খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে আমি নিপাট বাঙালি। দুবেলা চাট্টি ভাত আর মাছ হলে সবচেয়ে খুশি হই। আর বিভিন্ন দেশের রান্না খাওয়ার পরে একথাই বারবার মনে হয় – বাঙালি খাওয়ার জবাব নেই! হয়তো আমি এ ব্যাপারে বায়াসড, কিন্তু ভোজনরসিক হিসেবে বাঙালি বা আরেকটু জেনারালাইজ করে ভারতীয় রান্নার ইস্টাইলকে সম্মান না করে উপায় নেই। ফোড়ন দেওয়ার যে অপূর্ব কনসেপ্ট, আমার মতে তা ভারতীয় কুইজিনের এক বিরাট সম্পদ। মশলা সব দেশেই চলে, কিন্তু শুরুতে তেলের মধ্যে মশলাটা ভাজলে যে আলাদা সুবাস বের হয় সেই ট্রিকটা অনেক দেশেই অজানা। যা হোক, এত ধানাইপানাই করার প্রধান কারণ আজ প্রথমবার কিছু অ-ভারতীয় রান্নাবান্না নিয়ে লিখতে বসেছি। অবিশ্যি একটু এগোলেই বুঝতে পারবেন রান্নার মূল উপাদান অ-ভারতীয় হলেও রান্নার কায়দাটা অনেক ক্ষেত্রেই স্রেফ বিভিন্ন বাঙালি পদেরই মডিফিকেশন।

 

               

              আইসবার্গ লেটুস ও বাঁধাকপি                                                                জুকিনি ও শসা

 

বাড়ির বড়রা বলতেন সময়ের সবজি সময়ে খেতে হয়, তবে আসল গুণটা পাওয়া যায়। কোনটা যে কোন সময়ের সবজি তা আজকালকার দিনে, বিশেষ করে এই মার্কিন দেশে বসে, একেবারে ভুলতে বসেছি। তবে ওই কথাটাকে আরেকটু জেনারালাইজ করে বলা যায় যে স্থানীয় সব্জি খাওয়া সবসময় ইমপোর্টেড বা প্রিজার্ভড সব্জি খাওয়ার থেকে ভাল। এই কথা ভেবে এবং মজাদার দেখতে নানারকম মার্কিন সব্জিকে কিছুটা এক্সপ্লোর করার সদিচ্ছা নিয়েই গ্রসারি স্টোরে আগাগোনা শুরু করি বছরখানেক আগে থেকে। মনে আছে প্রথম প্রথম এসে অচেনা সব্জিকে চরমভাবে এড়িয়ে চলতাম। ফুলকপি বাঁধাকপি বেগুন গাজর মূলো ঢ্যাঁড়শেই সীমাবদ্ধ থাকত তাই আমার সব্জির বাজার। খুব সতর্ক থাকতাম বলে বাঁধাকপি ভেবে আইসবার্গ লেটুস বা শসা ভেবে জুকিনি কিনে ফেলার ভুলটা করিনি অনেকের মত। কিন্তু কদ্দিন আর একই জিনিস খাওয়া যায়? তাছাড়া ওই যে বললাম, নতুন জিনিসগুলো এক্সপ্লোর করারও বাসনা হল। এই ভেবেই সাহস করে কিনে ফেললাম কিছু নতুন নতুন সব্জি। এরা সকলেই যে খাঁটি মার্কিন সব্জি তা নয়, কিন্তু সবই এখানে চাষ হয়, ইম্পোর্টেড মাল নয়।

এই সমস্ত সব্জিদের কথাই বলব আজ। আর সঙ্গে আমার প্রবাসী বন্ধুদের জন্য দু একটা টুকরো রেসিপি। অবশ্য আজকাল কলকাতাতেও এদের অনেককেই পাওয়া যায়, তাই যাঁরা দেশে আছেন তাঁরাও ট্রাই করতেই পারেন।

           

                           Chaoyte Squash                                                                Butternut Squash

প্রথমে বলা যাক বিভিন্ন ধরনের স্কোয়াশের কথা। স্কোয়াশ এমনিতে খুব স্বাস্বাদু বস্তু নয় বলেই জানতাম, কিন্তু এখানের হাজারো রকমের স্কোয়াশের মধ্যে কয়েকটা ইতিমধ্যেই আমার বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে একটি হল চায়টি স্কোয়াশ। (Chayote Squash) অদ্ভুত দেখতে এই স্কোয়াশটি এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে নিজে থেকেই হত, চাষ না করতেই। তখন লোকে জানতই না এর খাদ্যগুণের কথা। প্রচুর পরিমাণে হয় বলেই দামে বেশ সস্তা, খেতেও ভাল। কুচি করে কেটে তেলে ভেজে খেতে ভাল লাগে, আবার কাঁচালঙ্কা আর টোমাটো কুচি দিয়ে ডিমের সঙ্গে ভাজলেও বেশ লাগে। চটজলদি রান্না। একদিন বানিয়ে ফেলুন চায়টি স্কোয়াশ দিয়ে ডিমের ভুজিয়া।

                    

                           Yellow Squash                                                               Baby Zucchini

 

বাটারনাট স্কোয়াশকে (Butternut Squash) অনায়াসে কুমড়ো বলে চালানো যায়। কুমড়োর স্বাদ আমার বেশি প্রিয়, তবে বাটারনাট স্কোয়াশও মন্দ না। ইন্ডিয়ান স্টোর যাওয়ার সুযোগ না গলে এই দিয়েই কুমড়োর কাজ চালাই। তাই আলাদা করে এর আর কোনো রান্নার কথা বলছি না। ইয়েলো স্কোয়াশ (Yellow Squash) জিনিসটা আমার অসহ্য লাগত প্রথম প্রথম। তারপর একদিন আবিষ্কার করলাম লাউ চিংড়ির লাউ এর বদলে ইয়েলো স্কোয়াশ দিয়ে করলে অসাধারণ লাগে। এটা বানানোর জন্য আপনাকে প্রথমে অল্প তেলে আদাকুচি ও পেঁয়াজকুচি ভাজতে হবে। সুগন্ধ বেরোলে তারপর তার মধ্যে কুচোনো ইয়েলো স্কোয়াশ দিয়ে দিন। যত ছোট কুচি হয় তত ভাল, তবে রান্না করতে গিয়ে গলিয়ে ফেলবেন না। আলাদা করে ভেজে রাখা চিংড়িটা পরে এর মধ্যে দিয়ে দিতে হবে রান্না কিছুদূর এগোলে। সঙ্গে দেবেন পরিমাণ মত নুন, চিনি আর সামান্য লঙ্কাগুঁড়ো। গরম গরম ভাতের সঙ্গে খেয়ে দেখুন কেমন লাগে।

ইয়েলো স্কোয়াশ দিয়ে চিংড়ি

স্কোয়াশ গোত্রের আরেক সদস্য জুকিনিকে (zucchini) পাঁচমেশালি চচ্চড়িতে দিলে ভাল লাগে। এছাড়া আমার খুব প্রিয় হল গ্রিলড বেবি জুকিনি। বেবি জুকিনিকে মাঝ বরাবর ফালি করে কেটে নুন লেবুর রস মাখিয়ে গ্রিল করুন। একটু অন্যভাবে করতে গেলে প্যানে অলিভ অয়েল নিয়ে তার মধ্যে ওই আধ ফালি বেবি জুকিনি নুন, মরিচ, লেবুর রস আর সামান্য রসুন কুচি সহযোগে ভাজতে পারেন। দুটোই দারুন লাগে আমার।

বাঁধাকপি যদি আপনার প্রিয় সবজি হয় তাহলে কখনও খেয়ে দেখুন ব্রাসেলস স্প্রাউট বা বাক চোয়। ব্রাসেলস স্প্রাউট (Brussels Sprout) দেখতেও ছোট্ট কিউট বাঁধাকপির মত। এদেরকে আদ্ধেক করে কেটে নেওয়া যায় বা গোট অবস্থাতেই রান্না করা যায়। প্রাথমিকভাবে বাঁধাকপির তরকারির মত আলু দিয়ে রান্না করে দেখুন। আলুটা আগে অল্প সিদ্ধ করে নেবেন, একটু গলে গলে গেলে ভাল হয়। জল একেবারে দেবেননা। আলুর সঙ্গে কশতে কশতে সামান্য পোড়া পোড়া ভাব নিয়ে আসুন। ব্রাসেলস স্প্রাউটের ফ্লেভারের সঙ্গে ঐ পোড়া পোড়া ভাবটা যায় দারুণ। ফোড়ন হিসেবে জিরে ব্যবহার করতে পারেন। বা অন্য কিছু এক্সপেরিমেন্ট করে দেখুন।

                    

     Brussel's sprout                                               Bok choy                                                       Habanero

বাক চোয় (Bokchoy) এক ধরনের চীনা বাঁধাকপি জাতীয় সবজি। নামের ইংরেজী বানানটা দেখে গালাগালি বলে ভুল হতে পারে, কিন্তু খেতে অতি সুস্বাদু। আমি সাধারণত এটি আরও কিছু সবজির সঙ্গে স্টার ফ্রাই করে খেতে পছন্দ করি। অর্থাৎ প্যানে তেল গরম করে তার মধ্যে পেঁয়াজকুচি, ক্যাপ্সিকাম, বাক চোয়, গাজর কুচি, ব্রোকোলি, মটরশুঁটি, কাঁচালঙ্কা ইত্যাদি দিয়ে ভাজা ভাজা করা। একটু মিষ্টি মিষ্টি খেতে হবে, তাই চিনিটা একটু বেশি দিতে হবে। সঙ্গে পরিমাণমত নুন, দরকার হলে অল্প ঝাল দেওয়া যেতে পারে।

ঝাল প্রসঙ্গে মনে পড়ল, প্রথম প্রথম এখানের ঘাসের মত খেতে লঙ্কাগুলো খেয়ে মুখগহ্বরের বদলে অন্য কিছু জ্বলে যেত। আমি ঝালের প্রবল ভক্ত, অথচ সেরকম ঝাল-ওয়ালা লঙ্কা কিছুই পেতামনা। একমাত্র হ্যালাপেনো (Jalapeno) দিয়ে কিছুটা কাজ চলত। তারপরে সন্ধান পেলাম হ্যাবানেরো (Habanero) লঙ্কার। বেশি কিছু বলবনা, নিজেই খেয়ে দেখুন। এটুকু বলছি আপনি যদি ঝাল-প্রেমী হন আর এদেশে এসে ঝালের অভাবে ডিপ্রেসড হয়ে পড়েন, তাহলে হ্যাবানেরোকে একবার সুযোগ দিন।

ঝালের জন্য হন্যে হয়ে শুকনো লঙ্কা কেনেন?
আসুন দাদা, কমলাপানা হ্যাবানেরো চেনেন…


  স্টার ফ্রাই করার পক্ষে উপযুক্ত আরেকটি সব্জি হল আনিস ফেনেল (Anise Fennel)। স্রেফ ফেনেল নামেই বিক্রি হয় অনেক দোকানে, তবে সারা বছর বোধহয় পাওয়া যায়না। এটি আসলে মৌরি জাতীয় গাছ, যার বীজগুলো মশলা হিসেবে (আনিস) ব্যবহার হয়। সেই গাছের শিকড়টি এই মুহূর্তে আমাদের আলোচ্য বিষয়। কেটে কুচি কুচি করে ফেললে অনেকটা সাদা পেঁয়াজের মত লাগবে। তারপর সেটাকে বিভিন্ন খুচরো সব্জি সহ স্টার ফ্রাই করুন। এটাও মিষ্টি মিষ্টিই ভাল লাগে। ফেনেলের একটা অসাধারণ সুগন্ধ আছে, সবে মিলে জমে যাবে!

 

 

 

                          Anise Fennel

 

গোলমরিচ দিয়ে ফেনেলের তরকারি

 

এবার কিছু শাকপাতার কথা বলে প্রথম পর্ব শেষ করব। প্রথম প্রথম এসে পালং শাক বাদে আর কিছু চেনা না পেয়ে শুধু পালং ই খেতাম। কে জানে, না জানি কেমন খেতে হবে এখানের শাকগুলো। কিন্তু সাহস করে খেয়ে দেখে মুগ্ধ হলাম। সবই যে ভাল লাগল তা নয়, কিন্তু বেশিরভাগই খুব সুস্বাদু। এখানে আমার খুব প্রিয় দুটো শাকের কথা বলছি। প্রথমটির নাম কেল (Kale)। এর একটি নিজের অসাধারণ ফ্লেভার আছে, খেতেও সুস্বাদু। শুধু তাই নয়, এই শাকটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। বিভিন্ন ভিটামিন আর মিনেরালে পরিপূর্ণ তো বটেই, সঙ্গে আছে ক্যান্সার প্রতিরোধক উপাদানও। এর একটি চটজলদি রান্না করার উপায় হল তেলে সরষে ফোড়ন দিয়ে ভাজা ভাজা করা। সঙ্গে নুন, মিষ্টি এবং ঝাল দিতে হবে। গরম ভাত দিয়ে খেতে দারুণ লাগে।

        

                                       Kale                                                                         Swiss Chard

 

আরেকটি অসাধারণ শাক হল সুইস শারড (Swiss Chard)। কেলের মত এটিও স্বাস্থ্যগুণে ভরপুর। এর মধ্যে বিভিন্ন উপাদান আছে যা ব্লাড সুগার এবং হাড়ের অসুখ প্রতিরোধ করে। সুইস শারড রান্না করার জন্য প্রথমে গরম তেলে দিন পাঁচফোড়ন। সঙ্গে বেশ কিছু কাঁচালঙ্কা। তার মধ্যে শাকটা দিয়ে ভাজুন। তারপরে দিন অল্প হলুদ এবং পরিমাণ মত নুন। মিষ্টি দেওয়ার দরকার নেই। নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না শাকটা ভাল মত ভাজা ভাজা হচ্ছে। তারপর ভাতের সঙ্গে প্রথম পাতে খেয়ে দেখুন কেমন লাগে।

আজ এখানেই থামা যাক। এই বিচিত্র নতুন নতুন শাকসব্জির ভাণ্ডারের কথা অর্ধেকও বলা হলনা। তাই আরেকদিন আরও কিছু সব্জির কথা বলা যাবে। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট ধরনের জিনিস যা আমার অত্যন্ত প্রিয়। সেগুলোর কথা না বললে পশ্চিমী রান্না সম্পর্কে কিছুই বলা হয়না। আজকের রান্নাগুলো বেশিরভাগই ভারতীয় স্টাইলে। পরের পর্বে আরেকটু পশ্চিমী ঘেঁষা রান্নার কথা বলা যাবে। ততদিন এইগুলো নিয়েই এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যান। আর হ্যাঁ, এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল জানাতে ভুলবেন না…

 

*** রান্নার ছবি দুটি আমার ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস ক্যামেরায় তোলা, সবজির ছবিগুলি নেট থেকে সংগৃহীত (প্রধানত উইকিপিডিয়া)।

 

 

বিচিত্র সবজির ভাণ্ডার
  • 4.67 / 5 5
6 votes, 4.67 avg. rating (91% score)

Comments

comments