সদ্য ডাক্তারি পাস করেছি | রেজাল্ট বেরিয়েছে… যা আশা করেছিলাম তার থেকে বেশ একটু ভালই নম্বর পেয়েছি… তার ওপরে আবার একটা সাবজেক্ট এ অনার্স মার্কস… একদম যা তা ব্যাপার!! সোনায় সোহাগা আর কাকে বলে…. নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না….

মাসখানেকের মধ্যেই আমাদের ইন্টার্নশিপ ট্রেনিং শুরু হলো… চলবে একবছর ধরে… উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট এ পিরীয়ডিক্যালি ঘুরে ঘুরে নিজের অভিজ্ঞতা, স্কিল বাড়ানো… সর্বোপরি রোগীদের সাথে ইন্টার্যাকশন করা |

এইরকম চলতে চলতে আমার পালা এলো বক্ষরোগ ডিপার্টমেন্টে (Department of Chest and TB) কাজ করার | তো সেইখানকারই এক ঘটনার কথা বলবো আজ…

দিনটা ছিল আমার ওই ডিপার্টমেন্ট এ কাজের প্রথম দিন | আগের দিনই পুরো রাত অন ডিউটি ছিলাম মেডিসিন বিভাগে… এত পেশেন্ট রাশ ছিলো ওইরাতে যে এক মিনিটও বসতে পারিনি…. শোয়া তো দুরের কথা!! তো আমি যে স্যারের সঙ্গে কাজ করবো, তাঁকে বললাম আমার কথা…. কিন্তু মুস্কিল হলো কি সেই দিন আবার তাঁর আউটডোর বিভাগে বসার দিন!! স্যার আমাকে বললেন “তুই চল আউটডোরে… একটু কাজ গুলো বুঝে নে | বুঝতে পারছি তোর অবস্থা.. ঠিক আছে আউটডোরের পরের রাউন্ডে  তোকে থাকতে হবে না, আবার রাত্তিরে রাউন্ডে আসিস!!” যাইহোক, ঢুলুঢুলু চক্ষে চললাম স্যারের পিছন পিছন, গন্তব্য আউটডোর বিল্ডিং|

শুরু হলো পেশেন্ট দেখা, এমনিতেই আমাদের হাসপাতালে প্রচুর রোগী আসেন, সেদিনও প্রচুর এসেছেন | আমরা ইন্টার্নরা স্যারের কথা মতো কাজ করছি, পেশেন্ট দেখছি, প্রেসক্রিপশন লিখছি | এরকমই চলতে চলতে এক বয়স্ক মানুষ এলেন, নাম… না আসল নামটা উহ্যই থাক, ধরে নেওয়া যাক তাঁর নাম অমল | বয়স এইমুহুর্তে একজ্যাক্টলি মনে পড়ছে না… তবে ৪০ উর্ধ্ব তো বটেই, থাকেন বর্দ্ধমানের কাছেই, বাতাসপুর গ্রামে |

আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কি অসুবিধা হচ্ছে বলুন ?

উনি বললেন: শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, অল্পেই হাঁপিয়ে যাচ্ছি |

জানা গেলো, কষ্টটা প্রায় বছরখানেকের, গ্রামেই একজনকে (অবশ্যই ডাক্তার নয়) দেখিয়ে কিসব ওষুধ পত্র  খেয়েছিলেন, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয় নি!! তাই মেডিক্যাল কলেজে আসা |

ক্লিনিক্যালি যা বোঝা গেলো হার্টের ব্যামো নয়, অতিরিক্ত ধুমপানের জন্য শ্বাসনালী ও শ্বাসযন্ত্র, সোজা কথায় ‘ফুসফুস’ গেছে বিগড়ে, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ক্রনিক ব্রংকাইটিস’ | যাইহোক, কিছু টেস্ট করতে দেওয়া হলো ওনাকে, বুঝিয়ে বলা হলো যে সিগারেট আর একদম নয়, এরপরও যদি ধুম্র সেবন করা হয় তবে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে | কটা ওষুধপত্র প্রেসক্রিপশন এ লিখে দেওয়া হলো | বলে রাখি ওষুধের মধ্যে একটা অত্যাবশ্যকীয় হলো ইনহেলার, এই রকম রোগভোগে এটি এখন অন্যতম প্রয়োজনীয় | অনেকেই এখন এর সাথে পরিচিত, যারা জানেননা তাদের জন্য…

 

যাই হোক, এই ড্রাগ ডেলিভারি যন্তরটাও ওনাকে ব্যবহার করতে বলা হলো, কিভাবে ব্যবহার করতে হবে টাও দেখিয়ে দেওয়া হলো আর বলা হলো সপ্তাহদুয়েক বাদে রিপোর্ট নিয়ে এসে আরেকবার চেক-আপ করিয়ে নিতে |

দু’ সপ্তাহ পরে, আমরা যথারীতি আউটডোরে, পেশেন্ট দেখা চলছে | এমনসময় অমলবাবু এলেন | রিপোর্ট দেখা হলো, সব ঠিকঠাক, মানে যেরকমটি ভাবা হয়েছিল সেরকমই… কিন্তু উনি বললেন ওনার কষ্ট একটুও কমেনি!!! যাব্বাবা… কি হলো ব্যাপারটা?!! ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম ওই ইনহেলার ঠিকঠাক নেওয়া হচ্ছে কিনা, দিনে ৪বার করে নেওয়ার কথা, বাকি ওষুধ সব কিনেছেন কিনা (আসলে এখনও ভারতীয় বাজারে ইনহেলারের দাম যথেষ্ট বেশি, অর্থাভাবে অনেকেই হয় ইনহেলার কেনেন না, বা ইনহেলার কিনে, অন্যান্য ওষুধ কিনে উঠতে পারেন না), কিন্তু অমল বাবু বললেন, “না না , সবই কিনেছি বাবু, আপনারা যেরম যেরম করতি বয়েছেন, সেরমই করতেছি, কিন্তু কষ্টটা যে এট্টুও কমলনি |”

এই সেরেছে… কি হলো কেসটা?? আমি তো হাবুডুবু খাচ্ছি… কি করবো কি করবো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ স্যার বললেন, “ও ইনহেলারটা কি ভাবে নিচ্ছে দেখ তো… ঠিকঠাক হাত আর শ্বাস-এর সিনক্রোনাইজেশান হচ্ছে কিনা দ্যাখ | ওটা ঠিক মতো না হলে যতটা ড্রাগ ভিতরে যাওয়ার দরকার, যেতে পারবে না | দরকার হলে আলাদা করে প্র্যাকটিস করিয়ে দিস |”

তা অমলবাবু কে ইনহেলারটা বের করতে বললাম | উনিও বের করে রাখলেন আমার সামনে টেবিলে…. কিন্তু একি??.. ওটা কি??!!! ওটা কি বেরিয়ে আছে ইনহেলারের উপর থেকে?? ইনহেলারের উপরে ড্রাগ ক্যানিস্টারের পাস থেকে বেরিয়ে আছেন দুই বিদ্রোহী বীর??… কি জিনিস জানতে চান নিশ্চয়??

কিছুই না স্রেফ ২টি ‘রাজু বিড়ি’!!!!!! কি কান্ড !! এ পকেট সে পকেট থেকে আরো কিছু পাওয়া গেলো!!!

কিন্তু..আগের দিন “ধুমপান করবেন না” এতসব বোঝানো, সব বিফলে গেলো?? প্রশ্ন করলাম ওনাকে :

-কি ব্যাপার অমল বাবু? আগেরদিন আপানকে বললাম না যে সিগারেট বন্ধ, ধুমপান করবেন না?? বলিনি ?? শোনেন নি কেন?? এরকম করলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে আপনার |

-না বাবু, আপনি তো কইছিলেন সিগারেট খাবো না, কিন্তুক বিড়িও খাওয়া যাবে না সেইটে তো বলেন নাই!!! তাই আমি ভাবলুম বিড়ি খেলে কুনো অসুবিধে নাই!!

-কি মুস্কিল, আপনাকে বললাম যে কোনো রকম ধুমপানই চলবে না… বিড়ি কি ধুমপান নয়??

-না বাবু, বিড়িতে আর কইটুন ধুয়ো হয় গো.. ওটা কিস্যু না, ও আমি মানেজ করি ফেলবো!!!

-মানে?? ম্যানেজ করে ফেলবেন মানে??

-আরে বাবু, একবারেই পুরোটা টানি ফেলবো, কুনো ধুয়াই বাইরে আসবেক না গো!!!

আমার তো তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা, কিছুতেই বোঝাতে পারিনা যে বিড়ি ও খাওয়া চলবে না তার!! শেষ পর্যন্ত স্যার একটু ধমক-ধামক দিয়ে বোঝালেন ওনাকে| ওনার বাড়ির লোকজনকেও ডেকে বলা হলো ওনাকে চোখে চোখে রাখতে |

যাইহোক, পরের বার দেখা গেলো, পরিস্থিতি অনেকটাই ইমপ্রুভ করেছে | অমলবাবু সিগারেট-বিড়ির নেশা ছেড়েছেন (অবশ্যই বাড়ির লোকের কড়া নজরদারির ফল)…. আগের চাইতে বেশ সুস্থ |

বি.দ্র.: জীবনের প্রথম লেখা… সুতরাং গুচ্ছের ভুল ভ্রান্তি থাকবে, পাঠকগণ নিজগুনে মার্জনা করবেন…

বিড়ি মাহাত্ম্য
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments