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।  একবার তো ভাসুরের পড়তি ব্যবসা আর এই বাড়িতে বসে ভোগ করার প্রতি কটাক্ষও করলেন। সেই সঙ্গে এটাও বললেন, কৃষ্ণেন্দুর পক্ষে দিল্লি ছেড়ে কোনোকালেই এখানে এসে বসবাস বা দেখাশোনা করা সম্ভব না। অতএব ওনারা আর এই ব্যাপারে বিশেষ মাথা ঘামাতে চান না। উইল এর কথা জিজ্ঞেস করতেও মহিলা একি উত্তর দেন, এই বাড়ি অর্ধেন্দু জীবিত থাকা অবস্থায় বেচবেন না, আর ওই মূর্তি বা গয়নার তো প্রশ্নই ওঠে না। এবং কৃষ্ণেন্দুর বর্তমান অবস্থা ও প্রতিপত্তির কথা জেনে নিশ্চয় বড় ভাই নির্মল এই বাড়ি বেচার মতন ভুল করবেন না, সেক্ষেত্রে এই বাড়ির ওপর তার একছত্র আধিপত্য থাকবে।

মোটকথা, নির্মল এবং কৃষ্ণের মধ্যে সম্পর্ক যাই হোক না কেন, অন্তত মনিকা বা ফুল্লরা কেউই নির্মল এবং তার আর্থিক অবস্থা কে ভাল চোখে দেখেন না। চুলে দ্রুত আঙুল চালালেন জটিল। ফুল্লরা এবং মনিকার এই ব্যবহার তার ন্যায্য মনে হল, কিন্তু খুন বা চুরির মোটিভ স্পষ্ট করার মতন না।

চা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, ভেতর থেকে তাপসীকে ডেকে দিতে বললেন জটিল। সন্দেহের তালিকায় এখন বাকিরা। ঘরে ঢুকলেন একজন মধ্যবয়স্কা আটপৌরে মহিলা। বেশ ক্লান্ত মুখ, দুঃখের ছাপ স্পষ্ট। একটু জবুথবু হয়ে বসলেন সামনের চেয়ারে।

-   নমস্কার, আমাদের পরিচয় নিশ্চয় এতক্ষণে আপনি জানেন। তবুও বলি আমি জটিল এবং ও সরোজ।

প্রতিনমস্কার সেরে গায়ের কাপড়টা আরেকটু টেনে নিলেন মহিলা। ভেজা গলায় বললেন,

-   কি জানতে চান বলুন। জেঠু কে আমি এবাড়িতে আসার দিন থেকেই চিনি। কারোর সাথে কখনো বিবাদ করতে শুনিনি। পুজো নিয়েই থাকতেন। কেন এরম হল জানি না।

একটু থেমে স্বগতোক্তির স্বরেই বললেন,

-   শর্মি বড় হয়েছে, পড়াশুনো জানে। নিজের পছন্দ অপছন্দ আছে, আমি কখনো বাধা দিয়নি কিছুতে। কিন্তু সবাই হয়তো সবকিছু অত সহজে মেনে নিতে পারেনা।

-   আপনি কি নির্মল বাবুর কথা বলছেন।

-   ও, বাবা কেউই শেষের দিকে জেঠুকে আর সহ্য করতে পারত না। ভাবতো বুঝি আমাকে দিয়ে বলিয়ে কেতুর একটা বন্দোবস্ত করানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জেঠু বা কেতু কেউ কখনো আমাকে কিছু বলেনি জানেন। তবে খুন, বিগ্রহ চুরি এ আমি ভাবতেও পারি না।

-   নির্মল বাবুর ব্যবসাপত্র?

-   ও তো রিটায়ার করার পর এক বন্ধুর সাথে একটা ব্যবসা খুলতে চেয়েছিল, কিন্তু পয়সার অভাবে সেভাবে কিছু . . . এখন এই একটু আধটু কলকাতায় প্রোমোটারি তে পয়সা ঢেলে . . .

-   অর্ধেন্দুবাবু কিছু সাহায্য করেননি?

-   বাবা চিরকাল ভীষণ হিসেবি। এখনো বাড়ির সমস্ত খরচ ওনার হাত দিয়েই হয়। প্রোমোটারির ব্যবসাটাও বাবার পছন্দ হয়নি। চেয়েছিলেন ছেলে নিজের মতন ওকালতি করুক। তাই আর কি।

-   খুনের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?

-   আমি আর মনিকা দুপুর নাগাদ গয়না নিয়ে মন্দিরে যাই, গয়না বাবার আলমারিতেই থাকতো। মন্দিরের চাবিও বাবাকেই এসে ফেরত দিই আমি। মনিকা একটু ঘুমোবে বলে নিজের ঘরে যায়, আমি নীচে রান্নাঘরে এসে সন্ধ্যের জলখাবারের জোগাড় করছিলাম। কিছুক্ষণ বাদে অক্ষয় এসে আমাকে জানায়।

একটু কেঁপে উঠলেন তাপসী।

-   আমাদের জিজ্ঞাসা শেষ, আপনি বরং অর্ধেন্দুবাবু কে ডেকেদিন একটু।

মহিলা যেতেই সরোজ বলে উঠল,

-   অর্ধেন্দুবাবু কে জেরা করে কি বিশেষ লাভ আছে? অক্ষয়ের খুনের মোটিভ কিন্তু অনেক বেশি স্ট্রং। বা নির্মলবাবুর।

-   অক্ষয়বাবুকে জেরা করব সব শেষে। বাইরের একজন লোক, এবং বাড়ির সমস্ত খবর আছে। চুরি করার দরকার কতটা জানা দরকার, কিন্তু খুন? খুন কেন করবে কেউ বুড়ো লোকটাকে। চোখে দেখে না, কানে শোনে না, এরম লোকের শত্রু কে?

চামড়ার চটির আওয়াজ হল দরজায়,

-   আসতে পারি?

 

 

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
(হস্তিমূর্খ)

জটিল এবং সরোজ একটু চমকেই উঠল অপ্রত্যাশিত মহিলা কন্ঠস্বরে। তবু জটিল গলায় যথাসম্ভব গম্ভীরভাব এনে বলল – প্লিজ, প্লিজ কাম। ঘরে ঢুকলেন আনুমানিক বছর ত্রিশের এক মহিলা। সরোজই জটিলকে শ্যামলীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। “জ্যাঠাবাবু বিশ্রাম নিচ্ছেন, তাই আপনাদের বলতে বললেন উনি একটু পরে আসবেন। আর জানতে চাইলেন আপনাদের চা-জলখাবার খেয়েছেন কিনা, নাহলে আমি কিছু……”

“আপনি ব্যস্ত হবেন না, আপনিই কি অর্ধেন্দুবাবুর দেখাশোনা করেন?” – জটিল জানতে চাইল

-   খানিকটা তাই। আমার হাজব্যান্ড মূলত বাইরের কাজকর্ম, কিছু অফিসিয়াল কাজকর্ম এগুলি দেখেন

-   অফিসিয়াল বলতে?

-   কাজ কমিয়ে দিলেও জ্যাঠাবাবুর কাছে অনেকেই এখনও আসেন কনস্যালটেন্সি চাইতে, সেসব অ্যাপয়েন্টমেন্ট ম্যানেজ করা, দরকারি কাগজপত্র ড্রাফট বানিয়ে ই-মেল করা এইসব

-   আচ্ছা শ্যামলী দেবী, এই যে বাড়িতে একটা চুরি হল, সঙ্গে একটা খুন, আপনার কি মতামত?

সরোজ বুঝল জটিল সময় নষ্ট করতে রাজি নয়

-   আমার আর নতুন করে কি মত থাকতে পারে বলুন? যা বলার তো ওনাকে বলেছি, এছাড়াও হাজার হোক আমরা কর্মচারী মানুষ, আর এসব অনেক বড় ব্যাপার

-   শর্মি মেয়েটির সম্বন্ধে আপনার কি মনে হয়?

প্রশ্নটি করেই জটিল লক্ষ্য করল শুধু শ্যামলীই নয়, সরোজও একটু চমকে উঠল। শ্যামলীকে চুপ করে থাকতে দেখে জটিল আবার বলল – আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আপনি যা বলবেন তা এই তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

“আসলে বড়দিভাই একটু অন্য টাইপের। পড়াশোনায় ভাল কিন্তু ……” – শ্যামলীর ইঙ্গিত বুঝে জটিল আবার প্রশ্ন করল – আপনি কি করে জানলেন?

-   আমার এক মাসতুতো ভাই কিছুদিন লেকে সিকিউরিটির ডিউটি করেছিল। ও বেশ কয়েকবার অন্য ছেলের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছে

-   প্রতিবারেই কি একই ছেলে ছিল?

-   সেটা ঠিক বলতে পারব না, তবে ভাই যাকে দেখেছিল সে মোটামুটি অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে বলেই মনে হয়

-   আর কে জানে এ কথা?

-   আমি ওকে একবার বলেছিলাম, ও বলল এসব ব্যাপার নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আর এই আপনাদের বললাম

-   হুঁ, আচ্ছা আপনার ওই ভাইটির সাথে কি একবার কথা বলা যেতে পারে?

-   হ্যাঁ, নিশ্চয়, আমি এখুনি ফোনে ওর সাথে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।

জটিল সামান্য কিছু সৌজন্যমূলক বাক্যবিনিময় মোবাইলটা ফিরিয়ে দিয়ে ফোন নাম্বারটা নিয়ে নিজের মোবাইলে সেভ করে নিল। আরও কিছুক্ষণ কথা চলার পরে শ্যামলী অর্ধেন্দুবাবুর ওঠার সময় হয়েছে বলে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগেই জটিল হঠাৎ বলে উঠল – “আপনি অর্ধেন্দুবাবুকে বলে দেবেন, ওনার যদি অসুবিধে থাকে তাহলে আমরাও গিয়ে ওনার সাথে দেখা করতে পারি।”

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই জটিল এবং সরোজের জন্যে জলখাবার নিয়ে এল কমলি। সরোজ তাকিয়ে দেখল জটিলের চোখমুখ বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। “বুঝলি সরোজ, সরেস সতেজ সরভাজা, তাও আবার খোদ কৃষ্ণনগরে বসে। জীবনটা ধন্য হয়ে গেল রে তোর সুবাদে।” সরোজ এই কথার উত্তরে নীরবতা অবলম্বন করাই শ্রেয় মনে করছে দেখে জটিল আবার মুখ খুলল – “চিন্তা করিস না, পুষিয়ে দেব। প্রায় সাড়ে ছ'টা বাজে, চল সরোজ এবার ওঠা যাক, এখানকার কাজ তো শেষ হয়ে গেল। হ্যাঁ, আরেকটা কাজ বাকি আছে। সেটা আমার দ্বারা হবে না। এই বাড়ির সবার ছবি চাই। ইনডিভিজুয়াল বা রিসেন্ট দরকার নেই। এই ধর মোটামুটি বছর খানেকের পুরনো আর গ্রুপ হলেও চলবে।” – সরভাজার শেষ টুকরোটা কাঁটা চামচের আগায় লাগিয়ে মুখে তুলতে তুলতে জটিল বলল।

-   তোর কাজ শেষ?

-   হ্যাঁ, এই তো সরভাজার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম, এসে গেল, পেটে পুরে নিলাম, আর কি কাজ থাকতে পারে?

-   কিন্তু অর্ধেন্দুবাবুকে তো…

-   ওহ্, যাওয়ার আগে ভদ্রলোককে ওনার আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ না জানিয়ে গেলে ইল-ম্যানার্ড ভাববে বলছিস? ঠিক আছে, আজ্ঞা শিরোধার্য।

জটিল এবং সরোজ অর্ধেন্দুবাবুর কাছে থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসতেই অক্ষয় ওদের হাতে ফোটোগ্রাফের খাম দিয়ে দিল। গাড়িতে পেছনের সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে সরোজ জিজ্ঞেস করল -

-   তুই তো সেভাবে কাউকেই ইন্টারোগেট করলি না – কথাটিকে পাত্তা না দিয়ে জটিল পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল – সরোজ, চোর আর খুনির পার্থক্য বলতে পারবি?

-   মানে? কেউ তো এখনও ধরাই পড়েনি

-   আরে তুই সব ব্যাপারে এত চাপে পড়ে যাস কেন? আমি জেনেরিক ডিফারেন্সের কথা বলছি

-   আমার দ্বারা হবে না, তুইই বল

-   খুব সহজ। চোর খুনি নয়, খুনি চোর নয়। একেবারে পাঁচে পাঁচ। আচ্ছা, যদ্দুর জানি বিবাহিতা তো অনেক দূর, বোধহয় অবিবাহিতা কোন বৌও নেই তোর? তাই তো?

-   হেঁয়ালি থামিয়ে আসল কথা বল

-   হেঁয়ালি নয় রে, হেঁয়ালি নয়। বিয়ে করে বা না করে গোটা কয়েক পুত্রকন্যার গর্বিত জনক হওয়ার সৌভাগ্যলাভ করলে কেসটা তোর কাছে আরও একটু সুবিধেজনক হত। আর কথা নয়, সোজা নিজগৃহ। অঙ্গপ্রক্ষালনের পর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সহযোগে উৎকৃষ্ট পানীয় এবং মস্তিষ্কে ঝড়

-   আমি তোকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছি

-   নামিয়ে দিয়ে মানে? পুরুলিয়ায় বদলী কে হবে? তুই না আমি?

জটিলের ইঙ্গিত বুঝে সরোজ আর কথা বাড়ালো না।

                                                                   ———-

‘চিয়ার্স’ দুটি হাত উঠে গ্লাসে গ্লাসে ঠেকল

-   জটিল তোর মদের কালেকশনের তারিফ না করে পারা যায় না

-   সরভাজার দাম। এনিওয়ে লেটস কাম টু দ্য পয়েন্ট। তোর কি মনে হয় বলতো?

-   দ্যাখ আমার মনে হয় গয়না আর মূর্তিচুরি করাটাই মেইন মোটিফ

-   তুই ঠিকই বলেছিস, তবে মূর্তি নয় গয়না চুরিটাই ছিল মোটিফ। কিন্তু সে তো চুরি করলেই ল্যাঠা চুকে যেত। থানা-পুলিস হত, মাল পাওয়া গেলে যেত না গেলে যেত না। খুন করার দরকার পড়ল কেন?

-   দানীবুড়ো চুরি হতে দেখেছিল বলছিস?

-   একজ্যাক্টলি। শুধু যে দেখেছিল তাই নয়, চোরকে চিনতেও পেরেছিল। সে কারণেই তাকে মরতে হল। সরোজ, কেতুর ঘর আর দোকান ভাল করে সার্চ করা হয়েছিল?

-   হ্যাঁ, অবভিয়াসলি

-   কবে করা হয়েছিল? খুন হওয়ার সাথে সাথে নাকি পরের দিন?

-   ন্যাচারালি পরের দিন, কারণ সেদিন তো আর সময় ছিল না। জানিস তো আমাদের ফোর্সে ম্যানপাওয়ারে কি টাইপের ক্রাইসিস

-   উঁহু, আই ডাউট সরোজ, আই ডাউট। আসলে তোদেরই বা দোষ দিই কি করে বল? তোদের এসব নিয়েই চলতে হয়, আর আজ যদি সেরকম কোনও ক্রিমিনাল কোনও কেসে জড়িত হয়ে পড়ত, তাহলে তোরা এই ম্যানপাওয়ার নিয়েই এতটুকু ফাঁক রাখতি না, দরকার হলে ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে নিতি, কারণ ওটা তোদের অ্যাপ্রাইজাল স্ট্রং করত। আর এই পরাশ্রয়ী দুটি প্রাণী, তার মধ্যে আবার একজনের দিন ঘনিয়ে এসেছে, এই সব খুচরো ব্যাপার নিয়ে কতটা মাথা ঘামানো যায়!! যাই হোক, কেতুর ঘর আর দোকানটা একটু ভাল করে সার্চ কর।

সরোজ এই ব্যঙ্গোক্তিগুলির সাথে অত্যন্ত পরিচিত। কাজেই গায়ে না মেখে জানতে চাইল

-   তুই কি বলতে চাইছিস কেতুই ওর দাদুর খুনি

-   আমি কি একবারও বললাম কেতু খুনি? আমি বলেছি ওর ঘর আর দোকান সার্চ করতে।

-   এর অন্যরকম কি মানে হয়?

-   ধীরে বন্ধু ধীরে। পুলিসের দরকার না থাকতে পারে, আমার কিন্তু ইচ্ছে আছে মার্ডার ওয়েপনটা একবার দেখার

-   মানে !!!!

-   হ্যাঁ। এতেই অবাক হলি? জিনিসটা হাতে পেলে তো তুই ওখান থেকে একদৌড়ে কলকাতায় এসে কোনও পাঁচতারা শুঁড়িখানায় ঢুকে পড়বি আনন্দের চোটে। আর হ্যাঁ, অতিরিক্ত উৎসাহিত হয়ে যেন আবার গোটা বাড়ি সার্চ করতে যাস না, শুধু ওই একটাই ঘর

-   ঠিক আছে, তাই হবে

-   আরও কতগুলো কাজ আছে। ঐ অস্ত্রটা পাওয়া গেলে কেতুকে অ্যারেস্ট করতে যেন ভুল না করে। তবে খেয়াল রাখিস খুনটা যে ওই করেছে সেটা যেন আবার ওকে দিয়ে বাই হুক অর ক্রুক কবুল না করানো হয়। ফর্মালিটি অনুযায়ী কোর্টে প্রোডিউস করে পি সি-তে নেওয়া এগুলি সব হোক, আর সেই সঙ্গে এমন একটা ভাব দেখা যেন কিনারা হয়েই গেছে। খোঁচর লাগিয়ে দে ইমিডিয়েটলি। বাড়ির লোকজন বিশেষ করে শর্মির প্রতিটি গতিবিধির খবর যেন নিয়মিত আমাকে জানানো হয়।

-   তোর কি মনে হচ্ছে একটু খুলে বলবি?

-   চোর বমাল সমেত চৌধুরী বাড়িতেই বহাল তবিয়তে বসবাস করছে। খালি দিন গুনছে কবে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট একটু কমে। লোকাল পি এস শুধু যে কেতুর ঘর আর দোকান ভাল করে সার্চ করেনি তাই নয়, গোটা বাড়িটার জন্যেই একই ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে।

-   আই জাস্ট কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড ইওর প্রসেস অফ ইনভেস্টিগেশন

-   হোয়াই?

-   তুই বলছিস যে কেতুর ঘর থেকে মার্ডার ওয়েপনটা পাওয়া যাবে। যদিও জানি না কিসের ভিত্তিতে তোর এই কল্পনা, তবু তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই পাওয়া গেল, আবার বলছিস কেতু ইনভল্ভড নয়, ওকে অ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে এসে যেন জামাই আদর করা হয়। তো ভাই সোজা করে বল না কে চুরিটা করেছে, তাকেই তুলে আনি।

-   আরেকটা ড্রিংক নিবি? শিবকুমার শর্মার সন্তুর শুনবি? যশরাজের দ্রুত তারানা?

-   শোন, অনেক রাত হয়েছে, সারাদিন বহুত ধকল গেছে, আর এসব ফাজলামি ভাল লাগছে না

-   কি করবি বল? সহ্য না করতে পারলেই তো আবার পুরুলিয়া। শোন, ওই বাড়িতে অন্তত দু’জন একটি বিশেষ সত্য গোপন করছে। আরেকজন সেই বিষয়ে যা জানে, ঠিক জানে বলা ভুল, যা বুঝতে পেরেছে তা সরাসরি না বলে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে। যাকে তাকে ধরে তুলে এনে দু’ঘা দিলেই তো যে চুরি করেছে সে কবুল করে দেবে। কিন্তু এটা কি কোনও পদ্ধতি হল? মানবিক দিক দিয়ে ভেবে দেখ তো? শান্ত হও, বন্ধু, শান্ত হও। খুনি এবং চোর দু’জনকেই তুমি সামনের শনিবারের আগেই তোমার কাস্টডিতে নিয়ে নিতে পারবে।

 

 

সপ্তম পরিচ্ছেদ
(প্রত্যয়)

পরদিন সকাল। খবরের কাগজটা নিয়ে সবে বসেছে জটিল, এমন সময় ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরে হ্যালোর বালাই না রেখে সে বলল "হ্যাঁ, বল সরোজ… "

সরোজ ভয়ঙ্কর উত্তেজিত। কিকরে জটিল জানল সে ফোন করেছে সেটাও জিজ্ঞেস করার কথা তার মাথায় আসেনি।

- "তুই কি ম্যাজিক জানিস নাকি ভাই? কেতুর ঘর থেকে… "

- "উদ্ধার হয়েছে তবে রাধামাধবের মূর্তি?"

আরও এক দফা চমকানোর পালা সরোজের! তার গোয়েন্দা বন্ধুটির মাথা যে কোন পথে কাজ করে সেটা বোঝা দুষ্কর।

- "হ্যাঁ, আর তাতে রক্তের দাগ… " নিজেকে সামলে নিয়ে বলল সে – "কেতু কে ফাটকে পুরেছি, বিশেষ কিছু কথা বলছেনা অবশ্য, তবে দাবি করছে খুন করেনি সে। তুই আসবি?"

- "না, বরং তুইই চলে আয়। কিছু আলোচনা করতে হবে তোর সঙ্গে।"

 

আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেল সরোজ। তখনও তাকে বেশ উত্তেজিত লাগছে।

- "আগে বল তো ভাই, কিকরে বুঝলি?"

- "ওই পাথরের মূর্তিই যে মার্ডার ওয়েপন, সেটা প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল। খুব ভারী নয়, যে তোলা যাবেনা, আবার মাথায় বাড়ি মেরে খুন করার পক্ষে যথেষ্ট ভারী। সেই সঙ্গে এটা ভাব যে আমাদের হাইপোথিসিস ছিল খুনী হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আসেনি, দানীবুড়ো তাকে দেখে ফেলায় বাধ্য হয়ে হত্যা করেছে…"

- "বা হয়তো সে ভেবেছিল দানীবুড়ো তাকে দেখেছে, কিন্তু আসলে অন্ধকারে দেখতে পায়নি। এমনিই বুড়ো চোখে কম দেখত… "

- "ভেরি মাচ পসিবল! ইন ফ্যাক্ট এটা খুব বুদ্ধিমানের মত বলেছিস। তো সে যাই হোক, খুন যদি পূর্বপরিকল্পিত না হয় তাহলে খুনী নিশ্চয়ই লোহার ডাণ্ডা জাতীয় কিছু নিয়ে ঘুরবেনা। সুতরাং…"
- "হুম, বুঝলাম। কিন্তু সেটা যে কালকেতুর ঘরে পাওয়া যাবে সেইটা কিকরে জানলি?"
- "ওটা জানতুম না। নেহাত একটা আন্দাজ। তবে ওয়াইল্ড গেস নয়। সেদিন যখন ওর সাথে দেখা করতে গেলাম, আমায় দেখেই কেমন একটা নার্ভাস হয়ে পড়ল। তোরা আগে অল্পস্বল্প সার্চ করেছিস, কিন্তু ওর ঘর সেভাবে করিসনি। তাতে ও বোধহয় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। আমায় সেখানে দুম করে হাজির হতে দেখে কেমন ঘাবড়ে গেল। তুই হয়তো খেয়াল করিসনি, ও বারবার ওর ঘরের দিকে তাকাচ্ছিল।"
- "আই সী… কিন্তু একটা জিনিস আমার মাথায় ঢুকছেনা… টাকার লোভে দাদুকে খুন করার মত কাজ হয়তো সে করলেও করতে পারে, কিন্তু মার্ডার ওয়েপনটা গুছিয়ে ঘরে তুলে রাখবে?"
হা হা করে হেসে উঠল জটিল – "তুই বুঝি এখনও ভাবছিস কেতুই খুন করেছে?"
- "না মানে সেরকম কিছু ভাবিনি…" একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল সরোজ, "বরং আমার থিওরিটা একটু অন্য, কিন্তু ঠিক মার্ডার ওয়েপন তুলে লুকিয়ে কেন রাখবে সে?"
- "কি তোর থিওরি শুনি? হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা তথ্য লুকোচ্ছিস আমার থেকে?"
মৃদু হেসে সরোজ বলল – "রঙের টেক্কাটাই তো নামাইনি এখনও। ওই মূর্তি ছিল কেতুর ঘরের একটা বাক্সের মধ্যে খবরের কাগজ মোড়া অবস্থায়। আর সেই খবরের কাগজের মোড়কের মধ্যে ছিল আরেকটা জিনিস… "
- "কি জিনিস?" উৎসুক হয়ে ঝুঁকে পড়ল জটিল।
- "একটা শান্তিনিকেতনী চুলের কাঁটা। সেটা শর্মির মাথার কাঁটা বলে শনাক্ত করা গেছে।" যুদ্ধজয়ের হাসি সরোজের মুখে।
- "এগজ্যাক্টলি! এরকমই কিছু একটা আশা করেছিলাম! নাও এভরিথিং মেক্স সেন্স!"
- "তো আমার থিওরি হল খুনটা শর্মির কাজ। খুন করে মূর্তিটা সে ফেলে যায় ঘটনাস্থলে। আরেকটু সময় পেলে হয়তো সেটা টান মেরে পুকুরের জলে ফেলেই দিত। কিন্তু হয়তো কালকেতুর ফিরে আসার শব্দ শুনে ঘাবড়ে গিয়ে সে ওটা ফেলে পালায়। আর সেইসঙ্গে তার মাথা থেকে… "
- "বাঃ কি দারুণ কনক্লুশন! কাঁটাটা তো আগেও কখনও খুলে পড়ে থাকতে পারে তার মাথা থেকে। হয়তো সেদিন সন্ধেবেলা সে দানীবুড়োর কাছে এসেছিল। এমন হতে পারেনা?"
- "তা পারে বটে।"
- "কেতু কি বলছে? মূর্তি ওর কাছে থাকার কি ব্যখ্যা দিচ্ছে?"
- "তার বক্তব্য সে চাবি নিয়ে আসতে গিয়ে চাবিটা খুঁজে পায়না। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে তার মনের মধ্যে সন্দেহ হয় তবে কি কেউ চাবিটা চুরি করেছে? এই ভেবে দৌড়ে দাদুর কাছে ফিরে এসে দেখে এই কাণ্ড। দাদুর নাড়ি ধরে বুঝতে পারে তিনি আর ইহলোকে নেই। পাশে পড়ে রয়েছে মূর্তি আর মাথার কাঁটা। সেই দেখে নাকি সন্দেহ হয় কেউ শর্মিকে ফাঁসাবার চেষ্টা করছে। তাই সে ওগুলো তুলে রাখে। পরে শর্মির সাথে কথা বলে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করবে এই মনে করে…"
- "দাঁড়া দাঁড়া… এর মধ্যে শর্মির সাথে ওর সেই কাঙ্ক্ষিত মোলাকাত হয়নি?"
- "না। ওখানেই ব্যাপারটা কেঁচে গেছে। খুনের পর থেকে অর্ধেন্দু এবং নির্মলেন্দুর নাকি দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে কালকেতুই খুনী। তাই তারপর থেকে কালকেতুর সঙ্গে শর্মির জনান্তিকে দেখা করা বন্ধ রেখেছেন ওঁরা। যে কবার ওদের দেখা হয়েছে, পাঁচটা লোকের সামনে। তাই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে পারেনি বোধহয়।"
- "হুম ইন্টারেস্টিং। জিগস ধাঁধার পিস গুলো খাঁজে খাঁজে মিলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। তবু আরও দুয়েকটা ডাউট আছে। সেগুলো ক্লিয়ার করার জন্য ওবাড়ি যেতে হবে। চঃ বেরোনো যাক…"
- "দাঁড়া, আমার শেষ একটা ধন্দ পরিষ্কার কর তো দেখি। দাদুকে এত ভালবাসা সত্ত্বেও কালকেতু ওই পরিস্থিতিতে শর্মিকে একটুও সন্দেহ করল না? ভাবল তাকে অন্য কেউ ফাঁসাচ্ছে? একটু অদ্ভুত না এটা?"
হো হো করে হেসে উঠে জটিল বলল – "বন্ধু, কালই তো বলেছিলাম, প্রেম ভালোবাসার তুমি কিস্যু বোঝোনা! ভালবাসার ফাঁদে পড়ে মানুষে কত কাছের মানুষকে ত্যাগ করে কখনও দেখনি? তাছাড়া আরেকটা জিনিস তুই জানিসনা, যেটা আমি জানি।"
- "কি?"
- "শর্মি বেশ কয়েক মাসের অন্তঃসত্তা…"
- "হোয়াট? হাও দ্য হেল অন আর্থ ডু ইউ… "
- "তুই বোধহয় ভুলে গেছিস  গোয়েন্দাগিরি শুরু করার আগে আমার পড়াশুনার ডিগ্রিটা ছিল ডাক্তারিতে। সেইসঙ্গে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করলে এই চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব না।"
- "ওহ গড! তার মানে সেই অন্য প্রেমিক?"
- "তিষ্ঠ বৎস! অত তাড়াহুড়ো কিসের? চ ওবাড়ি যাই। এ রহস্যের যবনিকা পড়তে আর বেশি দেরি নেই। শিগগিরই সব বুঝতে পারবি তুইও।"
     
জমিদারবাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ বেলা হয়ে গেল। ঢুকেই দেখা হল অক্ষয়ের সঙ্গে। জটিল তাকে বলল – "এই খুনের কিনারা আমি প্রায় করে ফেলেছি। কিন্তু দুয়েকটি জিনিস এখনও জানা দরকার। তার জন্য আমি বাড়ির সবাইকে নিয়ে বসে সবাইকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন সবাই চলে আসেন বৈঠকখানায়। তুমি, শ্যামলী এবং কাজের লোকেরাও থাকা চাই। অত্যন্ত আর্জেন্ট, যে যাই কাজে ব্যস্ত থাকুন যেন আসেন। আমি আধ ঘন্টার বেশ সময় নেবনা।"
আধঘন্টার মধ্যে অক্ষয় এসে জানাল সবাই রেডি। ওরা দুজন হাঁটা লাগাল বৈঠকখানার দিকে। ঢোকার আগে সরোজের কানে কানে জটিল বলল – "একটা প্রশ্ন তোকেও করার আছে। যদি ভুলে যাই মনে করাস সময় মত।"
 
ঘরে ঢুকে ওরা দেখল সবার মুখ থমথম করছে। অর্ধেন্দু বলে উঠলেন – "আর প্রশ্নোত্তরের কি দরকার আছে? খুনী তো গ্রেফতার হয়েছে ইতিমধ্যেই।"
মৃদু হাসল জটিল – "সবাইকে একটা দুটো করে প্রশ্ন করব। আপনাকে দিয়েই শুরু করি অর্ধেন্দুবাবু। আপনি কি সত্যিই মনে করেন কালকেতু খুন করেছে? যে দাদুকে সে এত ভালবাসত, তাকে খুন করবে নিজের হাতে?"
- আপনাকে তো আমি আগেই বলেছি, টাকার লোভে মানুষ সব করতে পারে। শুধু আমি না, নির্মল আর বাকিরাও এটাই বিশ্বাস করে যে কেতুই এ কাজ করেছে।"
নির্মলের দিকে চেয়ে জটিল বলে উঠল – "সত্যি নির্মল বাবু? আমাদের তো মনে হচ্ছে কালকেতু খুব কাছের কোনও মানুষকে বাঁচাতে হত্যার অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিল।"
- "না! শর্মি এমন কাজ করতেই পারেনা!" – হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠলেন যেন তাপসী!
- "আমি এখনও সেরকম কিছু বলেছি কি?" বলল জটিল। "তবে তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু এভিডেন্স পাওয়া গেছে একথা তো অস্বীকার করা যায়না। কনক্লুসিভ এভিডেন্স পাওয়ার জন্য আমাদের বাড়িটা একবার ভাল করে সার্চ করতে হবে। গতবারের সার্চে কিছু পাওয়া যায়নি অবশ্য। কিন্তু সে সার্চ খুব আলগা ভাবে করা হয়েছিল।"
- "যত খুশি সার্চ করুন। তবে তার আগে ওই কালকেতুর ঘরগুলো ভাল করে খুঁজে দেখলে হত না? গয়নাগুলো নির্ঘাত ওখানেই আছে।" বললেন কৃষ্ণেন্দু।
সরোজ বাধা দিয়ে বলল – "ও ঘর আজ আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছি…"
- তাছাড়া গয়না এবাড়ি থেকে পাচার হয়ে গেছে বলেই আমার ধারণা।" – জটিল বলল।
চমকে উঠল সরোজ… "কিন্তু খুনের পরদিন থেকেই তো পুলিশি পাহারা বসেছে, কিকরে পাচার হবে?"
জটিল কেবল হাসল।
- "আমার শেষ প্রশ্ন শর্মিকে…"
- "হ্যাঁ বলুন।" শর্মি কেমন যেন ভেঙে পড়েছে।
- "তোমার চুলের কাঁটা ঘটনাস্থলে গেল কিকরে?"
- "আমি ঠিক জানিনা… মানে… আমার মনে হয় তার আগের রাত্রে আমি কেতুর কাছে গেছিলাম, তখন হয়তো ওর ঘরেই পড়ে গেছিল… "
- "কিন্তু কেতু তো অন্য কথা বলছে। তাহলে কি সে-ই মিথ্যে কথা বলছে? সে-ই খুনী?"
- "না! না না! ও করতেই পারেনা এ খুন! অসম্ভব!" দুহাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল শর্মি।
- "কি চান বলুন তো আপনি? মিছিমিছি চাপ সৃষ্টি করছেন কেন আমাদের পরিবারের লোকেদের ওপর?" বেশ রেগেই বললেন নির্মল।
- "আর কিছুই চাইনা। আমার যা জানার জানা হয়ে গেছে। তবে কাল সকালে গোটা বাড়ি সার্চ করবে পুলিশ। তখন প্লিজ সহযোগিতা করবেন। আর হ্যাঁ সরোজ, আজ সন্ধ্যের পর পুলিশি প্রহরা সরিয়ে নিতে পারিস। তারপর তো আর কেউ বেরোবেন না এমনিতেই।"
- "কিন্তু আপনার তো ধারণা মাল পাচার হয়ে গেছে। তবে সার্চ করে কি বার করবেন?" নির্মলের প্রশ্ন।
স্মিত হেসে জটিল বলল – "আপনারা হয়তো ভুলে গেছেন, ঘটনার পর থেকে সেই চাবিটা কিন্তু নিরুদ্দেশ। আসি আজ। নমস্কার।"

 

 

বাইরে বেরোনোর পর সরোজ বলল "তুই আমায় কি জিজ্ঞেস করবি বলেছিলি,করলি না তো?"

- "হ্যাঁ। বাই দ্য ওয়ে, শর্মি কিন্তু তোর হাঁটুর বয়েসি। ওভাবে ওর প্রতি সফট কর্নার তৈরি করিস না ভাই।"

- "মানে? কি বলতে চাস তুই?"

- "কিছুই না। সুন্দরী, রূপবতী যুবতী। বেশিরভাগ ব্যাচেলর পুরুষই তাকে একটু অন্যরকম চোখে দেখবে। তবে কিনা, তদন্তের স্বার্থে তোকে আনবায়াসড থাকতে হবে। এই আর কি।"

- "বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু জটিল। তোকে তদন্তে সাহায্যের জন্য ডেকে এনেছি মানে এই নয় যে যা তা বলবি! তুই কি ইঙ্গিত করতে চাস? আমি শর্মির সঙ্গে নয়ছয়ে যুক্ত?"

- "আরে চিল! যা হোক, আমার আসল প্রশ্নটা ছিল অন্য। এখানে যে পুলিশী প্রহরা বসিয়েছিস, তার মধ্যে রতন নামে কেউ আছে?"

- "তুই কিকরে চিনলি রতন কে?" অবাক প্রশ্ন সরোজের।

- "অর্থাৎ আছে। বেশ। তা এই রতন পুলিশে চাকরি করার আগে কি করত জানিস?"

- "যদ্দুর জানি কিছু একটা বেসরকারী সংস্থার হয়ে ডিউটি করত।"

- "হুম। এক্স্যাক্টলি কি করত ইত্যাদির একটু ডীটেইল সংগ্রহ কর আজ বিকেলের মধ্যে।"

- "সে নাহয় করলাম। কিন্তু ব্যাপার কি বল তো?"

- "ধৈর্য ধর বাছা।" হেসে বলল জটিল, "চল অনেক বেলা হল, লাঞ্চটা সেরে নিই কোথাও।"

 

 

অষ্টম ও অন্তিম পরিচ্ছেদ

(পিব্যান্ডস)

পরেরদিন বিকেলবেলার মধ্যে জটিলের নির্দেশে যাবতীয় খানাতল্লাশি সম্পন্ন হল। সকাল থেকে সময় যতই এগিয়েছে, আশানুরূপ ফলপ্রাপ্তি ঘটায় জটিলের হাসি ততই চওড়া হয়েছে, আর পুলিশ বিভাগের ব্যর্থতা স্পষ্টতর হওয়ায় সরোজের মুখ ততই শুকিয়ে আমসি পাকিয়েছে।

বিকেল সাড়ে চারটেয় জটিল ঘোষণা করে দিল সন্ধে ছ’টায় চৌধুরিবাড়ির বৈঠকখানায় অন্তিম সভা বসবে আর সেখানেই এই রহস্য-নাটকের যবনিকা পতন।

 

নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট দশেক আগেই বৈঠকখানার ঘর পরিপূর্ণ। ঝি-চাকরশুদ্ধু বাড়ির সকলেই জটিলের নির্দেশে এসে উপস্থিত হয়েছে। এমনকি, মাঝখানে উঠে যেতে না হয়, তাই কমলিও কয়েকটা ফ্লাস্কে চা করে এনে টেবিলে রেখেছে। সঙ্গে রয়েছে তাপসীদেবীর হাতে গড়া মালপোয়া।

বড় পেটাঘড়িটায় সন্ধে ছ’টা বাজার রেশ কাটতে না কাটতেই সরোজকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকল জটিলেশ্বর। তাদের সঙ্গে আর একজনও। কালকেতু। কেতুর হাতকড়া খুলে দেওয়ার অনুরোধ করে তাকে সামনের একটা ফাঁকা আসনে বসতে বলে ক্লান্ত জটিল নিজেই একটা ফ্লাস্ক থেকে এক কাপ চা ঢেলে নিল। তৃপ্তির চুমুকের সঙ্গে চারিদিকটা এবং প্রত্যেকের মুখ ভাল করে নিরীক্ষণ করে নিল। পিন-পড়া নিস্তব্ধতাটাকে বেশ উপভোগ করল সে। সকলেই তার দিকে চেয়ে বসে আছে মোমের পুতুলের মতো। সকলেই জড়সড়, শুধু শর্মিষ্ঠা তার মায়ের পাশে বসে ক্রমাগত ওড়নার খুঁট দাঁত দিয়ে কাটছে। চায়ের কাপ টেবিলে রেখে জটিল নায়কোচিত ভঙ্গিমায় তার বক্তব্য শুরু করল—

“একটু আগেই আমি আমার বাবা স্বর্গীয় মিথিলেশ্বর সেনের দূরদৃষ্টির প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানালাম। একদিন যে এমন দুরতিক্রম্য জটিল কেসও সলভ করে ফেলতে পারব তা জেনেই হয়তো তিনি আমার নাম দিয়েছিলেন জটিলেশ্বর।

“যাই হোক, আর আমার গুণগান না গেয়ে জানিয়ে দিই যে গয়না, মূর্তি ও খুনের হাতিয়ার উদ্ধার হয়েছে এবং খুনিকেও নির্দিষ্ট করা গিয়েছে।

“এখানে বলে রাখি যে রহস্যোদ্ঘাটনের তাগিদে আমাকে চৌধুরীবাড়ির সংশ্লিষ্ট মানুষদের অনেক ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে হয়েছে। কিন্তু যেহেতু আপনারা সকলেই একে অন্যকে অন্তত দশ বছর ধরে জেনে-চিনে আসছেন সেহেতু আমি সকলের সামনেই ব্যক্তিগত আলোচনাগুলো করবার অনুমতি চেয়ে নিচ্ছি। কারও আপত্তি থাকলে নির্দ্বিধায় জানাতে পারেন।”

মিনিটখানেক সময় নিল জটিল। কারও আপত্তি নেই দেখে আবারও শুরু করল—

“বলা বোধহয় বাহুল্য প্রথম থেকেই একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিলাম। সেটা হল খুনি এবং চোর বহিরাগত নয়। কারণ চুরিটা মন্দিরের দরজা ভেঙে হয়নি আর খুনটাও মোটেই কাকতালীয় নয়। এও বলব যে অপরাধী এক বা একাধিক যতজনই হোক না কেন সে বা তারা প্রত্যেকেই পাকা অবরাধী নয় বলে নানারকম ভুলভ্রান্তি করে আমার কাজে প্রভুত সাহায্য করেছে।

“যেমন আমাদের মধ্যে উপস্থিত সুদর্শনতম পুরুষ কালকেতু চক্রবর্তীর কথাই ধরা যাক না,” জটিল কেতুর দিকে ফিরল, “তার জবানবন্দীতে কালকেতু আমাদের জানিয়েছে যে সে তার ঠাকুরদা নিহত দীননাথ চক্রবর্তীকে সিমেন্টের বেদীতে বসিয়ে রেখে অর্ধেন্দুবাবুর কাছে মন্দিরের চাবি চাইতে যাচ্ছিল, এমন সময় পিছন থেকে বাগানের মালী অমরনাথ দৌড়ে এসে তাকে দীননাথবাবুর মৃত্যু সংবাদ দেয়। কী, তা-ই তো, কেতু?”

কেতু হ্যাঁবাচক ঘাড় নাড়ে।

“কিন্তু কেতু তুমি নিশ্চয়ই জান যে ওই সময়ের মধ্যে তোমার দাদু খুন হয়েছেন, কোনও টু-মিনিট নুডল রান্না হয়নি?”

“মানে!” কেতুর গলায় ছদ্ম রাগ।

“মানেটা বোধহয় অর্ধেন্দুবাবুর বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হতে পারে। অর্ধেন্দুবাবু, কেতু বলেছে যে চাবিটা সে আনতে আপনার কাছে যায়নি। এই চাবির বিষয়ে আপনার কোনও বক্তব্য রয়েছে?”

অর্ধেন্দুবাবু সোজা হয়ে বসলেন, “আলবাৎ আছে। কেতু সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা বলছে। কেতু সেদিন সন্ধেয় আমার কাছে চাবি আনতে এসেছিল। সে চাবি আমি ওকে দিই।”

“ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন, অর্ধেন্দুবাবু।”

অর্ধেন্দুবাবু বললেন, “এ আর খুলে বলার কী আছে! আমার বিছানার একদিকে থাকে আমার সিন্দুক, আর একদিকে থাকে একটা কাঠের আলমারি। সেই আলমারির ড্রয়ারে থাকে মন্দিরের চাবি। ড্রয়ারটা সব সময় লক করা থাকে। এই ড্রয়ার আর সিন্দুক সহ আরও কিছু চাবির একটা গোছা সর্বদা আমার সঙ্গে থাকে। সেদিন কেতু আমার কাছে চাবি চাইতে এল আর আমি রোজকার মতো সেই চাবির গোছাটা ওর হাতে দিলাম। কেতু ড্রয়ার খুলে মন্দিরের চাবি বের করে নিয়ে আবার ড্রয়ার লক করে মূল চাবির গোছাটা আমার হাতে দিল।”

“অর্থাৎ মন্দিরের চাবি আপনি কেতুর হাতে দেখেছেন, তাই তো?” জটিল জিজ্ঞাসা করে।

“ওইভাবে তো আর লক্ষ করিনি, কোনওদিন করি না। মন্দিরের চাবি ছাড়া ড্রয়ার খুলে আর তো কিছু নেবার নেই। কেতু সেদিন অবশ্যই মন্দিরের চাবি নিয়েছিল।”

“কী কেতুবাবু, অর্ধেন্দুবাবু কি মিথ্যে কথা বলছেন, নাকি তুমি সত্যি কথা বলার শেষ একটা সুযোগ নেবে?”

কেতু মাথা নীচু করে ফেলল। তারপর বলল, “সেদিন অর্ধেন্দুদাদুর কাছে চাবি চাইতে গিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু ড্রয়ার ছিল ফাঁকা। আমি শুধু চাবিটা নিয়ে আসার অভিনয় করেছিলাম মাত্র।”

“কিন্তু কেন?”

“অর্ধেন্দুদাদু যদি আমাকেই দোষী বলে দেন সেই ভয়ে।”

“দোষী তো তুমি বটেই কেতু। এখনও তুমি মিথ্যে বলছ। বড্ড কাঁচা মিথ্যে। রাতের অন্ধকার ছাড়া ওই ড্রয়ার থেকে চাবি চুরি করা সম্ভব নয়। সকালে মনিকাদেবী ও ফুল্লরা অনেকের সামনেই রাধামাধবকে গয়না পরিয়েছেন। তারপর সেখানেই অর্ধেন্দুবাবুর হাতে চাবি দিয়েছিলেন মনিকাদেবী। সেই চাবি ড্রয়ারে রেখে ড্রয়ার লক করে বড় চাবির গোছা বরাবরের মতো নিজের কাছেই রেখেছিলেন অর্ধেন্দুবাবু। আমি দেখেছি যে তাঁর ঘরের দরজাতেও সব সময় ল্যাচ লাগানো থাকে এবং শব্দ না করে তাঁর ঘরে প্রবেশ অসাধ্য। আর, দিনের বেলায় অর্ধেন্দুবাবু ঘুমোন না। সুতরাং তুমি আবারও মিথ্যে বললে। একটা দুর্বল মিথ্যে বলে চেষ্টা করলে নিজেকে ও আরও কাউকে বাঁচাবার জন্যে। ও কী, মা? ওড়নাটা পুরোটাই খেয়ে ফেলবি নাকি রে?”

শেষ কথাটা জটিল বলেছে শর্মির দিকে দৃষ্টি রেখে। শর্মি ঝট করে তার ওড়নার খুঁট ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। জটিল তাপসীর দিকে তাকাল, “আচ্ছা তাপসীদেবী, আপনার মেয়ের এই দাঁত দিয়ে ওড়না কাটার স্বভাবটা কবে থেকে?”

“কী হচ্ছেটা কী! শর্মির স্বভাবের সঙ্গে এই কেসের কী সম্পর্ক?” নির্মলেন্দু চেঁচিয়ে উঠলেন।

“আস্তে নির্মলেন্দুবাবু,” জটিল হাত তুলল, “দয়া করে আমার কাজে সহায়তা করুন। ভুলে যাবেন না রাধামাধবের মূর্তির সঙ্গে শর্মির চুলে কাঁটা পাওয়া গিয়েছে।”

“ছোটবেলা থেকেই,” তাপসী বললেন, “কখনও রুমাল তো কখনও ওড়না। খুব টেনশন হলে বা কারও জন্য অপেক্ষা করলে ও এটা করে।”

“ভাগ্যিস করে।” এই বলে জটিল তার বুকপকেট থেকে দু’গাছা কমলা রঙের সুতো বের করে তুলে ধরল, “জেরায় শর্মিষ্ঠা জানিয়েছে যে খুনের দিন সে সবু্জ রঙের সালোয়ার কামিজ আর কমলা রঙের ওড়না পরেছিল। এই দুটো সুতো পাওয়া গিয়েছে মোরামের রাস্তার পাশে ঘাসের উপরে। সেখানেই তো শর্মি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল কালকেতুর জন্য। কী, তাই তো, শর্মি?”

“হ্যাঁ,” শর্মি হাঁপাচ্ছে, “কিন্তু আমি চুরি করিনি।”

“বেশ। এবার বাকিটা তুমি বলো।”

“কেতু আমাকে বলে রেখেছিল অপেক্ষা করতে,” শর্মি বলে, “কিন্তু কেন সেটা আমি বলব না।”

“বলতে হবেও না শর্মি, কারণ সেটা আমি জানি। তুমি শুধু তারপরে কী হল বলো।”

“কেতু দানীদাদুকে বসিয়ে রেখে আমাকে এসে বলল আর একটু দাঁড়াতে। অর্ধেন্দুদাদু ডাকছে, দেরি দেখলে সন্দেহ করবে। ও বাড়ির দিকে ছুটে গেল আর একটু বাদেই চলে এল হাতে চাবি নিয়ে। তারপর একটু কথাবার্তার পরে ও আমাকে চাবিটা দিয়ে বলল আমি যেন মন্দিরটা খুলে দিই আর ও বাড়ির দিকে যাবে, একটু কাজ আছে। আমি মন্দিরের দিকে এগোলাম। দানীদাদু উদাস হয়ে গান গাইছিল, শুনতে খুব ভাল লাগছিল বলে ডাকিনি। কিন্তু মন্দিরের দরজা খুলে দেখি — বিশ্বাস করুন — গয়না, রাধামাধব সব অদৃশ্য!”

ঘরে একটা অবাক হওয়ার রব উঠল। জটিল বলল, “কিন্তু তুমি তখনই চেঁচালে না কেন?”

সেখানে তখন আমি ছাড়া আর কেউ নেই। দানীদাদুও আপনমনে গান গেয়েই চলেছে। বুঝলাম সে আমাকে দেখতে পায়নি। ওই অবস্থায় লোক জানাজানি করলে সকলে তো আমাকেই সন্দেহ করত।”

“তাই তুমি ঝটপট আবারও তালায় চাবি দিয়ে, তালাটা ভাল করে তোমার ওই গেরুয়া ওড়না দিয়ে মুছে নিলে। তাই তো? তালায় কোনওরকম হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গিয়েছে তা হল তোমার সেই ওড়নারই একটা সূক্ষ্ম রোঁয়া।”

শর্মিষ্ঠা মাথা নীচু করে সম্মতি জানাল। জটিল বলল, “তুমি নিশ্চয়ই ততক্ষণে আন্দাজ করেছিলে যে কেতু তোমাকে ফাঁসাচ্ছে। তারপর তুমি ঘুরে পুকুরের পাশ দিয়ে পালিয়ে এলে আর পুকুরে ফেলে দিলে চাবিটা। ঠিক বলছি?”

শর্মিষ্ঠার মাথায় হাত। এটাও তার সম্মতিরই লক্ষণ।

“কিন্তু তাহলে চুরিটা করল কে? কীভাবেই বা করল?” এবার বললেন অক্ষয়।

“সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য অক্ষয়বাবু,” জটিল আবারও বরাভয়ের ভঙ্গিতে হাত তুলল, “তার আগে বরং একটু অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক।” আবারও কেতুর দিকে লক্ষ জটিলের, “কালকেতু, তুমি তোমার ইমেলবক্সের বেশ কিছু মেল সম্প্রতি ডিলিট করেছ। জানতে পারি সেগুলো কার?”

“তার সঙ্গে খুন আর চুরির কী সম্পর্ক?” কেতু বলে ওঠে।

“অ্যাইদ্দ্যাখো, সম্পর্ক না থাকলে আর বলছি কেন। আমি কি আজ আসর বসিয়ে পিএনপিসি করতে এসেছি? বেশ আমিই বলছি। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চকে তোমার মেলবক্স চেক করতে বলেছিলাম। সেই মেলগুলো ছিল তোমার সঙ্গে একজন মহিলার সম্পূর্ণ ইংরেজিতে প্রেমালাপ। তাঁর নাম লওরা ফ্লাওয়ার। “আপাতত শুধু জানতে চাই ভদ্রমহিলা কোথায় থাকেন।”

“লন্ডনে,” কেতুর জবাব।

“আচ্ছা! বিদেশিনী তো?”

“অবশ্যই।”

“অবশ্যই না, মি: কেতকুমার। আপনি আবারও মিথ্যে বলছেন।” এবার জটিলের চোখ বিদ্যুৎগতিতে শর্মিষ্ঠার উপর ঘুরে এল। শর্মির অবিশ্বাস ও ঘৃণাবহ দৃষ্টি কেতুর উপরে নিবদ্ধ। জটিল বলল, “সামলে শর্মি ম্যাডাম, সামলে। উওম্যান প্রপোজেজ আর ম্যান ডিসপোসেস। বুঝলে কিনা? হ্যাঁ, ব্যাপারটা সেরকমই ছিল অন্তত দু’বছর আগে অবধি, যতদিন না কেতুও ‘ডিয়ার এপ্রিল ফুল’ বলে তাকে সম্বোধন শুরু করল।”

“মানে?” শর্মি উঠে দাঁড়িয়েছে।

“মানেটা বোধহয় মনিকাদেবী একটু পরিষ্কার করতে পারবেন। কী মনিকাদেবী, আপনার মেয়ের জন্মদিন তেসরা এপ্রিল তো?”

“হ্যাঁ,” মনিকার ছোট্ট জবাবের ভঙ্গিতে মনে হল তিনি যেন আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে তাঁর অসন্তোষ ছিল।”

“লওরা ফ্লাওয়ার। ওলটালে কী হয়? ফুল-লরা। আসুন ম্যাডাম, সামনে একটু এগিয়ে আসুন, আপনার মুখটা দেখি।” জটিলের ডাকে ফুল্লরা বাধ্য হল জটিল আর সরোজের মাঝের ফাঁকা চেয়ারটায় এসে বসতে।

“দিল্লিতে গিয়েছিলে কি টুর্নামেন্ট খেলতে, কালকেতু? ফুল্লরার সঙ্গে ঘোরাঘুরিটা তো সেখানেই বোধহয় প্রথম হয়?”

“বেশ করেছি ঘুরেছি। আমি ফুল্লরাকেই ভালবাসি।” উঠে পড়েছে কালকেতু। রাগে তার ফরসা গাল লাল হয়ে উঠেছে। কপাল ঘেমে গিয়েছে, “বোকা তো, তাই ছোট থেকেই শর্মিকে ভালবেসেছিলাম। ফুল্লরা আমাকে মনেপ্রাণে চাওয়া সত্ত্বেও ওর দিকে ফিরেও তাকাইনি। আমার দাদুটাও বোকার হদ্দ। আমাকে আর শর্মিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে গেছে। আরে বাবা, কালকেতুর জন্য চিরকালই ফুল্লরা ছিল, থাকবেও। সেটাই তো স্বাভাবিক। আসল দুরদৃষ্টিটা ছিল আমার বাবার। আমার নাম কালকেতু তো বাবাই রেখেছিল। চৌধুরী বংশের পুরোহিত হিসেবে নামকরণগুলো তখন বাবাই করত। শর্মিষ্ঠা নামটা তাঁরই রাখা। কিন্তু কৃষ্ণকাকুর মেয়ে হতে তার নাম দুম করে ফুল্লরা রেখে দিল কি এমনি এমনি! এই নিয়ে অর্ধেন্দুদাদু কম রাগারাগি করেনি। কিন্তু কৃষ্ণকাকু-কাকিমা কখনও খারাপভাবে নেয়নি। তারা হয়তো ভেবেছিল আমরা দুজনে ভারতের দু’প্রান্তে আছি আর বছরে মাত্র একবার এ বাড়িতে দেখা। এতে কোনওরকম সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভবই না। কিন্তু ভুল করেছিলাম আমি। ওই শর্মি হারামজাদীটাকে ভালবেসে। প্রতিদানে কী দিল আমাকে? অন্য একটা ফালতু ছেলেকে ভালবাসতে শুরু করল! যাকে আমি সব দিলাম তার কাছে কি এটা পাওনা ছিল? তাহলে ফুল্লরা যে আমাকে ছোটবেলা থেকে চেয়ে এসেছে, আমি শর্মিকে ভালবাসি জানা সত্ত্বেও, তাকে আমি আমার ভালবাসা দেব না কেন!”

“শান্ত হও কেতু, বোসো,” জটিল কেতুর কাঁধ চাপড়াল, “আমিও কাউকে একদিন ভালবেসেছিলাম মনপ্রাণ দিয়ে। তোমার অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি। আচ্ছা এটা বলো তো, রতনের সঙ্গে শর্মির সম্পর্কটা তুমি কবে জানতে পারলে?”

“গত বছরের আগের বছরের ফেব্রুয়ারিতে।”

“কীভাবে জানলে?”

“লুকিয়ে শর্মির মোবাইলে আমি একটা চ্যাট কনভার্সেশন পড়ে নিয়েছিলাম। তারপরে আর কিছুই জানার বাকি ছিল না।”

 “তুমি কি রতনকে দেখেছ?”

“দেখবার দরকার নেই।”

“সত্যি? আমি যদি বলি সে এখানেই আছে তাহলেও না?”

“এখানে? কোথায় সে? দ্যাখান।”

হেসে উঠল জটিল, “দাঁড়াও, তোমায় দ্যাখাচ্ছি।” জটিল সরোজের দিকে তাকাতেই সরোজ উঠে গিয়ে বাইরে থেকে লম্বা সুঠাম এক মাথানীচু যুবক পুলিশকর্মীকে নিয়ে এল।

জটিল ঘোষণা করল, “বন্ধুগণ, পুলিশকে যে আপনারা গালাগাল দ্যান, তার একটা ছোট কারণ অবশ্যই আমাদের এই রতন শিকদার।”

“আরে! এইবার মনে পড়েছে কেন একে চেনা-চেনা লাগছিল,” এতক্ষণে মুখ খুললেন শর্মির বাবা নির্মলেন্দু।

“শয়তান!” কেতু ঘুসি বাগিয়ে উঠে দাঁড়াল।

“বোসো কেতু। জানি রতন তোমাকে খুব জ্বালিয়েছে,” রতনের ঘাড়ের কলার ধরে বলল জটিল, “তা রতনবাবু, শুধু সাসপেন্ডেই যদি খুশি থাকতে পারো, জেল যদি না চাও, তাহলে গুছিয়ে বলে ফ্যালো তোমার কাণ্ডকারখানা।”

একটু চুপ করে থেকে রতন বলল, “কলকাতায় নির্মলেন্দু স্যারের সিকিউরিটি কোম্পানীতে থাকতেই আলাপ হয়েছিল শর্মিষ্ঠার সঙ্গে। তখন সে গ্র্যাজুয়েশন পড়ছিল কলকাতায়। আমরা দুজন দুজনকে খুব ভালবেসে ফেললাম। শর্মিও বলে যে সে আমার মতো মানুষের জন্যই ওয়েট করছিল। কেতুর কথাও সে আমাকে বলেছিল। বলেছিল যে সে দানীবুড়োকে খুব ভালবাসে আর সেইজন্য দানীবুড়োর দিকে তাকিয়েই বাধ্য হয়ে কেতুর সঙ্গে অভিনয়টা চালিয়ে যাচ্ছে। বলেছিল কেতুও শর্মিকে খুব ভালবাসে।”

“তোমার পুলিশের চাকরিটা নির্মলেন্দুবাবুর সুপারিশেই হয়, তাই তো?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। তবে এত লোক নিয়ে উনি ডিল করেন তো, আমাকে মনে না থাকারই কথা।”

“এই কেসে তুমি কীভাবে জড়িত সেটা সবাইকে বলো।”

“মানে, স্যার, কয়েকটা ঘরে সার্চিংয়ের সময় আমি সুপারভাইজার ছিলাম। সরোজস্যারকে বললাম, ‘স্যার, শর্মিষ্ঠা ম্যাডামের ঘরটা অত সুন্দর গোছানো, ওরা তো সব ওলটপালট করে সার্চ করছে, আমি যদি একা ওই ঘরটা করি তাহলে লণ্ডভণ্ডটা কম হবে। স্যার মেয়েটার মুখ দেখে খুব মায়া লাগল। সবাই বলছে দানীবুড়োকে ও খুব ভালবাসত।’ তো, স্যার বললেন, ‘আচ্ছা যা ঠিক আছে, কর গিয়ে’।”

জটিল আড়চোখে সরোজের দিকে তাকাতেই সরোজের অপরাধী-চোখ দেওয়ালের উপরে একটা টিকটিকি দেখতে লাগল। “তারপর? একদম সত্যি করে বলবে।”

“স্যার, তারপরে শর্মির ঘরে আমি একটা কাগজে মোরা কষ্টিপাথরের রাধামাধবের মূর্তিটা পেলাম। আমি তখন ঘরে একেবারে একা। আমার সারা শরীর কাঁপছিল। স্যার, বিশ্বাস করুন, শর্মিকে আমি যতটা চিনেছি তাতে ওই কাজ ও কিছুতেই করতে পারে না। আর যদি ভুল করে চুরি করেও ফ্যালে, ওকে যে আমি ভালবাসি। কীকরে ওকে ধরা পড়তে দিই বলুন?”

“তাই তুমি ওই মূর্তি বের করে কেতুর ঘর আবারও সার্চ করার নাম করে সেখানে রেখে এলে, তাই তো?”

 “মানে, হ্যাঁ স্যার। আসলে এটাও ঠিক যে কেতুকে আমি ঠিক পছন্দ করতে পারতাম না। আমার বারে বারে মনে হত ওর চেহারা, ও গায়ের রং, ওর ওই ফটাফট স্মার্টলি ইংরেজি বলা, আবারও শর্মিকে ওর দিকে টেনে নিয়ে যাবে কোনওদিন।”

জটিল বলল, “বেচারা কেতু। তিন-তিনবার সার্চিং! ভাবা যায়!”

“কিন্তু এখনও তো বুঝতে পারছি না, শর্মি যদি চুরি না করে থাকে তাহলে করলটা কে? আর, মূর্তির সঙ্গে তো শর্মির চুলের কাঁটাও পাওয়া গিয়েছিল। তাহলে?” এবারে উত্তেজিত ফুল্লরার বাবা কৃষ্ণেন্দু।

“প্লিজ, আর একটু ধৈর্য ধরুন কৃষ্ণেন্দুবাবু। আমি তো সব কথাই বলতে এসেছি। কিন্তু আগেই যে বললাম, বিষয়টা অতীব জটিল। একেবারে টেনে ছাড়াতে গেলে আরও জট পাকিয়ে যাবে যে,” জটিল এবার দু’হাত তুলে থামাল। তারপর একটা মালপোয়া ছিঁড়ে মুখে ফেলে বলল, “আচ্ছা কেতু, তোমার ইলেকট্রনিক্সের দোকানে একটা কর্মচারী আছে, তাই তো?”

“হ্যাঁ।”

“সে আমাকে জানাল যে তুমি নাকি খুনের দুদিন আগে থেকেই দোকানে বসছ না। কারণটা জানতে পারি?”

“কারণ তো খুবই সোজা, চৌধুরিবাড়িতে এত বড় অনুষ্ঠান। এত কাজ—”

“কিন্তু খুনের দিন সকালে তো তুমি কয়েক মুহূর্তের জন্য সাইকেল নিয়ে তোমার দোকানে গিয়েছিলে। কীসের জন্য?”

“আপনি নিশ্চয়ই সেটাও জেনে ফেলেছেন।”

“আমি তো সবই জানি। কিন্তু তুমি সবাইকে জানাও।”

“একটা ব্লুটুথ হেডসেট।”

“ওই ছোট্ট মতো, এক কানে লাগায় যেগুলো?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“ওটা তোমার দরকার ছিল?”

“হ্যাঁ তো।”

“তা, অত সস্তার জিনিস নিলে কেন?”

“তাতে কী?”

“না, তোমাকে অত সস্তার জিনিস ব্যবহার করতে তো দেখি না, তাই আর কী। তোমার মোবাইলটা অত দামী, আর হেডসেট অত সস্তার?”

“হ-হতেই পারে।”

“হ্যাঁ, তা হয়তো পারে। তা, জিনিসটা দেখি?”

“কেক্‌-কেন?”

“কেন নয়, বলো কীভাবে। কারণ সেটা তুমি দেখাতে পারবে না।” এই বলে জটিল নিজের বুকপকেট থেকে এবার বের করল একটা ছোট কালো রঙের ব্লুটুথ হেডসেট, “সেটা এখন আমার কাছে, আর পাওয়া গিয়েছে ফুল্লরার ঘর থেকে।”

“তো দিয়েছে তো কী হয়েছে? আমার দরকার ছিল তাই কেতু এনে দিয়েছে”, ফুল্লরা উঠে জটিলের হাত থেকে হেডসেটটা নেবার মৃদু চেষ্টা করল।”

জটিল সেটাকে আবার পকেটে রেখে ফুল্লরাকে বসতে ইশারা করে বলল, “দরকার ছিল? তা বটে। ওইদিনই কেতুর সঙ্গে লুকিয়ে কথা বলার দরকার ছিল। তোমার এলোচুলে ঢাকা ওই এক-কানের হেডসেট, দিব্যি ঘুরতে ঘুরতে কথা বলবে, কেউ তোমাকে দেখে ফেললেও যাতে বুঝতে না পারে যে তুমি ফোনে কথা বলছ, তাই তো? আবার বলে দিয়ো না যে তুমি দিল্লি থেকে তোমার দু’কানের হ্যান্ডসফ্রিটা আনতে ভুলে গিয়েছ বলে ওটা দিয়ে কাজ চালাচ্ছ। কারণ ওই দামী হ্যান্ডসফ্রিটাও তোমার ঘর থেকে পাওয়া গিয়েছে আর তুমি যখনই মোবাইলে কথা বলো তখনই ওই দু’কানের হ্যান্ডসফ্রিটা দিয়েই কথা বলতে দেখা গিয়েছে। ফুল্লরা, আর লুকিয়ে লাভ নেই, তোমাদের জানিয়ে দিই যে তোমাদের প্রত্যেকেরই ফোনের কললিস্টও চেক করা হয়েছে। তাই আর সময় নষ্ট না করে গল্পটা বরং আমিই বলি, কোথাও ভুল বলছি মনে হলে আমাকে তোমরা যে-কেউ থামিয়ে দিতে পারো।”

পরপর তিন চুমুকে কাপের চা-টা শেষ করে জটিল নতুন উদ্যমে বলতে লাগল, “ফুল্লরা আর কেতু আগেই পরিকল্পনা করেছিল যে চুরিটা ফুল্লরা করবে, কেতু তাকে সাহায্য করবে আর তারা ফাঁসাবে শর্মিকে। সকালে দোকান থেকে ব্লুটুথ হেডসেট এনে ফুল্লরাকে দিয়েছিল কালকেতু। অর্ধেন্দুবাবুর ঘর থেকে মন্দিরের চাবি নিয়ে বেরিয়ে কেতু ঘরের বাইরে দাঁড়ানো ফুল্লরাকে ইশারা করে চলে যায়। যেতে-যেতে নিজের মোবাইল থেকে ফুল্লরাকে ফোন করে কল চলা অবস্থাতেই ফোনটা নিজের বুকপকেটে রাখে। তখন কলের অপরপ্রান্ত ফুল্লরার এলোচুল ঢাকা এক কানে। ফোনের আওয়াজে সে চুরি করার টাইমিং বুঝে নিচ্ছে।

“মোরামের রাস্তায় কথামতো অপেক্ষারত শর্মির সঙ্গে দেখা করল কেতু। পকেট থেকে বের করল একটা কাগজ। এই কাগজটা,” এই বলে জটিল যেটা তুলে ধরল সেটাকে ঠিক একটা কাগজ বলা চলে না। একটা বড় পাতার উপরে আর একটা কাগজের অনেকগুলো কুচি জিগশ্য পাজলের মতো করে আঠা দিয়ে বসানো হয়েছে, “এটা হল একটা ইউরিন রিপোর্ট। এতে দেখা যাচ্ছে যে শর্মি অন্তঃসত্তা। দেড় মাসের।”

ঘরে এবার রীতিমতো চাঞ্চল্য। সরোজকে দায়িত্ব নিতে হল সকলকে শান্ত হয়ে বসানোর।

“বাবা কে, সে প্রশ্নে আমি যেতে চাই না,” জটিল বলল। তবে আমার মনে হয়েছে শর্মি আর কেতু দুজনেই মনে করেছিল যে এই বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়ে দুজনকে দূরে সরে যেতে সাহায্য করবে। প্রসঙ্গত আর একটু ভালভাবে জানিয়ে দিই যে, কেতু জানত শর্মি তাকে ভালবাসে না, কিন্তু শর্মি জানত না যে কেতু তাকে ভালবাসে না। আবার তারা প্রত্যেকেই কিন্তু অন্য একজনকে ভালবাসে। কেতু ফুল্লরাকে আর শর্মি রতনকে। এই ইউরিন রিপোর্টটা আগেরদিন কেতু নিয়ে এসেছিল কাছের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। শর্মিকে সেটা দেখানোর ছুতো করেই চুরি-খুনের দিনে মোরামের রাস্তায় ডেকেছিল সে। এই রিপোর্টের টুকরোগুলো পাওয়া গিয়েছে কেতুর ঘরের পিছনের একটা ঘন ঝোপের নীচ থেকে।

“যাইহোক, শর্মিকে রিপোর্টটা দেখিয়ে কেতু তাকে মন্দিরের চাবি দিয়ে মন্দির খোলার কথা বলে। এই কথোপকথন যখন চলছে তখন ফুল্লরা ভিতরের ঘর দিয়ে মন্দিরের ভিতরে ঢুকে মূর্তির গা থেকে গয়না খুলতে শুরু করেছে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে সে সব গয়না খুলতে পারছিল না, তাই ঝটকা দিয়ে-দিয়ে খুলছিল। এতে অনেক গয়না বেঁকে আর ছিঁড়েও গিয়েছে। শর্মিকে ছেড়ে দিয়ে কেতু ফোনে তার গতিবিধি কমেন্ট্রি করতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে ফুল্লরা রাধামাধবের মূর্তিই উঠিয়ে নিয়ে চলে আসে গন্ধমাদনের মতো। অন্যঘরগুলোয় সবাই দরজা এঁটে ঘুমোচ্ছে। শুধু শর্মির ঘর খোলা আর ফাঁকা। মূর্তির গা থেকে সমস্ত গয়না ঝটপট খুলে ফুল্লরা মূর্তিটা একটা কাগজে মুড়ে শর্মির ঘরে রেখে আসে।”

“আর, গয়না?” অনেকেই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল।

“ওহো, দেখেছেন কাণ্ড! আপনাদের তো বলাই হয়নি,” জটিল ভুলে যাওয়ার ছদ্ম অভিনয় করল। তারপর বলল, “আজ সার্চ করে গয়নাগুলো পাওয়া গিয়েছে অর্ধেন্দুবাবুর সিন্দুকের মধ্যেকার একটা চোরা খুপরিতে।”

মুহূর্তে সারা ঘরে নেমে এলো বিষাদ ও নিস্তব্ধতার কালো মেঘ। সেই মেঘের মধ্যে দিয়ে একজনই প্রতীয়মান হয়ে জটিলের কথার সত্যতা সর্বাংশে স্বীকার করে নিচ্ছিলেন — নুয়ে পড়া দেহ নিয়ে কপালে করাঘাতরত অর্ধেন্দু দত্ত চৌধুরি স্বয়ং।

একটু সময় দিয়ে জটিল আবার বলতে থাকে, “এমনিতেই এমন সম্ভাবনার কথা পুলিশ ভাবতে পারেনি বলেই অর্ধেন্দুবাবুর ঘর সার্চ করা হয়েছিল দায়সারাভাবেই। তাঁর সিন্দুক খুলে দেখা হয়েছিল, কিন্তু তা চোখ বোলানোরই সামিল। তার উপরে গতকাল যখন আমি বললাম যে গয়না এ বাড়িতে নেই, তখন অর্ধেন্দুবাবু অনেকটাই নিশ্চিন্ত হয়ে পড়েছিলেন।”

“কিন্তু কেন বাবা, কেন?” নির্মলেন্দু বলে ওঠেন।

জটিল বলল, “কারণটা কিন্তু বোধগম্য, নির্মলেন্দুবাবু। আপনাদের সে জমিদারী তো আর নেই। অবস্থা ক্রমশই পড়তির দিকে। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা প্রতাপনারায়ণ যে সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন, তার বেশিভাগটাই বিলাসিতায় খুইয়েছেন অর্ধেন্দুবাবু নিজে। তাছাড়া একটা জিনিস অর্ধেন্দুবাবু ছাড়া কেউই জানতেন না। এক জানতেন, নিহত দীননাথ চক্রবর্তী আর বহুকষ্টে জেনেছেন এই অধম জটিলেশ্বর সেন। সেটা হল এই মন্দির আর পুকুর কিন্তু দেবত্র সম্পত্তি করে গিয়েছিলেন প্রতাপ। একমাত্র এই বাড়িটাই যা অর্ধেন্দুবাবুর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। অর্থাৎ ওই মন্দিরের যাবতীয় সম্পত্তি আর পুকুর শুধু ভোগ করতে পারবেন তিনি আর তাঁর বংশধর, কিন্তু বিক্রি করতে পারবেন না। তাই, মূর্তির গয়না যদি চুরি করে বিক্রি করে ফেলা যায় তবে হাতে বিপুল অর্থও আসবে আবার লোকজনের সহানুভূতি কুড়িয়ে রাধামাধবকে ইমিটেশনের গয়না পরিয়েও রাখা যাবে। কী, ঠিক বলছি তো, অর্ধেন্দুবাবু?

“ভক্তরাই যদি খেতে না পায়, তবে ভগবানের কি স্বর্ণালঙ্কার পরে থাকা উচিত?” এবার কথা বললেন অর্ধেন্দুবাবু।

জটিল মুচকি হেসে বলল, “সে আপনি আর আপনার ভগবান বুঝবেন। ঘটনা হচ্ছে, আমাকে পারুন বা না পারুন, ফুল্লরাকে আপনি এটা ভালই বোঝাতে পেরেছিলেন। ফুল্লরা আবার সেই সুযোগটা লাগাল আর একটা কাজেও। এই চুরিতে কেতুর থেকে সাহায্য নিল। ঠিক করেছিল পরে তার ঠাকুরদাকে জানাবে কেতুর মহানুভবতার কথা। কেতুকে হিরো বানিয়ে দেবে। আর, ঠাকুরদা একবার রাজি হলেই ফুল্লরা আর কালকেতুর বিয়ে আটকায় কে! কী, তাই তো ফুল্লরা?”

ফুল্লরা উপরে-নীচে ঘাড় নাড়ল।

জটিল কৃষ্ণেন্দুর দিকে ঘুরল, “কী, কৃষ্ণেন্দুবাবু, আপনার প্রশ্নের উত্তর পেলেন তো?”

কৃষ্ণেন্দুবাবু নড়েচড়ে বসে তাঁর বিস্ময় লুকোলেন। গলা ঝেড়ে বললেন, “নিজেদের জিনিস আমরা নিজেরা নিয়ে রেখেছি সেটা তো আর চুরি নয়। কিন্তু খুন? খুনটা কে করেছে?”

হাসল জটিল, “দেবত্র সম্পত্তি চুরি করা, পুলিশকে চরম বিভ্রান্ত করা, অন্যকে চুরিতে উসকানি দেওয়া, প্রমাণ অনত্র পাচার করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা  — এসবের কোনটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কোনটা আদৌ অপরাধ সেসব তো আইন ঠিক করবে কৃষ্ণেন্দুবাবু। আমি তো সত্যানুসন্ধান করে পুলিশকে সাহায্য করছি মাত্র। তবে হ্যাঁ, মানুষ খুনটা সর্বোতভাবেই অপরাধ বটে। তাই সে প্রসঙ্গে অবশ্যই আসব। তার আগে নিহত ব্যক্তির সম্বন্ধে কিছু বলতে পারেন? দীননাথ কি তুকতাক জাতীয় কিছু করতেন?”

কৃষ্ণেন্দু বললেন, “ছোটবেলায় দানীজেঠু একটু কবিরাজী করতেন বটে। ইদানীং শুনেছি তার সঙ্গে পুজোআচ্চা মিশে গিয়ে একটা তুকতাকের রূপ নিয়েছে। যদিও আমি মনে করি তুকতাক আলাদা জিনিস। পুরোপুরি লোক ঠকানো। দানীজেঠু পুজোআচ্চাটা নিষ্ঠাভরে করতেন। আবার, যেটুকু কবিরাজী করতেন সেটাও মন দিয়েই।”

“মুশকিল কী জানেন, আপনি তুকতাক না ভাবলেও অনেকেই ভেবে বসেন। বিশেষত শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত কিছু হতভাগ্য মানুষ। তাঁরা এসবকে তুকতাক, তান্ত্রিকশক্তি ইত্যাদি ভেবে ফ্যালেন। এই যে বাগানের মালি অমরনাথ।  বছরের পর বছর তার সন্তান হয় না। প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ হতে চলেছে, বংশে বাতি দেবার কেউ নেই। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ত্রীয়ের প্রবল অনুরোধে একটি ছেলেকে সে দত্তক নিল। কিন্তু নিজের রক্ত যে এক আলাদা জিনিস। এদিকে বয়স আবার ষাট ছুঁই-ছু্ঁই। তার অবস্থা দেখে পুরোহিত দীননাথ অনেকদিনই তাকে অনুরোধ করেছে একটা বিশেষ শিকড় বেটে খাওয়ার। কিন্তু অমরনাথের মেল ইগোতে বড়ই বাধত। তা, একদিন সে চোখ বুজে খেয়েই নিল। তার স্ত্রী তখন এখানেই ছিল। ম্যাজিকের মতো ফল। বছর না ঘুরতেই কোলে একটা ফুটফুটে সন্তান জন্মাল তাদের উড়িষ্যার বাড়িতে। শিকড় খাবার কথা বউকে না জানালেও কৃতজ্ঞতাবোধটাও একেবারে হারিয়ে ফেলেনি অমরনাথ। পালিত পুত্র ও নিজের দু’বছরের পুত্র সহ সস্ত্রীক এসে পড়ল দীননাথের পায়ে। গাছের ফলটা, জমির শাকটা যতটা যা পারল উপহার দিল। নিজের ছেলের নামকরণ করাল দীননাথকে দিয়ে। কেদারনাথ।

“সন্দেহের উদ্রেক হতে অমরনাথের স্ত্রী আলাদাভাবে দীননাথের সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞাসা করল। দীননাথও সরল মনে সব কথাই জানাল। আর এও বলল যে তাদের শিশুপুত্র কেদারের লক্ষণ ভাল নয়, তাই আর এক ধরনের বিশেষ শিকড় নিয়মিত সেবন করানো দরকার শিশুটিকে।

“অমরনাথের স্ত্রী তার পুত্রকে নিয়ে উড়িষ্যা ফিরে গেল। অমরনাথকে সে শিকড়ের কথা কিছুই জানাল না। শিকড় বেটে সে নিয়মিত খাওয়াতে লাগল তার ছেলেটাকে। কিন্তু এক বছর বাদে তিন বছরের সেই বাচ্চাটা নানারকম অসুখ-বিসুখে ভুগতে লাগল। ছায়ার মতো অসুখ তার সঙ্গে লেগে থাকতে লাগল সর্বদা। একদিন ভয় পেয়ে অমরনাথের বউ সব কথা বলে দিল তার স্বামীকে। অমরনাথ তাকে খুব মারধর করল। বলল এ নিশ্চয়ই দীননাথেরই ষড়যন্ত্র। সে কোথায় যেন শুনেছে যে, তান্ত্রিক-কাপালিকেরা নতুন শিশুর জন্ম দিয়ে এইভাবেই বলির জন্য তৈরি করে। এখন তো আর সর্বসমক্ষে বলি দেওয়া যায় না, তাই এইভাবে দূর থেকেই বাণ মেরে বলি।

“দীননাথবাবু খুন হওয়ার কদিন আগে থেকেই অমরনাথের ছোট ছেলেটা কঠিন জ্বরে ভুগছিল। একশো তিন-চার জ্বর প্রায় প্রতিদিনই। অমরনাথ তার দেশের বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করছিল। এমন সময় অন্য এক অভাবনীয় সুযোগ এসে গেল তার।

“সেদিন গোধুলিবেলায় যখন দীননাথকে একটা পাথরের বেদিতে হেলান দিয়ে বসিয়ে রেখে কালকেতু চলে গিয়েছে, শর্মিষ্ঠা চাবি নিয়ে মন্দিরের দরজা খুলতে এসেছে, তখনই গোলাপের চারায় জল দিতে আসছিল অমরনাথ। দরজা খুলে শর্মি মূর্তি আর গয়না না দেখতে পেয়ে হতবাক হয়ে মুখে ওড়না চেপে যখন দাঁড়িয়ে পড়ল, তখনই তাকে আড়াল থেকে লক্ষ করল অমরনাথ। সে বুঝল যে রাধামাধব অদৃশ্য এবং শর্মি তাড়াতাড়ি দরজায় তালা লাগিয়ে কেটে পড়ার তাল করছে। অর্থাৎ একটা চুরি ঘটে গিয়েছে এবং এই চুরি দেখে নেওয়ার শাস্তিস্বরূপ দানীবুড়োর খুন হওয়াটাই অতি স্বাভাবিক ঘটনা। শর্মি পুকুরের গা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সে দীননাথের পিছনে এসে দাঁড়াল, আর দীননাথ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার সঙ্গে-সঙ্গেই তার চুলের মুঠি আগাছার মতো করে  ধরে সিমেন্টের বেদিতে এক মোক্ষম বাড়ি। দীননাথের লাশের ছবি আমি দেখেছি। বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মাথা জুড়ে বড় বড় সাদা চুল ছিল। তেল চুপচুপে করে পেতে চুল আঁচড়াতেন তিনি। কিন্তু তাঁর মৃতদেহের মাথার মাঝখানের এক গোছা চুল খাড়া আর জড়ো হয়ে ছিল।

“হ্যাঁ, খুনেই অস্ত্র বলতে ওই সিমেন্টের বেদিই। তবে আঘাত যতই হোক, মৃত্যুর মতো গুরুতর ছিল না। রক্তক্ষরণ হয়েছে, তবে ধীরে। তাই বেদিতে রক্তের কোনও চিহ্ন নেই। কিন্তু ওই আঘাতই দীননাথের দুর্বল হৃদয়ের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলেছে যে, দীননাথের মৃত্যুর কারণ হার্টঅ্যাটাক।

“শর্মিকে ছেড়ে গিয়ে কেতু কিছুক্ষণ চৌধুরি বাড়ির দিকে যাবার অভিনয় করল।  ঘরে গিয়ে সামান্য অপেক্ষা। তারপর আবার সে ধীরে ধীরে মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে মোরাম রাস্তা ধরে। কৌতূহলটা আর যাবে কোথায়! কিন্তু সামনে কারও দৌড়ে আসার শব্দ পেয়েই সে আবার উলটোদিকে অর্থাৎ বাড়ির দিকে ঘুরল। অমরনাথ দৌড়ে এসে কেতুকে খুনের খবর দিল। খুনটা তো সে নিজেই করেছে, কাজেই কেতুর গতিবিধি নিয়ে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকবেই বা কী করে?"

এবার মেঝে ছেড়ে দাঁড়িয়ে বাগানের মালি অমরনাথ। সে তোৎলাচ্ছে, “এ-এঠো কঁড় হ্যালা? কুথাকে বাব্‌-বাত বানিয়ে বলছেন? আমাকে ভি প্রমান দিতে হিব।”

আর পারল না জটিল। একেবারে হো-হো করে অট্টহাস্যে বৈঠকখানা কাঁপিয়ে দিল, “প্রমাণ? আরে, এই বিজ্ঞানের যুগে প্রমাণ বের করা কি খুব কঠিন কাজ ভাব নাকি অ্যাঁ! আচ্ছা বেশ, একটা নয়, দুটো প্রমাণ দিই তাহলে। শর্মির সাধের গোলাপ চারাগুলো, যেগুলোতে তোমার উপরে জল দেওয়ার ভার ছিল, সেগুলোর কয়েকটা তো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে দীননাথবাবুর সঙ্গেই। এছাড়া আরও কয়েকটা অক্কা পেয়েছে তোমার বাঁপায়ের চাপে। সেই ছাপ কি তোমার পায়ের সঙ্গে মিলছে না মনে করেছ? ঝুঁকে পড়ে দীননাথবাবুর নাকের নীচে হাত দিয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা যখন দেখছিলে তখন বোধহয় সেটা তুমি খেয়াল করোনি, তাই না?

“পায়ের ছাপটা জোরালো প্রমাণ নয় বলছ নাকি? আচ্ছা বেশ। তাহলে তোমার ওই হাতের দাগটা? হ্যাঁ হ্যাঁ, ডানহাতের কবজির উপরের ওই আঁচড়টার কথাই বলছি।”

“উটো গুলাবের কাঁটারো দাগো অছি,” গোল স্টিকিংপ্লাস্ট লাগানো কবজিটা ঝট করে দেখে নিয়ে বলল অমরনাথ। স্টিকিংপ্লাস্ট ছাড়িয়েও আঁচড় সামান্য বেরিয়ে আছে।

“গোলাপ? বটে! এত বছর ধরে তোমাকে স্টিকিংপ্লাস্ট দিয়ে আঁচড় ঢাকতে কেউ দেখেছে কি না জিজ্ঞাসা করো তো। আমি করেছি। না, তারা দ্যাখেনি। তোমার মনে ভয় আছে বলেই তুমি ওটা লাগিয়েছ। না না, ওটাকেই আমি প্রমাণ বলছি না। আমি শুধু বলছি যে ওটা গোলাপের কাঁটায় নয়, দীননাথবাবুর নখের আঁচড়। আমি জেনেছি যে তাঁর হাতের নখ যথেষ্ট লম্বা ছিল। প্রাণ বেরোনোর আগের মুহূর্তে তিনি তোমার কবজি আঁকড়ে ধরেছিলেন। ওই নখের আগায় লেগে থাকা ময়লাটুকুর ডিএনএ টেস্ট করলেই বেরিয়ে যাবে তিনি কাকে আঁচড়েছিলেন। এখন, তুমি যদি দীননাথ-খুনের কথাটা নিজের মুখে স্বীকার করো তাহলে ডিএনএ টেস্টের খরচটাও বাঁচে আর আর হয়তো তোমার ফাঁসিটাও। তা না হলে আমার তো মনে হয় না ঠান্ডা মাথায় এই খুনটাকে বিচারক যাবজ্জীবনের উপর দিয়ে ছেড়ে দেবেন বলে। এখন, সিদ্ধান্তটা তোমার।”

“মুইকে মাফো করি দিয়েন বাবু। বুড়োটকে রাগেরো মাথায় খুনঅ করি ফেলুচি।” কেঁদে পড়ল অমরনাথ। পা ছাড়িয়ে সরোজের দিকে ইঙ্গিত করে জটিল উঠে পড়ল।

“একটা প্রশ্ন আছে, জটিল। সকলের ধোঁয়াশা কাটিয়ে যা”, এবার বাধাটা এল স্বয়ং সরোজের কাছ থেকে। জটিল ঘুরে বলল, “বেশ, বল।”

“তুই বলছিস যে রাধামাধবের মূর্তিটা মার্ডারও ওয়েপেন নয়? তাহলে ওতে ওই রক্তের দাগটা এল কোত্থেকে?”

“আরে, সেইজন্যই তো সর্বাগ্রে তোমার ওই গুণধর রতনটিকে সাসপেন্ড করা দরকার। ব্যাটা খুনের দায়টাও কেতুর উপর চাপানোর জন্য দীননাথের সামান্য একটু রক্ত নিয়ে মাখিয়ে দিয়েছিল ওই মূর্তির আগায়। কী, তাই তো?” রতনের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করে জটিল। রতন মাটিতে প্রায় মিশে গিয়ে সম্মতি জানায়।

জটিল বলল, “এই ধরনের ডেঞ্জারাস কাজ যে করতে পারে, সে কিন্তু খুনের মতো জঘন্য অপরাধও যেকোনও দিন করে ফেলতে পারে। আমার মনে হয় রতনের কাউন্সেলিং করা দরকার।”

 

* * * * * *

দুদিন বাদে নিজের ঘরে আরাম করে বসে ড্রিঙ্ক করছে জটিল। এইমাত্র সরোজ এসেছে। তাকেও একটা পেগ বানিয়ে দিয়েছে সে। দু’চুমুকের পরে একটু উশখুশ করতে-করতে সরোজ কথাটা পেড়েই ফেলল।

“বলছিলাম কী জটিল, সেদিন সকলের সামনে বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারিনি। লজ্জার ব্যাপার। আমার মনে কিন্তু এখনও কয়েকটা প্রশ্ন রয়ে গেছে।”

“আবারও প্রশ্ন? এসো তবে, বধো এ পরান।”

সুযোগ পেয়ে জটিল গ্লাস রেখে গুছিয়ে বসল, “আচ্ছা, অমরনাথের ব্যাপারে এত জানলি কী করে?”

“অতি সহজে। উড়িষ্যার আমার এক পুলিশ বন্ধুর সাহায্য নিলাম। ফোনে শিখিয়ে-পড়িয়ে দিলাম। সে সাদা পোশাকে অমরনাথের স্ত্রীয়ের বাড়ি গেল। দীননাথের মৃত্যুসংবাদ দিল। আর ব্যাস্‌, গড়গড় করে স্মৃতিচারণ করতে লেগে গেল বউটা। অবশ্য দীননাথ যে খুন হয়েছে তাকে জানানো হয়নি। তাহলে পেট থেকে কটা শব্দ বেরোত কে জানে। আর একটা ব্যাপার যেটা সুবিধে করে দিয়েছে সেটা হল উড়িষ্যার ওই প্রত্যন্ত গ্রামে মোবাইলের টাওয়ার পৌঁছয় না। তা না হলে, বলা তো যায় না, অমরনাথ হয়তো শিখিয়ে দিতে পারত। তা-ই তো বাড়ি যাবার জন্য ছটফট করছিল।”

 “আর, রাধামাধবের সঙ্গে যে শর্মির চুলের কাঁটা বেরোল, সেটা?”

“ভাই সরোজ,” জটিলের গলায় চরম অবজ্ঞা, “এসব শিশুসুলভ প্রশ্ন কেন যে করিস! আগের দিন রাতে শর্মি যে কেতুর বাড়ি গিয়েছিল সেটা তো শুনেছিলিস। কাঁটাটা সে ফেলে এল, আর সেটা পেয়ে কেতুও রাধামাধবের সঙ্গে রেখে দিল। কেল্লা ফতে। ভাল করে শোন, অতজনের মধ্যে সবচেয়ে ধুরন্ধর কিন্তু ওই কেতকুমার। রতন সার্চ করে যাবার পরে সে কাগজের মোড়া মূর্তিটা তার ঘরে পেয়েছিল। তারপর থেকেই সে ইচ্ছে করে এমন ভাব করতে থাকে যেন নিজের ঘরে কিছু একটা লুকোচ্ছে পুলিশের কাছ থেকে। আসলে সেটা ছিল ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করারই একটা চাল। পুলিশ মূর্তিটা পেল, ওকে অ্যারেস্ট করল। মূর্তির সঙ্গে শর্মির চুলের কাঁটাও পেল। আর কেতুও এমন একটা ভান করল যেন সে শর্মিকে ভালবাসে বলে তাকে বাঁচাতে চাইছে। একটা কথা বোঝ যে, কেতুর কিন্তু ধরা পড়ে যাবার খুব একটা ভয় ছিল না। দাদুকে হারিয়ে আর শর্মিষ্ঠার কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা পেয়ে কেতু হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া। সে আসলে শর্মিষ্ঠাকে সত্যিই প্রাণ ঢেলে ভালবেসেছিল। কেতু একের পর এক পুলিশকে যেসব মিথ্যে বলে চলেছিল সেগুলো তোদের খুব কাঁচা মনে হতে পারে, কিন্তু আমার আদৌ মনে হয়নি। আসলে কেতু ইচ্ছে করেই ওরকম কাঁচা মিথ্যেগুলো বলছিল। যাতে অবশেষে ও যে শর্মির অপরাধ নিজের মাথায় নিতে চাইছে এরকম ধারণাটাই হয়। এদিকে দ্যাখ, ওই ভয়ে চাবি ফেলে দেওয়া ছাড়া শর্মিষ্ঠা আর কোনও অপরাধই করেনি।

“আচ্ছা, এবার লাস্ট কোয়েশ্চেন,” সরোজের ভুরু এখনও সোজা হয়নি, “ফুল্লরার বিরুদ্ধে জোরালো কোনও প্রমাণ?”

“সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স, উইটনেস এসব তো আছেই। জোরালো একটা প্রমাণও আছে বটে। মূর্তিটার সঙ্গে তুই পেয়েছিস শর্মির একটা চুলের কাঁটা। আর আমি পেয়েছি আরও একটা জিনিস।”

“কী সে জিনিস?”

“পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে তোর ফেভারিট কোন দুটো বল”, জটিল জিজ্ঞাসা করে।

“দৃষ্টি আর ঘ্রাণ।”

“বেশ, তবে এই দ্যাখ।” পকেট থেকে একটা ট্যাবলেট রাখার ছোট্ট সাদা কাগজের প্যাকেট বের করল জটিল। প্যাকেট থেকে অদৃশ্য কিছু একটা বের করে ইঁদুরের লেজ ধরার মতো করে তুলে ধরে বলল, “দেখতে পাচ্ছিস?”

চোখ সরু করে আধ মিনিট তাকিয়ে থেকে সরোজ বলল, “হ্যাঁ, তা পাচ্ছি বটে।”

“কী রং বল তো?”

“কাল— না না, কালো নয়, বাদামী।”

“হুম। এবার চোখ বুজে এটা নাকে ঠেকিয়ে শোঁক তো, দেখি তোর ঘ্রাণশক্তির বহর।”

সেটা জটিলের কাছ থেকে নিয়ে দু’চোখ বুজে এক নাকের ছিদ্র বন্ধ করে আর এক নাকের ছিদ্রে ঠেকিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে এক মিনিট ধরে সুগভীর নিঃশ্বাস নিল সরোজ।

“কী রে সরোজ? কিছু পেলি?”

“হ্যাঁ পেলাম তো। বিরক্ত করছিস কেন!” সরোজের মনোযোগে বন্ধ দু’চোখে এখন তৃপ্তির ইঙ্গিত।

“কী পাইলে হে নারীবাজ সরোজ?”

“বৈঠকখানায় তোর আর আমার মাঝে এসে বসা এক অপরূপ সুন্দরী যুবতীর মেহেন্দি করা চুলের গন্ধ। লওরা ফ্লাওয়ার।”

সমাপ্ত

 

 

 

 

 

 

 

 

 

কাল-ঘুর্নি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments