বিচিত্র আরও কিছু সবজির ভাণ্ডার নিয়ে ফিরে আসা গেল দ্বিতীয়বার। আশা করি বন্ধুরা গতবারের দেওয়া খাবারগুলি খেয়ে উপভোগ করেছেন এবং সুস্থ আছেন। গতবার যেরকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সেই মত এবার কিছু খাঁটি পশ্চিমী স্টাইলের রান্নার কথা বলব। তবে শুরু করি বাঙালী কায়দার কয়েকটা রান্না দিয়েই।

কচু আমার অতি প্রিয় সবজি। অথচ এখানে ভাল কচু পাওয়া যায়না। কচুর মত যে জিনিসটি পাওয়া যায় সেটা কখনো খেয়ে দেখিনি, যদি কুটকুটে হয় এই আশঙ্কায়। তবে সম্প্রতি কচু গোত্রের, অথচ কুটকুটেপনা-বিহীন আর একটি জিনিসের সন্ধান পেয়েছি। এর নাম ইয়ুকা (Yuca)। দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু খেতে বেশ। অনেকটা আলুর মতই খেতে, তবে আলুর থেকে অনেক বেশি ক্ষারকীয়। বলা যেতে পারে আলু, কচু এবং আরও কিছুর এক জগাখিচুড়ি। এটি লাটিন আমেরিকান রান্নার ঘরানায় অত্যন্ত সমাদৃত। মোটামুটি যেকোনো মার্কিনি দোকানেই কিনতে পাবেন। কিনে সঙ্গে সঙ্গে রান্না করে ফেলাই ভাল। বেশিদিন রেখে দিলে খুব সহজে নষ্ট হয়ে যেতে চায়। এটি রান্না করার একটা সহজ উপায় বলি। প্রথমে ছাল ছাড়িয়ে ফালি ফালি করে কাটুন। নিখুঁতভাবে কাটার দরকার নেই, কারণ আমরা পরে পিসগুলোকে ভেঙ্গে দেব। এরপর প্রথমে প্রেসারে একটু সিদ্ধ করে নিন। মনে রাখবেন ইয়ুকা আলুর থেকে অনেক বেশি শক্ত, তাই একটু বেশি সময় লাগবে সিদ্ধ হতে, তবে একেবারে গলিয়েও ফেলবেন না। সিদ্ধ হবার পর পিসগুলির মাঝখানের শির-টাকে ছাড়িয়ে নিতে হবে। নইলে খাবারের মধ্যে ওটা শক্ত একটা ডাঁটির মত রয়ে থাকবে। তবে সবসময় ইয়ুকাতে এই শিরটা থাকেনা। না থাকলে আপনার খাটনি কমে গেল কিছুটা। এরপর সরষের তেলে অনেকটা পেঁয়াজ কুচি, সামান্য রসুন কুচি ভেজে তার মধ্যে সিদ্ধ ইয়ুকাটা নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না পিসগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়। পরে যোগ করুন কাঁচালঙ্কা কুচি, অল্প জিরে গুঁড়ো (জিরে ভাজা গুঁড়োও ট্রাই করে দেখতে পারেন) আর পরিমাণ মত নুন। আরও কিছুক্ষণ নেড়ে নামিয়ে নিন আর গরম গরম খেয়ে দেখুন। শুধু এটাই একটা ডিশ হিসেবে খাওয়া যায়। ভাতের সঙ্গেও খেতে পারেন, তবে ইয়ুকার নিজের মধ্যেই প্রচুর কার্ব থাকে, তাই শুধু এক বাটি ইয়ুকা দিয়েই ডিনার করে ফেলা যায়।

       

                                    Yuca                                                                           Avocado

আমার লিস্টের পরবর্তী সদস্যের নাম অ্যাভোকাডো (Avocado)। একে অবশ্য সবজি না বলে ফল বলাই ভাল, কারণ একে রান্না করে খাওয়া হয়না, কাঁচাই খাওয়া হয়। আমেরিকান এবং মেক্সিকানরা নানারকম ভাবে আসল খাবারের পাশে অ্যাভোকাডো খেয়ে থাকেন। তবে আমি যেভাবে খাই সেটাকে প্রায় সবজি হিসেবেই খাওয়া বলা চলে। প্রথমে খুব কাঁচা নয় এবং খুব পাকা নয় এরকম একটি মাঝারি পাকা অ্যাভোকাডো জোগাড় করুন। কতটা পাকা পারফেক্ট সেটা বুঝতে গেলে অ্যাভোকাডোটা অল্প টিপে দেখতে পারেন। যদি সামান্য নরম বোধ হয়, তার মানে আপনার বাছা অ্যাভোকাডোটা একদম ঠিকঠাক। এই অবস্থায় খোসার রঙ হবে কালচে সবুজ। যদি বাজারে এরকম অ্যাভোকাডো না পান তাহলে কাঁচা সবুজ অ্যাভোকাডো কিনে দুদিন ফ্রিজের বাইরে রেখে দিলেই পারফেক্ট অবস্থায় চলে আসবে। এবার সাবধানে খোসা ছাড়ান। হাত দিয়েই ছাড়াতে হবে, পীলার ব্যবহার করার চেষ্টা করলে ঠকবেন। ভিতরের বীজটা ফেলে দিন, বাকি অংশটা স্রেফ সরষের তেল, কাঁচা পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে মেখে ফেলুন আলুভাতে মাখার মত করে। মাখার কাজটা হাতে বা ফর্ক দিয়েই করবেন, মিক্সারে করলে বড্ড বেশি স্মুদ হয়ে যায়। কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ পছন্দ না হলে পেঁয়াজ কুচি করে গরম জলে এক মিনিট ফুটিয়ে নিন। এই অ্যাভোকাডো মাখাকে বলা যেতে পারে মেক্সিকান রান্না গুয়াকামোলির বাঙালী সংস্করণ। আমি ভাতের সঙ্গে খাই, তাছাড়া স্যান্ডুউইচের সঙ্গে, টাকোর উপর টপিং হিসেবে, স্ক্র্যাম্বল্ড এগ এর সঙ্গে, স্যালাডের সঙ্গে, এমনকি ঝালমুড়ির মধ্যেও দিলে দারুণ লাগে। একটু ভেরিয়েশন আনার জন্য টমেটোকুচি যোগ করতে পারেন। তবে পেঁয়াজ আর লঙ্কা মাস্ট।
ওহ ভাল কথা, এই অ্যাভোকাডো মাখা হাওয়ার সংস্পর্শে এলে একটু পর কালো হয়ে যায়। ঘাবড়াবেন না, ওটা নষ্ট হয়ে যায়নি, বা ওর অসামান্য খাদ্যগুণে ভাঁটা পড়েনি। একান্ত রংটা দেখতে অপছন্দ হলে স্টোর করার সময় এয়ার টাইট ভাবে স্টোর করুন।

 

কশা ইয়ুকা

এবার বলি আরেকটি অত্যন্ত উপকারী এবং সুস্বাদু সব্জির কথা। এর নাম অ্যাসপারাগাস (Asparagus) । দেখতে অনেকটা ডাঁটার মত। প্রচন্ড উপকারী বলেই বোধহয় দাম বেশ চড়া। দোকান থেকে এক বাণ্ডিল অ্যাসপারাগাস কিনে আনুন, সঙ্গে একটু চিকেন। অর্ধেক অ্যাসপারাগাস নুন লেবু আর গোলমরিচ মাখিয়ে গ্রিল করুন। লেবুটা একটু বেশি করে দিতে হবে। গ্রিল করার সময় ওভেনের মধ্যে একটা ছোটো বাটিতে জল রেখে দেওয়া যেতে পারে। এতে যেটা গ্রিল করছেন সেটার উপরিভাগ একদম খটখটে হয়ে যায়না, আবার একদম ঢেকে ভাপে রান্না করার মত অতটা ময়েস্ট ও থাকেনা। কতক্ষণ এবং কত তাপমাত্রায় গ্রিল করতে হবে সেটা নিজের আন্দাজে বুঝে নিতে হবে, এটুকু বলতে পারি রান্না শেষ হবে তখনই যখন অ্যাসপারাগাসগুলির সুঠাম পুরুষালী চেহারা শুকিয়ে গিয়ে নেতিয়ে পড়বে আর সামান্য পোড়া পোড়া রঙ ধরবে।
যতক্ষণ গ্রিলড অ্যাসপারাগাস তৈরি হচ্ছে ততক্ষণ প্রেসারে জল নিয়ে তার মধ্যে আদা কুচি, গোটা গোলমরিচ, ছোট করে কাটা চিকেন আর অ্যাসপারাগাস কুচি দিয়ে বসিয়ে দিন। কয়েকটা সিটি দিয়ে নামিয়ে নিতে হবে যাতে অ্যাসপারাগাস গলে না যায়। আমি লক্ষ করেছি এখানের চিকেন আর অ্যাসপারাগাসের কুকিং টাইম প্রায় একই, তাই এক সঙ্গে বসিয়ে সিদ্ধ করলে সমস্যা হয়না। প্রেসার খোলার পর যোগ করুন কিছুটা মাখন আর গুঁড়ো গোলমরিচ। কয়েক মিনিট সাঁতলালেই রেডি আপনার অ্যাসপারাগাস চিকেন ক্লিয়ার সুপ। রোগীর পথ্য হিসেবে দারুণ উপকারী, কিন্তু খেতে এতই ভাল যে রোগীর বাড়ির বাকি লোকেরা আগে শেষ করে ফেলবেন। ইতিমধ্যে ওভেন খুলে দেখুন গ্রিলড অ্যাসপারাগাসও তৈরি। গরম গরম সুপের পাশে উপভোগ করুন গ্রিলড ডাঁটাগুলো।

              

                                  Asparagus                                                             Belgian Endive

আরেকটি দারুন উপকারী সব্জির কথা বলি এবার (আমি কি বড্ড বেশি স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে পড়ছি? :P )। এর নাম বেলজিয়ান এনডিভ (Belgian Endive)। দেখে মনে হয় ফুলের কুঁড়ি। চেহারা দেখেই খাবার ইচ্ছে জাগে। স্বাদ একটু তেতো তেতো। এটির যে রান্নাটার কথা বলব সেটার নাম ব্রেইজড বেলজিয়ান এনডিভ। প্যানে এক কিউব মাখন দিয়ে সেটা গলিয়ে নিন। তার মধ্যে আদ্ধেক করে কেটে রাখা বেলজিয়ান এনডিভ দিয়ে দিন, অল্প আঁচে ভাজতে থাকুন, পরে যোগ করুন চিনি, নুন, গোলমরিচের গুঁড়ো। এনডিভের রঙ লালচে হয়ে এলে আর সুসিদ্ধ হয়েছে বুঝলে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে প্রথম পাতে ভাল লাগে। একটু ভেরিয়েশন আনার জন্য মাখনের বদলে ভেজিটেবল অয়েল আর রান্নার শেষদিকে অল্প তেঁতুল দিয়ে দেখতে পারেন, টক টক ভাবের সঙ্গে এনডিভের নিজস্ব ফ্লেভারটা যায় দারুণ।

এবার বলব কিছু বিশেষ ধরনের সবুজ গাছগাছালির কথা যাদের সবজি বলা যায় কিনা আমি নিশ্চিত নই, আবার মশলার পর্যায়েও পড়েনা এরা। ইংরেজীতে এদের বলা হয় হার্বস (herbs)। পশ্চিমী রান্নার একটা সিংহভাগ দখল করে আছে বিভিন্ন হার্ব দেওয়া রান্না। পশ্চিমী রান্না বলতে যাঁরা কেবলই স্যান্ডউইচ, বার্গার বা পিজ্জা বোঝেন তাঁদের প্রতি আমার করুণা হয়। এঁদের বলব নানারকম হার্বস এর সাহায্যে বানানো অসাধারণ সব রান্নাগুলো একবার খেয়ে দেখুন। এই সমস্ত হার্বস যে সবই পশ্চিমের একেবারে নিজস্ব সে কথা বলা যায়না। বেশ কিছু হার্বস এর উৎস আসলে প্রাচ্য। কিন্তু বর্তমান আমেরিকান রান্নাঘরের এক দেহে এরা সবাই লীন হয়ে গেছে। কাকে ছেড়ে কার কথা বলি। নীচে ছয় রকম হার্বস এর ছবি এবং নাম দিলাম। যাঁরা ইন্টারেস্টেড, এদের সম্পর্কে গুগল করে নিন। কি ধরনের রেসিপিতে এদের দেওয়া যেতে পারে সেটাও নেটে খুঁজলে গোছা গোছা পাবেন। সেই নিয়ে বেশি লিখে পাতা ভরাবনা। কেবল শুরু করানোর জন্য গোটা দুয়েক হার্ব দিয়ে আমিষ রান্নার রেসিপি দিই।

           

                              Thyme                                                  Dill                                         Rosemary

 

             

                             Basil                                           Chive                                       Oregano

ডিল (Dill) এর কথাই ধরুন। ঝিরিঝিরি পাতা-ওয়ালা এই উদ্ভিদটির প্রয়োগ মূলত গন্ধের জন্যই। স্বাদে এর বিশেষ ভূমিকা নেই। তবে সাবধানে থাকবেন, এর গন্ধ কিন্তু খুবই কড়া। ভুল করে বেশি দিয়ে ফেললে রান্নাটায় বড্ড বুনো গন্ধ হয়ে যাবে। এই ডিল দিয়ে স্যালাড বানালে দারুণ লাগে। তবে এখানে যেটার কথা বলব সেটার নাম লেমন অ্যান্ড ডিল স্যামন। এটা বানানোর জন্য স্যামন মাছের ফিলে কিনে তার গায়ে অল্প নুন আর অলিভ অয়েল মাখিয়ে নিন। এবার একটা বেকিং ট্রে-তে থরে থরে সাজান চাকা চাকা করে কাটা লেবু, অল্প ডিলের কুচি, তার উপর তেল মাখানো মাছগুলি এবং সবার উপরে আবার লেবুর চাকা ও ডিল। উপরে ছড়িয়ে দিন লেবুর রস আর গুঁড়ো গোলমরিচ। তারপর বেকিং ট্রে-টি অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে মুড়ে ওভেনে ঢুকিয়ে দিন। ভাপে রান্না হবে। স্যামন খুব বেশিক্ষণ রান্না না করাই ভাল, তাহলে স্যামনের নিজস্ব গন্ধটাই চলে যায়। আবার কম রান্না করলে কারো কারো কাঁচা গন্ধ লাগতে পারে। তাই সঠিক সময় বলা মুস্কিল। তবে ৪০০ ডিগ্রিতে আধ ঘন্টার বেশি বসানোর দরকার হবেনা এটুকু বলা যেতে পারে। ওভেন থেকে বার করে গরম গরম ভাতের সঙ্গে খেয়ে দেখুন।

লেমন অ্যান্ড চিকেন

দ্বিতীয় রান্নাটির জন্য লাগবে চিকেন এর ব্রেস্ট পিস বা টেন্ডারলায়ন, আর এক গোছা চাইভ (Chive)। চাইভ জিনিসটি অনেকটা পেঁয়াজকলির ছোটো ভার্সন বলা চলে। চ্যাপ্টা চিকেনের পিসগুলোর গায়ে নুন আর সামান্য ময়দা মাখিয়ে অল্প ভেজিটেবল অয়েলে ভাজুন। ময়দা বেশি মাখিয়ে কোটিং তৈরি করবেন না কিন্তু, স্রেফ অল্প ক্রিস্প ভাব আনার জন্য এই ব্যবস্থা। চিকেনের পিসগুলো যত পাতলা হয় তত ভাল, ভাজতে সময় লাগবে কম। চিকেন সিদ্ধ হয়ে যাবে ভাজতে ভাজতেই। বাইরেটা বেশ সুন্দর সোনালী রঙ ধরবে। এই অবস্থায় এর মধ্যে দিন বেশ কিছুটা লেবুর রস, গোলমরিচ গুঁড়ো আর কুচো চাইভ। আরো নাড়তে থাকুন কিছুক্ষণ। লেবুর রসে ভিজে যাওয়া চিকেন পিসগুলি আবার শুকিয়ে এলে নামিয়ে নিন। এটা স্টার্টার হিসেবে শুধু মুখে খেতেই বেশি ভাল লাগে। চাইভের গন্ধ এবং স্বাদ এই রান্নাটিতে এক আলাদা ডাইমেনশন নিয়ে আসে।

চাইভ দিয়ে ফ্রায়েড চিকেন

এখানেই থামা যাক আজকের মত। আমার লেখা থামলে কি হবে, খাওয়াদাওয়া আর রান্না তো থামানো চলেনা। অজানা শাকসব্জি, মশলা, হার্বস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যান। যতই বাঙালি রান্নার ভক্ত হোন না কেন, হয়তো এইভাবে এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে একদিন আপনিও খুঁজে পাবেন আরও ভাল ভাল খাবার। আর সেগুলোর হদিস আমায় দিতে দেরি করবেন না যেন।

 

*** রান্নার ছবি দুটি আমার ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস ক্যামেরায় তোলা, সবজির ছবিগুলি নেট থেকে সংগৃহীত (প্রধানত উইকিপিডিয়া)।

বিচিত্র সবজির ভাণ্ডার ২
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments