গত মাসে কোর্টের রায় বেরোনোর পর হইচই পড়ে গেছে ইতালি এবং বিশ্বের বিজ্ঞানমহলে। ২০০৯ এর এল-আকিলা ভূমিকম্পের আগে ভুল Prediction এর দায়ে মামলা করা হয় ইতালির ৬ বিজ্ঞানী এবং ১জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা! গত মাসে আদালত রায় দিয়েছে যে ওই বিশেষজ্ঞ দল সত্যিই দোষী, এবং তার জন্য তাঁদের বিশাল জরিমানা ও ৬বছরের হাজতবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায় বেরোনোর পর থেকেই বিশ্বের বিজ্ঞানমহলের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এর প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন, এল-আকিলা হত্যাকাণ্ডের কেস কে দেখা হচ্ছে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় আক্রমণ হিসেবে। সত্যিই কি তাই?
ঘটনাটা আরেকটু বিস্তারিত ভাবে দেখা যাক। ২০০৯ এর এপ্রিল মাসে ইতালির এল-আকিলা শহরে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারান বেশ কিছু মানুষ। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতিও হয়। এই ভূমিকম্পের আগে বেশ কিছু মাস যাবৎ স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পে বারবার কেঁপে উঠছিল এই অঞ্চল। ইতিমধ্যে গিয়াম্পাওলো জিউলিয়ানি নামে এক স্বঘোষিত বৈজ্ঞানিক…যিনি আসলে একটি ফিসিক্স ল্যাবের টেকনিশিয়ান…হঠাৎ ভবিষ্যতবাণী করে বসেন যে খুব অদূর ভবিষ্যতে এল-আকিলায় বড়সড় ভূমিকম্প হতে চলেছে। জিউলিয়ানি নাকি বহুদিন ধরেই এই অঞ্চলের র্যাকডন গ্যাসের মাত্রা পরিমাপ করে তার অ্যানালিসিস করে চলেছেন। মজার ব্যাপার হল তাঁর এই গবেষণা কোনও পিয়ার রিভিউড জার্নালে গৃহীত হয়নি এবং সমস্ত সিসমোলজিস্টই বলেছেন যে এই গবেষণা ভিত্তিহীন। এর আগেও তিনি দুবার ভূমিকম্পের ভবিষ্যতবাণী করেছেন যা ফলেনি। তবু বারবার স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পে জর্জরিত জনসাধারণ জিউলিয়ানির এই ভবিষ্যতবাণীতে যারপরনাই ভীত হয়ে পড়ল। সবাই রাত্রে ছাদের তলায় শুতে ভয় পেতে লাগল, অনেকে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও ভাবতে শুরু করল। পরিস্থিতি ভাল নয় দেখে সরকারী তরফ থেকে প্রশ্ন করা হল ছয় বৈজ্ঞানিক ও একজন অফিসার কে নিয়ে গড়া রিস্ক কমিশনের কাছে। সত্যিই কি ভয় পাওয়ার কোনও কারণ আছে?
৩১শে মার্চ একটি মিটিং ডাকা হল। মিটিং এর পর রিস্ক কমিশনের তরফ থেকে ঘোষণা করা হল জিউলিয়ানির ভবিষ্যতবাণী ভিত্তিহীন এবং আগের স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প মোটেই বড় ভূমিকম্পকে নির্দেশ করেনা। তবু একথা কখনই জোর দিয়ে বলা যায়না যে ভূমিকম্প হবে না, কারণ সেই prediction বিজ্ঞান এখনও করতে পারেনা। তবে আতঙ্কিত হবার কোনও কারণ নেই কারণ বড়মাপের ভূমিকম্প হবার সম্ভাবনা নেহাতই নগন্য। অদৃষ্টের এমনই পরিহাস, এর ঠিক এক সপ্তাহ পরই এক রাত্রে বড়সড় ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে শহর। রিখটার স্কেলের মাপে হয়ত বিশাল বড় ভূমিকম্প একে বলা চলেনা, কিন্তু এক-আকিলা শহরটা ছিল পুরোন ধাঁচের। বাড়িঘরও সমস্ত প্রাচীন আমলের। তার উপর রাত্রিবেলা হওয়ার বহু মানুষ ঘুমের মধ্যেই এর কবলে পড়েন। প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয় এবং আরও দেড় হাজার মানুষ আহত হন। এই ঘটনার পর ভিন্সেঞ্জো ভিত্তোরিনি এবং আরও কিছু ব্যক্তি, যাঁরা তাঁদের পরিবার পরিজনকে হারিয়েছেন, তাঁরা ওই ৭জনের রিস্ক কমিশনকে দায়ী করতে থাকেন। মিডিয়ার সামনে তাঁরা বলেন যে ওই বিজ্ঞানীদের মিথ্যা আশ্বাসে ভুলে তাঁরা সে রাত্রে কম্পন অনুভব করার পরও খোলা আকাশে বেরিয়ে আসেননি, বাড়ির ভিতরেই থেকেছেন। ওই মিথ্যা আশ্বাস না দিলে বহু মানুষ হয়ত প্রাণে বেঁচে যেতেন। দীর্ঘ জল্পনার পর ওই সাতজনের বিরুদ্ধে জনস্বার্থ বিরোধী মামলা কোর্টে ওঠে ২০১১ এর সেপ্টেম্বরে। এই সংবাদে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানমহলে চাঞ্চল্য পড়ে যায়। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স এর তরফ থেকে বহু বৈজ্ঞানিকের সই সহ একটি চিঠি পাঠানো হয় ইতালির রাষ্ট্রপতির কাছে। দাবি করা হয় এই মামলা তুলে নিতে। দীর্ঘ ১বছর পর গত ২২শে অক্টোবর সেই মামলার রায় বেরোল… ওই ৬ বৈজ্ঞানিক এবং এক অফিসারের সবাইকে ৬ বছরের কারাদণ্ড এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছে আদালত! এই খবরে আরও একবার বিজ্ঞানমহল এবং মিডিয়া ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। যেখানে ভূমিকম্পের সঠিক prediction করার কোনও উপায়ই নেই, সেখানে ভুল prediction কে খুনের সমতুল্য ধরা হবে, এই ব্যাপারটাই কেউ হজম করে উঠতে পারছেনা। ইউ এস এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগই একে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু ব্যাপারটা এতটাও সোজাসাপ্টা নয়।
২০১১তে এই মামলা কোর্টে ওঠার পর যখন হইচই হয় সেই খবর পড়ে আমার একটাই কথা মাথায় এসেছিল… “Ridiculous”। চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারিনি এটাকে। তার কারণ যথেষ্ট ভালোভাবে খুঁটিয়ে সবপক্ষের বক্তব্যগুলো পড়িনি। গত ২০-২৫ দিনে বিভিন্ন সংবাদপত্রে এবং সায়েন্টিফিক ব্লগে এই নিয়ে প্রচুর লেখালিখি হওয়ার পর ব্যাপারটা অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে।  ২০১১তেই নেচার পত্রিকার বেরোনো এই প্রবন্ধটি পড়লেই অনেকটা বোঝা যায় চিত্রটা। যাঁরা মামলাটা করেছেন তাঁদের বক্তব্য হল এই মামলা মোটেই ভূমিকম্পকে সঠিকভাবে predict করতে না পারার জন্য নয়, বরং “ভূমিকম্পের সম্ভাবনা একেবারেই নেই তা নয়” এই কথাটা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না বলা। তাঁদের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ বিজ্ঞানী হিসেবে না, সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে, তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ কাজে গাফিলতির বিরুদ্ধে। সত্যি কথা বলতে এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। যদিচ ৩১শে মার্চের মিটিং –এ সঠিকভাবেই আলোচনা হয় যে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নগন্য কিন্তু শূন্য নয়, মিটিং পরবর্তী প্রেস কনফারেন্সে কিন্তু ওই রিস্ক কমিশনের মুখপাত্র কিছু বেফাঁস মন্তব্য করে বসেন। তিনি বলেন পরিস্থিতি একেবারে স্বাভাবিক, বড়মাপের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা খুব কম,  আপনারা নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরে গিয়ে ওয়াইন পান করতে পারেন। এতে যদি ভিত্তোরিনির মত কিছু মানুষ আশ্বস্ত হয়ে থাকেন, তাঁদের বিশেষ দোষ দেওয়া যায়না। কিন্তু সবকিছুর পরেও…৬ বছরের কারাদণ্ড কি এই অপরাধের উচিত সাজা?
মনে রাখতে হবে ওই রিস্ক কমিশন কিন্তু স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মিটিং ডেকে ওই ঘোষণা করেনি। জিউলিয়ানির হাতুড়ে ভবিষ্যতবাণীতে সন্ত্রস্ত জনসাধারণকে শান্ত করে সঠিক পরিস্থিতির কথা বলার জন্য ডাকা হয়েছিল ওই মিটিং। এই অবস্থায় “চিন্তা করবেন না, ওই ব্যক্তির ভবিষ্যতবাণী ভিত্তিহীন, আদতে ওরকম ভয়ের কিছু নেই” জাতীয় বার্তা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এবং ৯৯% ক্ষেত্রে যেকোন বিজ্ঞানীদের দল সেই কথাই বলবেন। হয়তো আরেকটু গুরুত্ব দিয়ে বলা যেত “ভুমিকম্পের সম্ভাবনা যেহেতু উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছেনা, তাই আপনারা সাবধানতা অবলম্বন করতে থাকুন”, বিশেষ করে যখন তাঁরা জানেন যে শহরের বাড়িঘর ভূমিকম্প-নিরোধক নয়। এই বাড়তি সচেতনতাটা জাগিয়ে না তোলা রিস্ক কমিশনের ভুল হয়েছে, মেনে নিতেই হবে। তবু এটা ভুলই, ইচ্ছাকৃত ভাবে করা অপরাধ নয়। ওঁরা ভেবেছিলেন যে বড়সড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা যেহেতু হাজার ভাগের এক ভাগও নয়, তাই বেশি বেশি বলে আর বৃথা মানুষকে আতঙ্কিত না করাই ভাল। এই দোষের জন্য ওঁদের চাকরি কেড়ে নেওয়া যেতে পারে, বলা যেতেই পারে যে ওই পদের যোগ্য তাঁরা নন, কিন্তু ৬বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যায় কি? ব্যাপারটা কিরকম দাঁড়াচ্ছে বলুন তো? ধরুন আপনাকে এক জ্যোতিষী বলল আগামী দুদিনের মধ্যে আপনার বাড়িতে বাজ পড়বে এবং আপনি মারা যাবেন। আপনি তাই শুনে যারপরনাই আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। এই শুনে আপনার এক বিজ্ঞানী বন্ধু আপনাকে বলল “ধুস! কিসব ভুলভাল ভিত্তিহীন লোকের কথায় কান দিয়ে বেকার চিন্তা করছিস। যা তো বাড়ি গিয়ে মাল খা! আগামী দুদিনের মধ্যে তোর বাড়িতে বাজ পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।” আপনি বাড়ি গেলেন, মদ্যপান করতে বসলেন, এবং আপনার বাড়িতে বাজ পড়ল। আপনি মারা গেলেন। ঝড়ে বক মরল, জ্যোতিষীর কেরামতি বাড়ল। এরপর আমরা সব্বাই মিলে বললাম ধর ব্যাটা বিজ্ঞানী বন্ধুকে। ও তো বলতেই পারত “তোর বাড়িতে বাজ পড়ার সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায়না, সামান্য হলেও সম্ভাবনা আছে, সাবধানে থাক, বৃষ্টি পড়লেই কাঠের খাটে উঠে বসে থাকবি”। সেটা বললেই আর উনি মারা যেতেননা। সুতরাং Miscommunication এর দায়ে পোর ব্যাটাকে জেলে!
ভাবুন তো, যদি কোনও একটা দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম হয়, তাহলে কি আপনি সবাইকে ক্ষণে ক্ষণে তার জন্য সাবধান করে দেন? মাটি কেঁপে উঠলে সাবধান হতে হবে এটা তো কমন সেন্স। খুব কম সম্ভাবনার এই ঘটনাটা ঘটে গেছে সেটা দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু বিচার করার সময় তো বিচার করতে হবে সেই জায়গাটা থেকে যে যখন মিটিংটা হয়েছিল তখন আদৌ ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কত ছিল। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর “After the fact assessment” করলে তো চলবেনা। আমার মনে হয় বিচারপতি এই ভুলটাই করেছেন। যেহেতু বড় ভূমিকম্প হয়ে গেছে, উনি ভেবেছেন তাহলে তো সম্ভাবনা ছিল, তবু কেন সাবধান করে দেওয়া হয়নি? সম্ভাবনাটা যে কতটা কম ছিল সেটা তো দেখতে হবে। এই বিজ্ঞানীদেরই একজন এনরিকো বসচি কিন্তু আগে বহুবার বলেছেন এই অঞ্চল যেহেতু ইতালির মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভূমিকম্পপ্রবণ, তাই এখানের বাড়িঘর রি-ইনফোর্সড করা হোক। সরকার কান দেয়নি। বড় অপরাধ যদি হয়ে থাকে সেটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটর দের, রিস্ক কমিশনের না। এটাও শোনা গেছে যে উপরমহল থেকে নাকি আদেশ এসেছিল যে জনগণকে শান্ত করতে হবে, প্যানিক-মুক্ত করতে হবে (এই ব্লগের ফোন কনভার্সেশনের জায়গাটা পড়ে দেখতে পারেন)। সেই চাপে পড়ে রিস্ক কমিশন যদি ওরকম ঘোষণা করে থাকে তাহলে সেটা অপরাধ হয়ত, কিন্তু এই ঘোষণা এতটাও বিপজ্জনক কিছু না (আবারও বলছি, প্রোবাবিলিটির বিচারে বড় ভূমিকম্প হবার সম্ভাবনা ছিল ০.০০১ এরও কম), যে কমিশনের বিজ্ঞানীরা নিজেদের বিবেকবোধ থেকে সেটা করতে বিরত থাকবেন। বসচি দের মত বৈজ্ঞানিক যদি বিশ্বাস করতেন এই ঘোষণা বিপজ্জনক, তাহলে নিঃসন্দেহে রাজি হতেননা। মূল দোষী কিন্তু উপরমহলের কর্তাব্যাক্তিরাই। কিন্তু তাঁদের পলিটিকাল পাওয়ার আছে, তাই মামলা তাঁদের বিরুদ্ধে না করে করা হল বিজ্ঞানীদের ওপর, যাঁরা মানুষের ভালর জন্য গবেষণা করেন। বলির পাঁঠা কাউকে সাজাতে না পারলে বোধকরি আসল গাফিলতিগুলো ধরা পড়ে যেত। মাঝখান থেকে ভুগতে হল বসচি দের।

এই ঘটনাটা আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোন মানুষ, যাঁর একটা ভুল মানুষের জীবন নিতে পারে, তাঁর ভুলের জন্য তাঁর কতটা শাস্তি প্রাপ্য? ধরুন একজন জাজ, যিনি খুনের মামলার বিচার করছেন। যদি তিনি ভুল করে নির্দোষ ব্যক্তিকে ফাঁসি দেন, আর পরে সেটা ধরা পড়ে, তাহলে কি ওই জাজ-কে হত্যাকারী বলে শাস্তি দেওয়া উচিত? বা ধরা যাক একজন হার্ট সার্জনের কথা। তাঁর একটা সামান্য ভুলের জন্য রোগীর মৃত্যু হতে পারে। ভুল মানে আমি এখানে অনিচ্ছাকৃত ভুলের কথা বলছি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল চিকিৎসার কথা নয়। এক্ষেত্রে ওই সার্জনের বিরুদ্ধে মামলা করে তাঁকে জেলে পাঠানো কি নৈতিক? এরকম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলে কিন্তু এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব কেউ নিতেই চাইবেন না। বা নিলেও কাঁপা কাঁপা হাতে সার্জারি করতে গিয়ে আরোই বিপদ হবে। অথচ এরকম দায়িত্বে থাকা কেউ কাজে গাফিলতি করুন সেটাও কাম্য না, তার ফল মারাত্বক হতে পারে। তাহলে উপায়? আসলে গাফিলতি-জনিত ভুল আর সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে তফাত করা খুব সহজ নয়। তাই এই কাজটা খুব সাবধানে আর গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত। আমার মতে এল-আকিলার বিচারক এই ভুলই করেছেন। উচ্চতর আদালতে আপিল করেছেন ওই ৭জন। যদি সেখানে তাঁরা নির্দোষ প্রমাণিত হন তাহলে আশা করি নিম্নতর আদালতের ওই বিচারককে শাস্তি দেওয়া হবেনা ভুল বিচার করার জন্য।

কিছুদিন আগে আমির খানের সত্যমেব জয়তে তে এসে তাঁর স্ত্রীয়ের মৃত্যুর জন্য নেফ্রোলজিস্ট ডক্টর শ্রীধর এর বিরুদ্ধে পঙ্কজ রাইয়ের করা অভিযোগ এবং তারপরে সে ডাক্তারের প্রত্যুত্তর নিয়ে বেশ সরগরম হয়েছিল মিডিয়া। তাঁর স্ত্রীয়ের মৃত্যুর জন্য তিনি শুধু ওই ডাক্তারকে দায়ীই করেননি, এটাও বলেছিলেন যে তিনি স্রেফ টাকার লোভে চিকিৎসায় গাফিলতি করেছেন। এরপরেই ডক্টর শ্রীধর খোলা চিঠি লিখে জানান যে এই অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা এবং কর্নাটক মেডিকাল কাউন্সিলের কাছে করা মিস্টার রাই এর অভিযোগ নাকচ হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। দুদিন যেতে না যেতেই খোলা চিঠি তেই উত্তর দেন পঙ্কজ রাই। তাঁর অভিযোগ গুলো সম্পূর্ণ ব্যখ্যা করে এবং বেশ কিছু প্রমাণ দেখিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন যে তাঁর অভিযোগ একেবারে ভিত্তিহীন ছিলনা। তবু পুরো ব্যাপারটা দেখে আমার মনে হয়েছিল তাঁর সব অভিযোগ আদৌ সত্যি নয়। স্ত্রী-কে হারানোর দুঃখে তিনি বেশ কিছুটা বাড়িয়ে বলছেন। আসল সত্যি কি সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই, উচ্চতর আদালতে মামলা চলছে। সেটা শেষ হলে হয়তো বোঝা যাবে। কিন্তু এই ঘটনাটা আমায় মনে করিয়ে দিয়েছিল আমার নিজের দেখা এরকমই কিছু জুলুমের কথা। বিনা দোষে ডাক্তারকে মার খেতেও দেখেছি আমি। কোনও ডাক্তারের তত্বাবধানে রুগীর অবনতি বা মৃত্যু ঘটলেই ডাক্তারকে দায়ী করা অনেকের অভ্যেস। তখন তাঁরা এমন সব মন্তব্য করতে থাকেন যেন তাঁরা নিজেরাই এর থেকে ভাল ডাক্তারি বোঝেন। আসলে আমাদের দেশে ডাক্তারদের মধ্যে এত দুর্নীতি আছে যে কিছু হলেই মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করে। চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্নীতির চরম বিরোধিতা করেও বলব, কিছু হলেই কাউকে বলির পাঁঠা করার অভ্যেসটা আমাদের ছাড়তে হবে। পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যেগুলো নেহাতই অ্যাক্সিডেন্ট…যেগুলোর পিছনে হয়তো কারও কারও ছোট্ট ভুল রয়েছে, কিন্তু সেই নিয়ে তাঁদের কাঠগড়ায় তুলতে শুরু করলে এই গুরুদায়িত্ব গুলো নেওয়ার লোকই পাওয়া যাবে না। কঠিন রোগ নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে আপনাকে ফিরে আসতে হবে। বিচারক কাউকে দোষী বলতে ভয় পাবেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের Prediction করার বিজ্ঞানটাই যাবে হারিয়ে।

[ সবশেষে একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা... এল আকিলার ভূমিকম্পের ঘটনা নিয়ে মামলার কথা শুনে আমার মনে পড়ে গেছিল একটা বিখ্যাত উপন্যাসের কথা – “দ্য লাস্ট ডেজ অফ পম্পেঈ”। সেখানেও আছে ইতালির এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা। বহুদিন ধরেই ভিসুভিয়াসের আচার আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল বড় মাপের অগ্ন্যুৎপাত হতে পারে। তবু কেউ পাত্তা দেয়নি তেমন। কেবল এক জন ভবিষ্যতবাণী করেছিল। রোমান শাসনকালের সময়ে চিত্রায়িত এই উপন্যাসটি আমার অত্যন্ত প্রিয় এক ক্লাসিক।যাঁরা পড়েননি তাঁদের অনুরোধ করব এই অপূর্ব বইটি পড়ে দেখতে।]

বিজ্ঞানের দায়িত্ব এবং বলির পাঁঠা নির্বাচন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments